শক্তি

 ০১. ক্ষমতার শাসন

মানুষ ও পশুর মাঝে নানা রকম পার্থক্য। আর এই পার্থক্যগুলোর কতগুলো বৃত্তিবৃত্তিক, কতগুলো আবার আবেগপ্রসূত। মানবীয় আকাঙ্ক্ষা যে পশুর আকাক্ষার মতো না তা আবেগপ্রসূত একটি প্রধান পার্থক্য থেকে বোঝা যায়। আকাঙ্ক্ষাগুলো মুখ্যত সীমাহীন ও পূর্ণ তৃপ্তিলাভে ব্যর্থ। খাদ্য গ্রহণের পর অজগর যেমন পুনরায় ক্ষুধা না লাগা পর্যন্ত সুখে নিদ্রা যায় তেমনি অন্য কোনো পশুর ভেতর এর ব্যতিক্রম ঘটলে ধরে নিতে হবে যে প্রয়োজনের তুলনায় তাদের খাদ্য প্রাপ্তি কম কিংবা তারা শত্রুর ভয়ে ভীত। পশুপাখির সার্বিক কার্যকলাপ গুটি কয়েক ব্যতিক্রম থাকা সত্ত্বেও বংশবৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার মৌলিক প্রয়োজনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় এবং এগুলোর কার্যকলাপ ওইসব মৌলিক প্রয়োজনের দ্বারা চিহ্নিত সীমা অতিক্রম করে না।

তবে মানুষের বেলায় বিষয়টি ভিন্নধর্মী। এ কথা সত্য যে, মানবকুলের বৃহৎ অংশ জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য বস্তু অর্জনের লক্ষ্যে এতটাই কঠোর পরিশ্রম করতে বাধ্য হয় যে অন্যান্য উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে খুব কম কর্মশক্তিই তাদের মাঝে বিদ্যমান থাকে। তাই বলে জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুর প্রাপ্তি সুনিশ্চিত হওয়ায় তারা কর্মতৎপরতা বন্ধ করে দেয় না। এথেন্স অভিডানে যখন জেরক্স অবতীর্ণ হন তখন তার খাদ্য, পোশাক ও স্ত্রীর অভাব ছিল না। নিউটন ট্রিনিটিতে ফেলোশিপ লাভের পর ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশের নিশ্চয়তা পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রিন্সিপিয়া লিখেছিলেন নিউটন। ইগনেসিয়ায় লায়লার অভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করার প্রয়োজনও ছিল না সেন্ট ফ্রান্সিসের। আলস্যপরায়ণ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ছাড়া অন্য সব লোকের ভেতর কিন্তু এ ধরনের বৈশিষ্ট্য বা গুণ কমবেশি অস্বাভাবিকভাবে দেখতে পাওয়া যায়। মিসেস এ-যিনি তার স্বামীর ব্যবসায়িক সফলতায় সন্দেহাতীতভাবে প্রত্যয় পোষণ করতেন এবং যার কাজের ঘর সম্পর্কে কোনো ভয় ছিল না, তিনি মিসেস বি-এর চেয়ে ভালো পোশাক পরতে পছন্দ করতেন। যদিও তিনি অপেক্ষাকৃত কম খরচে নিউমোনিয়াজতিন বিপদ এড়াতে পারতেন। যদি মি. একে উপাধিতে ভূষিত করা হতো বা সংসদে সদস্য নির্বাচিত করা হতো তাহলে তিনি এবং মিসেস এ উভয়েই খুশি হতেন। সাফল্যের কোনো শেষ নেই, হোক না তা অলীক কল্পনাপ্রসূত, সম্ভব মনে হলে তা অর্জনের চেষ্টা করা হয়।

কল্পনা হলো এক ধরনের আঁকশির মতো; এজন্য সব মৌলিক চাহিদা মিটে গেলেও এটি মানুষকে বিরতিহীন প্রচেষ্টায় উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের ভেতর অধিকাংশ মানুষ খুব অল্প সময়কেই জেনেছেন যখন আমরা বলতে পারতাম

If it were now to die,
There now to be most happy, for I fear
My soul hath her content as absolute
That not another comfort like to this
Succeeds in unknown fate.

আমরা জানি যে সুখ দীর্ঘস্থায়ী নয় তাই আমাদের পূর্ণাঙ্গ সুখের ক্ষণে অথেলোর মতো মৃত্যু কামনা করাই স্বাভাবিক। মানুষের পক্ষে পরম সুখের জন্য যা প্রয়োজন তা অর্জন করা অসম্ভব। স্বর্গসুখ শুধু ঈশ্বরই পেতে পারেন, যেহেতু সাম্রাজ্য এবং ক্ষমতা ও গৌরব একমাত্র তাঁরই। মৃত্যুর ফলে পার্থিব ক্ষমতা সংক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে, এ কারণে পার্থিব রাজ্য অন্যান্য রাজ্য দ্বারা সীমিত হয়ে যায় এবং পার্থিব গৌরব শতাব্দীর প্রবাহে বিলীন হয়ে যায়। তারপরও আমরা তৈরি করি পিরামিড এবং অবতারণা করি সুন্দর অমর গাথার। খুব সামান্য ক্ষমতা ও গৌরব যাদের আছে তারা মনে করে আরেকটু পেলেই তারা পরিতৃপ্তি পাবে, তাদের এ ধারণা ভুল। সীমাহীন এসব আকাক্ষা এবং এতে কেউ কিছুই পরিপূর্ণ তৃপ্তি পেতে পারে না। খোদার আনন্দ বিস্তৃতির মধ্যেই তারা শুধু সুখের সন্ধান পেতে পারে।

জীবজন্তু যখন তাদের অস্তিত্ব ও বংশবিস্তার নিয়েই সন্তুষ্ট, মানুষ তখন তাদের পরিবৃত্তির জন্য মশগুল। এ অবস্থায় কল্পনায় রায়ে তাদের আকাঙ্ক্ষা অঙ্কিত সীমারেখা অতিক্রম করতে পারে না। সব মানুষই সম্ভব হলে ঈশ্বর হতে চাইত। এর অবাস্তবতাকে গুটিকয়েক মানুষ স্বীকার করে নিতে পারে না। মিলটনের শয়তানের ছাঁচে গড়া এসব মানুষ। মহত্ত্ব ও অধার্মিকতার মিশ্রণ দেখা যায় তাদের মাঝে। মানবীয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল নয়–আমি অধার্মিকতা বলতে এমন কিছু বোঝাতে চাই। বড় বড় বিজয়ী নেতার ভেতর মহত্ত্ব ও অধার্মিকতার অদ্ভুত মিশ্রণ সুস্পষ্ট। অবশ্য মানুষের ভেতর এর কিছু কিছু উপাদান দেখতে পাওয়া যায়। সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এগুলো সংকট সৃষ্টি করে। প্রত্যেকেই আমরা নিজেকে ঈশ্বরের সমতুল্য মনে করি এবং তা খোদা ও উপাস্যের মধ্যকার সহযোগিতার স্বরূপ অনুসারে বুঝতে চাই। এজন্যই সরকার ও আপোষ মীমাংসার প্রয়োজন স্বরূপ প্রতিযোগিতা, অস্থিতিশীলতা ও পর্যায়বৃত্ত হিংস্রতার সঙ্গে বিদ্রোহের তাড়না। এ কারণে নৈতিকতার প্রয়োজন অরাজকতাপূর্ণ স্বাধিকার আদায়ের প্রচেষ্টা রহিতকরণে।

ক্ষমতা ও গৌরব হলো মানুষের সীমাহীন আকাঙ্ক্ষার ভেতর প্রধান। যদিও এগুলো ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত কিন্তু অভিন্ন নয়। মর্যাদার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বেশি। অন্যদিকে ক্ষমতার চেয়ে রাজার মর্যাদা বেশি। সে যাই হোক গৌরব অর্জনের সহজতম পথ হচ্ছে আগে ক্ষমতা লাভ করা। এটা তাদের ক্ষেত্রেই বিশেষভাবে প্রযোজ্য যারা জাতীয় ঘটনা নিয়ে কাজ করেন। সুতরাং গৌরব ও ক্ষমতালাভের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে একই কাজ সমাধান উদ্বুদ্ধ করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবে এটা দুটো উদ্দেশ্য বিবেচিত হয় অভিন্ন বলে।

গোঁড়া অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে মার্কস এ বিষয়ে একমত যে, তিনি এবং গোড়া অর্থনীতিবিদরা ভুল করেছেন অর্থ-সম্পর্কীয় স্বার্থকে সমাজবিজ্ঞানের মূল ও চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। ক্ষমতা ও মর্যাদা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে সীমাহীন নয় সম্পদ লাভের আকাঙ্ক্ষা, বরং তা পরিপূর্ণ তৃপ্তি লাভ করতে পারে সীমিত সরবরাহ দ্বারা। বস্তুগত উপভোগের সাপেক্ষে বোঝা যায় না প্রকৃত ব্যয়বহুল আকাঙ্ক্ষা। এইসব সম্পদ অন্যায়ভাবে অধীনস্ত হয়ে পড়ে আইন পরিষদ কর্তৃক প্রণীত আইন বলে এবং সিনেমা গ্যালারিগুলো দক্ষ কুশলীদের দ্বারা একান্ত পুরনো প্রভুদের জন্য নির্ধারিত হয়। ক্ষমতা ও গৌরব বাড়ানোর জন্যই এ সব কিছুই করা হয়–আয়েশে বসার জন্য নয়। ক্ষমতা অনুসরণ করা হয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠী উভয় পর্যায়েই পরিমিত উপভোগের নিশ্চয়তা পেলে, সম্পদ নয়। তারা সম্পদের পরিবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে ক্ষমতার জন্যই সম্পদের সন্ধান করে অথবা ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু পূর্বোক্ত বিষয়টিতে শেষোক্ত বিষয়টির মতো মূল চালিকা শক্তি অর্থনীতি হয়।

এই ভুলটি গোঁড়া অর্থনীতিবিদ ও মার্কসীয় অর্থনীতিবিদদের শুধু তত্ত্বীয় দিক থেকে নয় বরং তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক দিক থেকেও এবং আধুনিক ঘটনাপ্রবাহকে ভ্রান্তির বেড়াজালে–ই প্রবিষ্ট করেছে। যদি মনে করা হয়, ক্ষমতার মোহই সামাজিক বিষয়গুলোর দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে, একমাত্র তাহলেই সম্ভব সঠিকভাবে আধুনিক অথবা প্রাচীন ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।

সমাজবিজ্ঞানের মূল ধারণা ক্ষমতা-আমি এই বইয়ের পরবর্তী পর্যায়ে এই সত্যটি প্রমাণ করার চেষ্টা করব। শক্তি যেমন পদার্থবিজ্ঞানের মূল ধারণা তেমনি ক্ষমতা সমাজবিজ্ঞানের মূল ধারণা। ক্ষমতাও শক্তির মতো প্রকারভেদ আছে। যেমন সম্পদ, যুদ্ধাস্ত্র, বেসামরিক কর্তৃত্ব এবং মতামতের উপর প্রভাব। তবে এমন ভাবা যাবে না যে এগুলো একটা আরেকটার অধীন। এর কোনোটি অন্যটি থেকে উদ্ভূতও নয়। অবশ্য এ কথা সত্য যে, আংশিক সফলতা আনবে পৃথকভাবে যে কোনো এক প্রকার ক্ষমতার আলোচনা। ক্ষমতার একটি বিশেষ রূপের আলোচনা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থাকে অন্যগুলো আলোচনার বাইরে রাখলে। সম্পদ লাভ করা যেতে পারে মিলিটারি ক্ষমতা ও মতামতের উপর প্রভাব থেকে। ঠিক একইভাবে এগুলোর যে কোনো একটি সৃষ্টি করা যায় সম্পদ থেকে। শুধু ক্ষমতার সাপেক্ষে সমাজ গতিবিজ্ঞানের সূত্রগুলো বর্ণনা করা যায় ক্ষমতার বিশেষ রূপের সাপেক্ষে নয়। মিলিটারি ক্ষমতা আগের দিনগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে ছিল এবং পরিচালকের আকস্মিক দক্ষতার উপর নির্ভর করতে যুদ্ধের জয় পরাজয়। আমরা এ যুগে মনে করি অন্যসব ক্ষমতা বেরিয়ে আসবে অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে। আমি বলতে চাই, মিলিটারি ইতিহাসবিদদের অনেকের এটিও একটি বড় ধরনের ভুল যে, এটি তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে অচল ভাবতে। আবার অনেকেই প্রচালনাই ক্ষমতার মৌলিক রূপ বলে মনে করেন। অবশ্য কোনো নতুন ধারণা নয় এটি। এটি শহীদের রক্তই চার্চের ভিত্তি এই প্রচলিত ধারণাই ভেতর জীবন্ত হয়ে ওঠে। এতে মিলিটারি এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণের মতোও প্রায় সমপরিমাণ সত্য ও মিথ্যার আশ্রয় রয়েছে। প্রচারণা সমাজে অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে যদি তা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়। কিন্তু প্রচারণার উদ্দেশ্যে ইচ্ছা করলে তারা এটি ব্যবহার করতে পারেন যাদের হাতে মিলিটারি বা অর্থনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অবশ্য পদার্থবিজ্ঞানের অনুরূপ আলোচনায় যদি ফিরে যাই তাহলে দেখব, ক্ষমতাও শক্তির মতো বারবার রূপান্তর ঘটায় এবং এই সব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যে নিয়ম বিদ্যমান তার অনুসন্ধান করা সমাজবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হওয়া উচিত। আমাদের এ যুগে ক্ষমতার যে কোনো রূপকে আলাদা করে দেখা, বিশেষত অর্থনৈতিক ক্ষমতা আলাদাভাবে দেখার ফলে ভুলের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে বাস্তব গুরুত্বের অধিকারী।

ক্ষমতার সাপেক্ষে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে বিভিন্ন সমাজের পার্থক্য। তাদের পার্থক্য হয়ে থাকে ব্যক্তি ও সংগঠন কর্তৃক অর্জিত ক্ষমতার পরিমাণের ভিন্নতার জন্যে। এ কথা সত্য যে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে সংগঠনের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যেই বর্তমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অনেক বেশি। আবার এগুলোর পার্থক্য সৃষ্টি হয় সর্বাদিক প্রভাবশালী সংগঠনগুলোর ভিন্নতা সাপেক্ষে। যেমন মিলিটারি, স্বৈরতন্ত্র, ধনতন্ত্র, দিব্যতন্ত্র ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। তাদের পার্থক্য সৃষ্টি হয় ক্ষমতা অর্জনের পদ্ধতিগত ভিন্নতার জন্যে। এক ধরনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জন্ম দেয় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া রাজতন্ত্র; অন্য এক প্রকার ব্যক্তিত্বের জন্ম দেয় রাজকীয় ব্যবস্থা; গণতন্ত্র তৃতীয় এবং যুদ্ধ চতুর্থ প্রকারের ব্যক্তিত্বের জন্ম দেয়।

ক্ষমতা অর্জনে সক্ষম ব্যক্তিদের সংখ্যা সীমিত রাখার জন্য যেখানে অভিজাততন্ত্র বা রাজতন্ত্রের মতো কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠান নেই সেখানে তাদের জন্য ক্ষমতা অর্জন খুব সহজ যাদের ক্ষমতা অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। রয়েছে। মূলত ক্ষমতা যে সমাজ ব্যবস্থায় সবার জন্য উন্মুক্ত সে সমাজে ক্ষমতাকেন্দ্রিক পদগুলো অসাধারণ ক্ষমতালিম্পু ব্যক্তিদের হাতে চলে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানব স্পৃহাগুলোর ভেতর ক্ষমতালিপ্সা অন্যতম হলেও তা সামঞ্জস্যহীনভাবে সমাজে বন্টিত হয়ে আছে এবং তা সীমিত হয়ে পড়ে ভিন্ন। ধরনের অন্যান্য স্পৃহা, যেমন আনন্দপ্রিয়তা, আরামপ্রিয়তা ও অনুমোদনপ্রিয়তা দ্বারা। এটি সুযোগ বাড়িয়ে দেয় আনুগত্যের ছদ্মাবরণে বিরাজ করা ভীরুলোকদের ভেতর সাহসি ব্যক্তিদের ক্ষমতা বিস্তারে। ক্ষমতালিপ্সা যাদের প্রবল নয় তাদের প্রভাব ঘটনাপ্রবাহের উপর খুবই কম। সাধারণত তারাই সমাজে পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম যারা সমাজ পরিবর্তনের তীব্র আশা পোষণ করে। সুতরাং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতালিপ্সা। একে আমরা একমাত্র মানবশৃহা বলে গণ্য করলে অবশ্যই ভুল হবে। অবশ্য সমাজবিজ্ঞানের কার্যকারণ সূত্রগুলো অন্বেষণের ফলে যা ঘটে থাকে এ ভুল হয় এক্ষেত্রে আমাদের এমন বিপথগামী করবে না। ক্ষমতালিপ্সাই হলো প্রধান স্পৃহা যার ফলে পরিবর্তন সাধিত হয়। তাই তার আলোচনা করা সমাজবিজ্ঞানে একান্ত প্রয়োজন।

বিভিন্ন প্রকার ক্ষমতার সাপেক্ষে শুধু সমাজ গতিবিজ্ঞানের সূত্রগুলো বর্ণনা করা সম্ভব। এই সূত্রগুলো আবিষ্কারের জন্য প্রথমত ক্ষমতার শ্রেণিবিভাগ এবং পরে ব্যক্তি বা সংগঠন দ্বারা মানবজীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্জনের পন্থা সংবলিত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তে পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এ পুরো বইয়ে আমার দ্বিবিধ উদ্দেশ্য থাকবে পরামর্শদানে। আমি বিশ্বাস করি যে সামাজিক পরিবর্তনের সাধারণ বিশ্লেষণ অধিকতর সমৃদ্ধ অর্থনীতিবিদদের প্রদত্ত শিক্ষা অপেক্ষা। বর্তমান ও নিকট-ভবিষ্যৎকে অধিকতর বোধগম্য করে তোলা প্রয়োজন অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের চেয়ে। বিভিন্নভাবে ব্যতিক্রমধর্মী ছিল ওই শতাব্দীগুলো। অনেকভাবে আমরা বিগত যুগের জীবনধারা ও চিন্তাধারায় প্রত্যাবর্তন করছি বলে মনে হয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস আলোচনা এ যুগ ও এর প্রয়োজন বুঝতে হলে অপরিহার্য। আমরা সম্ভাব্য অগ্রগতি শুধু তখনই অর্জন করতে পারব যখন তা ঊনবিংশ শতাব্দীর স্বতঃসিদ্ধতার অযৌক্তিক প্রভাবে প্রভাবিত হবে না।

০২. নেতা ও অনুসারী

দুই ধরনের প্রেরণা ক্ষমতা লাভের একটি নেতাদের ভেতর স্পষ্ট, অন্যটি অনুসারীদের ভেতর প্রচ্ছন্ন। নেতার নেতৃত্বাধীন দল কর্তৃক ক্ষমতা অর্জন করাই হচ্ছে কোনো নেতাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুসরণ করার উদ্দেশ্য। কারণ তারা নেতার সাফল্যেই তাদের সাফল্য মনে করে। বিজয় লাভের লক্ষ্যে অধিকাংশ লোকই নেতৃত্বদানে নিজের যোগ্যতার ভরসা করতে পারে না। তাই তারা শ্রেষ্ঠত্ব। অর্জনের প্রয়োজনীয় সাহস ও বিচক্ষণতা আছে এমন এক ব্যক্তিকে তাদের দলের নেতা বানাতে চায়। এমনকি এই আবেগ ধর্মের বেলায়ও বিদ্যমান। নিয়েজেক খ্রিস্টবাদকে জোরপূর্বক দাসনীতির ধারণা জন্মাবার জন্য দোষারোপ করেছে। কিন্তু লক্ষ্য ছিল সবসময় সর্বশেষ বিজয়ের। মহিমান্বিত ব্যক্তিরাই ভদ্র কারণ তারাই পৃথিবী পাবে, অথবা

যুদ্ধে যাবে দেবতাপুত্র
রাজমুকুট পাওয়ার আশায়
স্রোতের বানে তার রক্তাক্ত বেনার ভাসে
তার ট্রেনে যে যাবে।
যুদ্ধের সরাব ভার যে পান করে
সবার উপরে বিজয়ী দেব।

এই-ই যদি দাসনীতি হয় তাহলে দাস হিসেবে বিবেচিত হবেন সমরাভিযানে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা পালনকারী সৈনিক ও নির্বাচনে কঠোর পরিশ্রমী রাজনীতিকদের সবাই। প্রকৃতপক্ষে খাঁটি সমবায় উদ্যোগের অনুসারীরা দাস নন, নেতা।

এজন্য মানসিকতা সৃষ্টি হতে পারে সংগঠনের আওতাভুক্ত ক্ষমতা অসম বন্টন মেনে নেবার। ক্ষমতার এই অসম বন্টন সমাজ প্রগতির সঙ্গে বাড়বে বই কমবে না। যতদূর জানা যায় মানব সমাজে ক্ষমতার এই অসমবন্টন সব সময়ই ছিল। এটি ঘটে থাকে আংশিকভাবে বাহ্যিক প্রয়োজনে এবং আংশিকভাবে তা মানুষের স্বভাবজাত কারণে। অধিকাংশ সমবায় উদ্যোগ সম্ভব হয়ে ওঠে একমাত্র প্রশাসনিক বোর্ডের পরিচালনার মাধ্যমে। যেমন কোনো বাড়ি তৈরি করতে হলে কাউকে না কাউকে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে; রেললাইনে রেলগাড়ি চালাতে হলে তার সময়সূচি ড্রাইভারের খামখেয়ালির উপর ছেড়ে দেয়া যাবে না; নতুন রাস্তা তৈরি করতে হলে রাস্তাটি কোথায় যাবে তা কাউকে স্থির করতে হবে। গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত হলেও সরকার সরকারই। সুতরাং যে ক্ষেত্রে মনস্তত্ত্বের সম্পর্ক অনুপস্থিত সে ক্ষেত্রে সমবেত উদ্যোগ সার্থক করার জন্য কিছু সংখ্যক মানুষ এমন থাকবে যারা নেতৃত্ব দেবে এবং অন্য মানুষেরা নেতৃত্ব মেনে নেবে। কিন্তু আসল ঘটনা এই যে, প্রকৃত অসম ক্ষমতা কৌশলগত কারণে অনিবার্য মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এই সত্য ব্যাখ্যা করা যেতে পারে শুধু মনোবিদ্যা ও শরীরবিদ্যা সাপেক্ষে। কিছু মানুষের চরিত্র এমনই যে তারা নির্দেশ প্রদান করে এবং তা সর্বদা অন্য লোকেরা পালন করে। কোনো কোনো অবস্থায় এই দুই চরম অবস্থার মাঝামাঝি লোকজন আদেশ প্রদান করে, কিন্তু ভিন্ন অবস্থায় নেতার অনুগত হওয়াই পছন্দ করে।

Understanding Human Nature নামক বইয়ে এডলার দুই ধরনের মানুষের পার্থক্য দেখিয়েছেন–একটি শাসিত অন্যটি শাসক। তিনি বলেন, অন্যের দ্বারা আরোপিত নিয়ম শাসিত ব্যক্তি মেনে চলে এবং সব সময় একটা হীন অবস্থা খুঁজে বের করে নিজের জন্যে। অন্যদিকে শাসকশ্রেণি কি করে সবার থেকে শ্রেষ্ঠ হতে পারে তা ভাবতে থাকে। প্রয়োজনের সময় বিপ্লবের মাধ্যমে সবার উপরে উঠে আসেন এমন মানুষও দেখতে পাওয়া যায়। উভয় ধরনের লোকই তাদের চরম অবস্থায় অনভিপ্রেত বলে এডলার মনে করেন। শিক্ষার ফসল বলে তিনি তাদের অভিহিত করেন। তিনি বলেন, কর্তৃত্বপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা শিশুমনে ক্ষমতার একটি আদর্শিক ধারণার জন্ম দেয়, এটা একটা বড় অসুবিধা এবং এটি ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এমন এক আনন্দের দিকে ইঙ্গিত করে। আমরা আরও বলতে পারি, কর্তৃত্বপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা সৃষ্টি করে দাস ও স্বেচ্ছাচারী মানুষ। কারণ তা তাদের এই অনুভূতির দিকে ধাবিত করে যে দুজন মানুষের মাঝে সহযোগিতার একমাত্র সম্পর্ক হচ্ছে এক ব্যক্তি আদেশ প্রদান করবে এবং অন্য ব্যক্তি তা মেনে চলবে।

সীমিত ক্ষমতা বিশ্বজনীন; কিন্তু বিরল চরম ক্ষমতালিপ্সা। গৃহ পরিচালনায় একজন মহিলা যে ক্ষমতা রাখেন তা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার তুলনায় কম বলেই মনে হয়। অন্যদিকে রাষ্ট্র শাসন করতে যখন আব্রাহাম লিংকন ভীত নন তখন তিনি মোকাবেলা করতে পারেননি নিজ দেশে গৃহযুদ্ধের। নৌকায় পালানোর জন্য ব্রিটিশ অফিসারদের আদেশ নোপোলিয়ন হয়তো মাথা পেতে নিতেন বেলেরোফন জাহাজ ডুবির মতো দুর্ঘটনায় পতিত হলে। মানুষ যতক্ষণ তার যোগ্যতায় বিশ্বাস করে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সে ক্ষমতার আশা করে। কিন্তু যখন নিজের অযোগ্যতা সম্বন্ধে বুঝতে পারে তখন সে সিদ্ধান্ত নেয় একজন নেতাকে অনুসরণ করার।

আদেশদানের প্রেরণার মতোই প্রকৃত ও সাধারণ আনুগত্যের প্রেরণা। ভয়ের ভেতর এর জন্ম। চরম অবাধ্য ছেলের দলও অগ্নিকাণ্ডের মতো ভীতিপ্রদ পরিস্থিতিতে পুরোপুরি বাধ্য হয়ে যায় যোগ্য বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির। প্যাস্কারসরা যুদ্ধের সময় শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল লয়েড জর্জের সাথে। অধিকাংশ লোকই বিপদ দেখা দিলে নেতা খুঁজে বের করে এবং আত্মসমর্পণ করে তার কাছে। এ রকম সময়ে খুব কম লোকই স্বপ্ন দেখে বিপ্লবের। সরকারের প্রতি জনগণের এ ধরনের মনোভাব পরিলক্ষিত হয় যখন যুদ্ধ বাধে।

সব সময় এমন কথা সত্য নয় যে বিপদ মোকাবেলা করার উদ্দেশ্যে সংগঠনগুলো গঠিত হয়। কয়লা খনির মতো কিছু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিপদাপন্ন হতে পারে সংগঠনগুলো। কিন্তু তা নিতান্তই আপতিত। এগুলো যদি দূর করা যেত তাহলে প্রভূত সমৃদ্ধি হতো সংগঠনগুলোর। সাধারণ বিপদ মোকাবেলা করা অর্থনৈতিক সংগঠনগুলোর প্রধান উদ্দেশ্যের আওতাভুক্ত নয়। অথবা অর্থনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ে ব্যস্ত রাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলোরও নয়। কিন্তু বিপদ মোকাবেলা করার উদ্দেশ্যেই জীবনতরী ও অগ্নিনির্বাপক বাহিনী তৈরি করা হয়। ধর্মীয় সংগঠনের বেলায়ও একটি বিশেষ লঘু অর্থে সত্য, যেগুলো আমাদের প্রকৃতির গভীর আংশিকভাবে বিদ্যমান প্রোথিত অধিবিদ্যাগত ভয়ের উপশমের উদ্দেশ্যে। এ ব্যাপারে যদি কারও সন্দেহের উদ্রেক হয় তাহলে নিচের স্তুতিবাক্য সম্পর্কে চিন্তা করতে পারেন :

আমার পরিচয় প্রাচীন শিলায়
আমি তারই মাঝে লুকিয়ে থাকি
জেস্যু আমার আত্মার আত্মীয়।
আমায় যেতে দাও তার বুকে
পানি যখন গড়িয়ে যায়।
আর তীব্র হয় উতলা হাওয়া

এমন ধারণা আছে যে চূড়ান্ত ক্ষমতা নিহিত রয়েছে স্বর্গীয় ইচ্ছার কাছে। আত্মসমর্পণের মধ্যে। এর ফলে ধর্মীয় মর্যাদাবোধ হ্রাস পেয়েছে অনেক শাসকের মধ্যে। শুধু পার্থিব শক্তির কাছে এমন শাসকরা মাথানত করতে অপারগ। সর্বপ্রকার বশ্যতার মূলে রয়েছে ভয়, তা মানুষ অথবা স্বর্গীয় যে কোনো সত্তার কাছেই হোক না কেন।

এমন ধারণা আজকাল স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে আক্রমণের মূলেও রয়েছে ভীতি। এই তত্ত্বটি অনেক দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে এ কথা ভাবতে আমি বাধ্য। এটি বিশেষ ধরনের আক্রমণের বেলায় সত্য। উদাহরণস্বরূপ ধরা যেতে পারে D.H. Lawrence-এর আক্রমণ। কিন্তু আমার সন্দেহ হয় যে, যেসব মানুষ দস্যুপ্রধান হয়েছে তারা কি তাদের পিতার চরম ব্যবহারে আতঙ্কগ্রস্ত ছিল অথবা Austerlitz-এ নেপোলিয়ান কি ভেবেছিলেন যে তিনি মেডাম মেয়ারের উপরও প্রতিশোধ নিচ্ছেন! আমি কিছুই জানি না এটিলার মা সম্পর্কে। তিনি তার প্রিতমের ক্ষতিসাধন করেছিলেন বলে আমার সন্দেহ হয়, পরবর্তী সময়ে দুনিয়া যার কাছে অস্বস্তিকর বলে মনে হতো। কারণ তা সময় সময় বাধা সৃষ্টি করত তার খেয়াল-খুশির উপর। আমি এটা মনে করি না যে বড় বড় নেতার মাঝে ভীতি থেকে এমন আক্রমণ প্রবণতা উৎসাহ যোগায়। আমার বলা উচিত বাহ্যিকভাবে নেতাদের ভেতর আত্মবিশ্বাস বিরাজ করে না, বরং তা তাদের অবচেতন মনের অনেক গভীরে অবস্থান করে।

বিভিন্নভাবে সৃষ্টি করা যেতে পারে নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস। ঐতিহাসিকভাবে এটি হচ্ছে হুকুমের উত্তরাধিকার অবস্থান। দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখা যায় সংকটকালে রানী এলিজাবেথের ভাষণ। আপনি দেখবেন, রাজা ভদ্রমহিলাকে প্রভাবিত করে তার মাধ্যমে জাতীয় মনের প্রত্যয় সৃষ্টি করেছেন যে কি করতে হবে তা তিনি জানেন। অথচ তা জানার আশা করতে পারে না সাধারণ মানুষ। তার বেলায় সঙ্গতিপূর্ণ হলো জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম ক্ষমতার স্বার্থ। এ জন্যই মহান রানী তিনি। ঘৃণার উদ্রেক না করেই তিনি করতে পারতেন পিতার গুণকীর্তন। নিঃসন্দেহে দায়িত্ব পালন ও ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজতর করে আদেশদানের অভ্যাসই। অধিকাংশ নির্বাচিত প্রধানের চেয়ে বংশগত গোষ্ঠীপতির অনুসরণ করে কোনো উপজাতির ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল অর্জন সম্ভব। অপরদিকে ব্যক্তির গুণাগুণের ভিত্তিতে মধ্যযুগীয় চার্চের মতো সংগঠনগুলোতে নেতা নির্বাচন করা হতো, যারা ভালো ফল লাভ করতেন বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের মাধ্যমে বংশগত রাজতন্ত্রের চেয়ে।

ইতিহাসে পরিচিত বৈপ্লবিক পরিবেশে আবির্ভূত হয়েছেন কোনো কোনো নেতা। আমরা এখন আলোচনা করব ক্রমওয়েল, নেপোলিয়ন এবং লেলিনের ওইসব গুণ সম্পর্কে যা তাদের সফলতা এনে দিয়েছে। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দেশে আধিপত্য বিস্তার করেন এবং সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের স্বেচ্ছামূলক সেবাকর্ম গ্রহণ করেন, যারা স্বভাবগতভাবে অধীনতামূলক আচরণে অভ্যস্ত ছিলেন না। অফুরন্ত সাহস ও আত্মবিশ্বাস ছিল তাদের। সংকটমুহূর্তে তাদের সহকর্মীরা এগুলো সহযোগে উত্তম ব্যক্ত করতেন অভিমত। এই তিনজনের ভেতর ক্রমওয়েল ও লেলিন ছিলেন এক ধরনের আর নেপোলিয়ন ছিলেন ভিন্ন ধরনের। প্রগাঢ় ধর্মবিশ্বাস ছিল ক্রমওয়েল এবং লেলিনের। অতিমানবীয় কার্য সম্পাদনের জন্য নিয়োজিত-এমন বিশ্বাস করতেন তারা। তাদের ক্ষমতালাভের তাড়না নিঃসন্দেহে ন্যায়ভিত্তিক বলে তারা মনে করতেন বিলাস ও আরামের মতো পুরস্কার লাভের জন্য তারা খুব কমই যত্নবান ছিলেন। কারণ তা সৃষ্টি সম্পর্কিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে তারা মনে করতেন। তা আবার বিশেষভাবে সত্য লেলিনের বেলায়। জীবনের শেষের দিকে পাপে পতিত হওয়ার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন ক্রমওয়েল। তা সত্ত্বেও তারা উভয়ই তাদের অনুসারীদের মাঝে প্রেরণা যুগিয়েছিলেন বিশ্বাস ও সামর্থ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে নেতৃত্বে বিশ্বাস সৃষ্টির বিষয়ে।

ক্রমওয়েল ও লেলিনের বিপরীতধর্মী ছিলেন নেপোলিয়ন। তিনি সৌভাগ্যবান সৈনিকের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন। তাকে যোগ্য হওয়ার সুযোগ এনে দেয় বিপ্লব। না হলে তিনি উদাসীন হতেন এর প্রতি। যদিও তিনি ফরাসি দেশপ্রেমের বাসনা চরিতার্থ করেন তারপরও ফ্রান্স ছিল তার কাছে বিপ্লবের মতো একটি সুযোগ মাত্র। যৌবনে তিনি কারসিকার জন্য ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ধারণা পোষণ করেন। তার সফলতার পেছনে অসাধারণ চরিত্রবল ততটা ছিল না যতটা যুদ্ধের কলা-কৌশলগত দক্ষতার ভূমিকা ছিল। তিনি জয়যুক্ত হতেন যখন অন্যরা পরাজিত হতো। তিনি সফলতার জন্য অন্যের উপর নির্ভর করতেন ১৮ মেয়ার এবং সারেঙ্গার চূড়ান্ত সময়ে। তার কো-এডজুটেন্টদের সাফল্যগুলোর সংযোজনে তার দান তাকে সাহায্য করে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবকদের সমন্বয়ে গঠিত ছিল ফরাসি সৈন্যদল। তাকে সফলতা এনে দেয় নেপোলিয়নের চাতুর্যই। অবশেষে ভাগ্যতারকায় বিশ্বাস তার পতন ঘটায়। এটি তার বিজয়ের ফল–কারণ নয়।

এ যুগে ক্রমওয়েল ও লেলিনের শ্রেণিভুক্ত হলো হিটলার আর মুসোলিনি নেপোলিয়নের ইতিহাসে বৈজ্ঞানিক ঐতিহাসিকদের ধারণার চেয়েও বেশি গুরুত্ব রয়েছে সৌভাগ্যবান সৈনিক অথবা দস্যুপ্রধানদের। কখনও তিনি নেপোলিয়নের মতো কোনো জনগোষ্ঠীর নেতা হতে সমর্থ হন যার উদ্দেশ্য আংশিকভাবে নৈর্ব্যক্তিক। ফরাসি বিপ্লবের সৈনিকরা নিজেদের ইউরোপের উদ্ধারকর্তা বলে মনে করত। একইভাবে অনেকে তা-ই ভাবত ইতালি ও পশ্চিম জার্মানিতে। কিন্তু নিজের উন্নতি বিধানের জন্য প্রয়োজনের বেশি স্বাধীনতা অর্জন করেননি নেপোলিয়ন। প্রায়ই নৈর্ব্যক্তিক উদ্দেশ্যের ছলনার অস্তিত্ব থাকে না। প্রাচ্যকে আলেকজান্ডার হয়তো গ্রিসে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার এ ধরনের অভিযানে মেসিডোনীয়রা যে আগ্রহী ছিল যথেষ্ট সন্দেহ আছে তাতে। প্রজাতন্ত্রের শেষ একশো বছর রোমান জেনারেলরা প্রধানত অর্থের সন্ধানে ব্যস্ত ছিলেন এবং তাদের সৈনিকদের আস্থা অর্জন করেন জমি ও সম্পদ বিতরণের মাধ্যমে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অলৌকিকতায় বিশ্বাস করতে সিসিল রোডস। বেশ ফলদায়ক হয়েছিল এই বিশ্বাস। মিটারল্যান্ড জয় করার জন্য তিনি যেসব সৈনিককে নিয়োজিত করেছিলেন তাদের নগ্নভাবে দেখানো হয় আর্থিক প্রলোভন। বিশ্বযুদ্ধগুলোতে প্রলোভনের ভূমিকা রয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে।

প্রধানত ভীতির মাধ্যমেই সাধারণ শান্তিপ্রিয় নাগরিক নেতার অনুগত হয়। এ কথাটি শান্তিপূর্ণ কোনো পেশার সম্ভাবনা না থাকলে ডাকাতদলের বেলায় প্রযোজ্য নয়। নেতার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি বিদ্রোহী লোকের মনে ভয় সৃষ্টি করতে পারেন। কিন্তু নেতা না হলে এবং অধিকাংশ মানুষ কর্তৃত্ব স্বীকৃতি না পেলে তিনি ভয় সৃষ্টি করতে পারেন না। নেতৃত্ব অর্জন করতে তার কর্তৃত্বের উপযোগী আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন এবং তাকে গুণান্বিত হতে হবে ত্বরিত ও দক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুণে। নেতৃত্ব আপেক্ষিক : এন্তনিকে সিজার অধীনস্ত করতে পারতেন, কিন্তু তা অন্য কেউ পারত না। অধিকাংশ মানুষ মনে করে রাজনীতি খুব কঠিন এবং কোনো নেতাকে অনুসরণ করাই শ্রেয়। প্রবৃত্তিবশত তারা অবচেতন মনে তা অনুভব করে থাকে, যেভাবে কুকুর আচরণ করে তার প্রভুর প্রতি। তা না হলে খুব কমই সম্ভব হতো সংঘটিত রাজনৈতিক কার্যকলাপ।

সুতরাং কাপুরুষতার দ্বারা সীমিত হয়ে পড়ে ক্ষমতাপ্রীতি। আবার আত্মনিয়ন্ত্রণের সদিচ্ছাকেও সীমিত করে কাপুরুষতা। আকাঙ্ক্ষা পূরণে ক্ষমতা অধিকতর সহায়ক বিকল্প পন্থার চেয়ে। সুতরাং ক্ষমতার প্রত্যাশাই স্বাভাবিক যদি কাপুরুষতা বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। এ ধরনের কাপুরুষতা দায়িত্ব পালনের অভ্যাসের দ্বারা কমানো যেতে পারে। সুতরাং ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা বাড়াতে দায়িত্ব সক্ষম। একজন মানুষকে নিষ্ঠুরতা ও বন্ধুত্বহীনতা যে কোনো দিকে চালাতে পারে। সহজেই যারা ভীত হয় তা তাদেরকে ইচ্ছা যোগায় দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার। সাহসী ব্যক্তিরা উৎসাহ পায় তাদের অবস্থান খুঁজে বের করার, ফলে দুঃখভোগ। করার চেয়ে তারা নিষ্ঠুরতা চালাতে পারে।

স্বৈরতন্ত্রের কথা আসে অরাজকতার পর। কারণ তা সহজ হয়ে পড়ে স্বাধীনতা ও কর্তৃত্বের প্রবৃত্তিগত বিষয়াবলির দ্বারা। তা উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করা যায় পরিবার, রাষ্ট্র ও ব্যবসায়। স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে কঠিন উভয়মুখি সহযোগিতা। এর সঙ্গতি প্রবৃত্তির সঙ্গে অনেককম। পূর্ণ কর্তৃত্বের জন্য চেষ্টা সবার জন্য স্বাভাবিক হয়ে যায় উভয়মুখি সহযোগিতার জন্য চেষ্টা করলে। এর কারণ অধীনতামুলক তাড়না নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। একটা সাধারণ আনুগত্য মেনে চলা সংশ্লিষ্ট সব মানুষের জন্য প্রয়োজন। চীনে পরিবারভিত্তিক ব্যবসা সর্বদাই সাফল্য লাভ করে পরিবারের প্রতি কনফিউসীয় আনুগত্য থাকার জন্য। কিন্তু সেখানে নৈর্ব্যক্তিক যৌথ কারবার অচল প্রমাণিত। কারণ সেখানে একজন শেয়ার মালিক অন্য শেয়ার মালিককে সতোর জন্য বাধ্য করে না। সফলতার জন্য আইনের প্রতি একটি সাধারণ শ্রদ্ধাবোধ থাকতেই হবে যেখানে সরকার আলোচনা ও সতর্ক বিবেচনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। তা না হলে সেই শ্রদ্ধা থাকতে হবে জাতির প্রতি অথবা সব দলের নীতির প্রতি। সংশয়মূলক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় বন্ধুসমাজে কোনো ভোট নেয়া হয় না বা সংখ্যাগরিষ্ঠের নীতি মেনে চলে না। তারা আলোচনা করে চলে পবিত্র আত্ম কর্তৃক প্রণোদিত হয়ে সভার মূল চেতনার কাছাকাছি না আসা পর্যন্ত। তাদের বেলা সমশ্রেণিভুক্ত সমাজই ছিল আমাদের প্রতিপাদ্য বিষয়। কিন্তু সরকার সততা ছাড়া আলোচনার মাধ্যমে অচল হয়ে পড়ে।

সরকার গঠনের উপযোগী ঐক্যবোধ ফুগায় ও রথশেল্ডস-এর মতো পরিবারে, কুয়েকারের মতো ছোট ধর্মীয় সংগঠনে, বর্বর সামজে, যুদ্ধকালীন বা যুদ্ধের আশংকায় জর্জরিত সমাজে আলোচনার মাধ্যমে বিনা দ্বিধায় সৃষ্টি করা যেতে পারে। এর ফলে অনিবার্য হয়ে পড়ে বাহ্যিক চাপ। পৃথক ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলার ভয়ে দলীয় সদস্যরা একসাথে থাকে। সমতা সৃষ্টির জন্য সবচেয়ে সহজ পন্থা হলো একটা সাধারণ বিপদ। অবশ্য পুরো পৃথিবীর ক্ষমতা সংকট সমাধানের দিকনির্দেশনা নয়। যুদ্ধ সংহতি সৃষ্টি করে সত্য, ক্ষমতা সংকট সমাধানের দিক নির্দেশনা নয়। যুদ্ধ সংহতি সৃষ্টি করে সত্য, কিন্তু এর বিপদ দূর করতে চাই আমরা। সামাজিক সহযোগিতা নষ্ট করতে চাই না আমরা। এটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে একটি কঠিন সমস্যা এবং বিচার-বিবেচনা করলে দেখা যায় কোনো প্রাথমিক স্বৈরতন্ত্রের মাধ্যমে কোনো জাতির এ ধরনের সমাধান সম্ভব। অভিজাততন্ত্রের মতোই কঠিন জাতিতে-জাতিতে মুক্ত সহযোগিতা ও বিভাগপূর্ব পুলিশ। এক্ষেত্রেও সাধারণ ত্রাণ অপেক্ষা ধ্বংস অগ্রগণ্য। সরকার মানবজাতির জন্য প্রয়োজন, কিন্তু অরাজকতাপূর্ণ সামজে প্রথমে স্বৈরতন্ত্রের কাছেই জনগণ বশ্যতা স্বীকার করে। তাই প্রথমেই চেষ্টা করা প্রয়োজন স্বৈরতন্ত্রের কাছেই জনগণ বশ্যতা স্বীকার করে। তাই প্রথমেই চেষ্টা করা প্রয়োজন স্বৈরাচারী সরকার গঠনে। শুধু সফল গণতন্ত্রের আশা করা যায় সরকার পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হলেই। পরম ক্ষমতা সংগঠন সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন। সামাজিক চাপ সৃষ্টি হয় সংশ্লিষ্ট পরম ক্ষমতা সংগঠন সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন। সামাজিক চাপ সৃষ্টি হয় সংশ্লিষ্ট সবার কল্যাণে ক্ষমতা ব্যবহারের দাবিতে। চার্চ ও রাজনীতির ইতিহাসে এই চাপ স্থির থাকলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর উপরিস্থিতি ইতিমধ্যেই ঘটেছে।

আমি এ পর্যন্ত শাসক ও শাসিতের সম্পর্কেই বললাম। কিন্তু তৃতীয় এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা এ দুয়ের কোনো পর্যায়েই পড়ে না। অধীনতাকে অগ্রাহ্য করার সাহস রাখে এমন কিছু মানুষও আছে। আবার তারা শাসন করবে এ রকম ঔদ্ধত্যও দেখায় না। এ ধরনের মানুষ নিজেকে সমাজ কাঠামোতে মানিয়ে নিতে পারে না। কমবেশি নির্জন স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে এ রকম একটা আশ্রয় তারা যে কোনোভাবে খুঁজে বের করে। কখনও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে এই প্রকৃতির মানুষরা। গোড়ার দিকে এই একই জেনাসের দুই প্রজাতি ছিল খ্রিস্টান ও আমেরিকার প্রথম কর্মীরা। এই আশ্রয় কখনও মানসিক এবং কখনও তা বাস্তব। সন্ন্যাসীর আশ্রমের মতো কখনও কখনও তারা পূর্ণ নির্জনতা চায়। আবার কখনও সামাজিক নির্জনতা চায় মঠের মতো। মানসিক আশ্রয় প্রার্থীদের ভেতর রয়েছে অস্পষ্ট সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ যাদের স্বার্থ নির্দোষ খামখেয়ালের অন্তর্ভুক্ত। যারা অর্জন করেছেন দুর্বোধ্য ও গুরুত্বহীন পাণ্ডিত্য। এরা তাদের অন্তর্ভুক্ত। পনেরো বছর ধরে শুধু ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে একত্রে বাস করছেন এমন বাস্তব আশ্রয় প্রার্থীদের ভেতর রয়েছেন সভ্যতার সীমারেখা সন্ধানকারী এবং আমাজন অববাহিকার বেটস অনুসন্ধানকারী প্রকৃতিবিজ্ঞানী। বিভিন্ন প্রকার বৈশিষ্ট্যের জন্য কিছু সন্ন্যাসী মেজাজ অপরিহার্য উপাদান। এটি মানুষকে ঈর্ষাপরায়ণতার পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যেতে, জনপ্রিয়তার লোভ সংবরণে এবং সাধারণ উদারতা ও নির্ভুল সিন্ধান্তে উপনীত হতে সামর্থ্য যোগায়।

অকৃত্রিমভাবে উদাসীন নয় তৃতীয় দলের কেউ কেউ। স্বাভাবিকভাবে তারা তা অর্জন করতে অসমর্থ। হতে পারে এসব মানুষ দরবেশ বা বিরুদ্ধ মতাবলম্বী। শিল্প অথবা সাহিত্যের ক্ষেত্রে সন্ন্যাসী জীবনধারা নব্য পন্থার প্রবর্তন করতে পারে। এরা তাদের শিষ্যত্ব অর্জন করে যারা অধীনতাপ্রীতির সঙ্গে বিদ্রোহাত্মক আবেগের সমন্বয় সাধন করে। গোঁড়ামির বিরোধিতা করেন শেষোক্ত ব্যক্তিরা। কিন্তু কোনোরকম বাছবিচার না করেই প্রথমোক্ত ব্যক্তিরা নতুন মতবাদ গ্রহণ করে। এর উদাহরণ টলস্টয় ও তার অনুসারীরা। অকৃত্রিম নির্জনতা হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। সবিষাদ জেস এর পূর্ণাঙ্গ উদাহরণ। তিনি নির্বাসন কাটিয়েছেন ভালো সর্দারদের সঙ্গে এবং কোর্টে ফেরার পরিবর্তে খারাপ সর্দারদের সঙ্গে জঙ্গলে কাটিয়েছেন। সভ্যতার ছোঁয়া পেতেই আমেরিকার প্রথম দিকের অনেক কর্মী কষ্ট ও বঞ্চনা ভোগ করে খামার বিক্রি করে আরও পশ্চিমে সরে পড়েন। এ ধরনের মানুষেরা পৃথিবীতে খুব কমই সুযোগ পেয়ে থাকে। এরা ধাবিত হয় কিছুটা অপরাধের দিকে, কিছুটা বিষণ্ণতার দিকে এবং কিছুটা অসামাজিক দর্শনের দিকে। তাদের মনোভাব গড়ে ওঠে সঙ্গীদের সঙ্গে বেশি মেলামেশার ফলে মনুষ্যদ্বেষিতায়। আর তাই যখন নির্জনতা লাভ করা যায় না তখন তা হিংস্রতায় মোড় নেয়।

কাপুরুষদের সংগঠন গড়ে ওঠে শুধু নেতার প্রতি বশ্যতা স্বীকারের মধ্য দিয়েই নয়, বরং তা গড়ে ওঠে সমমনা মানুষের ভেতর নিশ্চিত ঐক্যবোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে। আনন্দানুভূতি বিদ্যমান সহানুভূতি অর্জনের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত উদ্যমপূর্ণ জনসভায় উৎসাহ ও নিরাপত্তার সমন্বয়ে। অহংবোধ বৃদ্ধি পেলে বিজয়ানুভূতি ছাড়া অন্য সবই সাধারণ আবেগের তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে দূরীভূত হয়। আনন্দদায়ক কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন সমবেত উত্তেজনা। এর ফলে সহজেই স্বাভাবিকতা, মানবতা ও আত্মরক্ষা বিঘ্নিত হয়। অবশ্য সমভাবে সম্ভব সহিংসতা ও শহীদের বীরত্বপূর্ণ মৃত্যু। এর ছোঁয়া একবার পেলে অন্যান্য উন্মত্ততার মতো তা প্রতিহত করা কঠিন। কিন্তু এটি পরিশেষে অনীহা ও ক্লান্তি এনে দেয় এবং উত্তরোত্তর আগ্রহের জন্ম দেয় প্রথমোক্ত আগ্রহ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে।

কোনো নেতা অপরিহার্য নয় এই তাড়না সৃষ্টির জন্যে। কারণ তা সৃষ্টি করা যেতে পারে সঙ্গীত এবং উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার মাধ্যমে। সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হচ্ছে বক্তার কথা। সুতরাং নেতৃত্বের জন্য সংঘবদ্ধ আনন্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নেতার অংশগ্রহণের প্রয়োজন নেই নিজের জাগানো অনুভূতিতে। তিনি শেক্সপিয়রের এন্তনিয়র মতোই বলতে পারেন :

Now let it work : mischief there art afoot,
Take thou what course thou will!

নেতার প্রভাব না থাকলে অনুসারীদের উপর তার সফলতার সম্ভাবনা কম। এ কারণে তিনি গুরুত্ব দেবেন এমন পরিস্থিতির যা তার সাফল্য সহজ করে দেয়। যে পরিস্থিতির মোকাবেলায় নিজেকে সাহসী মনে করা মারাত্মক বিপদ তা-ই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম, কিন্তু ভীতি সৃষ্টির মতো এত ভয়ানক নয়। দুর্দমনীয় হচ্ছে এমন পরিস্থিতি, কিন্তু অজেয় নয়। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধংদেহী মনোভাব জাগাতে একজন দক্ষ বক্তা চান শ্রোতাদের ভেতর দুই স্তরের বিশ্বাস সৃষ্টি করতে। এর একটি হলো অগভীর স্তর, এতে বড় করে দেখানো হয় শত্রু পক্ষের ক্ষমতা এবং ধরনের অনুভূতি সৃষ্টি করা হয় যে এর মোকাবেলায় অধিক সাহস সঞ্চয় করার প্রয়োজন রয়েছে। অন্যটি হলো গভীর স্তর, যেখানে বিরাজ করে বিজয়ের দৃঢ় বিশ্বাস। অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে শক্তির উপর-এ ধরনের স্লোগানে উভয়টি বাস্তবায়িত হয়ে থাকে।

বক্তার প্রত্যাশা হলো চিন্তাশীল জনগণ অপেক্ষা আবেগপ্রবণ আন্দোলনকারীর জনতা। ভয় ও ঘৃণায় পূর্ণ থাকবে তাদের মন। তাদের ধৈর্য থাকবে না ধীর ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। যদি বক্তা সম্পূর্ণ নিন্দুক না হন তাহলে তিনি কিছু বিশ্বাস অর্জন করবেন, যা প্রমাণ করবে তার কার্যকলাপের বৈধতা। তিনি যুক্তির চেয়ে অনুভূতিকেই ভালো পথপ্রদর্শক ভাববেন। মতামত গঠনে রক্ত মস্তিষ্ক অপেক্ষা অধিকতর কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ব্যক্তিগত নয়, সমষ্টিগত উপাদানই হলো জীবনের সবচেয়ে ভালো উপাদান। তার হাতে শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকলে তিনি শিক্ষাকে অনুশীলন ও যৌথ আন্দোলনের পর্যায়বৃত্ত গতির ভেতর সীমাবদ্ধ রাখবেন এবং একই সঙ্গে তিনি জ্ঞান ও বিচার ক্ষমতা ত্যাগ করে যাবেন অতিমানবিক বিজ্ঞানের নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের কাছে।

ক্ষমতালোভী ব্যক্তিরা সবাই বক্তা নন। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের তারা। ক্ষমতা প্রীতির দাবি মিটানো হয়েছে কার্য সম্পাদনের ব্যবস্থাপনার উপর নিয়ন্ত্রণ দ্বারাই। উদাহরণস্বরূপ বিবরণ দেয়া যায় আবিসিনিয়ার আকাশযুদ্ধে মুসোলিনির কর্তৃত্বের:

জঙ্গলে আগুন দিতে হয়েছিল আমাদের। ছোট ছোট গ্রাম এবং মাঠেও। মাটি ছোঁয়ার আগেই বোমাগুলো বিস্ফোরিত হচ্ছিল সাদা গ্যাস নির্গত করে এবং এগুলোর লেলিহান শিখা দেখাচ্ছিল। তখন জ্বলতে আরম্ভ করে শুকনো ঘাস। আমি ভাবছিলাম পশুগুলোর কথা : খোদা কিভাবে দৌড়াচ্ছিল ওরা! আমি হাতদিয়ে এগুলো ফেলছিলাম বোমা রাখার তাক শূন্য হওয়ার পর। লম্বা বৃক্ষ বেষ্টিত জারিরাতে আঘাত করা সহজ ছিল না, এটাই ছিল সবচেয়ে মজাদার ব্যাপার। আমাকে খুব সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়েছিল খড়ের চালে। আমি সফল হয়েছিলাম তৃতীয়বারের চেষ্টায়। হতভাগ্যরা ভেতরেই ছিল। ওরা যখন দেখল তাদের ঘরের ছাদ জ্বলে যাচ্ছে তখন তারা লাফিয়ে বের হয়ে দৌড়াতে লাগল পাগলের মতো।

প্রায় পাঁচ হাজার আবিসিনীয় বৃত্তাকার আগুনে আটকা পড়ে অনভিপ্রেত পরিণতির শিকার হলো। এটা নরকসদৃশ।

বক্তা যখন সজ্ঞাত মনস্তত্ত্বের প্রয়োজন বোধ করেন তার সফলতার জন্যে, ব্রুনো মুসোলিনির মতো বিমানচালক আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করা বেদনাদায়ক এমন মনস্তত্ত্বেই আনন্দ পান। বক্তা হলেন প্রাচীন ধরনের; সংগঠনের ব্যবস্থার উপর যার ক্ষমতা নির্ভরশীল তিনি আধুনিক। এ উদাহরণ আংশিকভাবে হলেও দেয়া যেতে পারে যে, যুদ্ধ শেষে প্রথম কার্তেজ বিদ্রোহপ্রবণ ভাড়াটে সৈন্যদের হত্যা করার জন্য কিভাবে ব্যবহার করেছিলেন হাতি। এক্ষেত্রে মনস্তত্ত্ব ব্রুনো মুসোলিনির মনস্তত্ত্বের মতোই। কিন্তু তুলনামূলকভাবে বলতে গেলে আমাদের যুগেই যান্ত্রিক ক্ষমতা অন্য যুগের চেয়ে অধিক বৈশিষ্ট্য বহন করে।

এ পর্যন্ত কোথাও পূর্ণতা লাভ করেনি যান্ত্রিক ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল অলিগার্কি মনস্তত্ত্ব। যা হোক এর আসন্ন সম্ভাবনা রয়েছে এবং তা গুণগত দিক দিয়ে না হলেও পরিমাণগত দিক দিয়ে একেবারে নতুন। কৌশলগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অলিগার্কির পক্ষে সম্ভব প্রজাগণের সমর্থন লাভ না করেই এরোপ্লেন, পাওয়ার স্টেশন, মোটরযান ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। লুপুতা সাম্রাজ্য পরিচালিত হতো এর কেন্দ্র ও বিদ্রোহাত্মক প্রদেশের ভেতর মধ্যস্ততা করার সামর্থ্য দ্বারা। একই জাতীয় কঠিন কিছু করা ঐক্যবদ্ধ বৈজ্ঞানিক কুশলীদের পক্ষে সম্ভব। তারা অনশনে রাখতে পারত অবাধ্য এলাকার জনগণকে এবং বঞ্চিত রাখতে পারত লাইট, তাপ ও বিদ্যুৎ শক্তির মতো আরামপ্রদ উপকরণে ব্যবহারের নির্ভরতায় উৎসাহদানের পর। তারা ভাসিয়ে দিতে পারত বিষাক্ত গ্যাস ও বেকটেরিয়ার বন্যায়। বিরোধিতা হলো চূড়ান্ত নিরাশাব্যঞ্জক। যন্ত্রের গঠন কৌশলের উপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিয়ন্ত্রক ব্যক্তিরা মানুষকে অনুভূতিহীন এবং কিছু নিয়মকানুনের অধীন বলে গণ্য করে। ব্যবহারকারী এসব নিয়ম-কানুন নিজ সুবিধামত কাজে লাগাতে পারেন। অন্য যে কোনো সময়ের সরকার ব্যবস্থাপনার চেয়ে এমন সরকারের নিষ্ঠুরতা বেশি।

আমার উদ্দেশ্য বস্তুর উপর নয়, মানুষের উপর ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করা। কিন্তু মানুষের উপর কৌশলগত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বস্তুর উপর ক্ষমতার ভিত্তিতে। যাদের অভ্যাস আছে শক্তিশালী গঠন কৌশলের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার এবং এই নিয়ন্ত্রণ দ্বারা যারা মানুষের উপর ক্ষমতা অর্জন করেছেন, তারা তাদের প্রজা সম্পর্কে গঠন করতে পারেন একটি কাল্পনিক দৃষ্টিভঙ্গি। ওইসব মানুষ থেকে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির, কারণ তারা যুক্তি-পরামর্শের উপর নির্ভরশীল। আমাদের অনেকেই গোলমাল বাধিয়ে দেখেছেন কেমন হৈচৈ শুরু হয়ে যায় খামখেয়ালি পিপীলিকার বাসায়। নিউইয়র্কের আকাশচুম্বী দালানের উপর থেকে নিচে তাকালে দেখা যায়-মানুষগুলো মানুষ নয় যেন কিম্ভুতকিমাকার। কেউ বজ্র ও অশনিসহ সশস্ত্র হলে জড-এর মতো একে সজোরে জনতার উপর ফেলার প্রবণতা জাগত। এক্ষেত্রে তাড়নাটি পিপীলিকার বাসায় ঘটিত তাড়নার মতো। বিমান থেকে আবিসিনীয়দের দেখে মুসোলিনির যে অনুভূতি জেগেছিল স্পষ্টতই এটা তার অনুরূপ। কল্পনা করা যাক একটি বৈজ্ঞানিক সরকার যে হত্যার ভয়ে থাকে এরোপ্লেনে এবং মাঝে মধ্যে নামে উঁচু টাওয়ারের চূড়ায় বা সমুদ্রে ভাসমান বেপটের উপর। এ ধরনের সরকারের পক্ষে কি সম্ভব জনকল্যাণমূলক যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করা? অপরপক্ষে এটি বাস্তব সত্য নয় কি যে তা তাদেরকে মেশিনের মতোই মনে করবে অনুভূতিহীন? কিন্তু যখন কোনো ঘটনা দ্বারা বুঝতে পারে যে এরা মেশিন নয় তখন উদয় হয় তার চৈতন্য এবং ধ্বংস করে দেয় এর সব রকম বাধা।

আমি এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে পারতাম যে পাঠকের কাছে মনে হবে এ সব কিছুই অপ্রয়োজনীয় নেশা। যান্ত্রিক ক্ষমতা নতুন মানসিকতার জন্ম দেয় এ আমার বিশ্বাস। যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সরকার নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজে বের করা। গণতন্ত্র কঠিন হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও কৌশলগত উন্নতির দরুন এর গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। বিশাল যান্ত্রিক ক্ষমতা রয়েছে আজ্ঞাধীন যে মানুষটার, অনিয়ন্ত্রিত হলেও নিজেকে তিনি মনে করে বসতে পারেন ঈশ্বর–তবে তা খ্রিস্টানদের ঈশ্বর নন, পৌত্তলিকদের অধিদেবতা।

লিওপার্ডি ভিসেরিয়াস স্লোপে ভলকেননা ক্রিয়ার ফলাফল বর্ণনা করেন এভাবে:

These lands that now are strewn
With sterilising cinders and embossed
With lava frozen to stone
That echones to the lonely pilgrims foot
Where nestling in the sun the snake lies coiled.

মানুষ এখন এই ফলাফল অর্জন করতে পারবে। এগুলো অর্জিত হয়েছে গার্মিকোতে; অদূর ভবিষ্যতে এগুলো লন্ডনে অর্জিত হবে। কি ফায়দা লাভ করা যাবে এমন ধ্বংসের মাধ্যমে অলিগার্ক থেকে গজিয়ে ওঠা ডমিনিয়োন থেকে? লন্ডন ও প্যারিস নতুন দেবতাদের বত্র ও অশনি দ্বারা ধ্বংস না হয়ে যদি বার্লিন ও রোম ধ্বংস হতো তবে ধ্বংসকারীদের ভেতর একজনেরও পরও কি অবশিষ্ট থাকতে কোনো মানবতা?

প্রারম্ভিক মানবিক অনুভূতি ছিল যেসব মানুষের তারা কি পাগল হয়ে যেত না অতিরিক্ত মায়ায়? এমনকি খারাপ হয়ে যেত না কি তাদের চেয়েও যাদের করুণা, সহানুভূতি ঢাকা দেয়ার হয়নি প্রয়োজন।

পুরাকালে মানুষ মোহিনীশক্তি লাভ করার জন্য শয়তানের কাছে বিলীন করে দিত তার নিজের সত্তা। আজকাল মানুষ নিজেই বিজ্ঞান থেকে এ শক্তি লাভ করে হয়ে যায় শয়তান। কোনো আশা নেই শক্তির লালন ও পোষণ করে এক মানবতার সেবায় ব্যবহার করতে না পারলে। এ গোষ্ঠীর বা ওগোষ্ঠীর নয় এই উন্মাদ অত্যাচারী, বরং তা সাদা, হলুদ এবং কালো, ফ্যাসিস্ট, কমিউনিস্ট এবং গণতন্ত্রী নির্বিশেষে সব মানুষের জন্যে। কারণ, হয় সবাই বেঁচে থাকবে অথবা সবাই মারা যাবে–বিজ্ঞান এটি অনিবার্য করে দিয়েছে।

০৩. ক্ষমতার রকমভেদ

ক্ষমতার সংজ্ঞা দেয়া যেতে পারে অভিপ্রেত ফলাফল সৃষ্টি সাপেক্ষে। সুতরাং ধারণাটি পরিমাণগত; একই রকম আকাক্ষা পোষণ করেন এ ধরনের দুই ব্যক্তির ভেতর তিনিই অধিকতর ক্ষমতার অধিকারী যিনি অধিকতর আকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম। কিন্তু তাদের ক্ষমতা তুলনা করার কোনো উপায় থাকে না যখন ওই দুই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন আকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম হন। মনে করা যাক ভালো ছবি আঁকা ও ধনী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন দুজন শিল্পী। যদি তাদের একজন ভালো ছবি অংকনে সমর্থ হন এবং অপরজন ধনী হতে সক্ষম হন তবে কার ক্ষমতা বেশি নিরূপণ করা অসম্ভব। আমরা শুধু বলতে পারি A-এর অভিপ্রেত কাজের ফলাফল B-এর চেয়ে বেশি হলে A-এর ক্ষমতা বেশি B-এর চেয়ে।

ক্ষমতার শ্রেণিবিভাগ করা যায় বিভিন্নভাবে : মানুষের উপর ক্ষমতা এবং জড়বস্তুর বা প্রাণীর উপর ক্ষমতা। আমি প্রধানত আলোচনা করব মানুষের উপর ক্ষমতা নিয়ে, কিন্তু আধুনিক বিশ্বে পরিবর্তনের প্রধান কারণ হচ্ছে জড়বস্তুর উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ–এ কথা মনে রাখা দরকার। বিজ্ঞানের কাছে এ সত্য আমরা ঋণী।

মানুষের উপর ক্ষমতার শ্রেণিবিভাগ করা যেতে পারে জনসাধারণকে প্রভাবিত করার রীতি অথবা সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নমুনা সাপেক্ষে।

প্রভাবিত হতে পারে ব্যক্তি বিশেষ : A. সরাসরি ক্ষমতা আরোপ করে শরীরের উপর। যেমন, কাউকে কারারুদ্ধ করে বা হত্যা করে। B. উদ্দীপকস্বরূপ পুরস্কার অথবা শাস্তির দ্বারা। যেমন, কাউকে উৎসাহ প্রদান করে চাকরিতে নিযুক্তির মাধ্যমে। C. প্রভাব ফেলে মতামতের উপর। যেমন, এই সর্বশেষ শিরোনামে আমি অন্যের ভেতর অভিপ্রেত অভ্যাস সৃষ্টির সুযোগ অন্তর্ভুক্ত করব এক ব্যাপক অর্থে প্রচারণা দ্বারা। যেমন, অভিপ্রেত অভ্যাস সৃষ্টি করা হয় সামরিক অনুশীলনের মাধ্যমে। পার্থক্য শুধু এই যে, এ ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া চলতে পারে কোনোরকম মধ্যবর্তী মতামত ছাড়াই।

আমাদের আচরণে অত্যন্ত নগ্নভাবে এ ধরনের ক্ষমতা প্রকাশ পাচ্ছে সরাসরি পশুর প্রতি। এখানে অনুভূত হচ্ছে না ছলনা বা গোপনীয়তার প্রয়োজন। যখন শূকরের শরীরে রশি বেঁধে জাহাজে ওঠানো হয় এবং যখন সে আর্তনাদ করতে থাকে তখন সে সততই শারীরিক ক্ষমতার অধীন। আমাদের ইচ্ছানুসারে গাধা যখন গাজরকে অনুসরণ করে তখন এই যুক্তিদিয়েই তাকে আমরা কাজে উদ্বুদ্ধ করি যে, এমন করাই তার স্বার্থের অনুকূল। ক্রীড়া প্রদর্শনকারী পশুর আচরণ হচ্ছে এ দুয়ের মধ্যবর্তী, যার ভেতর অভ্যাস সৃষ্টি করা হয়েছে পুরস্কার ও শাস্তির মাধ্যমে। ভেড়ার জাহাজ আরোহণ আবার ভিন্নভাবে উদ্বুদ্ধ; এক্ষেত্রে জাহাজের খোলা জায়গায় নেতাকে টেনে বার করা হয়, তখন বাকিগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুসরণ করে তাকে।

উদাহরণসহ এরকম ক্ষমতাই মানব সমাজে ব্যাখ্যা করা যায়। মিলিটারি ও পুলিশি ক্ষমতার ব্যাখ্যাস্বরূপ, শূকরের দৃষ্টান্তটির বর্ণনা।

প্রচারণা ক্ষমতার স্বরূপ বর্ণনা করে গাধা ও গাজরের দৃষ্টান্ত।

শিক্ষার ক্ষমতা প্রদর্শিত হয় ক্রীড়া প্রদর্শনকারী পশুর উদাহরণে।

ভেড়াগুলো কর্তৃক তাদের অনিচ্ছুক নেতার অনুসরণ–দলীয় রাজনীতির দৃষ্টান্ত; যখন দলীয় কোন্দলের শিকার অথবা দলীয় নেতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ সাধারণ সম্মানিত নেতা।

আমরা এখন এই উপমাগুলো প্রয়োগ করি হিটলারের অভ্যুদয়ের ক্ষেত্রে। গাজর চিল নাজি কর্মসূচি (সুদ উচ্চেদ সংবলিত), গাধা ছিল নিম্নবিত্ত শ্রেণির লোক, ভেড়া ও তাদের দলপতি ছিল সামাজিক গণতন্ত্র এবং হিন্দেনবার্গ। শূকরগুলো ছিল (শুধু তাদের ভাগ্য বিবেচিত হলো) বন্দিশিবিরে আটকেপড়া হতভাগ্যরা, ক্রীড়া প্রদর্শনকারী পশুগুলো হলো লাখ লাখ জনতা, যার বাধ্য নাজিকে সালাম দিতে।

বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন ক্ষমতা আরোপ করে থাকে। সংগঠনগুলোকে চিহ্নিত করা যায় এই আরোপিত ক্ষমতার রূপ অনুয়ায়ী। দৈহিক দমনমূলক ক্ষমতা অনুশীলন করে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। পুরস্কার অথবা শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে অর্থনৈতিক সংগঠনগুলোতে। এর ফলে কাজের প্রতি উৎসাহ বা ভয় সৃষ্টি হয়। মতামত প্রভাবিত করার লক্ষ্য স্থির করে রাজনৈতিক দল। কিন্তু খুব স্পষ্ট নয় এই পার্থক্যগুলো, কারণ বৈশিষ্ট্যসূচক ক্ষমতার বাইরে প্রতিটি সংগঠনে ব্যবহার করা থাকে ভিন্ন ধরনের ক্ষমতাও।

এসব জটিলতার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আইনের ক্ষমতায়। আইনের ক্ষমতা রাষ্ট্রীয় দমননীতি কার্যকর করে এর চূড়ান্ত রূপ। সভ্য সমাজে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হচ্ছে সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে দৈহিক দমন এবং কতগুলো নীতির সমাহার হচ্ছে আইন, যা অনুসরণ করে রাষ্ট্র এই বিশেষ অধিকার প্রযোগ করে নাগরিকদের সঙ্গে আচরণের মাধ্যমে। আইনে উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য রয়েছে শাস্তির বিধান। শুধু অনভিপ্রেত কার্যকলাপ বাস্তবে অসম্ভব করে তোলা এই শাস্তি বিধানের উদ্দেশ্য নয়, বরং তা অনাকর্ষণীয় করে তোলা। আইন প্রায় নিষ্ক্রিয়, যদি জনসমর্থন না থাকে। আমেরিকাতে নিষিদ্ধকালীন সময়ে অথবা আশির দশকে আয়ারল্যান্ডে তা দেখা যায় যখন অধিকাংশ জনগণের সহানুভূতি অর্জন করে Moonlighter রা। সুতরাং কার্যকরি শক্তি হিসেবে পুলিশি ক্ষমতার চেয়ে জনগণের মতামত ও আবেগের উপর আইন অধিকতর নির্ভরশীল। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের অন্যতম হলো আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।

আমাদের অতিপ্রয়োজনীয় ঐতিহ্যগত ও নবঅর্জিত ক্ষমতার মধ্যবর্তী পার্থক্যের কাছাকাছি নিয়ে আসে এই হৃদয়ানুভূতি। অভ্যাসজনিত শক্তি বিদ্যমান ঐতিহ্যগত ক্ষমতার মধ্যে। প্রয়োজন নেই সবসময় এর সত্যতা বিচারের। বারবার প্রমাণেরও প্রয়োজন নেই যে একে উৎখাত করার মতো যথাযথ ক্ষমতার অধিকারী নয় কোনো প্রতিযোগীই। যদি তা জড়িত ধর্মবিশ্বাস ও প্রায় ধর্মবিশ্বাসের সাথে। ফলে খারাপ বলে বিবেচিত হয় প্রতিবন্ধকতা এবং বিপ্লবী ক্ষমতা বা জোরপূর্বক অর্জনের ক্ষমতার চেয়ে জনগণের মতামতের উপর অধিক নির্ভরশীল। এর পরস্পর বিপরীত দুটো পরিণতি বিদ্যমান। ঐতিহ্যগত ক্ষমতা একদিকে নিরাপত্তাবোধের জন্য বিশ্বাসঘাতক দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল নয়, সম্ভবত অত্যধিক রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতা এড়াতে পারে ঐতিহ্যিক ক্ষমতা; অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের আসক্তির অনুকূলে স্মরণাতীত প্রথার যুক্তি রয়েছে সে সমাজে যেখানে প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যমান। আর এ জন্যই তা অধিকতর স্পষ্ট থাকে জনপ্রিয় সমর্থন লাভে আশাবাদী নতুন ধরনের সরকারের অধীন সম্ভাব্য অন্যায়গুলোর চেয়ে। ফ্রান্সের সন্ত্রাসী শাসন বিপ্লবী ধরনের কিন্তু সেটি করভি প্রথাজাতীয় অত্যাচারী শাসনের দৃষ্টান্ত।

আমার মতে যে ক্ষমতা ঐতিহ্য বা অনুমোদন নির্ভর নয় তা-ই নগ্ন ক্ষমতা। ঐতিহ্যগত ক্ষমতা ও নগ্ন ক্ষমতার ভেতর বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে পার্থক্য অনেক। ঐতিহ্যগত ক্ষমতা বিদ্যমান যে সমাজে, সেখানকার শাসন বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে প্রায় সীমাহীন নিরাপত্তা অথবা নিরাপত্তাহীন অনুভূতির উপর।

নগ্ন ক্ষমতা স্বভাবতই সামরিক এবং তা দেখা দিতে পারে অভ্যন্তরীণ নিষ্ঠুরতা অথবা ভিন্ন দেশ বিজয়ের মধ্যে। প্রকৃতপক্ষে নগ্ন ক্ষমতার গুরুত্ব বিদেশ জয়ে অনেক বেশি এবং আমি মনে করি তা অনেক বৈজ্ঞানিক ইতিহাসবিদের স্বীকৃত গুরুত্বের চেয়েও অনেক বেশি। মহান আলেকজান্ডার ও জুলিয়াস সিজার ইতিহাসের গতিধারার আমুল পরিবর্তন করেন যুদ্ধের মাধ্যমে। কিন্তু পূর্বোক্ত ব্যক্তির জন্য গ্রিক ভাষায় লেখা হয়নি গসপেল এবং রোমান সাম্রাজ্যব্যাপী প্রচার করা যায়নি খ্রিস্টবাদ। শেষোক্ত ব্যক্তির জন্য ফরাসিরা ল্যাটিন থেকে উদ্ভূত ভাষায় কথা বলত না এবং ক্যাথলিক চার্চ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছে সামান্যই। তলোয়ারের ক্ষমতার আরেকটি বড় দৃষ্টান্ত রেড ইন্ডিয়ানদের উপর শ্বেতকায় মানুষদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব। সভ্যতার যে প্রসার ঘটে অস্ত্রবলের বিজয়ের মাধ্যমে, তা সম্ভব নয় কোনো একক কর্তৃত্বের পক্ষে। তা সত্ত্বেও অন্যান্য ক্ষমতার উপর সামরিক ক্ষমতা নির্ভরশীল, যেমন-স্বাস্থ্য, কৌশলগত জ্ঞান। সব সময় যে তা-ই ঘটেছে আমি তা বলছি না উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত স্পেনের যুদ্ধে ফলাফলের জন্য অপরিহার্য ছিল মার্লবরাফের প্রতিভা। কিন্তু একে বিবেচনা করতে হয় সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম বলে।

