সুতরাং, হযরত মুসার জীবদ্দশাতেই তিনি যখন মাদিয়ানে ছিলেন, তখন এক ফেরাউনের মৃত্যু হয়, এবং অপর ফেরাউন মৃত্যুবরণ করেন ইহুদীদের মিসরত্যাগের সময়। অতএব, একজন নয়, হযরত মুসার আমলে আমরা পাচ্ছি দু’জন ফেরাউন : একজন নির্যাতনের কালের; অন্যজন ইহুদীদের মিসর ত্যাগের সময়কার। সুতরাং, ফাদার ডি ভক্স-এর এক ফেরাউনের (দ্বিতীয় রামেসিস) থিওরি সন্তোষজনক বলে বিবেচিত হতে পারে না। কেননা, তিনি এতদসংক্রান্ত বর্ণনার সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখেননি। এছাড়াও তাঁর থিওরির বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুক্তি পেশ করা যায়।
০৯. দ্বিতীয় রামেসিস ও মারনেপতাহহ
ইতিপূর্বে পি. মতেঁ মাসপেরো কর্তৃক বর্ণিত আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রচলিত কাহিনীর উপর পুনরায় নতুন করে পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষা চালিয়েছেন। সন্দেহাতীত যে, টলেমির সেই স্বর্ণযুগে অতীত ইতিহাসের বহু কিছু আলেকজান্দ্রিয়াতে সংরক্ষিত ছিল। রোমান-বিজয়কালে সেসব ধ্বংস হয়। এ কত বড় ক্ষতি –অধুনা তা গভীরভাবে হৃদয়াঙ্গম করা যাচ্ছে।
পরবর্তী পর্যায়ে, ইসলামী জাহানে প্রচলিত কাহিনীতে যেমন তেমনি খ্রিস্টান জগতের প্রাচীন লোককাহিনীতেও দুই ফেরাউনের কাহিনী পাওয়া যায়। ২০ শতকের গোড়ার দিকে প্রকাশিত ‘হোলি হিস্টরিজ’ এবং ধর্মীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্দেশ্যে এ্যাবে এইচ, লেসেত্রে রচিত ইতিহাসেও ইহুদীদের মিসরত্যাগের ঘটনা ফেরাউন মারনেপতার আমলে সংঘটিত হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। যাহোক, পি. মতেঁ তাঁর ‘ইজিপ্ট অ্যান্ড দি বাইবেল’ পুস্তকে (১৯৫৯) যে থিওরি দিয়েছেন এবং তার সমর্থনে যেসব যুক্তি তুলে ধরেছেন, তা বাস্তবে কোরআনের বর্ণনায় বিদ্যমান। যদিও, এই খ্যাতনামা প্রত্নতত্ত্ববিদ তাঁর রচনায় কোরআনের কোনো বরাত উল্লেখ করেননি। তবে, কোরআনের সেসব বর্ণনার আলোচনার আগে আবার ফিরে যেতে হচ্ছে বাইবেলের বর্ণনার আলোচনায়।
বাইবেলের যাত্রাপুস্তকে রামেসিস (রামিষেষ) শব্দটার উল্লেখ রয়েছে বটে কিন্তু ফেরাউনের প্রকৃত কোনো নামের উল্লেখ নেই। এই রামেসিস হচ্ছে সেই অন্যতম নগরী যা জবরদস্তিমূলকভাবে ইহুদীদের দ্বারা নির্মাণ করানো হয়েছিল। এখন জানা যায় যে, বাইবেলে উল্লিখিত এই নগরী নীল-অববাহিকার পূর্বাঞ্চলে তানিস-কানতির এলাকায় অবস্থিত ছিল। এই এলাকাতেই দ্বিতীয় রামেসিস তাঁর উত্তরাঞ্চলীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখন এই নগরীতে আরো সৌধমালা ছিল। তবে, দ্বিতীয় রামেসিসই এই নগরীকে গুরুত্বপূর্ণ বর্ণাঢ্য নগরীতে পরিণত করেন। গত কয়েকদশক ধরে এই এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে এর বহু নিদর্শন পাওয়া গেছে। এই নগরী নির্মাণেই ‘রামেসিস’ কৃতদাসে পরিণত ইহুদীদের কাজে লাগিয়েছিলেন।
