আমরা কি ভাষান্তর করতে পারি ধর্মীয় পরিভাষার বাইরে নীতিশাস্ত্রের? এর সম্ভাব্যতা সম্পর্কে ভিক্টোরীয় স্বাধীন চিন্তাবিদদের কোনো সন্দেহ ছিল না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, উপযোগবাদীরা ছিল উচ্চ নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ এবং তারা প্রত্যয় পোষণ করত তাদের নৈতিকতা একটি যুক্তিসঙ্গত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত বলে। যা হোক, বিষয়টি তাদের কল্পিত অবস্থার চেয়ে কঠিন। আলোচনা করা যাক উপযোগবাদীদের প্রস্তাবিত প্রশ্নের। কখনও কি আচারণবিধির নীতিশাস্ত্রীয় প্রতিজ্ঞা হতে পারে অথবা সর্বদাই কি আচরণের ভালো অথবা খারাপ ফলাফল থেকে তা পেতে হবে? ফলাফল নিরপেক্ষ প্রথাগত সৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে যে বিশেষ শ্রেণির কার্যকলাপ নীতিশাস্ত্রীয়ভাবে নিরপেক্ষ এবং এগুলো বিচার্য ফলাফল সাপেক্ষে। মৃত স্ত্রীর বোনের সঙ্গে বিবাহ একটি নীতিশাস্ত্রীয় প্রশ্ন; কিন্তু স্বর্নমান সম্পর্কীয় প্রশ্ন নীতিশাস্ত্রের আওতাভুক্ত নয়। দুটো সংজ্ঞা রয়েছে নীতিশাস্ত্রীয় প্রশ্নে, এর যে কোনো একটি এই বিশেষণ প্রযুক্ত ক্ষেত্রের জন্য প্রযুক্ত হবে। একটি প্রশ্ন নীতিশাস্ত্র সম্পর্কীয় (১) যদি তা প্রাচীন ইহুদিদের আগ্রহ সৃষ্টি করত। (২) যদি তা এ রকম হয় যে ক্যান্টারবারির আর্কবিশপ এর অফিসিয়াল দক্ষ। এটা স্পষ্ট যে, সম্পূর্ণ অরক্ষণযোগ্য নীতিশাস্ত্র শব্দটির ব্যবহার।
তা সত্ত্বেও ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে আমি দেখতে পাই যে, বিভিন্ন ধরনের আচরণ রয়েছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে আমি প্রতিকূলতা অনুভব করছি এবং যেগুলো আমার কাছে মনে হয় নৈতিকতা সম্পন্ন বলে।
কিন্তু স্পষ্টই তা প্রাক্কলিত পরিণাম নির্ভর নয়। অনেকের কাছ থেকেই আমি জানতে পেরেছি যে অসংখ্য ছেলেমেয়েকে বিষবাষ্প প্রয়োগে হত্যা করেও অন্যসব ভয়ানক কার্যকলাপের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ গণতন্ত্র সংরক্ষণ করা যায়। এ মুহূর্তে আমি এমন উপায় অবলম্বন নীরবে মেনে নিতে পারি না। আমি বলছি যে, তা সফল হবে না অথবা যদি সফল হয়েই যায় তবে এর পরিণাম এত খারাপ হবে যে তা গণতন্ত্রের যে কোনো সুফলকে অনেক পেছনে ফেলে দেবে। এ ব্যাপারে যুক্তিটি কতটুকু পক্ষপাতহীন আমি নিশ্চিত নই। আমি বলছি এ ধরনের উপায় অবলম্বন করা উচিত, যদি আমার কাছে প্রতীয়মান হয় যে এগুলোই সফল হবে। মনোগত কল্পনা থেকে আমি নিশ্চিত যে আমার কল্পিত ভালো কিছু এ ধরনের উপায় অর্জিত হতে পারে না। সর্বোপরি আমি মনে করি যে, দর্শনগতভাবে সব কাজই বিচার্য ফলাফল দ্বারা। কিন্তু যেহেতু তা কঠিন, অনিশ্চিত ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, বাস্তবে তাই আশা করা যেতে পারে যে, কিছু কিছু কাজ বাতিল করে দিতে হবে এবং পরিণতির পরীক্ষা ব্যতিরেকে কিছু কিছু কাজের প্রশংসাসূচক মূল্যায়ন করতে হবে। সুতরাং উপযোগবাদীদের মতো আমাকে বলতে হয় যে, যে কোনো সঠিক অবস্থায় সঠিক কাজ হচ্ছে তা-ই যা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য কাজগুলোর ভেতর মন্দের চেয়ে সর্বাধিক ভালো কিছু অর্জন করতে পারে। নৈতিক আচরণবিধির দ্বারাই এর কাজ সম্পাদন সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে নিলে নীতিশাস্ত্র ভালো ও মন্দের উদ্দেশ্যমূলক সংজ্ঞায়নে পর্যবসিত হয়। উপযোগবাদীরা বলেন, ভালো হচ্ছে আনন্দ এবং মন্দ হচ্ছে বেদনা। কিন্তু কেউ যদি তার সঙ্গে একমত না হন তবে কি যুক্তি উপস্থাপন করবেন তিনি?