বিশাল সংখ্যালঘিষ্ট জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সর্মথন লাভের ঐতিহ্যগত ক্ষমতা বিলুপ্ত হলে এর পরিবর্তে বিপ্লবী কর্তৃত্ব স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। এমন হয়েছিল আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামে। নগ্ন ক্ষমতার কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে। একইভাবে ক্যাথলিক চার্চের পরিবর্তে নতুন চার্চ প্রতিষ্ঠা করা হয় সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে। বলের চেয়ে সম্মতির উপর অধিক নির্ভরশীল ছিল তাদের সফলতা। নগ্ন ক্ষমতার ব্যাপক ব্যবহার ছাড়া সফল প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লবী কর্তৃত্ব তার ঐতিহ্যগত কর্তৃত্বের তুলনায় বীর্যবান হবে আরও অনেক বেশি এবং লাভ করবে সক্রিয় জনসমর্থন। ১৯১১ সালে যখন ঘোষণা করা হয় চীন প্রজাতন্ত্র তখন বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষিত ব্যক্তিরা রায় দেয় সংসদীয় সংবিধানের পক্ষে। কিন্তু জনগণ ছিল উদাসীন এবং সরকার শিগগিরই পর্যবসিত হয় যুদ্ধবাজ টিউকানস (সামরিক সরকার)-এর অধীন নগ্ন ক্ষমতায়। পরবর্তী সময়ে কমিনটার্ন কর্তৃক অর্জিত এ ধরনের একতা নির্ভরশীল ছিল জাতীয়তাবোধের উপর, সংসদীয় ব্যবস্থার উপর নয়। একই ধরনের বিষয় প্রায়ই ল্যাটিন আমেরিকাতে ঘটেছে। এসব ক্ষেত্রে জনপ্রিয় সমর্থন পেলে সংসদীয় কর্তৃত্ব যথেষ্ট বিপ্লবী হয়ে যেত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে খাঁটি সামরিক ক্ষমতা ছিল বিজয়ী এবং তা ছিল নগ্ন।

ঐতিহ্যগত, বিপ্লবী এবং নগ্ন ক্ষমতার ভেতর পার্থক্য মনস্তাত্ত্বিক শুধু প্রাচীনত্ব থাকলেই কোনো ক্ষমতা ঐতিহ্যগত হবে আমি এমন মনে করি না; এর প্রতি জনগণের শ্রদ্ধাবোধ অবশ্যই থাকতে হবে। আংশিকভাবে প্রথার জন্য এই শ্রদ্ধাবোদ হয়ে থাকে। ঐতিহ্যগত ক্ষমতা নগ্ন ক্ষমতায় রূপান্ততির হয় এই শ্রদ্ধাবোধ হ্রাস পেলে। ১৯১৭ সালের বিজয় মুহূর্ত পর্যন্ত রাশিয়াতে এই রূপান্তর পদ্ধতি দেখা দেয় ক্রমবর্ধমান বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে।

আমি বিপ্লবী ক্ষমতা বলি নতুন ধর্মমত, কর্মসূচি, ভাবাবেগ এবং জাতীয় স্বাধীনতার আশাবাদকে কেন্দ্র করে একতাবদ্ধ বিশাল জনগোষ্ঠীর উপর নির্ভরশীল ক্ষমতাকে। আমি নগ্ন ক্ষমতা তাকে বলি যে ক্ষমতা ব্যক্তি বিশেষের ক্ষমতালিপ্সা থেকে উদ্ভুত সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া শুধু ভয়ের মাধ্যমে প্রজাসাধারণের বশ্যতা অর্জন করে। নগ্ন ক্ষমতা মাত্রাগত ব্যাপার। গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাপেক্ষে সরকারের ক্ষমতা নগ্ন নয়। কিন্তু তা নগ্ন নৈরাজ্যবাদীদের সাপেক্ষে। একইভাবে যেখানে চার্চের ক্ষমতা বিরুদ্ধবাদীদের সাপেক্ষে নগ্ন সেখানে নিষ্ঠুরতা বিদ্যমান-গোঁড়া পাপীদের সাপেক্ষে নয়।

আমাদের আলোচ্য বিষয়ের অন্য দিক হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও ব্যক্তিবিশেষের ক্ষমতার ভেতর বিভক্তি। কোনো প্রতিষ্ঠান যে পন্থায় ক্ষমতা দখল করে তা কিন্তু এক, অন্যদিকে কোনো ব্যক্তি যে পন্থায় সংগঠনের ভেতর ক্ষমতা দখল করে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অবশ্য এ দুটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। প্রধানমন্ত্রী হতে হলে আপনাকে অবশ্যই দলের ভেতর ক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং দেশের ভেতর আপনার দল ক্ষমতা অর্জন করবে। কিন্তু কোনো জাতীয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের জন্য উত্তরাধিকার নীতি প্রচলিত থাকলে আপনাকে রাজার উত্তরাধিকারী হতে হবে। আপনি অন্য দেশ জয় করতে সমর্থন হবেন না এই উত্তরাধিকার লাভ করে। আপনাকে বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত হতে হবে ভিন্ন দেশ জয়ের জন্য। অবশ্যই প্রায়ই এ গুণগুলোর অভাব দেখা যেত রাজপুত্রদের মধ্যে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ জাতীয় অবস্থা বর্তমান যুগে বিরাজ করছে যেখানে ধনতন্ত্র প্রধানত উত্তরাধিকার সংক্রান্ত ধরা যাক ফ্রান্সে দুইশ ধনী পরিবার রয়েছে যাদের টী ব্যবস্থাপনায় আগের মতো নেই; কারণ তারা ব্যর্থ হয়েছে ব্যাপকভাবে স্বর্গীয় অধিকারের মতবাদ গ্রহণ করতে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ ছাড়া উঠতি ধনী ব্যক্তি তার ভাইকে দরিদ্রে পরিণত করলে কেউ তা অধর্ম মনে করে না।

নানা ধরনের সংগঠন নানা রকম ব্যক্তিকে শীর্ষে উঠিয়ে দেয়। অনুরূপভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির উন্নতির সহায়ক সমাজের বিভিন্ন রকম অবস্থাও। ইতিহাসে এক একটি যুগের সূচনা করে বিখ্যাত ব্যক্তির কার্যকলাপ এবং এর আপাত বৈশিষ্ট্য উদ্ভূত হয় এসব ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য থেকেই। পরিবর্তিত হয় খ্যাতিলাভের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাগুণ। অনুরুপভাবে পরিবর্তন ঘটে খ্যাতিমান ব্যক্তিদেরও। অনুমান করা যায়, লেলিনের মতো ব্যক্তিত্ব ছিল দ্বাদশ শতাব্দীতে এবং বর্তমান সমাজে রয়েছে রিচার্ড কয়ার ডি লায়নের মতো ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তারা অজ্ঞাত ইতিহাসে। এক মুহূর্তের জন্য আসুন আমরা ভাবি কোন ধরনের মানুষ কোন ধরনের ক্ষমতার ফসল।

ভদ্রলোক সম্বন্ধে আমাদের ধারণার জন্ম দিয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ক্ষমতা। এটি আমাদের ধারণার কিছু অধঃপতিত রূপ। এর রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস-গোত্রপতিদের ঐন্দ্রজালিক বৈশিষ্ট্য থেকে শুরু করে রাজার দেবত্ব, পীরের পীরত্ব, বিজয় ও আভিজাত্য পর্যন্ত। উত্তরাধিকার আইন যে দেশে ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বলবৎ রয়েছে সেখানে প্রশংসতি বৈশিষ্ট্যগুলোর উৎস অবসর ও প্রশ্নাতীত শ্রেষ্ঠত্ব। নিম্নশ্রেণিভুক্ত সমাজে ক্ষমতা রাজতান্ত্রিক না হয়ে অভিজাততান্ত্রিক হলে সবিনয় আত্মপ্রকাশসহ সমপর্যায়ভুক্ত লোকের সঙ্গে ভদ্রতা অন্তর্ভুক্ত হয় সর্বোৎকৃষ্ট আচরণে। আচরণের ব্যাপক ধারণা থাকা সত্ত্বেও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ক্ষমতার অধীন এলাকার মানুষের গুণাগুণ তার আচরণ দ্বারা বিচার্য। সামাজিক সক্ষমতা অনুশীলনের চেয়ে ভালো কিছু সম্পাদনে অনভ্যস্ত নারী-পুরুষ সমন্বয়ে গঠিত বুর্জোয়া জেন্টিলহোম অনুপ্রবেশ করলে হাস্যাস্পদ হয়ে থাকে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সমাজের উপর নির্ভরশীল ভদ্রলোকের প্রশংসায় বিদ্যমান বিষয়গুলো এবং তা দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায় পিতা থেকে পুত্রের হাতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরিত না হলে।

ভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় প্রকৃত অথবা অনুমতি শিক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জিত হলে। প্রথাগত চীন ও ক্যাথলিক চার্চ হচ্ছে এর রকম ক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটো দৃষ্টান্ত। আধুনিক বিশ্বে অতীতের অধিকাংশ সময়ের চেয়ে তা কমই রয়েছে; চার্চ ছাড়া এ ধরনের ক্ষমতা ইংল্যান্ডে খুব কমই রয়েছে। অধিকাংশ বর্বর সমাজে শিক্ষার মাধ্যমে সঞ্চারিত ক্ষমতার প্রভাব সর্বাধিক। কিন্তু তা নিয়মিতভাবে হ্রাস পায় সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে। আমি শিক্ষা বলতে অন্তর্ভুক্ত করছি মেজিসিয়ান বা মেডিসিনম্যানদের শিক্ষার মতো খ্যাতিমান শিক্ষাকে। লাসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি পেতে হলে বিশ বছরের প্রয়োজন। এই ডিগ্রি প্রয়োজন হয় দালাইলামার পদ ছাড়া অন্যসব পদের জন্যে। ইউরোপে এক হাজার সালের বিরাজমান অবস্থাই যথেষ্ট যখন পোপ সিলভিস্টার ২ ছিলেন একজন খ্যাতিমান মেজিসিয়ান। তিনি বই পড়তেন এবং সমর্থ হতেন মেটাফিজিক্যাল ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে চার্চের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে।

আমরা জানি ধর্মযাজকের আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি হরো বুদ্ধিজীবীরাই; কিন্তু তাদের ক্ষমতা হরণ করে নিয়েছে শিক্ষার বিস্তৃতি। বুদ্ধিজীবীদের ক্ষমতা র্নিভর করে কুসংস্কারের উপর; প্রথাগত যাদুমন্ত্র অথবা পবিত্র গ্রন্থের প্রতি শ্রদ্ধা। এগুলোর কিছুটা টিকে আছে ইংলিশ দেশগুলোতে, যা দেখতে পাওয়া যায় রাজ্যাভিষেক ও সংবিধানের প্রতি ইংরেজদের মনোভাবের ভেতর। এখনও প্রথাগত পান্ডিত্য ক্ষমতা আছে কেন্টারবারির আর্কবিশপ ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের। কিন্তু তা শুধু মিসরীয় যাজক ও চৈনিক কনফিউসীয় পন্ডিতদের ক্ষমতার প্রেতাত্মা।

সম্মান যদি ভদ্রলোকের বৈশিষ্ট্যমূলক গুণাগুণ হয় তবে জ্ঞান হবে শিক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জনকারী ব্যক্তির গুণাগুণ। ব্যক্তি বিশেষের পান্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞানভান্ডার, আবেগ-অনুভূতির উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ও মানবজীবন সম্পর্কে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা প্রয়োজন জ্ঞানের জন্য খ্যাতি অর্জন করতে। মনে হয় এসব গুণাগুণের কিছু কিছু অর্জন করা সম্ভব শুধু বয়সের কারণেই। এজন্যই সম্মানসূচক পরিভাষা হচ্ছে প্রেসভাইটার, সিগনিয়ার, এলডারম্যান ও এলডার। মুরব্বি মহান ব্যক্তি বলে একজন চৈনিক ভিক্ষুক পথিককে সম্বোধন করে। কিন্তু জ্ঞানসমৃদ্ধ যাজক ও সাহিত্যিকদের যৌথ সংস্থা গঠিত হয় জ্ঞানী ব্যক্তিদের ক্ষমতা সংগঠিত হলে। সব জ্ঞান যাদের ভেতর পুঞ্জীভূত আছে বলে মনে হয়। একজন উপাধিপ্রাপ্ত যোদ্ধা থেকে ভিন্ন ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন মহাজ্ঞানী বা পরমজ্ঞানী ব্যক্তি। ভিন্ন ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় তার শাসনের জন্য। এর বিপরীত দৃষ্টান্ত হলো চীন ও জাপান।

যদিও জ্ঞান সভ্যতার ক্ষেত্রে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর ভূমিকা রাখে তারপরও ইতিমধ্যে আমরা এমন অদ্ভুত জ্ঞানের উল্লেখ করেছি যে নতুন জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিদের ক্ষমতা অনুরূপভাবে বৃদ্ধি পায়নি। বিদ্যুৎ ও টেলিফোন কর্মীরা আমাদের সহায়ক অদ্ভুত কর্ম সম্পাদন করে থাকলেও আমরা কিন্তু তাদেরকে মেডিসিনম্যানের মতো মনে করি না। তাদের বিরক্ত করলে তারা বিপর্যয় ঘটিয়ে দিতে পারে, এ কথা আমরা চিন্তা করি না। এর কারণ কঠিন হলেও বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় জ্ঞান দুর্বোধ্য নয়। এ জ্ঞান তাদের জন্য উন্মুক্ত যারা প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারে। সুতরাং আধুনিক বুদ্ধিজীবীরা কোনোরূপ ভীতির সঞ্চার করেন না, শুধু চাকরিজীবী হিসেবেই থাকেন। তবে ব্যতিক্রম দেখা যায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে। ক্যান্টারবারির আর্কবিশপ ব্যর্থ হন তার পূর্বসূরিদের ক্ষমতা অর্জনে সহায়ক মহিনীমায়া অর্জনে।

জ্ঞানী ব্যক্তিদের সম্মান প্রদর্শন করা হয় স্বাভাবিক জ্ঞানের জন্য নয় বরং অনুমিত ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতার জন্যে। বিজ্ঞান বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিনষ্ট করে দিয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিতি ঘটিয়ে ঐন্দ্রজালিক বিশ্বাসের মূলে আঘাত হেনে। বিজ্ঞানীরা আমাদের এ যুগের সঙ্গে আগের যুগের পার্থক্য সৃষ্টিকারী বৈশিষ্ট্যগুলোর জনক এবং তারা অপরিমেয় প্রভাব রাখেন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনীর মাধ্যমে ঘটনাপ্রবাহের উপর। তা সত্ত্বেও ভারতীয় উলঙ্গ ফকির ও ম্যালেনেশিয়ার মেডিসিনম্যানের মতো তারা জ্ঞানের জন্য এত খ্যাতি অর্জন করতে পারেন না। নিজেদের কার্যকলাপের দরুন বুদ্ধিজীবীরা আধুনিক বিশ্বের প্রতি বিরাগভাজন হন তাদের মর্যাদা ফসকে যেতে দেখে। কমিউনিজমে বিশ্বাসী হন ন্যূনতম বিরাগভাজন ব্যক্তি; এই অনুভূতি যাদের ভেতর অনেক গভীরে নির্জন আবাসে তারা একান্তে চুপ করে থাকেন।

নতুন এক ধরনের ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্বের জন্ম দিয়েছে বড় বড় অর্থনৈতিক সংগঠনের পরিবৃদ্ধি। তাকে আমেরিকায় বলা হয় নির্বাহী। তিনি অন্য মানুষের প্রভাবিত করেন ত্বরিত উপলব্ধি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম লৌহরূপ ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে। তার থাকতে হবে সুদৃঢ় চোয়াল, শক্তভাবে বদ্ধ ঠোঁট এবং সংক্ষিপ্ত ও ধারালো কথা বলার অভ্যাস। তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগাতে হবে সমকক্ষ ব্যক্তিদের মনে এবং বিশ্বাসম্প্রবণ করে তুলতে হবে অধীনস্তদের। তাকে অর্জন করতে হবে একজন মহান জেনারেল বা একজন কূটনীতিকের গুণাবলি। তিনি হবেন দ্বন্দ্বে নিষ্ঠুর কিন্তু আলোচনার টেবিলে তিনি হবেন দক্ষ সম্মতি প্রদানকারী। মানুষ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্জন করতে পারে এসব গুণাবলি দ্বারা।

গণতন্ত্রে এক ধরনের মানুষের হস্তগত রাজনৈতিক ক্ষমতা, যারা এ পর্যন্ত আলোচিত তিন ধরনের মানুষ থেকেও ভিন্ন প্রকৃতির। একজন রাজনীতিককে সফলকাম হতে হলে অবশ্যই তার সংগঠনের আস্থা অর্জন করতে হবে এবং সফল হতে হবে অধিকাংশ ভোটারের ভেতর উৎসাহ সৃষ্টিতে। ক্ষমতা অর্জনের জন্য এই দুই স্তরের প্রয়োজনীয় গুণাবলি এক প্রকার নয়। এর যে কোনো একটির অধিকারী হয় বেশিরভাগ মানুষই। এ রকম বিরল ব্যক্তিত্ব নন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা। যদিও তারা সাধারণ মানুষের ভেতর ভাবাবেগ সৃষ্টি করতে পারেন না, তারপরও তারা দক্ষ পার্টির ব্যবস্থাপকদের অনুগ্রহ অর্জনে। এসব মানুষ সাধারণভাবে পরাজিত হন, কিন্তু তাদের পরাজয়ের পূর্বাভাস বোঝাতে পারেন না দলীয় ব্যবস্থাপকরা। কখনও নির্বাচনে সংগঠন বিজয়লাভ করতে পারে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গুণাগুণ ছাড়াই। এ ধরনের ক্ষেত্রে পার্টি তার উপর প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচনোত্তর সময়ে। যার ফলে প্রকৃত ক্ষমতা অর্জন করতে তিনি কখনও সক্ষম হন না। পক্ষান্তরে নিজের সংগঠন সৃষ্টি করা যে কারও পক্ষে সম্ভব। এর দৃষ্টান্ত নেপোলিয়ন-৩, মুসোলিনি এবং হিটলার। প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ব্যবহার করে রাজনীতিবিদ সফলতা অর্জন করলেও পরিণামে তিনি একে তার ইচ্ছার অধীনস্ত করে তোলেন এর উপর প্রভাব বিস্তার করে।

একজন রাজনীতিককে যেসব গুণাবলি গণতন্ত্রে সফল করে তোলে তা পরিবর্তিত হয় সময়ের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। এগুলো শাস্তিকালীন এবং বিপ্লব বা। যুদ্ধকালীন সময়ে একরকম নয়। একজন মানুষ সফল হতে পারেন শাস্তি কালীন সময়ে কাঠিন্য ও সুবিচার দ্বারা। কিন্তু এর অধিক গুণাবলি প্রয়োজন হয় শান্তি বিঘ্নিত হলে। এমন সময় প্রয়োজন একজন আকর্ষণীয় বক্তা হওয়ার প্রয়োজন নেই প্রচলিত অর্থে অনিবার্য বাগ্মী হওয়ার। বাগ্মী ছিলেন না রবসপিয়ার এবং লেলিন; কিন্তু তারা ছিলেন স্থিরচিত্ত, আবেগপ্রবণ এবং সাহসী। স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে এই আবেগ, কিন্তু অনুভূত হতে হবে এর অস্তিত্ব। একজন রাজনীতিবিদ সক্ষম হবেন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে যুক্তিনির্ভর বা নৈর্ব্যক্তিক সত্য উপলব্ধি করতে। তিনি অবশ্যই জনগণকে বোঝানোর ক্ষমতা রাখবেন যে তাদের আবেগপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সম্ভব এবং তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি তা অর্জন করতে পারেন দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে।

গণতন্ত্রকে মুছে ফেলে দিয়ে যিনি ডিক্টেটর হয়েছেন তিনিই সবচেয়ে সফল রাজনীতিবিদ। অবশ্য বিশেষ ক্ষেত্রে তা সম্ভব; ঊনবিংশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে কেউই তা করতে পারেননি। কিন্তু যখন তা সম্ভব তখন উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে গণতন্ত্রী রাজনীতিবিদদের একমাত্র উচ্চমাত্রায় ওইসব গুণ প্রয়োজন হয়। লেলিন, মুসোলিনি, হিটলার গণতন্ত্রের কাছে ঋণী তাদের উত্থানের জন্য।

একবার যখন ডিক্টেটরি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তা ডিক্টেটরের গুণাবলি ভিন্ন হয়ে থাকে প্রতিষ্ঠাকালে ব্যবহৃত গুণাবলি থেকে। যখন উত্তরাধিকার প্রত্যাখ্যাত হয় তখন গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো নিজে অন্তরালে থেকে অপরের মাধ্যমে ক্ষমতাসাধন, ষড়যন্ত্র এবং কোর্টের পক্ষপাতিত্ব অর্জন করা। এ জন্য প্রতিষ্ঠাকারীর মৃত্যুর পর নিশ্চিতভাবে পরিবর্তিত হয় ডিক্টেটরি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো। যেহেতু প্রতিষ্ঠাকারীর গুণাগুণের চেয়ে উত্তরাধিকারী ডিক্টেটরের গুণগুলো সাধারণভাবে কম আকর্ষণীয় সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই সম্ভাবনা থেকে যায় অস্থিতিশীলতা ও প্রাসাদ বিপ্লবের এবং পরিণামে তা মোড় নেয় অন্য পদ্ধতিতে। যা হোক আশা করা যায়, এই প্রবণতা রোধ করা সম্ভব রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে কোনোরূপ জনপ্রিয় গুণাগুণ প্রর্দশন ছাড়া শুধু আধুনিক প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে তার জনপ্রিয়তা সৃষ্টি করে। কিন্তু এখনও বলা সম্ভব নয় এ ধরনের পদ্ধতি কতটুকু সফল হবে।

আমরা এ পর্যন্ত আমাদের বিবেচনার বাইরে রেখেছি ব্যক্তিবিশেষের এক ধরনের ক্ষমতার আলোচনা। নেপথ্যে একে ক্ষমতা বলা হয়। এর অন্তর্ভুক্ত হলো সভাসদ, ষড়যন্ত্রকারী, গুপ্তচর এবং ঘটনার অন্তরালে থেকে অন্যের দ্বারা নিজ উদ্দেশ্য পূরণে সক্ষম ব্যক্তির ক্ষমতা। প্রতিটি বড় সংগঠন, যেখানে নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিদের যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে সেখানে অপেক্ষাকৃত কম খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ থাকে যারা নিজস্ব পদ্ধতিতে প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে নেতাদের উপর। এই একই পর্যায়ভুক্ত হলো ওয়ারপুলার এবং পার্টি কর্তারা, যদিও ভিন্ন ধরনের কৌশল তাদের। আস্থাভাজন বন্ধুদের তারা বসিয়ে দেন লোকচক্ষুর অন্তরালে কৌশলগত স্থানগুলোতে। সুতরাং সময় মতো তারা সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। স্বৈরাচার উত্তরাধিকারমূলক না হলেও স্বৈরাচারীর মৃত্যুর পর এ ধরনের ব্যক্তিরা তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার আশা পূরণ করতে পারেন। কিন্তু তারা পছন্দ করেন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকাটাই। তাদের মোহ গৌরবের চেয়ে ক্ষমতার প্রতি বেশি। এ ধরনের ব্যক্তিরা প্রায়ই ভীরু হয়ে থাকেন। কখনও তারা যে কোনো কারণে বঞ্চিত হয় প্রাচ্য রাজতন্ত্রের খোঁজা ব্যক্তি অথবা অন্য জায়গায় রাজার মহীয়সীর মতো নামসর্বস্ব নেতৃত্ব থেকে। তাদের প্রভাব সর্বাদিক উত্তরাধিকারমূলক নামমাত্র ক্ষমতার ক্ষেত্রে। কিন্তু ক্ষমতা থাকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতার অস্তিত্ব আধুনিক সরকার ব্যবস্থাপনার যেসব বিভাগে রয়েছে বলে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, ঐগুলোতে অনিবার্য হয়ে পড়ে তাদের প্রভাব। মুদ্রা ও বিদেশি নীতি হচ্ছে এগুলোর ভেতর এ যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বেরন হেলেটাইনের প্রভূত ক্ষমতা চিল কায়সার উইলিয়াম-২ এর শাসনকালে। কিন্তু তিনি কখনও আবির্ভূত হননি জনসমক্ষে আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয় ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী অফিসারদের ক্ষমতা কতটুকু। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় দলিল থেকে তা জানাতে পারবে আমাদের সন্তানরা। অন্যসব ক্ষমতা থেকে এমন নেপথ্য ক্ষমতা অনেক ভিন্ন। এগুলো সাধারণত অনাকাঙ্ক্ষিত গুণাবলি। এ ধরনের নেপথ্যে ক্ষমতা বিদ্যমান যে শাসন পদ্ধতিতে তা কোনোরূপ অবদান রাখতে পারে না সর্বসাধারণের মঙ্গলার্থে।

০৪. যাজকীয় ক্ষমতা

আমি দুই প্রকার প্রথাগত ক্ষমতা নিয়ে এই অধ্যায় ও পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করব। এই দুই প্রকার ক্ষমতা হচ্ছে–যাজকীয় কর্তৃত্ব ও রাজকীয় কর্তৃত্ব। অতীতকালে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল এগুলো। অধুনা উভয়টিই কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। এর কোনোটিই পুনরুজ্জীবিত হবে না ভাবাটা হঠকারী হতে পারে। উভয় প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ আলোচনা সম্ভব করে তোলে এগুলোর স্থায়ী বা অস্থায়ী পতন, যা অর্জিত হওয়ার নয় আরও তেজোবীর্য ক্ষমতার ক্ষেত্রে।

নৃবিজ্ঞানীদের পরিচিত সামজে প্রাথমিক হলেও যাজক এবং রাজা বিদ্যমান। একই ব্যক্তি কখনও উভয় কাজ সম্পাদন করে থাকেন। তা শুধু বর্বর সামজেই নয়, বরং অত্যধিক সভ্য সমাজেও দেখা যায়। রোমে প্রধান যাজক ছিলেন অগাস্টাস এবং প্রদেশগুলোতে দেবতা। ইসলাম ধর্ম ও রাষ্ট্রের অধিকর্তা ছিলেন খলিফা। অনুরূপ বর্তমানকালে সিন্টো ধর্মের সিকাডোর অবস্থান। রাজার ধর্মনিরপেক্ষ কার্যকলাপ হারানোর এক প্রবল প্রবণতা দেখা দিয়েছে ধার্মিকতার জন্য এবং এভাবে তিনি পরিণত হন একজন যাজকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব সত্ত্বেও স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট হয়ে পড়েছে রাজা ও যাজকের পার্থক্য।

চিকিৎসক হচ্ছে যাজকের প্রাচীনতম রূপ, যার ক্ষমতা দুই প্রকার। এই দুই প্রকার ক্ষমতাকে নৃবিজ্ঞানীরা ধর্ম ও ঐন্দ্রজালিক বলে অভিহিত করেছেন। অতিমানবীয় সত্তার সাহায্যের উপর ধর্মীয় ক্ষমতা নির্ভরশীল। অথচ ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা প্রাকৃতিক। যা হোক আমাদের কাছে উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয় এ ধরনের ক্ষমতা। গুরুত্বপূর্ণ যা তা হচ্ছে ধর্ম বা ইন্দ্রজাল দ্বারা অন্য লোকের উপকার বা ক্ষতি করতে সামর্থ্য চিকিৎসক। তাছাড়া সবার জন্য উন্মুক্ত নয় এই ক্ষমতা। এটুকু ভাবা হয় যে ইন্দ্রজাল পেশা বহির্ভুত কিছু মানুষ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে চিকিৎসকের ইন্দ্রজাল কঠিন। কেউ যখন পীড়িত হয় বা দুর্ঘটনায় পতিত হয় তখন বুঝতে হবে যে তা ঘটেছে কোনো শত্রুর অমঙ্গলকারী ম্যাজিকের দ্বারা। কি করে এই সম্মোহন দূর করা যায় চিকিৎসক তা জানেন। এভাবে ডিউক অব ইয়র্ক দ্বীপের একজন চিকিৎসক রোগীর পীড়িত হওয়ার কারণ বের করেন তার সুচতুর অনুমান দ্বারা। তিনি এক প্যাকেট চুন বের করেন এবং আওড়ান জাদুমন্ত্র : এই যাদুমন্ত্র অসাড় এটা মনে করা যাবে না। এ ধরনের মন্ত্রের প্রতি বেশি আকৃষ্ট সভ্য লোকের চেয়ে বর্বরেরা। এ জন্য এ জাতীয় মানুষের দ্বারা তাদের রোগ সৃষ্টি এবং উপশমও হয়।

রিভার্সের মতানুসারে একজন যাদুকর নতুবা ধর্মযাজক ম্যালোনেশিয়ার অধিকাংশ স্থানের রোগ উপশমকারী। চিকিৎসক ও অন্যান্য লোকের ভেতর আপাত স্পষ্ট পার্থক্য নেই এসব অঞ্চলে এবং যে কোনো মানুষ দ্বারা তা সহজতরভাবে উপশম সম্ভব।

যারা সমন্বয় ঘটিয়েছেন চিকিৎসার সাথে ধর্মীয় ও ঐন্দ্রজালিক আচরণের স্বভাবতই তারা দক্ষতা অর্জন করে থাকেন দীক্ষা এবং শিক্ষার মাধ্যমে। এমন জ্ঞান পয়সা দিয়ে কিনে নিতে হয় ম্যালোনেশিয়াতে। সবচেয়ে পরিপূর্ণ শিক্ষা ছাত্রদের কোনো কাজেই আসে না যতক্ষণ পর্যন্ত না চিকিৎসা-ইন্দ্রজাল বা চিকিৎসা-ধর্মীয় কলাকৌশলের কোনো শাখায় তাদের পকেট থেকে পয়সা প্রশিক্ষকদের হাতে পৌঁছায়।

এসব সূচনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, আরও গুরুত্বপূর্ণ ঐন্দ্রজালিক ও ধর্মীয় ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নির্দিষ্ট যাজক সম্প্রদায়ের সমৃদ্ধি, পরিণামে যে সম্প্রদায় গোটা সমাজের উপর এর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে। মিসর ও ব্যাবিলনের রাজার সঙ্গে দ্বন্দ্বে তাদের ক্ষমতা রাজার চেয়ে বেশি–এটা প্রতীয়মান হয়। তারা নাস্তিক ফেরাউন ইকনাটনকে পরাজিত করেন এটা অনুমান করা যায় এবং সাইরাসকে বিশ্বাসঘাতকপূর্বক ব্যাবিলন বিজয়ে সাহায্য করেন। কারণ তাদের দেশীয় রাজা প্রবণতা দেখিয়েছেন যাজকমন্ডলীর বিরুদ্ধাচারণের।

প্রাচীন সমাজে গ্রিস ও রোম পৃথক সত্তার অধিকারী ছিল যাজকীয় ক্ষমতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকার জন্যে। অনুমিত হয়, গ্রিসে পরিচালিত এ রকম ধর্মীয় ক্ষমতা প্রধানত দৈববাণী প্রকাশের স্থান ডেলপিতে পুঞ্জীভূত ছিল, যেখানে পিথনেস ভাববিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন এবং এপেলো কর্তৃক অনুপ্রাণিত হয়ে উত্তর। করেছিলেন। যা হোক মহাজ্ঞানীদের ঘুষ দেয়া হতো হেরোডেটাসের সময়। আলমেনিদে নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ এথেনীয় পরিবার পিসিস্ট্রেসাস কর্তৃক নির্বাসিত হয় বলে হেরোডেটাস ও এরিস্টটল উভয়েই উল্লেখ করেছেন এবং তার ছেলেদের বিরুদ্ধে ডেলপির সমর্থন লাভ করে দুর্নীতির মাধ্যমে। কৌতূহল উদ্দীপক ছিল হেরোডেটাসের বক্তব্য : তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে, ব্যক্তিগত অথবা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে এথেনীয়রা ঘুষ দিয়ে পিথনেসকে এথেন্সবাদদিদের বলার জন্য রাজি করাতে পারতেন যে, তারা অবশ্যই এথেন্সকে মুক্ত করে দেবে। সুতরাং কোনো উত্তর না পেয়ে লেসিডিমনীয়রা অস্টারের পুত্র। এনকিমলিয়াসকে (যিনি এথনীয়দের বিরুদ্ধে সংগঠিত সেনাবাহিনীর প্রধান। ছিলেন) আদেশ করেন পিসিস্ট্রিডীয়দের তাড়িয়ে দেয়ার জেন্য; যদিও তাদের ভেতর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। কারণ তারা বেশি সম্মান প্রদর্শন করত মানবীয় বিষয়ের চেয়ে স্বর্গীয় বিষয়ের প্রতি।

পরাজিত হলেও এনকিমিলিয়াসের পরবর্তী বড় অভিযান সফল হয়েছিল। ক্ষমতা ফিরে পায় আলমেনিদ পরিবার অন্যান্য নির্বাসিতরা এবং পুনরায় স্বাধীনতা লাভ করে এথেন্স।

কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে এই বর্ণনায়। হেরোডেটাস পুরোপুরিভাবে বিশ্বনিন্দাবাদ বিবর্জিত একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি এবং তিনি স্পার্টাবাসীদের সম্পর্কে ভালো মনোভাব পোষণ করতেন দৈববানী মেনে চলার জন্যে। কিন্তু তার কাছে স্পার্টার চেয়েও এথেন্সের গুরুত্ব বেশি। তিনি এথেন্সবাসীদের ব্যাপারে পিসিস্ট্রেসাস পরিবারের বিরোধী। তা সত্ত্বেও তিনি উল্লেখ করেন, এথেন্সবাসীরাই উৎকোচের কর্তৃত্বদানকারী এবং তাদের অধার্মিকতার জন্য বিজয়ী দল বা পিথনেস পরিবারের উপর শাস্তি নেমে আসেনি। হেরোডেটাসের সময়ও আলমেনিদ পরিবার প্রাধান্য বিস্তার করত। প্রকৃতপক্ষে আলমেনিদ পরিবারের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি তার সমসাময়িক পরিবেশক ছিলেন।

এরিস্টটল এসব কার্যাদির কলঙ্কময় বর্ণনা বিবৃত করেছেন এথেন্সের সংবিধান সম্বন্ধে প্রণীত বইয়ে। ৫৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আগুন দিয়ে ধ্বংস করা হয় ডেলপীয় গির্জা এবং আলমেনিদ কর্তৃক গ্রিসের সর্বত্র অর্থসগ্রহ করা হয় তা পুনঃনির্মাণের জন্য। দৃঢ়ভাবে এরিস্টটল বলেন, এই তহবিলের একটি অংশ পিথনেসকে উৎকোচ হিসেবে প্রদান করা হয় এবং পিসিস্ট্রেসাসের পুত্র হেপিয়াসের পতন ঘটানোর জন্য অবশিষ্টাংশ ব্যয় করা হয়। এভাবে তাদের পক্ষে নিয়ে আসা হয় এপোলোকে।

এসব কলঙ্ক সত্ত্বেও রাজনৈতিক গুরুত্বের বিষয় হয়ে রইল ডেলপিতে দৈববাণীর নিয়ন্ত্রণ, আর এটাই মারাত্মক যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়াল। ধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার জন্য এটি ধর্মযুদ্ধ বলে অভিহিত হয়। কিন্তু পরিণামে দৈববাণী রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের জন্য উন্মুক্ত, এ সত্যের খোলাখুলি স্বীকৃতি মুক্তচিন্তা বিকাশে উৎসাহ সৃষ্টি করে। পরিশেষে রোমানদের জন্য অপবিত্রতাজনিত ঘৃণা ব্যতিরেকে গ্রিক গির্জাগুলোর অধিকাংশ সম্পদ ও এর সর্বসময় কর্তৃত্ব লাভ সম্ভব করে তোলে। অধিকাংশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহৃত হয় সাহসী ব্যক্তিদের দ্বারা ধর্মনিরপেক্ষ উদ্দেশ্যে এবং এর ফলে বাজেয়াপ্ত হয় এগুলোর ক্ষমতানির্ভর সম্মান। আরও সুন্দরভাবে এবং অন্যান্য স্থানের চেয়ে তুলনামূলক কম চরমে পৌঁছেই তা ঘটেছিল গ্রিসীয় রোমান দুনিয়ায়। কারণ ধর্ম কখনও কোথায় এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যযুগীয় ইউরোপের মতো এত শক্তিশালী ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে চীন হচ্ছে গ্রিক ও রোমের অনুরূপ একমাত্র দেশ।

যেগুলো স্মরণাতীত কাল থেকেই চলে এসেছে এবং যেগুলোর ঐতিহাসিক উৎস আমাদের জানা নেই এ পর্যন্ত আমরা ঐসব ধর্ম নিয়ে আলোচনা করলাম। কিন্তু এর সবগুলোকে অতিক্রম করেছে প্রবর্তকের কাছ থেকে প্রাপ্ত ধর্ম। একমাত্র সিন্টো ও ব্রাহ্মণ্যবাদ হচ্ছে ব্যতিক্রম। নৃবিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত ধর্মগুলোর মতো সনাতন ধর্মগুলোর উৎস সম্পূর্ণরূপে অস্পষ্ট বর্তমান বর্বর সমাজে। আমরা দেখেছি যে কোনো সুনির্দিষ্ট যাজক সম্প্রদায় ছিল না প্রাচীনতম বর্বর সমাজে; এটা অনুমিত হয় যে প্রাথমিক অবস্থায় অগ্রাধিকার ছিল যাজকয়ি কাজে বৃদ্ধ লোকের, বিশেষত যারা বিচক্ষণ এবং ক্ষতিকর যাদুবিদ্যায় খ্যাতি লাভ করেছিলেন।

অধিকাংশ দেশে সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে যাজকরা অবশিষ্ট জনগণ থেকে ক্রমাগতভাবে পৃথক এবং ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন। কিন্তু রক্ষণশীল ছিলেন প্রাচীন প্রথার ধারক হিসেবে। তারা ক্ষমতা ও সম্পদের অধিকারী হিসেবে ব্যক্তিগত ধর্মের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন অথবা উদাসীন হয়ে পড়ে। বিপ্লবী নবীর অনুসারীদের দ্বারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তাদের সবকিছুই। ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত বুদ্ধ, খ্রিস্ট ও মোহাম্মদ (সাঃ)। তাদের অনুসারীদের ক্ষমতা প্রথমে বিপ্লবী ছিল এবং ক্রমান্বয়ে তা প্রথায় পরিণত হয়। প্রক্রিয়াগতভাবে তারা আত্মীকৃত করে নামমাত্র যেসব প্রথার পরিসমাপ্তি তারা পূর্বাহ্নে ঘটিয়েছেন সেসব প্রথার অধিকাংশই।

যে কোনো উপায়ে যতটুকু সম্ভব প্রথার প্রতি আবেদন রেখেছেন সবচেয়ে স্থায়ী সফল ধর্মীয় ও নিরপেক্ষ প্রবর্তকরা এবং পারতপক্ষে হ্রাস করেছেন তাদের পদ্ধতির অভিনবত্বের মাত্রা। স্বাভাবিক পরিকল্পনা হবে কাল্পনিক অতীত আবিষ্কার করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনরুদ্ধারের দাবি করা। যাজকগণ কিভাবে আইনের বই পান এবং রাজা কিভাবে আদেশ পালনে প্রত্যাবর্তন ঘটান তা 2 kings xxii নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে। নবীদের কর্তৃত্বের প্রতি আবেদন রাখে নতুন টেস্টামেন্ট; এনাবেপ্টিস্টরা নতুন টেস্টামেন্টের প্রতি; ইংরেজ গোঁড়া খ্রিস্টানরা ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়ে বিজয়পূর্ব ইংল্যান্ডের কাল্পনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি। জাপানিরা .৬৪৫ সালে মিকাডোর ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে; ১৮৬৮ সালে তারা ৬৪৫ সারেল সংবিধান পুনরুদ্ধার করে। একটা পুরো বিপ্লবী শ্রেণি মধ্যযুগব্যাপী এবং পরে ১৮ মেয়ার পর্যন্ত পুনরুদ্ধার করে রোমের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো। শার্লিম্যানের সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন নেপোলিয়ান, কিন্তু তা মনে করা হতো অতিশয় নাটুকেপনাপূর্ণ তুচ্ছ বলে। বাগিতার যুগকে তা প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়। এগুলো এলোমেলো কতগুলো উদাহরণমাত্র। এগুলো প্রথাগত ক্ষমতার বেলায় দেখিয়েছেন মহান প্রবর্তকরা।

ক্যাথলিক চার্চ হচ্ছে ইতিহাসে জ্ঞাত যাজকীয় সংগঠনগুলোর বেতর সবচেয়ে শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ। এই অধ্যায়ে আমি আলোচনা করব শুধু প্রথাগত ক্ষমতা নিয়ে। সুতরাং আমি আলোচনা করব বর্তমান বিপ্লবী আদর্শে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত চার্চের ক্ষমতার প্রাচীন যুগ নিয়ে। রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর, চার্চের পক্ষে দুটো প্রথা জনসমক্ষে তুলে ধরার সুযোগ হয় : খ্রিস্ট ধর্মের প্রথার সাথে তা রোমের প্রথারও বাস্তবরূপ দেয়। বর্বরদের ক্ষমতা ছিল, কিন্তু চার্চের ছিল উন্নত সভ্যতা ও শিক্ষা। একটা সুসঙ্গত নৈর্ব্যক্তিক উদ্দেশ্য, ধর্মীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভীতির প্রতি আবেদন সৃষ্টির উপায় এবং সর্বোপরি তা ছিল একমাত্র সংগঠন যা পুরো পশ্চিম ইউরোপব্যাপী বিস্তার লাভ করে। তুলনামূলকভাবে গ্রিক চার্চ স্থিতিশীল সাম্রাজ্য কনস্টান্টিনোপোল ও মস্কোর সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীনভাবে সম্পর্ক রক্ষাকারী রাষ্ট্রের অধীন হয়; কিন্তু সংস্কার সাধনের আগে পর্যন্ত পরিবর্তনশীল ভাগ্যের ভেতর দিয়ে সংগ্রাম চলছিল এবং তা আজ পর্যন্ত জার্মানি, মেক্সিকো ও স্পেনে শেষ হয়নি।

বর্বর আক্রমণের পর প্রথম ছয় শতাব্দী ধরে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি পশ্চিমা চার্চ দাঙ্গাবাজ ও আবেগপ্রবণ জার্মান রাজাদের এবং বেরনদের সঙ্গে। এই জার্মান রাজা ও বেরনরাই শাসন করত ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও উভয় ইতালি এবং খ্রিস্টীয় স্পেন। জাস্টিনীয়দের বিজয় ছিল এর কিছু কারণ। একবার পৌরহিত্যিক বাইজেন্টাইন প্রতিষ্ঠা করে নেয় এই বিজয় এবং পশ্চিমে এর প্রভাব যথেষ্ট কমিয়ে দেয়। তারা নিয়োগ করত বিদেশি ও দূরবর্তী পোপদের চেয়ে যাদের সঙ্গে তারা অধিকতর একাত্ম বলে নিজেদের মনে করত সেই সমস্ত অভিজাত শ্রেণির ভেতর থেকে উচ্চমান পাদ্রিদের। কারণ তারা অপমানজনক মনে করত বিদেশি ও দূরবর্তী পোপদের হস্তক্ষেপ। অধিকাংশ নিম্নমান পাদ্রিরা ছিল অজ্ঞ এবং বিবাহিত। তাই তারা বেশি উদগ্রীব ছিল তাদের অধিকারভুক্ত সম্পত্তিগুলো চার্চের সংগ্রামের চেয়ে তাদের ছেলেমেয়েদের কাছে হস্তান্তরের জন্যে। এত কষ্টকর ছিল যাতায়াত যে দুরবর্তী রাজ্যগুলোতে রোমান কর্তৃত্ব আরোপ করা যেত না। পোপের বিশাল এলাকার উপর প্রথম কার্যকর সরকার ছিল না, বরং তা ছিল শার্লিম্যানের, যা প্রশ্নাতীতভাবে পোপের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন তার সমসাময়িক ব্যক্তিরা।

সভ্যতার দ্রুত উন্নতি হতে লাগল তখন যখন দেখা গেল যে এক হাজার সালের পর বিশ্বের আকাঙ্ক্ষিত পরিসমাপ্তি ঘটেনি। পান্ডিত্যপূর্ণ দর্শনের উন্নতি ত্বরান্বিত হয় স্পেন ও সিসিলির মুরদের সঙ্গে সংস্পর্শে। সমসাময়িক শিক্ষা যা দিতে পারত নরম্যানরা ফ্রান্স ও সিসিলিতে তা ভোগ করল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জলদস্যুদের অত্যাচার ভোগ করে এবং বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে গড়ে উঠল সুশৃঙ্খল ধর্মীয় শক্তি। অধিকন্তুজকীয় কর্তৃত্ব কার্যকরি দেখতে পেল বিজয়। বৈধকরণে। সর্বপ্রথম তাদের দ্বারা যাজকীয় ইংল্যান্ড পুরোপুরিভাবে রোমের অধীনস্ত হলো। ইতিমধ্যে প্রজাদের নিয়ন্ত্রণ রক্ষায় সবচেয়ে বেশি অসুবিধার সম্মুখীন হলেন ফ্রান্সের রাজা ও সম্রাট উভয়ই। ঐ অবস্থায় যাজকীয় ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে শুরু করে গ্রেগরি-৭-এর নির্দয় শক্তি ও রাজনীতি এবং তা স্থায়ী হয় পরবর্তী দুই শতাব্দী ধরে। এই যুগ যাজকীয় ক্ষমতার শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত বিধায় আমি তা নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব।

পোপীয় শাসনের দিনগুলোর সূত্রপাত হয় গ্রেগরি-৭ এর সিংহাসন আরোহণের সঙ্গে এবং তা স্থায়ী হয় এভিগননে ক্লিমেন্ট-৫ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত পোপীয় শাসন ১৩০৬ খ্রিঃ পর্যন্ত। এই যুগে পোপের বিজয় অর্জিত হয় আধ্যাত্মিক অস্ত্রশস্ত্রের দ্বারা। অর্থাৎ অস্ত্রবলে নয় বরং কুসংস্কার দ্বারা। যুগব্যাপী পোপগণ নির্ভরশীল ছিলেন বাহ্যত নগরের বিদ্রোহাত্মক অভিজাত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত রোমের আন্দোলনমুখী জনগণের আগ্রহের উপর। কারণ খ্রিস্টান জগতের বাকি অংশ যা-ই ভাবুক না কেন, রোমানরা তাদের পোপের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল না। মহান হিলডিব্র্যান্ড নির্বাসনে মারা গিয়েছিলেন বটে কিন্তু তিনি অর্জন করেছিলেন ক্ষমতা এবং তা মহান শাসকদের অপদস্ত করতে হস্তান্তর করেছিলেন। সম্রাট হেনরি-৪ এর জন্য এর অব্যবহিত রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো সুবিধাজনক হলেও ক্যানোসা পরবর্তী যুগগুলোর জন্য তা প্রতীক হয়ে রইল। বিসমার্ক কুলটার ক্যাম্পের সময় বলেছিলেন, কেনোসায় আমরা যাব না। কিন্তু অকাল গর্বই করেছিলেন তিনি। হেনরি-৪, যিনি সমাজচ্যুত হয়েছিলেন তিনি তার পরিকল্পনা অগ্রসর করে নেয়ার জন্য পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রয়োজনবোধ করেন। যদিও গ্রেগরি অনুশোচনাকারীকে পাপমুক্ত করে দিতে অগ্রাহ্য করতে পারননি তারপও মর্যাদাহানিকর শর্তারোপ করেন চার্চের সঙ্গে মীমাংসার মূল্য হিসেবে। মানুষ রাজনীতিবিদ হিসেবে পোপের দোষ-ত্রুটি খুঁজতে পারে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষমতা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে শুধু প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধবাদীরাই, এমনকি সম্রাট ফ্রেডারিক-৩ পোপের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চরম পর্যায়েও প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধে প্রদান করতে পারেননি নৈতিক সমর্থন।

যাজকীয় সংস্কার চরম পর্যায়ে পৌঁছে ৭ম গ্রেগরির পোপীয়কালে। সম্রাটের অবস্থান তার আগে পোপের উপরে ছিল এবং সম্রাট পোপ নির্বাচনে সিদ্ধান্তকারী ভূমিকার দাবি করতেন। ৬ষ্ঠ গ্রেগরিকে হেনরি-৪ এর পিতা হেনরি-৩ ঘুষ সম্বন্ধীয় অপরাধের জন্য ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং তার স্থলে পোপের পদে বসান একজন জার্মান ব্যক্তিকে। তিনি ছিলেন ক্লিটমেন্ট-২। তারপরও হেনরি-২ চার্চের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত ছিলেন না। অপরদিকে তিনি ছিলেন তাপস ব্যক্তি। তিনি তার সময়ের হিংসাপরায়ণ যাজক ব্যক্তিদের সঙ্গে এক কাতারে থাকতেন। তার সমর্থিত এবং গ্রেগরি-৭-এর দ্বারা বিজয়মণ্ডিত সংস্কার আন্দোলন অপরিহার্যরূপে সমাজতন্ত্রের দ্বারা কলুষিত হওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। রাজা ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত সামন্ত অভিজাত শ্রেণিভুক্ত ব্যক্তিদের ভেতর থেকে আর্কবিশপ ও বিশপ নিযুক্ত করতেন, যারা তাদের অবস্থানের একটি লৌকিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। মুলত সম্রাটের অধীনে রাজকর্মচারী ছিলেন সাম্রাজ্যস্থিত সবচেয়ে মহান ব্যক্তিরা এবং রাজপদের বলেই তারা জমির উপর তাদের অধিকার বজায় রাখেন; কিন্তু একাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে তারা বংশগতভাবে অভিজাত শ্রেণিভুক্ত হন, যাদের মালিকানা উত্তরাধিকার সূত্রে বংশ পরম্পরায় হস্তান্তরিত হতো। চার্চের অভ্যস্তরে বিশেষত নিম্নমান লৌকিক পাদ্রিদের একটি বিপদ চিল। চার্চের সংস্কারক দল আক্রমণ চালায় চার্চের ভেতরকার ঘুষ ও উপপত্নীগ্রহণ নামীয় সমজাতীয় পাপাচারের উপর। তাদের অভিযানে তারা উৎসাহ, সাহস ও নিষ্ঠা এবং জাগতিক জ্ঞানের পরিচয় দেন। তারা পবিত্রতার দ্বারা জনসাধারণের সমর্থন লাভ করেন এবং বাগ্মিতার দ্বারা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উপর জয়লাভ করেন, যারা মূলত শত্রুভাবাপন্ন ছিল। উদাহরণস্বরূপ ১০৫৮ সালে মিলানে সেন্ট পিটার পাদ্রিদেরকে আহ্বান করেন ডমিয়ান রোমের সংস্কারমূলক রায়ের প্রতি বাধ্য হতে। তিনি প্রথমে এতই উত্তেজিত হন যে তার জীবন বিপদাপন্ন ছিল। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত জয়ী হন। দেখা যায় যে, ব্যক্তিগতভাবে ঘুষের অপরাধে অপরাধী ছিলেন আর্কবিশপ থেকে নিচের দিকে মিলনিজদের প্রত্যেক যাজকই। সবাই তাদের দোষ স্বীকার করল এবং ভবিষ্যতে বাধ্য থাকার জন্য প্রতিজ্ঞা করল। এসব শর্তে তাদেরকে বেদখল করা হলো না। তবে এ কথা পরিষ্কার করা হলো যে ভবিষ্যতে এ রকম অপরাধের শাস্তি কোনোরকম অনুকম্পা ছাড়া প্রযোজ্য হবে না।

হিল্ডার ব্রান্ডের পূর্বের ধারণাগুলোর অন্যতম হলো যাজকীয় কৌমার্য। তা বলবৎ করার জন্য তিনি একটি তালিকা প্রস্তুত করেন যাজক ও তাদের স্ত্রীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের অপরাধী ব্যক্তিদের। অবশ্য এই অভিযান পুরোপুরি সফল হয়নি। স্পেনে আজও তা সফল হয়নি, কিন্তু এর উদ্দেশ্যগুলোর ভেতর একটি অর্জিত হয়। তা ছিল এই যে, যাজকীয় পদে যাজকদের ছেলেমেয়েদের অধিষ্ঠিত করা যাবে না। ফলে বংশগত উত্তরাধিকার প্রথা রহিত হয় স্থানীয় যাজকত্বে।

১০৫৯ সালে রায়ের মাধ্যমে পোপ নির্বাচনে বিধিমালা প্রণয়ন ছিল সংস্কার আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয়। এই রায়ের আগে সম্রাট ও জনগণের কিছু অনির্দিষ্ট অধিকার ছিল। এর ফলে সৃষ্টি হতো অনৈক্য এবং পুনরাবৃত্তি ঘটত বিতর্কিত নির্বাচনের। অবিলম্বে তা সগ্রাম ছাড়া হয়নি বটে, কিন্তু সফল হয় নতুন রায় নির্বাচনের অধিকার বিশপদের হাতে সীমাবদ্ধ রাখতে।

চলমান সংস্কর আন্দোলন একাদশ শতাব্দীর শেষার্ধব্যাপী এবোট, বিশপ ও আর্কবিশপকে সামন্ত অভিজাত শ্রেণি থেকে পৃথক করতে এবং পোপকে তাদের নিযুক্তির ব্যাপারে ক্ষমতা প্রদান করতে সফল হয়। কারণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত না হলে পোপ স্বাভাবিকভাবেই কলঙ্কের সম্মুখীন হতেন ঘুষের ব্যাপারে। এর ফলে জনসাধারণ প্রভাবিত হলো এবং চার্চের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে গেল। যাজক সম্প্রদায় স্পষ্টতই অবশিষ্ট দুনিয়া থেকে পৃথক হয়ে পড়ে কৌমার্য প্রথা আরোপের ফলে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে কঠোর তপস্যার মতো নিঃসন্দেহে তাদের ক্ষমতা তাড়না উদ্দীপিত হয়। নেতৃস্থানীয় যাজকদের ভেতর তা একটি উদ্দেশ্যে নৈতিক আগ্রহের সঞ্চার করে। প্রচলিত দুর্নীতির মাধ্যমে লাভবান ব্যক্তিরা ছাড়া সবাই এ উদ্দেশ্যের প্রতি বিশ্বাসী ছিল এবং এ উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল উন্নতি বিধানের প্রধান উপায় হিসেবে পোপের প্রভূত ক্ষমতা বৃদ্ধিও।

প্রথমদিকে সাধারণত প্রচারণার উপর নির্ভরশীল ক্ষমতার জন্য প্রয়োজন হয় এ ক্ষেত্রের মতো অসাধারণ সাহস ও আত্মোৎসর্গের। কিন্তু শ্রদ্ধা অর্জিত হওয়ার পর এসব গুণাবলি পরিত্যাগ করা যেতে পারে এবং জাগতিক উন্নতির জন্য ব্যবহৃত হতে পারে শ্রদ্ধা। এরপর সময়ের সাথে শ্রদ্ধা হ্রাস পায় এবং এর মাধ্যমে অর্জিত সুবিধাগুলো হারিয়ে যায়। কখনও এই প্রক্রিয়া কয়েক বছর স্থায়ী হয়, আবার কখনও হাজার বছর। কিন্তু মূলগতভাবে তা সবসময় একই ছিল।

শান্তিপ্রিয় ছিলেন না ৭ম গ্রেগরি। অভিশপ্ত সে-ই যে তার তলোয়ার রক্তপাত থেকে ফিরিয়ে রাখে ছিল তার প্রিয় কথা। কিন্তু তিনি এর ব্যাখ্যা দেন দেহধারী মানুষের ভেতর প্রচারণা থেকে বিরত থাকার উপায় নিষিদ্ধকরণ সম্বন্ধে এবং প্রদর্শন করেন প্রচারণা ক্ষমতার উপর তার দৃষ্টিভঙ্গির যৌক্তিকতা।

ইংরেজদের ভেতর পোপের চেয়ার দখল করেন একমাত্র নিকোলাস ব্রেক্সপিয়ারই। তিনি অন্যভাবে দেখান পোপের ধর্মীয় ক্ষমতা। এবিলার্ডের ছাত্র ব্রেসিয়ারের আর্নল্ড এই মতবাদ প্রচার করেন যে, ভূসম্পত্তি আছে যে পাদ্রির, জায়গির ভোগ করেন যে বিশপ এবং সম্পদ আছে যে সন্ন্যাসীদের অধিকারে তারা কেউই রক্ষা পাবে না। এ মতবাদ অবশ্য গোঁড়া ছিল না। সেইন্ট বার্নার্ড তার সম্বন্ধে বলেন, যে ব্যক্তি পানাহার করে না সে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকে শয়তানের মতো শুধু আত্মার রক্তের জন্যে। তা সত্ত্বেও সেইন্ট বার্নার্ড স্বীকার করেন তার দৃষ্টান্তমূলক ধার্মিকতা। ফলে তিনি পক্ষ অবলম্বন করেন পোপ ও মৌলবাদীদের সঙ্গে পরিচালিত সংগ্রামে কার্যকরভাবে রোমানদের। ১১৪৩ সালে রোমানরা এদেরকে নির্বাসনে প্রেরণ করতে সমর্থ হয়। তিনি সমর্থন দান করেন তার মতবাদের নৈতিক প্রেরণা সন্ধানী পুনরুত্থিত রোমান প্রজাতন্ত্রের। কিন্তু একজন মৌলবাদীকে হত্যার ফলে সৃষ্ট সুযোগ গ্রহণ করে চতুর্থ অর্ডিয়ান (ব্রেক্সপিয়র) পবিত্র সপ্তাহে রোমে ধর্মকর্ম নিষিদ্ধ করে দেন। ধর্মীয় সন্ন্যাসীরা পবিত্র শুক্রবার আসন্ন হলে জোরপূর্বক সিনেট দখল করে নেয়। শোচনীয় বশ্যতা মেনে নেয় সিনেট। আর্নল্ডকে গ্রেফতার করা হয় সম্রাট ফ্রেডারিক বারবারসার সাহায্যে। ফাঁসি দিয়ে তার দেহ পুড়িয়ে ছাইভস্ম তাইবার নদীতে ফেলে দেয়া হয়। যাজকদের যে ঐশ্বর্যলাভের অধিকার আছে এভাবে তা প্রমানিত হয়। পুরস্কারস্বরূপ পোপ সম্রাটকে সেইন্ট পিটারের মুকুট পরিয়ে দেন। ক্যাথলিক বিশ্বাসের মতো এত উপকারী না হলেও সম্রাটের সেনাদল প্রয়োজনীয় ছিল। সম্রাটের সেনাদলের কাছে চার্চের ক্ষমতা সম্পদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ সমর্থনের চেয়ে অনেকগুণ বেশি ঋণী।

ব্রেসিয়ারের আর্নল্ডের মতবাদের বিষয়বস্তু চিল পোপ ও সম্রাটের ভেতর পারস্পরিক সমন্বয় বিধান। কারণ প্রত্যেকেই স্বীকার করে যে উভয়ের প্রয়োজন ছিল প্রতিষ্ঠিত প্রথার জন্যে। কিন্তু অনিবার্য দ্বন্দ্বটি নতুনভাবে দেখা দিল আর্নল্ড ক্ষমতাচ্যুত হলে। উদ্ভূত এই দীর্ঘ সংগ্রামে লম্বার্ড লীগ নামে এক নতুন সহযোগী পেলেন পোপ। লম্বার্ডির শহরগুলো বিশেষত মিলান সমৃদ্ধ ও বাণিজ্যিক দিকদিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখনকার দিনে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্মুখভাগে ছিল ওইগুলো। স্বীকৃতিস্বরূপ ইংরেজরা একে লম্বার্ড স্ট্রিট নামে স্মরণ করে থাকে। সামন্তবাদের পক্ষে দাঁড়ালেন সম্রাট, কিন্তু ইতিমধ্যেই এর বিরোধী হয়ে গের বুর্জোয়া পুঁজিবাদ। চার্চ সুদ নিষিদ্ধ করলেও পোপ ঋণগ্রহীতা ছিলেন এবং উত্তর ইতালীয় ব্যাংকের মুলধন এত উপকারী দেখতে পেলেন যে অবশেষে ধর্মীয় কঠোরতা হ্রাসের প্রয়োজন মনে করেন। দীর্ঘ বিশ বছর ধরে বারবারসার সঙ্গে পোপের দ্বন্দ্ব চলে এবং তা শেষ হয় অমীমাংসিতভাবে। সম্রাটের জয়ী না হওয়ার প্রধান কারণ লম্বার্ড শহরগুলোই।

পোপ ও ফ্রেডারিকের ভেতর দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় পোপের সার্বিক জয়ের পেছনে প্রধানত দুটো কারণ ছিল : উত্তর ইতালীয় বাণিজ্যিক শহর তাসকানি ও লম্বার্ডের সামন্ত প্রথার প্রতি বিরোধিতা এবং ফ্রান্সিসকানদের দ্বারা ধর্মীয় উৎসাহের জাগরণ। প্রেরিত পুরুষদের দারিদ্র্য ও বিশ্বজনীন প্রেমের বিচার করতেন সেন্ট ফ্রান্সিস; কিন্তু তার মৃত্যুর কয়েক বছরের ভেতর তার অনুসাীরা সার্জেন্টদের নিযুক্তি শুরু করেন চার্চের সম্পত্তি রক্ষার জন্যে তুমুল যুদ্ধের জন্যে। সম্রাটের পরাজয়ের কারণ ছিল এই যে, ঈশ্বরভক্তি ও নৈতিকতার ঢঙে তিনি দাঁড় করাতে পারেননি তার যুক্তিগুলো।

অনেকেই নৈতিকতার কারণে একই সময়ে পোপের এই সংগ্রামকালীন যুদ্ধ প্রস্তুতি পোপের মর্যাদা সম্পর্কে সমালোচনামুখর করে তোলে। CAMBRIDGE MEDIEVAL HISTORY (Vol-5, Page-176)-এ ফ্রেডারিকের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ পোপ চতুর্থ ইনোসেন্টের মৃত্যুর সময় উল্লেখ আছে।

তাঁর পূর্বসূরি যে কোনো পোপের চেয়ে পোপের মর্যাদা সম্পর্কে তার ধারণা অধিকতর ধর্মনিরপেক্ষ ছিল। তার মতে তার দুর্বলতা ও এর প্রতিকার ছিল রাজনৈতিক। তিনি সর্বদা আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ব্যবহার করতেন অর্থ সংগ্রহ, বন্ধুত্ব অর্জন এবং শত্রুকে ঘায়েল করার জন্যে। পোপীয় মর্যাদার প্রতি সর্বত্রই মানুষের ঘৃণার উদ্রেক করে তার অপরিণামদর্শী কার্যকলাপ। কলঙ্কময় ছিল তার কর্মপদ্ধতি। আধ্যাত্মিক কর্তব্য এবং স্থানীয় অধিকার অবমাননা করে তিনি চার্চের সম্পত্তি, পোপীয় রাজস্ব ও রাজনৈতিক পুরস্কারের উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন। যাজকীয় বৃত্তির জন্য পোপের জন্য মনোনীত চার ব্যক্তিকে এক এক করে অপেক্ষমান থাকতে হতো। এ ধরনের পদ্ধতির নাম ছিল নিকৃষ্ট নিযুক্তি। আবার দূত নির্বাচন ছিল ধর্ম ও কূটনীতির ক্ষেত্রে বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সম্পূর্ণরূপে জাগতিক না হওয়ার চেয়েও বেশি কিছু। তার কারণে সৃষ্ট আধ্যাত্মিক প্রভাব ও সম্ভ্রমহানির ব্যাপারে ইনোসেন্ট সচেতন ছিলেন না। সদিচ্ছা থাকলেও তার নীতি ভালো ছিল না। খুব কমই সৌভাগ্য ও বিপর্যয় দ্বারা বিচলিত হয়েছে তার সাহস, অজেয় সংকল্প ও ধূর্ততায় সমৃদ্ধ ঠান্ডা মেজাজ। তিনি ধৈর্য সহকারে ধূর্ততা ও বিশ্বাসহীনতার সঙ্গে তার লক্ষ্যের দিকে ধাবমান ছিলেন, যার পরিণতিস্বরূপ চার্চের মান নিচে নেমে যায়। তার বিশাল প্রভাব ছিল ঘটনা প্রবাহের উপর। তিনি সাম্রাজ্য ধ্বংস করেন। পোপীয় পতনের সূচনা ঘটে তার হাতেই। তিনি নির্মাণ করেন ইতালির ভাগ্য।

পোপীয় নীতির কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়নি ইনোসেন্ট-৪-এর মৃত্যুতে। তার উত্তরাধিকারী URBAN-IV সম্পূর্ণ সফলতার সঙ্গে FREDERICK-এর পুত্র MANFRED-এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যান। এবং তৎকালীন ইতালির উদীয়মান পুঁজিবাদের সমর্থন লাভ করেন। কর্তৃত্বের আকর্ষনীয় ব্যবহার দ্বারা এর স্থিতিশীলতা যতই ব্যাহত হোক না কেন নৈতিকতার ক্ষেত্রে তা প্রচারণা ক্ষমতা থেকে অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনে যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। পোপীয় রাজস্ব সংগ্রহের ব্যাপক লেনদেনের জন্য অধিকাংশ ব্যাংকার ইতিমধ্যেই পোপের পক্ষে ছিল, কিন্তু কিছু শহরে যেমন, SIENA ও GHIBELLINE-এ অনুভূতি এত প্রবল ছিল যে, ব্যাংকাররা প্রথমত মেনফ্রেডের পক্ষ অবলম্বন করে। যেখানেই তা ঘটেছে পোপ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের জানিয়ে দেন যে, ঋণ পরিশোধ না করাই হচ্ছে খ্রিস্টানদের দায়িত্ব। তৎক্ষণাৎ এ ঘোষনা ঋণগ্রহীতাদের কাছে কতৃত্বাদেশ হিসেবে গৃহীত হয়। ফলে ইংরেজদের সঙ্গে বাণিজ্য হারাল SIENA। ইতালির সর্বত্র যেসব ব্যাংকর ধ্বংস এড়াতে পারল তারাই পোপীয় কৌশলের দ্বারা বাধ্য হলো GUELPH হতে।

কিন্তু এ উপায়ে ব্যাংকারদের রাজনৈতিক সমর্থন লাভকরতে পারলেও পোপের স্বর্গীয় কর্তৃত্বের দাবির প্রতি জনসাধারণের শ্রদ্ধাবোধ বাড়াতে পারেনি।

দুটি প্রথার ভেতর প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে পশ্চিমা সাম্রাজ্যের পতন থেকে শুরু করে যোড়শ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত সমগ্র যুগটিকে দেখা যেতে পারে : একটি রাজকীয় রোমের অপরটি টিউটনিক অভিজাত শ্রেণির। প্রথমটি চার্চের অঙ্গীভূত এবং দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অঙ্গীভূত। রাজকীয় রোমের ঐতিহ্য অন্তর্ভুক্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন রোম সম্রাটরা। দ্বিতীয় ফ্রেডারিক ছাড়া তারা সবাই অজ্ঞতাবশত রোমের ঐতিহ্যকে বুঝতে পারেনি। যে সামন্ততান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাদের পরিচিত ছিল তা ছিল জার্মানির। পান্ডিত্যাভিমানীভাবে প্রাচীন তথ্যাদি থেকে গৃহীত হয় রাজকীয় চাকরিজীবীসহ সব শিক্ষিত ব্যক্তির ভাষা। রোমানদের ছিল আইন, গ্রিকদের ছিল দর্শন কিন্তু প্রথা ছিল উৎসের দিক থেকে টিউটনিক যা ভদ্র ভাষায় বর্ণনা করার মতো ছিল না। আধুনিক শিল্প পদ্ধতি বর্ণনায় বর্তমান যুগের সনাতনী পন্ডিতদের ল্যাটিন ভাষায় যে অসুবিধা মোকাবেলা করতে হচ্ছে তার অনুরূপ অসুবিধা ছিল। টিউটনিক প্রথা বর্ণনাময় সংস্কার আন্দোলন ও ল্যাটিনের পরিবর্তে আধুনিক ভাষা গ্রহণের আগে পশ্চিমা ইউরোপীয় সভ্যতার টিউটনিক উপাদান সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকাশের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছিল।

হোহেন স্টেফেনের পতনের পর চার্চ কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা দুনিয়ার উপর ইতালির শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিল বলে মনে হয়। অর্থের মানদণ্ডে বিচার করলে দেখা যায়, এই শাসন সুসংহত ছিল এন্টানাইনের সময় পর্যন্ত। রোমানদের সেনাদল কর্তৃক সংগৃহীত অর্থের চেয়ে ইংল্যান্ড এবং জার্মান থেকে রাজস্ব হিসেবে যে অর্থ রোমে চলে যেত তা ঢের বেশি ছিল। কিন্তু তা পোপের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের কারণেই আদায় করা সম্ভব হতো- কোনোরূপ অস্ত্রবলে নয়।

পূর্ববর্তী তিন শতাব্দী ধরে অর্জিত সম্মান পোপরা এভিগননে সরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হারাতে বসে। তার একমাত্র কারণ ছিল না ফরাসি রাজার প্রতি পূর্ণ বশ্যতা স্বীকার, বরং এর কারণ ছিল সংঘের সদস্যদের দমনের মতো নির্মমতায় অংশগ্রহণও। রাজা চতুর্থ ফিলিপ অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হয়ে এসব সম্পদের প্রতি অন্যায়ভাবে লাভ করে। বিরুদ্ধমত পোষণ করার অজুহাতে অন্যায়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তাকে অভিযুক্ত করার জন্যে। যারা ফ্রান্সে ছিল পোপের সাহায্য নিয়ে তাদেরকে আটক করা হয় এবং অত্যাচার করা হয় যে পর্যন্ত না তারা স্বীকার করে যে শয়তানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছিল এবং ক্রুশবিদ্ধ যিশুর প্রতিমূর্তির প্রতি থুথু ফেলেছিল। পরে পোপের জন্য কোনো উপরি পাওনা না রেখেই যখন রাজা তাদের সম্পত্তি থেকে সবটুকু হস্তান্তরিত করেছিলেন তখন তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলা হয় অধিক সংখ্যায়। পোপের মর্যাদার নৈতিক অধঃপতনের সূচনা করে এসব কাজ।

পোপের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠল এই বিরাট বিভক্তি। কারণ দাবিদারদের ভেতর কে বৈধ তা কেউই জানত না। তারা একে অপরকে অভিশপ্ত মনে করত। প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষই এই মহাবিভক্তিকালে তাদের অশোভন অভিপ্রায় প্রদর্শন করে ক্ষমতার প্রতি। এমনকি তারা তাদের সংসক্ত শপথও পরিহার করে। উভয় পোপের প্রতি বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্র ও স্থানীয় চার্চ একত্রে বশ্যতা প্রত্যাহার করে। অবশেষে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এ দুর্যোগের অবসান ঘটাতে পারে মাত্র একটি সাধারণ পরামর্শ সভাই। ভিন্নমত পোষণকারী হিসেবে তাদের পদচুতি ঘোষণা করলেও সাফল্যজনকভাবে উভয় পোপের প্রভাব থেকে মুক্তি লাভ না করেই বিপথগামী হয়ে পিশার কাউন্সিল শুধু জন্ম দেয় তৃতীয় এক পোপের; অবশেষে কনস্টেন্সের কাউন্সিল সফলতার সঙ্গে তিনটিই অপসারণ করে এবং পুনরুদ্ধার করে সংহতি। কিন্তু সগ্রামী পোপের প্রতি ঐতিহ্যগত শ্রদ্ধাবোধ মর্যাদা সম্পর্কে বলা সম্ভব হয়েছিল যে, এ রকম দৈত্য থেকে ব্যাহতি চার্চের পক্ষে ক্ষতিকর নয় বরং উপকারী; চার্চ তার ধ্বংসের জন্য কাজ করতে গিয়ে একান্তভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বের জন্যই কাজ করবে।

পোপীয় মর্যাদা ইতালির পরিবেশে উপযোগী হলেও পনেরো শতকে উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলোর ঈশ্বর ভক্তির প্রতি পরিতৃপ্তি দানে তা অতিমাত্রায় জাগতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ এবং নগ্নভাবে নৈতিকতা বিবর্জিত ছিল। অবশেষে মুক্ত অর্থনীতির উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির অনুকূলে টিউটনিক দেশগুলোতে আনুপাতিক হারে জোরদার হয়ে ওঠে নৈতিক বিদ্রোহ। রোমের প্রতি সম্মান প্রর্দশনের একটি স্বাভাবিক অস্বীকৃতি দেখা দেয়। রাজপুরুষরা এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা চার্চের ভূমি দখল করে নেয়, কিন্তু তা সম্ভব হতো না প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদ সংক্রান্ত বিদ্রোহ ছাড়া। আবার মহাবিভক্তি ও পোপীয় সংস্কারের কেলেঙ্কারী ছাড়া সংগঠিত হতো না প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদ। অভ্যন্তরীণ কারণে চার্চের নৈতিক শক্তি দুর্বল না হলে এর আক্রমণকারীরা এতটুকু নৈতিক সাহস পেত না এবং তারা পরাজিত হতো ফ্রেডারিক-২-এর মতোই।

এই প্রেক্ষিতে এতটুকু খেয়াল করা মজার ব্যাপার যে, যাজকীয় শাসন বিষয়ে মেকিয়াভেলিকে তার প্রিন্স বইয়ের একাদশ অধ্যায়ে বলতে হয়েছে:

দশম ও লিও এর যাজকীয় কালে এই কথাগুলো লিখিত হয়েছিল। সংস্কার শুরু হয়ে যায় ওই সময়ে। এ কথা ধার্মিক জার্মানদের কাছে বিশ্বাস করা ক্রমে অসম্ভব হয়ে পড়ল যে ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের স্বজনপ্রিয়তা এবং লিও-এর অর্থ সংক্রান্ত প্রবল লোভ ঈশ্বর কর্তৃক প্রশংসিত ও রক্ষিত হতে পারে, লুথারের মতো। একজন বেপরোয়া দুঃসাহসী ব্যক্তি পোপীয় ক্ষমতার উপর আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন, যদিও তা থেকে পশ্চাৎপদ হয়েছিলেন মেকিয়াভেলি। চার্চবিরোধী নৈতিক ও ধর্মীয় সমর্থন লাভের সঙ্গে সঙ্গে স্বার্থজনিত বিরোধী প্রেরণা দ্রুতবেগে সম্প্রসারিত করে। যেহেতু চার্চের ক্ষমতা নির্ভর করত মূলনীতিগুলোর উৎকর্ষের উপর, তাই এটা স্বাভাবিক ছিল যে বিরোধিতার বৈধতা সংক্রান্ত নতুন মতবাদ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবে। কোনোরকমের ভীতি এবং প্রজাদের পক্ষ থেকে নৈতিক নিন্দাবাদ ছাড়াই লুথারের ধর্মতত্ত্ব অজ্ঞ যুবরাজদের চার্চ লুণ্ঠনে উদ্বুদ্ধ করে।

পোপবিরোধী ধর্ম বিপ্লব বিস্তারে অর্থনৈতিক প্রেরণার প্রভূত অবদান থাকলেও স্পষ্টত এর ব্যাখ্যাদানে ওইগুলো যথেষ্ট নয়, কারণ ওইগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ক্রিয়াশীল। পোপকে প্রতিহত করতে চেষ্টা করেছিলেন অনেক ম্রাটই; অন্যত্র সার্বভৌম রাজা বা রানী এ রকমই করেছিলেন। যেমন ইংল্যান্ডের হেনরি-২ ও রাজা জন। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা অসৎ মনে করা হতো। এ কারণেই তা ব্যর্থ হয়। সফল প্রতিরোধ সম্ভব হয়ে ওঠে শুধু দীর্ঘকাল ধরে পোপীয় ঐতিহ্যগত ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে নৈতিক বিদ্রোহ ঘটলেই।

প্রচারণার মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জন সম্পর্কে ধারণা লাভে ইচ্ছুক যে কোনো ব্যক্তির কাছে পোপীয় ক্ষমতার উত্থান-পতন একটি পাঠোপযোগী বিষয়। এটুকু বলা যথেষ্ট নয় যে, মানুষ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিল এবং তারা বিশ্বাস করত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ক্ষমতায়। মধ্যযুগব্যাপী প্রচলিত ধর্মবিরোধী মতবাদ বিরাজমান ছিল এবং সার্বিকভাবে পোপ শ্রদ্ধা পাওয়ার উপযুক্ত না হলে তা প্রটেস্ট্যান্টবাদের মতো বিস্তার লাভ করত। প্রচলন বিরোধী মতবাদ ছাড়া ধর্মনিরপেক্ষ শাসকরা চার্চকে রাষ্ট্রের অধীন রাখার জোর চেষ্টা করত, কিন্তু তা সফল হলেও পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্যর্থ হয়। এর রয়েছে অনেক কারণ।

প্রথমত, বংশগত উত্তরাধিকারমূলক ছিল না পোপীয় পদ এবং তাই ধর্মনিরপেক্ষ রাজতন্ত্রের মতো দীর্ঘকাল অবধি সংখ্যালঘুতা প্রসূত অসুবিধার সম্মুখীন হয়নি। চার্চে ঈশ্বর ভঙ্গি, জ্ঞান ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছাড়া কেউ প্রসিদ্ধি লাভ করতে পারেনি। ফলস্বরূপ অধিকাংশ পোপই এক বা একাধিক দিক থেকে সাধারণ স্তরের অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন। সামর্থ্য লাভ করতে পারতেন ধর্মনিরপেক্ষ সার্বভৌম রাজা। কিন্তু প্রায়ই ঘটেছে এর বিপরীতটি। তার ওপর পাদ্রিদের মতো আবেগ নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না তাদের। রাজারা বারবার পৃথক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে সৃষ্ট অসুবিধায় পড়েন, চার্চের বিষয় হওয়ার জন্য পোপের কারুণার মুখাপেক্ষী হতে হয়। কখনও তারা চেষ্টা করেন হেনরি-৮ এর মতো সমস্যা মোকাবেলা করার নীতি অনুসরণের। কিন্তু তাদের প্রজারা মুক্ত হয় অধীনতার শপথ থেকে এবং পরিশেষে তাদের স্বীকার করতে হয় বশ্যতা অথবা হতে হয় পরাজিত।

নৈর্ব্যক্তিক অবিচ্ছেদ্যতা হলো পোপীয় মর্যাদার অন্য একটি বড় শক্তি। কতই না আশ্চর্যজনক ফ্রেডারিক-২ এর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কোনো পোপের মৃত্যুতে সৃষ্ট ক্ষীণ পার্থক্য। এমন কিছু মতবাদ এবং রাষ্ট্রীয় শাসন প্রণালি ছিল যে সমাজ নির্ভরতার সঙ্গে রাজারা এগুলো বিরোধিতা করতে পারতেন না। একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ সরকারগুলোর তুলনামূলক অবিচ্ছেদ্যতা বা উদ্দেশ্যের সংশক্তি অর্জন করে জাতীয়তাবাদের অভ্যুদয়ের ফলে।

রাজারা সাধারণত একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে অজ্ঞ ছিল। অন্যদিকে অধিকাংশ পোপই ছিলেন জ্ঞানী এবং সর্ববিষয়ে উত্তমরূপে ওয়াকিবহাল। তার ওপর সামন্ত প্রথার সঙ্গে একই সূত্রে বাঁধা ছিলেন রাজারা। ফলে সবসময় শক্ত ছিল অরাজকতাজনিত বিপদ মোকাবেলা করা। এই প্রথা নবতর অর্থনৈতিক শক্তির শত্রু ছিল। সর্বোপরি এ শতাব্দীতে রাষ্ট্রের চেয়ে চার্চ প্রদর্শন করে উন্নতর সভ্যতার প্রতিমূর্তি।

কিন্তু চার্চের বড় শক্তি ছিল স্বর্গীয় প্রভাবে অনুপ্রাণিত শ্রদ্ধাবোধ। এ ধরনের নৈতিক পুঁজি হিসেবে তা প্রাচীনকালে নির্বাহিত নির্যাতনের গৌরব উত্তরাধিকর সূত্রে অর্জন করে। আমরা দেখেছি যে, এর বিজয় সম্পর্কযুক্ত ছিল বলপূর্বক কৌমার্য প্রথার বাস্তবায়নের সঙ্গে এবং মধ্যযুগীয় চিন্তাধারায় কৌমার্য প্রথা অত্যন্ত আর্কষণীয় ছিল। কিছু সংখ্যক পোপ ছাড়া অধিকাংশ যাজকই কষ্ট করেছেন নীতি বিসর্জন না দিয়ে। সাধারণ মানুষের কাছে এ কথা পরিষ্কার ছিল যে, বল্গাহীন লোভ-লালসা-লাম্পট্য ও আত্মকেন্দ্রিকতার এ বিশ্বে চার্চের মর্যাদাশীল প্রসিদ্ধ ব্যক্তিরা নৈর্ব্যক্তিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সাধারণ জীবনযাপন করেছেন এবং স্বেচ্ছায় ব্যক্তিগত সহায়-সম্পদের অধীন করে দিয়েছেন। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে চিত্তাকর্ষক পবিত্র ব্যক্তিরা-হিল্ডার ব্র্যান্ড, সেইন্ট বার্নাড, সেইন্ট ফ্রান্সি জনমত উদ্ভাসিত করেছেন এবং রোধ করেছেন নৈতিকতার অবক্ষয়। অন্যথায় তা উদ্ভূত হতো অন্যের দুষ্কর্মের ফলস্বরূপ।

আদর্শিক উদ্দেশ্য এবং ক্ষমতার প্রতি মোহের জন্য ক্ষমার অধিকারী যে কোনো সংগঠনের প্রতি শ্ৰেষ্ঠ গুণের জন্য খ্যাতি বিপজ্জনক এবং পরিণামে তা নিশ্চিতভাবে অপরিনামদর্শী নির্মমতার ভেতর শ্রেষ্ঠত্বের জন্ম দেয়। জাগতিক বস্তুর ব্যাপারে ঘৃণা প্রচার করে চার্চ এবং এভাবে কর্তৃত্ব অর্জন করে রাজপুরুষের উপর। দারিদ্র্যব্রত পালন করে খ্রিস্টান ভিক্ষুরা। এর ফলে বিশ্ব এতই প্রভাবিত হয় যে, এর আগে অর্জিত চার্চের প্রভূত সম্পদ আরও বৃদ্ধি পায়। ভ্রাতৃপ্রেম প্রচারের মাধ্যমে বিজয়মণ্ডিত দীর্ঘ ও নৃশংস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় উদ্দীপনা সৃষ্টি করেন সেইন্ট ফ্রান্সিস। পরিশেষে রেনেসাঁ চার্চের ক্ষমতা ও সম্পদের উৎস সব নৈতিক উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে এবং প্রয়োজন দেখা দেয় আকস্মিক সংস্কারের জন্যে পুনর্জাগরণ পুনরুদ্ভাবনের।

এর সবই অপরিহার্য হয়ে পড়ে যখন কোনো সংগঠনের উদ্দেশ্যে উৎপীড়নমূলক ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে সদ্গুণ ব্যবহৃত হয়।

প্রথাগত ক্ষমতার পতন সর্বদাই বিদেশি শক্তির দ্বারা বিজিত হওয়া ছাড়া ওইসব ব্যক্তির দ্বারা এর অপব্যবহারের ফল। মেকিয়াভেলির মতো এমন ভাবা হতো যে মানুষের মনে এর অবস্থান এত দৃঢ় যে এর অপসারণ অসম্ভব চরম অপরাধমূলক ব্যবস্থার দ্বারাও।

পোপের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হতো মধ্যযুগে। বর্তমানকালে যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রিমকোর্টের প্রতি সেই সম্মান দেখানো হয় অনুরূপভাবে গ্রিকরা দৈববাণী প্রকাশের স্থানের প্রতি যে সম্মান দেখাত। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের কার্যকরিতা সম্বন্ধে পড়াশোনা করেছেন এমন অনেকেই জানেন যে সুপ্রিমকোর্ট ধনতন্ত্র সংরক্ষণে নিয়োজিত শক্তিগুলোর একাংশ। কিন্তু এগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত মানুষের প্রতি সম্মান হাসের ব্যাপারে কিছুই করেন না। আবার কিছু সংখ্যক মানুষ আছে যারা সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষের চোখে বিধ্বংসী ও বলশেভিক হওয়ার জন্য ঘৃণিত ও কলঙ্কিত। লুথারের মতো সংবিধানের সরকারি ব্যাখ্যাদানকারী কর্তৃপক্ষের উপর কেউ সফল আক্রমণ চালানোর আগে তার জন্য প্রয়োজন হবে স্পষ্টভাবে পক্ষভুক্ত মানুষ সংগ্রহের জন্য বেশ কিছু অগ্রগতি অর্জন করা।

ধর্মীয় ক্ষমতা ধর্মনিরপেক্ষ ক্ষমতার চেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে। এ কথা সত্য যে, ধর্মীয় রাজনৈতিক বিপ্লব শুরু হয় রাশিয়া ও তুরস্কে মহাযুদ্ধের পর। কিন্তু উভয় দেশেই রাষ্ট্রের সাতে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল প্রথাগত ধর্ম। পঞ্চাশ শতাব্দীতে বর্বরদের উপর চার্চের বিজয় যুদ্ধে পরাজয় সত্ত্বেও ধর্মীয় ভাবধারা বজায় রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সেন্ট অগাস্টিন রোম লুণ্ঠনের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত সৃষ্টিকর্তার শহরে ব্যাখ্যা দেন যে, প্রকৃত বিশ্বাসীদের কাছে অঙ্গীকার করা হয়নি জাগতিক ক্ষমতা এবং তাই তা আশা করা হয়নি ধর্মীয় গোঁড়ামির ফলস্বরূপ। সাম্রাজ্যে অস্তিত্বশীল পৌত্তলিকরা যুক্তি প্রদান করে যে, রোম পরাজিত হয় দেবতাদের পরিত্যাগ করার জন্যেই। কিন্তু আপাত সত্য মনে হলেও এ ধরনের যুক্তি সাধারণ সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়। পরাজিতের উন্নত সভ্যতা বিস্তার লাভ করে আক্রমণকারীদের ভেতর এবং খ্রিস্টীয় বিশ্বাস গ্রহণ করে বিজয়ীরা। বর্বরদের ভেতর এভাবে রোমের প্রভাব বজায় থাকে চার্চের মাধ্যমে। প্রাচীন সংস্কৃতির ভিত হিটলারের আগে কেউই টলাতে পারেনি।

 ০৫. রাজকীয় ক্ষমতা

রাজাদের উৎস যাজকদের মতো প্রাগৈতিহাসিক। অধুনা বিরাজমান সবচেয়ে পশ্চাৎপদ বর্বর সমাজের অবস্থা থেকেই শুধু ধারণা লাভ করা যেতে পারে রাজতান্ত্রিক ক্রমবিকাশের প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে। রাজার সম্প্রদায় বা জাতিকে যুদ্ধে নেতৃত্ব দান করেন প্রাতিষ্ঠানিক পূর্ণতালাভের পর পতন শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। তিনিই স্থির করেন কখন যুদ্ধ করতে হবে এবং কখন শান্তি স্থাপন করতে হবে। তিনি প্রায়ই আইন প্রণয়ন করেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন বিচার বিভাগীয় প্রশাসন। সিংহাসনে তার অধিকার কমবেশি বংশগত। তার ওপর তিনি একজন পূতপবিত্র ব্যক্তি। দেবতা না হলেও তিনি প্রভুর আশীর্বাদপ্রাপ্ত।

কিন্তু এ ধরনের রাজতন্ত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যায় সরকারের দীর্ঘ ক্রমবিকাশ ও বর্বরদের তুলনায় উন্নততর সুসংগঠিত সম্প্রদায়ের। সেকেলে সমাজেও অধিকাংশ ইউরোপীয়র কল্পনা অনুরূপ কোনো বর্বরপ্রধান প্রকৃত খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা যাকে প্রধান বলে ধরে নেই। তিনি শুধু ধর্মীয় ও সামাজিক আনুষ্ঠানাদি পরিচালনা করে থাকেন। কখনও লর্ড মেয়রের মতো ভাষণদান করেন ভোজসভায়। কখনও যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। কিন্তু তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন না, কারণ অতিমাত্রায় পবিত্র তিনি। কখনও তার মানা (MANA) এমন যে কোনো প্রজা তার উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না। কার্যত তিনি বিরত থাকেন জনগণের কাজে অধিকমাত্রায় অংশগ্রহণ থেকে। তিনি আইন তৈরি করতে পারেন না, কারণ তা গঠিত হয় প্রথা অনুযায়ী। তার প্রয়োজন হয় না প্রশাসনে, কারণ ছোট সম্প্রদায়ে প্রতিবেশিদের দ্বারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শাস্তি প্রদত্ত হয়ে থাকে। দুজন প্রধান থাকেন কিছু বর্বর সমাজে : একজন নিরপেক্ষ ও অন্যজন ধর্মীয়। প্রাচীন জাপানের সগোন ও মিকাডোর মতো নয়। কারণ নিয়মানুযায়ী শুধু আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা রয়েছে ধর্মীয় প্রধানের। প্রাচীন বর্বর সমাজে সাধারণত সিদ্ধান্তমূলক প্রশ্নে আনুষ্ঠানিক সরকারের চেয়ে প্রথার গুরুত্ব এত বেশি যে ইউরোপীয়দের কাছে প্রধান হিসেবে খ্যাত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ভেতর থেকেই শুধু রাজকীয় ক্ষমতার সূত্রপাত হয়।

হিজরত ও বিদেশি আক্রমণ প্রথা ধ্বংস ও পরিণামে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টিতে বড় ধলনের শক্তি। শাসকরা সভ্যতার সর্বনিম্ন স্তরে রাজা বলে খ্যাত। রাজ-পরিবারগুলো কখনও বিদেশি হয়ে থাকে এবং প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্ট শ্রেষ্ঠত্বের দ্বারা শ্রদ্ধা অর্জন করে। কিন্তু রাজতান্ত্রিক বিবর্তনে প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এটা সাধারণ বা অসাধারণ যে স্তরেই থাকুক না কেন তা একটি বিবর্তনমূলক প্রশ্ন।

এটা পরিষ্কার যে যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে রাজশক্তি বৃদ্ধির ব্যাপার। কারণ সাধারণ ঐক্যের প্রয়োজন খুবই স্পষ্ট যুদ্ধকালীন সময়ে। বিবর্তনমূলক উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অশুভ প্রভাব এড়ানোর সবচেয়ে সহজ পন্থা হচ্ছে রাজতন্ত্রে উত্তরাধিকারমূলক বৈশিষ্ট্য অর্জন। রাজা যদিও তার উত্তরসূরি নিযুক্ত করার ক্ষমতা রাখেন তারপরও তিনি প্রায় নিশ্চিতরূপেই তার পরিবারের সদস্যদের ভেতর থেকে তা করে থাকেন। কিন্তু চিরকাল স্থায়ী হয় না রাজবংশ।

রাজপরিবারের সূচনা হয় জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা বিদেশ জয়ের মাধ্যমে। সাধারণত ধর্মই নতুন পরিবারকে প্রথাগত উৎসবের মাধ্যমে বৈধ করে তোলে। এসব সুযোগ রাজকীয় ক্ষমতা লাভবান হয়। কারণ তা রাজকীয় ক্ষমতায় অপরিহার্য সমর্থন দান করে। প্রথম চার্লস বলেছিলেন কোনো বিকল্প নেই, কোনো রাজা নেই। সর্বযুগব্যাপী সত্য ছিল এ জাতীয় মেক্সিম রাজতন্ত্রের। উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের কাছে রাজপদ এতে লোভনীয় যে একমাত্র শক্তিশালী ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞাই তারেকে বাধ্য করতে পারে এ ধরনের লোভ পরিত্যাগে।

বর্বর প্রধান ও রাজার মধ্যবর্তী যতগুলো স্তরই থাকুক না কেন, এই প্রক্রিয়া ইতিহাস যুগে সর্বপ্রথম মিসরে ও ব্যাবিলনে সমাপ্ত হয়। খ্রিঃ পূঃ ৩০০০ অব্দে নির্মিত মহান পিরামিডের নির্মাণ সম্ভব ছিল একমাত্র প্রজাদের উপর প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী কোনো রাজার পক্ষেই। এ সময় ব্যাবিলনে কিছু সংখ্যক রাজা ছিলেন, কিন্তু মিসরের সঙ্গে তুলনা হতে পারে এমন কোনো রাজা ব্যাবিলনে ছিলেন না। কিন্তু রাজারা তাদের নিজ নিজ এলাকায় পরিপূর্ণ শাসক ছিলেন।

আমরা এমন মহান রাজার কাছে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্র বর্ষ শেষ হওয়ার আগে পৌঁছে যাই যার নাম ছিল হামুরাবি। একজন রাজার পক্ষে যা সম্ভব তার সবই তিনি করেছিরেন। আইন প্রণয়নের জন্য সুপরিচিত তিনি। সূর্যদেবতার কাছ থেকে তিনি আইন ক্ষমতা পেয়েছিলেন এবং তিনি দেখিয়েছিলেন যে মধ্যযুগীয় রাজপুরুষরা যা করতে পারেননি তা অর্জন করতে সফলকাম তিনি। যেমন আদালতে যাজকদের অধীনতা। সৈনিক ও ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বৈশিষ্ট্য অর্জন করেন তিনি। তার বিজয়ের প্রশংসা করেছেন দেশপ্রেমিক কবিরা।

তিনি লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন সেচ ব্যবস্থায় তার কৃতিত্ব। আমু এবং এনলিন। (একজন পুরুষ দেবতা এবং একজন স্ত্রী দেবতা) শাসন করার জন্য শুমার ও আক্কাদের ভূমি দান করলেন এবং তাদের শাসন করার জন্য রাজদন্ড প্রদানের দায়িত্ব আমার উপর অর্পন করলেন। আমি হামুরাবি খনন করলাম যা শুমার ও আক্কারেদ জমিতে পানি আনল। আমি শুমার ও আক্কাদের বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত মানুষগুলোকে একত্রিত করলাম এবং তাদের জন্য ব্যবস্থা করলাম পশু চারণ ও জল ব্যবহারের। আমি তাদের প্রচুর চারণভূমি দিলাম এবং প্রতিষ্ঠিত করলাম শান্তিপূর্ণ বসবাসে।

মিসরে পিরামিড যুগে রাজতন্ত্র উন্নতির সর্বোচ্চ শিকরে পৌঁছে। বিশাল এলাকা ছিল পরবর্তী রাজাদের, কিন্তু কারোরই পূর্ণমাত্রায় শাসন ছিল না রাজ্যের উপর। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ফলে নয়, মিসর ও ব্যাবিলনে রাজাদের ক্ষমতা শুধু বিদেশি আক্রমণের ফলে নিঃশেষ হয়। এটা সত্য যে, তা যাজক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অবতীর্ণ হতে পারেনি। কারণ প্রজাদের অধীনতা নির্ভর করতে রাজতন্ত্রের ধর্মীয় তাৎপর্যের উপর। কিন্তু এই দিক ছাড়া অপরিসীম ছিল তাদের

অধিকাংশ শহরেই ইতিহাস যুগের সূচনা পর্যন্ত গ্রিকরা রাজাদের রাজনৈতিক শাসন থেকে মুক্ত ছিল। ইতিহাসব্যাপী রাজার প্রতি রোমানরা তাদের জাতির অনীহা বজায় রাখে। সঠিক অর্থে রোমান সম্রাট পশ্চিমে তাদের জাতির অনীহা বজায় রাখে। সঠিক অর্থে রোমান সম্রাট পশ্চিমে রাজা ছিলেন না। আইনবহির্ভূত ছিল তাদের উৎস। সবসময় তিনি নির্ভর করতেন সেনাবাহিনীর উপর। জনসাধারণের কাছে নিজেকে ঈশ্বর ঘোষণা করতে পারতেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর কাছে তিনি একজন জেনারেল। তিনি প্রচুর পরিমাণে দান করতেন অথবা করতেন না। সাম্রাজ্য স্বল্পকাল ছাড়া কখনও উত্তরাধিকারজাত ছিল না। সেনাবাহিনীর হাতে ছিল প্রকৃত ক্ষমতা। সম্রাট শুধু সাময়িকভাবে এমন মনোনীত ব্যক্তিমাত্র।

কিছু পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বর্বর আক্রমণের ফলে পুনরাবির্ভাব ঘটে রাজতন্ত্রের। নতুন রাজারা জার্মান গোষ্ঠীপতি ছিলেন। পরম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না তারা। সবসময়ই তাদের ক্ষমতা নির্ভর করত কোনো পরিষদ বা সগোত্রীয় সহযোগিতার উপর। কিন্তু জার্মান গোষ্ঠী রোমান প্রদেশ জয় করলে এর প্রধান হতো রাজা এবং গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীরা লাভ করতেন বিশেষ স্বাধীনতাসহ এর আভিজাত্য। এভাবে যে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব হয় তা পশ্চিম ইউরোপের সব রাজাকে অবাধ্য বেরনদের করুণার উপর ফেলে দেয়।

রাজতন্ত্র দুর্বল ছিল চার্চ ও সামন্ত অভিজাত সম্প্রদায়ের অধিকাংশ জিনিস গ্রহণ করার আগে। আমরা এর আগে চার্চের দুর্বলতার কারণ আলোচনা করেছি। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে রাজার বিরুদ্ধে সংগ্রামে অভিজাত শ্রেণি ধ্বংস হয়, কারণ তা সুশৃংখল সরকারের প্রতি বাধাস্বরূপ ছিল। জার্মানিতে এর নেতারা উন্নীত হয় ছোট ছোট রাজায়। ফলে জার্মানি ফ্রান্সের কৃপায় পতিত হয়। বিভাগপূর্ব পর্যন্ত পোল্যান্ডে অভিজাত শ্রেণির অরাজকতা চলছিল। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে শতবর্ষের যুদ্ধ ও গোলাপযুদ্ধের পর সাধারণ নাগরিকরা বিশ্বাস স্থাপন করে শক্তিশালী রাজার উপর। চতুর্থ এডওয়ার্ড বিজয়ী হন লন্ডন নগরীর সাহায্য পেয়ে এবং তিনি তার রানী লন্ডন থেকেই বেছে নেন। সামন্ত অভিজাত শ্রেণির শত্ৰু একাদশ লুইস উচ্চশ্রেণির বুর্জোয়াদের বন্ধু ছিলেন, যারা তাকে অভিজাতদের বিরুদ্ধে সাহায্য করে এবং তিনি তাদেরকে সাহায্য করেন আর্টিসামদের বিরুদ্ধে। ENCY CLOPAEDIA BRITANICA-র রায় হচ্ছে, তিনি বড় পুঁজিপতির মতো শাসন করেন।

শিক্ষা যাজকদের এখন একচেটিয়া অধিকার নয়। চার্চের সঙ্গে সংঘর্ষে এ নিয়ে আগেকার রাজাদের তুলনায় রেনেসাঁ রাজতন্ত্রের সুবিধা ছিল বড় ধরনের। অপেশাদার আইনজ্ঞদের সাহায্য অতুলনীয় নতুন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়।

নতুন রাজতন্ত্র ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেনে চার্চ ও আভিজাত্যের ঊর্ধ্বে ছিল। তাদের ক্ষমতা নির্ভরশীল ছিল জাতীয়তাবাদ ও বাণিজ্য-এই দুই উদীয়মান শক্তির উপর। যতদিন পর্যন্ত মনে করা হতো যে তারা এই দুই শক্তির জন্য কার্যকর ততদিন তারা শক্তিশালী ছিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হলেই বিপ্লব সংগঠিত হয়। নতুন বিশ্বজয়ের মাধ্যমে স্পেন একপাশে সরে দাঁড়ায়; কিন্তু স্পেনীয় নতুন জগৎ বাণিজ্যের জন্যেই বিদ্রোহ করছিল ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে।

যদিও বাণিজ্যিক বলয় সামন্তবাদীদের অরাজকতার বিরুদ্ধে রাজাকে সমর্থন দেয়, তারপরও যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ার পর তা প্রজাতন্ত্রী ধরনের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। প্রাচীনকালে উত্তর ইতালি ও মধ্যযুগীয় হেনসিটিক শহরগুলোতে এবং হল্যান্ডের মহান দিনগুলোতে তা একই ছিল। সুতরাং বেদনাদায়ক ছিল রাজার বাণিজ্য মৈত্রী। রাজা স্বর্গীয় কর্তৃত্বের কাছে আবেদন করেন, তাদের ক্ষমতা যেন সিক্ত হয় প্রথাগত ও আংশিকভাবে ধর্মীয় উপাদানে। এ ব্যাপারে তারা শুধু অপরাধীই নয়, বরং তা ছিল অধার্মিকতা। ফ্রান্সে সেইন্ট লুইসকে রূপকাহিনীর ব্যক্তিত্বে পরিণত করা হয়, যার কিছু ধার্মিকতা পৌঁছে পঞ্চদশ লুইস পর্যন্ত। নতুন কোর্ট আভিজাত্য সৃষ্টি করে। রাজারা একে গুরুত্ব দেয় বুর্জোয়াদের চেয়ে। ইংল্যান্ডে উচ্চতর অভিজাত ও মধ্যবিত্তরা একত্রিত হয়ে নামমাত্র সংসদীয় শিরোনামে একজন রাজা বসায়, যার কোনোরকম অতিপ্রাকৃত সংসদীয় গুণাগুণ ছিল না। উদাহরণস্বরূপ রাজার ক্ষতিকর দিকের কোনো উপশ্রম দিতে পারেননি জর্জ-১, কিন্তু রানী এনি দিতে পেরেছিলেন। ফ্রান্সে রাজারা জয়লাভ করলেন অভিজাত শ্রেণির উপর এবং তাদের মাথা শিরোচ্ছেদ যন্ত্রের নিচে পতিত হলো।

ফ্রেডারিক বারবারেসার সময় লম্বৰ্ড লীগের সাথে বাণিজ্য ও জাতীয়তার ঐক্য শুরু হয় এবং রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে সর্বশেষ ও সংক্ষিপ্ত বিজয় অর্জন করে ক্রমাগতভাবে সমগ্র ইউরোপে তা ছড়িয়ে পড়ে। যেখানেই এই মৈত্রী ক্ষমতা লাভ করে সেখাইে প্রথমত রাজতন্ত্রের সহযোগ ও পরে এর বিপরীতে তা ভূমির উপর নির্ভরশীল প্রথাগত ক্ষমতার বিরোধী হয়ে পড়ে। অবশেষে রাজারা সর্বত্র বিলীন হয়ে পরিণত হয় ঠুটো জগন্নাথে। বর্তমানে কমপক্ষে পৃথক হয়েছে জাতীয়তা ও বাণিজ্য। ইতালি, জার্মানি ও রাশিয়ায় বিজয়ী হয়েছে একমাত্র জাতীয়তাই। দ্বাদশ শতাব্দীতে মিলানে সূচনালাভের পর স্বাভাবিক পরিণতি লাভ করে উদারনৈতিক আন্দোলন।

বাহ্যিক কারণে প্রথাগত ক্ষমতা ধ্বংস না হলে সবসময়ই তা এক বিশেষ স্তরে উন্নতি লাভ করে এবং অমনযোগী হয়ে পড়ে সাহস ও শ্রদ্ধায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাধারণ অনুমোদনের ব্যাপারে। কারণ বিশ্বাস করা হয় যে তা কখনও ধ্বংস হবে না। মূর্খতা ও নিষ্ঠুরতার জন্য মানুষ ক্রমান্বয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে এর স্বর্গীয় কর্তৃত্বের প্রতি। যেহেতু অভ্যাসের চেয়ে এসব দাবির ভালো উৎস নেই তাই সমালোচনা একবার শুরু হলে সহজেই এগুলোকে নিঃশেষ করে দেয়। বিদ্রোহীদের কাছে প্রয়োজনীয় ধর্মমত স্থান নেয় পুরনোর। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় ফ্রান্সের কাছ থেকে হাইতি স্বাধীন হলে শুধু বিশৃঙ্খলাই জন্ম নেয়। সাধারণত মনোগত বিদ্রোহ ব্যাপকতা লাভের আগে একটি দীর্ঘজীবী কুশাসন জরুরি হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্রোহীরা পুরনো শাসন বৈশিষ্ট্যের পুরোটা অথবা অংশবিশেষ অর্জন করে। অগাস্টাস তাই সিনেটের প্রথাগত মর্যাদা আত্মস্ত করেছিলেন এবং প্রটেস্ট্যান্টরা বাইবেলের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখলেও রাখতে পারেনি তা ক্যাথলিক চার্চের প্রতি। রাজতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অক্ষুণ্ণ রেখেই ব্রিটিশ সংসদ ধীরে ধীরে রাজক্ষমতা আত্মস্ত করে।

যা হোক, সীমিত বিপ্লব ছিল এগুলো : অধিকতর ব্যাপকতাসম্পন্ন বিপ্লবগুলো সৃষ্টি করত কঠিনতর সমস্যা। উত্তরাধিকারমূলক রাজতন্ত্রের স্থলে হঠাৎ প্রজাতন্ত্রী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দেয়, কারণ নতুন সংবিধান সম্পর্কযুক্ত হয় না জনগণের মানসিক অভ্যাসের সঙ্গে। সংবিধান ব্যক্তির স্বার্থের অনুকূল হলেই এর প্রতি সম্মান প্রদর্শিত হয়। উচ্চাভিলাষী ব্যক্তিরা একনায়ক হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অকৃতকার্য থাকার পর পরিত্যাগ করে সে চেষ্টা। একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে টিকে না থাকলে প্রজাতন্ত্রী সংবিধান ব্যর্থ হয় জনগণের চিন্তা-চেতনার উপর প্রভাব অর্জনে। অথচ স্থিতিশীলতার জন্য তা-ই ছিল জরুরি। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা যায় নতুন প্রজাতন্ত্রের দৃষ্টান্ত হিসেবে, যা সূচনা থেকেই রয়েছে স্থিতিশীল।

ব্যক্তি মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতার উপর সমাজবাদ ও সাম্যবাদের আক্রমণ হচ্ছে আমাদের সময়ের প্রধান বৈপ্লবিক আন্দোলন। আমরা এ ধরনের আন্দোলনের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আশা করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ উপস্থাপন করা যায় খ্রিস্টবাদের উত্থানের সময় প্রটেস্ট্যান্টবাদ ও রাজনৈতিক গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো। আমি পরবর্তী পর্যায়ে আরও আলোচনা করব।

০৬. নগ্ন ক্ষমতা

প্রথাগত ক্ষমতার সহায়ক বিশ্বাস ও অভ্যাস হ্রাস পেলে ক্রমে নতুন বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল ক্ষমতা অথবা প্রজাদের সম্মতির পরোয়া করে না–এ ধলনের নগ্ন ক্ষমতার পথ সুগম হয়। এর পর্যায়ভুক্ত হলো মেষের উপর কসাইয়ের, পরাভূত জাতির প্রতি আক্রমণকারী সেনাবাহিনীর এবং বন্দি ষড়যন্ত্রকারীর উপর পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগ। ক্যাথলিকদের উপর ক্যাথলিক চার্চের ক্ষমতা ঐতিহ্যগত; কিন্তু নগ্ন এর ক্ষমতা অত্যাচারিত মতাবলম্বীদের উপর। সাধারণ তিনটি পর্যায় অতিক্রম কের দীর্ঘদিনব্যাপী ক্ষমতাসীন সংগঠন। প্রথমটি বিজয়ের পথে অতি-উৎসাহের, কিন্তু প্রথাগত বিশ্বাসের নয়; পরে নতুন ক্ষমতার প্রতি সাধারণ সম্মতির যা শিগগিরই প্রথাগত হয়ে পড়ে; অবশেষে প্রথা অগ্রাহ্যকারী লোকের উপর ক্ষমতার ব্যবহার, যা আবারও নগ্ন ক্ষমতায় পর্যবসিত হয়। সংগঠনের বৈশিষ্ট্যগুলোর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এই পর্যায়গুলো অতিক্রমকালে।

এশিয়া ও আফ্রিকার খ্রিস্টান দেশগুলো প্রায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও নতুন শাসকদের (মুসলমান) বশ্যতা স্বীকার করে নেয় বিজিত হওয়ার পর। ওয়েলস কালক্রমে ইংরেজদের শাসন মেনে নেয়, যদিও আয়ারল্যান্ড তা করেনি। আলবিজেন বিরুদ্ধবাদীদের সামরিক শক্তি দ্বারা দমন করা হলে তাদের নতুন প্রজন্ম ভেতরে ও বাইরে চার্চের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়। ইংল্যান্ডে এক রাজকীয় পরিবারের জন্ম দেয় নরমেন বিজয়। পরে এমন মনে করা হতো যে তাদের স্বর্গীয় অধিকার প্রতিষ্ঠিত সিংহাসনে। মনোগত বিজয়ের ফলে শুধু সামরিক বিজয় স্থিতিশীল হয়। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে তা ঘটেছে সেগুলো সংখ্যার দিক দিয়ে অনেক।

দুটো ভিন্ন পরিবেশের জন্ম দেয় বিদেশি শক্তির কাছে পরাজয়ের পর বশ্যতা স্বীকার করেনি এমন সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ সরকার ব্যবস্থার নগ্ন ক্ষমতা। প্রথমত, দুই বা ততোধিক ধর্মমতের অতি-উৎসাহী বিশ্বাসীরা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় প্রভুত্ব অর্জনের জন্য। দ্বিতীয়ত, প্রথাগত বিশ্বাস স্থলবর্তী বিশ্বাস ছাড়া লোপ পেয়ে থাকে যেখানে ব্যক্তিগত অভিলাষ সীমাহীন। প্রথমোক্তটি বিশুদ্ধ নয়, কারণ শক্তিশালী ধর্মমতের অনুসারীরা অনুগত হয় নগ্ন ক্ষমতার। আমি পরবর্তী অধ্যায়ে বিপ্লবী ক্ষমতা শিরোনামে তা আলোচনা করব। এখনকার আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে শুধু দ্বিতীয় বিষয়ের উপর।

নগ্ন ক্ষমতার সংজ্ঞা মনোগত। একটি সরকার নগ্ন হতে পারে কিছু সংখ্যক প্রজার সাপেক্ষে, কিন্তু অন্যদের সাপেক্ষে নয়। বিদেশি আক্রমণ ছাড়া গ্রিকদের নিষ্ঠুর শাসনের শেষ অধ্যায় এবং রেনেসাঁ ইতালির কয়েকটি প্রদেশ হচ্ছে আমার জানা মতে এর সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টান্ত।

রাজনৈতিক ক্ষমতার ছাত্রদের গ্রিক ইতিহাস পরীক্ষাগারের মতো ছোট ছোট পরীক্ষা উপহার দেয়। হোমারের যুগে বংশগত রাজতন্ত্র ইতিহাস যুগের আগেই লুপ্ত হয় এবং এর স্থলে জন্মলাভ করে বংশানুক্রমিক অভিজাততন্ত্র। অভিজাত ও অত্যাচারিতদের ভেতর সংঘঠিত সংঘর্ষের ইতিহাস হলো গ্রিক শহরগুলোর ইতিহাস। স্পার্টা ছাড়া সর্বত্রই একবার অত্যাচারী বিজয়ী হয়, কিন্তু পরে এর স্থলাভিষিক্ত হয় গণতন্ত্র অথবা অল্প লোকের শাসনের রূপে আভিজাত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। খ্রিঃ পূঃ সপ্তম ও ষষ্ঠ শতাব্দীর অধিকাংশ সময়ব্যাপী ছিল নিষ্ঠুরতার এই প্রথম যুগ। কিন্তু পরবর্তী যে যুগ সম্বন্ধে আমি আলোচনা করতে চাই তা নগ্ন ক্ষমতার যুগ ছিল না। কিন্তু এ সত্ত্বেও তা পথ তৈরি করে দেয় পরবর্তী সময়ের আইনহীনতা ও অবমাননাকর পরিস্থিতির।

অত্যাচারী শব্দটি মূলত শাসকের কোনো খারাপ বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত বহন করত না, বরং তা বুঝাত শুধু আইনগত ও প্রথাগত গুণাগুণের অনুপস্থিতি। প্রাচীনকালে অনেক অত্যাচারীই বিজ্ঞের মতো শাসন করে গেছেন। অধিকাংশ প্রজার সম্মতি নিয়েই তারা শাসন করেছেন। সাধারণত তাদের অভিজাত শ্রেণি ছিল অপশম্য শত্রু। প্রাচীন অত্যাচারীদের ভেতর অধিকাংশই ছিলেন বিত্তবান। অর্থের বিনিময়ে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করে নিত এবং তা বজায় রাখার জন্য সামরিক ক্ষমতার চেয়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতার উপর বেশি নির্ভর করত। তাদেরকে আমাদের যুগের স্বেচ্ছাচারীদের পরিবর্তে মধ্যযুগের স্বেচ্ছাচারীদের সাথে তুলনা করা যায়।

মুদ্রার প্রচলন শুরু হয় অত্যাচারীদের প্রথম যুগেই। ঋণ ও কাগজি মুদ্রা যেমন আজকাল ধনীদের ক্ষমতা বৃদ্ধির উপর প্রভাব রাখে, তখনকার দিনে তা তেমনই প্রভাব রাখত। উল্লেখ আছে যে, মুদ্রার প্রচলন সম্পর্কযুক্ত ছিল অত্যাচারী শাসকের উত্থানের সাথে। কিন্তু তা কতটুকু সত্য তা বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। তবে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, রৌপ্য খনির মালিকানা একটি লোকের অত্যাচারী শাসক হওয়ার পক্ষে সহায়ক ছিল। ইউরোপের নিয়ন্ত্রণাধীন আফ্রিকার অঞ্চলগুলোতে যেমন দেখা গেছে, নতুন অবস্থায় মুদ্রার ব্যবহার প্রাচীন প্রথাগুলোর ক্ষতিসাধন করে। খ্রিঃ পূঃ সপ্তম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্যবসায়ীদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং আঞ্চলিক অভিজাত শ্রেণির ক্ষমতা হ্রাস পায়। পারসিকরা এশিয়া মাইনরের অধিকার লাভ করা পর্যন্ত যুদ্ধবিগ্রহ কম ছিল গ্রিসীয় বিশ্বে এবং এগুলো ছিল গুরুত্বহীন। উৎপাদনের উদ্দেশ্যে কম কাজই দাসদের দ্বারা সম্পন্ন। হতো। এই অবস্থানগুলো অর্থনৈতিক ক্ষমতার জন্য আদর্শস্বরূপ ছিল এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের মতো তা প্রথাগুলোর প্রভাব দুর্বল করেছিল।

প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষে উন্নতি লাভ করা যতদিন পর্যন্ত সম্ভব ছিল প্রথাশক্তি হ্রাসের পরিণতি ভালো বই মন্দ ছিল না। এর ফলে বিগত চার শতাব্দী ছাড়া অন্য সব সময় গ্রিক সভ্যতা লাভ করে দ্রুত অগ্রগতি। গ্রিক শিল্প, বিজ্ঞান ও দর্শনের স্বাধীনতা ছিল কুসংস্কার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমন উন্নত যুগের অবদান। কিন্তু দুর্ভাগ্য, রোধ করার মতো সমাজের গঠনশৈলী তত উন্নত ছিল না। অভাব ছিল সমাজে ধ্বংসাত্মক অপরাধ এড়ানোর উপযোগী প্রয়োজনীয় নৈতিকতা বোধের। কোনো সদ্গুণ দ্বারা সফলতা অর্জন করা ওই সময় সম্ভব ছিল না। দীর্ঘদিন যুদ্ধের ফলে স্বাধীনচেতা মানুষের সংখ্যা হ্রাস পেল এবং ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেল দাস-দাসীর সংখ্যা। ফলে খোদ গ্রিসই মেসিডোনিয়ার অঙ্গরাজ্যে পরিণত হলো। ক্রমবর্ধমান হিংসাত্মক বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ এবং অত্যাচার সত্ত্বেও গ্রিসীয় সিসিলি প্রথমে কার্তেজ ও পরে রোমের বিরুদ্ধে সংগ্রামে রত ছিল। এ উভয় কারণে সাইরেকিউসের অত্যাচারী শাসন আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। প্রথমত আমাদের কাছে নগ্ন ক্ষমতার একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টান্ত। দ্বিতীয়ত, বৃদ্ধ ডায়ানোসিয়াসের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত এবং তা প্রভাবিত করতে পেরেছিল যুবকদের জন্য সমাজ গঠনের চেষ্টায় রত প্লেটোকে। পরবর্তী সব যুগের গ্রিক অত্যাচারীদের দৃষ্টিভঙ্গি অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয় বৃদ্ধ ডায়ানোসিয়াস ও সাইরেকিউসের কুশাসনে নিযুক্ত তার উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে দুর্ভাগ্যজনক যোগাযোগের মাধ্যমে।

গ্রেট প্রতারণামূলক সংগঠন সম্পর্কে বলেন, বল প্রয়োগকারী সংগঠনগুলোর সূচনালগ্নে জনসাধারণকে প্রতারণাপূর্বক বশ্যতা স্বীকার করানো হতো এর মাধ্যমে। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন বশ্যতা স্বীকার করানো হতো যা ছিল গ্রিক শক্তি প্রয়োগকারীদের ব্যবসায়িক পুঁজি। প্রাচীন অত্যাচারী শাসন জনগণের সমর্থন ছাড়া কতটুকু টিকে ছিল তা সন্দেহজনক। কিন্তু সামরিক বৈশিষ্ট্যের চেয়ে অধিকতর বৈশিষ্ট্যমন্ডিত পরবর্তী অত্যাচারী শাসনের বেলায় তা নিশ্চিত সত্য। গ্রেটের বর্ণনা দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যায় ডায়াডোরাসের উপর নির্ভরশীল ডায়ানোসিয়ামের উত্থানের মুহূর্তগুলো সম্পর্কে। সাইরেকিউস পরাজয়ের গ্লানি স্বীকার করতে বাধ্য হলো কমবেশি গণতান্ত্রিক শাসন বর্তমান থাকা সত্ত্বেও। পরাজিত জেনারেলদের শাস্তি দাবি করলেন মহাযুদ্ধে বিজয়ীদের নেতা ডায়ানোসিয়াস।

শান্ত ও অশান্ত পরিবেশের ভেতর বিরাজমান সাইরেকিউস সভায় ডায়ানোসিয়াসই একমাত্র প্রথম ব্যক্তি, যিনি তাদেরকে সম্বোধন করে কিছু বলছেন। তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও তাদের মেজাজের উপযোগী প্রাসঙ্গিক বিষয়ের উপর। তিনি তীব্র সমালোচনা করেন কার্তেজদের হাতে সাইরেকিউসের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ব্যাপারে জেনারেলদের বিশ্বাসঘাতকতা ও এগ্রিজেন্টাম ধ্বংস এবং সেই সঙ্গে চতুপার্শ্বস্থ প্রত্যেকটি ব্যক্তির আসন্ন বিপদের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের। তিনি শুধু রুক্ষভাবে পূর্ণতার সঙ্গে তাদের প্রকৃত ও অভিযোগে আনীত দুষ্কর্মের কথাই তুলে ধরেননি, তার প্রচণ্ড হিংস্রতা সব সঙ্গত বিতর্কের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। অধুনা তিনি বেআইনিভাবে মৃত্যুদন্ড দিতে মনস্থ করেন এগ্রিজেন্টামে গঠিত জেনারেলদের। ওখানে বিশ্বাসঘাতকতা বসে আছে। আইনানুগ বিচারের অপেক্ষা করো না, বরং সহসা তাদের উপর হস্ত চালনা করো এবং সংক্ষিপ্ত বিচারের ক্রিয়া প্রয়োগ করো। আইন ও পার্লামেন্টারি আদর্শের পরিপন্থি এমন বর্বরোচিত প্রেরণাদান। আইনানুগ ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটরা ডায়নোসিয়াসকে একজন শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী। হিসেবে অভিযুক্ত করে তার জরিমানা করেন। কিন্তু সমর্থকরা তার সমর্থনে উচ্ছ্বসিত ছিল। শুধু ফিলিস্টাস ঘটনাস্থলে তার জরিমানা অর্থই প্রদান করেননি, বরং তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, তিনি সারাদিন এ ধরনের সম্ভাব্য জরিমানার অর্থ প্রদান করে যাবেন। তিনি এভাবে ডায়নোসিয়াসকে প্রয়োগ করে যেতে বলেন তার ভাষা। যা বেআইনি হিসেবে শুরু হয়েছিল এখন তা খোলাখুলিভাবে আইন অমান্য করার প্রবণতায় পর্যবসিত হলো। ম্যাজিস্ট্রেটদের কর্তৃত্ব এতই নিষ্প্রভ এবং তাদের বিরুদ্ধে হট্টগোল এতই তীব্র ছিল যে, বক্তাকে শাস্তি প্রদান করা তো দূরের কথা, তাকে দমিয়ে রাখাও ছিল তাদের ক্ষমতার বাইরে। আরও উচ্চকণ্ঠে ডায়নোসিয়াস তার ভাষা প্রয়োগ করে চললেন। তিনি শুধু এগ্রিজেন্টামে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য জেনারেলদের অভিযুক্ত করেননি, বরং নিন্দা করেন সম্পদশালী ব্যক্তিদেরও, কারণ অলিগার্কদের মতো তারা জনসাধারণের উপর অত্যাচারী শাসন বজায় রাখত এবং হেয় প্রতিপন্ন করত অনেককেই। তাছাড়া তাদের স্বার্থ হাসিল করত শহরের দুর্ভাগ্য থেকে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের লোককে কর্তৃত্বে না বসালে সাইরেকিউসকে রক্ষা করা যাবে না। সম্পদের ভিত্তিতে তাদের নির্বাচিত করা যাবে না, বরং জন্মগতভাবে নীচ এবং নিজেদের দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন থাকায় যারা আচরণে বিনয়ী ও মার্জিত তাদেরকে নির্বাচিত করতে হবে।

তিনি এর জন্যেই হতে পেরেছিলেন অত্যাচারী। তিনি পরিমাণসূচক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন গরিব ও নীচদের সঙ্গে। এ কথা সত্য যে, তিনি ধনীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন, কিন্তু তা বিতরণ করে দেন তার দেহরক্ষীদের। তার জনপ্রিয়তা শিগগিরই হ্রাস পেল, কিন্তু অক্ষুণ্ণ থেকে গেল ক্ষমতা। গ্রেটের বর্ণনায় পরবর্তী কয়েক পৃষ্ঠাব্যাপী আমরা দেখতে পাব :

আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এ ধরনের অনুভূতি এতই অধিক ছিল যে, তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল সাইরেকিউবাসীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই এবং তা নির্ভরশীল ছিল একমাত্র নগ্ন ক্ষমতার উপর। সম্ভবত অন্য যে কোনো স্বেচ্ছাচারীর চেয়ে অধিকতর সতর্ক অবস্থায় থাকতেন তিনি।

এজন্য গ্রিক ইতিহাস বৈশিষ্ট্যমন্ডিত যে, স্পার্টা ছাড়া গ্রিসের সর্বত্রই ঐতিহ্যগত প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে। তার ওপর প্রায় নীতিবিবর্জিত ছিল রাজনীতি। হেরোডেটাসের বর্ণনা পাওয়া যায় যে, কোনো স্পার্টাবাসী ঘুষ প্রতিরোধ করতে পারত না। অর্থহীন ছিল গ্রিসব্যাপী রাজনীতিকদের পারস্য রাজের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণে আপত্তি। কারণ প্রতিপক্ষ যথেষ্ট ক্ষমতাবান হলেও তিনি তাই করতেন। ফলস্বরূপ সার্বজনীন লড়াই শুরু হয়ে যায় ব্যক্তিগত ক্ষমতা লাভের জন্যে। পাপ, রাজপথ যুদ্ধ ও হত্যা বিরাজ করছিল এর পেছনে। এ ব্যাপারে অগ্রগামী ছিল সক্রেটিস ও প্লেটোর শিষ্যরা। বিদেশি শক্তির অধীনস্থ হওয়াই ছিল এর পরিণতি যার পূর্বাভাস অনুভূত হয় আগেই।

গ্রিসের স্বাধীনতাহানির জন্য বিলাপ করা এবং গ্রিকদের জ্ঞানী ও সক্রেটেসীয় ভাবাটা ছিল প্রথাগত। গ্রিসীয় সিসিলির ইতিহাসে দৃষ্ট রোমের বিজয়ে পরিতাপ করার কারণ কত ক্ষীণ ছিল। আমার জানা নেই এগথোসলের জীবনধারার চেয়ে নগ্ন ক্ষমতার ভালো দৃষ্টান্ত। আলেকজান্ডারের সমসাময়িক ছিলেন এগথোসল। তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৩৬১ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৮৯ অব্দ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন এবং তিনি তার জীবনের শেষ আটশ বছর সাইরেকিউসের একজন অত্যাচারী ছিলেন।

শুধু গ্রিক শহরগুলোর মধ্যেই সাইরেকিউস সবচেয়ে বড় ছিল না, সম্ভবত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যেও বড় ছিল। একমাত্র প্রতিপক্ষ ছিল কার্তেজ, যার সঙ্গে যুদ্ধে উভয় পক্ষের শোচনীয় পরাজয়ের পর অল্পকাল বিরতি ছাড়া সব সময় যুদ্ধ চলছিল। সিসিলির অন্যান্য শহর দলীয় রাজনীতির পালাবদল অনুযায়ী পক্ষ অবলম্বন করে কখনও সাইরেকিউসের আবার কখনও কার্তেজের। প্রত্যেক শহরেই ধনীরা অলিগার্কি এবং গরিব জনসাধারণ গণতন্ত্র সমর্থন করত। গণতন্ত্রের অনুগামীরা জয় লাভ করলে এর নেতারা হয়ে যেত অত্যাচারী। পরাজিত দলের অনেকেই নির্বাসিত হতো। তাদের দল যেসব শহরে ক্ষমতাশালী সেসব শহরে তারা সেনাবাহিনীতে যোগদান করত। কিন্তু সেনাবাহিনীর অধিকাংশই ছিল বণিক দলের, যারা গ্রিসীয় ছিল না।

নীচ বংশোদ্ভূত কুমারের ছেলে ছিলেন এগথোসল। তার সৌন্দর্যের জন্য তিনি সাইরেকিউসের ডোমাস নামে এক ধনী ব্যক্তির প্রিয় হয়ে ওঠেন। মৃত্যুকালে এই ধনাঢ্য ব্যক্তি সব সম্পত্তি রেখে যান এগগোসলের জন্যে। ধনাঢ্য ব্যক্তির বিধবাকে বিয়ে করেন এগথোসল। এ কথা মনে করা হতো যে,তিনি যুদ্ধে বৈশিষ্ট্য অর্জন করার পর নিষ্ঠুর শাসক হওয়ার উচ্চাভিলাষ পোষন করতেন। তাই তিনি প্রেরিত হন নির্বাসনে। পথিমধ্যে তাকে হত্যা করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু পূর্বাভাস পেয়ে তিনি এক গরিব লোকের সঙ্গে তার পোশাক পাল্টে নেন। ফলে ভাড়াটে ঘাতক কর্তৃক নিহত হয় গরিব লোকটি। তিনি একটি সেনাবাহিনী গঠন করেন সিসিলির অভ্যন্তরে। এর ফলে সাইরেকিউসানরা ভীত হয়ে তার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। তিনি আবার প্রবেশ করেন এবং সেরেসে শপথ নেন যে, তিনি কিছু করবেন না গণতন্ত্রের পূর্ব ধারণার উপর।

সাইরেকিউস সরকার এই সময় ছিল গণতন্ত্র ও অলিগার্কির মিশ্রণ। ছয়শ লোকের একটি পরিষদ ছিল ধনী মানুষের সমন্বয়ে। এগথোসল ওইসব অলিগার্কের বিরুদ্ধে গরিবের স্বার্থ আদায়ের দায়িত্ব নিলেন। তাদের চল্লিশ জনের সঙ্গে কনফারেন্স চলাকালে তিনি তাদের উপর সৈন্যদের চড়াও হওয়ার নির্দেশ দেন। তাতে নিহত হয় চল্লিশ জনের সবাই। তিনি তাদের বিরুদ্ধে অজুহাত দেখান যে ওরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তিনি সৈন্যদের শহরের দিকে পরিচালিত করেন এবং লুণ্ঠন করার নির্দেশ দেন ছয়শ জনের সবাইকে।

যেমন ডায়াডোরাস বলেন, না তাদেরও নিরাপত্তা ছিল না যারা পালিয়ে গির্জায় ঈশ্বরের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস চূর্ণ করে দেয় মানুষের নিষ্ঠুরতা। নিজেদের দেশে এক গ্রিকের বিরুদ্ধে অন্য গ্রিকের শান্তিকালীন সময়ে এগুলো ঘটেছে, যারা পরস্পরের আত্মীয় ছিল, তাদের একের বিরুদ্ধে অন্যের। এ সময় মোটেই শ্রদ্ধাবোধ ছিল না ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণে প্রকৃতি বা লীগের নিয়ম বা ঈশ্বরের প্রতি। শুধু এমন বর্ণনা নয়, প্রত্যেক শত্রু ও মিথ্যাচারী ব্যক্তিই এসব দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তির করুণ অবস্থায় বিচলিত না হয়ে পারেন না।

দিনের বেলা গণহত্যায় লিপ্ত থাকত এগতোসলের মানুষ এবং রাতে চড়াও হতো মহিলাদের উপর। দুদিনের ধ্বংসযজ্ঞের পর এগথোসল সব বন্দিকে বের করে আনেন এবং তার বন্ধু ডায়ানোক্র্যাট ছাড়া সবাইকে হত্যা করেন। তিনি পরিষদ ডেকে অলিগার্কদের অভিযুক্ত করেন। তিনি শহরকে রাজতন্ত্রমুক্ত করে ছাড়বেন বলেন এবং নিজে ব্যক্তিগত জীবনযাপন করবেন। সুতরাং তিনি পোশাক ছেড়ে মুক্তির বেশ ধারণ করেন। কিন্তু যারা তার নিয়ন্ত্রণাধীনে থেকে লুণ্ঠন করেছিল তারা তাকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। তিনি নির্বাচিত হলেন একমাত্র জেনারেল। ঋণগ্রস্ত গরিবদের ভেতর অনেকেই এই বিপ্লবে আনন্দিত হলো। কারণ এগথোসল প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ঋণ মওকুফ ও গরিবদের ভেতর জমি বন্টনের। এরপর তিনি শান্ত ছিলেন কিছুকাল।

এগথোসল যুদ্ধের সময় সম্পদশালী এবং সাহসী কিন্তু হঠকারী ছিলেন। এমন সময় এলো যখন অনুভূত হলো যে কার্তেজদের বিজয় অবশ্যম্ভাবী, তখন কার্তেজরা সাইরেকিউস অবরোধ করল এবং পোতাশ্রয় দখল করে নিল তাদের নৌবাহিনী। এগথোসল আফ্রিকা চলে যান বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে। সেখানে তিনি জাহাজ পুড়িয়ে ফেলেন, যাতে এগুলো কার্তেজদের হাতে না পড়ে। তার অবর্তমানে বিদ্রোহ হতে পারে এই ভয়ে তিনি প্রতিভূ হিসেবে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে যান। এক সময় প্রতিনিধিত্বকারী তার ভ্রাতা কার্তেজদের বন্ধুভাবাপন্ন আট হাজার রাজপ্রতিনিধির সবাইকে নির্বাসনে পাঠান। তিনি বিস্ময়করভাবে আফ্রিকায় সফল হন। তিনি তিউনিস দখল করে নেন এবং কার্তেজ অবরোধ করেন, যেখানে সরকার ভীত হয়ে দেবতাকে শান্ত করতে বসেছিলেন। দেখা গেল যে, ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বলিদানের জন্য উপযুক্ত ছেলেমেয়েদের পিতামাতা তাদের পরিবর্তে গরিব ছেলেমেয়েদের ধরে নিতে অভ্যস্ত। তীব্রভাবে প্রতিরোধ করা হলো এই অভ্যাস। কারণ জানা গেল যে, মলক দেবতা অধিকতর সন্তুষ্ট অভিজাত ছেলেমেয়েদের বলিদানে। এই সংস্কারের পর আবার পরিবর্তিত হয় কার্তেজদের ভাগ্য।

এগথোসল সিরিনে দূত পাঠান অতিরিক্ত সাহায্যের প্রয়োজন মনে করে। অপেলার কর্তৃত্বাধীন টলেমির অধীন ছিল সিরিন আলেকজান্ডারের একজন ক্যাপ্টেন। দূতরা এমন বলতে আদিষ্ট হয়েছিল যে, অপেলার সাহায্যে কার্তেজদের ধ্বংস করা সম্ভব এবং শুধু সিসিলিতেই এগথোসল নিরাপদ হতে চেয়েছিলেন। তার কোনো অভিলাষ নেই আফ্রিকায়। তাছাড়া অপেলার অংশ থাকবে আফ্রিকায় তাদের যুক্ত বিজয়ে। অপেলা এ ধরনের কষ্টের পর মিলিত হলেন এগথোসলের সঙ্গে। অবিলম্বে এগোসল তাকে হত্যা করেন এবং সৈন্যদের বলে দেন, তাদের মৃত নেতার হত্যাকারীর অধীনে চাকরি গ্রহণ করা তাদের নিরাপত্তার একমাত্র পথ।

এরপর ইউটিকা অবরোধ করেন এগথোসল এবং অকস্মাৎ উপস্থিত হয়ে বন্দি করে ফেলেন মঠের ভেতর তিনশ লোকের সবাইকে। তিনি তাদেরকে অবরোধ কৌশলের পুরোভাগে রাখেন, যাতে ইউটিকানরা তাদের নিজেদের মানুষ ধ্বংস হবে এমন আশংকায় আক্রমণ করতে না পারে। সফল হলেও এই অভিযান অবস্থান কঠিন ছিল। আরও কঠিন এ কারণে ছিল যে, তার ছেলে আরচাগেথাচ সেনাবাহিনীর ভেতর অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। এজন্য তিনি গোপনে সিসিলিতে পলায়ন করেন। তার পলায়নে ক্রুদ্ধ হয়ে সৈন্যরা তার এক ছেলের সহায়তায় আরচাগেথাচকে হত্যা করে। এতে তিনি এত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে, সাইরেকিউসে তিনি এসব সৈন্যর আত্মীয় প্রত্যেক শিশু, মহিলা ও পুরুষকে হত্যা করেন।

কিছুদিনের জন্য সিসিলিতে তার ক্ষমতা স্বাভাবিক উত্থাপন-পতনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি এজেস্টা অধিকার করেন এবং শহরের প্রত্যেক পুরুষকে হত্যা করেন। ধনীরা সম্পদ উন্মোচন করে না দেয়া পর্যন্ত তাদের অত্যাচার করেন। যুবতী এবং শিশুদের তিনি দাস হিসেবে বিক্রি করে দেন প্রধান ভূমিতে অবস্থিত ত্রুটিতে।

বলতে আমার দুঃখ হয় যে, সুখের ছিল না তার পারিবারিক জীবন। গোপন সম্পর্ক ছিল তার এক পুত্রের সঙ্গে তার এক স্ত্রীর। তার দুই নাতি অপর এক নাতিকে হত্যা করে এবং পরে এক পুরনো ভৃত্যকে উদ্বুদ্ধ করে দাঁতের খড়গে বিষ প্রয়োগে। এগথোসল যখন দেখলেন যে তিনি নিশ্চিত মারা যাবেন তখন তিনি সিন্টে সভা ডাকলেন এবং দাবি করলেন নাতির উপর হত্যার প্রতিশোধ। কিন্তু বিষক্রিয়ায় তার মাড়ি এত ক্ষত হয়েছিল যে তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। নাগরিকরা উঠে পড়ল। মৃত্যুর আগে তড়িঘড়ি চিতায় চলে গেলেন তিনি। তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হলো এবং বলা হলো যে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে গণতন্ত্র।

প্রাচীন গ্রিসের অনুরূপ রেনেসাঁ ইতালির ঘটনাবলি, কিন্তু আরও ঘনীভূত ছিল সন্দেহ। অলিগার্কিক বাণিজ্যিক প্রজাতন্ত্র, অত্যাচারী শাসন ও প্রাচীন আদর্শ অনুসরণে সমাজতান্ত্রিক রাজ্যশাসন এবং আরও ছিল চার্চ। পোপ ইতালি ছাড়া সব জায়গাতেই সম্মানী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হতেন, কিন্তু তার পুত্র সম্মানিত এ ধরনের বিবেচনা করা হতো না। বর্গীয় ক্ষমতার উপর নির্ভর করতেন সিজার।

শুধু নিজের বর্ণনামতেই নয়, বরং সিজার বর্গীয় ও তার পিতা ষষ্ঠ আলেকজান্ডার গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন মেকিয়াভেলিকে অনুপ্রাণিত করার জন্যে। ওই যুগের বর্ণনায় তাদের একটি ঘটনা ক্রেইটনের মন্তব্য সহকারে সহায়তা করবে। শতাব্দীব্যাপী পোপের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল কলোনা এবং অরসিনি। ইতিমধ্যে অরসিনি টিকে থাকলেও কলোনার ঘটেছিল পতন। ষষ্ঠ আলেকজান্ডার তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন এবং সিজার বিশ্বাসঘাতকতাপূর্বক দুটি গুরুত্বপূর্ণ অরসিনি দখল করেছেন শুনে তিনি তাদের প্রধান কার্ডিনাল অরসিনিকে ভেটিকানে আমন্ত্রণ করেন। কার্ডিনাল অরসিনি পোপের কাছে আসা মাত্রই বন্দি হলেন। তাকে খাদ্য সরবরাহ করার জন্য তার মা পোপকে দুহাজার ডুকাট প্রদান করেন এবং পোপকে লোভনীয় মুল্যবান পার্ল দান করেন তার স্ত্রী। তা সত্ত্বেও কার্ডিনাল অরসিনি কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। কথিত আছে যে, ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের আদেশে তাকে বিষাক্ত মদ সরবরাহ করা হয়। এই ঘটনায় এ যুগের নগ্ন ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে ক্রেইটনের মন্তব্যেই।

এমন বিশ্বাসঘাতকাপূর্ণ কাজে আশ্চর্যজনকভাবে কোনোরূপ আপত্তি থাকার কথা ছিল না এবং সফল হওয়ার কথা ছিল পরিপূর্ণভাবে। কিন্তু ইতালির কৃত্রিম রাজনীতিতে সবকিছু নির্ভর করত খেলোয়াড়ের দক্ষতার উপর। কনডেটরি শুধু তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করে এবং যে কোনো উপায়ে তাদের বিতাড়িত করার পর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি। অরসিনি ওভিটেলজদের পরাজয়ের পর কোনো দল বা স্বার্থ অবশিষ্ট ছিল না, যার ক্ষতিসাধন করা যেত। জেনারেলদের অনুগত থাকাকালীন কনডেটরির সৈন্যরা দুর্দমনীয় ছিল। যখন জেনারেলরা অপসারিত হলেন তখন সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে অন্য কাজে ঢুকে পড়ল। এবং….অনেকেই এ ব্যাপারে সিজারের দুশ্চিন্তাহীন শান্ত মেজাজের প্রশংসা করেন … প্রচলিত নৈতিকতায় কোনো প্রকার ক্ষতি সাধন করা হলো না। …. মেকিয়াভেলির প্রতি সিজারের মন্তব্য যথেষ্ট মনে করে গ্রহণ করেছে ইতালির অধিকাংশ মানুষই : যারা নিজেদের পটু প্রতারক হিসেবে প্রদর্শন করে তাদের প্রতারণা করাই শ্রেয়। সফলতার দ্বারাই সিজারের আচরণ বিচার্য।

প্রাচীন গ্রিসের মতোই রেনেসাঁ ইতালিতে সংমিশ্রণ ঘটেছিল উচ্চতর সভ্যতার সঙ্গে নিম্নতর নৈতিকতার। উভয় যুগেই প্রদর্শিত হয় শীর্ষস্থানীয় প্রতিভা ও সর্বনিম্ন নীতিহীনতা। কোনোরূপ শত্রুতা ছিল না প্রতিভাধর ও নীতিবিবর্জিত ব্যক্তিদের মধ্যে। সিজার বর্গীয়ার জন্য দুর্গ তৈরি করেছিলেন লিওনাদ। সক্রেটিসের কিছু ছাত্র ত্রিশ অত্যাচারীর ভেতর সবচেয়ে খারাপ ছিল। প্লেটোর ছাত্ররা সাইরেকিউসে লজ্জাজনক কাজে যুক্ত ছিল এবং এরিস্টটল বিয়ে করেছিলেন এক অত্যাচারীর ভগিনীকে। উভয় যুগেই শিল্পের চর্চা হয় এবং পরে দেড়শ বছরব্যাপী সাহিত্য ও হত্যা পাশাপাশি উৎকর্ষ লাভ করে। উত্তর পশ্চিমের কম সভ্য অথচ অধিক সঙ্গতিপূর্ণ জাতীয়তার দ্বারা সব নিঃশেষ হয়ে যায়। রাজনৈতিক স্বাধীনতা লুপ্ত হওয়ার সাথে উভয় ক্ষেত্রেই শুধু সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ই জড়িত ছিল না, বরং জড়িত ছিল বাণিজ্যিক প্রভুত্বের অবলুপ্তি ও সর্বনাশা দারিদ্র্যও।

নগ্ন ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। সাধারণত এগুলো বিলুপ্ত হয় তিনটির যে কোনো একটি পন্থায়। প্রথমত বিদেশিদের বিজয়ের মাধ্যমে; গ্রিস ও ইতালির ঘটনাবলি, দ্বিতীয়ত একটি স্থিতিশীল একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, যা প্রথাগত হয়ে পড়ে শিগগিরই। মেরিয়াস থেকে এন্তনির পরাজয় পর্যন্ত স্থায়ী গৃহযুদ্ধের পর অগাস্টাসের সাম্রাজ্য হচ্ছে এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তৃতীয়ত হচ্ছে একটি ধর্মের উত্থান। এর স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে, যে পন্থায় মোহাম্মদ (সাঃ) পূর্ববর্তী বিবদমান আরব সম্প্রদায়গুলোকে একত্রিত করেছিলেন। রাশিয়ায় রফতানিযোগ্য খাদ্য পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মহাযুদ্ধের পর ইউরোপব্যাপী কমিউনিজম গ্রহণের মাধ্যমে নগ্ন ক্ষমতার রাজত্ব শেষ হয়ে যেত।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেই নয় শুধু, বরং সরকার পরিচালনায় একটি রাষ্ট্রের যেখানে নগ্ন ক্ষমতা বিরাজমান, সেখানে ক্ষমতা অর্জন অন্য যে কোনো জায়গার চেয়ে নিষ্ঠুর। মেকিয়াভেলি এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ নেয়া যেতে পারে ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের মৃত্যুর সময় সিজার বর্গীয়ার প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার প্রশংসাসূচক বর্ণনা।

তিনি কাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন চারটি পন্থায়। প্রথমত, তাদের দ্বারা লুণ্ঠিত প্রভুদের পরিবারবর্গেল শোষণের মাধ্যমে যাতে পোপের কাছ থেকে এ যুক্তি নেয়া যায়। দ্বিতীয়ত, রোমের ভদ্রলোকদের সমর্থন আদায় করে তাতে তাদের সাহায্য নিয়ে পোপকে দমন করা যায়। তৃতীয়ত, কলেজকে নিজের সুবিধায় এনে। চতুর্থত, পোপের মৃত্যুর আগে প্রভূত ক্ষমতা অর্জন করে যাতে তিনি ক্ষমতাবলে প্রথমত আঘাত রোধ করতে পারেন-এ চারটির তিনটি তিনি পূর্ণ করেন আলেকজান্ডারের মৃত্যুর আগে। কারণ তিনি হত্যা করেছিলেন তার নাগালের ভেতর বেদখলকৃত জমিদারদের। পালাতে সক্ষম হয়েছিল শুধু অল্প কয়েকজন।

যে কোনো সময় অনুসরণ করা যায় দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পন্থা। কিন্তু প্রথমটি জনমতকে ব্যথিত করে প্রতিষ্ঠিত সরকার থাকাকালীন। একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার বিরোধী নেতাকে হত্যা করে নিজের অবস্থান সংহত করতে পারবেন না। কিন্তু যেখানে নগ্ন ক্ষমতা বিদ্যমান সেখানে নিষ্ক্রিয় এ রকম নৈতিক বাধা।

জনসাধারণ যখন কোনো ক্ষমতার প্রতি ক্ষমতার কারণেই শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তখন তা-ই নগ্ন ক্ষমতায় পরিণত হয়। এভাবে চলে আসা ঐতিহ্যগত ক্ষমতার ঐতিহ্য গ্রহণযোগ্য না হলে তা নগ্ন ক্ষমতায় পরিণত হয়। এভাবে নগ্ন ক্ষমতায় পরিণত হয় যুক্ত চিন্তা ও তীব্র সমালোচনা। গ্রিস ও রেনেসাঁ ইতালিতে তা ঘটে থাকে। প্লেটো নগ্ন ক্ষমতার যথাযথ উপস্থাপন করেন রিপাবলিকের প্রথম বইয়ে। থ্রাসিমেকাস ন্যায়-নীতিগত সংজ্ঞা প্রদানের চেষ্টায়রত সক্রেটিসের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে বলেছেন, আমার মতে ন্যায়ের অর্থ হচ্ছে শক্তিমানের স্বার্থ রক্ষা করা।

প্রত্যেক সরকারই আইন রচনা করে তার স্বার্থ রক্ষার্থে। গণতান্ত্রিক আইন রচনা করে একটি গণতান্ত্রিক সরকার। একটি স্বৈরশাসক স্বৈরতান্ত্রিক আইন রচনা করে। অন্যান্য আইনও অনুরূপভাবেই রচিত হয়। এই পদ্ধতি অনুসারে এখনকার সরকারগুলো ঘোষণা করেছে যে, তাদের স্বার্থই প্রজাদের স্বার্থ এবং যে-ই তা থেকে বিচ্যুত হয় সে-ই অবৈধ বা অন্যায় আচরণের জন্য অভিযুক্ত হয়ে বেত্রাঘাতপ্রাপ্ত হয়। সুতরাং হে মহাশয়, আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে, প্রত্যেক শহরে প্রতিষ্ঠিত সরকারের স্বার্থ রক্ষাই ন্যায়। আমি মনে করি উন্নত যুক্তি পাওয়া যাবে সরকারের পক্ষে। সুতরাং সঠিক যুক্তির সিদ্ধান্ত একই জিনিস যে, সর্বত্র শক্তিমানের স্বার্থ রক্ষাই ন্যায়।

সাধারণভাবে যখন এমন দৃষ্টিভঙ্গি গৃহীত হয় তখন শাসক তার নৈতিক বিপত্তির অধীনে থাকে না। কারণ শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য তারা যা কিছু করে তাতে অত্যাচারিত ছাড়া কেউই ব্যথিত হয় না। বিদ্রোহীদের দমনে উৎসাহ যোগায় শুধু অকৃতকার্য হওয়ার ভয়ই। নির্মম উপায়ে সফলতার সম্ভাবনা থাকলে তাদের ভয় করার প্রয়োজন নেই যে, এই নির্মমতাই তাদের অপ্রিয় করে তোলে।

থ্রাসিমেকাসের মতবাদ যেখানে সাধারণভাবে গৃহীত হয়, সেখানে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল সরকারের ইচ্ছাধীন শক্তির উপর। এভাবে তা অপরিহার্য করে তোলে সামরিক শাসন। সমাজে বিরাজমান বিশ্বাস যদি বিদ্যমান ক্ষমতা বন্টনের প্রতি জনমনে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করে তবেই সেখানকার সরকার স্থিতিশীলতা পেতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে সব বিশ্বাস স্বাভাবিকভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনার মুখে টিকে থাকতে পারে না। সাধারণের সম্পত্তিসহ বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল রাজকীয় পরিবার, অভিজাত ব্যক্তিবর্গ, ধনিকশ্রেণি, স্ত্রীলোকদের বিপরীতে পুরুষদের এবং অন্যান্য জাতির বিপরীতে শ্বেতকায় জাতির মানুষের হাতে। কিন্তু এ জাতীয় সীমাবদ্ধতা বুদ্ধিবৃত্তি প্রসারের ফলে অগ্রাহ্য করা হয়ে থাকে এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা হয় ক্ষমতা ছেড়ে দেন নতুবা বাধ্য হন নগ্ন ক্ষমতার উপর নির্ভর করতে। সাধারণের সম্পত্তি লাভের জন্য সুশৃঙ্খলভাবে সরকারকে অবশ্যই যুক্তি-পরামর্শের একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে, যাতে মানবজাতির অধিকাংশ লোকই একমত হতে পারে গ্রাসিমেকাসের মতবাদ ছাড়া অন্য মতবাদের উপর।