এখন যখন কোনো পাঠক বাইবেলে ‘রামেসিস’ শব্দটি দেখতে পান তখন তার মনে কোনোও ভাবান্তর জাগে না। কেননা, প্রায় ১৫০ বছর আগে সাংকেতিক চিত্রলিখন পদ্ধতির পাঠোদ্ধার আবিষ্কারকালে চ্যাপোলিয়ন এই বিশেষ শব্দটির উপর বিশদভাবে আলোকপাত করেছিলেন। ফলে, সেই থেকে শব্দটি একান্ত পরিচিত হয়ে পড়েছে। এখন এই শব্দটি আমরা আর সব শব্দের মতই পড়ছি, উচ্চারণ করছি এবং আমরা ধরেই রেখেছি, এই শব্দটি দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের কথা স্মরণ করুন। চিত্রাক্ষর লিখনের পাঠোদ্ধার পদ্ধতি তখন হারিয়ে গেছে; আর এই রামেসিস” শব্দটারও বলতে গেলে ঘটে গেছে অবলুপ্তি। তখন শুধু বাইবেলের পৃষ্ঠাতেই এই শব্দটি অবিকৃতভাবে রয়ে গিয়েছিল; যদিও কিছুসংখ্যক গ্রীক ও ল্যাটিন পুস্তকে এই শব্দটি প্রায় অথবা সম্পূর্ণ বিকৃত করা হয়েছিল। এ কারণেই ট্যাসিটাস তার। ‘এ্যনালস’ পুস্তকে শব্দটিকে রাহমসিস’ বলে উল্লেখ করে গেছেন। কিন্তু, বাইবেলে এই নামটি নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত ছিল এবং এই শব্দটি বাইবেলের পেন্টাটেক বা তাওরাত অধ্যায়ে চার-চারটি জায়গায় উল্লিখিত রয়েছে। (আদিপুস্তক ৪৭, ১১, যাত্রাপুস্তক ১, ১১ ও ১২, ৩৭ এবং গণনাপুস্তক ৩৩, ৩ ও ৩৩, ৫)
হিব্রু ভাষার বাইবেলে ‘রামেসিস’ শব্দটি দু’ভাবে লিখিত হয়েছিল। যথা ‘রা (ই) মস’ এবং রাইআমস [হিব্রু ‘ই’-শব্দটি (আরবী) ‘আইন’-এর মত]। বাইবেলের গ্রীক অনুবাদ যা ‘সেপ্টোজিন্ট’ নামে খ্যাত, সেখানে শব্দটি লেখা হয়েছিল ‘রামেসে’ বলে। বাইবেলের ল্যাটিন সংস্করণে (ভালগেট) শব্দটিকে করা হয় রামেসে। ফরাসী ভাষায় অনূদিত ক্লেমেন্টাইন বাইবেলেও (১ম সংস্করণ, ১৬২১) রাখা হয় একই উচ্চারণ ‘রামেসিস’। চ্যাম্পোলিয়ন যখন চিত্রাক্ষর সাংকেতিক ভাষা নিয়ে গবেষণা করছিলেন তখন এই ফরাসী বাইবেলটি সর্বত্র প্রচলিত ছিল। চ্যাম্পোলিয়ন তার ‘সামারি হাইয়ারোগ্লিফিক অব দি এনসিয়েন্ট ইজিপশিয়ানস’ (২য় সংস্করণ, ১৮২৮, পৃষ্ঠা ২৭৬)-এ বাইবেলে উল্লিখিত এই শব্দটির বানান সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন।
এইভাবে বাইবেলের হিব্রু, গ্রীক ও ল্যাটিন সংস্করণে ‘রামেসিস’ নামটি সংরক্ষিত থেকে গিয়েছিল। মজার কথা, বাইবেলের পুরাতন সংস্করণগুলোতে দেখা যায়, ভাষ্যকারবৃন্দ এই শব্দটির অর্থ আদৌও অনুধাবন করতে পারেননি। উদাহরণস্বরূপ, ক্লেমেন্টাইন বাইবেলের ফরাসী সংস্করণে (১৬২১) এই ‘রামেসিস’ শব্দটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে একদম গাঁজাখুরিভাবেই বলা হয়েছে : ‘থাডার অব দি ভারমিন’ অর্থাৎ কিনা এক ধরনের স্তন্যপায়ী হিংস্র জন্তুর গর্জন। (কিনা আশ্চর্য!)