বিবেচনা করা যাক জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। একজন বলেছেন, ভালো হচ্ছে আনন্দ; অন্যজন বলেছেন, ভালো হচ্ছে আল্লাহর প্রশংসা এবং চিরকাল তাকে গৌরবান্বিত করা। এই তিন ব্যক্তি কিসের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং কি পদ্ধতির মাধ্যমে একে-অন্যের প্রত্যয় সৃষ্টি করেছেন? বিজ্ঞানীদের মতে তাদের পদ্ধতি প্রকৃত সত্যের ব্যাপারে সংবেদনশীল নয়, অর্থাৎ কোনো সত্যই এই বিতর্কের অনুকূল নয়। তাদের পার্থক্য আকাক্ষার মধ্যে-সত্য সম্পর্কিত বিতর্কের ভেতর নয়। আমি বলছি না যে আমি যখন বলি এটা ভালো তখন আমি বোঝাতে চাই আমি তা আশা করি; এটা শুধু একটি বিশেষ আকাক্ষা যা আমাকে কোনো জিনিস ভালো বলতে উদ্বুদ্ধ করছে। এই আশা বিশেষ মাত্রা পর্যন্ত নৈব্যক্তিক; এটা এমন একটি বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে যা শুধু আমার পরিবেশেই আমাকে আনন্দ দেবে না। কোনো একজন রাজা। এই বর্ণনার প্রথম অংশ নিঃসন্দেহে নীতিগত। কিন্তু রাজা হওয়ায় তার আনন্দ শুধু নীতিগত হতে পারে, যদি কোনো জরিপ থেকে বোঝা যায় যে, অন্য কিছুই পারে না এ ধরনের ভালো রাজা বানাতে।
আগে এক উপলক্ষে আমি প্রস্তাব করেছি যে, স্বকীয়মান ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন-তবে এ ব্যাখ্যা স্বপ্রমাণের ভিত্তিতে নয়, বরং মানবজাতির আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কিত প্রকাশের ভিত্তিতে। আমি যখন বলি ঘৃণা খারাপ তখন প্রকৃতপক্ষে আমি বলি যে, কেউ ঘৃণাবোধ করেনি। আমি কোনোরূপ গুরুত্ব আরোপ করছি, আমি শুধু বিশেষ ধরনের আকাক্ষা প্রকাশ করছি। শ্রোতা বুঝতে পারেন যে, আমি এই আকাক্ষা অনুভব করি। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন যে সত্য শুধু এটি ই। এই সত্য মনোবিজ্ঞানসম্মত সত্য-নীতিশাস্ত্রীয় সত্য নয়।
নীতিশাস্ত্রের মহাপ্রবর্তকরা অন্য মানুষের চেয়ে বেশি জানতেন না। তবে বেশি আশা করতেন। আরও যথাযথভাবে বলতে গেলে সাধারণ মানুষের চেয়ে তাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল অধিকতর নৈর্ব্যক্তিক এবং তাদের লক্ষ্যস্থল ছিল অধিকতর ব্যাপক। অধিকাংশ লোকই নিজের সুখের চিন্তা করে; বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ তাদের ছেলেমেয়ের সুখের চিন্তা করে; অল্প লোকও জাতীয় সুখের চিন্তা করে না; মানবজাতির জন্য সুখের চিন্তা কোনো কোনো মানুষের ভেতর খাঁটি ও প্রবল। অনেকের মধ্যেই এ ধরনের অনুভূতি নেই এবং একে সার্বজনীন সুখের পথে বাধাস্বরূপ দেখে এসব মানুষ মনে করে যে অন্যরা যেমন কাজ করে তেমন অভুব করে; সুখই ভালো এভাবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়।