পরবর্তী অধ্যায় পর্যন্ত আমি মূলতবি রাখব সরকার গঠনের জন্য সাধারণের সম্মতি আদায় সংক্রান্ত কুসংস্কার ছাড়া অন্যান্য পন্থার আলোচনা। কিন্তু এ পর্যায়ে কিছু প্রাথমিক মন্তব্য যথাযথ হবে। প্রথমত, সমস্যা সমাধানের অযোগ্য নয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে তা সমাধান করা হয়েছে। (ব্রিটেনে তা সমাধান করা হয়েছে বলা মুশকিল, কারণ ব্রিটিশ স্থিতিশীলতায় রাজসিংহাসনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন একটি অপরিহার্য উপাদান।) দ্বিতীয়ত, বুঝতে হবে সুশৃঙ্খল সামজের সুবিধাদি। সাংবিধানিক উপায়ে তা তেজোদীপ্ত ব্যক্তিদের ধনী ও ক্ষমতাশীল হওয়ার সুযোগ দেবে। যে সমাজে তেজোদীপ্ত ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ শ্রেণি আশানুরূপ বৃত্তিলাভে বঞ্চিত হয়, সে সমাজের অস্থিতিশীলতায় একটি উপাদান বিদ্যমান। ফলে সে সমাজে বিদ্রোহ দেখা দেয় যে কোনো সময়। তৃতীয়ত, শৃঙ্খলার স্বার্থে কতক সামাজিক রীতিনীতি উদ্দেশ্য মূলকভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন; কিন্তু তা ব্যাপক বিরোধিতা সৃষ্টির মতো এত নিদারুণ অন্যায়মূলক হবে না। এ রীতি একবার সফল হলে শিগগিরই ঐতিহ্যগত হয়ে পড়ে এবং লাভ করে ঐতিহ্যগত সর্বপ্রকার শক্তি।

সামাজিক চুক্তি নামক রুশোর বইটি আধুনিক পাঠকের কাছে তত বৈপ্লবিক মনে হয় না। কিন্তু তা সরকারের কাছে কেন এত বেদনাদায়ক বোঝা মুশকিল। আমার মতে এর প্রধান কারণ হলো তা বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে গৃহীত রীতির উপর সরকারি ক্ষমতার ভিত্তি অন্বেষণ করে–তবে রাজার প্রতি কুসংস্কারমূলক শ্রদ্ধার উপর নয়। বিশ্বব্যাপী রুশোর মতবাদের প্রভাব থেকে দেখা যায় যে, সরকারের সংস্কারমুলক ভিত্তির ব্যাপারে মানুষকে একমত হতে উদ্বুদ্ধ করা কঠিন। হয়তো তা সম্ভব নয় কুসংস্কার সহসা দূরীভূত হলে। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ হিসেবে স্বেচ্ছাকৃত সহযোগিতার জন্য কিছু অনুশীলন দরকার হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে যে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু সাধারণ সমর্থন হারিয়ে ফেললে ঐতিহ্যগত শাসনের অধীন তা অসম্ভব এবং অবশ্যম্ভাবীরূপে বিপ্লবে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। সুশৃঙ্খল সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব মুক্তবুদ্ধিচর্চার সঙ্গে সুসঙ্গত হলেও তা সমাধান করতে হবে সমস্যাটি কঠিন হওয়া সত্ত্বেও।

কখনও কখনও ভুল অর্থে এ সমস্যার প্রকৃতি গৃহীত হয়ে থাকে। এ ধরনের একটি সরকার কল্পনা করা যথেষ্ট নয় যা একজন তাত্ত্বিকের কাছে বিদ্রোহাত্মক মনোভাব সৃষ্টিতে সহায়ক বলে মনে হয় না। বাস্তবে একটি সরকার গঠন করা জরুরি এবং গঠিত হলে বিপ্লব রোধকল্পে প্রয়োজনীয় আনুগত্য লাভে সমর্থ হবে। তা হচ্ছে, বাস্তব রাষ্ট্র শাসনমূলক সমস্যা এবং এতে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট জনসাধারণের সর্বপ্রকার বিশ্বাস ও পূর্ব ধারণা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এমন অনেকে বিশ্বাস করে যে, কোনো জনসমষ্টি একবার রাষ্ট্রীয় সংগঠন যন্ত্র দখল করতে পারলে প্রচারণার মাধ্যমে জনসমর্থন লাভ করতে পারবে। যা হোক, এ মতবাদের রয়েছে স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা। জাতীয় অনুভূতির বিরোধী হওয়ার জন্য অধুনা রাষ্ট্রীয় প্রচারণা ভারতে এবং (১৯২১ সালের আগে) আয়ারল্যান্ডে অচল প্রমাণিত হয়েছে। প্রবল ধর্মীয় অনুভূতির বিরোধী হওয়ার জন্য অধুনা রাষ্ট্রীয় প্রচারণা ভারতে এবং (১৯২১ সালের আগে) আয়ারল্যান্ডে অচল প্রমাণিত হয়েছে। প্রবল ধর্মীয় অনুভূতির বিরোধী হয়ে টিকে থাকা কঠিন। এখনও এ ব্যাপারটি সন্দেহজনক যে, তা কত দূর অধিকাংশ লোকের ব্যক্তিস্বার্থের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে। স্বীকার করতেই হবে যে, ক্রমাগতভাবে অধিকতর ফলপ্রসূ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রচারণা। সুতরাং সরকারের পক্ষে সহজ হচ্ছে সাধারণ মানুষের সমর্থন লাভ করা। পরবর্তী পর্যায়ে আরও পূর্ণতার সাথে আমাদের উত্থাপিত প্রশ্নগুলো আলোচিত হবে। এখন শুধু এগুলো মনে রাখা দরকার।

আমি এ পর্যন্ত আলোচনা করেছি রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্পর্ক। কিন্তু অর্থনৈতিক পরিমন্ডলে নগ্ন ক্ষমতা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কসমনে করেন ভবিষ্যতে সমাজতান্ত্রিক সম্প্রদায় ছাড়া সর্বত্রই সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরিভাবে নগ্ন ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। ঐতিহাসিক হেলভি বেনথেইজমে একদা বলেছেন যে, যে ব্যক্তি তার কাজের মূল্য যতটুকু ধারণা করে তা-ই পেয়ে থাকে। আমি নিশ্চিত এটি সত্য নয় গ্রন্থাকারদের বেলায়। আমার বেলা আমি দেখেছি যে, যে বই আমার কাছে যত বেশি মূল্যবান মনে হয়েছে তার জন্য আমাকে তত কম মূল্য দেয়া হয়েছে। যদি সফল ব্যবসায়ী প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাস করেন যে, তাদের কাজ উপার্জিত অর্থের সমমূল্যমানের তাহলে তারা অবশ্যই অনুমিত স্তর অপেক্ষাও নিম্নস্তরের মূর্খ হবেন। তা সত্ত্বেও সত্যের উপাদান রয়েছে হেলভির তত্ত্বে। একটি স্থিতিশীল সমাজে তীব্র অন্যায় অনুভূতিসম্পন্ন বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ থাকতে পারে না। সুতরাং ধরে নিতে হবে যে, যে সমাজে অসন্তুষ্টি ব্যাপক নয় সে সমাজে অধিকাংশ মানুষ মনে করে যে তারা পাইকারিভাবে বিনা বেতনে রয়েছে। যে অনুন্নত সমাজে চুক্তি নয় বরং মর্যাদার উপরই জীবিকা নির্ভর করে সে সমাজে প্রথাগত সবকিছুই তিনি ন্যায়সঙ্গত মনে করেন। কিন্তু তখনও হেলভির ফর্মুলা কার্যকারণকে উল্টিয়ে দেয়। ন্যায়সঙ্গত অনুভূতিই প্রথার কারণ, কিন্তু প্রযোজ্য নয় বিপরীতটি। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ক্ষমতা প্রথাগত যখন পুরনো প্রথাগুলো পুরোপুরি বদলে যায় শুধু তখনই তা নগ্ন ক্ষমতায় পর্যবসিত হয় অথবা, কোনো কারণে পরিণত হয়। সমালোচনায়।

মজুরি নির্ধারণের কোনো রীতি প্রচলিত ছিল না। শিল্পায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে এবং চাকরিজীবীরা সংগঠিত হয়নি তখনও। ফলে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত সীমারেখার ভেতর শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক নগ্ন হয়ে পড়ে। গোঁড়া অর্থনীতিবিদরা মনে করতেন, অদক্ষ শ্রমিকদের রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরে রাখাই যে এর কারণ তা তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন।

কিছুক্ষেত্রে তা স্পষ্ট। দস্যু কর্তৃক লুণ্ঠিত দ্রব্য অথবা বিজিত জাতির কাছ থেকে বিজয়ীদের দ্বারা দখল করা সম্পদ নগ্ন ক্ষমতার বিষয়। এভাবে দাসত্ব ও নগ্ন ক্ষমতার বিষয় দাস অভ্যাস সত্ত্বেও তা নীরবে মেনে নেয় না। মাকর্স দেখতে পান যে, প্রশ্নটি ক্ষমতা সম্পর্কিত। কিন্তু আমি মনে করি যে, তিনি গৌণ করে দেখেছেন অর্থনৈতিক ক্ষমতার সাপেক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতা। ট্রেড ইউনিয়নগুলো যথেষ্ট অবদান রাখতে পারত শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। কিন্তু কার্যত ক্ষমতা ছাড়া এগুলো অচল হয়ে পড়ে। এক রাশ আইন অচল হয়ে যেত ইংল্যান্ডে, কিন্তু তা ঘটেনি, কারণ ১৯৬৮ সালে ভোটাধিকার লাভ করে শহরে শ্রমিকরা। ট্রেড ইউনিয়ন (সংগঠন) থাকায় মজুরি আর নগ্ন ক্ষমতার দ্বারা নয় বরং পণ্য কেনা-বেচার মতো দর কষাকষির দ্বারা স্থির হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মার্কসের প্রভাব পরিলক্ষিত হওয়ার আগে নগ্ন ক্ষমতার ভূমিকা ধারণাতীতভাবে বেশি ছিল। দস্যু কর্তৃক ভাগ্যহতের কাছ থেকে জোরপূর্বক দখল করা দ্রব্য অথবা বিজিত জাতির কাছ থেকে বিজয়ী কর্তৃক সম্পদ অর্জনের মতো তা নগ্ন ক্ষমতার বিষয়। এভাবে দাসত্বের বিষয়টি, যখন দাস কর্তৃক অভ্যাস সত্ত্বেও তা নীরবে মেনে নেয় না। আদায়কারীর প্রতি ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও যদি অর্থ সংগ্রহ জরুরি হয়ে পড়ে তবে নগ্ন ক্ষমতার মাধ্যমেই তা জোরপূর্বক আদায় করা হয়। দুটো ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘৃণা বিদ্যমান : একটি হচ্ছে যেখানে অর্থ প্রদান প্রথাগত নয় এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ফলে প্রথাগত ব্যাপার অন্যায় বলে গৃহীত হয়। আগের দিনগুলোতে পুরুষরা স্ত্রীর সম্পত্তির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধিকার রাখত, কিন্তু নারী আন্দোলন এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উদ্রেক এবং পরিবর্তন ঘটায় আইনের ক্ষেত্রে। আগে শ্রমিকের দুর্ঘটনার দায়িত্ব বহন করত না মালিক। কিন্তু এখানেও পরিবর্তন ঘটেছে দৃষ্টিভঙ্গির এবং প্রবর্তিত হয়েছে এ সম্পর্কিত আইনও। এ ধরনের দৃষ্টান্ত সংখ্যায় অনেক।

একজন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক মনে করতে পারে যে মালিকের চেয়ে তার আয় কম হওয়া অন্যায়। নগ্ন ক্ষমতাই এ ধরনের ক্ষেত্রে তাকে মেনে নিতে বাধ্য করে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের পুরনো পদ্ধতি প্রথাগত এবং তাতে আপনা আপনি ঘৃণার উদ্রেক হয় না। ব্যতিক্রম শুধু তাদের ক্ষেত্রে, যারা প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে রত। সমাজতান্ত্রিক মনোভাব বৃদ্ধি পেলে পুঁজিবাদী শক্তি আরও বেশি নগ্ন হয়ে পড়ে। এ ব্যাপারটি ক্যাথলিক চার্চ এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের সম্পর্কের অনুরূপ। আমরা দেখেছি যে, নগ্ন ক্ষমতার কিছু অশুভ দিক রয়েছে সর্মথন লাভকারীর ক্ষমতার বিপরীতে : পরিণামে ভয়ের মাধ্যমে নির্মমতা প্রশমিত না হলে সমাজতান্ত্রিক মনোভাব বৃদ্ধির ফলে পুঁজিবাদী শক্তি আরও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। মার্কসীয় দর্শনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সমাজে যদি শ্রমিকই সমাজতন্ত্রী হয় এবং বাকি সবাই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারক হয় তারপরও বিজয়ী যে কোনো দল তাদের বিরোধীদের উপর নগ্ন ক্ষমতা প্রয়োগ না করে পারে না। মার্কসের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী অবস্থা বড়ই নাজুক। যে পর্যন্ত তার শিষ্যদের প্রচার সফল হয়েছে তাতে তা ঘটবেই।

মানব ইতিহাসের জঘন্য বিষয়গুলোর অধিকাংশই নগ্ন ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত-শুধু যুদ্ধের বিষয়গুলোই নয়, বরং অন্যগুলো কম দৃষ্টিগোচর হলেও সমভাবে ভয়ংকর। দাসত্ব ও দাস বেচা-কেনা, কংগোর শোষণ, প্রাথমিক শিল্পায়নের ভয়াবহতা, শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা, বিচারবিভাগীয় অনাচার অপরাধ আইন, জেল, কর্মশালা, ধর্মীয় অত্যাচার, ইহুদিদের নির্দয় চপলতা, বর্তমানে জার্মান ও রাশিয়ায় অবিশ্বাস্য রকম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অন্যায় আচরণ–এগুলো হচ্ছে অসহায়দের প্রতি নগ্ন ক্ষমতা।

এক সময় নগ্ন হতে বাধ্য ঐতিহ্যের অভ্যন্তরে প্রোথিত অনেক অন্যায় ক্ষমতা। খ্রিস্টান স্ত্রীরা অনেক শতাব্দী ধরে তাদের স্বামীদের মেনে চলত, কারণ সেন্ট পল বলেছিলেন, তা-ই করা উচিত। কিন্তু সেন্ট পলের মতবাদ সাধারণভাবে মহিলা সমাজে গৃহীত হওয়ার আগে পুরুষদের অসুবিধাগুলোর কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জেনস ও মেডিয়ার গল্পে।

ক্ষমতা থাকবে সরকার অথবা অরাজক দুঃসাহসিকদের। সমাজে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী অথবা সাধারণ অপরাধী থাকলে নগ্ন ক্ষমতা অবশ্যই থাকবে। বাধাগ্রস্ত একঘেয়ে দুঃখের চেয়ে ভালো কিছু পেতে হলে মানবজাতিকে সম্ভাব্য ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে হবে নগ্ন ক্ষমতা। আইন ও প্রথার মাধ্যমে ক্ষমতার লালন একান্ত প্রয়োজন অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রণাদানের চেয়ে ভালো কিছু পেতে হলে।

০৭. বিপ্লবী ক্ষমতা

আমরা দেখেছি যে দুটো ভিন্ন পন্থায় ভেঙে পড়তে পারে প্রথাগত পদ্ধতি। প্রথমত, এক ধরনের সন্দেহবাদের জন্ম দিতে পরে ধর্মমত ও মানসিক অভ্যাসের উপর প্রতিষ্ঠিত পুরনো যুগ। সে ক্ষেত্রে শুধু নগ্ন ক্ষমতার দ্বারা সামাজিক বন্ধন রক্ষা করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, মানুষের উপর ক্রমাগতভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে নতুন মানসিক অভ্যাস সংবলিত নতুন ধর্মমত। পরিশেষে শক্তিশালী হয়ে বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করে পুরনো অচল সরকারের স্থলে সামঞ্জস্যপূর্ণ সরকার নতুন। এ ক্ষেত্রে নতুন বিপ্লবী ক্ষমতা ভিন্ন রকম বৈশিষ্ট্য ধারণ করে প্রথাগত ক্ষমতা ও ভগ্ন ক্ষমতা থেকে। এটা সত্য যে, প্রতিষ্ঠিত নতুন পদ্ধতি শিগগিরই প্রথাগত হয়ে পড়ে বিপ্লব সফল হলে। আবার এটাও সত্য যে, সংগ্রাম কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী হলে তা নগ্ন ক্ষমতার সংগ্রামে পর্যবসিত হয়। তা সত্ত্বেও নতুন ধর্মমতে বিশ্বাসীরা মনোগত দিক দিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী দুঃসাহসিকদের চেয়ে অনেক ভিন্ন এবং তাদের কার্যকলাপ অধিক স্থায়ী হওয়ার উপযোগী এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

চারটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বিপ্লবী ক্ষমতা ব্যাখ্যা করব :

(১) প্রাথমিক খ্রিস্টবাদ, (২) সংস্কার, (৩) ফরাসি বিপ্লব, (৪) সমাজবাদ ও রুশ বিপ্লব।

১. প্রাথমিক খ্রিস্টবাদ

খ্রিস্টবাদের প্রভাব পড়ছে ক্ষমতা ও সামাজিক সংগঠনের উপর। এ জন্য আমি আলোচনা করতে চাই খ্রিস্টবাদ সম্পর্কে।

পুরোপুরিভাবে অরাজনৈতিক ছিল খ্রিস্টবাদের প্রাথমিক দিনগুলো। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা হচ্ছে আমাদের যুগে প্রাচীন প্রথার উত্তম প্রতিনিধি। এরা বিশ্বাস করেন যে, এ পৃথিবীর পরিসমাপ্তি অত্যাসন্ন। ধর্মনিরপেক্ষ কোনোরূপ অংশগ্রহণে তাদের আগ্রহ নেই। যা হোক ছোট সম্প্রদায়েই শুধু এমন মনোভাব সম্ভব। রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায় খ্রিস্টানদের সংখ্যা ও চার্চের শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে। এ ধরনের প্রত্যাশা জোরদার করেছে ডায়ক্লোসিয়ানদের নির্যাতন। খ্রিস্টবাদে দীক্ষার মনোভাব কমবেশি অস্পষ্ট। কিন্তু এ কথা স্পষ্ট যে, এগুলো ছিল রাজনৈতিক। এর অর্থ দাঁড়ায়, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ছিল চার্চ। চার্চের শিক্ষা ও রোমের প্রথাগত মতবাদের ভেতর পার্থক্য এত বেশি ছিল যে খ্রিস্টের সময়ে অনুষ্ঠিত বিপ্লব ইতিহাসে পরিগণিত হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে।

ক্ষমতা সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খ্রিস্টীয় মতবাদ হচ্ছে, মানুষকে নয়, আমাদের উচিত ঈশ্বরকে মেনে চলা। এর আগে অনুরূপ শিক্ষা ইহুদিবাদ ছাড়া অন্য কিছুতে ছিল না। এটা সত্য যে, ধর্মীয় কর্তব্য বিদ্যমান ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে ইহুদি ও খ্রিস্টান ছাড়া অন্য কোথাও এর সংঘর্ষ ঘটেনি। সম্রাটের কার্যকলাপে নীরব থাকত পৌত্তলিকরা; এমনকি তখনও, যখন তারা মনে করত যে সত্যের লেশমাত্র নেই সম্রাটের স্বর্গীয় দাবির মধ্যে। অপরদিকে খ্রিস্টানদের কাছে অধিবিদ্যাগত সত্য চরম মুহূর্তের। তারা বিশ্বাস করে, তারা যদি ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করে তবে নরকযন্ত্রণা ভোগের ঝুঁকি নিতে হবে। কম খারাপ হিসেবে এর চেয়ে অধিক পছন্দনীয় শহীদের মৃত্যু যন্ত্রণা।

খ্রিস্টানরা মানুষের চেয়ে ঈশ্বরকে মেনে চলার নীতির ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। খোদার আদেশ-নিষেধ মানুষের বিবেকের কাছে পৌঁছানো হয় সরাসরি নতুবা চার্চের মাধ্যমে। আজ পর্যন্ত ৮ম হেনরি বা হেগেল ছাড়া কেউ-ই বলেননি যে রাষ্ট্রের মাধ্যমে তা পৌঁছাতে পারে। রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেয় এভাবে খ্রিস্টীয় শিক্ষা। তত্ত্বগতভাবে প্রথমোক্তটির সাথে অরাজকতা এবং শেষোক্তটির সাথে চার্চ ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব জড়িত। কিন্তু কোনো স্পষ্ট নীতি নেই এগুলোর সীমারেখা নির্ধারণের ব্যাপারে। কোনটি সিজারের এবং কোনটি ঈশ্বরের? একজন খ্রিস্টানের পক্ষে বলা স্বাভাবিক যে, সবই ঈশ্বরের। এভাবে রাষ্ট্রের কাছে চার্চের দাবি অসহনীয় হয়ে দেখা দেয়। তত্ত্বগতভাবে কখনও মীমাংসা করা হয়নি রাষ্ট্র ও চার্চের মধ্যকার সংঘর্ষের। আজ পর্যন্ত তা চলে এসেছে শিক্ষার মতো বিষয়ে।

এটা মনে করা যেতে পারে যে রাষ্ট্র ও চার্চের ভেতর সংগতি বিধান করতে পারে কনস্টেইন্টাইনের ধর্মান্তর। প্রাথমিক খ্রিস্টান সম্রাটরা আর্যজাত ছিলেন। আর্য ও ভেন্ডালদের অনুপ্রবেশের ফলে পশ্চিমের গোড়া সম্রাটদের স্থায়িত্বকাল সংক্ষিপ্ত ছিল। ক্যাথলিক বিশ্বাসের প্রতি প্রাচ্য সম্রাটদের অধীনতা প্রশ্নাতীত হলে মিসরীয় মনোফিজাইট এবং পশ্চিম এশিয়ায় অধিকাংশই পরামর্শদাতার রূপ নিল। পবিত্র সপ্তাহে মিলানে অবস্থানের ফলে সম্রাট বুঝতে পারেন যে রোম সম্রাট তার নিজ ডমিনিয়নগুলোতে তার ধর্মের গণআচারের দাবি করবেন। তিনি আর্কবিশপের কাছে পরিমিত ও যুক্তিযুক্ত সুবিধাদি প্রদানের জন্য প্রস্তাব করেন যে, তিনি মিলান শহরে বা শহরতলিতে যেন একটি চার্চের ব্যবহার পরিত্যাগ করেন। এসব দেশের ভিন্ন মতাবলম্বীরা স্বাগত জানায় বাইজেনটাইন সরকারের চেয়ে কম অত্যাচারী হিসেবে নবীর অনুসারীদের। খ্রিস্টান রাষ্ট্রের সাপেক্ষে এসব প্রতিযোগিতায় সর্বত্রই চার্চ বিজয়ী হয়। একমাত্র নতুন ধর্ম ইসলামই চার্চের উপর প্রভুত্ব করতে দেয় রাষ্ট্রশক্তিকে।

মিলানের আর্কবিশপ সেন্ট এম্রোজ ও সম্রাজ্ঞী জাস্টিনার ভেতর ৩৮৫ সনে সংঘঠিত দ্বন্দ্বের মাধ্যমে চতুর্থ শতাব্দীর শেষভাগে অরিয়ন সাম্রাজ্য ও চার্চের মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তার ছেলে ভেলেনটিয়ান অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন এবং তিনি তার পরিবর্তে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পবিত্র সপ্তাহে মিলানে অবস্থানকালে তাকে বোঝানো হয়েছিল যে, ডমিনিয়নগুলোতে একজন রোমান সম্রাট তার ধর্মের গণপালনের দাবি করতে পারেন। তিনি আর্কবিশপের কাছে অত্যন্ত সুবিবেচনাপূর্ণ প্রস্তাব করেন যে, তিনি যেন মিলান শহর ও তার আশপাশের এলাকাগুলোতে একক চার্চের ব্যবহার বর্জন করেন। কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল এম্রোজের আচরণ। হতে পারে যে জাগতিক প্রাসাদগুলো সিজারের মালিকানাধীন; কিন্তু চার্চগুলো ঈশ্বরের ঘর এবং বিশপের এলাকাধীন প্রচারকের একমাত্র তিনিই আইনানুগ উত্তরাধিকারী। খ্রিস্ট শুধু প্রকৃত বিশ্বাসীদেরই প্রাপ্য ধর্মের জাগতিক ও ঐশ্বরিক সুবিধাদি। মানসিক দিক দিয়ে এম্রোজ সন্তুষ্ট ছিলেন কিন্তু তার ধর্মীয় মতাদর্শগুলো ছিল সত্য বিশুদ্ধতার মাপকাঠি। শয়তানের অনুসারীদের সঙ্গে আলোচনায় অস্বীকৃতি জানালেন আর্কবিশপ এবং সাবলীলতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করলেন যে, শহীদের মৃত্যু অধার্মিকতার কাছে বশ্যতা স্বীকার করার চেয়ে শ্রেয়।

শিগগিরই দেখা গেল শহীদ হতে ভয় করার তার কোনো কারণই ছিল না। তাকে যখন পরিষদের সামনে ডাকা হলো তখন তিনি সঙ্গে নিয়ে আসেন একদল ক্রোধান্বিত সমর্থকদের। সমর্থকরা ভয় দেখাচ্ছিল যে তারা রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করবে এবং সম্রাজ্ঞী ও তার ছেলেকে মেরে ফেলতে পারে। গথিক ব্যবসায়ীরা অরিয়নদের মাধ্যমে এ রকম একজন পবিত্ৰাত্মার বিরুদ্ধে কিছু করতে ইতস্তত বোধ করল এবং বিপ্লব এড়ানোর জন্য সম্রাজ্ঞী তা চেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। এম্রোজের বিজয় উপেক্ষা করতে পারলেন না ভেলেনটিয়ানের মাতা। যুবরাজ আবেগজনিত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন যে, তার নিজস্ব চাকররা একজন বিবেকহীন যাজকের হাতে প্রস্তুত ছিল তাকে ছেড়ে দিতেও।

সম্রাজ্ঞী পরবর্তী বছরে জয় করার চেষ্টা করলেন দরবেশকে। তিনি নির্বাসনের ঘোষণা দিলেন তার বিরুদ্ধে। কিন্তু তিনি গির্জায় বিশপের আসনে অবস্থান নিলেন, যেখানে তাকে দিনরাত সমর্থন করতেন বিশ্বাসী ও দানশীল ব্যক্তিরা। তাদেরকে জাগ্রত রাখার জন্য তিনি নিয়মিত উচ্চস্বরে প্রার্থনা সংগীত চালনা করেন মিলানের চার্চে। অলৌকিক ঘটনা দ্বারা অনুসারীদের উৎসাহ আরও বৃদ্ধি করা হলো এবং পরিশেষে ইতালির ক্ষুদ্র সার্বভৌমত্ব টিকে থাকতে পারল না স্বর্গের প্রিয়পাত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়।

এ ধরনের প্রতিযোগিতার ফলে চার্চ সার্বভৌম ক্ষমতা অর্জন করে। দানশীলতা ও সংগঠন দুই-ই আংশিকভাবে এই বিজয়ের কারণ। কিন্তু প্রধান কারণ এই ছিল যে, এর বিরোধী কোনো ধর্মমত বা জনমত ছিল না। যখন রোম জয়লাভ করল তখন একজন রোমান ভাবত যে এটা তার রাষ্ট্রের গৌরব। কিন্তু এ ধরনের মনোভাব চতুর্থ শতাব্দীতে কিছুদিনের জন্য মুছে গিয়েছিল। ধর্মের সাপেক্ষে রাষ্ট্রীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা আধুনিককালে পুনরুজ্জীবিত হয় জাতীয়তাবোধের অভ্যুদয়ের ফলে।

প্রতিটি সফল বিপ্লবই কর্তৃত্বকে নাড়া দেয় এবং সামাজিক বন্ধন দুরূহ করে তোলে। এটা শুধু রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে দেয় না, পরবর্তী বিপ্লবের রূপও প্রদান করে। অধিকন্তু ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ প্রাথমিক দিনগুলোতে খ্রিস্টীয় শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহের বিপজ্জনক উৎস হিসেবে রয়ে গেল। ব্যক্তিগত বিবেক যখন দেখল যে সে চার্চের রায় গ্রহণ করতে পারে না তখন সে বশ্যতা অস্বীকার করার পক্ষে যুক্তি পেল। চার্চের জন্য বিরক্তিকর হতে পারে ভিন্নমত, কিন্তু প্রাথমিক খ্রিস্টবাদের নিরিখে তা নীতিবিরুদ্ধ ছিল না।

প্রত্যেক কর্তৃত্বের জন্য এ ধরনের অসুবিধা সহজাত এবং এর উৎসস্থল বিপ্লব। এ কথা বলতেই হবে যে প্রাথমিক খ্রিস্টবাদ যুক্তিসঙ্গত ছিল এবং তার্কিকভাবে বলা যাবে না যে, পরবর্তী সব বিপ্লবই বিভিন্ন দোষে দুষ্ট হতে পারে। নৈরাজ্যিক আগুন জ্বলছিল খ্রিস্টবাদে, যদিও তা মধ্যযুগে গভীরভাবে পুঁতে রাখা হয়েছিল, তথাপি তা ভয়ানক অগ্নিকান্ডের রূপ ধারণ করে সংস্কার আন্দোলনের সময়।

২. সংস্কার

দুটো বিষয়ে ক্ষমতার দিক দিয়ে সংস্কার আমাদের ধারণা দেয়। এর ধর্মীয় নৈরাজ্য চার্চকে দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রকে সবল করে তোলে। সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ আন্তর্জাতিক সংগঠনের আংশিক ধ্বংসের জন্যে। এ বৃহৎ সংগঠন বারবার প্রমাণ করেছে যে তা যে কোনো নিরপেক্ষ সরকারের চেয়ে ক্ষমতাশালী। লুথার চার্চ এবং চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে জয়লাভের জন্য নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ যুবরাজদের উপর। হিটলারের যুগ পর্যন্ত লুথারীয় চার্চ কোনো অক্যাথলিক সরকারের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেনি। কৃষক বিদ্রোহ রাজার কাছে অধীনতা প্রচারের পক্ষে লুথারকে আরেকটি কারণ যুগিয়েছিল। স্বাধীন ক্ষমতা হিসেবে চার্চ লুথারীয় দেশগুলোতে তার বাস্তব অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে এবং পরিণত হয় ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের কাছে বশ্যতা স্বীকারের জন্য প্রচারণার অংশবিশেষ।

৮ম হেনরি বিষয়কে ইংল্যান্ডে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, তেজোবীর্য এবং নির্মমতার সঙ্গে হাতে দিয়েছিলেন। তিনি নিজেকে ইংল্যান্ডের চার্চ-প্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ধর্মকে জাতীয় ও নিরপেক্ষ রূপ দিতে আরম্ভ করেন। এ রকম আশা তার ছিল না যে, ইংল্যান্ডের ধর্ম বিশ্বজনীন খ্রিস্টীয় জগতের অংশবিশেষ হবে। তিনি আশা করেছিলেন যে ঈশ্বরের গৌরবের চেয়ে তার গৌরবের বেশি সহায়ক হবে ইংলিশ ধর্ম। তিনি তার পছন্দমত পরিবর্তন করিয়ে ছিলেন সংসদ দ্বারা। তার কোনো অসুবিধা ছিল না যারা পরিবর্তনের বিরোধী ছিল তাদের ফাঁসিদানে। রাজস্ব আনা হলো সন্ন্যাসীদের মঠ ভেঙে। তা তাকে সাহায্য যোগায় ঈশ্বরের কৃপা লাভের জন্য তীর্থযাত্রার মতো ক্যাথলিক বিদ্রোহ দমনে। প্রাচীন সামন্ত আভিজাত্যকে দুর্বল করে দেয় বারুদ এবং গোলাপ যুদ্ধ। যখনই উদ্যত হতেন তখনই তিনি তাদের মাথা কর্তন করে দিতেন। প্রাচীন গির্জার ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল ওয়েলসের পতন হলো। হেনরির অধীন যন্ত্রবিশেষ পরিণত হলেন ক্রমওয়েল এবং ক্রেনমার। হেনরি বিনয়ী ছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে রাষ্ট্রক্ষমতা কিরূপ হতে পারে চার্চের পূর্ণ গ্রাসের মাধ্যমে।

স্থায়ী হতে পারেনি ৮ম হেনরির কাজ। এলিজাবেথের অধীন প্রটেস্ট্যান্টবাদের সংমিশ্রণে এক ধরনের জাতীয়তাবোধ হঠাৎ প্রয়োজনীয় আকর্ষণীয় হয়ে উঠল। স্পেনের পরাজয় দাবি করল আত্মসংবরণ ক্যাথলিক এবং দখল করে নিল স্পেনীয় ভান্ডারজাত জাহাজ। তারপর থেকে শুধু বাম দিকে থেকেই ছিল এংলিকান চার্চের জন্য বিপদ। কিন্তু প্রতিহত করা হলো বামদিক থেকে উদ্ভূত আক্রমণ। পরবর্তীকালে জুড়ে নিল এর স্থান।

ভিকার ও বে হচ্ছে প্রটেস্ট্যান্ট দেশগুলোতে রাষ্ট্র কর্তৃক চার্চের পরাজয়ের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যে পর্যন্ত ধর্মীয় সহিষ্ণুতা অসম্ভব মনে হতো, পোপ ও সাধারণ পরিষদের একমাত্র স্থলবর্তী ছিল ইরিস্টেনিয়ারিজম।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে যাদের ধর্মবোধ অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল তাদের কাছে সন্তোষজনক হতে পারেনি ইরিস্টেনিয়ারিজম। এক রকম অসম্ভব ছিল পাপমোচনমূলক প্রশ্নে সংসদীয় কর্তৃত্বের কাছে বশ্যতা স্বীকারের জন্য বলা। স্বাধীনচেতা জনগণ সমভাবে চার্চ ও রাষ্ট্রের ধর্মীয় কর্তৃত্ব অগ্রাহ্য করল এবং দাবি করল ধর্মীয় সহিষ্ণুতার অনুসিদ্ধান্ত সহকারে ব্যক্তিগত বিচারের অধিকার। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সংযোজিত হলো সরাসরি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সঙ্গে। ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকের ধর্মীয় মতামতের অধিকার থাকলেও তার অন্যান্য অধিকার কি থাকবে না? সাধারণ নাগরিকদের আচরণে কি সরকারের কোনো আইনসঙ্গত সীমাবদ্ধতা ছিল না? ক্রমওয়েলের পরাজিত অনুসারীরা এ জন্য মানবাধিকার সংবলিত মতবাদ আটলান্টিক মহাসাগরের অপর পারে বহন করে নিয়ে যায় এবং জেফারসন এর বাস্তব রূপ দেন আমেরিকার সংবিধানে। আবার তা ইউরোপে ফেরত আসে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে।

৩. ফরাসি বিপ্লব

পশ্চিমা জগৎ সংস্কার আন্দোলন থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত ক্রমাগতভাবে আন্দোলনের ভেতর দিয়ে চলতে থাকে, যা মানবাধিকার বিপ্লব নামে আখ্যায়িত হয়। ১৮৪৮ সালে এই আন্দোলন পূর্ব রাইনে রূপ নেয় জাতীয়তাবাদের। এই মিলন বা যোগ অস্তিত্ব লাভ করে ফ্রান্সে ১৯৭২ সাল থেকে ও ইল্যান্ডে প্রথম থেকেই এবং আমেরিকাতে ১৭৭৬ সাল থেকে। এই আন্দোলনে গুরুত্ব পায় মানবাধিকারের চেয়ে জাতীয়তাবাদই বেশি। কিন্তু মানবাধিকারই প্রথম দিকে অধিকতর গুরুত্ববহ ছিল।

মানবাধিকারের প্রতি ঘৃণা-বর্ষণ আমাদের যুগে স্থল উক্তি হিসেবে স্বাভাবিক ব্যাপার। এটা সত্য যে দার্শনিক তত্ত্ব অনুসারে এ মতবাদ অরক্ষিত। কিন্তু ঐতিহাসিক ও প্রায়োগিক দিক থেকে প্রয়োজনীয় এবং আমরা অনেক স্বাধীনতাই এর বদৌলতে ভোগ করছি। একজন বেনথামাইটের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় অধিকারের তত্ত্বগত ধারণা। বাস্তব উদ্দেশ্যে এই মতবাদের নিম্নরূপ বর্ণনা দেয়া যায়। কোনো সমাজের নিয়ম-কানুন যদি এ ধরনের নির্দিষ্ট হয়ে যায় যে এর ভেতর প্রত্যেক ব্যক্তিই তার পছন্দমতো কাজ করবে এবং তার উপর কোনোরূপ কর্তৃত্ব থাকবে না তবেই সে সমাজে সাধারণ সুখ বৃদ্ধি পাবে। ন্যায়বিচারও একটি বিষয় ছিল যা মানবাধিকারবাদীদের আগ্রহ যোগায়। তারা মনে করে যে আইনের সঠিক প্রয়োগ ছাড়া কোনো মানুষকেই তার জীবন ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এ ধরনের মতবাদ সত্য বা মিথ্যা হতে পারে। কিন্তু তা অসম্ভব নয় পুরাতাত্ত্বিকভাবে।

এ মতবাদ অবশ্যই উৎস ও ভাবপ্রবণতার দিক থেকে সরকারবিরোধী। এ মত স্বৈরাচারী সরকারের একজন প্রজা পোষণ করে যে, আপন ধর্মমত পোষণে স্বাধীনতা থাকবে, সে তার ব্যবসা চালিয়ে যাবে হস্তক্ষেপ ছাড়া, সে বিয়ে করবে তার পছন্দ অনুযায়ী। সুতরাং মানবতাবাদীরা বলেছে যে, যেখানে বিরোধী সিদ্ধান্ত দরকার সেখানে তা হবে অধিকাংশের অথবা তাদের প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত-স্বেচ্ছাচারী বা শুধু প্রথাগত কর্তৃত্ব যেমন রাজা বা গির্জার পাদ্রির সিদ্ধান্ত হবে না। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি স্বাধীনতা সম্বন্ধে জন্ম দেয় অদ্ভুত মানসিকতার যা ক্রমাগতভাবে পশ্চিমা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এক প্রকার সন্দেহ পোষণ করে তা ক্ষমতার টিকে থাকা অবস্থায় ও সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে।

প্রটেস্ট্যান্টবাদের সঙ্গে এক অবশ্যম্ভাবী যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের। ফলে এই মতবাদ ঘোষণা করা হয় ধর্মীয় বলয়ে জোরেশোরে। কিন্তু ঘোষণাকারীরা ক্ষমতালাভের পর তা বর্জন করে। প্রটেস্ট্যান্টবাদের বদৌলতে এবং পৌত্তলিক রাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতার জন্য প্রাথমিক খ্রিস্টবাদের সঙ্গে এর সম্পর্ক বিদ্যমান। ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে সম্পর্কের ফলে খ্রিস্টবাদের সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। খ্রিস্টীয় নীতিকথা অনুসারে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনই কর্তৃপক্ষের দ্বারা কোনো ব্যক্তিকে পাপকাজে বাধ্য করা যুক্তিযুক্ত করতে পারে না। চার্চ বলেছেন যে, বিবাহ যে কোনো একপক্ষের উপর আরোপিত বাধ্যবাধকতা বাতিল করে। এই মতবাদটি নির্যাতনের বেলায়ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। উদ্দেশ্য হচ্ছে, সামাজিক উপকার সাধনের পরিবর্তে ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তিদেরকে অনুশোচনা ও পরিত্যাগে বাধ্য করা। প্রত্যেক মানুষের পরিসমাপ্তি তার নিজের মধ্যেই-কান্টের এ ধরনের নীতি খ্রিস্টীয় শিক্ষা থেকে গৃহীত হয়েছে। ক্যাথলিক চার্চের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতা প্রাথমিক খ্রিস্টবাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকে অস্পষ্ট করে তোলো। কিন্তু এর চরম অবস্থায় তাকে পুনরুজ্জীবিত করে প্রটেস্ট্যান্টবাদ এবং সরকার সম্বন্ধীয় তত্ত্বে এর প্রয়োগ করে।

যখন বিপ্লবী এবং প্রথাগত ক্ষমতার ভেতর ফরাসির বিপ্লবের অনুরূপ অবস্থায় প্রভুত্ব অর্জনের লক্ষ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় তখন বিজিতদের উপর বিজয়ীদের ক্ষমতাই নগ্ন ক্ষমতা। বিপ্লবী সৈন্য ও নেপোলিয়ানের সৈন্যরা নতুন ধর্মমতের প্রচারণা শক্তির সমন্বয়ে নগ্ন ক্ষমতা প্রদর্শন করে। নতুন ধর্মমতের প্রচারণা শক্তির সমন্বয়ে নগ্ন ক্ষমতা প্রদর্শন করে। ইউরোপে এই ক্ষমতা ব্যাপকতার দিক দিয়ে অভূতপূর্ব ছিল। আজও ইউরোপবাসীর উপর এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। জেকোবিনরা সর্বত্রই প্রথাগত ক্ষমতার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেন, কিন্তু নেপোলিয়ানের সৈন্যরাই এই প্রশ্ন কার্যকরি করে। নেপোলিয়ানের সৈন্যরা প্রাচীন কদর্য বার্তাগুলোর সংরক্ষণের জন্য যুদ্ধ করে এবং পরিশেষে বিজয়ী হলে প্রতিষ্ঠা করে একটি প্রতিক্রিয়াশীল পদ্ধতি। তাদের নিষ্প্রভ প্রতিবাদের ফলে তার অত্যাচার এবং বল প্রয়োগ বিস্মৃতির অতলগর্ভে তলিয়ে যায়। মহান শান্তি সুদূরপরাহত, তাই যুদ্ধের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় এবং বেয়নেটে বিদ্ধ করে স্বাধীনতার অগ্রগদূতকে। মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বছরগুলোতে এক প্রকার বাইরোনিক ধর্মবিশ্বাসজাত সহিংসতা জন্ম নেয় এবং ক্রমাগতভাবে মানুষের চিন্তাভাবনার উপর প্রভাব ফেলে। এর সবই নেপোলিয়ানের নগ্ন ক্ষমতায় খুঁজে পাওয়া যায়। রবসপিয়ার ও নেপোলিয়নের কাছে স্ট্যালিন তার সফলতার জন্যে যতটুকু ঋণী, হিটলার ও মুসোলিনি তার চেয়ে কম ঋণী নন।

নেপোলিয়নের দৃষ্টান্ত থেকে বলা যেতে পারে যে বিপ্লবী ক্ষমতা নগ্ন ক্ষমতায় পর্যবসিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বিদেশ বিজয়, ধর্মীয় নির্যাতন অথবা শ্রেণি সংগ্রামে অত্যুৎসাহীদের ভেতর সংঘাত নগ্ন ক্ষমতা থেকে ভিন্ন এ কারণে যে এই সংঘাতের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধার নয় বরং তা ধর্মমতের স্বার্থে পরিচালিত। ক্ষমতা হচ্ছে এর উপর। এর উদ্দেশ্য বিস্মৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে। তাই সংগ্রাম কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী হলে অন্ধ অনুরাগ ক্রমাগতভাবে শুধু বিজয়লাভের প্রচেষ্টায় পরিচালিত হতে পারে। সুতরাং প্রথম দৃষ্টে অনুভূত পার্থক্যের চেয়ে বিপ্লবী ক্ষমতা ও নগ্ন ক্ষমতার পার্থক্য প্রায়ই কম হয়ে থাকে। লাতিন আমেরিকায় প্রথমত স্পেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উদারপন্থি ও গণতন্ত্রীদের দ্বারা পরিচালিত হয়, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটে অস্থিতিশীল সামরিক একনায়ক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। বিপ্লবী বিশ্বাস ব্যাপক ও জোরালো হলে এবং বিজয় খুব বেশি বিলম্বিত না হলে সহযোগিতামূলক অভ্যাসের ফলে কি বিপ্লবের সঙ্গে জড়িত দুঃখ-কষ্টের অবসান ঘটবে এবং নতুন শাসকের কি খাঁটি সামরিক শক্তির পরিবর্তে সম্মতির উপর নির্ভরতা লাভের সামর্থ্য যোগাবে? মনোকর্তৃত্ব ছাড়া অত্যাচারী হতে বাধ্য যে কোনো সরকার।

৪. রুশ বিপ্লব

এখনও বিশ্ব ইতিহাসে রুশ বিপ্লবের গুরুত্ব সম্পর্কে বিচার করার সময় আসেনি। আমরা এখন আলোচনা করতে পারি এর কয়েকটি দিক নিয়ে। প্রাথমিক খ্রিস্টবাদের মতো এটিও আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় নিরপেক্ষ। খ্রিস্টবাদের মতো না হলেও তা প্রধানত ইসলামের মতো রাজনৈতিক। এ পর্যন্ত এ মতবাদের যে অংশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে তা হচ্ছে উদারনীতিকদের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতার আহ্বান। ১৯১৭ সালের নভেম্বরে পর্যন্ত শুধু প্রতিক্রিয়াশীলাই উদারনীতিকদের প্রতিহত করে। অন্য প্রতিবাদীদের মতো মার্কসীয়রা ওকালতি করত গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, মুক্ত সাংবাদিকতা এবং উদারনৈতিক রাজনীতির অবশিষ্টাংশের। রুশ সরকার ক্ষমতালাভের পর এক মহান দিনগুলোতে খ্রিস্টীয় শিক্ষার দিকে ফিরে গেল। কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ইতিবাচক শিক্ষা ও সব প্রতিদ্বন্দ্বী মতবাদ দমনের মাধ্যমে সত্যের বিকাশ ঘটানো। অবশ্য এর অন্তর্ভুক্ত ছিল লাল সৈন্যের উপর নির্ভরশীল অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারের প্রতিষ্ঠা। এই ব্যবস্থায় প্রভূত বৃদ্ধি পায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার মিশ্রণের ফলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা।

কমিউনিস্ট মতবাদের আন্তর্জাতিক অংশ অচল প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু অসাধারণ সফলতা লাভ করে উদারনৈতিকতা বর্জনের দিক। রাইন থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত সর্বত্র এ মতবাদের প্রধান সব অংশই অগ্রাহ্য হয়েছে। প্রথমে ইতালি ও পরে জার্মানি বলশেভিকদের রাজনৈতিক ক্রিয়াকৌশল রপ্ত করে, এমনকি যেসব দেশ গণতান্ত্রিক থেকে গেল সেখানেও উদারনৈতিক বিশ্বাস এর অনুকুল পরিবেশ হারায়। উদারনীতিকরা মনে করেন যখন কোনো রাষ্ট্রীয় ভবন ধ্বংস করা হয় তখন পুলিশ ও আদালতের দায়িত্ব প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করা। কিন্তু নিরর মতো আধুনিকতাবাদীরা বলেছেন, সাজানো প্রমাণাদির মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দকৃত দলের উপর দোষ চাপানো উচিত। বাকস্বাধীনতার মতো বিষয়ে সেইন্ট এম্রোজের মতো তিনি মনে করেন যে, স্বাধীনতা তার নিজের দলেরই থাকা উচিত, অন্য কোনো দলের নয়।

সব রকম ক্ষমতাই এসব মতবাদ অনুযায়ী প্রথমে বিপ্লবী ক্ষমতার রূপ নেবে ও পরে পর্যবসিত হবে অপরিহার্য ধারণা মোতাবেক নগ্ন ক্ষমতায়। বিপদ অত্যাসন্ন। আমি পরবর্তী পর্যায়ের আগে একে এড়ানোর উপায় সম্পর্কে আর কিছুই বলব না।

এগুলো খুঁজতে হবে উদারনৈতিকতা বিলুপ্তির কৌশলগত প্রচারণার জন্য বর্ধিত সুযোগ-সুবিধা ও উদারনৈতিক মতবাদের ফসল জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে। সরকার প্রভূত ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা একত্রে কুক্ষিগত করে। রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সময়ের সমস্যাগুলো নতুন এবং তার সমাধানে লক ও মন্টেন্ধু আমাদেরকে সার্মথ্য যোগাতে পারেন না। ব্যক্তিগত উদ্যোগের একটি ক্ষেত্র সৃষ্টি করা প্রয়োজন অষ্টাদশ শতাব্দীর সমাজে শান্ত ও অগ্রগতি বজায় রাখতে। কিন্তু এই ক্ষেত্রের নতুন সংজ্ঞা প্রদান করা এবং একে নিরাপদ রাখা প্রয়োজন।

০৮. অর্থনৈতিক ক্ষমতা

অর্থনৈতিক ক্ষমতা সামরিক ক্ষমতার মতো মৌলিক নয়, সিদ্ধান্তমূলক। তা একটি রাষ্ট্রের ভেতরে আইনের উপর নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে তা শুধু ছোটখানো ব্যাপারেই আইনের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তা যুদ্ধ বা যুদ্ধের আশংকার উপর নির্ভরশীল। কোনোরূপ বিশ্লেষণ ছাড়াই অর্থনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণ করে নেয়া প্রচলিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে ঐতিহাসিক কারণগত ব্যাখ্যায় অযৌক্তিক গুরুত্ব আরোপিত হচ্ছে যুদ্ধ ও প্রচারণার বিপরীতে অর্থনীতির উপর।

শ্রম-অর্থনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া অন্যসব অর্থনৈতিক ক্ষমতার সর্বশেষ বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, একখন্ড জমির উপর দাঁড়িয়ে থাকা এবং এর উপর কিছু রাখা বা তা থেকে কিছু নিয়ে যাওয়া কার পক্ষে সম্ভব প্রয়োজনে তা সেনাশক্তি ব্যবহারের সামর্থ্যের উপর নির্ভর করছে। কিছু ক্ষেত্রে তা অপরিহার্য। এংলো পারসিক কোম্পানির মালিকানাধীন দক্ষিণ পারস্যের তেল সম্পদগুলো। কারণ ব্রিটিশ সরকার এ রকম আইন পাস করেছে যে তাতে অন্য কারোর অধিকার থাকবে না এবং অদ্যাবধি এই আইন বলবৎ করার জন্য তা যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু ব্রিটেন কোনো মরাত্মক যুদ্ধে পরাজিত হলে সম্ভবত মালিকানা পরিবর্তিত হতে পারে। কিছু ধনী মানুষের মালিকানাধীন রোডেশীয় স্বর্ণক্ষেত্রগুলো। কারণ ব্রিটিশরা মনে করত যে লবেনগুলার সঙ্গে যুদ্ধের মাধ্যমে লোকগুলোকে ধনী করে দেয়াই লাভজনক। যুক্তরাষ্ট্রের তেল সম্পদ কতগুলো কোম্পানির মালিকানাধীন, কারণ তাদের আইনগত অধিকার রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাশক্তি এই আইন বলবৎ করতে প্রস্তুত। তেল এলাকাগুলোর মালিকানা যেসব ইন্ডিয়ানদের ছিল তাতে তাদের কোনো আইনগত অধিকার নেই। কারণ, তারা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল। অতি সম্প্রতি সংঘটিত যুদ্ধে বিজয় অনুসারে ফ্রান্স অথবা জার্মানির মালিকানাধীন লরেনের লৌহখনি।

কিন্তু অপেক্ষাকৃত অস্পষ্ট ক্ষেত্রে এই বিশ্লেষণ প্রযোজ্য। কেন একজন প্রজা কৃষক জমির খাজনা দেন এবং কেন তিনি জমির শস্য বিক্রি করতে পারেন? তাকে খাজনা দিতে হয় কারণ জমি জমিদারের মালিকানাধীন। জমিদার জমির মালিক কারণ তিনি তা অর্জন করেছেন ক্রয় করে অথবা তা পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে। আমরা মালিকানা সূত্রের উল্টো দিক অনুসরণ করলে পরিশেষে এমন এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছব, যিনি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তা অর্জন করেছিলেন–এটা হতে পারে কোনো সভাসদের অনুকূলে ব্যবহৃত রাজার স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা অথবা সেক্সন বা নরমেনদের মতো বড় ধরনের বিজয়। এসব উগ্র কার্যকলাপের মধ্যবর্তী সময়ে রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহৃত হয় আইন অনুসারে মালিকানা পরিবর্তনের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য। জমির মালিকানা সিদ্ধান্তকারী ক্ষমতা, কে জমির উপর থাকবে এর মাধ্যমে তা নির্ধারিত হয়। এই অনুমতির জন্য কৃষক জমির খাজনা প্রদান করেন এবং সে সুবাদে শস্য বিক্রি করেন তিনি।

একই ধরনের সর্বশেষ বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, লক আউট শিল্পপতির ক্ষমতার ভিত্তি হচ্ছে। অর্থাৎ ফ্যাক্টরি মালিক রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করতে পারেন অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের ফ্যাক্টরির ভেতরে প্রবেশকরা থেকে বিরত রাখতে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এ ব্যাপারে কোথাও রাষ্ট্রীয় অনীহা থাকতে পারে, পরিণামে ধর্মঘটের সম্ভাবনা দেখা দেয়। রাষ্ট্র কর্তৃক এগুলো সহনীয় হয়ে ওঠামাত্রই নিয়োগকারীদের নিরঙ্কুশ মালিকানা রদ হয়ে যায় এবং কর্মচারীদের অংশগ্রহণ শুরু হয় মালিকানায়।

অন্যান্য আর্থিক ক্ষমতার চেয়ে ঋণ অধিক বিমূর্ত, কিন্তু পৃথক নয়। এই ক্ষমতা নির্ভরশীল উৎপাদক থেকে অব্যবহিত উৎপাদনশীল নয় এমন কাজে নিয়োজিত লোকের হাতে উদ্বৃত্ত ভোগ্যপণ্য হস্তান্তর করার আইনগত অধিকারের উপর। আর্থিক ঋণ গ্রহণকারী কর্পোরেশন বা সাধারণ মানুষ শুধু আইনের বলেই ঋণ পরিশোধে বাধ্য। কিন্তু এ উপায় ব্যর্থ হতে পারে ঋণ গ্রহণকারী সরকারের বেলা চূড়ান্ত উপায় হিসেবে বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার মতো পরিবেশ যে দেশে বিরাজ করে সে দেশে। ব্যর্থ হলে ঋণগ্রহীতা সোজা ঋণদাতার সম্পত্তি দখল করে নেয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যায় লিনা স্বর্ণ ক্ষেত্রে কে প্রবেশাধিকার পাবে। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার সোভিয়েত সরকারের, যুদ্ধপূর্ব শেয়ার মালিকদের নয়।

সাধারণত মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতা এভাবে সরকারের সেনাশক্তি নিয়োগের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। প্রয়োজনে এগুলো বিধিবদ্ধ কিছু নিয়মানুসারে ঠিক করে দেয় যে, এই জমিতে যাওয়ার মোক্ষম অধিকার কে পেতে পারে। কিন্তু সরকারের অর্থনৈতিক ক্ষমতা নির্ভর করে আংশিকভাবে সেনাশক্তির উপর এবং আংশিকভাবে অন্যান্য সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত শান্তিচুক্তি বা আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের উপর।

অর্থনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক অনেকটা উভয়মুখী। অর্থাৎ একদল মানুষ অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করতে পারে একত্রিত হয়ে অর্জিত সেনাশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। প্রকৃতপক্ষে চরম অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জনই তাদের একত্রিত হওয়ার মূল লক্ষ্য। দৃষ্টান্তস্বরূপ ধরা যাক ১৮৪৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় অথবা এর কয়েক বছর পর ভিক্টোরিয়ায় অকস্মাৎ ত্বরাপূর্ণ স্বর্নমুখী আগমনজনিত আধানৈরাজ্যিক অবস্থার কথা। যিনি আইনসঙ্গতভাবে স্বর্ণের অধিকার পেয়েছেন তিনি তা ব্যাংকে জমা রাখার আগে অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করেছেন বলা যায় না। তার লুণ্ঠিত হওয়ার অথবা খুন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে সে সময় পর্যন্ত। নৈরাজ্যপূর্ণ দেশে যখন সবাই একে-অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধেরত তখন যিনি রিভলবার দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি এবং নিশ্চিতভাবে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করতে পারে তিনি ছাড়া অন্য সবার কাছে স্বর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়ে। তার কাছে এমন চিন্তা করা আনন্দদায়ক যে, কোনোরূপ অর্থ প্রদান ছাড়াই তিনি খুন করার ভয় দেখিয়ে চাহিদা পূরণ করতে পেরেছেন। বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থানরত খাদ্যান্বেষী জনসমষ্টি ছাড়া অন্য কোথাও এ ধরনের অবস্থা স্থিতিশীল হবে না। কৃষিকাজ অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় অনধিকার প্রবেশ ও চুরি বন্ধ করতে না পারলে। এটা স্পষ্ট যে স্বর্ণসন্ধানীদের মতো কমবেশি সভ্যলোকের সমন্বয়ে গঠিত নৈরাজ্যিক সমাজে ভিজিল্যান্ট কমিটির অনুরূপ এক প্রকার সরকার দেখা দেয়। একত্রিত হয়ে লুণ্ঠনকারীদের প্রতিহত করবে শক্তিমান ব্যক্তিরা। হস্তক্ষেপের জন্য বাহ্যিক কর্তৃপক্ষ না থাকলে তারা অন্যদেরও লুণ্ঠন করবে, কিন্তু তারা এ ক্ষেত্রে সংযম চর্চা করে থাকে স্বর্ণ ডিমদানে সক্ষম হাঁসের হত্যার ভয়ে। তারা সমাজে নিরাপত্তা বিধান করে মানুষের আয়ের এক অংশের বিনিময়ে। একেই বলে আয়কর। নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে আইন গঠিত হওয়া মাত্রই সামরিক শাসন আইনের ছদ্মাবরণে সজ্জিত হয়। ফলে নৈরাজ্য রহিত হয়ে পড়ে। আজও ভিজিলেন্টদের সামরিক ক্ষমতা হলো আইন এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের চরম ভিত্তি।

আইনগত ভিত্তি জটিল। চার্চের সম্পত্তি হলো ঐতিহ্যর্নিভর। শ্রমজীবীরা লাভবান হয়েছে ট্রেড ইউনিয়নের বদৌলতে। স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের অধিকারের ভিত্তি সম্প্রদায়গত নৈতিকতা। সামরিক ক্ষমতা রাষ্ট্রের সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক বিধিবিধান বলবৎ করার পেছনে অপরিহার্য।

আইনের প্রাসঙ্গিক অধ্যায় হচ্ছে সাধারণ মানুষের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণীত নীতি। আইনের এই অধ্যায় জনমত সমর্থিত হলেই শুধু অন্যান্য অধ্যায়ের মতো কার্যকরী হয়। অষ্টম আদেশ অনুসারে জনমত দ্বারা চুরি নিন্দিত এবং আইনের চোখে নিন্দিত উপায়ে সম্পদ অর্জন চুরি বলে অভিহিত হয়েছে। সুতরা সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতা আসলে নির্ভরশীল মতামতের উপর। যেমন বলা যায়, আইন দ্বারা চুরির সংজ্ঞা প্রদানের মনোভাব সমেত চুরির নৈতিক নিন্দাবাদ। সম্পদ সেখানে বিপন্ন যেখানে মনোভাব দুর্বল অথবা অস্তিত্বহীন। যেমন বলা যায়, সাম্যবাদের স্বার্থে বৃত্তি চর্চার জন্য ধার্মিক সমাজচ্যুত ব্যক্তি হিসেবে জীবন শুরু করেন স্ট্যালিন। আমরা দেখেছি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে অষ্টম অধ্যাদেশ বাধ্যবাধকতা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পোপের ক্ষমতা ইতালির ব্যাংকারদের নিয়ন্ত্রিত করতে তাকে সামর্থ্য যোগায়।

অর্থনৈতিক ক্ষমতা একটি রাষ্ট্রের ভেতর আইন এবং জনমত লব্ধ হলেও তা সহজেই কিছু বিশেষ স্বাধীনতা ভোগ করে। এটি দুর্নীতির মাধ্যমে আইন প্রভাবিত করে এবং প্রচারণার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করে। এটি রাজনীতিকদের উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করে তাদের স্বাধীনতা হ্রাস করতে পারে এবং ভয় দেখাতে পারে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের। কিন্তু অত্যন্ত সীমিত অর্থনৈতিক ক্ষমতার সাফল্যের দিক। ঋণদাতা সিজারের ক্ষমতা অর্জনে সহায়তা দান করে তার সাফল্য ছাড়া ঋণ পরিশোধের সম্ভাবনা দেখেনি। কিন্তু সাফল্য অর্জনের পর তাদের উপেক্ষা করার উপযোগী ক্ষমতা অর্জন করেন সিজার। সম্রাটের অবস্থান দখল করে নেয়ার জন্য ফুজারের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেন পঞ্চম চার্লস। কিন্তু সম্রাট হওয়ার পর তিনি তাদের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করেন। ফলে সব ঋণই হারায় তারা। আমাদের সময়ে জার্মান পুনরুদ্ধারের জন্য সাহায্যদানে লন্ডন শহরে অনুরূপ অভিজ্ঞান রয়েছে। টাইসনের অভিজ্ঞতাও হিটলারের ক্ষমতা লাভে একই জাতীয়।

এ মুহূর্তে গণতান্ত্রিক দেশে কিছু লোকের শাসন ক্ষমতার (Plutocracy) কথা ধরা যাক। আগেকার দিনগুলোর কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তা ব্যর্থ হয় ক্যালিফোর্নিয়ায় ও অস্ট্রেলিয়ায় এশীয় শ্রমের প্রবর্তন করতে। এটি ধ্বংস করতে পারেনি ট্রেড ইউনিয়ন। ব্রিটেনে এটি ধনীদের উপর ব্যাপক করারোপ এড়াতে এবং সমাজতান্ত্রিক প্রচারণারোধে ব্যর্থ হয়। এটি সমাজতন্ত্রীদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারকে সমাজতন্ত্র প্রবর্তনে বাধা প্রদান করতে পারে। তারা অনমনীয় হলে সংকট সৃষ্টি ও প্রচারণার মাধ্যমে তাদের পতন ঘটাতে পারে। এসব উপায় ব্যর্থ হলে গৃহযুদ্ধের সূচনা করতে পারে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বাধা প্রদানের জন্য। যেখানে এই বিষয়টি সহজ এবং জনমত খুবই সুনির্দিষ্ট সেখানে প্রটোক্র্যাসি ক্ষমতাহীন। কিন্তু যেখানে জনমত সুনির্দিষ্ট নয় অথবা বিষয়ের জটিলতার জন্য জনমত বিভ্রান্ত, সেখানে অভীষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ প্লুটোক্র্যাসি।

ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষমতা রয়েছে ধনীদের বিপরীতে। বর্ণ শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্তি ঠেকিয়ে রাখতে পারে ট্রেড ইউনিয়নগুলো। নিজেদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে, ব্যাপক মৃত্যুকর ও আয়কর লাভ করতে পারে। কিন্তু এ পর্যন্ত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন। তাছাড়াও ব্যর্থ হয়েছে তাদের পছন্দসই অথচ অধিকাংশ লোকের বিরাগভাজন সরকারকে টিকিয়ে রাখতে।

এভাবে জনমত দ্বারা সীমিত হয়ে পড়ে গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর প্রভাব। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যেখানে তীব্র প্রচারণা ও জনমত প্রভাবিত করতে পারে না। এর বাস্তবতা গণতান্ত্রিক দেশে পুঁজিবাদ বিরোধীদের স্বীকৃত মানের চেয়েও বেশি।

আধুনিক সমাজে আইনের নিয়ন্ত্রণাধীনে অর্থনৈতিক ক্ষমতা চূড়ান্তভাবে জমির মালিকানার উপর নির্ভরশীল হলেও এর সবচেয়ে বড় দাবিদারদের অন্তর্ভুক্ত নয় নামমাত্র জমির মালিকরা। সামন্তযুগে জমির মালিকদেরই অর্থনৈতিক ক্ষমতা ছিল। মজুরি নির্ধারণে শ্রম আইনের ভূমিকার মতোই তারা নির্ধারণ করতে পারত শ্রমিকদের মজুরি। তাছাড়া সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে সদ্যজাত ঋণদানেও তাদের ভুমিকা রাখতে পারে। কিন্তু শিল্পোন্নত দেশে জমির মালিকানার চেয়ে ঋণ অধিকতর শক্তিশালী। অবিবেচনার সাথে ঋণ গ্রহণ করে জমির মালিকরা, নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ব্যাংকের উপর। উৎপাদন কৌশলের পরিবর্তনের পরিণামস্বরূপ তা ঘটে বলেই মনে করা হয়। ভারতের মতো যেসব দেশে কৃষি ব্যবস্থা আধুনিক যন্ত্রনির্ভর নয় সেখানে তা হচ্ছে আইন কার্যকরি করার ক্ষেত্রে সরকারি ইচ্ছা ও ক্ষমতার ফসল। যে দেশে আইন সবার ঊর্ধ্বে নয় সেখানে দেখা গিয়েছে যে সময় সময় ঋণদাতারা তাদের ঋণগ্রহীতাদের হাতে খুন হয় এবং ঋণগ্রহীতারা ঋণের কাগজপত্র পুড়িয়ে দেয়। রাজপুরুষ থেকে কৃষক পর্যন্ত জমির সঙ্গে যাদেরই সম্পর্ক রয়েছে তারা সবাই ঋণ গ্রহণে অভ্যস্ত। কিন্তু যেখানে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয় এবং তা কার্যকরি করা হয় সেখানে ঋণগ্রহীতাকে ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত ঋণের সুদ দিয়ে যেতে হয়। যেখানে তা ঘটে থাকে সেখানে ভূ-সম্পত্তির উপর নির্ভরশীল ক্ষমতা ঋণগ্রহীতার হাত থেকে ঋণদাতার হাতে চলে যায়। কিন্তু ব্যাংক হচ্ছে আধুনিককালে ঋণদাতা।

আধুনিক বৃহৎ কর্পোরেশনের মালিকানা ও ক্ষমতা কোনোক্রমেই একত্রিত নয়। বার্লে ও মিনস The Modern Corporation and Private Property নামে বইতে দেখিয়েছেন তা কিভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করে। তারা যুক্তি দেন যে মালিকানা অপকেন্দ্রিক হলেও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রমুখী। দুহাজার ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক শিল্পকারখানা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে (পৃঃ ৩৩)-সযত্ন ও শ্রমবাধ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তাঁরা মনে করেন যে, আগেকার দিনের রাজা ও পোপের অনুরূপ বর্তমান নির্বাহীরা; তাদের মতে এডাম স্মিথের লেখায় আবির্ভূত ব্যবসায়ীদের উত্তরাধিকারী হিসেবে নয় এবং মহান আলেকজান্ডারের জীবনী আলোচনায় ওই নির্বাহীদের উদ্দেশ্য ও প্রেরণা সম্বন্ধে অধিক জানা যায়। তারা যুক্তি দেখান যে এসব বিশাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন মধ্যযুগীয় চার্চ বা জাতীয় রাষ্ট্রর ক্ষমতার কেন্দ্রায়নের অনুরূপ এবং এভাবে কর্পোরেশনগুলো রাষ্ট্রের গড়ে ওঠে সমকক্ষ প্রতিযোগী হিসেবে।

সহজেই এই কেন্দ্রায়ন বোঝা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাধারণ শেয়ার মালিকদের মতামত রাখার কোনো সুযোগ নেই রেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনায়। তত্ত্বগতভাবে পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ ভোটাররা ব্যবস্থাপনায় যেটুকু ক্ষমতা রাখে, কোম্পানি ব্যবস্থাপনায় তাদের ততটুকু ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তারা তার চেয়েও কম ক্ষমতা ভোগ করে থাকেন। রেল কোম্পানি অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিছু সংখ্যক ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত; আমেরিকাতে তা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। প্রতিটি উন্নত দেশে অর্থনৈতিক ক্ষমতা মুষ্টিমেয় ব্যক্তিদের একচেটিয়া অধিকার। কখনও কখনও এরা আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্সে পুঁজিপতি। এরা জার্মানি, ইতালি ও রাশিয়ায় রাজনীতিবিদ। যেখানে রাজনৈতিকও অর্থনেতিক ক্ষমতা একীভূত হয়ে গেছে সেখানে উদ্ভব ঘটেছে শেষোক্ত পদ্ধতির। অর্থনৈতিক ক্ষমতা মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে কুক্ষিগত হওয়া সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু এ ধরনের প্রবণতা ক্ষমতার ক্ষেত্রে সাধারণতভাবে প্রযোজ্য-শুধু অর্থনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে নয়। একটি স্টিল ট্রাস্ট কিছু সংখ্যক প্রতিযোগিতাশীল ছোট ছোট স্টিল উৎপাদকের পরবর্তী স্তরের অন্তর্ভুক্ত। তেমনি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একাঙ্গীভূত অবস্থা ও এগুলোর পৃথক সত্তা রয়েছে পরবর্তী স্তরে। কিন্তু এখনও আমি যেতে চাই না সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের আলোচনায়।

অর্থনেতিক ক্ষমতা পর্যবসিত হতে পারে সামরিক বা প্রচারণা ক্ষমতায়। বিপরীত প্রতিক্রিয়াটিও ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন দেশের আন্তঃসম্পর্কে অন্তর্ভুক্ত হলে প্রাচীন অবস্থাধীন সামরিক ক্ষমতাই অন্যান্য ক্ষমতার উৎস। আলেকজান্ডার পারসিকদের মতো এবং রোমানরা কার্তেজদের মতো ধনী ছিলেন না; কিন্তু যুদ্ধে বিজয়ের ফলে বিজয়ীরা তাদের শত্রুদের চেয়ে ধনী হয়ে ওঠে। বিজয়ের সূচনালগ্নে মোহাম্মদ (সাঃ)-এর অনুসারীরা বাইজেনটাইনদের চেয়ে অনেক গরিব ছিলেন এবং টিউটনিক আক্রমণকারীরা ছিলেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যের চেয়ে গরিব। এসব ক্ষেত্রে সামরিক ক্ষমতা অর্থনৈতিক ক্ষমতার উৎস। কিন্তু আরব জাতির অভ্যন্তরে সামরিক ক্ষমতা নবী (সাঃ) ও তার পরিবারের প্রচারণার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে সৃষ্টি হয়েছিল পশ্চিমা চার্চের ক্ষমতা ও সম্পদ।

অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ক্ষমতাশালী হওয়ার পর সামরিক ক্ষমতা অর্জন করেছে–এমন অনেক রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রাচীনকালে উপকূলবর্তী গ্রিক শহর ও কার্তেজ। মধ্যযুগে ইতালীয় প্রজাতন্ত্র এবং বর্তমান যুগে প্রথমে হল্যান্ড ও পরে ইংল্যান্ড। শিল্প বিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের আংশিক ব্যতিক্রম ছাড়া এর সব ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি ছিল বাণিজ্য কাঁচামালের মালিকানা নয়। ভৌগোলিক সুবিধার সঙ্গে দক্ষতার সমন্বয়ে কোনো শহর বা রাষ্ট্র আংশিকভাবে একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। (সতেরো শতকে স্পেনের পতনে দৃষ্ট শুধু পরিবর্তীগুলোই যথেষ্ট ছিল না) সামরিক ক্ষমতা অর্জনের উপায় বের করা হয় বাণিজ্যলব্ধ সম্পদ আংশিকভাবে ভাড়াটে সৈন্যদের পেছনে ব্যয় করে। যা হোক এ ব্যবস্থায় ত্রুটি ছিল যে তা সব সময় সিপাহি বিদ্রোহ এবং ব্যাপকভাবে বিশ্বাসঘাতকতার জন্ম দিত। ম্যাকিয়াভেলি এ কারণেই তা অনুমোদন করেননি এবং পরামর্শ দেন যে সেনাবাহিনী নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। বাণিজ্য সমৃদ্ধ বিরাট দেশে এ পরামর্শ খুবই ফলপ্রসূ, কিন্তু গ্রিক নগর রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে অথবা ছোট ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের বেলায় তা অর্থহীন। শুধু বিশাল সম্প্রদায় অথবা প্রতিবেশিদের তুলনায় অধিকতর সভ্য সমাজের ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল হয়ে থাকে বাণিজ্য নির্ভর অর্থনৈতিক ক্ষমতা।

যা হোক এর গুরুত্ব হারিয়েছে বাণিজ্য। আগের তুলনায় পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব কমে গেছে। সাম্রাজ্যবাদের প্রসারের ফলে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রয়োজন আগের তুলনায় অনেক কম। কাঁচামাল ও খাদ্যের মালিকানা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ; যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা খুব কমই সম্ভব। দৃষ্টান্তস্বরূপ তেলের ব্যাপারটি ধরা যাক: তেল ছাড়া কোনো দেশই যুদ্ধ করতে পারে না এবং যুদ্ধ করতে সমর্থ না হলে সে তেলের মালিক হতে পারে না। ব্যর্থ হতে পারে উভয় শর্তই: পারস্যের তেল পারসিকদের উপকার আসেনি, কারণ তাদের যথেষ্ট সেনাশক্তির অভাব ছিল। তেল অর্জন করতে না পারলে জার্মান সেনাশক্তি তাদের কোনো উপকারে আসবে না। অনুরূপ অবস্থা বিরাজমান খাদ্যের বেলা। একটি শক্তিশালী যুদ্ধযন্ত্রের জন্য খাদ্যোপার্জন থেকে প্রভূত জাতীয় শক্তি অর্জন করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তাই তা নির্ভর করে বিশাল উর্বর এলাকার সামরিক নিয়ন্ত্রণের উপর।

বর্তমানের মতো অতীতে কখনও এত অঙ্গাঙ্গীভঅবে সম্পর্কযুক্ত ছিল না অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা। শিল্পে উন্নতি বিধান, খাদ্য এবং কাঁচামালের অধিকার ছাড়া কোনো জাতিই ক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। সামরিক ক্ষমতাবলে জাতিগুলো নিজ দেশে অনুৎপাদনযোগ্য কাঁচামালের অধিকার লাভ করে। যুদ্ধের সময় জার্মানরা বিজয়ের মাধ্যমে রোমানিয়ার তেল ও ইউক্রেনের ফসলের অধিকার লাভ করে। গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চল থেকে যেসব দেশ তাদের কাঁচামাল পেয়ে থাকে তারা নিজেদের অথবা তাদের মিত্রদের সামরিক শক্তির মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে ওইসব দেশের উপর।

এর ভূমিকা বৃদ্ধি পেয়েছে শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে জাতীয় ক্ষমতার প্রচারণায়। অধিকাংশ মানুষ দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে এবং কিছুসংখ্যক মানুষ মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত না থাকলে কোনো জাতিই আধুনিক যুদ্ধে জয় লাভ করতে পারে না। শাসকরা এ ধরনের অভিপ্রায়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রজাদের মনে এমন প্রত্যয় সৃষ্টি করেন যে যুদ্ধে মৃত্যুবরণকারী শহীদের সমমর্যাদাসম্পন্ন। যুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়ের প্রধান কারণ প্রচারণা এবং ১৯১৮-২০ সময়কালের ভেতর সোভিয়েতেদের বিজয়ের একমাত্র কারণ তা-ই। এটা স্পষ্ট যে, যেসব কারণে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা একীভূত হয়, ওই একই কারণে এ উভয় প্রচারণা একীভূত হয়। প্রকৃতপক্ষে একটি সংগঠনে সর্বপ্রকার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে–এ সংগঠনটি হলো রাষ্ট্র। বিভিন্ন প্রকার ক্ষমতার ভেতর পার্থক্য শিগগিরই শুধু ঐতিহাসিক আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে প্রতিবাদী শক্তিগুলো কার্যকর না হলে।

অবশ্য এই প্রেক্ষাপটে মার্কসবাদের সমর্থনপুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনা প্রয়োজনীয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে পুঁজিবাদী শ্রেণি সংগ্রামের জন্ম দেয়, যা পরিণামে অন্যান্য সংগ্রামকে প্রভাবিত করে। মার্কসবাদের ব্যাখ্যা সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু মার্কস মনে হয় ভেবেছিলেন যে শান্তির সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকে জমিদার ও পুঁজিপতিদের হাতে। এরা চরমতম বিশ্লেষণ চালায়। ফলে বিদ্রোহ দানা বেঁধে ওঠে প্রলেতারীয়দের ভেতর। প্রলেতারীয়রা বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায় একত্রিত হলেই জয় লাভ করবে এবং এমন একটি পদ্ধতি প্রবর্তন করবে যে জমি ও পুঁজি থেকে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে সমাজের হাতে ন্যস্ত থাকবে। সঠিকভাবে তত্ত্বটি মার্কসের হোক বা না হোক, ব্যাপকভাবে তা আজকাল সাম্যবাদীদের এবং তাই এটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার দাবিদার।

জমিদার ও পুঁজিপতিদের হাতে সব অর্থনৈতিক ক্ষমতা-এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি যদিও মোটামুটিভাবে সত্য এবং এ পর্যন্ত আমি তা-ই ধরে নিয়েছি, তারপরও এর গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জমিদার ও পুঁজিপতিরা শ্রম ছাড়া বড় অসহায়। তাই ধর্মঘটে দৃঢ় সংকল্প ও ব্যাপকতা থাকলে অর্থনৈতিক ক্ষমতায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। কিন্তু ধর্মঘটের সম্ভাবনা এতই পরিচিত যে আমি আর কিছুই বলব না এ সম্পর্কে।

দ্বিতীয় যে প্রশ্ন উঠে তা হচ্ছে : প্রকৃতপক্ষে পুঁজিপতিরা তাদের চরমতম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে কি? যেখানে তারা অপরিণামদর্শী নয় সেখানে মার্কসের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী পরিণতির ভয়ে তারা এমন করে না। শ্রমিকদের উন্নতি লাভে সুযোগ দেয়া হলে তারা বিপ্লব থেকে বিরত থাকে। আমেরিকা এর উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। দক্ষ শ্রমিকরা সেখানে রক্ষণশীল।

এমন ধারণা খুবই প্রশ্ন সাপেক্ষ যে প্রলেতারীয়রা সংখ্যাগরিষ্ঠ। কৃষিপ্রধান যে দেশের জমির উপর কৃষকদের মালিকানা রয়েছে সেখানে মোটেই এর সত্যতা নেই। যেসব দেশে স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ অনেক বেশি সেখানে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী যারা প্রলেতারীয় তারা রাজনীতির ক্ষেত্রে ধনীদের পক্ষে থাকে, কারণ তাদের চাকরি নির্ভরশীল বিলাস সামগ্রীর চাহিদার উপর। এক্ষেত্রে প্রলেতারীয়ের বিজয় কোনোক্রমেই নিশ্চিত নয় শ্রেণি সংগ্রাম সংগঠিত হলে।

অধিকাংশ মানুষই চরম সংকট মুহূর্তে তার শ্রেণির চেয়ে জাতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে। এর রকম সবসময় নাও হতে পারে। কিন্তু ১৯১৪ সালের পর আজ অবধি পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই, যখন প্রায় সব আন্তর্জাতিকবাদীই যুদ্ধবাজ ও দেশপ্রেমিক হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং শ্রেণি সগ্রাম যদিও সুদূর ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনা তারপরও খুব কমই তা আশা করা যায় না। বর্তমানের মতোই থেকে যাবে জাতীয়তাবাদী যুদ্ধের আশঙ্কা।

স্পেনের বর্তমান গৃহযুদ্ধ এবং অন্যান্য দেশে এর প্রতিক্রিয়া এ কথা প্রমাণ করে যে, জাতীয়তাবাদী ধারণাগুলো শ্রেণি সংগ্রামের প্রভাবাধীন। আমি মনে করি না যে, এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছে ঘটনা প্রবাহই। জার্মানি ও ইতালি জাতীয়তাবাদী পটভূমির জন্যেই জেনারেল ফ্রাঙ্কোর পক্ষ অবলম্বন করে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স একই জাতীয় কারণে ফ্রাঙ্কোর বিরোধিতা করে। এটা সত্য যে সরকারের নীতি ব্রিটিশ স্বার্থ অনুযায়ী স্থির করা হলে ব্রিটিশরা যতটুকু ফ্রাঙ্কোর বিরোধিতা করত বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম বিরোধিতাই করেছে। কারণ রক্ষণশীলরা। স্বভাবতই তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। তা সত্ত্বেও যখন মরক্কোর খনি অথবা ভূমধ্যসাগরে নৌ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তখনই ব্রিটিশ স্বার্থ রাজনৈতিক সহানুভূতি অগ্রাহ্য করেছে। রুশ বিপ্লব সত্ত্বেও ১৯১৪ সালের আগে বৃহৎ শক্তিগুলোর বিভিন্ন শিবিরে বিভক্তিই আবার কার্যকর হয়েছে। উদারপন্থিরা জারকে অপছন্দ করেছে এবং রক্ষণশীলরা স্ট্যালিনকে; কিন্তু স্যার E-কে অথবা বর্তমান সরকারের কেউই এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারতেন না ব্রিটিশ স্বার্থের প্রতি হস্তক্ষেপ।

যা এ অধ্যায়ে বলা হয়েছে তার সারসংক্ষেপ হচ্ছে : সামরিক ইউনিটের (যা কয়েকটি স্বাধীন দেশের সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে) অর্থনৈতিক ক্ষমতা নির্ভর করে (ক) নিজ ভূখন্ডের নিরাপত্তা বিধানে এর সামর্থ্যের উপর, (খ) অন্য রাষ্ট্রকে ভীতি প্রদানে এর ক্ষমতার উপর, (গ) কাঁচামাল, খাদ্য, শিল্প ক্ষেত্রে দক্ষতার উপর, (ঘ) অন্যান্য সামরিক ইউনিটের প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবা সরবরাহে এর সামর্থ্যের উপর। এর সব ক্ষেত্রে সামরিক ও অর্থনৈতিক উৎপাদনগুলো একটি অন্যটির সাথে মিশে আছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, জাপান শুধু মিলিটারি শক্তির দ্বারাই চীনা ভূ-খন্ডে তার সামরিক শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল অর্জন করে এবং একইভাবে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স অর্জন করে নিকট প্রাচ্যে তেল। কিন্তু শিল্পে পূর্ব অগ্রগতি ছাড়া উভয়টিই অসম্ভব। যুদ্ধ যতই বিজ্ঞানভিত্তিক ও যন্ত্রর্নিভর হচ্ছে সামরিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক গুরুত্ব ততই বাড়ছে। কিন্তু এ কথা মনে করা নিরাপদ নয় যে, অর্থনৈতিক সম্পদে শ্রেষ্ঠ পক্ষই জয়লাভ করে। প্রচারণার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে অর্থনৈতিক উৎপাদকের মতোই জাতীয়তাবোধ সৃষ্টিতে।

আইন সম্পদ সীমাবদ্ধতা আরোপ করে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শোষণের উপর। ব্যক্তি বিশেষ বা দল বিশেষ অবশ্যই একচেটিয়া অধিকার রাখে অন্যান্য লোকের আকাঙ্ক্ষিত কিছুর উপর আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে। একচেটিয়া অধিকার আইন দ্বারা সৃষ্টি হতে পারে, যেমন– ঔষধপত্রের উৎপাদন, ছাপানো ইত্যাদি অধিকার ও জমির মালিকানা। এগুলো সৃষ্টি হতে পারে ট্রেড ইউনিয়ন ও ট্রাস্টের মতো সংঘের মাধ্যমে। দরকষাকষির মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে বা সমষ্টিগতভাবে যা কিছু লাভ করা যায় রাষ্ট্র ঐগুলো ছাড়া প্রয়োজনীয় অন্য সব কিছুই বল প্রয়োগ করে অর্জন করার অধিকার রাখে। প্রভাবশালী মহল রাষ্ট্রকে অধিকার আদায়ে এবং যুদ্ধে এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করে যা সঠিকভাবে জাতির জন্য নয় বরং নিজেদের পক্ষে সুবিধাজনক তাদের সুবিধামত আইন কাজে লাগাতে পারে, যেমন শ্রমিকদের নয়, নিয়োগকারীদের সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগদানে। প্রকৃত অর্থে ব্যক্তি বিশেষ বা গোষ্ঠী বিশেষের অর্থনৈতিক ক্ষমতা সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল এবং অর্থনীতির সাধারণ বিবেচ্য উৎপাদকগুলোকে প্রচারণার মাধ্যমে প্রভাবিত করে থাকে। পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় প্রায়োগিক ক্ষেত্রে অর্থনীতি পৃথক বিজ্ঞান হিসেবে আবির্ভূত হলে তা হবে অবাস্তব ও ত্রুটিপূর্ণ। ক্ষমতা বিজ্ঞানের বিশদ অধ্যয়নের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, এ কথা সত্য।

০৯. জনমত সংগঠনের ক্ষমতার প্রভাব

এমন দৃষ্টিভঙ্গির সহায়ক যুক্তি খুঁজে বের করা সহজ যে, মতামতই সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং অন্যসব ক্ষমতা এ থেকেই উদ্ভুত। সৈন্যরা অকেজো হয়ে পড়ে যুদ্ধের যৌক্তিকতা সম্পর্কে যুদ্ধরত সৈন্যদের আস্থার অভাব হলে অথবা ভাড়াটে সৈন্যদের বেলা বিজয়লাভে সেনাপতির যোগ্যতায় আস্থা না থাকলে। আইন অর্থহীন হয়ে পড়ে সমাজে সাধারণ স্বীকৃতির অভাব হলে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ভরশীল আইনের প্রতি শ্রদ্ধার উপর। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায় যে, জালিয়াতির বিরুদ্ধে নাগরিকদের আপত্তি না থাকলে ব্যাংকিংয়ের ব্যাপারে কি ঘটত? প্রায়ই রাষ্ট্রের চেয়ে ধর্মীয় মতামত বেশি শক্তিশালী বলে প্রমাণিত। কোনো দেশের অধিকাংশ জনগণ সমাজতন্ত্রের পক্ষ অবলম্বন করলে সে দেশে ধনতন্ত্র অচল হয়ে পড়ে। এমন ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে, মতামতই হচ্ছে সামাজিক কার্যকলাপে সর্বোচ্চ ক্ষমতা।

কিন্তু মতামত গঠনকারী কারণগুলো অবহেলিত হলে অর্ধেকে এসে দাঁড়ায় এর সত্যতা। জনমত সামরিক শক্তির জন্য অপরিহার্য–এ কথা যেমন সত্য তেমনি সমভাবে সত্য যে সামরিক শক্তি জনমত গঠন করতে পারে। এ মুহূর্তে ইউরোপের প্রত্যেকটি দেশে একটি করে ধর্ম রয়েছে যা ষোড়শ শতাব্দীর শেষদিকে ওই দেশগুলো রাষ্ট্রধর্ম ছিল সেনাশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নির্যাতন ও প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ করত কোনো কোনো দেশ। এ কথা মনে করা হয় যে মনোগত কারণেই মতামত গঠিত হয়। কিন্তু তা শুধু সত্য অব্যবহিত কারণের বেলা। পটভূমিতে ধর্মমতের সেবায় স্বভাবতই শক্তির ভূমিকা বিদ্যমান।

বিপরীত দিক থেকে বলা যায় যে, সূচনালগ্নে ধর্মমতের অধীন কোনো শক্তি থাকে না এবং প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোতে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করতে হয় শুধু যুক্তি-পরামর্শের মাধ্যমে।

সুতরাং আমি সন্ধান পাই এক প্রকার ঊর্ধ্ব-নিম্নমুখী গতির : প্রথমত অল্প মানুষের দীক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে বিশুদ্ধ যুক্তি-পরামর্শের ব্যবহার, তারপর অবশিষ্ট মানুষের সঠিক প্রচারণার প্রভাবাধীন করার লক্ষ্যে শক্তি প্রয়োগ এবং পরিশেষে বৃহৎ অংশের অকৃত্রিম বিশ্বাস, যা আবারও শক্তির ব্যবহার অপ্রয়োজনীয় করে দেয়। কিছু মানুষ মতামতের ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায় ছাড়িয়ে যায় না, কিছু দ্বিতীয় পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে তারপর ব্যর্থ হয় এবং অন্যান্য মানুষ তিনটির সব কটিতে সফল হয়। বন্ধু সমাজ কখনও যুক্তি-পরামর্শের বাইরে যায়নি। অন্যান্য গির্জা অমান্যকারীরা ক্রমওয়েলের সময় অর্জন করে রাষ্ট্রশক্তি। কিন্তু ব্যর্থ হয় ক্ষমতা দখলের পর প্রচারণায়। তিন শতাব্দী ধরে যুক্তি-পরামর্শ ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যাথলিক চার্চ অর্জন করে কনস্টান্টাইনে সময় রাষ্ট্রশক্তি। তারপর শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি প্রচারণা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করে, যার ফলশ্রুতিস্বরূপ প্রায় সব পৌত্তলিক খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়। বর্বরদের আক্রমণের পরও খ্রিস্ট ধর্ম বেঁচে থাকে। রাশিয়ার মার্কসীয় ধর্মমত দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে, কিন্তু অন্যত্র তা সীমাবদ্ধ প্রথম পর্যায়েই।

যা হোক, কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত রয়েছে যে কোনো স্তরে বল প্রয়োগ ছাড়া জনমত গঠনকারী প্রভাবের। বিজ্ঞানের অভ্যুদয় হচ্ছে এগুলোর ভেতর উল্লেখযোগ্য। অধুনা সভ্য দেশগুলোতে বিজ্ঞান রাষ্ট্র কর্তৃক উৎসাহিত হচ্ছে। কিন্তু এর সূচনালগ্নে অবস্থা এ রকম ছিল না। গ্যালিলিওকে তার বিশ্বাস পরিত্যাগে বাধ্য করা হয়। নিউটনকে মিন্টোর প্রভু বানানোর মাধ্যমে থামিয়ে দেয়া হয়। ক্রিস্ট ও এরিস্টটলসহ ইতিহাসে জ্ঞাত অন্যান্য ব্যক্তিত্বের চেয়ে তাদের প্রভাব অনেক বেশি। অন্য একমাত্র ব্যক্তিত্ব যার প্রভাব তুলনামূলকভাবে গুরুত্বের অধিকারী তিনি হচ্ছেন পিথাগোরাস। সন্দেহজনক তার অস্তিত্ব।

আজ প্রথাগত হয়ে পড়েছে মানবীয় কার্যাবলির সহায়ক শক্তি হিসেবে যুক্তি পরামর্শ রহিতকরণ। তারপরও বিজ্ঞানের অভ্যুদয় হচ্ছে অন্য দিকে এক অদম্য শক্তি। বিজ্ঞানজগতের ব্যক্তিরা অপেশাদার বুদ্ধিমান মানুষের কাছে এ কথা প্রমাণ করেন যে, একটি বিশেষ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি সামরিক শৌর্য-বীর্যের সহায়ক। ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনুরাগ ও চার্চের রাজত্ব এবং প্রথাজনিত শক্তি সত্ত্বেও এসব লক্ষ্য এত আগ্রহের সঙ্গে প্রতীক্ষিত হচ্ছিল যে নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অতিক্রম করে যাবে। সূর্যকে স্থির থাকতে বাধ্য করেছিল যশোয়া-এ জাতীয় বিশ্বাস বিশ্ববাণী পরিত্যাগ করেছে। নৌ চলাচলের জন্য উপকারী কোপারনিকাসের জোতির্বিদ্যা। এরিস্টটলের পদার্থবিদ্যা পরিত্যক্ত হলো। কারণ, পড়ন্ত বস্তু সম্পৰ্কীয় গ্যালিলিওর তত্ত্বের দ্বারা ক্যানন বলের গতিপথ বের করা সম্ভব হলো। বন্যার কাহিনী প্রত্যাখ্যান করা হলো, কারণ ভূতত্ত্ববিদ্যা খনিজ সম্পদ উত্তোলনের জন্য উপযোগী। এখন সাধারণভাবে স্বীকৃত হচ্ছে যে, যুদ্ধ এবং শান্তিকালীন শিল্পের জন্য বিজ্ঞান অপরিহার্য এবং বিজ্ঞান ছাড়া কোনো জাতি সম্পদশালী বা ক্ষমতাশালী হতে পারে না।

এসব প্রভাব শুধু মতামতের উপর বিজ্ঞানের বদৌলতে বাস্তবধর্মী আবেদনের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে সাধারণ তত্ত্বের মাধ্যমে বিজ্ঞান যা বলতে চায় তা প্রশ্নাতীত নয়। কিন্তু কৌশলের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফল সবার জন্য উন্মুক্ত। বিজ্ঞান শ্বেতকায় মানুষের এ পৃথিবীর প্রভুত্ব দান করেছিল, কিন্তু তা হারাতে বসে জাপানিরা তাদের কৌশল শিখে ফেললে।

যুক্তি-পরামর্শের ক্ষমতা সম্পর্কে এই দৃষ্টান্ত থেকে কিছু জানা যেতে পারে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুক্তি-পরামর্শ কুসংস্কারের উপর জয়যুক্ত হয়, কারণ তা চলমান উদ্দেশ্য উপলব্ধি পথ প্রদর্শন করে। অধিকন্তু এ ধরনের কাজের পক্ষে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। যারা বলতে চান যে মানবীয় কার্যাবলিতে যুক্তির কোনো ক্ষমতা নেই, তারা এ দুটো যুক্তি অবহেলার চোখে দেখেন। যদি শুধু যুক্তি-পরামর্শের নামে আপনি কোনো লোককে তার মৌলিক উদ্দেশ্য পরিবর্তন করার আহ্বান জানান তাহলে আপনি ব্যর্থ হবেন এবং আপনি ব্যর্থ হতে বাধ্য, কারণ, শুধু যুক্তি পরার্মশই জীবনের লক্ষ্য নিরূপণ করতে পারে না। প্রোথিতমূল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আপনার আক্রমণ একইভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে যদি আপনারা যুক্তিগুলো প্রশ্নাতীত না হয় অথবা এত কঠিন না হয় যে শুধু বিজ্ঞানের ছাত্ররাই এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। প্রত্যেক সুস্থ ব্যক্তির কাছে বিশ্বাসযোগ্য দৃষ্টান্ত দ্বারা আপনি প্রমাণ করতে পারেন যে, আপনি বিদ্যমান আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে সক্ষম, তবে আপনি আশা করতে পারেন যে আপনি যা বলবেন মানুষ তা বিশ্বাস করবে। অবশ্য এতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে যে, আপনি যেসব আশা পূর্ণ করতে সক্ষম তা যারা ক্ষমতালাভে সক্ষম তাদের।

মানবীয় কার্যাবলির ক্ষেত্রে এগুলো হচ্ছে বিচার-বুদ্ধিজাত ক্ষমতা। আমি এখন আলোচনা করব অন্য এক প্রকার বলহীন যুক্তি-পরামর্শ সম্পর্কে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ধর্ম প্রচারকদের যুক্তি-পরামর্শ সম্বন্ধে। মামুলি ফর্মুলায় পর্যবসিত পদ্ধতি হচ্ছে : যদি বিশেষ উপপাদ্য সত্য হয় তবে আমি আমার আকাঙ্ক্ষা পূরণে সমর্থ হব। আমি আশা করি যে, এই উপপাদ্যটি সত্য হবে; সুতরাং আমার ব্যতিক্রমধর্মী বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মনিয়ন্ত্রণ না থাকলে আমি একে সত্য বলে বিশ্বাস করব। আমাকে বলা হয়েছে যে, গোঁড়ামি ও ধর্মীয় জীবনযাপন মৃত্যুর পর আমাকে স্বর্গে যাওয়ার সামর্থ্য যোগাবে। এ রকম বিশ্বাসের পেছনে আনন্দ রয়েছে এবং সম্ভবত আমি তা বিশ্বাস করব যদি জোরেশোরে তা আমার কাছে উপস্থাপন করা হয়। এই বিশ্বাসের কারণ বিজ্ঞানের সত্য তথ্যের মতো নয়, বরং বিশ্বাস থেকে প্রাপ্ত আনন্দানুভূতি ও তৎসমেত বিশ্বাস জন্মানোর নিমিত্ত প্রাণশক্তি, যা অবিশ্বাসযোগ্য করে তোলে না ওই পরিবেশে।

প্রচারাভিযানের ক্ষমতা এই শিরোনামে ধরা পড়ে। এমন দিলে বিশ্বাস করা আনন্দদায়ক, কারণ তা আপনাকে আশা প্রদান করে ভালো স্বাস্থ্যের। এগুলো বিশ্বাস করা সম্ভব যদি আপনি দেখতে পান যে এগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জোরেশোরে ঘন ঘন ঘোষণা করা হচ্ছে। সঙ্গত প্রচারণার মতো অসঙ্গত প্রচারণা ও অবশ্য মানুষের অনুভূতিকে নাড়া দেয়। কিন্তু সত্যের প্রতি আবেদনের পুনর্ব্যক্ততার প্রতিকল্প স্বরূপ এগুলো।

বাস্তব ক্ষেত্রে এত পরিষ্কার নয় উপরোল্লিখিত বিশ্লেষণের মতো যৌক্তিক ও অযৌক্তিক আবেদনের ভেতর পার্থক্য। চূড়ান্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট না হলেও স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান কিছু যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ। অযৌক্তিক অবস্থা বিরাজ করে কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপের ভেতর। প্রথাগত না হলে বিশ্বাস আকাঙ্ক্ষা, প্রমাণ ও পুনর্ব্যক্ততার সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়ে থাকে। আকাক্ষা ও প্রমাণের অভাব হলে বিশ্বাস অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে গুরুত্ব আরোপিত না হলে বিশ্বাস ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য নিয়ে আবির্ভূত হয়। ধর্মের প্রবর্তক, বিজ্ঞান আবিষ্কর্তা ও পাগলের বৈশিষ্ট্যের অনুরূপ এইগুলো।

ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা অর্জন করেন পুনর্ব্যক্ততার শক্তি বলে বিশ্বাস প্রভাবিত করার সামর্থ্য। অফিসিয়াল প্রচারণার রয়েছে নতুন ও পুরনো রূপ। চার্চের কৌশল অনেক দিক দিয়েই প্রশংসার যোগ্য; কিন্তু তা ছাপাখানা আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত উন্নতি লাভ করে। এ কারণে আগের মতো ফলপ্রদ নয়। বহু শতাব্দী ধরে রাষ্ট্র বিশেষ বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে : মুদ্রার উপর রাজার মাথা, রাজ্যাভিষেক এবং জুবিলি, পদাতিক ও নৌবাহিনীর প্রদর্শনমূলক ক্রিয়াকলাপ ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো শিক্ষা, সংবাদ মাধ্যম, সিনেমা, রেডিও ইত্যাদির মতো আধুনিক পদ্ধতিগুলোর চেয়ে অনেক কম শক্তিসম্পন্ন। সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রগুলোতে এগুলো চরমভাবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এত শিগগির এগুলো .মূল্যায়ন সম্ভব নয়।

আমি বলেছিলাম, আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে হৃদয়বৃত্তিতে নাড়া দিতে পারে না প্রচারণা। তা প্রমাণ করা যেতে পারে জাতীয়তাবোধের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রচারণা ব্যর্থতার দ্বারা। দৃষ্টান্ত স্বরূপ যুদ্ধপূর্ব অস্টিয়া, হাঙ্গেরির বৃহদংশ, ১৯৯২ সাল পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড এবং বর্তমান যুগ পর্যন্ত ভারতে সংঘটিত ঘটনাবলি উল্লেখ করা যায়। প্রচারণা সফল হয় রোগীর হৃদয়ানুভূতির সঙ্গে ঐকতান সৃষ্টি করলেই। মৌন সম্মতির এ ধরনের কোনো মৌল কারণ না থাকলে কর্তৃপক্ষের দাবি নিন্দার চোখে দেখা হয়। সরকারি দৃষ্টিকোণ থেকে গণতন্ত্রের সুবিধা হচ্ছে, এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করা সহজ; কারণ, তারা গণতান্ত্রিক সরকারকে নিজের সরকার মনে করে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের বিরুদ্ধাচরণ অন্যান্য শাসন পদ্ধতির চেয়ে গণতন্ত্রে কম। গণতন্ত্রে অধিকাংশ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে যেতে পারে কঠিন ও নীরস নেতা নির্বাচনের জন্য নিজেদের ভুল স্বীকারের মাধ্যমে।

গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে পদ্ধতিগত ব্যাপকভিত্তিক প্রচারণা বর্তমানকালে চার্চ, ব্যবসা, রাজনৈতিক দল, প্রটোক্র্যাসি এবং রাষ্ট্রের ভেতর হয়ে পড়েছে বিভক্ত। বিরোধী রাজনৈতিক দল ছাড়া এসব শক্তি একই পক্ষে থাকে। বিরোধী দলগুলোও ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পেলে রাষ্ট্রীয় প্রচারণা মৌল বিষয়গুলোর বিরোধিতা করে না। সর্বগ্রাসী দেশগুলোতে রাষ্ট্রই একমাত্র প্রচারক। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না আধুনিক প্রচারণার সর্বপ্রকার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর অফিসিয়াল দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপকভাবে গৃহীত হবে। জাতীয় অনুভূতি বিরোধী সরকারের মতোই এ ধরনের অবস্থার ফলে জন্ম নেয় সরকারের ব্যর্থতাবোধ। যুদ্ধোন্মদনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যত বেশি জয়ের ভরসা দেয়া হয় জয়ের সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায় হলে প্রতিক্রিয়া তত বেশি হয়। সুতরাং আশঙ্কা করা হয় যে, বিগত যুদ্ধের মতো পরবর্তী যুদ্ধ বিপ্লবের বীজ ছাড়ানোর মাধ্যমে সমাপ্ত হবে। যুদ্ধ আরও বেশি ধ্বংসাত্মক হবে বিধায় ১৯১৭ ও ১৯১৮ সালে বিপ্লবের চেয়েও বেশি ভয়ানক হবে। শাসকরা উচ্ছঙ্খল জনতার হাতে মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে বুঝতে পারেন, যা শত্রুর হাতে সৈন্যদের মৃত্যুর ঝুঁকির সমান।

ক্ষমতার উচ্চ মূল্যায়ন সহজ অফিসিয়াল প্রচারণায়, বিশেষত যখন কোনো প্রতিযোগিতামূলক প্রচারণা থাকে না। সময়মতো যেসব উপপাদ্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যায় ওইসব মিথ্যা উপপাদ্যে বিশ্বাস জন্মানোর লক্ষ্যে অফিসিয়াল প্রচারণা নিবেদিত হলে এর অবস্থান গ্যালিলিওর বিরুদ্ধবাদী এরিস্টটলের অনুসারীদের মতোই খারাপ হয়। বিরোধী দুটো রাষ্ট্রশক্তির প্রত্যেক পক্ষই যদি মানুষের মনে নিশ্চিত যুদ্ধ জয়ের প্রচারণা চালায় তবে উভয় পক্ষ না হলেও একপক্ষ অবশ্যই নাটকীয়ভাবে অফিসিয়াল বিবৃতি খন্ডনের অভিজ্ঞতা লাভ করবে। যখন সব বিরোধী প্রচারণা নিষিদ্ধ থাকে তখন শাসকদের মনে করা স্বাভাবিক যে, তা সৃষ্টি করতে পারে যে কোনো ধরনের বিশ্বাস। সুতরাং অসতর্ক হয়ে পড়ে অতিমাত্রায় ধারণা পোষণ করে। শক্তি বজায় রাখতে হলে প্রয়োজন মিথ্যাগুলোর ভেতর প্রতিযোগিতা।

ক্ষমতা রাষ্ট্রের একচেটিয়া অধিকারভুক্ত হয় মতামতের উপর একীভূত ও ঘনীভূত হয়ে। কিন্তু এটা মনে করা যুক্তিসঙ্গত হবে না যে, যুদ্ধ ছাড়া অন্য সময়েও রাষ্ট্রের একচেটিয়া প্রচারের ফলে সরকার অজেয় হবে। লুথারীয় যুগের পোপদের মতো পরিণামে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা সাধারণ লোকের স্বার্থের প্রতি অতিশয় উদাসীন হয়ে পড়তে পারেন। শিগগির অথবা বিলম্বে কোনো নতুন লুথার রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তুলবেন এবং তার পূর্বসূরিদের মতো এত দ্রুত সফল হবেন যে তাকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ রকম হবে কারণ, শাসকরা মনে করেন যে এ রকম কিছু ঘটতে পারে না। কিন্তু এ রকম পূর্বাভাস পাওয়া অসম্ভব যে মঙ্গলের জন্য পরিবর্তনটি।

অন্য কিছুর মতো বিপ্লব বিলম্বিত হয়ে প্রচারণার ব্যাপারে সংগঠন ও একত্রীকরণের প্রভাবে, কিন্তু যখন তা ঘটে তখন তা অধিকতর প্রচন্ড হয়ে থাকে। শুধু একটি মতবাদ অফিসিয়াল অনুমোদন পেলে বিকল্প মতবাদের চিন্তা ও তার তুলনামূলক গুরুত্ব নিরূপণের সুযোগ পায় না। শুধু আবেগপ্রসূত বিদ্রোহের মহাজোয়ার গোঁড়ামি দূর করতে পারে। মনে হয় সফলতা অর্জনের উদ্দেশ্যে সরকারি মতবাদের মধ্যেও সত্য জিনিসটি অগ্রাহ্য করা প্রয়োজন বিরোধিতাকে যথেষ্ট একাগ্র ও প্রচন্ড করে তোলার জন্যে। শুধু যে জিনিসটি অগ্রাহ্য করা যাবে

তা হচ্ছে কোনো অব্যাহত গোঁড়ামি প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব, কারণ বিজয়ের জন্য তা মনে করা হয় প্রয়োজনীয়। যুক্তিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে তাই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রে বিপ্লবের সম্ভাব্যতা আনন্দের অপরিহার্য ভিত্তি নয়। এর অধিক যা আশা করতে হয় তা হচ্ছে নিরাপত্তা অপরিহার্য ভিত্তি নয়। এর অধিক যা আশা করতে হয় তা হচ্ছে নিরাপত্তা বোধের ক্রমবৃদ্ধি। এটি উৎসাহ কমিয়ে দেবে এবং উন্মুক্ত করবে অলসতার দ্বার। সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের এটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

১০. ক্ষমতার উৎস : ধর্মমত

লোকসংখ্যা, অর্থনৈতিক উৎসগুলো এবং কৌশলগত যোগ্যতার উপরই শুধু নির্ভর করে না একটি সম্প্রদায়ের ক্ষমতা, নির্ভর করে সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরে বিরাজমান বিশ্বাসের উপরও। কখনও জনগণের অন্ধ বিশ্বাস সম্প্রদায়ের ক্ষমতা প্রভূত বৃদ্ধি করে আবার কখনও তা হ্রাস করে দেয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর চেয়ে বর্তমান সমাজে ধর্মোন্মাদনা ব্যাপকতা লাভ করেছে, তাই ক্ষমতার যুক্তি হচ্ছে, ঐক্যবদ্ধ উন্মাদ জাতির চেয়ে যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনা বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠ সুস্থ। জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত জাতির। এ যুক্তির বিচার করা যাক ইতিহাসের আলোকে।

শুরুতে এটা লক্ষণীয়, ব্যর্থতার ক্ষেত্রগুলো উন্মাদনার সফল ক্ষেত্রগুলোর চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম জ্ঞাত। কারণ ব্যর্থতার ক্ষেত্রগুলো অপেক্ষাকৃত অস্পষ্ট রয়েছে। সুতরাং ভুল হতে বাধ্য ত্বরিত পরীক্ষণ। কিন্তু তা এড়ানো কঠিন নয় যদি আমরা সম্ভাব্য ভুলের উৎস সম্বন্ধে অবহিত হই।

ইসলামের অভ্যুদয় হচ্ছে ধর্মোন্মাদনার মাধ্যমে ক্ষমতালাভের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত। আরবদের সম্পদ ও জ্ঞানে নতুন কিছুই যোগ করেননি মোহাম্মদ (সঃ)। তারপরও তার মৃত্যুর কিছুদিনের ভেতর তার অনুসারীরা শক্তিশালী প্রতিবেশিদের পরাজিত করে প্রতিষ্ঠা করে বিশাল সাম্রাজ্য। নিঃসন্দেহে নবী (সাঃ) কর্তৃক প্রবর্তিত ধর্মই তার জাতির বিজয়ের অপরিহার্য উপাদান। জীবনের শেষদিকে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেন বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। মুসলমানরা নিরুৎসাহিত ছিল : তারা ইঙ্গিত করল অর্থ, ঘোড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবের দিকে। তারা আরও বলল যে, এটা ফসল কাটার সময় এবং গ্রীষ্মের অসহনীয় গরম। নবী ঘৃণাভরে উচ্চারণ করলেন, নরকের আগুন এর চেয়েও গরম। তিনি ঘৃণার চোখে দেখতেন বাধ্যতামূলক সেবা গ্রহণ। কিন্তু ফিরে এসে পঞ্চাশ দিনের জন্য সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কার করে চরম অপরাধীদের শাস্তি দেন। মোহাম্মদ (সঃ)-এর জীবিতাবস্থায় এবং তার মৃত্যুর পর কয়েক বছর পর্যন্ত ধর্মোন্মদনার মাধ্যমে আরব জাতির ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যুদ্ধে আত্মবিশ্বাস জন্মে। অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে বেহেস্ত পাওয়া যাবে-সাহস সঞ্চার করা হয় এ ধরনের বিশ্বাস জন্মানোর মাধ্যমে।

কিন্তু উন্মাদনা যদিও প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোতে আরবদের প্রেরণা দান করে, তারপরও অন্যান্য বিষয়ের ভূমিকা রয়েছে তাদের দীর্ঘ বিজয়ের ইতিহাসে। বাইজেনটাইন ও পারস্য দুটোই দুর্বল হয়ে পড়েছিল সিদ্ধান্তহীন দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে। রোমান সৈন্যরা সব সময়ই দুর্বল ছিল এবং অশ্বারোহণে তাদের অনীহা ছিল। আরব অশ্বারোহীরা অবিশ্বাস্যরকম দ্রুতগতিসম্পন্ন ছিল এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কষ্টসহিষ্ণু হয়ে উঠত, যা অসহনীয় ছিল তাদের বিলাস প্রিয় প্রতিবেশিদের কাছে। এসব অবস্থা অপরিহার্য ছিল মুসলমানদের প্রাথমিক সাফল্যের জন্য।

খুব শিগগিরই উন্মাদনামুক্ত করা হলো সরকার। নবী (সঃ)-এর জামাতা হযরত আলী (রাঃ) বিশ্বাসীদের একটি সম্প্রদায়ের ভেতর মূল উন্মাদনা জিইয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি গৃহযুদ্ধে পরাজিত হন এবং শেষ পর্যন্ত শহীদ হন। তারপর খেলাফতে অধিষ্ঠিত হলো নবী (সঃ)-এর ঘোর বিরোধী উমাইয়া পরিবার। কিন্তু ধর্মে তাদের রাজনৈতিক সম্মতি ছাড়া বেশি কিছু ছিল না। মোহাম্মদ (সঃ)-এর নির্যাতনকারীরা জোরপূর্বক দখল করল তার সন্তানদের উত্তরাধিকার এবং তার ধর্ম ও রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তা হয়ে বসল প্রতিমা পূজারিরা। বিরোধিতায় আবু সুফিয়ান দুর্দান্ত ও অনড় ছিলেন। তার ধর্ম গ্রহণ ধীরগতিসম্পন্ন ও অনিচ্ছাকৃত ছিল। প্রয়োজন ও স্বার্থ দ্বারা সমর্থিত ছিল তার নতুন বিশ্বাস। তিনি যুদ্ধ করেন এবং সেবা দান করেন এবং সম্ভবত তিনি বিশ্বাসও করতেন। উমাইয়া পরিবারের যোগ্যতার দ্বারা অন্ধকার যুগের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হলো। এ মুহূর্ত থেকে অনেক দিন পর্যন্ত খেলাফত মুক্ত চিন্তার জন্য চিহ্নিত হয়ে রইল। কিন্তু খ্রিস্টানরা উন্মাদ রয়ে গেল। প্রথম থেকেই মোহাম্মদ (সঃ)-এর অনুসারীরা বিজিত খ্রিস্টানদের সঙ্গে তাদের আচরণে সংযমের পরিচয় দেন। এই সংযম খ্রিস্টানদের নির্যাতনস্পৃহার প্রবল বিরোধী। তাদের বিজয় ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রধান কারণ ছিল এই সংযম।

ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে স্বাধীনতাবাদীদের বিজয় হচ্ছে উন্মাদনার এই আপাত সাফল্যের অন্য একটি উদাহরণ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে যে, উন্মাদনার কতটুকু ভূমিকা ছিল ক্রমওয়েলের সাফল্যে? বাজার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পার্লামেন্ট এজন্য বিজয়ী হয় যে লন্ডন ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো এর পক্ষে ছিল; জনশক্তি ও অর্থ সম্পদের দিক দিয়ে তা রাজাকে অনেক দূর অতিক্রম করে গিয়েছিল। মধ্যপন্থিদের মতো প্রেসবাইটেরিওয়অরা বিপ্লবের ফলে ক্রমাগতভাবে একদিকে চলে যায়, কারণ, তারা সর্বান্তকরণে বিজয়ের প্রত্যাশা করছিল না। ক্রমওয়েল একজন বাস্তব রাজনীতিবিদ হয়ে পড়েন ক্ষমতা অর্জনের পর এবং উদ্বিগ্ন ছিলেন সংকটাবস্থাকে সর্বোত্তম পন্থায় কাজে লাগানোর ব্যাপারে। কিন্তু তিনি তার অনুসারীদের উন্মাদনা উপেক্ষা করতে পারেননি, যা এতই অপ্রিয় ছিল যে পরিণামে এর জন্যেই তার দলের পতন হয়। এ কথা বলা যাবে না যে, উন্মাদনা ইংলিশ স্বাধীনতাবাদীদের চেয়ে তাদের পূর্বসূরিদের সাফল্যে বেশি কিছু করেছে।

ব্যাপক ভিত্তিতে ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস ইংল্যান্ডের অনুরূপ : উন্মাদনা, বিজয়, পতন ও প্রতিক্রিয়া। এমনকি অনুকূল এই দুই দৃষ্টান্তে ক্ষণস্থায়ী ছিল উন্মাদনার দৃষ্টান্ত।

সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতা অনেক বেশি উন্মাদদের। এটি টিটাসের সময় জেরুজালেম ধ্বংস করে এবং ১৪৫৩ সালে ধ্বংস করে কনস্টান্টিনোপল। প্রাচ্য ও প্রতিচ্যের চার্চগুলোর ভেতর তুচ্ছ পার্থক্য থাকায় প্রতিচ্যকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। প্রথমত স্পেনের পতন ঘটায় ইহুদি ও মুরদেরকে বিতাড়নের মাধ্যমে এবং পরে নেদারল্যান্ডে বিদ্রোহ ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। অপরদিকে বর্তমান যুগব্যাপী ওইসব জাতিই সফল হচ্ছে যারা ভিন্ন মতাবলম্বীদের নির্যাতনে সবচেয়ে কম আসক্ত।

তা সত্ত্বেও আজকাল ব্যাপকতা লাভ করেছে একটি কথা, সুষম মতবাদ অপরিহার্য জাতীয় সংহতির জন্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয় জার্মানি ও রাশিয়ায় কঠোরতার সঙ্গে এবং ইতালি ও জাপানের কিছুটা শৈথিল্যের সঙ্গে। গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্সে অনেক ফ্যাসিবাদ বিরোধীরাই এই মতবাদ পোষণ করেন যে মুক্তিচিন্তাই হচ্ছে সামরিক দুর্বলতার উৎস। আরও একবার এই প্রশ্নের পর্যালোচনা করা যাক অধিক তত্ত্বগতভাবে এবং বিশ্লেষণাত্মক ঢঙে।

আমি যে প্রশ্ন সম্পর্কে বলছি তা ব্যাপক কিছু নয়। মুক্তচিন্তাকে উৎসাহিত। করা উচিত কি-না অথবা কমপক্ষে তা কি সহ্য করতে হবে? আমি একটি ছোট প্রশ্ন করছি : ক্ষমতার উৎস হিসেবে (স্বতঃস্ফূর্ত বা আরোপিত) সুষম ধর্মমতের ব্যাপ্তি কতটুকু? অপরপক্ষে এর ব্যাপ্তি কতটুকু ক্ষমতার উৎস হিসেবে?

১৯০৫ সালে যখন ব্রিটিশরা তিব্বতে সামরিক অভিযান চালায় তখন প্রথমে সাহসের সঙ্গে অগ্রসর হয় তিব্বতীয়রা, কারণ লাগামবাদীরা বুলেটের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ দান করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা হতাহত হলে লাগামবাদীরা দেখল যে বুলেটের অগ্রভাগ নিকেলের তৈরি। তখন ব্যাখ্যা দেয়া হলো যে শুধু সিসার ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ প্রযোজ্য। এরপর খুব কম সাহস প্রদর্শন করে তিব্বতীয়রা। বেলাকুন এবং পিজনার যখন কমিউনিস্ট বিপ্লব করেন তখন তারা আশ্বস্ত ছিলেন যে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে দ্বান্দ্বিক মতবাদ। আমি ভুলে গিয়েছি যে লাগামবাদীরা কমিনটার্নের ব্যর্থতার কি ব্যাখ্যা দিয়েছিল? এ দুটো দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায় যে বিজয় লাভে ব্যর্থ সুষম বিশ্বাস।

এ ব্যাপারে সত্যে পৌঁছাতে হলে দুই বিপরীত উক্তির ভেতর আপস মীমাংসা করা প্রয়োজন। এর প্রথমটি হচ্ছে, বিশ্বাসের অনুবর্তী মানুষ ভিন্ন মতাবলম্বীদের চেয়ে অধিক আগ্রহের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ভ্রান্ত বিশ্বাসের চেয়ে সত্য বিশ্বাসের অনুসারীদের সাফল্যলাভের সম্ভাবনা বেশি। এই দুই উক্তি পরীক্ষা করব আমরা।

এটা স্পষ্ট যে, সহযোগিতার সহায়ক হলো ঐকমত্য। স্পেনের গৃহযুদ্ধে এনার্কিস্ট, কমিউনিস্ট ও বাস্ক জাতীয়তাবাদীদের ভেতর সহযোগিতা কঠিন ছিল, যদিও তারা সবাই কামনা করে ফ্রাঙ্কোর পরাজয়। একটু কম হলেও অনুরূপভাবে কার্লিস্ট ও আধুনিক ফ্যাসিবাদীদের ভেতর সহযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ে। অব্যবহিত লক্ষ্য সম্পর্কে ঐকমত্য ও মেজাজগত সাদৃশ্য থাকলে অন্যান্য বিষয়ে মতপার্থক্য ক্ষতিকর নয়। পেনিনসুলার যুদ্ধের ঐতিহাসিক স্যার উইলিয়াম নেফিয়ার নেপোলিয়নের প্রশংসা করেছেন এবং ওয়েলিংটনের নিন্দা করেছেন। তার লিখিত বই থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন নেপোলিয়নের পরাজয়কে। কিন্তু তার সাম্প্রদায়িক চেতনা ও সামরিক কর্তব্যানুভূতি বাতিল করে দেয় এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তি। তিনি উচ্চ রক্ষণশীল রাজনীতিকদের মতো দক্ষতার সঙ্গে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। সুযোগ এলে আজকাল হিটলারের বিরুদ্ধে তেজোবীর্যের সাথে যুদ্ধ করবে ব্রিটিশ টরিরা।

একটি জাতি, ধর্ম বা দলের ক্ষমতালাভের জন্য জরুরি মেজাজ ও অভ্যাসের উপর নির্ভরশীল সমতা। যেখানে এর অস্তিত্ব রয়েছে সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাসের প্রয়োজন নেই। গ্রেট ব্রিটেনে এর অস্তিত্ব বিদ্যমান কিন্তু সেখানে তা ছিল না ১৭৪৫ সাল পর্যন্ত। ১৯৭২ সালে ফ্রান্সে অথবা বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধের সময় রাশিয়ায় এর অস্তিত্ব ছিল না। এ মুহূর্তে এর অস্তিত্ব নেই স্পেনে। কার্যক্ষেত্রে আনুগত্যের উপর নির্ভর করতে পারলে একটি সরকারের পক্ষে মুক্ত চিন্তার অনুকূলে সম্মতি প্রদান করা কঠিন নয়। কিন্তু বিষয়টি জটিল হয়ে যেতে পারে সম্মতি প্রদানে অনিচ্ছার দরুন। এটা স্পষ্ট যে, গৃহযুদ্ধের সময় স্বাধীন প্রচারণা অসম্ভব, কিন্তু আসন্ন গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রচারণা নিষিদ্ধকরণের যুক্তিগুলো কম আকর্ষণীয়। জোরালো যুক্তি বিদ্যমান মারাত্মক পরিবেশে আরোপিত সমস্যার পক্ষে।

এখন ধরা যাক দ্বিতীয় উক্তিটি। সত্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিশ্বাসগুলো নেয়াই সুবিধাজনক। সরাসরি সুবিধা সম্ভব শুধু সীমিত শ্রেণির বিশ্বাসের বেলায়। প্রথমত উচ্চ বিস্ফোরক দ্রব্য ও বিষাক্ত গ্যাসের মতো বিষয়গুলো এবং পরে ধরা যেতে পারে বিরোধী শক্তিগুলোর আপেক্ষিক ক্ষমতা-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো। এসব বিষয় সম্পর্কেও বলা যেতে পারে যে, শুধু নীতি ও সামরিক ক্রিয়াকলাপ নির্ধারণে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন : আশা করা যায় যে জনগণ বিজয়ের নিশ্চয়তা অনুভব করবে এবং বিমান ও আক্রমণপ্রসূত বিপদের গুরুত্ব কমই দেবে। সত্য সম্পর্কে অবহিত হবেন শুধু সরকার, সামরিক কর্তাব্যক্তি ও তাদের কুশলীরাই। অন্যান্য মানুষের ভেতর সর্বাধিক কাম্যআত্মবিশ্বাস ও অন্ধভাবে বাধ্য থাকা।

যদি দাবার মতো হিসাব করা যেত মানবীয় কার্যকলাপ এবং যদি রাজনীতিবিদ ও যুদ্ধবিশারদরা দাবা খেলোয়াড়দের মতো চতুর হতেন তাহলে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা সত্য থাকত। সফল যুদ্ধের সুবিধাগুলো সন্দেহজনক, কিন্তু ব্যর্থ যুদ্ধের অসুবিধাগুলো নিশ্চিত। সুতরাং যদি অসাধারণ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি আগেভাগেই বুঝতে পারতেন যে অমুক যুদ্ধে জয়লাভ করতে যাচ্ছেন তাহলে কোনো যুদ্ধই হতো না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং প্রতিটি যুদ্ধেই সম্ভাব্যতার ভুল হিসাবটি করে থাকেন উভয় পক্ষের সরকার না হলেও এক পক্ষের সরকার। এর অনেক কারণ রয়েছে–গর্ব, অহংকার ও ছোঁয়াচে উত্তেজনা। যখন জনমনে অন্ধ বিশ্বাস জিইয়ে রাখা হয় তখন জনগণের এই বিশ্বাস ও মারমুখো ভাব সম্বন্ধে শাসকদের সহজেই অবহিত করা যেতে পারে। খুব কমই এইসব অপ্রিয় সত্যের মূল্যদিয়ে থাকেন শাসক শ্রেণি, তা তারা জানেন অথচ গোপন রাখেন। তবে সংবাদপ্রিয় অথবা কতোপকথনে ঘোষিত প্রিয় সত্য বিষয়ের যথার্থ মূল্যায়ন করে থাকেন। সৃষ্টি হচ্ছে বায়ুরোগ ও অহংভাবের বাতিক; রেহাই নেই সরকারের।

গোপনীয়তার জন্য সৃষ্ট ফলাফল আকাঙ্ক্ষিত ফলাফলের ঠিক বিপরীত হয় যুদ্ধ সংঘঠিত হলে। মানুষের কাছ থেকে গোপন করে রাখা অপ্রীতিকর সত্যের কিছু কিছু সর্বসাধারণের কাছে স্পষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং মানুষকে যতই সুখের স্বর্গে বসবাসের প্রতিশ্রুতি দেয়া হোক না কেন, তারা ততই আতঙ্কিত ও নিরুৎসাহিত হয় বাস্তব সত্যের দ্বারা। এইভাবে বেড়ে যায় বিপ্লব এবং আকস্মিক পদচ্যুতির সম্ভাবনা।

বুদ্ধিবৃত্তির জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায় অধীনস্তদের জোরপূর্বক বিশেষভাবে আচরণ দেখাতে বাধ্য করা হলে। বাহ্যিকভাবে হলেও অযৌক্তিক মতবাদ গ্রহণ যে সমাজে স্বাভাবিক সে সমাজে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তিকে বিরাগভাজন হতে হয়। ফলে ওই সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক মান কমে এবং তা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় কৌশলগত অগ্রগতির পথে। এর সত্যতা বিশেষভাবে প্রমাণিত হয় যখন অফিসিয়াল ধর্মমত এমন হয় যে, তা গ্রহণ করতে পারে খুব কম সংখ্যক মানুষই। নাজিরা অনেক যোগ্য জার্মান নাগরিককে নির্বাসিত করেছে। আজ হোক কাল হোক এর প্রভাব পড়বেই সামরিক কৌশলের উপর। বিজ্ঞান ছাড়া অসম্ভব দীর্ঘ অগ্রগতি। আবার চিন্তার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার অভাব হলে অগ্রগতি অসম্ভব। ফলে এই বিজ্ঞানের যুগে যুদ্ধ ভিন্ন অন্য সব ক্ষেত্রে মতামত সংক্রান্ত সমতার প্রচেষ্টা পরিশেষে সামরিক দক্ষতার সর্বনাশ সাধন করে।

আমরা এখন আসতে পারি এ দুটো গতানুগতিক উক্তির বাস্তব সংশ্লেষণে। সামাজিক বন্ধনের জন্য প্রয়োজন একটি ধর্মমত অথবা আচার-আচরণের একটি প্রচলিত রীতি অথবা প্রভাবশালী ভাবপ্রবণতা অথবা এ তিনের সংমিশ্রণ। একটি সম্প্রদায় ভেঙে পড়তে পারে এর কোনো একটি না থাকলে। ফলে কোনো অত্যাচারী বা বিদেশি শক্তির অধীন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এ ধরনের বন্ধন কার্যকরি হলে একে গভীরভাবে অনুভব করে নেয়া প্রয়োজন, তা বলপূর্বক আরোপিত হতে পারে সংখ্যালঘুর উপর, যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ব্যতিক্রমী বুদ্ধিবৃত্তি বা নৈতিকতার দিক দিয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ না হয়। তবে তা অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠের ভেতর খুঁটি ও স্বতঃস্ফূর্ত হবে। ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সামাজিক সংহতির উপায় হচ্ছে নেতার প্রতি আনুগত্য, জাতীয় গৌরব এবং ধর্মীয় উৎসাহ। কিন্তু নেতার প্রতি আনুগত্য আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন অপেক্ষাকৃত কম স্থায়ীভাবে কার্যকর। তার কারণ বর্তমানে সার্বভৌমত্বের উত্তরাধিকার হ্রাস পেয়েছে এবং মুক্তচিন্তার প্রসারের ফলে ধর্মীয় উৎসাহে ভাটা পড়েছে। সুতরাং একমাত্র জাতীয় গৌরব রয়ে গেল এবং তা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। খ্রিস্টবাদের মতো এত অধিক না হলেও এই অনুভূতির পক্ষে ক্ষতিকর অফিসিয়াল ধর্মমত থাকা সত্ত্বেও সোভিয়েত রাশিয়ায় লক্ষণীয়ভাবে আগ্রহের সৃষ্টি করেছে এর পুনরাবির্ভাব।

স্বাধীনতার উপর কতটুকু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন জাতীয় গৌরব রক্ষার জন্য? মুলত হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য তা-ই। রাশিয়ায় মনে করা হয় যে, যারা অফিসিয়াল মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন রাষ্ট্রদ্রোহিতার আচরণ দেখানোই স্বাভাবিক তাদের পক্ষে। ইতালি ও জার্মানিতে সরকারের শক্তি নির্ভর করে সরকারের জাতীয়তাবাদী আচরণের উপর এবং যে কোনো বিরোধিতাই মস্কোর স্বার্থে হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। ফ্রান্সে স্বাধীনতাহানি ঘটলে বুঝতে হবে যে তা সম্ভবত জার্মানপন্থিদের বিশ্বাসঘাতকতা রোধের লক্ষ্যে করা হয়েছে। এসব দেশে শ্রেণি সংঘাতগুলোকে অতিক্রম করে যায়। ফলে গণতান্ত্রিক দেশে পুঁজিপতি এবং ফ্যাসিবাদী দেশে সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী দল জাতীয় স্বার্থ ভিন্ন অন্য স্বার্থের চেতনায় পরিচালিত হয়। এই সমস্যা কঠিন সরকারের জন্য। কারণ, জাতীয়তাবাদ একটি মূর্খতাপূর্ণ আদর্শ ও বুদ্ধিজীবীরা অনুধাবন করেন যে তা ধ্বংস এনেছে ইউরোপে। সবচেয়ে ভালো সমাধান হচ্ছে যে গণতন্ত্র কমিউনিজম বা সমষ্টিগত নিরাপত্তার মতো আন্তর্জাতিক স্লোগানের ছদ্মাবরণে নিয়ে আসে। জার্মানি ও ইতালির মতো যেসব দেশে তা করা যায় না, বাহ্যিক সমতা সেখানে অত্যাচারের জন্ম দেয়, কিন্তু জন্ম দেয় না বৈধ অন্তর্মুখী চেতনার। সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছে সামাজিক সংহতির জন্য অপরিহার্য কোনো একটি ধর্মমত। কিন্তু শক্তির উৎস হতে হলে অধিকাংশ জনগোষ্ঠী এবং কিছু সংখ্যক কুশলীদের দ্বারা তা অনুভূত হতে হবে একান্ত গভীরভাবে। যেখানে এ ধরনের অবস্থা নেই সরকার সেখানে বিপচন ও নির্যাতনের মাধ্যমে তা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু বিপচন ও নির্যাতন কঠোর হলে তা বাস্তবতার বাইরে চলে যেতে পারে এবং বাধ্য করে গুরুত্বপূর্ণ সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে অথবা তা ভুলে যেতে। যেহেতু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা ক্ষমতার তাড়না দ্বারা প্রভাবিত সেহেতু স্বাধীনতার উপর যে পরিমাণ হস্তক্ষেপ জাতীয় শক্তির জন্য সবচেয়ে সহায়ক-তা সবসময়ই সরকারগুলোর বিশ্বাসের তুলনায় কম। তাই অরাজকতায় পর্যবসিত না হলে জাতীয় সংহতি বৃদ্ধি করতে পারে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বিকীর্ণ অনুভূতি। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া এসব চলে যেতে পারে সার্বজনীনতার বাইরে।

 ১১. সংগঠনের ইতিবৃত্ত

এ পর্যন্ত আমরা আলোচনা করেছি ক্ষমতার মনস্তত্ত্বগত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস সম্পর্কে : প্রথা, বিশেষত যাজক বা রাজার প্রতি সম্মানরূপে, ভয় এবং ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যা নগ্ন ক্ষমতার উৎস, পুরনো বিশ্বাসের স্থলে নতুন বিশ্বাস যা বিপ্লবী ক্ষমতার উৎস এর ধর্ম বিশ্বাস ও অন্যান্য ক্ষমতার উৎসের ভেতর ঘাত-প্রতিঘাত। এখন আমরা আমাদের আলোচনার নতুন বিভাগে আসছি : ক্ষমতার চর্চার মাধ্যমে সংগঠনগুলোর আলোচনা। প্রথমত জীবনীশক্তিসম্পন্ন। প্রতিষ্ঠান হিসেবে, পরে বিভিন্ন প্রকার ব্যবস্থাপনা সাপেক্ষে এবং পরিশেষে এগুলোর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের জীবনের উপর এগুলোর প্রভাব সম্পর্কে। আমাদের আলোচনার এই পর্বে সংস্থাগুলোকে যতদূর সম্ভব তাদের উদ্দেশ্য ছাড়া বিবেচনা করতে হবে, যেভাবে মানুষ বিবেচিত হয়ে থাকে অস্থিবিদ্যা ও জীব রসায়নে।

সংগঠনগুলোর ইতিবৃত্ত নামক এই পর্বে যা আলোচনা করা হবে তা নির্ভর করছে এই সত্যের উপর যে, সংগঠন হচ্ছে একটি কর্মশীল সংস্থা (Organism), যার জিন আছে এবং ক্ষয় ও বৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের ভেতর প্রতিযোগিতা বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের ভেতর প্রতিযোগিতার মতোই এবং তা মোটামুটিভাবে ডারউইনের পদ্ধতির অনুরূপ দেখা যেতে পারে। কিন্তু এ ধরনের সাদৃশ্যে অন্যান্য জিনিসের মতো অধিক গুরুত্ব দেয়া যাবে না। তা ধারণা দিতে পারে, কিন্তু প্রদর্শিত করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ আমরা ধরে নিতে পারি না যে, সামাজিক সংগঠনগুলোতে অনিবার্য ক্ষয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের।

সামগ্রিকভাবে না হলেও ক্ষমতা প্রধানত নির্ভরশীল সংগঠনের উপর। তা টিকে থাকতে পারে প্লেটো ও গ্যালিলিওর খাঁটি মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতার অনুরূপ সামাজিক প্রতিষ্ঠান ছাড়াই। কিন্তু সাধারণভাবে এ ধরনের ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না চার্চ, রাজনৈতিক দল বা অনুরূপ কোনো সামাজিক সংস্থার দ্বারা প্রচার ও প্রসার না ঘটলে। এ মুহূর্তে আমি বিবেচনার বাইরে রাখব সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কহীন ক্ষমতা।

একই লক্ষ্য অর্জনে নিবেদিত কর্মকাণ্ড সম্পাদনের জন্য সংঘবদ্ধ জনগোষ্ঠীই সংগঠন। তা স্বেচছামূলক হতে পারে একটি ক্লাবের মতো, পরিবার বা ক্লোনের মতো তা স্বাভাবিক জৈবিক গোষ্ঠীভুক্ত হতে পারে, হতে পারে তা রাষ্ট্রের মতো বাধ্যতামূলক। সংগঠনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট বা অস্পষ্ট, চেতনাসম্পন্ন বা অচেতন হতে পারে, তা হতে পারে সামরিক বা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ধর্মীয়, শিক্ষা বা ক্রীড়া সংক্রান্ত। বৈশিষ্ট্য বা উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন প্রত্যেক সংগঠনে রয়েছে ক্ষমতার বিভাজন। অবশ্যই এর একটি সরকার থাকবে এবং তা সিদ্ধান্ত নেবে সারা সংগঠনের নামে। যে উদ্দেশ্যে সংগঠন টিকে থাকে তার সঙ্গে সঙ্গতিশীল যে কোনোভাবে এর ক্ষমতা সংগঠনের একক সদস্যের চেয়ে হয়ে থাকে বেশি। ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে মানব সভ্যতার কৌশলের জটিলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুবিধাগুলো। কিন্তু সবসময়ই কিছুটা স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয় সংঘবদ্ধতার ফলে। আমরা অন্যদের উপর অর্জন করতে পারি বৈধ ক্ষমতা আবার অন্যরাও আমাদের উপর অর্জন করতে পারি বৈধ ক্ষমতা আবার অন্যরাও আমাদের উপর অর্জন করতে পারে ক্ষমতা। ক্রমাগত অধিক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সংগঠনগুলোর-ব্যক্তি বিশেষের নয়। সদস্য সংখ্যা কম না হলেও সংগঠনের সিদ্ধান্তগুলো কার্যকরি করতে হয় সরকার পদ্ধতির মাধ্যমে। শিল্প-পূর্ব সমাজের চেয়ে আধুনিক সভ্য সমাজের জীবনধারায় সরকার আবশ্যিকভাবে পালন করে থাকে অনেক ভূমিকা।

বাস্তবে একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সরকার সম্ভব হলেও তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে ক্ষমতার বিভাজন। যৌথ সিদ্ধান্তে প্রত্যেকের সমান ভূমিকা থাকলে এবং সদস্য সংখ্যা এক লাখ (ধরা যাক) হলে, নিঃসঙ্গ বন্য জীবের মতো অন্যের উপর মোট ক্ষমতার লক্ষতম ভাগ ক্ষমতা থাকে। তা জন্ম দেয় অরাজকতাপূর্ণ জনগোষ্ঠী মনস্তত্ত্ব থেকে ভিন্ন রকম মনস্তত্ত্বের। যেখানে সরকার পুরোপুরিভাবে গণতান্ত্রিক নয় সেখানে বৃদ্ধি পায় মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত হলেও সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণকারী সদস্যের চেয়ে বেশি। একই কথা প্রযোজ্য গণতান্ত্রিক সরকারের নিযুক্ত অফিসিয়ালদের বেলা। সংগঠন যত বড় হবে নির্বাহীদের ক্ষমতা হবে তত বেশি। সুতরাং সংগঠনের পরিবৃদ্ধির প্রত্যেক ধাপে ক্ষমতার ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পায় অসমতা। পাশাপাশি সদস্যদের স্বাধীনতা খর্ব হয় ও বৃদ্ধি পায় সরকারের স্বাধীনতা। সাধারণ মানুষ তা মেনে নেয়, কারণ, একক প্রচেষ্টার চেয়ে যৌথ প্রচেষ্টায় অর্জিত হয় বেশি কিছু, ব্যতিক্রমধর্মী ক্ষমতালোভী ব্যক্তিরা আনন্দ করে, কারণ, তা এনে দেয় সুযোগ। সরকার বংশগত অথবা ক্ষমতালোভী ব্যক্তিটি বিশেষ গোষ্ঠীভূক্ত হলেও দেখা দেয় ব্যতিক্রম।

দুধরনের প্রতিযোগিতা ক্ষমতালাভের: একটি আন্তঃসাংগঠনিক প্রতিযোগিতা; অন্যটি একটি সংগঠনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যকার প্রতিযোগিতা। আন্তঃসাংগঠনিক প্রতিযোগিতা শুধু তখনই দেখা যায়, যখন এগুলোর উদ্দেশ্য মোটামুটি একই অথচ বেমানান। তা হতে পারে অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রচারণা বা এর যে কোনো দুটো বা তিনটিরই সমন্বয়। তৃতীয় নেপোলিয়ান যখন সম্রাট হচ্ছিলেন তখন তার-ই স্বার্থে নিয়োজিত একটি সংগঠন সৃষ্টি ও পরে অর্জন করতে হয়েছিল এর শ্রেষ্ঠত্ব। এই উদ্দেশ্যে কিছু মানুষকে তিনি সিগার দেন-তা ছিল অর্থনৈতিক অন্যান্য মানুষের কাছে তিনি নিজেকে চাচার ভাজিতা বলে পরিচয় দেন তা ছিল প্রচারণা। পরিশেষে তিনি কিছু সংখ্যক বিরোধীকে গুলি করে হত্যা করেন–তা ছিল সামরিক। ইতিমধ্যে তার বিরোধীরা স্থির সিদ্ধান্ত নেয় গণতান্ত্রিক ধরনের সরকারের প্রশংসায় এবং নিন্দা করে সিগার ও বুলেটের। গ্রিকদের সময় থেকেই পরিচিত গণতন্ত্রের উপর একনায়কতন্ত্র অর্জনের কৌশল। সবসময়ই তাতে অন্তর্ভুক্ত ঘুষ, প্রতারণা ও হিংস্রতার একই মিশ্রণ। যাক আমাদের বর্তমান বিষয়বস্তু ঘুষ, প্রতারণা ও ও হিংস্রতার একই মিশ্রণ। যাক আমাদের বর্তমান বিষয়বস্তু এটা নয়। সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক ইতিবৃত্ত হলো আমাদের বর্তমান বিষয়বস্তু।

সংগঠনগুলো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভিন্ন হয়ে পড়ে : একটি হচ্ছে আকার; অন্যটি বলা যায় ক্ষমতার তীব্রতা, যার অর্থ আমি মনে করি সদস্যদের উপর এগুলোর নিয়ন্ত্রণে মাত্রা। সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের ক্ষমতাপ্রীতির জন্যেই প্রতিটি সংগঠনে বিরোধী শক্তির অবর্তমানে রয়েছে এর আকার ও ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রবণতা। সহজাত কারণে এ উভয় প্রকার বৃদ্ধি রদ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, একটি আন্তর্জাতিক দাবা ক্লাব যথেষ্ট কৃতিত্বের অধিকারী সফল দাবা খেলোয়াড়দের করতে পারে অন্তর্ভুক্ত। সম্ভবত ক্লাব সদস্যদের দাবা খেলার সঙ্গে সম্পর্কহীন কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। একজন শক্তিমান সম্পাদকের অধীনে থেকে তা আরও অধিক সংখ্যক লোককে দাবা সচেতন করে তোলার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু তা অসম্ভব হয়ে পড়বে সম্পাদক দাবাড় না হলে। এতে দাবা ক্লাব ধ্বংস হয়ে যেতে পারে ভালো খেলোয়াড়দের দল ত্যাগের ফলে। কিন্তু এ ধরনের বিষয় ব্যতিক্রমধর্মী। সম্পদ বা রাজনৈতিক আধিপত্য সংগঠনের উদ্দেশ্য হলে শুধু অন্যান্য সংগঠনের চাপের মাধ্যমে অথবা সংগঠনটি বিশ্বব্যাপী হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এর বৃদ্ধি ঠেকানো যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বাধীনতা প্রীতি খুব প্রবল হলেই শুধু সম্ভব তীব্রতা ঠেকানো।

রাষ্ট্র হচ্ছে এর সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। কোনো রাষ্ট্র রাজ্যজয়ের লক্ষ্য স্থির করে যথেষ্ট শক্তিশালী হলে। কিন্তু যদি অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারে যে এর প্রকৃত ক্ষমতা অনুভূত ক্ষমতা থেকে কম অথবা অনভিজ্ঞতাবশত অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতাধর (এর প্রকৃত ক্ষমতার চেয়ে) বলে বিশ্বাস করে তাহলে সে বিপরীতমুখী প্রবণতা দেখায়। সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, কোনো রাষ্ট্র পারলে জয় করে নেয় রাজ্য। কিন্তু যুদ্ধ ক্ষেত্রে শুধু সমান শক্তিশালী অন্য রাষ্ট্রের মোকাবেলায় থেমে যায়। গ্রেট ব্রিটেন আফগানিস্তান জয় করেনি কারণ রাশিয়া সেখানে ব্রিটিশের মতোই শক্তিশালী। নেপোলিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে লুসিয়ানা বিক্রি করে দেন কারণ তার পক্ষে সম্ভব ছিল না লুসিয়ানার প্রতিরক্ষা। শুধু অভ্যন্তরীণ শক্তির বিবেচনায় প্রতিটি দেশই বিশ্বব্যাপী হতে চায়। কিন্তু একটি দেশের ক্ষমতা কমবেশি ভৌগোলিক : সাধারণত এ ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে উত্থিত হয় এবং কেন্দ্র থেকে দূরত্বের সঙ্গে হ্রাস পায়। পরিণামে কেন্দ্র থেকে বিশেষ দূরত্বে এর ক্ষমতা ভারসাম্য সৃষ্টি করে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে এবং প্রথাগত শক্তির হস্তক্ষেপ না ঘটলে সেখানে গঠিত হয় সীমান্ত।

এ পর্যন্ত কথিত সব কিছুই গুণগত পরিবর্তন ছাড়া সত্যে পরিণত হওয়ার জন্য অতিশয় বিমূর্ত। ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ক্ষমতা বলে নয় বরং বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক ঈর্ষামূলক মনোবৃত্তির জন্যেই টিকিয়ে রেখেছে অস্তিত্ব। বেলজিয়াম টিকে আছে কারণ এর অস্তিত্ব সুবিধাজনক ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের জন্য। পর্তুগালের অনেক উপনিবেশ রয়েছে কারণ বৃহৎ শক্তিগুলো একমত হতে পারেনি এগুলোর বিভক্তির ব্যাপারে। যুদ্ধ মারাত্মক বিধায় কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে রাজ্যাংশ বজায় রাখা কিছুকাল সম্ভব, কিন্তু তা সে হারাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রের নজরে পড়লে। এসব বিবেচনা আমাদের সাধারণ নীতির ক্ষতি করে না। এগুলো শুধু কার্যকরি শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটায়, যা বিলম্বিত করে অপরিণত শক্তিগুলোর ক্রিয়াকলাপ।

বলা যেতে পারে যে, পারলে কোনো রাষ্ট্র দখল করে নেয়–এ নীতির ব্যতিক্রম যুক্তরাষ্ট্র। এটা স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মারাত্মক অসুবিধা সৃষ্টি হতো না মেক্সিকো এবং প্রকৃতপক্ষে লাতিন আমেরিকার সব রাষ্ট্র দখল করে নেয়ার কার্যক্রম হাতে নিলে। যা হোক রাজনৈতিক বিজয়ের স্বাভাবিক উদ্দেশ্য বর্তমানে বিরোধী শক্তির দ্বারা এ ক্ষেত্রে হচ্ছে বাধাগ্রস্ত। গৃহযুদ্ধের আগে দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর ছিল সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতা। মেক্সিকোর যুদ্ধে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং বিশাল এলাকা সন্নিবেশিত হয়। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী বসতি স্থাপন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রম সবচেয়ে শক্তিমান নাগরিকের কর্মশক্তি আত্তীকরণের জন্য যথেষ্ট ছিল। এই কার্যক্রম এক প্রকার শেষ হয়ে আসতেই ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে স্পেন-আমেরিকার যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদের সজীব তাড়না প্রকাশ পেতে দেয়। কিন্তু আমেরিকার সংবিধানে নতুন এলাকার সন্নিবেশ অসুবিধাজনক। এর অন্তর্ভুক্ত অনাকাঙ্ক্ষিত নতুন ভোটারদের অনুপ্রবেশ। তাছাড়া এর ফলে অভ্যন্তরীণ মুক্ত বাণিজ্যিক এলাকা বিস্তার লাভ করে এবং তাই তা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থের পক্ষের ক্ষতিকারক। লাতিন আমেরিকার উপর-আপাতত অভিভাবকত্ব সংবলিত মনরো মতবাদ তাই প্রভাবশালী স্বার্থের ক্ষেত্রে সন্নিবেশের চেয়ে অধিকতর সন্তোষজনক। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে রাজনৈতিক বিজয় সুবিধাজনক হলে শিগগিরই তা ঘটত।

সবসময়ই শাসকদের কাম্য ছিল রাজনৈতিক বলয়ে ক্ষমতার কেন্দ্ৰায়ন এবং সবসময় শাসিতরা এর বাধা প্রদান করেনি। আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় একনায়ক দেশের চেয়েও প্রাচীন বড় সাম্রাজ্যগুলোতে তা অধিকতর পূর্ণতা লাভ করে। কিন্তু কার্যত কৌশলগতভাবে সম্ভব ক্ষেত্রগুলোতে তা সীমাবদ্ধ ছিল। যাতায়তই সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল প্রাচীন রাজপুরুষদের জন্য। মিসর ও ব্যাবিলনে বড় বড় নদীও এ সমস্যা সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। কিন্তু পারস্য শাসন নির্ভরশীল ছিল সড়ক পথ যোগাযোগের উপর। হেরোডেটাস সার্দিন্স থেকে সোসা পর্যন্ত বৃহৎ রাজকীয় রাস্তার বর্ণনা দিয়েছে। ১৫০০ মাইল দীর্ঘ রাস্তার উপর দিয়ে শান্তির সময়ে রাজকীয় বার্তাবাহক এবং যুদ্ধকালীন সৈন্য চলাচল করত। তিনি বলেন-রাস্তার প্রকৃত বর্ণনা হচ্ছে নিম্নরূপ : পুরো রাস্তাব্যাপী রাজকীয় স্টেশন ও চমৎকার পান্থশালা বিরাজমান; রাস্তাটি আগাগোড়া জনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে এবং তাই তা বিপদমুক্ত-প্রাইজেরিয়া ত্যাগ করে হেলিস অতিক্রম করতে হয়; ফটক রয়েছে, এগুলোর মধ্য দিয়ে জনস্রোত অতিক্রমের আগে আপনাকে অবশ্যই নিতে হবে অনুমতি (ছাড়পত্র)। একটি শক্তিশালী বাহিনী এই স্থান পাহারা দিয়ে থাকে। … সিসিলিয়া ও আর্মেনিয়ার মধ্যবর্তী সীমান্ত হচ্ছে ইউফ্রেটিস নদী। তাই পার হতে হয় নৌকাযোগে। আর্মেনিয়াতে পনেরোটি বিশ্রামের স্থান রয়েছে। এর দুরত্ব ৫৬.৫ প্যারাসংস (প্রায় ১৮০ মাইল)। এক জায়গায় পাহারারত আছে একজন দেহরক্ষী। চারটি বড় নদী এই জেলাকে ছেদ করেছে, এর প্রতিটি পার হতে হয় নৌকাযোগে…. পুরো স্টেশনের সংখ্যা উন্নীত হয়েছে ১১১টিতে, প্রকৃতপক্ষে এই বিশ্রামস্থল সার্দিস ও সোসার মধ্যবর্তী দেখতে পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১৫০ ফার্লং গতিতে চললে (প্রায় সৈনিকদের গতি সমান) ভ্রমণ সম্পন্ন করতে সঠিকভাবে লেগে যায় নব্বই দিন।

এ ধরনের রাস্তা যদিও সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি সম্ভব করে তুলেছিল তারপরও তা রাজাকে সামর্থ্য যোগায়নি দূরবর্তী প্রদেশগুলো পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। একুজন ঘোড়সওয়ার বার্তাবাহক এক মাসে সার্দিস থেকে সোসাতে সংবাদ নিয়ে আসত, কিন্তু সার্দিস থেকে সোসাতে যেতে সৈন্যদের লেগে যেত তিন মাস। যখন আওনিয়া পারস্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল তখন এশিয়া মাইনরে ইতিমধ্যে কোনো সৈন্য না থাকায় বিদ্রোহের মোকাবেলা করতে তাদের লেগে যায় কয়েক মাস। সব সাম্রাজ্য প্রায়ই প্রাদেশিক গভর্নদের দ্বারা পরিচালিত বিদ্রোহ দেখেছে; এমনকি প্রত্যক্ষ বিদ্রোহ না হলে সবে মাত্র বিজয় ছাড়া স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রায় অনিবার্য ছিল এবং কালক্রমে তা সমর্থ ছিল স্বাধীনতার রূপলাভে। প্রাচীন কোনো বড় রাষ্ট্রই বর্তমান যুগের মতো একই মাত্রায় কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো না। এর প্রধান কারণই ছিল দ্রুত চলাচলের সুবিধার অভাব।

মেসিডোনিয়াবাসীদের মাধ্যমে রোমানরা পারসিকদের কাছ থেকে শিখেছিলেন কিভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্বারা শক্তিশালী করা যায় কেন্দ্রীয় সরকারকে। রাজকীয় বার্তাবাহক পুরো পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়াব্যাপী দিনরাত ঘন্টায় ভ্রমণ করতে পারত গড়ে দশ মাইল। কিন্তু প্রতিটি প্রদেশেই রাজকীয় পদ সামরিক কমান্ডারদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যিনি তাদের সৈন্যদলের অগ্রগমন পথে কেউ নেই এমন কিছু না জেনেই পরিচালনা করতে পারতেন সৈন্য। সৈন্যদের ক্ষিপ্রগতি ও সংবাদ প্রেরণে ধীরগতি প্রায়ই রোম সম্রাটের বিরুদ্ধে সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। ইতালি আক্রমণের জন্য গোলের উত্তর থেকে কনস্টেন্টাইনের অভিযান সম্পর্কিত গিবনের বর্নণা কনস্টেন্টাইনের আরামপ্রদ ও হেনিবলের কষ্টসাধ্য গমনের ভেতর প্রদর্শন করে স্পষ্ট পার্থক্য।

গোল থেকে ইতালি অভিযানকালে হেনিবল পর্বতের উপর নিয়ে বর্বর জনপদের মধ্য দিয়ে প্রথমে একটি রাস্তা আবিষ্কার করেন ও পরে তা খুলে দিতে ব্যর্থ হন। বর্বররা এর আগে কখনও নিয়মিত সৈন্য চলাচলের জন্য এ ধরনের রাস্তা মেনে নেয়নি। আল্পস পর্বতমালা তখন প্রকৃতিগতভাবেই শক্তি প্রদত্ত। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেসব জেনারেল পথের জন্য চেষ্টা করেছিলেন তারা হঠাত্র অসুবিধায় পড়েন বা বাধার সম্মুখীন হন। কনস্টেন্টাইনের যুগে সভ্য ও বাধ্য ছিল পাহাড়ি কৃষকরা। দেশে প্রচুর সম্পদ মজুদ ছিল এবং রোমানরা বহু জনপথ আল্পস পর্বতমালার উপর দিয়ে নিয়ে যায় যা যোগাযোগ স্থাপন করে গোল ও ইতালির ভেতর। কনস্টেন্টাইন কটিয়ান আল্পসের রাস্তাটি (যা বর্তমানে সেনিস পর্বতমালা) অধিক গুরুত্ব দিতে এবং এত সক্রিয় অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তার সেনাবাহিনী পরিচালনা করেন যে, রাইনের তীরবর্তী অঞ্চল থেকে তার প্রস্থান সম্পর্কে সেক্রেনসিয়াম কোর্টে (রোমে) কোনো কিছু বোধগম্য হওয়ার আগে তিনি প্রবেশ করেন পিডমন্টের সমতল ভূমিতে।

ফলাফল দাঁড়াল এই যে, মেক্সেনসিয়াস পরাজিত হন এবং ধর্মের মর্যাদা লাভ করে ক্রিশ্চিয়ানিটি রাষ্ট্র। যদি রোমানদের রাস্তাঘাট অধিকতর শোচনীয় না হতো এবং সংবাদ প্রেরণের ত্বরিত ব্যবস্থা থাকত তবে ভিন্নরূপে আবির্ভূত হতো বিশ্ব ইতিহাস।

দূরবর্তী স্থানগুলোতে সরকারি ক্ষমতার ব্যবহার সম্ভব করে তোলে বাষ্পচালিত জাহাজ, রেলপথ ও সর্বশেষে উড়োজাহাজ। সাহারা অথবা মেসোপটেমিয়ায় বিদ্রোহ হলে আজকাল কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তা দমন করা যায়। কিন্তু একশো বছর আগেও সৈন্য পাঠাতে কয়েক মাস সময় লেগে যেত এবং তা খুব কষ্টকর হতো বেলুচিস্তানে আলেকজান্ডারের সৈন্যদের মতো তৃষ্ণায় মৃত্যুবরণ থেকেও।

সংবাদ প্রেরণও মানুষ ও দ্রব্যসামগ্রীর ত্বরিত চলাচল ব্যবস্থার মতো সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৮১২ সালের যুদ্ধের শান্তি স্থাপন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পর নিউ ওলিন্স যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যদিও পরস্পরবিরোধী কোনো পক্ষই জানত না প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে। সপ্ত বর্ষের যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সৈন্যরা কিউবা বা ফিলিপাইন দখল করে নেয়, কিন্তু শান্তি চুক্তিতে সই করার আগ পর্যন্ত ইউরোপে তা জানা ছিল না। টেলিগ্রাফ আবিষ্কারের আগে শান্তি কালীন দূতদের ও যুদ্ধকালীন জেনারেলদের অনেক স্বাধীনতা ছিল, কারণ নির্দেশগুলো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রতিফলিত হতো না। দূরবর্তী সরকার তাদের প্রতিনিধিদের প্রায়ই নিজস্ব বিবেচনার উপর নির্ভর করে কাজ করার জন্য আহ্বান করত এবং এভাবেই কেন্দ্র নির্দেশিত মামুলি নীতিমালার প্রেরকের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ যে সংবাদ মানুষের চেয়েও দ্রুততর। একশো বছর আগেও সংবাদ দ্রুততর ছিল না ঘোড়ার চেয়ে। অপরাধের সংবাদ প্রকাশের আগেই পার্শ্ববর্তী শহরে পালাতে পারত একজন ডাকাত। আজকাল সংবাদ প্রথমেই পৌঁছে বলে পলায়ন অপেক্ষাকৃত কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের সময় সরকারই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সব আদান-প্রদানের দ্রুত উপায়গুলো। ফলে বেড়ে যায় তাদের ক্ষমতা।

আধুনিক কলাকৌশল শুধু সংবাদ আদান-প্রদানের দ্রুততার মাধ্যমেই নয় বরং রেল, টেলিগ্রাফ, মোটর ট্রাফিক এবং সরকারি প্রচারণার দ্বারাও বিশাল সাম্রাজ্যগুলোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল করে তুলেছে। বিদ্রোহ সহজ করার জন্য প্রাচীন পারস্যের প্রাদেশিক শাসন এবং রোমান প্রকনসুলের যথেষ্ট স্বাধীনতা ছিল। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল সাম্রাজ্য। এটিলা ও চেঙ্গিস খাঁর সাম্রাজ্যগুলো ক্ষণস্থায়ী ছিল এবং ইউরোপীয় জাতিগুলো নতুন জগতে তাদের দখল হারাল। কিন্তু বাহ্যিক আক্রমণ ছাড়া অধিকাংশ সাম্রাজ্যই আধুনিক সুবাদে মোটামুটি নিরাপদ। বিপ্লব দেখা দিতে পারে শুধু যুদ্ধে পরাজিত হলেই।

সর্বতোভাবে এ কথা বলা যাবে না যে, দূরবর্তী এলাকাগুলোতে ক্ষমতার ব্যবহার সহজ হয়ে কলাকৌশলের উন্নতির ফলে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো লাভ করেছে বিপরীত ফল। হেনিবলের সৈন্যরা যোগাযোগ ছাড়াই বহু বছর বেঁচে ছিল। অপরপক্ষ আজকাল বিশাল সৈন্যবাহিনী অনুরূপ পরিবেশে দুই অথবা তিন দিনের বেশি টিকে থাকতে পারে না। পালের জাহাজের উপর নির্ভরশীল নৌকাবাহিনী চলাচল ছিল বিশ্বব্যাপী, এখন তাদের ঘন ঘন জ্বালানি নিতে হয় বলে কোনো কেন্দ্র থেকে তারা বেশি দূর যেতে পারে না। নেলসনের সময় ব্রিটিশরা সমুদ্রে কোথাও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলে তা বলবৎ হতো সর্বত্রই। অধুনা নিজস্ব জলসীমায় তাদের আধিপত্য থাকলেও দুরপ্রাচ্যে তারা দুর্বল ও বাল্টিক সাগরে প্রবেশাধিকার নেই তাদের।

সাধারণভাবে বলা যায় যে, আজকাল কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী স্থানগুলোতে ক্ষমতা প্রয়োগ করা অধিকতর সহজ। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতা বেড়ে যায় এবং বিজয় অধিকতর নিরঙ্কুশ হয়, কারণ দক্ষতার কোনোরূপ ক্ষতি হয় না আয়তন বৃদ্ধির ফলে। একটি বিশ্বরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে তা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে কোনো মারাত্মক যুদ্ধে বিজয়ী ব্যক্তি অথবা নিরপেক্ষ ক্ষমতাশালী ব্যক্তির দ্বারা।

ক্ষমতার তীব্রতা ও সংগঠনের শক্তি সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো জটিল ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি জনপদে গঠিত রাষ্ট্র আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে অনেক বেশি কর্মতৎপর। এর হাত রয়েছে রাশিয়া, জার্মানি ও ইতালিতে প্রায় সব মানবীয় বিষয়ে। মানুষের ক্ষমতাপ্রীতি রয়েছে, কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা ক্ষমতার মোহে বেশি আচ্ছন্ন অন্যান্য মানুষের চেয়ে। ফলে আশা করা যায় যে, যিনি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হাতে পেয়েছেন তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় রাষ্ট্রের পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে বৃদ্ধি করবেন তার অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ। জোরালো যুক্তি রয়েছে রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ জোরদার করার পেছনে। সুতরাং সাধারণ নাগরিকের নীরব সমর্থন থাকবে রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপে সরকারের ইচ্ছার প্রতি। যা হোক কিছু স্বাধীনতাপ্রীতিও থাকবে নাগরিকদের ভেতর। এক পর্যায়ে এই স্বাধীনতাপ্রীতি এত প্রবল হবে যে, তা অস্থায়ীভাবে হলেও আরও অধিক বৃদ্ধি হতে দেবে না সংগঠনের শক্তি। পরিণামে সংগঠনের শক্তি একটি বিশেষ পর্যায়ে পৌঁছলে জনসাধারণের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পেলে স্বাধীনতা প্রীতি প্রবল হবে আবার সংগঠন হ্রাস পেলে প্রবল হবে অফিসিয়াল ক্ষমতাপ্রীতি।

স্বাধীনতাপ্রীতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাহ্যিক হস্তক্ষেপের অবাস্তব বিরোধী নয় বরং নিষিদ্ধকরণ, বাধ্যতামূলক সৈন্যদলে নিযুক্তি, ধর্মীয় আনুগত্য ইত্যাদির মতো একপ্রকার সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিরোধী। কখনও কখনও এ ধরনের অনুভূতি দমিত হতে পারে ক্রমাগত প্রচারণা ও শিক্ষার দ্বারা। এর ফলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুর্বল হয়ে পড়ে স্বাধীনতাপ্রীতি। অনেক শক্তিই আধুনিক সম্প্রদায়গুলোর ভেতর সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেমন–স্কুল, সংবাদপত্র, ড্রিল ইত্যাদি। একই প্রভাব রয়েছে জনসংখ্যার ঘনত্বেরও। স্বাধীনতাপ্রীতি ও ক্ষমতাপ্রীতির মধ্যকার অস্থায়ী ভারসাম্য তাই আধুনিক অবস্থায় ক্রমাগতভাবে ক্ষমতার দিকে সরে পড়ে। এইভাবে সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের উদ্ভব হয় ও প্রশস্ত হয় এর সফলতার পথ। শিক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতাপ্রীতি কতটুকু হ্রাস করা সম্ভব বর্তমানে তা জ্ঞাত নয়। বিদ্রোহের উদ্রেক না করে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ক্রমাগতভাবে কতটুকু বাড়ানো যেতে পারে বলা অসম্ভব। কিন্তু এ রকম সন্দেহের কারণ নেই যে, বর্তমান যুগে তা অনেক বেশি বৃদ্ধি পাবে স্বৈরশাসনের চেয়ে।

এ পর্যন্ত আমাদের আলোচিত সংগঠনগুলোর মতো রাষ্ট্র ছাড়া সব সংগঠনই একই প্রকার আইনের অধীন, শুধু ব্যতিক্রম এই যে, এগুলো প্রয়োগ করতে পারে না শক্তি। আমি আলোচনার বাইরে রাখছি ক্ষমতা তাড়নার অবদানে অক্ষম ক্লাবের অনুরূপ সংগঠনগুলোকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাজনৈতিক দল, চার্চ এবং ব্যবসায় কর্পোরেশনগুলো। লক্ষ্য অর্জনে যত কম সফল হোক না কেন বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করতে চায় অধিকাংশ চার্চই। অধিকাংশই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে সদস্যদের কিছু গুরুত্ববহ অভ্যন্তরীণ বিষয়। যেমন-বিবাহ ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা। সম্ভাব্যতা প্রমাণিত হলে চার্চগুলো রাষ্ট্রীয় কাজে জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করে। তিব্বতে পিটারসের পিতৃত্বে এবং কিছু মাত্রায় সংস্কার আন্দোলন পর্যন্ত পুরো পশ্চিম ইউরোপে তা ঘটেছে। কিছু ব্যতিক্রম থাকা সত্ত্বেও চার্চের ক্ষমতা তাড়না সীমিত হয়ে পড়েছে শুধু সুযোগ-সুবিধার অভাবে এবং ভিন্নমত বা অনৈক্যরূপে বিদ্রোহের ভয়ে। যা হোক অনেক দেশেই জাতীয়তাবাদ তাদের ক্ষমতা খর্ব করে দিয়েছে এবং আগেকার ধর্মীয় তাড়নাগুলো রাষ্ট্রীয় তাড়নায় পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় শক্তি হ্রাস পায় এবং জাতীয় রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি পায় জাতীয়তাবাদের ফলে।

রাজনৈতিক দলগুলো অতি সাম্প্রতিককালেও অতি ঠিলেঢালা সংগঠন ছিল এবং অতি অল্প চেষ্টাই করেছে সদস্যদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য। ঊনবিংশ শতাব্দীব্যাপী সংসদ সদস্যরা প্রায়ই দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে তাদের ভোটাধিকার। ফলে দলীয় বিভক্তির পূর্বাভাস বর্তমানের চেয়ে বেশি অনিশ্চিত ছিল। ওয়ালপল নর্থ এবং পিট একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত তাদের সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণ করতেন দুর্নীতির মাধ্যমে। দুর্নীতি হ্রাসের পরও রাজনীতি অভিজাত নিয়ন্ত্রিত ছিল। ফলে সরকার ও দলীয় নেতাদের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার কোনো পথ ছিল না। আজকাল বিশেষত শ্রমিক দলের সদস্যরা ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং প্রতিজ্ঞা বিফল হলে সাধারণত তাদের রাজনৈতিক মৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়। দাবি করা হয় দুধরনের আনুগত্য : কর্মসূচিতে মতামত ঘোষণায় এবং নেতাদের প্রতি দৈনন্দিন কার্যকলাপে। নামমাত্র গণতান্ত্রিক উপায়ে কর্মসূচি স্থির হলেও কিছু সংখ্যক তোষামোদকারীর দ্বারা তা খুব বেশি প্রভাবিত হয়। সংসদ বা সরকারি কার্যকলাপে কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে কি-না স্থির করার দায়িত্ব নেতাদের উপর পরিত্যক্ত। তারা এমন না করার সিদ্ধান্ত নিলে বিশ্বাসভঙ্গের সমর্থনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা অনুসারীদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু বিবৃতিতে এ ধরনের কিছু অস্বীকার করা হয়। এই পদ্ধতির ফলেই ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ সমর্থন লাভ। এগুলোর বাস্তবায়ন ছাড়াই নেতারা ওকালতি করেছেন সরকারের পক্ষে।

ওইদিকে সব রাজনৈতিক দলেল সাংগঠনিক ক্ষমতা প্রভূত বৃদ্ধি পেয়েছে, তারপরও এখনও তা কমিউনিস্ট, ফ্যাসিস্ট ও নাজিদের তুলনায় অপরিমিতভাবে কম গণতান্ত্রিক দলগুলোতে। ঐতিহাসিক ও মনোগত দিক দিয়ে শেষোক্তগুলো গোপন সংস্থার বিকাশ-রাজনৈতিক দলের নয়। স্বেচ্ছাচারী সরকারের অধীন যেসব মানুষ মৌলিক পরিবর্তন চায় তারা গোপনীয়তার দিকে ধাবিত হয় এবং যখন তারা একত্রিত হয় তখন বিশ্বাসঘাতকতার ভয় তাদের কঠোর শৃঙ্খলার দিকে পরিচালিত করে। গুপ্তচর-মুক্ত বিশেষ নিরাপদ জীবন পদ্ধতিই স্বাভাবিক। ঝুঁকি, গোপনীয়তা, বর্তমান দুঃখভোগ এবং ভবিষ্যৎ বিজয়ের আশা এক প্রকার ধর্মীয় আনন্দানুভূতি এবং যাদের মধ্যে এই ভাব সহজেই উদিত হয় শুধু তারাই আকর্ষিত হয়ে থাকে। একটি বিপ্লবী গোপন সংস্থার লক্ষ্য অরাজকতা হলেও এর ভেতর স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যকলাপের ঊর্ধ্বে বহু বিস্তৃত পরিদর্শন সংবলিত একটি কঠোর স্বৈরাচারী শাসনের সম্ভাবনা দেখা যায়। নেপোলিয়ানের মৃত্যুর পর ইতালি গোপন সংস্থার পরিপূর্ণ হয়ে পড়ে, যেগুলোর প্রতি কিছু মানুষ আকর্ষিত হয় বিপ্লবী তত্ত্বের দ্বারা ও অন্যান্য মানুষ অপরাধমূলক কাজের দ্বারা। রাশিয়ায় একই ব্যাপার ঘটে সন্ত্রাসবাদের সাথে সাথে। রাশিয়ায় কমিউনিস্টরা ও ইতালিতে ফ্যাসিস্টরা গোপন সংস্থার মানসিকতায় গভীরভাবে উচ্ছ্বসিত ছিল এবং এগুলোর উপর নির্ভর করে রচিত হয় নাজিদের কাঠামো। তাদের কিছু নেতা সরকার গঠন করলে তারা দল পরিচালনার একই যুক্তি সাহায্যে রাষ্ট্র শাসন করে। বিশ্বব্যাপী তাদের অনুসারীদের ভেতর অধীনতামূলক আপেক্ষিক স্পিরিট কাম্য।

অর্থনৈতিক সংগঠন আকারে বৃদ্ধি পেলে জন্ম দেয় ক্ষমতার গতিবিজ্ঞান সম্বন্ধীয় মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গির। এ বিষয়ের উপর তিনি যা বলেছেন তার অনেকটাই পরিণত হয়েছে সত্যে। কিন্তু এগুলো ক্ষমতা তাড়নার অবদানে সক্ষম সব সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য-অর্থ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেই নয় শুধু। উৎপাদনের এই প্রবণতা ট্রাস্টের জন্ম দেয় যা বৃহৎ রাষ্ট্র এবং এর উপরাষ্ট্রের সঙ্গে সমভাবে বিস্তৃত; কিন্তু কদাচই অস্ত্র কারখানা ছাড়া বিশ্বব্যাপী ট্রাস্ট গঠনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। টারিফ ও কলোনিগুলো রাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী করে তুলেছে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। অথনৈতিক পরিমন্ডলে বৈদেশিক বিজয় ট্রাস্টভুক্ত রাষ্ট্রের জাতীয় সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল। সীমাবদ্ধ ক্ষেত্র ছাড়া আজকাল তা আর পুরনো পদ্ধতির খাঁটি ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার দ্বারা পরিচালিত নয়। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর চেয়ে ইতালি ও জার্মানিতে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক আরও গভীর এবং স্পষ্ট। কিন্তু এ কথা মনে করা ভুল হবে যে, ফ্যাসিবাদের অধীন বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইংল্যান্ড, ফ্রান্স অথবা আমেরিকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে রাষ্ট্রকে অধিক নিয়ন্ত্রণ করে। অপরপক্ষে ইতালি ও জার্মানিতে বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অন্য সব কিছুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কমিউনিস্ট ভীতির ব্যবহার করছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, ইতালিতে বাধ্যতামূলক মূলধন সংগ্রহের সূচনা হচ্ছে, কিন্তু পক্ষান্তরে ব্রিটিশ শ্রমিক দল কর্তৃক একই জাতীয় অপেক্ষাকৃত মৃদু প্রস্তাব জন্ম দেয় পুঁজিপতিদের হৈচৈয়ের এবং সফল হয় পুরোপুরিভাবে।

এর শক্তি আগের যে কোনো একটি অথবা একত্রে উভয়টি শক্তির চেয়ে বেশি হয়ে তাকে মানানসই ভিন্ন উদ্দেশ্যের দুটো সংগঠন একত্রীভূত হলে। যুদ্ধের আগে মহান উত্তরাঞ্চলীয় লন্ডন থেকে ইয়র্ক, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয়রা ইয়র্ক থেকে নিউকেসল এবং উত্তর অঞ্চলে ব্রিটিশরা নিউকেসল থেকে এডিনবার্গ গিয়েছেন। আজকাল LNER-রা সব দিকে যায় এবং স্পষ্টত তিনটি কোম্পানির চেয়ে শক্তিশালী। অনুরূপভাবে একটি ইস্পাত কারখানা খনিজ নিষ্কাশন থেকে শুরু করে জাহাজ নির্মাণ পর্যন্ত একই কর্পোরেশন কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ হওয়া সুবিধাজনক। এই কারণে একটি স্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে একত্রীকরণের। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই তা সত্য নয়। এ পদ্ধতির যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন রাষ্ট্র অন্য সব সংগঠনকে আত্তীকৃত করে ফেলে। সংগঠন বিভিন্ন রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সংগঠন হলে একই ধরনের প্রবণতা কালের প্রবাহে এক সময় বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় পরিচালিত হবে। যদি বিভিন্ন রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সংগঠন হলে একই ধরনের প্রবণতা কালের প্রবাহে এক সময় বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় পরিচালিত হবে। যদি বিভিন্ন রাষ্ট্রের সম্পদ, স্বাস্থ্য, বুদ্ধিমত্তা অথবা নাগরিকদের সুখ অর্জন হয় তবে তা অসঙ্গতিপূর্ণ কিছু হবে না। তবে এগুলোকে জাতীয় ক্ষমতার চেয়ে মনে করা হয় কম গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের ভেতর সংঘাত দেখা দেয় এবং একত্রীকরণের পরিণাম ভালো হয় না। পরিণামে একটি বিশ্বরাষ্ট্র শুধু সম্ভব যদি একটি জাতীয় রাষ্ট্র পুরো পৃথিবী জয় করে অথবা জাতীয়তাবাদের গন্ডি অতিক্রম করে একটি ধর্মমত বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে।

জাতীয়তাবোধের জন্য রাষ্ট্রীয় পরিবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা হচ্ছে দলীয় রাজনীতি বা ধর্মে দৃষ্ট সীমাবদ্ধতার মতোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। আমি এই পরিচ্ছেদে উদ্দেশ্য থেকে মুক্ত জীবনপ্রাপ্ত সংগঠনগুলোর আলোচনা করব। এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি যে, তা সম্ভব বিশেষ সীমা পর্যন্ত। আলোচনা প্রয়োজন এই সীমানার বাইরে আবেগ-উচ্ছ্বাসে সংগঠনের যে আবদেন রয়েছে তার।

বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায় ব্যক্তি বিশেষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে প্রতিটি শ্রেণিই হচ্ছে অনুভূতির এবং কিছু সংখ্যক মনোবিজ্ঞানী একে অভিহিত করেছেন অনুভূতি আশ্রিত অভিমত নামে। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনুরাগের পর্যায়ে রয়েছে দেশপ্রেম, পরিবারপ্রেম, ক্ষমতাপ্রীতি, উপভোগপ্রীতি এবং আরও কিছু। আবার বিরাগ মনোভাবের পর্যায়ে রয়েছে বেদনাপ্রীতি, বিদেশিদের প্রতি ঘৃণা ইত্যাদি। কোনো এক বিশেষ সময়ের একটি মানুষের আবেগ মিশ্রিত অনুভূতি হচ্ছে তার স্বভাব, তার বিগত ইতিহাস এবং বর্তমান পরিবেশের জটিল সৃষ্টি। দৃষ্টান্তস্বরূপ ধরা যাক পারিবারিক অনুভূতি। তা গৃহায়ন, শিক্ষা বা জীবন বীমার মতো যেসব বিষয়ে বিভিন্ন পরিবারের সিল রয়েছে ওই সব বিষয়ের জন্য সংগঠন সৃষ্টি করেছে। বর্তমানের চেয়ে বেশি পরিমাণে অতীতে তা জন্ম দিয়েছে অনেকগুলো পরিবারের স্বার্থরক্ষার জন্য বিশেষ পরিবারের। দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যায় মন্টেগু ও ক্যাপুলেট স্বার্থরক্ষাকারী সংগঠনের। এমন একটি সংগঠন হলো রাজবংশোদ্ভূত রাষ্ট্র। অভিজাত সরকার হচ্ছে বিশেষ পরিবারগুলোর সমন্বয়ে গঠিত, যা সমাজের অবশিষ্টাংশের স্বার্থের বিনিময়ে সমন্বয়কারী পরিবারগুলোর সুবিধাদির উদ্দেশ্যে গঠিত। এ ধরনের সংগঠন সবসময়ই কমবেশি পরিবারগুলোর সুবিধাদির সংবলিত। বিরাগ অনুভূতিগুলো হচ্ছে ভয়, ঘৃণা, অবমাননা ইত্যাদি। এ ধরনের অনুভূতি তীব্রভাবে অনুভূত হলে তা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় সংগঠনের পরিবৃদ্ধির সাথে।

এই সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা প্রদান করে ধর্মতত্ত্ব। খ্রিস্টীয় যুগের প্রথম দিকে কয়েক শতাব্দী ছাড়া অন্য কোনো সময়েই ইহুদিদের উদ্দেশ্য ছিল না। জেন্টাইলদের ধর্মান্তরিত করার। তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতির দ্বারা সন্তুষ্ট ছিল। জাপান অবশিষ্ট দুনিয়ার আগে সৃষ্টি হয়েছিল–সিন্টের এই শিক্ষা জাপানি ছাড়া কারো অনুভূতিতে নাড়া দেবে এমন আশা করা যায় না। প্রত্যেকেই এই গল্প জানে যে, ওল্ড লিকট স্বর্গে উপস্থিত হয়ে অন্য মানুষের উপস্থিতি আবিষ্কারে বাধাপ্রাপ্ত হন, কারণ ভয় ছিল যে এতে নষ্ট হবে তাদের স্বর্গীয় সুখভোগ। একই ধরনের অনুভূতি নিতে পারে আরও অশুভ রূপ। অত্যাচারীদের কাছে অত্যাচার এত আনন্দের নয় যে, ভিন্ন মতাবলম্বী শূন্য পৃথিবী তার কাছে অসহনীয় হবে। অনুরূপভাবে হিটলার ও মুসোলিনি যেহেতু মনে করেন যে, যুদ্ধ মানবীয় কার্যাবলির ভেতর সবচেয়ে মহৎ কাজ সুতরাং পুরো পৃথিবী জয়ের পর যুদ্ধ করার মতো কোনো শত্রু অবশিষ্ট না থাকলে তারা সুখি হতে পারবে না। দলীয় রাজনীতিতে একটি দলের প্রশ্নাতীত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হলে তা দাঁড়ায় নিরানন্দের কারণ হয়ে।

যে সংগঠন এভাবে ব্যক্তি বিশেষের প্রতি এর আবেদন, গর্ব, হিংসা, ঘৃণা, : অবমাননা অথবা প্রতিযোগিতায় আনন্দের মধ্য থেকে পেয়ে থাকে তা বিশ্বব্যাপী হয়ে পড়লে পূর্ণ করতে পারে না এর উদ্দেশ্য। যে বিশ্বে এ ধরনের ভাবাবেগ খুব বেশি শক্তিশালী সেখানে কোনো সংগঠন বিশ্বব্যাপী হয়ে পড়লে তা নিশ্চিতভাবে ভেঙে পড়বে চালিকাশক্তির অভাবে।

এ পর্যন্ত আমরা যা আলোচনা করেছি তাতে দেখা যাবে যে নেতৃত্বের চেয়ে আমরা সংগঠনের সাধারণ সদস্যদের অনুভূতি নিয়েই আলোচনা করেছি বেশি। যাই হোক না কেন সংগঠনের উদ্দেশ্য, এর নেতৃত্ব ক্ষমতা থেকে তৃপ্তি পেয়ে থাকে। তাই তাদের স্বার্থ হয় না সাধারণ সদস্যদের স্বার্থের মতো। তাই নেতৃত্বের ভেতর বিশ্বজয়ের আকাক্ষা যতটা প্রবল ততটা নয় সদস্যদের ভেতর।

১২. ক্ষমতা ও শাসন পদ্ধতি

কোনো সংগঠনের উদ্দেশ্যের কথা বাদ দিলেও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে– (১) আকার, (২) সদস্যদের উপর ক্ষমতা (৩) সদস্য নয় এমন মানুষের উপর ক্ষমতা এবং (৪) সরকারের ধরন। পরবর্তী পরিচ্ছেদে আমি আকার সম্বন্ধে আলোচনা করব। বাকিগুলো বর্তমান পরিচ্ছেদের আলোচ্য বিষয়।

রাষ্ট্র ছাড়া আইনানুগ স্বীকৃত সংগঠনগুলো সদস্যদের উপর সীমাবদ্ধ ক্ষমতা প্রয়োগ করে আইনের মাধ্যমে। যদি আপনি একজন ব্যারিস্টার, সলিসিটর, চিকিৎসক বা ঘোড়দৌড়ের ঘোড়ার মালিক হন, আপনার সম্প্রদায় থেকে আপনি বিতাড়িত হতে পারেন, হতে পারেন আপনি তালিকাচ্যুত, অযোগ্য ঘোষিত হতে পারেন ঘোড়দৌড় ব্যবসায়, অথবা আপনাকে সতর্ক করা যেতে পারে ঘোড় দৌড় মাঠ থেকে সরে পড়ার জন্য। এসব শাস্তি অপমানজনক এবং প্রথম তিনটি অর্থনৈতিকভাবে চরম কষ্টকর। কিন্তু আপনি যতই আপনার পেশায় অপ্রিয় হোন না কেন আইনগতভাবে আপনার সহকর্মীরা আপনার পেশাগত অনুশীলনে বাধা প্রদান ছাড়া কিছুই করতে পারবে না। আপনি যদি রাজনীতিবিদ হন তবে আপনি অবশ্যই কোনো দলের অন্তর্ভুক্ত হবেন; কিন্তু আপনাকে অন্য দলে যোগদানে অথবা সংসদীয় প্রতিযোগিতা থেকে দূরে শান্তিপূর্ণ বসবাসে বাধা দেয়া যাবে না। রাষ্ট্র ছাড়া অন্যান্য সংগঠনগুলোকে সদস্যদের উপর ক্ষমতা নির্ভর করে এর বিতাড়ন করার অধিকারের উপর এবং তা কমবেশি মারাত্মক বিতাড়নের সঙ্গে জড়িত অপমান ও অর্থনৈতিক কষ্ট অনুসারে।

অপরপক্ষে নাগরিকদের উপর রাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমাহীনভাবে বেড়ে যায় অবাধ গ্রেফতার সম্পর্কে সাংবিধানিক বিধি-নিষেধ না থাকলে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনগত পদ্ধতি ছাড়া কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না জীবন, স্বাধীনতা বা সম্পত্তি থেকে। বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের কাছে প্রদর্শন করতে হবে যে পূর্ব ঘোষিত আইন অনুসারে তিনি দোষী সাব্যস্ত এবং এ ধরনের শাস্তির যোগ্য। একইভাবে ইংল্যান্ডে নির্বাহীদের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হলেও আইন পরিষদ সর্বশক্তিমান। পরিষদ এ রকম আইন পাস করতে পারে যে মি. জন স্মিথ মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হতে পারেন বা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই তাকে পদ্ধতিগতভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করার। যেসব পন্থায় পার্লামেন্ট সরকারি নিয়ন্ত্রণ লাভ করে সর্বগ্রাসী ক্ষমতার মতোই এ ক্ষমতা ছিল অনুরূপ একটি পন্থা। এই ক্ষমতা ভারত এবং একদল শাসিত দেশগুলোতে নির্বাহীদের হাতে এবং তা অবাধে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এটা ঐতিহ্য অনুসারে ঘটে থাকে এবং যেখানে রাষ্ট্র এই শক্তিমত্ততা হারিয়েছে সেখানে তারা তা করে থাকে মানবাধিকার মতবাদের ফলস্বরূপ।

সংগঠনের সংজ্ঞা সদস্য নয় এমন লোকের উপর দেয়া অপেক্ষাকৃত কঠিন। বিদেশিদের সাপেক্ষে যুদ্ধ অথবা যুদ্ধরীতির উপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তা প্রযোজ্য শুল্ক এবং অভিবাসন নিয়ম-কানুনের বেলায়ও। চীন দেশে সামরিক পরাজয়ের ফলস্বরূপ গৃহীত চুক্তির দ্বারা এ দুটো পরিচালিত হতো। শুধু যথেষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব থাকলে, সব লোকের ধ্বংস অথবা বিতাড়নের হুকুম জারি করা যেতে পারে। এসব প্রায়ই করা হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বিবেচনা করা যায় যশোয়ার বই, ব্যাবিলনীয় বন্দিত্ব এবং উত্তর আমেরিকায় ইন্ডিয়ানদের নির্মূলের পরিবর্তে কারাবাসের কথা।

রাষ্ট্র কর্তৃক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাহ্যিক ক্ষমতা ঈর্ষার চোখে দেখাই স্বাভাবিক। তাই এগুলো বহুলাংশে অবৈধ এগুলো নির্ভর করে প্রধানত বয়কট ও চরম ভীতি প্রদর্শনের উপর। সাধারণত এ ধরনের সন্ত্রাসী প্রভাব বিপ্লব বা অজরাকতার ভূমিকাস্বরূপ। রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞ আয়ারল্যান্ডে প্রথমত জমিদার ও পরে ব্রিটিশ আধিপত্যের পতন ঘটায়। জারতন্ত্রের রাশিয়ায় বিপ্লবীরা প্রধানত সন্ত্রাসী তৎপরতার উপর নির্ভর করে। নাজিরা হিংস্রতাপূর্ণ অবৈধ কাজের মাধ্যমে তাদের পথ বেছে নেয়। বর্তমানে চেকোস্লোভাকিয়ায় জার্মান জনগণের ভেতর যারা হেনলিন দলে যোগদান করা থেকে বিরত তারা এমন নোটিশ পাচ্ছে, আপনি একজন চিহ্নিত ব্যক্তি অথবা আপনার পালা আসবে। জার্মানিরা অস্ট্রিয়া দখল করে নিলে বিরোধীদের ভাগ্যে যা ঘটে সে দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের ভীতি প্রদর্শন অত্যন্ত কার্যকারী। যে রাষ্ট্র এ ধরনের কার্যকলাপের সাথে পেরে ওঠে না তারা শীঘ্রই পতিত হয় দুঃখে। এই অবৈধ কার্যকলাপ কোনো একক সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মসূচি হলে তার পরিণাম হয় বিপ্লব। কিন্তু তা দস্যুদল বা বিদ্রোহী সিপাহিদের কার্যকলাপ হলে পর্যবসিত হতে পারে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলতায়।

গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এগুলো গোপন সংস্থাগুলোর অনুরূপ নয় এমন অবৈধতা ছাড়াই সন্ত্রাসী কার্যকলাপে সমর্থ। কারণ, তারা শত্রুকে হত্যার হুমকি দেয় না, তবে ঠেলে দেয় ক্ষুধার দিকে। কোনো স্পষ্ট ঘোষণার প্রয়োজন হয় না এ ধরনের ভীতি প্রদর্শনের জন্য। তারা প্রায়ই এর দ্বারা সরকারকে পরাজিত করেছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যায় ফ্রান্সের অধুনা ঘটনা প্রবাহ। যতদিন পর্যন্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রাখে যে, রাষ্ট্রের ভেতরে এগুলোর সঙ্গে সম্পর্কহীন লোকজন যথেষ্ট খেতে পাবে অথবা পাবে না তত দিন পর্যন্ত মারাত্মক সীমাবদ্ধতার অধীন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বলা যায় যে, রাশিয়ার মতো ইতালি ও জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্যক্তি মালিকানার উপর রাষ্ট্রীয় মালিকানার শ্রেষ্ঠত্ব।

আমি এখন প্রশ্নে আসছি সরকারের প্রকারভেদের। ইতিহাসে জ্ঞাত প্রাচীনতম, সরলতম এবং সবচেয়ে বিস্তৃত সংবিধান হিসেবে পরম রাজতন্ত্র দিয়ে আরম্ভ করা স্বাভাবিক। আমি নিরূপণ করছি না রাজা ও অত্যাচারীর ভেতর পার্থক্য, আমি শুধু এক ব্যক্তির শাসন আলোচনা করছি-হতে পারে সে শাসনক্ষমতা উত্তরাধিকারী সূত্রেপ্রাপ্ত অথবা জোরপূর্বক লব্ধ। ব্যাবিলনীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে মেসিডোনীয়, রোমান প্রভূত্ব এবং খেলাফত পার হয়ে মহান মোগল পর্যন্ত এ ধরনের শাসন সবসময়ই প্রভাব বিস্তার করছে এশিয়ায়। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে সি. হুয়াং সি যিনি বই পুড়িয়েছিলেন, তার শাসনকাল ছাড়া অন্য কোনো সময়েই চীনের সম্রাটরা পরম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না। অন্য সময় পন্ডিত ব্যক্তিরা তাকে পরাস্ত করতে পারতেন। কিন্তু চীন সবসময়ই সব শাসনের ব্যতিক্রম। আজ যদিও পরম রাজতন্ত্র পতনোন্মুখ বলে অনুমিত হচ্ছে তারপরও এর সমান্তরালে থেকে অনুরূপ কিছু বিস্তার লাভ করছে জার্মানি, ইতালি, রাশিয়া, তুরস্ক ও জাপানে। এটা স্পষ্ট যে মানুষের কাছে স্বাভাবিক ও ধরনের সরকারই।

এর গুণাগুণ পরিষ্কার মনোবিজ্ঞান সম্মতভাবে। সাধারণত নেতা কোনো গোত্র বা সম্প্রদায়কে বিজয়লাভে পরিচালিত করেন এবং তার অনুসারীরা নিজেদের তার গৌরবের অংশীদার বলে মনে করেন। সাইরাস মিডসদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে পারসিকদের নেতৃত্ব দেন; আলেকজান্ডার মেসিডোনিয়াবাসীদের ক্ষমতা সম্পদ দান করেন; নেপোলিয়ান বিপ্লবী সৈন্যদের বিজয় এনে দেন। তা-ই ছিল লেনিন ও হিটলারের সঙ্গে নিজ নিজ দলের সম্পর্ক। যে দল বা সম্প্রদায়ের প্রধান হচ্ছেন একজন বিজয়ী ব্যক্তি সে দল বা সম্প্রদায় স্বেচ্ছায় তাকে অনুসরণ করে এবং তার সফলতার প্রশান্তি অনুভব করে। শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভীতি বিরাজমান যাদের তিনি পরাস্ত করেন তাদের ভেতর। কোনো রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ বা আপসভ্যাসের প্রয়োজন নেই; একমাত্র সহজাত সামাজিক বন্ধন অন্তর্হিত ছোট দলের ভেতর বিরাজমান বন্ধনের মতোই এবং তা এই সত্যের জন্য সহজ হয়ে যায় যে, সবকিছুই নির্ভর করে বীরের কৃতিত্বের উপর। তিনি যখন মারা যান তখন তার কাজ হয়ে যেতে পারে টুকরো টুকরো। কিন্তু ভাগ্যক্রমে কোনো সক্ষম উত্তরাধিকারী নতুন ক্ষমতা চালিয়ে যেতে পারে প্রথাগত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।

নেতা ও অনুসারীদের সম্পর্ক ভিন্ন অন্য যে সম্পর্ক একই সম্প্রদায়ের লোককে একত্রিত করে রেখেছে তার অসুবিধা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের সাপেক্ষে। বিজয়ের মাধ্যমে ছোট দৃষ্টান্ত খুবই কম। কারণ, ফিলিপের সময় গ্রিস ও রেনেসাঁ ইতালির বিভিন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভেতর সামান্যতম সহযোগিতা ও জীবন-মৃত্যুর ব্যাপার ছিল। এ সত্ত্বেও তা ঘটেনি। আজকাল একই জিনিস সত্য ইউরোপের বেলায়। আদেশদানে অথবা স্বাধীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ব্যক্তিকে প্রভাবিত করা সহজ নয় যে তিনি স্বেচ্ছায় বাইরের শক্তির কাছে মাথা নত করবেন। কিন্তু সাধারণত তা দস্যুদলের অনুরূপ এবং তাদের হাতে নেতৃত্বদানের ক্ষমতা অর্পণের ব্যাপারে নেতার অভিপ্রায়ে বিশ্বাস রাখে। এই ক্ষেত্রে চুক্তিটি রুশোর নয় বরং হবসের। এটি এমন এক চুক্তি যার মাধ্যমে নাগরিকরা পরস্পরের সঙ্গে অভিনয় করে থাকে–এটা নেতা ও অনুসারীদের মধ্যকার চুক্তি নয়। মনোবিজ্ঞানসম্মত গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে যে, মানুষ এ ধরনের চুক্তি শুধু তখনই মেনে নিতে রাজি হয় যখন দেখা দেয় লুণ্ঠন ও বিজয়ের সমূহ সম্ভাবনা। স্বাভাবিকভাবে নগ্ন আকারের না হলেও এটাই মনোবিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া, যার ফলে স্বৈরাচারী নয় এমন রাজারা সফল যুদ্ধের মাধ্যমে হতে পেরেছে এর আরও অধিক কাছাকাছি।

এই আলোচনা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় যে, রাজার স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার প্রতি যখন সিংহাসনের কাছাকাছি একদল লোকের স্বেচ্ছামূলক সম্মতির প্রয়োজন হয়ে পড়ে তখন স্বভাবতই অধিকাংশ প্রজা প্রথমে ভয়ে ও পরে মেনে নেয় ঐতিহ্যগতভাবে অধীনতা। যে অর্থে সামাজিক চুক্তি পুরোপুরিভাবে অবাস্তব নয় শুধু সে অর্থে তা বিজয়ীদের চুক্তি। এ চুক্তি আসল উদ্দেশ্য হারিয়ে বসে বিজয়ের ফলোভে বঞ্চিত হলে। একাধিক সম্প্রদায়ে বিস্তৃত ক্ষমতার অধিকারী রাজার প্রতি অধিকাংশ প্রজার বশ্যতার মূল কারণ স্বেচ্ছামূলক সম্মতি নয়, ভয়।

দলের অভ্যন্তরে আনুগত্যের উদ্দেশ্য এবং সাধারণ জনগণের ভেতর ভয় এত সহজ ও সরল যে সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর বিস্তৃতি শুধুই বিজয়ের মাধ্যমে হয়েছে স্বেচ্ছামূলক ফেডারেশন দ্বারা নয়। একই কারণে রাজতন্ত্র এত গুরুত্ব বহন করছে ইতিহাসে।

যা হোক রাজতন্ত্রের রয়েছে অনেক বড় অসুবিধা। তা উত্তরাধিকারমূলক হলে শাসকদের টিকে থাকা সন্দেহজনক। সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে গৃহযুদ্ধ হতে পারে উত্তরাধিকার আইনে কোনোরূপ অনিশ্চয়তা থাকলে। প্রাচ্যে একজন শাসক তার ভাইদের হত্যার মাধ্যমে শুরু করেন; কিন্তু একজন পালিয়ে যেতে পারলে তিনি দাবি উত্থাপন করতেন সিংহাসনের। পড়া যেতে পারে MAINUC CIS STORIA DO MOGOR নামক বইটি। বইটিতে মহান মোগলদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, উত্তরাধিকারমূলক যুদ্ধ অন্য যে কোনো কারণের চেয়ে তাদের সাম্রাজ্যকে অধিকতর দুর্বল করে দেয়। একই শিক্ষা গোলাপ যুদ্ধ দিয়ে থাকে আমাদের দেশে।

অপরপক্ষে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা এর চেয়ে বেশি রাজতন্ত্র উত্তরাধিকারমূলক না হলে। এ ধরনের বিপদের উদাহরণ হচ্ছে কমোডসের মৃত্যুর পর ক্রিস্টেন্টাইনের সিংহাসন আরোহণ পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য। এ সমস্যার একমাত্র সমাধান পরিকল্পিত হয়েছে; এটা এমন পদ্ধতি যার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে থাকেন পোপ। কিন্তু তা হচ্ছে গণতন্ত্র থেকে শুরু করে উন্নয়নের সর্বশেষ পরিভাষা। এক্ষেত্রেও বিরাট অনৈক্য থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, এ পদ্ধতিও অভ্রান্ত নয়।

রাজতন্ত্রে আরও মারাত্মক অসুবিধা এই যে, রাজার স্বার্থের অনুকূল প্রজাদের স্বার্থ না হলে সাধারণত তা প্রজাদের স্বার্থের প্রতি উদাসীন হয়। বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত থাকা সম্ভব স্বার্থের অভিন্নতা। রাজার আগ্রহ অভ্যন্তরীণ অরাজকতা দমনে বিদ্যমান। সুতরাং অরাজকতার বিপদ দেখা দিলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সম্প্রদায় অরাজকতা দমনে রাজাকে সমর্থন করেন। প্রজাদের সম্পর্কে তার আগ্রহ রয়েছে কারণ তাতে কর অধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। রাজা ও প্রজাদের স্বার্থ অভিন্নরূপে দেখা দেয় বৈদেশিক যুদ্ধে বিজয়ী হলে। তাই রাজ্য বিস্তারে সমর্থ হলে তার নেতৃত্বাধীন দলটি তার কাজকে লাভজনক মনে করে। কিন্তু রাজারা দুটো কারণে বিপথগামী হন : গর্ব এবং নিষ্প্রভ অভ্যন্তরীণ দলের উপর নির্ভরতা। গর্ব সম্পর্কে : মিসরীয়রা পিরামিড তৈরির ব্যাপারে কষ্ট করলেও ফরাসিরা পরিশেষে প্রতিবাদ করেছে ভার্সাই এবং লভার সম্পর্কে। নীতিবাদীরা কঠোর ভাষা প্রয়োগ করেছে কোর্টের বিলাসিতার উপর। বাইবেলের অপ্রামাণিক অংশে মদ খারাপ, নারী খারাপ, রাজা খারাপ বলে বর্ণিত আছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ রাজতন্ত্র পতনের অন্য কারণটি। রাজারা সমাজের নির্ভরশীল হয়ে পড়েন বিশেষ অংশের উপর : অভিজাত শ্রেণি, চার্চ, উচ্চ বুর্জোয়া অথবা সম্ভবত কোনো ভৌগোলিক দল যেমন, কোজাক। ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায় অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ফলে সুবিধাভোগী বলের ক্ষমতা এবং তাদের সঙ্গে রাজাও হয়ে ওঠেন অপ্রিয়। নিকোলাস-২ এর মতো তিনি নিজ দলের পূর্ণ সমর্থন লাভের পরিবর্তে তা হারানোর মতো নির্বোধ হতে পারেন; কিন্তু এটা ব্যতিক্রমধর্মী। চার্লস-১ ও লুইস-১৬ অভিজাতদের সমর্থন পেয়েছিলেন, কিন্তু তাদের পতন ঘটে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিরোধী হওয়ার ফলে।

একজন রাজা বা স্বৈরচারী শাসক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারেন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ধূর্ত হলে এবং বাহ্যিকভাবে সফল হলে। তার রাজবংশ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে তিনি আপাত ঐশ্বরিক হলে। কিন্তু সভ্যতার বিকাশ তার স্বর্গীয় দাবির প্রতি বিশ্বাসের পরিসমাপ্তি ঘটায়। যুদ্ধের পরাজয় সবসময় সংঘটিত হলে কোনো এক সময় বিপ্লব হতে পারে এবং নিশ্চিত হয়ে যেতে পারে রাজতন্ত্র।

রাজতন্ত্রের স্বাভাবিক উত্তরাধিকার হচ্ছে অলিগার্কি। অলিগার্কি অনেক ধরনের হতে পারে : তা হতে পারে বংশপরম্পরায় অভিজাতদের, ধনীদের, চার্চের অথবা রাজনৈতিক দলের। বিভিন্ন ফল পাওয়া যায় এগুলো থেকে। উত্তরাধিকারমূলক জমিদারি আভিজাত্য, রক্ষণশীল, গর্বিত, মূর্খ এবং এমনকি নিষ্ঠুরও হতে পারে। এসব কারণে তা সবসময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয় উচ্চ বুর্জোয়াদের সঙ্গে সংগ্রামে। মধ্যযুগে সব স্বাধীন শহরগুলোতে ধনীদের শাসন জয়ী হয় এবং তা ভেনিসে টিকে থাকে নেপোলিয়ান কর্তৃক বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত। মোটের উপর ইতিহাসে জ্ঞাত অন্যান্য শাসনের চেয়ে এ ধরনের শাসন অধিকতর জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত ও ধূর্ততাপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে জটিল ষড়যন্ত্রে নিমজ্জিত ভেনিস শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিচক্ষণতার দিকনির্দেশনা দেয় এবং অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতাপূর্ণ কূটনৈতিক বিভাগ চালু করে। বাণিজ্যলব্ধ অর্থ চাতুর্যজাত ছিল, কিন্তু স্বেচ্ছাচারজাত নয়। বণিকদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারের ভেতর এই বৈশিষ্ট্যগুলো পরিলক্ষিত হয়। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি আধুনিক শিল্পে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। এর আংশিক কারণ এই যে, তারা কাঁচামাল ব্যবহার করে থাকেন কৌশলগতভাবে নিপুণতার সঙ্গে। এর আংশিক কারণ এও হতে পারে যে, জনসাধারণের সঙ্গে তাদের আচরণ সমপর্যায়ভুক্ত লোকের সঙ্গে নয় বরং সৈনিক কর্মচারীদের সঙ্গে আচরণের মতো, যারা অবশ্যই প্রত্যায়াপন্ন হবেন, কিন্তু হবেন না দমিত।

চার্চ বা রাজনৈতিক দলের সমর্থনপুষ্ট সরকার (যাকে দিব্যতন্ত্র ও সেন্ট পিটারের পিতৃত্বে এবং জেসুটের রাজত্বকালে) পেরাগুয়েতে বিরাজ করে। কিন্তু এর আধুনিক রূপটি কেলভিনের শাসনের মাধ্যমে জেনেভাতে শুরু হয়। ব্যতিক্রম শুধু মুনস্টারে এনাবেপ্টিস্টদের স্বল্পকালীন আন্দোলন। এর চেয়েও আধুনিক রূপটি দরবেশদের শাসন যা পুনর্জাগরণের সময় ইংল্যান্ডে সমাপ্ত হয়। তবে তা কিছুকালের জন্য টিকে ছিল নতুন ইংল্যান্ডে। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে এ ধরনের সরকারের স্থায়ী বিলুপ্তি ঘটেছে বলে মনে হয়। কিন্তু পুনরুজ্জীবিত হয় লেলিন কর্তৃক। ইতালি ও জার্মানিতে তা গৃহীত হয় এবং এর জন্য জোর প্রচেষ্টা চলে চীনে।

রাশিয়া ও চীনের মতো যেসব দেশে জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই অশিক্ষিত ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাশূন্য সেখানে বিপ্লবীরা সম্মুখীন হয় কঠিন পরিস্থিতির। সম্ভবত সফল হতো না পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র। এর জন্য চেষ্টা করা হয়েছে চীনে, কিন্তু প্রথম থেকেই পরিণত ছিল কলঙ্কজনক। অপরপক্ষে রাশিয়ায় অঞ্চলভিত্তিক আভিজাত্য ও মধ্যবিত্ত বনিক শ্রেণির প্রতি বিপ্লবী দলগুলোর ছিল শুধু ঘৃণাই। এসব শ্রেণির মানুষের সমন্বয়ে গঠিত অলিগার্ক দ্বারা কোনো লক্ষ্যই অর্জন করার ছিল না। তাই তারা বলেছিলেন, বিপ্লবী দল হিসেবে আমরা দেশে গণতন্ত্রের ক্ষেত্র সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখব এবং এর ভেতর আমাদের নীতি অনুযায়ী আমরা দেশবাসীকে শিক্ষিত করে তুলব।

যা হোক আশানুরূপ ফল লাভ হয়নি পুরনো বলশেভিকদের। ক্রমাগতভাবে মারাত্মক রূপ ধারণ করে গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং কৃষক অসন্তোষের মুখে একনায়কতন্ত্র। পাশাপাশি লেলিনের মৃত্যুর পর কমিউনিস্টদের দলীয় কোন্দলের ফলে একদলীয় শাসন কঠিন ছিল না। আমি ১৯২০ সালে লিখেছিলাম : বর্তমানে রাশিয়া যে অবস্থার সম্মুখীন বলশেভিক তত্ত্ব অনুসারে আজ হোক কাল হোক প্রতিটি দেশ একই অবস্থার সম্মুখীন হবে এবং এমন অবস্থায় প্রতিটি দেশ নির্মম লোকের হাতে পড়বে যারা স্বাধীনপ্রিয় নয় স্বভাবগতভাবে। একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের গুরুত্ব কমই দেবে তারা। এটি অনিবার্য যে রাশিয়ায় বলশেভিকদের মতো অন্যান্য দেশে যেসব ব্যক্তি অনুরূপ অবস্থানে রয়েছে তারা ছেড়ে দেবে তাদের ক্ষমতার একচেটিয়া অধিকার এবং নতুন বিপ্লবের মাধ্যমে বিতাড়নের পূর্ব পর্যন্ত টিকে থাকার জন্য চেষ্টা করবে যুক্তি খুঁজে বের করার। অন্যান্য ক্ষেত্রে গুণাগুণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এসব কারণে দিব্যতন্ত্রকে গণতন্ত্রের দিকে গণ্য করা কঠিন একটি পদক্ষেপ হিসেবে।

কোনো নতুন ধর্মের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে দিব্যতন্ত্রের গুণাগুণ কখনও খুব মহান এবং কখনও হয়ে পড়ে প্রায় অস্তিত্বহীন। প্রথমত বিপ্লবের পর বিশ্বাসীরা সামাজিক বন্ধনের নাভী গঠন করে এবং মৌলিক বিষয়ে একমত হওয়ার ফলে সহজে সহযোগিতা করতে পারে। সুতরাং তাদের পক্ষে সম্ভব সম্পূর্ণ সচেতন একটি শক্তিশালী সরকার গঠন করা। দ্বিতীয়ত ইতিমধ্যে খেয়াল করা গেছে যে, কোনো কারণে গণতন্ত্র নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ হলে সেখানে সংখ্যালঘিষ্ঠ (জন্ম বা সম্পদের দিক দিয়ে নয়) দল বা চার্চের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা সম্ভব। তৃতীয়ত, এটা নিশ্চিত যে বিশ্বাসীরা সাধারণ মানুষের চেয়ে অধিক শক্তিসম্পন্ন ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং অনেকাংশেই তারা অর্জন করেছে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব। যা হোক কিছু ক্ষমতাসম্পন্ন কিছু ধর্মমতসহ বিশেষ বিশেষ ধর্মমত চাকরি সন্ধানী দুঃসাহসিক লোকসহ শুধু মূর্খ লোককেই আকর্ষণ করে থাকে। তাই দিব্যতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত কতগুলো বৈশিষ্ট্য হলো বুদ্ধিবৃত্তি।

একটি সম্প্রদায়ের সদস্যদের ভেতর ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লে সেখানে অনিবার্যভাবে কঠোর বাছাই সম্পন্ন হয়। খাঁটি বিশ্বাসীরা সত্য বিশ্বাসের প্রচারের উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে; অন্যান্য ব্যক্তিগত বাহ্যিক সাদৃশ্য সন্তুষ্ট থাকে। প্রথমোক্ত মনোভাব মুক্তবুদ্ধিচর্চা নষ্ট করে দেয়। শেষোক্তটি জন্ম দেয় কপটতার। শিক্ষা ও সাহিত্য অবশ্যই ধরাবাঁধা ছকের ভেতর থাকবে এবং উদ্যম ও সমালোচনার পরিবর্তে শুধু বিশ্বাস সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিকল্পিত হবে। নেতারা নিজস্ব মতবাদে আগ্রহী হলে ভিন্ন মতের আবির্ভাব ঘটবে এবং গোঁড়া মতবাদ ক্রমান্বয়ে সঞ্চার করবে অধিকতর শক্তি। যারা ধর্মমতের দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত তারা সাধারণ মানুষের অনুরূপ নয়, দৈনন্দিন জীবন থেকে এ ধরনের ভিন্ন কিছু দ্বারা পরিচালিত হন। এ ধরনের মানুষ কোনো অপ্রিয় সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করলে সমাজের অধিকাংশ মানুষ। স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অধিকতর হঠকারী ও মূর্খ হয়। এটি এমন একটি ফল বা সব চিন্তাই কার্যত ভিন্নমত এবং তাই বিপজ্জনক-এ ধরনের জ্ঞানের দ্বারা উন্নীত হয়। দিব্যতন্ত্রের অনুসারী শাসক অন্ধ অনুরাগের বশবর্তী হবেন; অন্ধ অনুরাগের ফলে তিনি মারাত্মক হবেন; মারাত্মক হলে তিনি বিরোধিতার সম্মুখীন হবেন; বিরোধিতার সম্মুখীন হলে তিনি আরও মারাত্মক হবেন। তার ক্ষমতা তাড়না ধর্মীয় উন্মাদনার ছদ্মাবরণে আবৃত থাকবে। ফলে তা পর্যবসিত হবে নিয়ন্ত্রণহীনতায়। ধ্বংস ও বিপন্ন অবস্থা এবং নাজি পুলিশ ও চেক এর জন্যেই।

আমরা দেখেছি যে, দোষ-গুণ-ই আছে রাজতন্ত্র ও অলিগৰ্কীর। উভয়টির প্রধান ত্রুটি হচ্ছে, যে সরকার এক সময় সাধারণ মানুষের স্বার্থের প্রতি এতই উদাসীন হয়ে পড়ে যে বিপ্লব সংগঠিত হয়। গণতন্ত্র দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে তা এ ধরনের অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। যেহেতু গৃহযুদ্ধ গুরুতর অমঙ্গলজনক সুতরাং যে সরকার ব্যবস্থা গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা দূর করে দেয় তা প্রশংসার দাবি রাখে। এখন গৃহযুদ্ধ অসম্ভব, কিন্তু সংঘটিত হলে তা আগের ক্ষমতাসীনদের জন্য নিয়ে আসবে বিজয়। অন্যান্য কিছু অপরিবর্তিত থাকলে গৃহযুদ্ধে সংখ্যালঘু সরকারের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের বিজয়ের সম্ভাবনা বেশি। এগুলো গণতন্ত্রের পক্ষের যুক্তি; অধুনা বিভিন্ন উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে তা অনেক সীমাবদ্ধতার অধীন।

একটি সরকার গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করে রাজনৈতিক ক্ষমতায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অংশগ্রহণের ফলে। চরম গ্রিসীয় গণতন্ত্রে মহিলা ও দাসের স্থান ছিল না। মহিলাদের ভোটাধিকার প্রদানের আগেই আমেরিকানরা নিজেদের গণতান্ত্রিক ভাবত। স্পষ্টতই রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে গণতন্ত্রের কাছাকাছি এসে যায় একটি অলিগার্কি ব্যবস্থা। কিন্তু অংশগ্রহণকারী লোকের সংখ্যা হ্রাস পেলে দেখা দেয় অলিগার্কির বৈশিষ্ট্য।

সব সংগঠনের বিশেষত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সরকারের সমস্যা দুধরনের। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি হচ্ছে শাসিতের কাছ থেকে সম্মতি আদায় করা। শাসিতের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি হচ্ছে শাসিতের স্বার্থের ক্ষতিয়ান নিতে সরকারকে উদ্বুদ্ধ করা। সমস্যা দুটির যে কোনো একটি সমাধান হয়ে গেলে দেখা দেয় না অন্যটি। কিন্তু উভয়টির সমাধানের অভাবে দেখা দেয় বিপ্লব। সাধারণ একটি সমঝোতামূলক সমাধানে পৌঁছা সম্ভব। পেশিশক্তির কথা বাদ দিলে সরকার পক্ষের প্রধান উৎপাদকগুলোর পেশি হচ্ছে ঐতিহ্য, ধর্ম, বৈদেশিক শত্রুর ভয় এবং নেতাকে অনুসরণ করার স্বাভাবকি ইচ্ছা। শাসিতের স্বার্থ রক্ষার জন্য কোন মাত্রা কার্যকর–এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত পদ্ধতিই হচ্ছে গণতন্ত্র।

শাসন পদ্ধতি হিসেবে কিছু অপরিহার্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে গণতন্ত্রের। অন্যান্য ক্ষেত্রে এগুলো নীতিগতভাবে পরিহারযোগ্য। এ সীমাবদ্ধতার উদ্ভব হয় প্রধানত দুটো উৎস থেকে। কিছু ক্ষেত্রে ত্বরিত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় বিশেষজ্ঞ পরামর্শ। ১৯৩১ সালে ব্রিটেন যখন স্বর্নমান পরিত্যাগ করে তখন উভয় উৎপাদকই জড়িত ছিল। সমস্যাগুলো এমন ছিল যে, তা বুঝত না অধিকাংশ মানুষই। গণতন্ত্র তাই অতীত দৃশ্যাদি অবলোকনপূর্বক এর মতামত প্রকাশ করতে পারত। যুদ্ধ মুদ্রার চেয়ে কম কৌশলসম্পন্ন, কিন্তু তুরিতাবস্থাজনিত।

এসব অপরিহার্য সীমাবদ্ধতার জন্য ভোটাররা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্ভর করে সরকারের উপর। সরকার জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেই গণতন্ত্র সফল হয়। দীর্ঘ সংসদ রায় ঘোষণা করে যে, এর সম্মতি ছাড়া সংসদ ভেঙে দেয়া যাবে না। কোন জিনিসটি পরবর্তী সংসদকে এ ধরনের কাজে বাধা দেয়? উত্তরটি যেমন সাধারণ নয় তেমনি নিশ্চিতও নয়। প্রথমে অবস্থায় বিপ্লবাত্মক পরিস্থিতি বিরাজ না করলে বহির্গামী সংসদ সদস্যদের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা বিধিত করে। তাদের অনেকেই আবার নির্বাচিত হতে পারেন। শাসন করার আনন্দ হতে বঞ্চিত হলেও প্রতিযোগীর ভুলের প্রকাশ্য সমালোচনা করে প্রায় সমান আনন্দ পেতে পারেন। যথাসময়ে তারা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু শাসনতান্ত্রিক উপায়ে তাদের কবল থেকে ভোটারদের মুক্তি অসম্ভব হলেও বিপ্লবাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। এতে তাদের সম্পত্তি এমনকি জীবনও হতে পারে বিপন্ন। এ ধরনের হঠকারিতায় সম্পৃক্ত ছিল স্টামফোর্ড ও প্রথম চার্লসের অদৃষ্ট।

ইতিমধ্যে বিপ্লবাত্মক পরিস্থিতি বিরাজ করলে সব কিছু ভিন্ন রূপ ধারণ করত। ধরা যাক একটি রক্ষণশীল দলের এ ধরনের ভয় করার কারণ ছিল যে, পরবর্তী নির্বাচনে কমিউনিস্টরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে এবং ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটাবে কোনোরূপ ক্ষতিপূরণ ছাড়াই। এ ধলনের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল দীঘ সংসদের পক্ষে রায় দিতে পারে। তা প্রতিহত করা যেতে পারে শুধু সেনাবাহিনীর আনুগত্যের ব্যাপারে সন্দেহ দ্বারাই।

গণতন্ত্রের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বাধ্যতামূলক হলেও তা এ ধরনের নিরাপত্তাবোধে ব্যর্থ হবে যে বিপ্লবাত্মক পরিবেশে প্রতিনিধিদের পরিস্থিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সঙ্গে সংসদের মনোভাব বিরোধিতাপূর্ণ হতে পারে। এ ধরনের পরিবেশে সংসদ শক্তিমত্ততার উপর নির্ভর করে কোনোরূপ ঝুঁকি ছাড়াই ব্যর্থ করতে দিতে পারে অধিকাংশ জনগণের উদ্দেশ্য।

এটা বলা যাবে না যে, গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো শাসন পদ্ধতি রয়েছে। শুধু বলা যাবে যে, অনেক বিষয় রয়েছে যার জন্য মানুষ সংগ্রাম করবে এবং এগুলোর উদ্ভব হলে কোনো শাসনই ঠেকাতে পারবে না গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে এমন কোনো বিষয়ের জটিলতা রোধ করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর অন্যতম। যে সমাজে মানুষ গণতন্ত্র চর্চায় অভ্যস্ত সেখানে এই দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী গণতন্ত্র অন্য যে কোনো শাসন পদ্ধতির চেয়ে অগ্রাধিকার পাবার যোগ্য।

শাসন পদ্ধতি হিসেবে গণতন্ত্রের সমস্যা এই যে, তা সব সময় গুরুত্ব আরোপ করে আপসমূলক মনোভাবের উপর। কিন্তু সঠিক মনোভাব এই হওয়া উচিত যে, পরাজিত দল বশ্যতা স্বীকারের উপযোগী কোনো নীতি গ্রহণ করবে। অপরদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সুবিধাবাদী কার্যকলাপ এমন হওয়া উচিত নয় যা জন্ম দিতে পারে বিদ্রোহের। এর জন্য প্রয়োজন অনুশীলন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও পারস্পরিক সহিষ্ণু মনোভাব। এর চেয়েও বেশি প্রয়োজন ভীতশূন্য রাষ্ট্রের। কারণ ভীতিপ্রদ রাষ্ট্রের জনগণ বাধ্য হয় নেতাকে অনুসরণ করতে। এমন ক্ষেত্রে উড়িয়ে দেয়া যায় না নেতার একনায়ক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এই অবস্থায় একমাত্র গণতন্ত্রই স্থিতিশীল সরকার গঠনে সর্মথ। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ডমিনিয়ন স্ক্যানডিনেভিয়া এবং সুইজারল্যান্ড বাহ্যিক প্রভাব ছাড়া খুব কমই বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। স্থিতিশীলতা ছাড়াও গণতন্ত্রের গুণাগুণ এই যে, তা সমাজের মঙ্গলজনক কাজে সরকারকে বাধ্য করে। এগুলো আশানুরূপ না হলেও পরম রাজতন্ত্র, অলিগার্ক অথবা স্বৈরাচারের চেয়ে গণতন্ত্র অনেক বেশি কার্যকরি।

গণতন্ত্রের কিছু সমস্যা রয়েছে আধুনিক বৃহৎ রাষ্ট্রে। সমস্যাগুলো অন্যান্য শাসন পদ্ধতির সঙ্গে তুলনামূলক নয়, বরং তা অপরিহার্য রূপে বিপুল সংখ্যাপ্রসূত। প্রাচীনকালে প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অজ্ঞাত থাকায় নাগরিকরা বাজার এলাকায় জমায়েত হয়ে নিজেদের মতামত দিতে পারত প্রতিটি বিষয়ের উপর। রাষ্ট্রের পরিধি যখন একক নগরভিত্তিক ছিল তখন তা প্রতিটি নাগরিককে ক্ষমতা ও দায়িত্ববোধ দান করে। অধিকাংশ বিষয় এমন ছিল যে, প্রত্যেকেই তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দ্বারা এগুলো বুঝতে পারত। কিন্তু নির্বাচিত আইন পরিষদের অভাবে গণতান্ত্রিক এলাকা বেশি বিস্তার লাভ করেনি। ইতালির বিশাল এলাকায় জনগণকে রোমান নাগরিকত্ব প্রদান করলে রাজনৈতিক নতুন এলাকার নাগরিকরা রাজনৈতিক ক্ষমতায় বাস্তব অংশগ্রহণে সক্ষম হয়নি। কারণ, তা অনুশীলন করতে পারত শুধু রোমে বসবাসকারী জনসাধারণই। আধুনিক বিশ্বে প্রতিনিধি র্নিাচনের মাধ্যমে ভৌগোলিক অসুবিধাগুলো দূর করা হয়। অল্পদিন আগেও প্রতিনিধিরা একবার নির্বাচিত হলে যথেষ্ট ক্ষমতা রাখতেন। কারণ রাজধানী থেকে দূরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী জনগণ কার্যকরি মতামত রাখার জন্য ঘটনাবলি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য শীঘ্র বিস্তারিতভাবে জানতে পারত না। অধুনা সম্প্রচার মাধ্যম দ্রুত যাতায়াত ব্যবস্থা, সংবাদপত্র ইত্যাদির বদৌলতে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোও ক্রমাগতভাবে প্রাচীন নগর রাষ্ট্রের অনুরূপ হতে চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে দূরবর্তী ভোটারদের। অনুসারীরা নেতার উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, নেতাও প্রভাব বিস্তার করতে পারেন অনুসারীদের উপর। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে তা অসম্ভব ছিল। ফলস্বরূপ প্রতিনিধিত্বের গুরুত্ব কমেছে এবং নেতার গুরুত্ব বেড়েছে। সংসদ এখন আর ভোটার ও শাসকদের ভেতর কার্যকরি মাধ্যম নয়। আগের দিনে শুধু নির্বাচনকালে ব্যবহৃত হতো এমন সব প্রচার মাধ্যম আজকাল সব সময়ই প্রচারণা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। জননেতা, অত্যাচারী শাসক, দেহরক্ষী ও নির্বাসিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রাচীন নগর রাষ্ট্রের অনুরূপ রাষ্ট্র আবার জাগরিত হয়েছে। কারণ আবারও দেখা দিয়েছে এর প্রচারণা পদ্ধতি।

নেতার প্রতি আগ্রহ না থাকলে বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটাররা প্রায়ই ভোটাধিকার প্রয়োগ মনে করেন অর্থহীন। কোনো একটি দলের শক্তিশালী প্রচারক না হলে শাসক নির্বাচনের সিদ্ধান্তকারী বিশাল জনশক্তির তুলনায় তার ভূমিকা পুরোপুরিভাবে অবহেলিত মনে করেন। বাস্তবে তিনি শুধু দুই ব্যক্তির ভেতর যে কোনো একজনের পক্ষে সংশ্লিষ্ট মনস্তত্ত্ব রাজতন্ত্রের বেলা আরোচিত মনস্তত্ত্বের অনুরূপ হয়ে থাকে। রাজাও তার সক্রিয় সমর্থকদের সম্পর্ক গোত্র বা সম্প্রদায়ের সদস্যদের ভেতর বন্ধনের অনুরূপ প্রত্যক্ষ দক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তি বিশেষের ভেতর উৎসর্গের মনোবৃত্তি উজ্জীবিত করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করে থাকেন। ওই ব্যক্তি বড় নেতা হলে এক ব্যক্তির শাসন হয় প্রতিষ্ঠিত। তা না হলে কার্যকরি কমিটিই প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে থাকে তার নির্বাচনী বিজয়ের পশ্চাতে।

প্রকৃত গণতন্ত্র এটা নয়। সরকারের পরিধি বড় হলে গণতন্ত্র সংরক্ষণ সম্পর্কীয় প্রশ্ন কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তী অধ্যায়ে আমি এই আলোচনায় প্রত্যাবর্তন করব।

এ পর্যন্ত আমরা আলোচনা করলাম রাজনীতিতে বিভিন্ন প্রকার শাসন পদ্ধতি। কিন্তু অর্থনৈতিক সংগঠনগুলোতে আবির্ভূত পদ্ধতি এত গুরুত্বপূর্ণ ও অদ্ভুত যে তা দাবি রাখে পৃথক আলোচনার।

কোনো শিল্প উদ্যোগের ক্ষেত্রে প্রারম্ভেই রয়েছে একটি পার্থক্য যা প্রাচীন সমাজে নাগরিক ও দাসের মধ্যকার পার্থক্যর অনুরূপ। মূলধন দাতা একজন নাগরিক, কিন্তু চাকরিজীবী হচ্ছেন একজন দাস। এ ধরনের পার্থক্যে আমি খুব জোর দিতে চাই না। চাকরিজীবী দাসের অনুরূপ নন। কারণ, তিনি চাকরি পরিবর্তন করতে পারেন অথবা ইচ্ছা করলে কাটাতে পারেন অবসর সময়। সরকারের সাপেক্ষে আমি সাদৃশ্য বের করতে চাই। স্বাধীন মানুষের সাপেক্ষে সম্পর্কের ভিত্তিতে স্বৈরাচার, অলিগার্ক ও গণতন্ত্র ভিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়েছে। দাসের সঙ্গে সম্পর্ক অনুযায়ী এগুলো একই ধরনের। অনুরূপভাবে একটি পুঁজিবাদী শিল্প প্রতিষ্ঠানে রাজতান্ত্রিক, অলিগার্ক ও গণতান্ত্রিক পন্থায় বিনিয়োগকারীদের ভেতর ক্ষমতা বন্টন করা হয়। কিন্তু চাকরিজীবীরা বিনিয়োগ না করলে কোনো শেয়ার পায় না এবং তাদের দাবি অবহেলিত থেকে যায় প্রাচীন দাসের মতোই।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বহুরূপতা দেখা যায় অলিগার্কিক সংবিধানের মতো। আমি এ মুহূর্তে ভাবছি না এই সত্য সম্পর্কে যে, চাকরিজীবীরা রয়েছে ব্যবস্থাপনার বাইরে। আমি ভাবছি শুধু শেয়ার মালিকদের কথাই। এ সম্পর্কে ভালো বর্ণনা যে বইতে পাওয়া যায় ইতিমধ্যে আমি এর বর্ণনা দিয়েছি : The Modern Corporation and Private Property by Berley and Means. নিয়ন্ত্রণের ক্রমবিকাশ শিরোনামে এক অধ্যায়ে গ্রন্থকারদ্বয় দেখিয়েছেন যে কিভাবে অলিগার্করা স্বল্প বিনিয়োগের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করে নিয়ন্ত্রণ লাভ করেছে বিশাল সঞ্চিত মূলধনের। Proxy Committee র কলা- কৌশল ব্যবহার করে পরিচালকরা তাদের উত্তরসূরিদের নির্দেশ দিতে পারেন। মালিকানা অসংখ্য ভাগে ভাগ হয়ে পড়লে ব্যবস্থাপনা চিরস্থায়ী হয়ে যেতে পারে। এ শর্তের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থা বর্তমান লেখক অন্যত্র যে সংগঠনে বের করতে পেরেছেন তা হচ্ছে ক্যাথলিক চার্চের উপর প্রভাবশালী সংগঠন। পোপ কার্ডিনালদের নিযুক্ত করেন, আবার কার্ডিনাল পরিষদ পোপ নির্বাচন করেন। এ ধরনের ব্যবস্থা কোনো কোনো বিশাল কর্পোরেশনে বিদ্যমান। আমেরিকায় টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ কোম্পানি এবং আমেরিকার ইস্পাত কর্পোরেশনের বিনিয়োগ যথাক্রমে চার ও দুই বিলিয়ন ডলার। শেষোক্তটিতে পরিচালকমণ্ডলী মাত্র ১.৪ শতাংশের মালিক অথচ তাদের হাতে সম্পূর্ণরূপে অর্থনৈতিক ক্ষমতা।

ব্যবসা কর্পোরেশনগুলো অধিকতর জটিল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে। ভিন্ন ভিন্ন করণীয় কাজ রয়েছে পরিচালকদের, শেয়ার মালিকদের, ডিবেঞ্চার মালিকদের, নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারীদের। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সাধারণ অলিগার্ক ব্যবস্থার অনুরূপ। এর ইউনিট হচ্ছে শেয়ার-শেয়ার মালিক নয়। পরিচালকরা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি। বাস্তবে সাধারণ শেয়ার মালিকদের তুলনায় পরিচালকদের যে ক্ষমতা রয়েছে তা ব্যক্তি অলিগার্কের তুলনায় রাজনৈতিক অলিগার্কের ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। অপরপক্ষে যেখানে ট্রেড ইউনিয়ন সুসংগঠিত সেখানে চাকরির শর্তের ব্যাপারে কর্মচারীদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত রাখার ক্ষমতা রয়েছে। উদ্দেশ্যের অদ্ভূত দ্বৈততা পরিলক্ষিত হয় পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানে : একদিকে জনসাধারণের জন্য দ্রব্য অথবা সেবার যোগান দেয়ার উদ্দেশ্যে এগুলো সৃষ্টি করা হয়ে থাকে; অপরদিকে শেয়ার মালিকদের লাভের অংশ দেয়াও এগুলোর উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে রাজনীতিবিদরা শুধুই বেতন বৃদ্ধির চিন্তা করেন না, বরং জনকল্যাণমূলক কর্মেও ব্রত হন। স্বৈরাচারী সরকারের পক্ষ থেকেও এ ধরনের দাবি উচ্চারিত হয় বলে ব্যবসার চেয়ে রাজনীতিতে অধিক কপটতা বিদ্যমান। কিন্তু গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক প্রচারণার যৌথ প্রভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপতি রাজনৈতিক প্রতারণার কলা-কৌশল আয়ত্ত করেছেন এবং ভান করতে শিখেছেন যে জনকল্যাণই তাদের ধন উপার্জনের উদ্দেশ্য। রাজনীতি ও অর্থনীতি একীভূত হওয়ার আরেকটি দৃষ্টান্ত তা।

নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কিভাবে পরিবর্তিত হয় বিশেষ প্রতিষ্ঠানে–এ সম্পর্কে প্রয়োজন কিছু বলা। এটা এমন যে এ ব্যাপারে ইতিহাস থেকে কোনো নিশ্চিত নির্দেশনা পাওয়া যায় না। আমরা দেখেছি যে ইতিহাস যুগের সূচনালগ্নেই মিসর ও ব্যাবিলনে পরম রাজতন্ত্র পুরোপুরিভঅবে উন্নতি লাভ করে; নৃবিজ্ঞানের প্রমাণ থেকে ধারণা করা হয় যে, মূলত বয়স্ক পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত সীমিত কর্তৃত্ব থেকে তা উন্নীত হয়েছে। ইউরোপীয় প্রভাবের অধীনতা ছাড়া এশিয়াব্যাপী (চীন ছাড়া) কোথাও পরম রাজতন্ত্র অন্য কোনো শাসন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে দেখা যায়নি। অপরপক্ষে ইতিহাস যুগে তা কখনও ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেখা যায়নি। অপরপক্ষে ইতিহাস যুগে তা কখনও ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মধ্যযুগে সামন্ত অভিজাত শ্রেণি ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহরগুলোর মিউনিসিপ্যাল স্বায়ত্তশাসনের জন্য রাজার ক্ষমতা সীমিত ছিল। রেনেসাঁর পর সর্বত্র রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু মধ্যবিত্তের আবির্ভাবের ফলে এর পরিসমাপ্তি ঘটে প্রথম ইংল্যান্ডে, পরে ফ্রান্সে ও এর পরে পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ জায়গায়। ১৯১৮ সালে বলশেভিকদের সাংবিধানিক পরিষদ বাতিল করা অবধি অনুমান করা হতো যে, সভ্য জগতের সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করবে সংসদীয় গণতন্ত্র।

যা হোক, নতুন কিছু নয় গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন। এগুলো ঘটে থাকে গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলোতে, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হলে রোমে এবং মধ্যযুগীয় ইতালির বাণিজ্যিক প্রজাতন্ত্রগুলোতে। কোনো সাধারণ নীতি প্রণয়ন করা কি সম্ভব গণতন্ত্রমুখী ও গণতন্ত্রবিমুখী বিভিন্ন পরির্তন নিধারণে?

অতীতে গণতন্ত্রবিরোধী দুটি শক্তি ছিল-সম্পদ ও যুদ্ধ। এ দুটোর ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য আমরা মেডিসি ও নেপোলিয়ানকের দৃষ্টান্ত হিসেবে নিতে পারি। বাণিজ্যলব্ধ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিদের রূঢ়তা জমিদারদের চেয়ে কম। তাই তা ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করতেও পরবর্তী সময়ে হিংসার উদ্রেক না করে শাসন কাজ চালিয়ে যেতে উত্তরাধিকারী শাসকদের তুলনায় অনেক দক্ষ। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় ভেনিসে অথবা হেনসিটিক লীগের শহরগুলোতে বিদেশি লোকের মাধ্যমে মুনাফা সৃষ্টি করা হতো। ফলে স্বদেশে তাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়নি। নগরবাসী অভিজাতদের অলিগার্ক তাই বাণিজ্য প্রধান সমাজে অন্য স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল পদ্ধতি। একটি পরিবার অনেকগুলো পরিবারের তুলনায় প্রভূত সম্পদের অধিকারী হলে তা সহজেই উন্নীত হয় রাজতন্ত্রে।

যুদ্ধ পরিচালিত হয় একটি ভিন্ন ও হিংস্রতাপূর্ণ মানসিকতা দ্বারা। ভয় মানুষের মনে জন্ম দেয় নেতার প্রয়োজনবোধের। একজন সফল জেনারেল ভয়ের বিপরীতধর্মী আবেগপূর্ণ প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম। যেহেতু বিজয় এ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তাই একজন সফল জেনারেল দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা তার হাতে ন্যস্ত করার প্রয়োজনীয়তা সহজেই বুঝতে সক্ষম। তিনি অপরিহার্য বিবেচিত হন সংকটকালীন। কিন্তু সংকট কেটে গেলে তাকে অপসারণ করা হয়ে পড়ে কঠিন।

যুদ্ধংদেহী মানসিকতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও গণতন্ত্রবিরোধী আধুনিক আন্দোলন সম্পূর্ণরূপে নেপোলিয়নের অনুরূপ নয়। এটা অদ্ভুত মনে হতে পারে যে, সেনাপতির চেয়ে শক্তিশালী হবে বেসামরিক সরকার। তথাপি যেখানে গণতন্ত্র জাতীয় প্রোথিতমূল অভ্যাসে পরিণত হয়েছে সেখানকার অবস্থা তাই। লিংকন সেনাপতি নিয়োগকালে লিখেন, তারা আমাকে বলছে যে তোমার লক্ষ্য হচ্ছে একনায়কতন্ত্র। তা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন বিজয় লাভ করা। বিজয়ের জন্য আমি তোমার দিকে চেয়ে আছি এবং আমি ঝুঁকি নেব একনায়কত্বের। তিনি নিরাপদে তা লিখতে পেরেছিলেন, কারণ, তিনি জানতেন যে বেসামরিক সরকারের উপর আক্রমণ হলে আমেরিকার সৈন্য জেনারেলকে অনুসরণ করে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ওয়েলিংটনের অধিনায়ক এ ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করলে কোনো মানুষ পেতেন না তাকে অনুসরণ করার জন্য।

গণতন্ত্র নতুন অবস্থায় প্রাক্তন ক্ষমতাসীনদের প্রতি বিরক্তি থেকেই জন্ম লাভ করে; কিন্তু নতুন অবস্থায় স্থিতিশীল নয় তা। যারা নিজেদের পুরনো রাজা বা অলিগার্কদের বিরোধী মনে করেন তারা রাজতান্ত্রিক বা অলিগার্কিক পদ্ধতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেন। নেপোলিয়ান ও হিটলার জনসমর্থন লাভ করেছিলেন, কিন্তু পারেননি বারবোনস এবং হোহেন জোলার্ন। যেখানে গণতন্ত্র দীর্ঘ স্থায়ীত্বের ফলে ঐতিহ্যগত হয়ে পড়েছে শুধু সেখানেই তা স্থিতিশীল হয়। ক্রমওয়েল, নেপোলিয়ান ও হিটলার নিজ নিজ দেশে গণতন্ত্রের প্রাথমিক যুগে আর্বিভূত হন। প্রথম দুইজনের তুলনায় তৃতীয় ব্যক্তি কখনোই আশ্চর্যজনক হতে পারেন না। পূর্বসূরিদের চেয়ে তার দীর্ঘস্থায়ীত্বের কল্পনা করার কারণ ছিল না।

এ ব্যাপারে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, অদূর ভবিষ্যতে গণতন্ত্র এর ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না। আমরা বলছি যে গণতন্ত্র এর স্থিতিশীলতার জন্য অবশ্যই ঐতিহ্যগত হবে। পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ায় কতটুকু সম্ভাবনা রয়েছে এর ঐতিহ্যগত প্রতিষ্ঠা লাভের?

সামরিক কৌশলের দ্বারা সব সময় সরকার প্রভাবিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক দিনগুলোতে রোমান নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত ছিল রোমান সেনাবাহিনী। কিন্তু পেশাদার সৈন্য স্থলাভিষিক্ত হলে সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়। সামন্ত অভিজাত শ্রেণির শক্তি নির্ভর করত দৃঢ়তার উপর, কিন্তু নিঃশেষ হয়ে যায় আর্টিলারির সূচনা হলে। প্রথম প্রশিক্ষণবিহীন বিশাল ফরাসি বিপ্লবী সেনাবাহিনী তাদের বিরোধী পেশাদার ছোট সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বিশেষ আদর্শের প্রতি জনপ্রিয় উৎসাহের গুরুত্ব প্রদর্শন করে। এর মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় গণতন্ত্রের সামরিক সুবিধাগুলো। উড়োজাহাজ ব্যবহারের মাধ্যমে মনে হয় আমরা স্বল্পসংখ্যক দক্ষ লোকের সমন্বয়ে গঠিত সেনাশক্তির উপর নির্ভরশীলতার যুগে ফিরে যাচ্ছি। মারাত্মক যুদ্ধে জড়িত প্রতিটি দেশের সরকার বৈমানিকদের ইচ্ছার অনুরূপ হবে, যা গণতান্ত্রিক নয়।

কিন্তু এগুলোর বিপক্ষে প্রয়োজন কিছু আলোচনার। মনে করা যেতে পারে যে, মহাযুদ্ধে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই জয়লাভ করবে। কিন্তু তাই বলে যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র অচল হয়ে যাবে–এটা মনে করা অসম্ভব। যুদ্ধ কল্পিত সুবিধাগুলো থেকে ফ্যাসিবাদী শক্তির অনেকটাই অস্তিত্ব লাভ করবে। ফলশ্রুতিতে কোনো জাতিকে শিক্ষা ও দেশপ্রেমের বিস্তৃতি ছাড়া অন্য কিছুই যোগাতে পারবে না এত শক্তি।

১৩. ব্যক্তি ও সংগঠন

সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা যে লাভজনক তা মানুষ দেখতে পায়, কিন্তু তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তিগতই থেকে যায় মৌচাকের মৌমাছির বিপরীতে। সমাজজীবনে এই জন্য অসুবিধা দেখা দেয় এবং জরুরি হয়ে পড়ে সরকার গঠন। কারণ, একদিকে সরকার প্রয়োজনীয় : সরকার ছাড়া সভ্য দেশের কিয়দংশ মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু অপরদিকে রয়েছে অসমতা বিজড়িত ক্ষমতা (সরকারের) এবং যাদের হাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা রয়েছে তারা এর ব্যবহার করে থাকে সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় অধিক আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য। এইভাবে নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচার একইভাবে হয়ে ওঠে ধ্বংসাত্মক। তাই সুখী হতে হলে প্রয়োজন এক ধরনের আপসের।

এই অধ্যায়ে আমি আলোচনা করার ইচ্ছা রাখি ব্যক্তি বিশেষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠন সম্বন্ধে-সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আলোচনা নয়। অবশ্যই এই বিষয়টির পার্থক্য গণতান্ত্রিক ও সর্বগ্রাসী দেশে অনেক। কারণ, কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও শেষোক্ত দেশে সংশ্লিষ্ট সংগঠনই রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। আমি যতটুকু সম্ভব প্রথম জরিপে বিবেচনার বাইরে রাখব এই পাথর্কটি।

দুটো পন্থায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিবিশেষকে প্রভাবিত করে। কিছু নীতি ব্যক্তিবিশেষের আশা-আকাক্ষা চরিতার্থ করার জন্য তার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিকল্পিত। আবার কিছু অনেকের বৈধ স্বার্থ ব্যাহত করা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত। পার্থক্যটি পরিস্কার নয় : পুলিশ রয়েছে সৎ লোকের স্বার্থ রক্ষা এবং সিদেল চোরকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে। এর প্রভাব অনেক বেশি জোরালো সভ্য মানুষের চেয়ে সিঁদেল চোরের জীবনের উপর। আমি আবার ফিরে আসব এ পার্থক্য। এ মুহূর্তে আলোচনা করব সভ্য সমাজে মানবজীবনের যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সংগঠনগুলো সিদ্ধান্তকারী ভূমিকা পালন করে সেগুলো।

প্রারম্ভেই জন্ম : একজন ডাক্তার বা একজন যাত্রীর সেবা অপরিহার্য। অতীতে যথেষ্ট ছিল একজন সম্পূর্ণ অশিক্ষিত মিসেস গ্যাম্পের সেবা। কিন্তু আজকাল তা যথেষ্ট নয়–এক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারি কর্তৃপক্ষের দ্বারা ধার্য নির্দিষ্ট স্তরের দক্ষতা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শিশুর স্বার্থ রক্ষা করা। বিভিন্ন সরকারি দায়িত্বের মান শিশু-কিশোরের মৃত্যুহারে প্রতিফলিত হয়। পিতামাতা তাদের কর্তব্যে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলে সরকারি কর্তৃপক্ষ শিশুটির পালন পিতামাতা বা কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে দিতে পারেনি। শিশুটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধীনে আসে পাঁচ অথবা ছয় বছর বয়সে এবং তখন থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত বাধ্য হয়। সরকারের পছন্দ অনুযায়ী বিষয়গুলো শিখে নিতে। এই প্রক্রিয়া শেষে অধিকাংশের ক্ষেত্রেই সারা জীবনের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায় মতামত ও মানসিক অভ্যাস।

ইতিমধ্যে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে শিশুরা প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে অন্য কিছুর উপর, যা আরোপিত হয় না রাষ্ট্র কর্তৃক। পিতামাতা ধার্মিক বা রাজনীতিবিদ হলে তারা ধর্মীয় বা দলীয় নীতি শিক্ষা দেন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শিশু ক্রমাগতভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে সংঘটিত আমোদ-প্রমোদে। যেমন-সিনেমা, ফুটবল খেলা ইত্যাদি। সে মোটামুটি বুদ্ধিমান হলে সংবাদ মাধ্যম কর্তৃক হতে পারে প্রভাবিত। রাষ্ট্রীয় স্কুল ভিন্ন অন্য কোনো স্কুলে পড়লে সে স্বাভাবিকভাবে এক প্রকার অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে-ইংল্যান্ডে তা হচ্ছে জাতি বা গোষ্ঠীর উপর সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব। ইতিমধ্যে সে একটি নৈতিক আচরণবিধি আত্মস্থ করে যা তার যুগের সম্প্রদায়ের বা জাতির। এই নৈতিক আচরণবিধি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর সংজ্ঞা প্রদান করা সহজ নয়। কারণ তিন প্রকার কর্মবিধি রয়েছে যেগুলোর পার্থক্য স্পষ্ট নয়। প্রথমত সাধারণ অপবাদ সত্ত্বেও এগুলো পালন করতে হয়; দ্বিতীয়ত খোলাখুলিভাবে অমান্য করা যাবে না কতগুলো; তৃতীয়ত যেগুলো পরিপূর্ণ উপদেশ হিসেবে গণ্য করা হয়, শুধু দরবেশ ব্যক্তিই তা পালন করতে পারেন। মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য আচরণবিধি সম্পূর্ণত না হলেও প্রধানত ধর্মীয় সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত ধর্মীয় ঐতিহ্যের ফলাফল। এগুলো টিকে থাকতে সক্ষম দীর্ঘ অথবা স্বল্পকাল। তাছাড়া পেশাগত আচরণবিধিও রয়েছে-কিছু ব্যাপার আছে যেগুলো কোনো অফিসার, ডাক্তার অথবা ব্যারিস্টার অবশ্যই করবে না। কিন্তু আজকাল সাধারণত পেশাগত সমিতি ও এ ধরনের বিধি পরিকল্পনা ও প্রণয়ন করে। এটা উপদেশমূলক যে দ্বন্দ্বযুদ্ধের ব্যাপারে চার্চ ও সেনাবাহিনীর ভেতর সংঘাত দেখা দিলে সেনা-আচরণবিধি অফিসারদের ভেতর বিস্তার লাভ করে। আইনের বিরুদ্ধে প্রসার লাভ করে চিকিৎসা ও দোষ স্বীকার সম্পর্কীয় গোপনীয়তা।

যুবক বা যুবতী অর্থ উপার্জন শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সংগঠন তাদের কার্যকলাপ প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। চাকরিদাতা সাধারণত একটি সংগঠন; অধিকন্তু নিয়োগদাতাদের একটি ফেডারেশন। ট্রেড ইউনিয়ন এবং তাদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। ইনস্যুরেন্স এবং ফ্যাক্টরি আইনের মতো বিষয়গুলো ছাড়া রাষ্ট্র ট্যারিফ ও সরকারি আদেশের মাধ্যমে ব্যক্তি মানুষের নির্বাচিত বৃত্তি লাভ করবে না অবদমিত হবে তা স্থির করার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। শিল্পোন্নয়ন প্রভাবিত করতে পারে মুদ্রা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অথবা জাপানের অভিলাসের মতো সবরকম পরিস্থিতি।

বিবাহ এবং সন্তানের প্রতি কর্তব্য আবার একজন মানুষকে আইন এবং প্রধানত চার্চ থেকে প্রাপ্ত নৈতিক আচরণবিধির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে। যদি তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকেন এবং খুব গরিব না হন তবে তিনি সর্বশেষ বৃদ্ধকালীন বয়স্ক-ভাতা ভোগ করতে পারেন। সতর্কতার সঙ্গে আইন ও চিকিৎসার দ্বারা তার মৃত্যু তত্ত্বাবধান করা হয় যাতে এটা নিশ্চিত হতে পারে যে তার মৃত্যু ঘটেনি নিজের ইচ্ছায় বা অন্যের দ্বারা।

কিছু ব্যাপার রয়ে গেল যা ধার্য হয়ে থাকে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই। কোনো ব্যক্তি একজন মহিলা রাজি হলে তাকে বিয়ে করতে পারেন। যৌবনে তার সবিশেষে স্বাধীনতা রয়েছে জীবিকা অর্জনের পথ বেছে নেয়ার ব্যাপারে। ইচ্ছানুসারে অবসর সময় কাটাতে পারেন সীমাবদ্ধতার ভেতর। ধর্ম বা রাজনীতিতে আগ্রহী হলে যোগ দিতে পারেন সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্প্রদায় বা দলে। পছন্দ-অপছন্দের স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও বিবাহ সম্পর্কিত ব্যাপার ছাড়া তিনি নির্ভরশীল সংগঠনের উপর। খুব ব্যতিক্রমধর্মী না হলে তিনি ধর্ম প্রতিষ্ঠা, দল সৃষ্টি, ফুটবল ক্লাব সংগঠন অথবা পারেন না নিজের পানীয় বানাতে। তিনি শুধু সদাপ্রস্তুত বিকল্পের ভেতর চর্চা করতে পারেন নিজের রুচি। কিন্তু এর সব বিকল্পকে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার গণ্ডির ভেতর সবচেয়ে আকর্ষণীয় করে তোলে প্রতিযোগিতা।

এ পর্যন্ত সভ্য সমাজে সংগঠনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে তুলনামূলক অনুন্নত সামজের কৃষকদের তুলনায় মানুষের স্বাধীনতা বৃদ্ধি করা। তুলনা করা যাক পাশ্চাত্য দিনমজুরের জীবনের সঙ্গে একজন চীনা কৃষকের জীবন। এটা সত্য যে তাকে শিশু হিসেবে যেতে হয় না স্কুলে। কিন্তু অতি অল্প বয়স থেকেই তাকে কাজ করতে হয়। সম্ভবত শৈশবকালে অর্থাভাব ও চিকিৎসার অভাবে তার মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি। যদি বেঁচে থাকেন এবং সৈনিক বা বান্ডিট না হন অথবা কোনো বড় শহরে স্থানান্তরের ঝুঁকি না নেন তবে জীবিকা অর্জনের জন্য রুচি চর্চা করার সুযোগ পাবেন না তিনি। বািবহের ব্যাপারে সামান্যতম স্বাধীনতা ছাড়া প্রথা তার সর্বস্ব হরণ করে। বাস্তবে তার অবসর বলতে কিছুই নেই এবং যদি থেকেও থাকে তবে এ নিয়ে আনন্দ করার মতো কিছুই নেই এবং যদি থেকেও থাকে তবে এ নিয়ে আনন্দ করার মতো কিছুই নেই। তিনি সবসময় বেঁচে থাকেন ন্যূনতম জীবিকার উপর নির্ভর করে। দুর্ভিক্ষের সময় তার পরিবারের এক বিরাট অংশ ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করে। লোকটির জীবন যতই কঠিন হোক না কেন তার স্ত্রী বা কন্যা সন্তানদের জীবন এর চেয়েও কঠিন। গড়পড়তা চীনা কৃষকদের জীবনের তুলনায় ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বেকার যুবকের জীবনও স্বর্গের মতো।

এবার আসা যাক অন্য এক শ্রেণির সংগঠনের বেলায়। এগুলো একজন লোককে অন্য মানুষের আহত করা থেকে বিরত রাখার লক্ষ্যে পরিকল্পিত হয়েছে : পুলিশ এবং ফৌজদারি আইন হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। খুন, ডাকাতি ও রাহাজানির উপর এগুলো হস্তক্ষেপ করলে ব্যতিক্রমধর্মী অল্প সংখ্যক হিংস্র ব্যক্তি ছাড়া সবারই স্বাধীনতা এবং সুখ বৃদ্ধি পায়। যেখানে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে লুণ্ঠনকারী ছাড়া সবারই বেসামরিক জীবনের আনন্দ অসম্ভব হয়ে পড়ে। অবশ্যই একটা বিপদ রয়েছে : পুলিশের পক্ষে দুবৃত্ত দলের মানুষ সাজা সম্ভব অথবা যে কোনোভাবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা সম্ভব। এই বিপদ কোনোক্রমেই কাল্পনিক নয়, তবে সুপরিচিত এর রহিত কারণও। এ রকম বিপদও রয়েছে যে, ক্ষমতাসীনরা পুলিশ ব্যবহার করতে পারে সংস্কারের লক্ষ্যে সংঘটিত আন্দোলন ঠেকানোর জন্য। বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত এ রকম ঘটে যাওয়া প্রায় অপরিহার্য বলে মনে হয়। নৈরাজ্য রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলো এমনই যে তা বর্তমান অবস্থানের পরিবর্তন আরও দুরূহ করে তোলে তা মৌলিক প্রতিবন্ধকতাগুলোর অংশবিশেষ। এই প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সভ্য সমাজের অনেক মানুষ ভাবতে পারে যে পুলিশ সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা সম্ভব।

এ পর্যন্ত আমরা কোনো চিন্তা করিনি যুদ্ধ, বিপ্লব এবং এগুলোর ভয় সম্বন্ধে। এগুলোর ভেতর রয়েছে আত্মরক্ষামূলক রাষ্ট্রীয় প্রবণতা। এই কারণে রাষ্ট্র ব্যক্তি জীবনের উপর চরম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কায়েম করে। ইউরোপের প্রায় সব দেশেই বাধ্যতামূলক সার্বজনীন সামরিক চাকরি বিদ্যমান। যুদ্ধ দেখা দিলে সর্বত্রই সামরিক বয়সের প্রত্যেক পুরুষকে যুদ্ধে ডাকা হয় এবং সরকার বিজয় লাভের জন্য যেসব কাজ উপযোগী মনে করে তা করার জন্য আদেশ করে পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিদের। যাদের কার্যকলাপ শত্রুপক্ষের অনুকূলে মনে হয় তাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। শান্তির সময়ে সব সরকারই সময়মত প্রত্যেকের যুদ্ধ করার ইচ্ছা এবং জাতীয় প্রয়োজনে সার্বক্ষণিক আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। সম্ভাব্যতার মাত্রা অনুসারে সরকারের পদক্ষেপ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে বিপ্লবাত্মক বিষয়ে। বিপ্লবের ঝুঁকি বেড়ে যায় অন্যান্য জিনিস অপরিবর্তিত থাকলে এবং জনকল্যাণমূলক কাজে সরকারের মনোযোগ কমে গেলে। কিন্তু সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের মতো দৈহিক নিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক ও অর্থ সংক্রান্ত ব্যাপারে মানসিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা একচেটিয়াভাবে সরকারের হাতে থাকলে এই সরকার অপেক্ষাকৃত কম প্রগাঢ় সরকারের চেয়ে অপ্রিয় হয়ে পড়ে। কারণ বিপ্লবী চেতনায় সংগঠন ও প্রসার সহজ নয়। সুতরাং আশংকা করা যায় যে, রাষ্ট্র ও জনসাধারণের ভেতর স্পষ্ট সীমারেখা থাকলে সরকার ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রত্যেক ধাপে জনকল্যাণমূলক কাজে আরও বেশি উদাসীন হবে।

উপরের সংক্ষিপ্ত অনুসন্ধান থেকে অনুমিত হয় যে, সরকারের আত্মরক্ষামূলক কাজ থেকে উদ্ভূত প্রবাহ ব্যতিরেকে প্রধানত সংগঠনগুলো ব্যক্তি জীবনে বৃদ্ধি করে থাকে মানুষের শখ ও মঙ্গল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রমের উৎপাদিকা শক্তি, দারিদ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগুলো এমন যে নীতিগতভাবে এগুলো সম্বন্ধে কোনো বির্তক থাকা উচিত নয়। এর সবই নির্ভর করছে উন্নত সংগঠনের উপর। কিন্তু যখন আমরা যুদ্ধে পরাজয় বা বিপ্লব রোধে পদক্ষেপ নিই তখন ব্যাপারটি হয়ে থাকে ভিন্ন। এসব পদক্ষেপের যতই প্রয়োজন মনে করা হোক না কেন আসলে এগুলো নিরানন্দের এবং এ কারণেই শুধু সংরক্ষিত হয় যে বিপ্লব এবং পরাজয় আরও বেশি নিরানন্দের। সম্ভাবত পার্থক্য শুধু মাত্রার দিক থেকে। বলা যেতে পারে যে, টিকা, শিক্ষা এবং রাস্তা নির্মাণ নিরানন্দের, কিন্তু বসন্ত, অজ্ঞতা ও দুর্গম জলাভূমি এর চেয়েও নিরানন্দের। মাত্রাগত পার্থক্য এত বেশি যে, তা বস্তুগত পার্থক্যের শামিল। অধিকন্তু শান্তিপূর্ণ অগ্রগতিতে জড়িত কাজের নিরানন্দ অস্থায়ী। বসন্ত নিমূর্ল করা যেতে পারে, তখন টিকা নিষ্প্রয়োজন হয়ে পড়বে। উন্নত পদ্ধতির মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় শিক্ষা ও রাস্তা নির্মাণ। কিন্তু কৌশলগত যে কোননা অগ্রগতি যুদ্ধকে অধিক বেদনাদায়ক ও ধ্বংসাত্মক করে তোলে। মানবতা ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে সর্বগ্রাসী পদ্ধতিতে বিপ্লব প্রতিরোধ করা ধ্বংসাত্মক।

অন্য একটি পন্থা রয়েছে ব্যক্তি ও সংগঠনের সম্পর্কের শ্রেণিকরণের : ব্যক্তি হিসেবে তিনি একজন ক্রেতা, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সদস্য অথবা হতে পারেন শত্রু।

তিনি ক্রেতা হিসেবে দেখবেন যে সংগঠন তাকে উপভোগে সাহায্য করছে, কিন্তু বৃদ্ধি করছে না তার ক্ষমতা। অবশ্য তিনি ভুল বুঝতে পারেন এগুলোর ব্যাপারে : ক্রীত পিলটি উপকারে না আসতে পারে, বিয়ার খারাপ হতে পারে, ঘোড়দৌড়ে অর্থহানি হতে পারে। তা সত্ত্বেও সংগঠন থেকে তিনি কিছু লাভ করছেন। যেমন– আশা, বিনোদন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ। নতুন গাড়ি কেনার সম্ভাবনা আপনাকে কিছু ভাবনা ও বলার সুযোগ দেয়। অর্থ ব্যয়ের স্বাধীনতা আনন্দদায়ক। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আসবাবপত্রের প্রতি আকর্ষণ একটি ব্যাপক ও শক্তিশালী আবেগ। কিন্তু তা আর থাকে না রাষ্ট্র সুসজ্জিত বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিলে।

মানুষ যেসব সংগঠনের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সদস্য সেগুলো হচ্ছে রাজনৈকি দল, চার্চ, ক্লাব, বন্ধু, সমাজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রতিযোগিতায় এগুলো একই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি। যেমন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল, ভিন্ন মতাবলম্বী চার্চ, প্রতিযোগী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা আগ্রহী ব্যক্তিদের মনে ক্ষমতা তাড়না নাটকীয় মনোভাবের জন্ম দেয়। রাষ্ট্র দুর্বল না হলে এই প্রতিযোগিতা আইনের অধীন থাকে। রাষ্ট্র শান্তির ব্যবস্থা করে থাকে সহিংসতা ও প্রতারণামূলক কাজ ধরা পড়লে। কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বিরোধী সংগঠনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত রক্তপাতহীন হলে তা উৎসাহ যোগায় মানুষকে উন্মাদনা ও ক্ষমতামোহ হাসে। অন্যথায় এর ফলে জন্ম দেয় এক বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতা।

রাষ্ট্র উদাসীন হলে এবং নিরপেক্ষ না হলে রাজণৈতিক বিরোধ, দাঙ্গা, হত্যা অথবা গৃহযুদ্ধে পর্যবসিত হয়। ব্যক্তি ও সমাজজীবনে এই বিপদ এড়ানো গেলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে উন্নতির লক্ষন।

মানুষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সংগঠনটির অনিচ্ছুক সদস্য-তা হচ্ছে রাষ্ট্র। এ পর্যন্ত নাগরিকত্ব প্রদানে সফল জাতীয়তা নীতি নাগরিকদের ইচ্ছানুসারে প্রণীত হয়-ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছায় নয়।

হতে পারতেন তিনি একজন রুশ
ফরাসি, তুর্কি অথবা প্রোসিয়ান
অথবা হয়তো ইতালির কিন্তু
এতগুলো সম্ভাবনার পরেও তিনি
রয়েছেন একজন ইংরেজ।

তবে অধিকাংশ মানুষ সুযোগ পেলেও নাগরিকত্ব পরিবর্তন করে না যদি রাষ্ট্র নাগরিকদের প্রতি শত্রুতামুলক মনোভাব না দেখায়। সফল জাতীয়তা নীতি ছাড়া অন্য কিছুই রাষ্ট্রকে এত শক্তিশালী করতে পারে না। নাগরিকত্ব ও দেশপ্রেম হাতে হাত ধরে চললে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনের প্রতি আনুগত্যের চেয়েও গভীরতর হয়।

ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রেরণা বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের। অনুরূপ একটি প্রেরণা রয়েছে স্বদেশপ্রীতি ও পরিবারপ্রীতির। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আনুগত্যে অনুরূপ প্রেরণা থাকে না ক্ষমতাপ্রীতি ও বৈদেশিক আক্রমণজনিত ভয়ের দ্বৈত প্রেরণায় উজ্জীবিত না হলে। রাজনৈতিক দলগুলোর অনুরূপ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অবাধ হয়ে পড়ে। সভ্য দুনিয়া আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে একটি লিন্ডবার্গ শিশুর হরণ ও এর হত্যায়। কিন্তু পরবর্তী যে যুদ্ধের জন্য আমরা ব্রিটেনে আমাদের আয়ের এক-চতুর্থাংশ খরচ করছি সে যুদ্ধে তা দাঁড়াবে সাধারণ ব্যাপার হয়ে। কোনো প্রতিষ্ঠানই জন্ম দেয় না জাতীয় রাষ্ট্রের অনুরূপ আনুগত্যের। বিশাল সংখ্যঅর মানুষ হত্যার জন্য প্রস্তুতি নেয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য। মৃত্যু ঝুঁকিসহ সংগঠনের প্রতি আনুগত্যই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র মেনে নিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে। এতে বাসস্থান, ছেলেমেয়ে এবং সভ্যতা ধ্বংসের ঝুঁকি ও বিদেশি শক্তির বশ্যতা স্বীকার করার চেয়ে ভালো। বেদনাদায়ক সমস্যা ঘটছে ব্যক্তি-মনোবিজ্ঞান ও সরকারি সংগঠনের। আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের নিস্তার নেই যদি এই ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচার উপযুক্ত পথ খুঁজে বের না করি।

১৪. প্রতিযোগিতা

ঊনবিংশ শতাব্দীতে মানুষ জ্ঞাত ছিল স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার উৎপীড়ন সম্পর্কে। এই বিপদ পরিহার করে চলার কৌশলও জানা ছিল মানুষের। কৌশলটি হচ্ছে প্রতিযোগিতা। তখনও মানুষ জানত প্রথাগতভাবে একচেটিয়ার অশুভ দিক। সভাসদদেরকে লাভজনক মজুরি প্রদান করেন স্টুয়ার্ট এবং এলিজাবেথ। গৃহযুদ্ধের অনেকগুলো কারণের অন্যতমই ছিল এর বিরুদ্ধে আপত্তি। সামন্তযুগে নিজেদের কারখানায় শস্য ভাঙানোর জেদ ধরা ছিল সম্ভ্রান্ত ইংরেজদের পক্ষে স্বাভাবিক ব্যাপার। ১৮৪৮ সালের আগে ইউরোপীয় রাজতন্ত্র মুক্ত প্রতিযোগিতার উপর আধা-সামন্ততান্ত্রিক বিধি-নিষেধের সঙ্গে জড়িত ছিল; রাজা ও জমিদারদের স্বার্থে এই বিধি-নিষেধ বিদ্যমান ছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সর্বনিম্ন মজুরি আইন এবং সাধারণ ভূমির পৃথকীকরণ ইত্যাদি। ইংল্যান্ডে তাই শস্য আইন প্রশ্ন পর্যন্ত সর্বোপরি অবাধ নীতির পক্ষে ওকালতির ব্যাপারে একমত হন জমিদার ও পুঁজিপতিরা।

ইউরোপের সবচেয়ে চরম ব্যাপারগুলোর সবই ছিল মতামতের ব্যাপারে মুক্ত প্রতিযোগিতার প্রতিকূলে। ফরাসি বিপ্লবের চেতনার বিরোধিতায় ১৮১৫ সাল থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত মহাদেশের সর্বত্র চার্চ ও রাষ্ট্র ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। সেন্সর ব্যবস্থা জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার সর্বত্র হঠাৎ হাস্যাস্পদ হয়ে ওঠে। নিম্নবর্ণিত শব্দাবলির সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ পরিচ্ছেদে হিন উপহাস করেন।

জার্মান সেন্সর ……..

…………. মূর্খ ….

ফ্রান্স ও ইতালির সরকারি নির্যাতনের উদ্দেশ্যই ছিল নেপোলিয়নের রূপকথা এবং বিপ্লবের প্রশংসাস্তুতি। সবরকম উদারনৈতিক চিন্তা-ভাবনা নিষিদ্ধ ছিল স্পেন ও চার্চ শাসিত রাষ্ট্রগুলোতে। পোপের সরকার তখনও কার্যকরিভাবে জাদুবিদ্যায় বিশ্বাস করত। ইতালি, জার্মানি ও অস্ট্রীয় হাঙ্গেরিতে জাতীয়তা নীতির পক্ষে ওকালতি করার অনুমতি ছিল না। সব সময়ই গ্রামীণ জনগণের বিপরীতে সামন্ত অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে বোকা রাজা ও অলস অভিজাতদের সমর্থনে বাণিজ্যিক স্বার্থবিরোধী প্রতিক্রিয়া জড়িত ছিল। এ ধরনের অবস্থায় অবাধ নীতিই ছিল শক্তির স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এগুলো ব্যাহত হয় বৈধ কার্যকলাপে।

আমেরিকার উদারপন্থিরা স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তাদের আশানুরূপ মুক্তি অর্জন করে; ইংল্যান্ডে ১৮৭১ সালের মধ্যে; জার্মানিতে পর্যায়ক্রমে ১৮৪৮ সাল থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে; ইতালিতে রিজারজিমেন্টো এবং রাশিয়ায় মুহূর্তকালের জন্য ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সময়। কিন্তু আশানুরূপ ফলাফল হয়নি উদারপন্থিদের। শিল্পে তা মার্কসের বিদ্বেষপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণীর অনুরূপ ছিল। দীর্ঘ উদারপন্থি প্রথার ধারক হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকাই প্রথম ট্রাস্ট রাষ্ট্র গঠন করে। তা উদ্ভূত হয় প্রতিযোগিতামূলক স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ফলে। আমেরিকাতে উদারনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও অন্যান্য দেশের শিল্পায়নে ক্রমে রকফেলারের নেতৃত্ব অনুসরণ করা হয়। কার্যকরি ব্যবস্থার অভাব হলে প্রতিযোগিতা বিলীন হয়ে পড়ে প্রতিযোগীদের একজনের পূর্ণ বিজয়ের মাধ্যমে।

প্রতিষ্ঠানগুলো কৌশলগত কারণে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের উপযোগী আকার লাভ করেছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে যাজনিক কার্যালয়ের অধীন ছিল রাস্তাঘাটের ব্যবস্থা। বর্তমান এগুলো নিয়ন্ত্রিত হয় কাউন্টি কাউন্সির কর্তৃক। তবে তত্ত্বাবধান ও অর্থ যোগানের দায়িত্ব কেন্দ্রের হাতে রয়েছে। বেশ বড় এলাকার তত্ত্বাবধান ও অর্থ যোগানের দায়িত্ব কেন্দ্রের হাতে রয়েছে। বেশ বড় এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বিদ্যুতের সবচেয়ে ভালো ব্যবহার করতে পারেন যদি ওই এলাকায় থাকে নায়াগ্রার মতো একটি শক্তিশালী বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। জলসেচের জন্য প্রয়োজন হতে পারে আসাম বাঁধের মতো একটি বাঁধের। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত এলাকা খুব বিশাল না হলে এর খরচ নিষিদ্ধ। প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত দ্রব্যের বিশোষণে সমর্থ বাজার নিয়ন্ত্রণের উপর নির্ভরশীল বৃহদায়তন উৎপাদন অর্থনীতি।

আরও বিভিন্ন এলাকা রয়েছে যেখানে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগানো হয়নি বৃহৎ এলাকার সুবিধাগুলো। শিক্ষা সংক্রান্ত সরকারি ফিল্মের মাধ্যমে এবং প্রাথমিক শিক্ষা প্রাণ পেতে পারে বিবিসি পাঠ্যসূচি প্রচারের মাধ্যমে। আরও ভালো হতো যদি এ ধলনের ফিল্ম বা পাঠ্যসূচি আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তৈরি হতো, কিন্তু বর্তমানে তা কাল্পনিক ব্যাপার বলে পরিগণিত। বর্তমানে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ পঙ্গু, তবে তা আন্তর্জাতিক পরিসরে এর বিস্তার লাভের জন্য নয়। এটা স্পষ্ট যে অধিকাংশ ব্যাপারই ছোট ছোট রাষ্ট্রের চেয়ে বড় রাষ্ট্র সুবিধাজনক এবং যে কোনো রাষ্ট্রই বিশ্বব্যাপী না হলে যথেষ্ট কিছু করতে পারে না নাগরিকদের জীবনরক্ষামূলক প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য।

যা হোক সুবিধা রয়েছে ক্ষুদ্র এলাকাগুলোতেও। এগুলোর ভেতর রয়েছে জনসাধারণের কাজে আইনের অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহার, দ্রুত সিদ্ধান্ত, স্থানীয় প্রয়োজন এবং প্রথার সাথে সম্ভাব্য অধিকতর অভিযোজন। স্পষ্ট সমাধান হচ্ছে স্থানীয় সরকার, যা সার্বভৌম নয়। তবে এর কিছু নির্দিষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তা নিয়ন্ত্রিত হয় কেন্দ্র থেকে। কেন্দ্রের উচিত যুক্তিযুক্ত কাজে একে আর্থিক সহযোগিতা দেয়া। যা হোক, আমাদের বিশদ প্রশ্নের সম্মুখীন করে দেয় এই বিষয়। আমি তা আলোচনা করতে চাই না।

আরও কঠিন প্রতিযোগিতার প্রশ্নটি। এর অনেক বিতর্ক হয়েছে অর্থনৈতিক পরিসরে, কিন্তু তা সামরিক ও প্রচারণার সাপেক্ষেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগিতা থাকা উচিত উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ব্যবসা ও প্রচারণার ক্ষেত্রে, কিন্তু সামরিক ক্ষেত্রে নয়। এর সম্পূর্ণ বিপরীত মত প্রকাশ করেছেন ইতালির ফ্যাসিবাদী ও জার্মান নাজিরা। তাদের মতে জাতীয় যুদ্ধের রূপ লাভ ছাড়া প্রতিযোগিতা সবসময়ই খারাপ। এক্ষেত্রে জাতীয় যুদ্ধ মানবীয় কার্যাবলির ভেতর মহত্তম। বিরোধী শ্রেণিগুলোর ভেতর ক্ষমতা লাভের সগ্রাম ছাড়া মার্কসবাদীরা সবরকম প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। আমার যতদূর মনে পড়ে, প্লেটো প্রশংসা করেছেন একটি মাত্র প্রতিযোগিতার। তা হচ্ছে সংগ্রামী সাথীদের ভেতর সম্মান সমীকরণের প্রতিযোগিতা। তিনি বলেছেন যে তা উন্নতি লাভ করে সমরনীতি প্রেমের দ্বারা।

উৎপাদন বলয়ে অসংখ্য ছোট ছোট খামারের ভেতর প্রতিযোগিতা শিল্পায়নের প্রাথমিক যুগের বৈশিষ্ট্য ছিল। অধুনা রাষ্ট্রের সঙ্গে সমভাবে বিস্তৃত ট্রাস্টগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ট্রাস্ট হিসেবে বিবেচিত অস্ত্র কারখানা এর জন্য ব্যতিক্রমধর্মী যে এর একটির প্রতি আদেশগুলো অন্যটির প্রতি আদেশের কারণ হয়ে দাঁড়ায় : যদি একটি রাষ্ট্র অস্ত্র সজ্জিত হয় তবে অন্যগুলোও অস্ত্র সজ্জিত হবে। এজন্যে প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক উদ্দেশ্যগুলো বজায় থাকে না। এই অদ্ভুত ক্ষেত্র ছাড়া ব্যবসায়ে এখনও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। কিন্তু আজকাল তা আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতার সঙ্গে মিশে এক হয়ে পড়েছে, যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারী হচ্ছে যুদ্ধ। সুতরাং আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতার মতোই আধুনিক ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার দোষ-গুণ।

যা হোক, আরও এক ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে, যার প্রচণ্ডতা আগের মতোই বিরাজমান-তা হচ্ছে চাকরি লাভের প্রতিযোগিতা। এর সূচনা হয় স্কুলের বৃত্তি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এবং তা চলে অধিকাংশ লোকের কর্মজীবনব্যাপী। এই প্রতিযোগিতা প্রশমিত করা যায়, কিন্তু পুরোপুরি বিলীন করা যায় না। সব অভিনেতা সমান পারিশ্রমিক পেলেও কোনো ব্যক্তি প্রথম নাবিকের চেয়ে হেমলেটের চরিত্রে অভিনয় করতে চান। লক্ষণীয় দুটো শর্ত রয়েছে, প্রথমত অকৃতকার্য ব্যক্তির পরিহারযোগ্য দুঃখ-কষ্ট ভোগ করা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত সফলতা স্বাভাবিক গুণের পুরস্কারস্বরূপ-হীনস্তাবকতা বা ধূর্ততার ফল নয়। দ্বিতীয় শর্তটি সমাজতন্ত্রীদের যথাযথ মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। যা হোক, আমি এ বিষয়ে আলোচনা করব না, কারণ, তা আমাদের অনেক দুরে নিয়ে যাবে মূল বিষয় থেকে।

আন্তঃরাষ্ট্রীয় তথা বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা হচ্ছে বর্তমান যুগের সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা। এটি পরিণত হয়েছে সর্বধ্বংসী প্রতিযোগিতায়–তা ক্ষমতার জন্যে, সম্পদের জন্যে, মানুষের বিশ্বাসের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভের জন্য এবং সর্বোপরি মানুষের জীবনের জন্যে। কারণ, মৃত্যুদণ্ডই হচ্ছে বিজয় লাভের একমাত্র উপায়। এটি স্পষ্ট যে, এই প্রতিযোগিতা রোধের প্রধান উপায় হচ্ছে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সশস্ত্র বাহিনীর বিলোপসাধন এবং একচেটিয়া সশস্ত্রবাহিনী সমেত একটি একক আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এর বিকল্প পন্থা হচ্ছে সভ্য দেশগুলোর অধিকাংশ লোকের মৃত্যু এবং অধিকাংশ লোকের দারিদ্র্য দশা ও আধা বর্বরতায় রূপান্তর। বর্তমানে এই বিকল্পটি পছন্দ এক বিশাল সংখ্যাধিক্যের।

উদারপন্থিরা তত্ত্বগতভাবে মনে করে থাকেন যে প্রচারণায় প্রতিযোগিতা মুক্তভাবে ক্রিয়াশীল, কিন্তু তা সম্পর্কযুক্ত হয়ে পড়েছে আন্তঃরাষ্ট্রীয় অস্ত্র প্রতিযোগিতার সঙ্গে। আপনি যদি ফ্যাসিবাদ প্রচার করেন তবে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে জার্মানি ও ইতালির শক্তি বৃদ্ধি করা। কমিউনিজমের প্রচার করলে সম্ভবত আপনি তা বাস্তবায়িত করতে পারবেন না। তবে পরবর্তী যুদ্ধে জয়লাভের জন্য আপনি রাশিয়াকে সহায়তা করতে পারেন। আপনি যদি গণতন্ত্রের গুরুত্ব আরোপ করেন তবে আপনি দেখতে পাবেন যে, চেকোশ্লাভিয়ার স্বাধীনতা রক্ষায় ফ্রান্সের সঙ্গে সামরিক মৈত্রী সম্পর্কীয় নীতির প্রতি আপনি সমর্থন দান করেছেন। রাশিয়া, জার্মানি ও ইতালি একের পর এক মুক্ত প্রচারণার নীতি পরিত্যাগ করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। কারণ, ওই দেশের সরকার এই নীতি গ্রহণ করে তাদের পূর্বসূরিদের ব্যাহত করতে পেরেছিল এবং এর অবিরাম অনুবৃত্তি তাদের নিজস্ব নীতি অনুসরণ পুরোপুরিভাবে অসম্ভব করে তুলবে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আজকের দুনিয়া এত ভিন্ন যে মুক্ত প্রতিযোগিতায় উদারনৈতিক যুক্তিগুলো বলবৎ হলে আধুনিক পরিভাষায় এগুলোর বর্ণনা প্রয়োজন হবে। আমি বিশ্বাস করি যে, তারা ব্যাপক বৈধতা বজায় রেখেছে, তবে তারা সীমাহীন নয়-এটা বুঝে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ।

জন স্টুয়ার্ট মিলের লিখিত উদারপন্থি মতবাদ অনুমিত মতবাদের চেয়ে কম চরমভাবাপন্ন ON LIBERTY বইয়ে। মানুষ তার কার্যকলাপের জন্য স্বাধীন, যদি তা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। কিন্তু যদি অন্যান্য মানুষ আহত হয় তবে এগুলো রহিত করা যেতে পারে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। ধরা যাক, একজন মানুষ স্থির জ্ঞানে বিশ্বাস করেন যে, রানী ভিক্টোরিয়াকে হত্যা করা উচিত। তাকে এ মতের অনুমতি দেয়া যায় না প্রচার ও প্রসারে। এটা চরম দৃষ্টান্ত; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রায় সব মতামতের দ্বারা কেউ না কেউ আহত হন। বাকস্বাধীনতা অর্থহীন, যদি না তাতে ব্যক্তিবিশেষ বা শ্রেণিবিশেষের কাছে অপ্রীতিকর এমন কিছু বলার সুযোগ না থাকে। প্রচারণায় স্বাধীনতার সুযোগ থাকতে হলে তাতে মিলের চেয়ে জোরালো নীতির প্রয়োজন।

আমরা প্রশ্নটি পর্যালোচনা করতে চাই সরকারি দৃষ্টিকোণ, সাধারণ নাগরিকের দৃষ্টিকোণ, নতুনত্বের প্রবর্তকদের দৃষ্টিকোণ থেকে। আলোচনা শুরু করা যাক সরকারি দৃষ্টিকোণ দিয়েই।

ইতিমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকার দুধরনের বিপদের সম্মুখীন; বিপ্লব ও যুদ্ধে পরাজয়। (সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে অফিসিয়াল বিরোধীদের সরকারের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়)। এসব বিপদ আত্মরক্ষামূলক প্রবণতার জন্ম দেয়। আশা করা যায় যে এগুলো প্রতিহত করতে সরকার পারতপক্ষে সবকিছু করেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন হচ্ছে : প্রচারণায় কতটুকু স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীলতা দেবে? উভয়টি অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিপদের বিরোধী। উভয় উত্তর অবশ্যই নির্ভর করছে ওই সময়ের সরকারের বৈশিষ্ট্য ও পারিপার্শ্বিকতার উপর। স্বাধীনতা আরেক দফা বিপদ আনবে সরকার আধুনিক ও বৈপ্লবিক হলে এবং জনগণের অসন্তুষ্টির পেছনে জোরালো কারণ থাকলে। এই পরিবেশ ছিল ১৯৭৩ সালে ফ্রান্সে, ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় এবং ১৯০৩ সালে জার্মানিতে। কিন্তু সরকার ঐতিহ্যগত হলে এবং জনগণের আর্থিক অবস্থা খুব হতাশাব্যঞ্জক না হলে স্বাধীনতা নিরাপদ বাল্বের মতো কাজ করবে এবং অসন্তোষ কমিয়ে দেবে। ব্রিটিশ সরকার যদিও কমিউনিজম ব্যাহত করার জন্য অনেক কিছু করেছে তারপরও তা ব্রিটেনে কমিউনিস্টদের বিফলতার কাজ নয়। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাদের প্রচারের পরম স্বাধীনতা দেয়াই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।

আমি মনে করি না যে সরকারের উচিত হবে কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্য প্রেরণামূলক প্রচার চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া। এক্ষেত্রে প্রচারণায় অতি অল্প লোকের পরিবর্তন হলেও অনুমোদিত কাজ বাস্তবায়িত হয়ে যেতে পারে। আইনত মৃত্যুদণ্ড প্রদান ছাড়া নাগরিকদের জীবন রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু কারো হত্যার লক্ষ্যে আন্দোলন সংঘটিত হলে তার জীবন রক্ষা করা মুশকিল। WELIMER প্রজাতন্ত্রে এ বিষয়ে মাত্রাধিক শিথিল ছিল। কিন্তু আমি মনে করি না যে, কোনো স্থিতিশীল সরকারের পক্ষে উচিত আইনত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার যোগ্য একশ্রেণির লোকের মৃত্যুদন্ডের লক্ষ্যে আন্দোলন নিষিদ্ধ করা। কারণ এ ধরনের আন্দোলন আইনের প্রতি কোনো ভীতি প্রদর্শন করে না।

সরকারি দৃষ্টিকোণ থেকেও রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ না হলে কোনো মতের উপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। যদি কেউ মনে করে যে পৃথিবী চেপ্টা অথবা রোববার দিন কর্মবিরতি পালন করা উচিত তবে জনসাধারণকে তার মতাবলম্বী করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে স্বাধীনতা দান করা উচিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মেটাফিজিক্স বা নৈতিকতা বিরাজমান সত্যের অভিভাবক-মনে করা উচিত নয়। কিন্তু আজকাল তা-ই করা হচ্ছে জার্মানি, ইতালি ও রাশিয়াতে। কিন্তু প্রতিটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের মুক্ত থাকা উচিত দুর্বলতার স্বীকারোক্তি থেকে।

সাধারণ নাগরিকরা খুব কমই আগ্রহ দেখান সরকারের প্রতি হুমকিস্বরূপ নয় এমন পরিবেশে প্রচারণার স্বাধীনতায়। সরকার ভিন্নমত পোষণ করতে পারে ধর্ম অথবা জাতীয়তার প্রশ্নে : ফলে অভিজাতদের বিরুদ্ধে রাজা, বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে অভিজাত অথবা বিত্তহীনদের বিরুদ্ধে বুর্জোয়া উদ্বুদ্ধ হতে পারে। দ্বিতীয় চার্লস ও যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মান সরকারের মতো দেশপ্রেম এর প্রভাব রয়েছে বলে মনে হয়। এ ধরনের পরিবেশে সাধারণ নাগরিকরা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আগ্রহী হতে পারে এবং আহ্বান জানাতে পারে বাকস্বাধীনতার প্রতি। কিন্তু এগুলো হচ্ছে বিপ্লব-পূর্ব পরিবেশ। যেখানে এই পরিবেশ বিরাজ করে সেখানে বিরোধী প্রচারণায় সরকারের উচিত ধৈর্য ধারণ করা। এমনকি তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা প্রায়ই সত্য কারণ, এতে তারা ক্ষমতা হারাবে বটে, কিন্তু যদি ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকে তবে জীবনও হারাতে পারে। খুব কম সরকারই এ ধরনের বিচক্ষণতা দেখিয়েছে যে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার-কথাটি সব সময় সত্য নয়।

আট শতাব্দী ধরে ইংল্যান্ড আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে এ ধরনের নীতি অনুসরণ করতে সমর্থ হয়, কিন্তু পরিশেষে এর পরিসমাপ্তি ঘটায় কিছু অর্থ ও মর্যাদাহানির মাধ্যমে। এই আট শতাব্দী ব্যাপী ব্রিটিশ নীতি সফল ছিল কারণ সেখানে কৃষকরা যখন ক্ষুধার্ত জমিদাররা তখন ঐশ্বর্যশালী।

প্রচারণার স্বাধীনতা যেসব ক্ষেত্রে নাগরিকদের আস্থা জন্মায় ওইগুলো প্রচণ্ড বিপ্লব অথবা অধিক স্বাধীনতার স্বীকৃতি দান। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সরকার নির্বাচনের স্বাধীনতা। তা গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনাধিকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অন্যথায় তা অর্জিত হয় বিপ্লবাত্মক পন্থায়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এর স্বীকৃতি অতীব প্রয়োজনীয়। তা মুক্ত প্রচারণার অধিকারকে বহু দূর অতিক্রম করে যায়।

বাকি রয়েছে আগ্রহী সংস্কারকদের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা কনস্টেন্টাইন পূর্ব প্রতীকী খ্রিস্টানরা, লুথারের সময় প্রটেস্ট্যান্ট এবং বর্তমানকালের প্রটেস্ট্যান্টদের কথা ধরা যাক। এসব মানুষ খুব কমই বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। তারা শহীদত্ব বরণে আগ্রহী ছিলেন এবং অন্য লোককে অনুরূপভাবে আগ্রহী করে তোলার ইচ্ছা পোষণ করতেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, অতীতে সরকারি প্রশাসন যন্ত্র বর্তমান থাকা সত্ত্বেও সংকল্পবদ্ধ ব্যক্তিরা স্বাধীনতার কথা বলতে পারতেন। যা হোক আজকাল সরকারি প্রশাসযন্ত্র অনেক বেশি দক্ষ এবং সম্ভবত মৌলিক পরিবর্তন অসম্ভব করে তুলতে সক্ষম। অপরদিকে যুদ্ধ ও বিপ্লব অরাজকতার জন্ম দেয় এবং সম্ভবত নতুন কিছুর সূচনা করে। এই প্রেক্ষাপটে কিছু কিছু কমিউনিস্ট আশা নিয়ে তাকিয়ে আছেন পরবর্তী যুদ্ধের দিকে।

সাধারণত স্বর্ণযুগের আগমনে বিশ্বাসী হবেন আগ্রহী সংস্কারকরা : তিনি মনে করেন যে সবাই তার ধর্মমত গ্রহণ করলে সহস্র বছরের শাসন সম্ভব হবে। বর্তমানের জন্য বিপ্লবী হলেও ভবিষ্যতের জন্য তিনি একজন রক্ষণশীল : একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব এবং গঠিত হলে তা রক্ষা করতে হবে। এই সব দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে তিনি স্বভাবত পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টায় বা একে ব্যাহত করার প্রচণ্ডতা থেকে অপসৃত হন না; বিরোধিতায় তিনি একজন সন্ত্রাসবাদী এবং ক্ষমতায় একজন নির্যাতনকারী। প্রচণ্ডতায় তার বিশ্বাস বিরোধীদের একই বিশ্বাসে উপনীত হতে উদ্বুদ্ধ করে : তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে তাকে নির্যাতন করবে এবং বিরোধিতায় থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। তার সহস্র বছরের শাসন তাই মধুময় হবে না; গুপ্তচরবৃত্তি থাকবে, প্রশাসনিক আদেশ অনুযায়ী গ্রেফতার করা চলবে এবং কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থাকবে। কিন্তু সর্বধ্বংসীদের মতো তিনি এতে ক্ষতির কিছু দেখবেন না।

এ কথা সত্য যে, স্বর্ণযুগের আগমনে বিশ্বাসীদের মধ্যে অধিকতর দ্র ব্যক্তিরাও রয়েছেন। এমন অনেকেই আছেন যারা বিশ্বাস করেন যে, মানুষের ভেতর যা কিছু সর্বোত্তম তা মানুষের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসবে, আরোপিত হবে না কোনো কর্তৃপক্ষের দ্বারা। বন্ধুসমাজ দ্বারা এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করা যায়। এমন অনেকেই আছেন যারা মনে করেন যে, বদান্যতাপূর্ণ ও বিজ্ঞতাপূর্ণ পরামর্শ অনুযায়ী বাহ্যিক প্রভাবগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী হতে পারে, কিন্তু কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের সহায়ক হবে না। এ ধরনের ব্যক্তিরা উৎসাহী সংস্কারক হওয়া সত্ত্বেও প্রচারণার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হতে পারেন।

অন্য এক ধরনের সংস্কারক অস্তিত্ব লাভ করেছে বিবর্তন সাধারণভাবে গৃহীত হওয়ার পর। সিনডিকেলিস্ট দিনগুলোতে সরেলকে আমরা দৃষ্টান্ত হিসেবে নিতে পারি। এ ধরনের মানুষ মনে করেন যে, মানবজীবন হচ্ছে একটি ক্রম অগ্রগতির ধারা। তা বিশেষ লক্ষ্যে ধাবিত নয় এবং অগ্রগতি সাধিত হওয়ার আগে এ সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে কিছুই বলা যাবে না। কিন্তু তা এমন ধরনের যে প্রতিটি স্তরে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে বলে দেখা হয়। না দেখার চেয়ে দেখা ভালো; কিন্তু যে। পর্যন্ত সব প্রাণীই অন্ধ ছিল সংস্কারের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে দৃষ্টিক্ষমতা অর্জনের প্রস্তাব তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তা সত্ত্বেও প্রকৃত সত্য যে অতীত দর্শনের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে একটি স্থিতিশীল সংরক্ষণশীলতা ভুল হতে বাধ্য। সব সংস্কার কর্ম অবশ্যই উৎসাহিত হবে। কারণ আমরা না জানলেও বাস্তবায়িত হবে মূল নীতি।

আমি এখন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করব প্রচারণার স্বাধীনতা সম্পর্কে। প্রাচীনযুগের সহনশীলতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে গিবন বলেছেন, রোমান বিশ্বে বিভিন্ন উপাসনা পদ্ধতি জনগণ কর্তৃক সমভাবে সত্য বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু দার্শনিক এগুলো একইভাবে মিথ্যা এবং ম্যাজিস্ট্রেটরা সমভাবে উপকারী মনে করতেন। যে দার্শনিক সম্বন্ধে আমি ভাবছি তিনি এতটুকু বলতে যাবেন না যে বিরাজমান সব ধর্মমতই সমভাবে মিথ্যা। কিন্তু তিনি তাও বলতে যাবেন না যে, এর একটি মিথ্যা থেকে মুক্ত অথবা দৈবাৎ মুক্ত হয়ে থাকলেও এই সৌভাগ্যপূর্ণ সত্যটি মানবমনের দক্ষতাপূর্ণ বিভাগ কর্তৃক অনাবিস্কৃত হতে পারত। অদার্শনিক প্রচারকের কাছে তার নিজস্ব প্রচারণাটিই সত্য এবং বিপরীত প্রচারণাটি মিথ্যা। যদি তিনি উভয়টি অনুমোদন দানে বিশ্বাস করেন তবে তা শুধু এ কারণে যে তিনি নিষিদ্ধকরণের ফলে ভুক্তভোগী হওয়ার ভয়ে ভীত। দার্শনিক ব্যক্তিটির কাছে ব্যাপারটি এত সহজ নয়।

প্রচারণার কি ব্যবহার হতে পারে দার্শনিক ব্যক্তির কাছে? পেশাদার প্রচারকের মতো তিনি বলতে পারেন না : পিন প্রস্তুত করার জন্য পিন ফ্যাক্টরির অস্তিত্ব রয়েছে এবং মতামত গঠনের জন্য রয়েছে মতামত ফ্যাক্টরি। গঠিত মতামত দুটো পিনের মতামত হলে এবং দুটোই ভালো হলে কি হতো? বৃহদায়তন উৎপাদন ব্যবস্থায় একচেটিয়া অধিকারের ফলে প্রতিযোগিতাশীল ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদন ব্যবস্থার চেয়ে সস্তা সামগ্রী উৎপাদনে সক্ষম হলে উভয় ক্ষেত্রে একই কারণে একচেটিয়া প্রয়োজন অনুভূত হয়। শুধু তাই নয়, সাধারণ প্রতিযোগী মতামত ফ্যাক্টরি প্রতিযোগী পিন ফ্যাক্টরির মতো ভিন্ন মতামত সৃষ্টি করে না, যা ভালো হতে পারে। তা এ রকম মতামত গঠন করে যা আমার ফ্যাক্টরি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত। তাই সমাজে আমার ফ্যাক্টরির উৎপাদিত সামগ্রীর যোগান বজায় রাখার জন্য প্রভূত পরিমাণে কাজ বৃদ্ধি করে দেয়। এ কারণেই নিষিদ্ধ করতে হবে প্রতিযোগিতাশীল ফ্যাক্টরিগুলো। আমি বলছি এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারেন না দার্শনিক। তিনি বলবেন যে প্রচারণা অবশ্যই অন্ধ বিশ্বাস সৃষ্টি করবে না, বরং তা বিচার, যুক্তিসিদ্ধ সংশয়ে এবং বিরুদ্ধ মতবাদের ভেতর তুলনামূলক গুরুত্ব নিরূপণে ক্ষমতা যোগাবে। প্রচারণা প্রতিযোগিতায় সুযোগ থাকলেই এই উদ্দেশ্য সফল হবে। তিনি জনসাধারণকে বিচারকের সঙ্গে তুলনা করে দেখতে চান। বিচারক কোনো সমস্যায় বিচার্য বিষয়ে উভয় পক্ষের যুক্তি-পরামর্শ শুনে থাকেন। কিন্তু অপরাধ আইনে এক পক্ষের যুক্তি-পরামর্শ শুনে রায় প্রদান করার মতো একচেটিয়া প্রচারণাও অযৌক্তিক। সুতরাং সঙ্গতিপূর্ণ প্রচারণার পরিবর্তে তিনি প্রত্যেক প্রশ্নে সবার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য প্রচারের পক্ষে ওকালতি করবেন যাতে জনগণ ভিন্ন ভিন্ন মতামত শোনার পর আপন মতামত গঠন করতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন পার্টির স্বার্থে পরিচালিত ভিন্ন ভিন্ন পত্রিকার পরিবর্তে সব পার্টির স্বার্থে নিবেদিত একটি পত্রিকার পক্ষে তিনি ওকালতি করবেন। বুদ্ধিবৃত্তিক সুবিধা স্বাধীন বিতর্কে খুবই স্পষ্ট। তাই স্বাধীন বিতর্কে প্রতিযোগিতামূলক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ আবশ্যিক নয়। বি.বি.সি. বিতর্কের সুযোগ দিয়ে থাকে। প্রতিদ্বন্দ্বী সব বৈজ্ঞানিক মতবাদ রাজকীয় সমাজে বর্ণণা করা যেতে পারে। জ্ঞানী ব্যক্তিরা যৌথ প্রচারণা সমর্থন করেন না, কিন্তু সদস্যরা যাতে নিজ নিজ মতামত প্রকাশ করতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেন। কোনো একক সংগঠনে এ ধরনের আলোচনা মৌলিক বিরত ঐকমত্যের নিদর্শন। মিসরীয় পুরাতত্ত্ববিদ তার প্রতিদ্বন্দ্বী পুরাতত্ত্ববিদের বিরুদ্ধে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে যাবেন না। যে সমাজে সরকার সম্বন্ধীয় মৌল বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত সেখানে মুক্ত আলোচনা সম্ভব। কিন্তু যেখানে এ ধরনের মতৈক্য নেই মনে হয় প্রচারণা সেখানে শক্তি ব্যবহারের ভূমিকাস্বরূপ অবতীর্ণ হয়। যাদের অধিকারে শক্তি রয়েছে তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রচারণায় একচেটিয়া অধিকার লাভ করতে চায়। একটি সরকারের অধীনে শান্তিপূর্ণ সহযোগিতা অসম্ভব না হলে সেখানে মতপার্থক্য সংবলিত স্বাধীন প্রচারণা সম্ভব। ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে পটেস্ট্যান্ট কাথলিক রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, কিন্তু অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে পেরেছে। এ কারণেই ওই সময়ে সম্ভব হয়ে ওঠে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা। একটি স্থিতিশীল সরকার কাঠামো জরুরি মুক্তবুদ্ধির জন্য; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা অত্যাচারের মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। এই সমস্যার সমাধান প্রধানত নির্ভরশীল সরকার পদ্ধতির উপর।

 ১৫. ক্ষমতা ও নৈতিক বিধি

যে কোনোভাবে নৈতিকতার দুটো দিক বিদ্যমান ইহুদি নবীদের সময় থেকেই : একটি আইনের অনুরূপ; অপরটি ব্যক্তিবিশেষের বিবেক। পূর্বোক্তটি ক্ষমতার অংশবিশেষ, শেষোক্তটি প্রায়ই বিপ্লবধর্মী। আইনের অনুরূপ দিকটি ইতিবাচক নৈতিকতা, অন্যটি ব্যক্তিগত নৈতিকতা। আমি এই পরিচ্ছেদে আলোচনা করার ইচ্ছা রাখি দুই ধরনের নৈতিকতার পরস্পরের মধ্যকার এবং এগুলোর সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক।

ব্যক্তিগত নৈতিকতার চেয়ে ইতিবাচক নৈতিকতা পুরনো এবং সম্ভবত পুরনো আইন ও সরকারের চেয়েও। মূলত তা ছিল উপজাতীয় প্রথা এবং ক্রমে তা থেকে গঠিত হয়েছে আইন। অতি প্রাচীন সমাজে দৃষ্ট বিবাহ সম্পর্কে অসাধারণ বিস্তৃত নিয়ম-কানুন আলোচনা করা যাক। আমাদের কাছে মনে হয়েছে এগুলো নিয়ম মাত্রই; কিন্তু তাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র যারা এগুলো গ্রহণ করে। এগুলোর নৈতিক শক্তি বিদ্যমান অজাচারী যৌনমিলনের ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধের মতোই। এগুলোর উৎস অস্পষ্ট, কিন্তু এক অর্থে সন্দেহাতীতভাবে ধর্মীয়। ইতিবাচক নৈতিকতার এই অংশটুকু সামাজিক অসমতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয় বলে মনে হয়। এটা ব্যতিক্রমধর্মী ক্ষমতা অর্পণ করে না বা এর মেনে নেয় না অস্তিত্ব। আজও সভ্য সমাজে রয়েছে এ ধরনের নৈতিক বিধি। গ্রিক চার্চ একই সন্তানের দেব পিতাদের ভেতর বিবাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে–এ ধলনের বিধি-নিষেধ কোনোরূপ সামাজিক উদ্দেশ্যই পূর্ণ করছে না। এর উৎস একমাত্র ধর্মতত্ত্বেই রয়েছে। মূলত কুসংস্কার ছিল এখনকার অনেক যুক্তিনির্ভর বিধি-নিষেধই। প্রেতাত্মার শত্রুতার জন্য হত্যা আপত্তিজনক-এ ধরনের আপত্তি শুধু হত্যাকারীরই নয় বরং প্রদর্শিত হতো হত্যাকারীর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও। তাই এ বিষয়ে সমাজের স্বার্থ জড়িত ছিল শাস্তিও শুদ্ধিকরণ আধ্যাত্মিক গুরুত্ব লাভ করে এবং দেখা দেয় অনুশোচনা ও মুক্তিদানের রূপলাভের সম্ভাবনা। কিন্তু এর মূল আনুষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য এখন এভাবে স্মরণ করা হয়, মেষশাবকের রক্তে বিধৌত।

আমি আলোচনা করতে চাই না ইতিবাচক নৈতিকতার এ ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও। আমি ক্ষমতার সহায়ক গৃহীত নৈতিক বিধির ওই দিকগুলো আলোচনা করতে চাই। সাধারণত প্রথাগত নৈতিকতার (বহুলাংশে অচেতন) অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থা সক্রিয় করে তোলা। সফল হলে এ উদ্দেশ্য অর্জিত হয় পুলিশ বাহিনীর চেয়ে সহজে ও অধিকতর কার্যকরি পন্থায়। কিন্তু তা ক্ষমতা পুনর্বণ্টনের প্রত্যাশায় সিক্ত বিপ্লবী ক্ষমতার মুখোমুখি হতে বাধ্য। এই পরিচ্ছেদে আমি প্রথমত আলোচনা করব নৈতিক আচরণবিধির উপর ক্ষমতার প্রভাব নিয়ে এবং পরে দেখাব যে খুঁজে পাওয়া যায় কি-না নৈতিকতার অন্য কোনো ভিত্তি।

নৈতিক ক্ষমতার স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে পৌনঃপুনিক অভ্যাসের মাধ্যমে বাধ্য থাকার মনোভাব সৃষ্টি। পিতামাতার প্রতি সন্তান, স্বামীর প্রতি স্ত্রী, প্রভুর প্রতি ভৃত্য, রাজার প্রতি প্রজা এবং (ধর্মীয় ক্ষেত্রে) যাজকের প্রতি অজ্ঞের বাধ্য থাকা কর্তব্য। ধর্মীয় আদর্শ এবং সেনাবাহিনীতে আরও বিশেষ কর্তব্যপরায়ণতা। বিদ্যমান ছিল। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমান্তরালে প্রবহমান এগুলোর প্রতিটির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

আলোচনা করা যাক পিতামাতার প্রতি সন্তানোচিত আচরণ দিয়েই। বর্তমান যুগে এমন অসভ্য রয়েছে যে যখন তাদের পিতামাতা বৃদ্ধাবস্থায় কাজের অনুপযোগী হয়ে পড়ে তখন খাদ্য হিসেবে তাদের বিক্রি করে দেয়া হয়। সভ্যতার অগ্রগতির কোনো এক পর্যায়ে স্বাভাবিক অগ্রিম চিন্তাশীল কোনো ব্যক্তির মাথায় অবশ্যই এমন চিন্তা আসে যে শৈশব অবস্থায় তাদের সন্তানদের ভেতর এ ধরনের মানসিক অবস্থা সৃষ্টি করা যেতে পারে যা বৃদ্ধাবস্থায় তাকে জীবিত রাখতে সাহায্য করবে; নিঃসন্দেহে তিনি ওই ব্যক্তি যার পিতামাতা ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছেন। তিনি তার বিরোধী মতবাদ সমর্থন করার জন্য দল গঠনের উদ্দেশ্যে দূরদর্শিতামূলক চেতনায় আবেদন রেখেছিলেন কি-না আমার সন্দেহ। আমার সন্দেহ হয় যে, তিনি মনোযোগ আকর্ষণ করেন মানবাধিকারের প্রতি প্রধানত ফলমূল জাতীয় খাদ্যের সুবিধাদির প্রতি, ছেলেমেয়েদের মঙ্গলার্থে শ্রমের ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছেন এমন বৃদ্ধ লোকের দোষহীনতার দিকে। সম্ভবত ওই সময় কৃশ বয়োজ্যেষ্ঠ ও অস্বাভাবিক বুদ্ধিমান কোনো ব্যক্তি ছিলেন যার পরামর্শ তার মাংসের চেয়েও মূল্যবান অনুভূত হলো। যা হোক এমন হতে পারে যে, কারও পিতামাতাকে খাওয়ার চেয়ে সম্মান প্রদর্শন করা উচিত বলে অনুভূত হলো। আমাদের কাছে অতিরঞ্জিত বলে মনে হয় প্রাচীন সভ্যতায় পিতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই লাভজনক প্রথার অবসানের লক্ষ্যে অতি শক্তিশালী বাধা সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল। সুতরাং আমরা দেখতে পাই যে, TEN COMMANDMENT-এর পরামর্শ হচ্ছে যদি তুমি তোমার পিতামাতাকে শ্রদ্ধা করতে ব্যর্থ হও তবে অল্প বয়সেই তুমি মারা যাবে। রোমানরা পিতৃহত্যাকে সবচেয়ে নৃশংস অপরাধ মনে করত এবং কনফিউসীয়রা মনে করত যে, পিতামাতার প্রতি সন্তানোচিত ব্যবহার করাই নৈতিকতার বুনিয়াদ। ছেলেমেয়েদের অসহায় শৈশবাবস্থার পরও তাদের উপর পৈতৃক কর্তৃত্ব স্থায়ী করার জন্য এগুলোই সহজাত ও অচেতন ব্যবস্থা। সম্পত্তির স্বত্বাধিকারের দ্বারা পিতামাতার কর্তৃত্ব অবশ্যই বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু পিতামাতার প্রতি সন্তানোচিত আচরণের অস্তিত্ব না থাকলে যুবকরা তাদের পিতামাতা দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর তাদের দল বা গোষ্ঠীর উপর পিতামাতার নিয়ন্ত্রণ রাখতে দিত না।

একই জিনিস ঘটত মহিলাদের অধীনতার ব্যাপারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষ প্রাণীদের শ্রেষ্ঠশক্তি স্ত্রী প্রাণীদের ক্রমাগতভাবে অধীন করে নিতে পারে না। কারণ, উদ্দেশ্যের দিক থেকে পুরুষদের যথেষ্ট দৃঢ়তার অভাব রয়েছে। মানবজাতির ভেতর সভ্যতার কোনো এক স্তরে স্ত্রীলোকের অধীনতা বর্বর সমাজের চেয়ে অনেক বেশি পূর্ণাঙ্গ ছিল এবং সবসময়ই এই অধীনতা নৈতিকতার সাহায্যে শক্তি লাভ করে। সেন্ট পল বলেছেন, পুরুষ ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব ও গৌরব কিন্তু মহিলারা পুরুষের গৌরব। কারণ পুরুষ স্ত্রীলোকের নয় বরং স্ত্রীলোক পুরুষের। কোনো পুরুষই স্ত্রীলোকের জন্য সৃষ্টি হয়নি বরং স্ত্রীলোক পুরুষের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং স্ত্রী তার স্বামীকে মেনে চলবে। স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর ভেতর অবিশ্বস্ততা নিকৃষ্ট পাপ। এটা সত্য যে, তত্ত্বগতভাবে খ্রিস্টধর্মে পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ের বেলা ব্যভিচার সমান পাপ। এই পাপটি ঈশ্বরের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবে সম্ভব হয়নি। এমনকি খ্রিস্টপূর্ব যুগেও তা তত্ত্বগতভাবে ছিল না। বিবাহিত মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার দুষ্কর্মের ছিল। কারণ অপরাধটি ছিল তার স্বামীর বিরুদ্ধে। কিন্তু মহিলারা ও যুদ্ধবন্দিরা ছিল তাদের প্রভুর বৈধ সম্পদ। তাই তাদের সাথে যৌনমিলন দুষ্কর্মের ছিল না। এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না খ্রিস্টান ধার্মিক দাস মালিকদের। তা ছিল না ঊনবিংশ শতাব্দীর আমেরিকাতেও।

পুরুষ ও মহিলাদের নৈতিকতার পার্থক্যের ভিত্তি ছিল ক্ষমতার দিক থেকে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব। মূলত শ্রেষ্ঠত্ব শুধু কায়িক দিক থেকেই ছিল। কিন্তু এই ভিত্তি থেকে তা ক্রমে অর্থনীতি, রাজনীতি ও ধর্মনীতিতে সম্প্রসারিত হয়। পুরুষের উপর নৈতিকতার বড় ধরনের সুবিধা এক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট বলে মনে হয়। কারণ, অতি আধুনিককালেও মহিলারা বিশ্বাস করতেন পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব বাস্তবায়নকারী নৈতিক শিক্ষায়। ফলে প্রয়োজন পড়ত অপেক্ষাকৃত কম বাধ্যবাধকতার।

আইনপ্রণেতার দৃষ্টিতে মহিলাদের গুরুত্বহীনতার একটি আকর্ষণীয় ব্যাখ্যা পাওয়া যায় হামুরাব্বি বিধিতে। কোনো ভদ্রলোকের সন্তানসম্ভবা মেয়েকে আঘাত করার ফলে মেয়েটি মারা গেলে আঘাতকারীর মেয়ের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় প্রদান করা হয়। ভদ্রলোক ও আঘাতকারীর পক্ষে এটাই ন্যায়। যে মেয়েটি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে সে শুধু শেষোক্ত ব্যক্তির অধিকারভুক্ত এবং তার নিজের বাঁচার অধিকার নেই। ভদ্রলোকের মেয়েকে খুন করায় আঘাতকারী ভদ্রলোকের কাছে অপরাধী-মেয়েটির কাছে নয়। মেয়েদের অধিকার ছিল না, কারণ তারা ছিল ক্ষমতাহীন। ১ম জর্জ পর্যন্ত রাজারা শ্রদ্ধেয় ছিল ধর্মীয় দিক দিয়ে।

Theres such divinity doth hedge a king that treason can but peep thing it would. Acts little of it will.

এমনকি বিশ্বাসঘাতকতা শব্দের ভেতর অধার্মিকতার গন্ধ রয়েছে REPUB LIC বইয়েও। ইংল্যান্ডে রাজকীয় ঐতিহ্যের দ্বারা সরকার লাভবান হন। ভিক্টোরীয় যুগে রাজনীতিবিদরা, এমনকি গ্লেডস্টোনও ভাবতেন যে এটা দেখা তাদের কর্তব্য যে রানী কখনও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া থাকবেন না। আজকাল অনেকেই ভাবেন যে কর্তৃপক্ষের প্রতি বশ্যতা সার্বভৌমত্বের প্রতি বশ্যতার শামিল। এটা একটি ক্রমহাসমান অনুরাগ। কিন্তু এই অনুরাগ হ্রাস পেলে সরকারের স্থিতিশীলতা হ্রাস পায় এবং বেড়ে যায় ডান অথবা বামের একনায়কত্বের সম্ভাবনা।

এখনও বেইজহাটের ইংলিশ সংবিধান বইটি পড়াশোনার জন্য একটি মুল্যবান বই। তাতে এভাবে শুরু হয়েছে রাজতন্ত্রের আলোচনা

রানীর উপকারিতা মর্যাদাপূর্ণ ক্ষমতার দিকদিয়ে বর্ণনাতীত। তাকে ছাড়া ইংল্যান্ডের বর্তমান ইংলিশ সরকার ব্যর্থ হবে। রানী উইন্ডসরের স্লোপে ভ্রমণ করেছেন, ওয়েলসের রাজকুমার ডারভিতে গিয়েছিলেন-এগুলো পড়ে অনেকেই কল্পনা করে যে, অনেক ছোট জিনিসের বেলাও অনেক চিন্তা এবং খ্যাতির গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা রয়েছেন ভুলের মধ্যেই। এটা খুঁজে বের করা ভালো যে কিভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ হলো একজন বিধবা এবং বেকার যুবকের কার্যকলাপ।

রাজতন্ত্র ভালো সরকার হওয়ার পেছনে সবচেয়ে জোরালো কারণটি হচ্ছে যে, এটা একটি বোধগম্য সরকার। একে বুঝতে পেরেছে মানবজাতি। কিন্তু বিশ্বে এরা খুব কমই অন্যদের বুঝতে পেরেছে। প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, কল্পনাশক্তির দ্বারাই মানুষ শাসিত হচ্ছে; কিন্তু এর চেয়েও সত্য যে, মানুষ শাসিত হচ্ছে কল্পনার দুর্বলতার দ্বারাই।

এটি সত্য ও গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক বন্ধন সহজ করে তোলে রাজতন্ত্র। কারণ, ব্যক্তিবিশেষের প্রতি আনুগত্য তত কঠিন নয়। দ্বিতীয়ত রাজতন্ত্র এর দীর্ঘ ইতিহাসে যে শ্রদ্ধা মিশ্রিত অনুরাগ পুঞ্জীভূত করেছে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এর সঞ্চার অসম্ভব। কোথাও বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র অবলুপ্ত হলে স্বভাবত এর স্থলে শিগগির অথবা বিলম্বে এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় : গ্রিসে স্বেচ্ছাচারী, রোমে সম্রাট, ইংল্যান্ডে ক্রমওয়েল, ফ্রান্সে নেপোলিয়ন ও এবং আমাদের সময়ে স্ট্যালিন ও হিটলার। এ ধরনের মানুষ অর্জন করেন আগের রাজতন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনুভূতির অংশবিশেষ। প্রাচীন ও ঐতিহ্যগত পরম রাজতন্ত্রে যথোচিত আনুগত্যের অনুরূপ রাশিয়ার বিচারলয়ে অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির ভেতর শাসকের প্রতি আনুগত্য গ্রহণ এক মজাদার ব্যাপার। নতুন একনায়ক অসাধারণ ব্যক্তিত্বশীল না হলে খুব কমই সফল হবেন অতীতে বংশানুক্রমিক রাজপুরুষদের উপভোগকৃত ধর্মীয় শ্রদ্ধাবোধ সঞ্চারে।

আমরা দেখেছি যে, এ পর্যন্ত প্রায়ই ধর্মীয় উপাদান আনা হয়েছে রাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে ক্ষমতার মোকাবেলায়। যে সমাজ ব্যবস্থায় রাজা প্রতীকস্বরূপ বিদ্যমান তিনি সেই সমাজ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করে তুলেছেন। জাপান ও ইংল্যান্ডের মতো অনেক অর্ধসভ্য দেশে তা ঘটেছে। রাজা কোনো অন্যায় করতে পারেন না-ইংল্যান্ডে এই মতবাদটি রাজাকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু রাজার অস্তিত্ব না থাকলে মন্ত্রীদের যে ক্ষমতা থাকত এর অধীনে তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। যেখানে রাজতন্ত্র প্রথাগত সেখানে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই হচ্ছে রাজার প্রতি অপরাধ এবং গোড়া ব্যক্তিদের কাছে এগুলো পাপ ও অধর্ম। সাধারণতভাবে বলতে গেলে রাজতন্ত্র অবস্থা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কাজ করার মতো একটি শক্তি। এর চেয়ে উপযোগী কাজ হচ্ছে সামাজিক সংহতির অনুকূলে ব্যাপক অনুভূতি সৃষ্টি করা। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে এত কম সামাজিক যে অরাজকতা হচ্ছে একটি নিয়মিত বিপদ যার প্রতিরোধকল্পে রাজতন্ত্র অনেক কিছু করেছে। যা হোক, এই গুণের বিপরীতে তা প্রাচীন পাপ বাঁচিয়ে রাখা এবং ঈপ্সিত পরিবর্তন প্রতিরোধকল্পে শক্তিবৃদ্ধির দোষে দুষ্ট। অধুনা পৃথিবী পৃষ্ঠের অধিকাংশ স্থানে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটিয়েছে এই ত্রুটি।

অন্যান্য ক্ষমতার চেয়ে নৈতিকতার সঙ্গে যাজকয়ি ক্ষমতার সম্পর্ক অধিকতর স্পষ্ট। খ্রিস্টান দেশে ঈশ্বরের আরাধনার ভেতর সদ্গুণ নিহিত। কোন আদেশটি ঈশ্বরের তা একমাত্র যাজকই জানেন। আমরা দেখেছি যে মানুষের চেয়ে ঈশ্বরের আরাধনাই শ্রেয়-নীতিবাক্যটি বিপ্লবধর্মী। দুটো পরিস্থিতিতে তা সম্ভব–একটি হচ্ছে যখন রাষ্ট্র চার্চের বিরোধী; অন্যটি হচ্ছে, যখন ধরে নেয়া হয় যে ঈশ্বর সরাসরি মানুষের বিবেকের সাথে কথা বলেন। পূর্বোক্ত অবস্থা কনস্টেন্টাইনের আগে বিদ্যমান ছিল এবং শেষোক্ত অবস্থা এনাবেপ্টিস্ট এবং স্বাধীনচেতাদের ভেতর বিরাজমান ছিল। স্বাধীন অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত প্রথাগত চার্চ বিদ্যমান থাকাকালে ইতিবাচক নৈতিকতা ব্যক্তিবিশেষের বিবেক ও ঈশ্বরের মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হয়। এর গ্রহণযোগ্যতা চলাকালে এর ক্ষমতা অনেক বেশি এবং চার্চের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি দোষণীয় মনে করা হয়। তা সত্ত্বেও চার্চের অসুবিধা রয়েছে, কারণ যদি চার্চ নিদারুণভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করে তবে মানুষ সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করবে যে তা কি সঠিকভাবে ঈশ্বরের ইচ্ছায় বিশ্লেষণ করতে পারছে। যখন এই সন্দেহ সাধারণভাবে বিস্তার লাভ করে তখন চার্চ সংক্রান্ত সব প্রাসাদ চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যায়। এমনটি ঘটেছিল সংস্কার আন্দোলনের সময় টটনিক দেশগুলোতে।

চার্চের ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও নৈতিকতার সম্পর্ক বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত আলোচিত ক্ষমতা ও নৈতিকতার সম্পর্কের কিছুটা বিপরীত। পিতামাতা, স্বামী ও রাজার প্রতি বাধ্য থাকার জন্য ইতিবাচক নৈতিকতার নির্দেশ, কারণ, তারা শক্তিশালী; কিন্তু নৈতিক কর্তৃত্বের জন্য চার্চ শক্তিশালী। যা হোক তা শুধু একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সত্য। চার্চ নিরাপদ হলে পিতামাতা, স্বামী বা রাজার প্রতি আনুগত্যের নৈতিকতার মতো চার্চের প্রতি আনুগত্যের নৈতিকতা বেড়ে যায়। অনুরূপভাবে অধীনতামূলক নৈতিকতা প্রত্যাখ্যান করা হয়। বিরুদ্ধ মতবাদ এবং অনৈক্য চার্চের কাছে বিশেষভাবে ঘৃণ্য। তাই এগুলো বিপ্লবী কার্যক্রমের অপরিহার্য উপাদান। যাজকীয় ক্ষমতার বিরোধিতার ফলাফল আরও জটিল। চার্চ নৈতিক বিধিগুলোর অফিসিয়াল অভিভাবক। ফলে এর বিরোধীরা নৈতিক মতবাদ এবং পরিচালনার দিক থেকে এর বিরোধিতা করবেন। তারা পিউরিটানদের মতো আরও কঠোরতার সঙ্গে এবং ফরাসি বিপ্লবীদের মতো আরও শৈথিল্যের সঙ্গে বিদ্রোহ করতে পারে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই নৈতিকতা একটি ব্যক্তিগত বিষয়-আগের মতো একটি অফিসিয়াল সিদ্ধান্তের বিষয় নয়।

এটা অবশ্যই করা উচিত নয় যে, অপেক্ষাকৃত কম কঠোর হলেও অফিসিয়াল যাজকীয় নৈতিকতার চেয়ে ব্যক্তিগত নৈতিকতা নিকৃষ্ট। খ্রিস্টপূর্ব যষ্ঠ ডেলপিতে দৈববানী এই জনহিতকর সংস্কার কাজ স্তিমিত করে দেয় এবং পুরনো ব্যক্তির মৃত স্ত্রীর বোনকে বিবাহ করা অনুমোদনযোগ্য মনে করে তখন চার্চ তার ক্ষমতা সাপেক্ষে পুরনো বিধি-নিষেধ বলবৎ করে।

চার্চ যেখানে ক্ষমতা হারিয়েছে সেখানে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে নৈতিকতা প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তিগত হতে পারেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা জনমত অর্থাৎ সাধারণ প্রতিবেশি এবং চাকরিদাতাদের মতো প্রদর্শিত হচ্ছে ক্ষমতাবানদের মতামতের মাধ্যমে।

এ পরিবর্তন পাপীদের দৃষ্টিকোণ থেকে তুচ্ছ ও অধিকতর খারাপ হতে পারে। যেখানে ব্যক্তিগত প্রাপ্তি পাপীর নয় বরং বিচারকের মতো, তিনি সেখানে আনুষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক আদালতের অংশবিশেষ। তিনি কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে নিতে বাধ্য চার্চ শক্তিশালী হলে। দৃঢ় নৈতিক অনুভূতিসম্পন্ন প্রটেস্ট্যান্টরা যাজকীয় নৈতিক ক্রিয়াকলাপ অন্যায়ভাবে আত্মস্থ করেছে এবং অন্যান্য মানুষের দোষ-গুণ বিশেষত দোষের প্রতি প্রায় পোষণ করে সরকারি মনোভাব।

Ye naught to do mark and tell.
Your neighbours fault and folly.
(এটা বলা যথোচিত নয় যে
তোমার প্রতিবেশির ত্রুটি রয়েছে)

ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে নৈতিক আচরণবিধি তত্ত্বটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। বর্বর সমাজের অসবর্ণ বিবাহমূলক অনুশাসন থেকে শুরু করে সভ্যতার সর্বস্তরে ক্ষমতার সঙ্গে নৈতিক বিধিগুলো বাহ্যত কোনো পার্থক্য নেই। আমাদের ভেতর শুধু সমকামের নিন্দাবাদই দৃষ্টান্তস্বরূপ উপস্থাপিত হতে পারে। নৈতিক আচরণবিধি অর্থনৈতিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ মার্কসীয় তত্ত্বটি সাধারণভাবে ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ তত্ত্বটির চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম সমৃদ্ধ। তা সত্ত্বেও মার্কসীয় তত্ত্বটি অনেক ক্ষেত্রেই সত্য। দৃষ্টান্তস্বরূপ মধ্যযুগে যখন জনসাধারণের ভেতর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষ জমির মালিক ছিল, যখন ইহুদিরাই (একমাত্র) অর্থ বিনিয়োগকারী ছিল, তখন চার্চ কোনোরূপ ইতস্তত না করেই কুদিস প্রথা বাতিল করে দেয়। এটা ছিল ঋণগৃহীতার নৈতিকতা। বিত্তবান মালিক সম্প্রদায়ের অভ্যুদয়ের সঙ্গে পুরনো নিষেধাজ্ঞা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ল। এর শৈথিল্য প্রথম এনেছিলেন কেলভিন, যার মক্কেলরা ছিল শহুরে ও সম্পদশালী পরে অন্য প্রটেস্ট্যান্টরা এবং পরিশেষে ক্যাথলিক চার্চ। ঋণদাতাদের নৈতিকতা সামাজিক রূপ লাভ করে এবং ঋণ পরিশোধহীনতা ঘৃণ্য পাপ বলে বিবেচিত হয়। বাস্তবে অতি অধুনা পর্যন্ত দেউলিয়াদের বহিষ্কার করে রাখে বন্ধু সমাজ।

বিভিন্ন যুগের শত্রু সম্পর্কিত নৈতিক বিধির পার্থক্য অনেক। এর কারণ পার্থক্য ছিল ক্ষমতা লাভ জনক ব্যবহারে। এই বিষয়ের উপর শোনা যাক পুরনো টেস্টামেন্ট থেকে :

When the lord thy God shall bring thee into the land wither throw goest to possess it, and hath cost out many nations before thee, the Hittites, and the Girgashites, and the Amorifes, and the companies, and the Perizzites, and the Hivites and the Jebusites. Seven nations greater and mightier than thou;

And when the lord thy God shall deliver them before thee; Thou shalt smite them, and utterly destroy they; thou shalt make no covenant with them. no show mercy unto them :

Neither shalt thou make marriage with them; they daughter shalt thou not give unto his sow. nor his daughter shalt thou take untro thy son.

For they will turn away thy son from following me, that they may serve other gods : so the anger of the lord be kindled against you, and destroy thee suddenly.

If they do all this, There shall not be male or female barren among you, or among your cattle.

পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এই সাত জাতি সম্পর্কে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে :

thou shalf save alive nothing that breathe th… that they teach you not to do after all their abominations.

But towards cities which are very for off from thee, and which are not of these nations it is permissible to be more merciful

Thou shall smite every male there of with the edge of the sword : but the women, and the little ones, and the cattle, and all that is in the city even all the spoil thereof, shalt thou take unto thyself.

স্মরণ করা যেতে পারে যে বিষয়টি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান না থাকায় সোল (saul) এমালেকাইটকে আঘাত করলে সমস্যায় পড়েন:

And he took agag the king of the Amolekites alive and utterly destroyed all the people with the edge of the sword.

But saul and the people spared Agag, and the best of the sheep, and of the oxen, and of the fettings. and the lambs, and all that was good. and would not utterly destroy them : but everything that was vile and refuse, that they destroyed utterly.

Then come the word of the lord unto samnel saying.

It repenteth me that I have set up saul to the king : for he is turned back from following me. and hath not performed my commandments.

The moral code towards enemies is a matter as to which different ages have differed greatly, largely because the profitable uses of power have differed. On this subject, let us first hear the Old Testament.

When the Lord thy God shall bring thee into the land wither thou gust to possess it, and hath cast out many nations before thee, the Hittities. and Girgashites, and the Amorites, and the Canaanites, and the Perizzites, and the Hivites and the Jebusites, seven nations greater and mightier than thou :

And when the Lord thy God shall deliver them before thee : thou shalt smite them, and utterly destroy them : thou shall make no covenant with them. nor show mercy unto them :

Neither shalt thou make marriages with them : thy daughter shalt thou not give unto his son. nor his daughter shall thou take unto thv son.

For thev will turn away the son from following me. that they may serve other gods : so will the anger of the Lord be kindled against you. and destroy thee suddenly.

If they do all this, there shall not be make or female barren among you. or among your cattle.

As regards these seven nations, we are told in a later chapter even more explicity :

Thou shalt save alive nothing that breatheth … that they teach you not to do after all their abominations.

But towards cities which are very far off from thee, and which are not of these nations it is permissible to be more merciful:

Thou shall smite every male thereof with the edge of the sword : but the women, and the little ones, and the cattle, and all that is in the city. even all the spoil thereof, shalt thou take unto thyself.

It will be remembered that when Saul smote the Amalekites he got into trouble for being insufficiently thorough :

And be took Agag the king of the Amalekites alive and utterly destroyed all the people with the edge of the sword.

But Saul and the people with the edge of the sword.

But Saul and the people spared Agag. and the best of the sheep, and of the oxen, and of the fatlings, arid the lambs and all that was good. and would not utterly destroy them : but everything that was vile and refuse, that they destroyed utterly.

Then came the word of the Lord unto Samuel, saying,

It repenteth me that I have set up Saul to be king : for he is turned back from following me, and hath not performed my commandments.

রচনার এই অংশগুলোতে এ কথা স্পষ্ট যে পরিপূর্ণ বিজয় লাভই ছিল জেন্টাইল ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সংঘর্ষে ইসরাইলি ছেলেমেয়েদের আগ্রহের কারণ। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ধর্মীয় তথা যাজকদের স্বার্থ ছিল জনসাধারণের উপর অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা। প্রভুর কথা সামুয়েল পর্যন্ত এসেছিল। কিন্তু Saul-এর কাছে যা আসল তা ছিল সামুয়েলের এবং কথাটি ছিল : আমার কানে ভেড়ার ডাক ও ষড়গুলোর হাম্বা ধ্বনির অর্থ কি ছিল? Saul এগুলোর উত্তর দিতে পারতেন নিজের পাপ স্বীকারের মাধ্যমেই।

পৌত্তলিকতার প্রতি ঘৃণার বশবর্তী হয়ে ইহুদিরা পরাজিতদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য ব্যতিক্রমধর্মী ব্যাপকতায় ধাবিত হয়। কিন্তু প্রাচীন কোনো জাতিই পরাজিত জনগণের সঙ্গে আচরণের কোনো নৈতিক বা আচরণগত সীমারেখা চিহ্নিত করেনি। একটিই রীতি ছিল যে, পরাজিত পক্ষের কিছু লোককে নিশ্চিহ্ন করা হতো এবং অবশিষ্ট মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হতো। কিছু গ্রিক (যেমন Euripides in the trojen women) এই রীতির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির জন্য চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা বিফল হয়। শক্তিহীন বলেই পরাজিত দল ক্ষমতা লাভের দাবি করতে পারেনি। এমনকি তত্ত্বগতভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যক্ত হয়নি খ্রিস্টবাদের পূর্ব পর্যন্ত।

শত্রুর প্রতি কর্তব্য একটি কঠিন ধারণা। প্রাচীনকালে ক্ষমাশীলতা একটি গুণ হিসেবে স্বীকৃত হতো। কিন্তু এই স্বীকৃতি শুধু সফল ক্ষেত্রেগুলোতেই প্রযোজ্য হতো। অন্য ক্ষেত্রে তা দুর্বল হিসেবে নিন্দিত হতো। ভয়ের উদ্রেক হলে কেউ উদারতা আশা করত না। রোমানরা হেনিবল বা স্পার্টাকাসের অনুসারীদের কাউকে ক্ষমা প্রদর্শন করেনি। মধ্যযুগে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত সৈনিকদের মধ্যকার সংঘাত খুব মারাত্মক ছিল না; আলবেজিনেসের প্রতি সামান্যতম ক্ষমা দেখানো হয়নি। আমাদের যুগে ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, জার্মানি ও স্পেনে শ্বেত সন্ত্রাসীদের শিকারে পরিণত মানুষের প্রতি প্রায় একই ধরনের হিংস্র আচরণ প্রদর্শিত হয়েছে। এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া অন্যদের মধ্যে থেকে খুবই কমই অভিযোগ উঠেছে। অনুরূপভাবে রাশিয়াতে অধিকাংশ বামপন্থিরা সন্ত্রাস অনুমোদন করে। পুরনো টেস্টামেন্টের দিনগুলোর মতো বাস্তবে শক্রর প্রতি কোনো কর্তব্যই স্বীকৃত হচ্ছে না, যখন এগুলো ভীত সঞ্চারে শক্তিশালী। ইতিবাচক নৈতিকতা শুধু সমাজের সংশ্লিষ্ট অংশের ভেতর ক্রিয়াশীল এবং কার্যত এটি সরকারের একটি বিভাগ। এখন একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ব সরকার ছাড়া অন্য অবাস্তব পরামর্শ ব্যতিরেকে কলহপ্রিয় জনগণকে স্বীকার করতে পারবে না যে নৈতিক বিধিগুলো মানবজাতির একটি সম্প্রদায়ের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়।

এই পরিচ্ছেদে আমি আলোচনা করছি ইতিবাচক নৈতিকতার, কিন্তু স্পষ্টই প্রতীয়মান হচ্ছে যে তা যথেষ্ট নয়। ইতিবাচক নৈতিকতার, কিন্তু ক্ষমতার পক্ষে এবং তা বিপ্লব অনুমোদন করে না। তা বিবদমান পক্ষগুলোর হিংস্রতা প্রশমনে কিছুই করে না এবং নৈতিক অন্তর্দৃষ্টি সম্পর্কিত নতুন কিছুর ঘোষকের জন্য অবস্থান খুঁজে বের করতে পারে না। এখানে তত্ত্বীয় কঠিন প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। কিন্তু এগুলো আলোচনার আগে আসুন আমরা কতগুলো প্রশ্ন স্মরণ করি, যা শুধু বিরোধিতাই করতে পারে ইতিবাচক নৈতিকতার।

কম হলেও পৃথিবী গসপেলের কাছে ঋণী। তা কিছুটা দাসত্ব ও মহিলাদের অধীনতা প্রত্যাখ্যানকারীদের কাছে ঋণী। আমরা আশা করতে পারি যে ভবিষ্যতে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বর্জনকারীদের কাছে তা ঋণী হবে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে সহিষ্ণু প্রচারকদের কাছে তা ঋণী হবে। মধ্যযুগীয় চার্চের বিরুদ্ধে বিপ্লব, পুনর্জাগরিত রাজতন্ত্রে এবং বর্তমান প্রটোক্র্যাসি ক্ষমতার অচলাবস্থা নিরসনের জন্য প্রয়োজনীয়। এ কথা স্বীকার করে পৃথিবীকে অরাজতার দিকে ঠেলে না দিয়ে প্রয়োজন এগুলোর স্থান খুঁজে বের করা।

এখানে বিবেচনাধীন রয়েছে দুটো প্রশ্ন : প্রথমত ইতিবাচক নৈতিকতা ব্যক্তিগত নৈতিকতায় পরিণত করার জন্য কি হতে পারে এর দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞতাপূর্ণ মনোভাব? কোন মাত্রার শ্রদ্ধার জন্য ব্যক্তিগত নৈতিকতা ইতিবাচক নৈতিকতার কাছে দায়ী? কিন্তু এর যে কোনো একটি আলোচনার আগে প্রয়োজন ব্যক্তিগত নৈতিকতা বলতে কি বোঝায় তা আলোকপাত করা।

ব্যক্তিগত নৈতিকতা আলোচনা করা যেতে পারে ঐতিহাসিক ঘটনাবলি থেকে অথবা দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আলোচনা শুরু করি পূর্বোক্তটি দিয়েই।

ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান অনুযায়ী বলা যায়, প্রায় প্রতিটি ব্যক্তিই ঘৃণার চোখে দেখতেন বিশেষ বিশেষ কাজ। সাধারণ এসব কার্যকলাপ শুধু ব্যক্তিবিশেষের দ্বারাই নয় বরং ঘৃণিত হতো সম্পূর্ণ গোষ্ঠী, জাতি বা সম্প্রদায় কর্তৃক। কোনো কোনো ঘৃণার উৎস মানুষের জানা নেই আবার কোনো কোনো ঘৃণার উৎস ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ভেতর খুঁজে পাওয়া যেত। আমরা জানি কেন মোহাম্মদ (সাঃ)-এর অনুসারীরা কোনো প্রাণী বা মানুষের ছবি অংকন করে না। এর কারণ মোহাম্মদ (সাঃ) এমন করতে নিষেধ করেছেন তাদের। আমরা জানি কেন ইহুদিরা খরগোস খায় না। এর কারণ মুসা (আঃ)-এর আইন ঘোষণা করছে যে খরগোস অপবিত্র প্রাণী। এ ধরণের নিষেধাজ্ঞাগুলো গৃহীত হলে ওইগুলো ইতিবাচক নৈতিকতার আওতাভুক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু যে কোনোভাবে এগুলো জানা হয়ে গেলে তা পড়ে ব্যক্তিগত নৈতিকতার পর্যায়ে।

যা হোক, ইতিবাচক নৈতিকতা বলতে আমাদের কাছে ধর্মীয় অনুশাসনের চেয়ে বেশি কিছু মনে হয়। যেভাবে তা আমাদের কাছে পরিচিত তা সেকেলে নয়, কিন্তু এর কতগুলো উৎস রয়েছে বলে মনে হয়- চৈনিক বিজ্ঞ ব্যক্তি, ইহুদি নবী এবং গ্রিক দার্শনিক। কঠিন ব্যাপার ইতিহাসে তাদের গুরুত্ব নির্ণয় করা। সবাই কয়েক শতাব্দীর ভেতর বসবাস করে গেছেন। তাদের সবাই বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর অংশীদার যা তাদের পূর্বসূরিদের থেকে স্পষ্টভাবে পৃথক করেছে। প্রথা অথবা অন্য কারও পূর্বসূরিদের থেকে স্পষ্টভাবে পৃথক করেছে। প্রথা অথবা অন্য কারও জ্ঞানের মাধ্যমে নয় বরং নিজের জ্ঞানানুযায়ী লাওসি ও চুনসি চাও তাদের মতবাদ প্রচার করেন। তাদের মতবাদ বিশেষ কর্তব্য সংবলিত নয়, বরং বিশেষ চিন্তা ও অনুভূতি সংবলিত জীবন পদ্ধতি যা স্বাভাবিক হয়ে যায় কোনোরূপ নীতির প্রয়োজন ব্যতিরেকে। একই কথা বলা যেতে পারে প্রাচীন বৌদ্ধদের সম্বন্ধে। ইহুদি নবীরা আইন অতিক্রম করেন এবং নতুন ও অধিকতর অন্তর্মুখী গুণাবলি সমর্থন করেন। এই সমর্থনের ভিত্তি প্রথা নয়, বরং প্রভু এমন বলেছেন শব্দাবলির মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ। সক্রেটিস আত্মার আদেশ অনুযায়ী কাজ করেন-আইনানুগ কর্তৃপক্ষের আদেশ অনুযায়ী নয়। অন্তরের সুরের প্রতি মিথ্যা হওয়ার চেয়ে শহীদের মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতে তিনি প্রস্তুত। তাদের সময়ে এইসব মানুষ বিদ্রোহী ছিলেন এবং সবাই সম্মানিত হয়েছেন। এগুলোর ভেতর অবশ্যই বিবেচনাধীন রয়েছে নতুন কিছু। কিন্তু এই জিনিসটি কি তা সার্বিকভাবে সহজ নয় বলা।

এটা মনে হয় যে, নৈতিক প্রশ্নে মানবজাতির ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে নিজেকে উপস্থাপিত করা সবসময় অন্যায় হতে পারে না। আজকাল প্রত্যেকেই বিজ্ঞানে অনুরূপ মতবাদ গ্রহণ করেন। কিন্তু বিজ্ঞানে নতুন মতবাদ পরীক্ষা করার পদ্ধতি জ্ঞাত এবং শিগগিরই তা সাধারণভাবে গৃহীত হয়ে থাকে অথবা প্রথা ছাড়া অন্য কোনো কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়। নীতিশাস্ত্রের নতুন মতবাদ পরীক্ষা করার অনুরূপ কোনো পদ্ধতির অস্তিত্ব নেই। নবী তার উপদেশের প্রাথমিক উপস্থাপনায় প্রভু এমন বলেছেন কথাটি যথেষ্ট মনে করেন। কিন্তু অন্যান্য মানুষ কি করে বুঝবে যে তিনি দিব্যজ্ঞানপ্রাপ্ত হয়েছেন? বিজ্ঞানে প্রায়ই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত পরীক্ষার অনুরূপ পরীক্ষা ডিউটারনমি আশ্চর্যজনকভাবে প্রস্তাব করেন যে পূর্ব ধারণাতেই সফলতা রয়েছে। তিনি যদি অন্তরে অন্তরে তাকে বলে দেন তবে আমরা কি করে জানব প্রভু কোন কথাটি বলেননি। নবী যখন কিছু বলেন এবং কথা অনুযায়ী কাজ হয় না তখন বলা হয় যে প্রভু এ রকম বলেননি, বরং নবী তা অনুমান করেই বলেছিলেন। কিন্তু আধুনিক মানুষ খুব কমই এ ধরনের নীতিশাস্ত্রীয় পরীক্ষা গ্রহণ করে থাকে।

প্রশ্নের মোকাবেলা অবশ্যই করতে হবে আমাদের। নীতিশাস্ত্রীয় মতবাদ বলতে কি বোঝায় এবং কিভাবে তা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

ঐতিহাসিকভাবে নীতিশাস্ত্র ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অধিকাংশ লোকের জন্য কর্তৃত্বই যথেষ্ট-চার্চ অথবা বাইবেলে বর্ণিত সত্য-মিথ্যাই তাদের কাছে আসল সত্য-মিথ্যা। কিন্তু সময় সময় বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিত্ব স্বর্গীয় প্রেরণা লাভ করেছেন–তারা জেনেছেন কোন জিনিস সত্য অথবা মিথ্যা। কারণ, প্রভু সরাসরি তাদের সাথে কথা বলেছেন। গোঁড়া মতবাদ অনুসারে এসব মানুষ অনেক আগেই চলে গেছেন এবং আধুনিক কোনো ব্যক্তি নিজেকে ওইরকম একজন বলে পরিচয় দিলে তাকে আশ্রয়দানে রাখাই শ্রেয় হবে যদি চর্চা তার ঘোষণা অনুমোদন না করে। যা হোক, এটাই হচ্ছে বিদ্রোহীদের স্বেচ্ছাচারী হওয়ার স্বাভাবিক অবস্থা এবং তা আমাদের সাহায্য করে না বিদ্রোহীদের বৈধ কার্যকলাপ নিরূপণে।

আমরা কি ভাষান্তর করতে পারি ধর্মীয় পরিভাষার বাইরে নীতিশাস্ত্রের? এর সম্ভাব্যতা সম্পর্কে ভিক্টোরীয় স্বাধীন চিন্তাবিদদের কোনো সন্দেহ ছিল না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, উপযোগবাদীরা ছিল উচ্চ নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ এবং তারা প্রত্যয় পোষণ করত তাদের নৈতিকতা একটি যুক্তিসঙ্গত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত বলে। যা হোক, বিষয়টি তাদের কল্পিত অবস্থার চেয়ে কঠিন। আলোচনা করা যাক উপযোগবাদীদের প্রস্তাবিত প্রশ্নের। কখনও কি আচারণবিধির নীতিশাস্ত্রীয় প্রতিজ্ঞা হতে পারে অথবা সর্বদাই কি আচরণের ভালো অথবা খারাপ ফলাফল থেকে তা পেতে হবে? ফলাফল নিরপেক্ষ প্রথাগত সৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে যে বিশেষ শ্রেণির কার্যকলাপ নীতিশাস্ত্রীয়ভাবে নিরপেক্ষ এবং এগুলো বিচার্য ফলাফল সাপেক্ষে। মৃত স্ত্রীর বোনের সঙ্গে বিবাহ একটি নীতিশাস্ত্রীয় প্রশ্ন; কিন্তু স্বর্নমান সম্পর্কীয় প্রশ্ন নীতিশাস্ত্রের আওতাভুক্ত নয়। দুটো সংজ্ঞা রয়েছে নীতিশাস্ত্রীয় প্রশ্নে, এর যে কোনো একটি এই বিশেষণ প্রযুক্ত ক্ষেত্রের জন্য প্রযুক্ত হবে। একটি প্রশ্ন নীতিশাস্ত্র সম্পর্কীয় (১) যদি তা প্রাচীন ইহুদিদের আগ্রহ সৃষ্টি করত। (২) যদি তা এ রকম হয় যে ক্যান্টারবারির আর্কবিশপ এর অফিসিয়াল দক্ষ। এটা স্পষ্ট যে, সম্পূর্ণ অরক্ষণযোগ্য নীতিশাস্ত্র শব্দটির ব্যবহার।

তা সত্ত্বেও ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে আমি দেখতে পাই যে, বিভিন্ন ধরনের আচরণ রয়েছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে আমি প্রতিকূলতা অনুভব করছি এবং যেগুলো আমার কাছে মনে হয় নৈতিকতা সম্পন্ন বলে।

কিন্তু স্পষ্টই তা প্রাক্কলিত পরিণাম নির্ভর নয়। অনেকের কাছ থেকেই আমি জানতে পেরেছি যে অসংখ্য ছেলেমেয়েকে বিষবাষ্প প্রয়োগে হত্যা করেও অন্যসব ভয়ানক কার্যকলাপের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ গণতন্ত্র সংরক্ষণ করা যায়। এ মুহূর্তে আমি এমন উপায় অবলম্বন নীরবে মেনে নিতে পারি না। আমি বলছি যে, তা সফল হবে না অথবা যদি সফল হয়েই যায় তবে এর পরিণাম এত খারাপ হবে যে তা গণতন্ত্রের যে কোনো সুফলকে অনেক পেছনে ফেলে দেবে। এ ব্যাপারে যুক্তিটি কতটুকু পক্ষপাতহীন আমি নিশ্চিত নই। আমি বলছি এ ধরনের উপায় অবলম্বন করা উচিত, যদি আমার কাছে প্রতীয়মান হয় যে এগুলোই সফল হবে। মনোগত কল্পনা থেকে আমি নিশ্চিত যে আমার কল্পিত ভালো কিছু এ ধরনের উপায় অর্জিত হতে পারে না। সর্বোপরি আমি মনে করি যে, দর্শনগতভাবে সব কাজই বিচার্য ফলাফল দ্বারা। কিন্তু যেহেতু তা কঠিন, অনিশ্চিত ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, বাস্তবে তাই আশা করা যেতে পারে যে, কিছু কিছু কাজ বাতিল করে দিতে হবে এবং পরিণতির পরীক্ষা ব্যতিরেকে কিছু কিছু কাজের প্রশংসাসূচক মূল্যায়ন করতে হবে। সুতরাং উপযোগবাদীদের মতো আমাকে বলতে হয় যে, যে কোনো সঠিক অবস্থায় সঠিক কাজ হচ্ছে তা-ই যা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য কাজগুলোর ভেতর মন্দের চেয়ে সর্বাধিক ভালো কিছু অর্জন করতে পারে। নৈতিক আচরণবিধির দ্বারাই এর কাজ সম্পাদন সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে নিলে নীতিশাস্ত্র ভালো ও মন্দের উদ্দেশ্যমূলক সংজ্ঞায়নে পর্যবসিত হয়। উপযোগবাদীরা বলেন, ভালো হচ্ছে আনন্দ এবং মন্দ হচ্ছে বেদনা। কিন্তু কেউ যদি তার সঙ্গে একমত না হন তবে কি যুক্তি উপস্থাপন করবেন তিনি?

বিবেচনা করা যাক জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। একজন বলেছেন, ভালো হচ্ছে আনন্দ; অন্যজন বলেছেন, ভালো হচ্ছে আল্লাহর প্রশংসা এবং চিরকাল তাকে গৌরবান্বিত করা। এই তিন ব্যক্তি কিসের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং কি পদ্ধতির মাধ্যমে একে-অন্যের প্রত্যয় সৃষ্টি করেছেন? বিজ্ঞানীদের মতে তাদের পদ্ধতি প্রকৃত সত্যের ব্যাপারে সংবেদনশীল নয়, অর্থাৎ কোনো সত্যই এই বিতর্কের অনুকূল নয়। তাদের পার্থক্য আকাক্ষার মধ্যে-সত্য সম্পর্কিত বিতর্কের ভেতর নয়। আমি বলছি না যে আমি যখন বলি এটা ভালো তখন আমি বোঝাতে চাই আমি তা আশা করি; এটা শুধু একটি বিশেষ আকাক্ষা যা আমাকে কোনো জিনিস ভালো বলতে উদ্বুদ্ধ করছে। এই আশা বিশেষ মাত্রা পর্যন্ত নৈব্যক্তিক; এটা এমন একটি বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে যা শুধু আমার পরিবেশেই আমাকে আনন্দ দেবে না। কোনো একজন রাজা। এই বর্ণনার প্রথম অংশ নিঃসন্দেহে নীতিগত। কিন্তু রাজা হওয়ায় তার আনন্দ শুধু নীতিগত হতে পারে, যদি কোনো জরিপ থেকে বোঝা যায় যে, অন্য কিছুই পারে না এ ধরনের ভালো রাজা বানাতে।

আগে এক উপলক্ষে আমি প্রস্তাব করেছি যে, স্বকীয়মান ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন-তবে এ ব্যাখ্যা স্বপ্রমাণের ভিত্তিতে নয়, বরং মানবজাতির আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কিত প্রকাশের ভিত্তিতে। আমি যখন বলি ঘৃণা খারাপ তখন প্রকৃতপক্ষে আমি বলি যে, কেউ ঘৃণাবোধ করেনি। আমি কোনোরূপ গুরুত্ব আরোপ করছি, আমি শুধু বিশেষ ধরনের আকাক্ষা প্রকাশ করছি। শ্রোতা বুঝতে পারেন যে, আমি এই আকাক্ষা অনুভব করি। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন যে সত্য শুধু এটি ই। এই সত্য মনোবিজ্ঞানসম্মত সত্য-নীতিশাস্ত্রীয় সত্য নয়।

নীতিশাস্ত্রের মহাপ্রবর্তকরা অন্য মানুষের চেয়ে বেশি জানতেন না। তবে বেশি আশা করতেন। আরও যথাযথভাবে বলতে গেলে সাধারণ মানুষের চেয়ে তাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল অধিকতর নৈর্ব্যক্তিক এবং তাদের লক্ষ্যস্থল ছিল অধিকতর ব্যাপক। অধিকাংশ লোকই নিজের সুখের চিন্তা করে; বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ তাদের ছেলেমেয়ের সুখের চিন্তা করে; অল্প লোকও জাতীয় সুখের চিন্তা করে না; মানবজাতির জন্য সুখের চিন্তা কোনো কোনো মানুষের ভেতর খাঁটি ও প্রবল। অনেকের মধ্যেই এ ধরনের অনুভূতি নেই এবং একে সার্বজনীন সুখের পথে বাধাস্বরূপ দেখে এসব মানুষ মনে করে যে অন্যরা যেমন কাজ করে তেমন অভুব করে; সুখই ভালো এভাবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়।

বুদ্ধ ও স্টয়েকের সময় থেকে আজ পর্যন্ত নৈতিকতাবাদী সবাই ভালো বলতে এমন কিছু বিবেচনা করেছেন যা সব মানুষ সমভাবে উপভোগ করতে পারে। তারা নিজেদের রাজপুত্র বা গ্রিক বা ইহুদি মনে করেননি বরং মানুষই ভেবেছেন। সব সময়ই তাদের নীতির দ্বিত্ব উৎস ছিল : একদিকে তারা নিজেদের জীবনে বিশেষ বিশেষ জিনিসের মূল্য দিতেন। অপরদিকে সহানুভূতিমূলক গুণ থাকার ফলে নিজেদের মতোই তারা অন্যদের জন্যও আশা করতেন। নীতিশাস্ত্রে সহানুভূতি একটি বিশ্বজনীন শক্তি; আমি মনে করি সহানুভূতি একটি আবেগ তত্ত্বীয় নীতি নয়। সহানুভূতি সহজাত একটি বিশেষ শিশু অন্য একটি শিশুর কান্নার দুঃখ পেতে পারে। কিন্তু সহানুভূতির সীমাবদ্ধতা প্রাকৃতিকও বটে। ইঁদুরের প্রতি বিড়ালের সহানুভূতি নেই। হাতি ছাড়া অন্য প্রাণীর প্রতি রোমানদের সহানুভূতি ছিল না। ইহুদিদের প্রতি জেন্টাইলদের এবং কুলকদের প্রতি স্ট্যালিনের কোনো সহানুভূতি ছিল না। সহানুভূতির সীমাবদ্ধতা থাকলে অনুরূপভাবে ভালোর ধারণা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ভালো এমন যা শুধু মহানুভব ব্যক্তিরা অথবা শুধু অতিমানব অথবা আর্য অথবা প্রলেতারীয় অথবা ক্রিস্টাডেলপীয়রা ভোগ করে থাকেন। এসব ইঁদুর-বিড়াল সম্পর্কজাত নীতিশাস্ত্রের কথা।

ইঁদুর-বিড়াল সম্পর্কজাত নীতিশাস্ত্রীয় কথার খণ্ডন বাস্তব, তাত্ত্বিক নয়। দুটোই এ ধরনের নীতিশাস্ত্রের উপযোগী হয়ে থাকে। ঝগড়াটে ছোট ছোট ছেলেদের মতো অনেকেই বলতে থাকে, চলো খেলা শুরু করি; আমি বিড়াল তুমি ইঁদুর। না না প্রত্যেকেই উত্তর দেয় তুমি না আমি বিড়াল হব। এভাবে ওরা সবাই পরিণত হয় ঝগড়াটে বিড়ালে। কিন্তু এর একজন পূর্ণ সফলতা অর্জন করতে পারলে সে তার নীতিকথা প্রতিষ্ঠা করতে পারে; আমরা তখন বাড়ি ভাড়া, সাদা মানুষের বোঝা অথবা নরভিক প্রতিযোগিতা অথবা এ ধরনের কিছু মতামত পেয়ে থাকি। এ ধরনের মতামতগুলো অপরিহার্যরূপে আকর্ষণ করে থাকে বিড়ালকেই, ইঁদুরকে নয়। এগুলো ইঁদুরের উপর আরোপিত নগ্ন ক্ষমতা।

নীতিশাস্ত্রীয় বিতর্ক প্রায়ই উপায় সম্পর্কিত-উদ্দেশ্য সম্পর্কিত নয়। দাস প্রথাকে এজন্য আক্রমণ করা যেতে পারে যে তা অ-অর্থনৈতিক নয়। স্বাধীন ছেলেমেয়েদের আলাপ-আলোচনা আগ্রহ উদ্দীপক-এ সত্যের উপর জোর দিয়ে মহিলাদের অধীনতার সমালোচনা করা হয়। নির্যাতনের জন্য দুঃখ করা হয় এজন্য যে, এর ফলে উদ্ভূত ধর্মীয় বিশ্বাস বৈধ নয়। যা হোক, এসব যুক্তির পেছনে সাধারণত উদ্দেশ্য সম্পর্কিত পার্থক্য বিদ্যমান। নিয়েজেকের যুদ্ধবাদ সম্পর্কিত সমালোচনার মতো উদ্দেশ্যের পার্থক্য নগ্নভাবে প্রতীয়মান হয়। খ্রিস্টীয় নীতিশাস্ত্রে সব মানুষ একই রকম। নিয়েজের বেলায় অধিকাংশই বীরের পাথেয়। প্রকৃত সত্যের প্রতি আবেদন সৃষ্টির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক বিতর্কের মতো উদ্দেশ্য সম্পর্কিত বিতর্ক চালানো যায় না। মানুষের অনুভূতির পরিবর্তনের প্রচেষ্টার মাধ্যমে অবশ্যই এগুলো চালাতে হবে। খ্রিস্টানরা অনুভূতি সৃষ্টির চেষ্টা চালাতে পারে। অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা প্রচারণা বৃদ্ধি করতে পারে। সংক্ষেপে এই প্রতিযোগিতা হচ্ছে ক্ষমতালাভের সাধারণ প্রতিযোগিতা। সার্বজনীন ক্ষমতায় শিক্ষাদানকারী কোনো ধর্মমত ও একটি সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী হয়ে ওঠার উপায়ে পরিণত হতে পারে। তখনই তা ঘটে থাকে যখন ফরাসি বিপ্লব অস্ত্রের বলে বিস্তার লাভ করার কাজ শুরু করে।

রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মতো নীতিশাস্ত্রীয় উদ্দেশ্য ক্ষমতা নয়। মানুষ যদিও একে-অপরকে ঘৃণা করেছে, শোষণ করেছে এবং অত্যাচার করেছে তারপরও নতুন জীবন পদ্ধতির প্রবর্তকদের প্রতি তারা তাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছে। প্রাচীনকালের জাতীয় এবং উপজাতীয় বিশ্বাসগুলোর স্থলে বিশ্বজনীনতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিবেদিত মহান ধর্মগুলো মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখেছে ইহুদি বা জেন্টাইল, অধীন বা স্বাধীন হিসেবে নয়। এগুলোর প্রবর্তকদের সহানুভূতি ছিল বিশ্বজনীন এবং মনে করা হতো যে এ মর্মে তাদের প্রজ্ঞা অস্থায়ী ও আবেগপ্রবণ স্বেচ্ছাচারী প্রজ্ঞা অতিক্রম করেছে। ফলাফল সম্পূর্ণরূপে প্রবর্তকদের আশানুরূপ হয়নি। পুলিশ উত্তেজিত জনতাকে অসহায় মানুষের উপর আক্রমণ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত। উত্তেজিত জনতা অসহায়দের জীবন্ত দগ্ধ দেখতে চাইলে যদি তাদের কেউ ধীর পরিত্যাগের মাধ্যমে প্রথমে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করার পর অগ্নিদগ্ধ হতো, তবে উন্মত্ততা প্রচণ্ড রূপ ধারণ করত। তা সত্ত্বেও বিশ্বজনীন সহানুভূতিমূলক নীতিমালা একের পর এক রাজ্য জয় করে নিত। অনুভূতির জগতে তা বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের নৈর্ব্যক্তিক ঔৎসুক্যের অনুরূপ, দুটোই মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। আমার মনে হয় না যে উপজাতীয় বা অভিজাত নীতিশাস্ত্রীয় তত্ত্বে প্রত্যাবর্তন দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। বুদ্ধের সময় থেকে মানবজাতির ইতিহাস বিপরীতমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। ধ্যানমগ্ন মুহূর্তে যা কিছু ভালো মনে হয় তা ক্ষমতা নয়। তা প্রমাণিত মানুষ যাকে স্বর্গীয় আত্মা মনে করেছে তার বৈশিষ্ট্য থেকেই।

এ অধ্যায়ের শুরুতে আলোচিত পিতামাতার প্রতি সন্তানোচিত আচরণ, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর বশ্যতা, রাজার প্রতি আনুগত্য ইত্যাদির মতো প্রথাগত নৈতিক বিধি আংশিক অথবা সম্পূর্ণভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছে। নৈতিক নিয়ন্ত্রণের অভাব হলে অধিকতর কঠোর নতুন আচরণবিধি এগুলোর স্থান দখল করে নেয়। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে আমাদের এ যুগে ইতিবাচক নৈতিকতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের ক্ষমতা অনেক বেশি। অবশ্যই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বৃদ্ধির পরিণতিস্বরূপ তা ঘটেছে। চার্চ ও পরিবারের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা কমে গেছে। কিন্তু আমি এর কোনো লক্ষণই দেখছি না যে অষ্টাদশ শতাব্দী অথবা মধ্যযুগের চেয়ে আমাদের এ যুগে নৈতিকতার প্রভাব রয়ে গেছে মানবীয় কার্যকলাপে।

এবার আসুন একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা এই পরিচ্ছেদের আলোচনা সমাপ্ত করি। প্রাচীন সমাজে এমন বিশ্বাস করা হতো যে আচরণ বিধিগুলোর উৎস অতীন্দ্রিয়লোক। আমি এর কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে বলে মনে করি না। কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে, এর ফলে সমাজে শক্তির ভারসাম্য বিরাজ করে। দেবতারা মনে করেন যে ক্ষমতাবানদের কাছে আত্মসমর্পণ করা কর্তব্য; কিন্তু ক্ষমতাবানরা এত নিষ্ঠুর হবে না যে তা বিদ্রোহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নবী ও জ্ঞানী মানুষের প্রভাবে নতুন নৈতিক বিধি দেখা দেয়। কখনও নৈতিক বিধিগুলো পুরাতনের পাশাপাশি চলে আবার কখনও তা পুরাতনের স্থান দখল করে নেয়। নবী ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা ক্ষমতার ঊর্ধ্বে জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও বিশ্বজনীন প্রেমের স্থান দিয়েছেন। এইভাবে তারা দেখিয়েছেন যে, ব্যক্তিগত সফলতার চেয়ে এই লক্ষ্যগুলো অধিক মুল্যবান। সমাজ পদ্ধতির যে অংশ বিশেষের জন্য মানুষ দুঃখভোগ করে থাকে নবী ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত কারণেই এর পরিবর্তনের প্রত্যাশা করে থাকেন। বিপ্লবী আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত কারণের সঙ্গে নৈর্ব্যক্তিক তত্ত্বের সমন্বিত রূপদানের ফলেই।

আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি সমাজ জীবনে বিপ্লবের স্থান চিহ্নিতকরণে। বিপ্লব দুধরনের : তা শুধু ব্যক্তিগত হতে পারে অথবা হতে পারে ভিন্ন সমাজ প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তার আশা-আকাঙ্ক্ষায় অন্যের অংশ থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই কিছু সংখ্যক ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ ছাড়া সবাই অংশগ্রহণ করে থাকে। (যারা প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় নিজের স্বার্থসিদ্ধি লাভ করে তারাই এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমধর্মী লোক)। এ ধরনের বিপ্লব গঠনমূলক, ধ্বংসাত্মক নয়। এমনকি প্রথম দিকে ধ্বংসাত্মক দেখা গেলেও পরিণামে তা স্থিতিশীল নতুন সমাজের জন্ম দেয়। এর নৈর্ব্যক্তিক উদ্দেশ্যই একে নৈরাজ্যিক বিপ্লব থেকে আলাদা করে দেখায়। শুধু ঘটনা প্রবাহ থেকে এর বৈধতা যাচাই করা সম্ভব। কর্তৃপক্ষের বোষধাদয় হলে একে প্রতিরোধ না করেই প্রজ্ঞার পরিচয় দেবেন। ব্যক্তিবিশেষ মানুষের জন্য উপকারী জীবন পদ্ধতি উপলব্ধি করতে পারেন। যে জীবন পদ্ধতি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা অধিক পরিমাণে চরিতার্থ করতে সমর্থ। তিনি কে তা অন্য লোকের কাছে বোধগম্য করে তুলতে পারেন। বিপ্লব ছাড়া মানবজাতি পশ্চাৎপদ থেকে যাবে এবং অন্যায় দূর হবে না সমাজ থেকে।

১৬. ক্ষমতার দর্শন

এই অধ্যায়ে আমি আলোচনা করতে চাই ক্ষমতাপ্রীতির দ্বারা অনুপ্রাণিত দর্শন সম্বন্ধে। আমি বলছি না যে ক্ষমতাই এর বিষয়বস্তু। তবে অধিবিদ্যা ও নৈতিক বিচার-বিবেচনায় এটিই দার্শনিকদের সচেতন বা অবচেতন ইচ্ছা।

আমাদের বিশ্বাস জন্ম নেয় বিভিন্ন মাত্রায় ইচ্ছার সঙ্গে দর্শনের মিলনের ফলেই। কোনো ক্ষেত্রে একটি উৎপাদকের কার্যকরী অংশ খুবই কম থাকে এবং অন্য ক্ষেত্রে অন্য উৎপাদকের। অভিজ্ঞতার সাহায্যে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে এমন কিছু যৎসামান্যই হয়ে থাকে। যখন আমাদের বিশ্বাস তা অতিক্রম করে যায় তখন ইচ্ছাই এগুলোর সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করে। অপরপক্ষে অল্প বিশ্বাসই চূড়ান্তভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পরও দীর্ঘদিন টিকে থাকে। তাছাড়া পক্ষে বা বিপক্ষে তা যুগ যুগ ধরে টিকে থাকতে পারে প্রমাণের অভাব হলেও।

দর্শন জীবনের চেয়ে অধিকতর সমন্বিত। অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকে আমাদের জীবনে। কিন্তু একটি দর্শন সাধারণত কোনো প্রভাবশালী ইচ্ছার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে থাকে।

বিভিন্ন রকম আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রভাবিত করেছে দার্শনিকের কাজকে। জানার আকাক্ষা রয়েছে। কিন্তু বিশ্বকে যে জানা সম্ভব এটা প্রমাণের আকাক্ষার মতো তা এক হতে পারে না। সুখের আকাক্ষা রয়েছে, সদগুণের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে এবং এ দুয়ের মিলনে সৃষ্ট মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে। সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মিলনের আকাক্ষা রয়েছে, সৌন্দর্যের আকাক্ষা রয়েছে এবং সর্বোপরি রয়েছে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা।

সদগুণের লক্ষ্য স্থির করে বড় বড় ধর্মগুলো। খ্রিস্ট ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম মুক্তির পথ অন্বেষণ করে। অধিকতর রহস্যরূপে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মিলনের পথ অন্বেষণ করে। অভিজ্ঞতাবাদী দর্শন সত্য অন্বেষণ করে। আবার আদর্শবাদী দর্শন (ডেকার্তে থেকে কান্ট পর্যন্ত) নিশ্চয়তার অন্বেষণ করে। বাস্তবে কান্ট পর্যন্ত বড় বড় দার্শনিক মানব স্বভাবের জ্ঞাত অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত আকাক্ষার সঙ্গে তাদের চর্চা সীমাবদ্ধ রাখেন। বেনথাম ও মানচেষ্টার স্কুলের দর্শন সম্পদকে প্রধান। উপায় ও আনন্দকে উদ্দেশ্য হিসেবে স্থির করে। আধুনিককালের ক্ষমতা দর্শন প্রধান মানচেস্টরিসমাস-এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ আবির্ভূত হয়। জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ধারাবাহিক আনন্দলাভ–এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে তা প্রতিক্রিয়াস্বরূপ।

ইচ্ছাশক্তি ও অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতার ভেতর দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক হচ্ছে মানবজীবন। যে দার্শনিক ক্ষমতা তাড়না দ্বারা পরিচালিত হন তিনি বাস্তবতার ভূমিকাকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করেন। আমি এ মুহূর্তে শুধু মেকিয়াভেলি ও রিপাবলিক গ্রন্থে বর্ণিত নগ্ন ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন ব্যক্তিদের কথাই চিন্তা করছি; আমি ভাবছি ওইসব মানুষের কথা যারা অধিবিদ্যা ও নীতিবিজ্ঞানের আচ্ছাদনের নিচে তাদের ক্ষমতাপ্রীতি লুকিয়ে রাখার তত্ত্ব উঘাটন করেন। ফিকট হলেন আধুনিককালের এমন দার্শনিকের ভেতর প্রথম ব্যক্তি।

ফিকটের দর্শন শুরু হয় পৃথিবীতে একক অস্তিত্বশীল সত্তার অহংবোধ থেকে। শুধু নিজেকে সত্য বলে মনে নেয় বলেই এই অহংবোধ রয়েছে। যদিও অন্য কিছুই বিরাজ করে না তারপরও এই অহংবোধ একদিন ধাক্কা খায় এবং এর ফলে অহংবোধহীনতা সত্যে পরিণত হয়। তা তখন ধাবিত হয় বিভিন্ন উদ্ভবের দিকে। সংশয়বাদিতা উদ্ভবের কারণ হিসেবে ঈশ্বরের দিকে ইঙ্গিত করে। ফিকট মনে করেন যে, ঈশ্বর ও অহংবোধের ভেতর পার্থক্য অপ্রয়োজনীয়। অহংবোধ ও অধিবিদ্যার ভেতর সমন্বয় হলে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, জার্মানরা ভালো এবং ফরাসিরা খারাপ। তাই নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা জার্মানদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। জার্মান ও ফরাসিরা শুধু ফিকটেরই আবিষ্কার। কিন্তু জার্মানরা উন্নততর এবং তারা চূড়ান্ত বাস্তবতার অধিকতর নিকটবর্তী বা ফিকটের অহং। আলেকজান্ডার ও অগাস্টাস নিজেদের দেবতা বলে দাবি করেছেন এবং অন্যদের চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ভান ধরতে বাধ্য করেছেন। ফিকট সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলেন না। তাই তাকে চাকরি হারাতে হয় নাস্তিকতার দায়ে। কারণ তিনি ঘোষণা দিতে পারেননি কোনো স্বর্গীয় সত্তার।

সামাজিক কর্তব্যের কোনো স্থান নেই ফিকটের অধিবিদ্যায়। কারণ বহির্বিশ্ব শুধু আমারই স্বপ্ন। এই দর্শনের সঙ্গে মানানসই কাল্পনিক নীতিশাস্ত্র হচ্ছে আপন উন্নয়নের। অযৌক্তিকভাবে একজন মানুষ ভাবতে পারেন যে তার পরিবার বা জাতি তার অহংয়ের অংশবিশেষ। তাই তার অধিকতর মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এভাবেই স্বাভাবিক সৃষ্টি জাতি ও জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস সলিপসিস্টিক দর্শনের। সর্বোপরি যেহেতু ক্ষমতাপ্রীতি তত্ত্বকে অনুপ্রাণিত করে, তাই ক্ষমতা শুধু অর্জন করা যেতে পারে অন্যান্য বিষয়ের সাহায্যে।

এ সবই আদর্শবাদ হিসেবে পরিচিত এবং বহির্বিশ্বের বাস্তবতা স্বীকৃতিদানকারী দর্শনের চেয়ে তা নৈতিক দিক থেকে বিবেচিত মহত্তর বলে।

আমার ইচ্ছা থেকে সত্যের ধারণায় মূর্ত হয়ে ওঠে স্বাধীন বিষয়ের বাস্তবতা। আমার বিশ্বাসের সত্য উপাদানটি এমন কিছুর উপর নির্ভর করে না যা আমি করতে পারি। আমি আগামীকাল আমার প্রাতঃভোজন সম্পন্ন করব-এই বিশ্বাস আংশিকভাবে নির্ভর করে আমার ইচ্ছাশক্তির উপর। কিন্তু মার্চের ১৫ তারিখ সিজারকে হত্যা করা হয়–এ ধরনের বিশ্বাস ইচ্ছাশক্তির উপর নির্ভর করে না। ক্ষমতাপ্রীতির দ্বারা অনুপ্রাণিত দর্শনে এ ধরনের অবস্থা নিরানন্দের এবং তাই তা সত্য ও মিথ্যার উৎস হিসেবে সত্য ঘটনার সাধারণ ধারণাকে ধ্বংস করতে শুরু করে। হেগেলের অনুসারীরা বলেন যে, সত্য ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল হলেই সত্য বিরাজ করে না। বরং আমাদের বিশ্বাসের পুরো পদ্ধতির পারস্পরিক সমন্বয়ের উপর তা নির্ভর করে। আপনার সব বিশ্বাসই সত্য হবে যদি এগুলোর সবই মানানসই হয়। প্রকৃতপক্ষে কোনো পার্থক্য নেই ঔপন্যাসিকের সত্য ও ঐতিহাসিকের সত্যের ভেতর। এভাবে সৃজনশীলতা মুক্তি লাভ করে বাস্তব বিশ্বের শিকল থেকে।

বাস্তববাদ হচ্ছে এর বিশেষরূপে ক্ষমতা দর্শন। বাস্তবাদ অনুসারে কোনো বিশ্বাসের ফলাফল আনন্দদায়ক হলে তাই সত্য। এখন মানুষই পারে একটি বিশ্বাসের পরিণতিকে আনন্দ বা নিরানন্দের ব্যাপারে পরিণত করতে। একনায়কের সদগুণে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের চেয়ে অধিকতর আনন্দদায়ক পরিণতি বয়ে আনে যদি আপনি এর সরকারের অধীনে বসবাস করেন। যেখানেই কার্যকরি নির্যাতন বিরাজমান সেখানে বাস্তবতাবোধে অফিসিয়াল বিশ্বাসই সত্য। তাই বাস্তববাদী দর্শন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদেরকে অধিবিদ্যাগত Omnipotence দান করে, যা একটি অধিকতর পেডিস্ট্রিয়ান দর্শন অগ্রাহ্য করে। আমি বলছি না যে, সবচেয়ে বেশি বাস্তববাদীরা এই পরিণতিগুলোকে তাদের নিজেদের দর্শন বলে গ্রহণ করেন। আমি শুধু বলছি যে, সত্য সম্বন্ধে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির উপর বাস্তববাদীদের আক্রমণ ক্ষমতাপ্রীতি থেকে উদ্ভূত। অবশ্য প্রাণহীন প্রকৃতির উপর এর ক্ষমতা মানুষের উপর ক্ষমতার চেয়ে বেশি।

বার্গসঁর সৃষ্টিশীল বিবর্তন হচ্ছে একটি ক্ষমতা দর্শন যা বার্নার্ডশর Back to Methusaleh নাটকের শেষ দৃশ্যে অতি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। বার্গ বলেছেন যে, বুদ্ধিবৃত্তি নিন্দিত, কারণ তা অবৈধভাবে নিষ্ক্রিয় এবং শুধুই চিন্তার ভেতর সীমাবদ্ধ। তিনি বিশ্বাস করেন যে, প্রাণীগুলো চক্ষু অর্জন করেছে কারণ তারা অনুভব করে যে কোনো কিছু দেখতে সমর্থ হওয়া তাদের জন্য আনন্দদায়ক হবে। তাদের বুদ্ধিবৃত্তি দৃষ্টি সম্পর্কীয় চিন্তাভাবনায় সমর্থ হয়ে ওঠেনি। কারণ তারা ছিল অন্ধ। কিন্তু intuition ই এর অদ্ভুত কাজ সম্পাদনে সমর্থ হয়। তার মতে সর্বপ্রকার বিবর্তনের মূলে রয়েছে আকাঙ্ক্ষা। আকাক্ষা যথেষ্ট আবেগপূর্ণ হলে অর্জন সীমাহীন হয়ে পড়ে। জীবন গঠন (যান্ত্রিক) বোঝার ক্ষেত্রে জীব রসায়নবিদদের প্রচেষ্টা তুচ্ছ বলে মনে হয়, কারণ জীবন গঠন যান্ত্রিক নয়, এর পরিবর্ধন এমনই যে মানুষের পক্ষে বুদ্ধিমত্তার দ্বারা এর সম্বন্ধে অগ্রিম কল্পনা করা অসম্ভব। কাজের দ্বারাই শুধু জীবনকে বোঝা যায়। ফলাফল দাঁড়াচ্ছে যে, মানুষ আবেগপ্রবণ হবে। সৌভাগ্যজনকভাবে বার্গসঁর সুখের জন্য ওইগুলো স্বাভাবিকভাবে তাই।

কোনো কোনো দার্শনিক তাদের ক্ষমতা-তাড়না অধিবিদ্যাগত সত্তাকে প্রভাবিত করুক এটা চান না। তবে তারা অনুমোদন করেন নীতিবিদ্যার উপর মুক্ত শাসন। তাদের ভেতর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছেন নিয়েজেক। নিয়েজেক খ্রিস্টীয় নৈতিকতাকে দাস নৈতিকতার মতোই অগ্রাহ্য করেন এবং এর পরিবর্তে বীর শাসকদের উপযোগী নৈতিকতার যোগান দিয়ে থাকেন। অবশ্য তা নতুন নয়। এর কিছু কিছু হেরাক্লিয়াস ও প্লেটোর ভেতর এবং অনেকগুলোই রেনেসাঁর ভেতর পাওয়া যায়। নিয়েজেকের ভেতর এর সমাধান করা হয়েছে এবং নিউ টেস্টামেন্টের শিক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তার দৃষ্টিতে সংঘবদ্ধ মানুষের নিজেদের স্বার্থের দিক থেকে কোনো মূল্য নেই; কিন্তু বীরের মহত্ত্ব অর্জনের উপায় হিসেবে এর মূল্য রয়েছে। বীর নিজের উন্নতি বিধানের জন্য তাদের আহত করার অধিকার রাখেন। বাস্তবে অভিজাতরা সর্বদাই তাদের কর্মপন্থা এমনভাবে স্থির করেছে যে এ ধরনের নীতিশাস্ত্র দ্বারা তা প্রমাণিত। কিন্তু খ্রিস্টীয় তত্ত্ব বলছে যে ঈশ্বরের দৃষ্টিতে সব মানুষই সমান। গণতন্ত্র খ্রিস্টীয় শিক্ষার কাছে সমর্থন লাভের জন্য এ আবেদন রাখে। কিন্তু অভিজাতদের কাছে নিয়েজেকের নীতিবিদ্যাই শ্রেষ্ঠ। দেব-দেবি থাকলে আমি কিভাবে দেবতা না হয়ে থাকতে পারতাম? সুতরাং কোনো দেবতা নেই বলেছেন নিয়েজেকের জরাথুস্ত্র। ঈশ্বরকে সিংহাসনচ্যুত করা প্রয়োজন যাতে পৃথিবীতে সন্ত্রাসীদের জায়গা করে দেয়া যায়।

ক্ষমতাপ্রীতি মানব প্রকৃতির স্বাভাবিক অংশবিশেষ। কিন্তু ক্ষমতা দর্শন একটি বিশেষ অর্থে অস্বাভাবিক। বস্তু ও অন্যান্য মানুষের সমন্বয়ে গঠিত বহির্বিশ্বের অস্তিত্ব তথ্যস্বরূপ এবং তা বিশেষ ধরনের অহংকারকে ধ্বংস করে দেয়। ক্ষমতাপ্রীতির দ্বারা গঠিত বিশ্ব সম্পর্কে বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী মানুষ প্রতি জনপদেই দেখতে পাওয়া যায়। কোনো মানুষ ভাবতেন যে তিনি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর, অন্য মানুষ ভাববেন যে তিনি রাজা। আবার অন্য কেউ ভাববেন যে তিনি ঈশ্বর। অনুরূপ বিপথগামিতা যদি শিক্ষিত মানুষের দ্বারা অস্পষ্ট ভাষায় প্রকাশিত হয় তবে তা দর্শনের অধ্যাপক হওয়ার পথ সুগম করে দেয়। কিন্তু যদি তা আবেগপ্রবণ মানুষের বাগিতায় প্রকাশিত হয় তবে তা দর্শনের অধ্যাপক হওয়ার পথ সুগম করে দেয়। সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত উন্মাদের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়, কারণ তার কার্যকলাপ প্রশ্নবিদ্ধ হলে সে সহিংসপ্রবণ হয়ে পড়ে। সার্টিফিকেটধারী নয় এমন বিভিন্ন ধরনের মানুষ ক্ষমতাবান সেনাদলের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে এবং তাদের ক্ষমতাধীন সব সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সাহিত্য, দর্শন ও রাজনীতি উন্মাদের সফলতা এ যুগের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। উন্মাদের সফলতার ধরন প্রায় পুরোপুরিভাবে তাড়না থেকে ক্ষমতার দিকে ধাবিত হয়।

এই অবস্থা বোঝার জন্য সমাজ জীবনের সঙ্গে ক্ষমতা দর্শনের সম্পর্ক আলোচনা করা প্রয়োজন। আমাদের ধারণার চেয়েও জটিল হতে পারে এই সম্পর্কটি।

আমরা সলিপজিসম দিয়ে শুরু করতে পারি। যখন ফিকট মনে করেন যে, সব কিছুই অহং থেকে শুরু হয়, তখন পাঠকরা মনে করেন না যে সবকিছু জোহান গটলিয়ের ফিকট থেকে শুরু হয়। কেমন অদ্ভূত? কিছুদিন আগে পর্যন্ত কেন আমি তাকে শুনতে পাইনি? তিনি কি প্রকৃতই মনে করেন যে তিনি তাদের আবিষ্কার করেছেন? কি হাস্যকর অহংবোধ? আমি পুনর্বার বলি যে পাঠক তা বলছেন না। তিনি ফিকটের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন এবং যুক্তিগুলোকে অকাট্য দেখছেন না। তিনি চিন্তা করেন, মোটের উপর অতীত সম্বন্ধে আমি কি জানি? আমার কিছু অভিজ্ঞতা রয়েছে যেগুলো আমি বাছাই করেছিলাম আমার জন্মের আগের সময় সম্বন্ধে ব্যাখ্যাস্বরূপ। যেসব জায়গা আমি দেখিনি এগুলো সম্পর্কে আমি কি বলতে শুনেছি। আমি যদি ঈশ্বরের জায়গায় নিজেকে মনে করি এবং বলি যে বিশ্ব আমারই সৃষ্টি তবে কোনো কিছু দিয়েই প্রমাণ করা যাবে না যে আমি ভুল করছি। ফিকট মনে করছেন যে শুধু ফিকটই আছেন এবং জন স্মিথ যুক্তিগুলো পড়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যে শুধু জন স্মিথই আছেন। কিন্তু জন স্মিথ কখনও খেয়াল করেননি যে ফিকটের কথা তা নয়।

এভাবে সলিপসিজমের বিশেষ ধরন সমাজজীবনের ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। কিছু সংখ্যক পাগল, যারা প্রত্যেকেই নিজেকে ঈশ্বর মনে করে, একে-অন্যের সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে আচরণের শিক্ষা নিতে পারে। কিন্তু যে পর্যন্ত প্রতিটি ঈশ্বরই নিজেকে Omnipotence হিসেব দেখতে পায় ততক্ষণই তাদের এই বিনয়ভাব বজায় থাকে। যদি মি. A নিজেকে ঈশ্বর ভাবেন তাহলে তিনি অন্যদের কার্যকলাপ ততক্ষণ মেনে নেবেন যতক্ষণ তাদের কার্যকলাপ তার উদ্দেশ্য সাধনে সহায়ক হবে। কিন্তু যদি মি. B তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করেন এবং বুঝতে চান যে তিনি Omnipotence নন তাহলে মি. Aর আবেগ জাগ্রত হবে এবং তিনি বুঝে নেবেন যে মি. B হচ্ছে শয়তান অথবা তার সমর্থক। মি. B ও A সম্পর্কে অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবেন। প্রত্যেকেই দল গঠন করবেন। ফলে যুদ্ধ বাধবে। এটা হবে ধর্মযুদ্ধ, যা হবে তীব্রতর; নিষ্ঠুরতর এবং অধিকতর উন্মাদনাযুক্ত। ধরা যাক মি. A হচ্ছেন হিটলার এবং মি. B হচ্ছেন স্ট্যালিন। তাদের দুজনের মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বের একটি চিত্র পেতে পারেন। হিটলার বলবেন, আমি মুক্তিদাতা। স্ট্যালিন বলবেন, আমি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। কিন্তু যেহেতু তাদের দাবি বিশাল সেনাবাহিনী, উড়োজাহাজ, বিষাক্ত গ্যাস ও নির্দোষ ব্যক্তিদের সমর্থপুষ্ট তাই উভয়ের উন্মাদনা থেকে যাবে মানুষের অলক্ষ্যেই।

পরবর্তী পর্যায়ে ধরা যাক নিয়েজেকের বীরের আচরণ। প্রশংসাকারী পাঠককে অবশ্যই বোঝানো হবে যে তিনি নিজে একজন বীর এবং তিনি দুই প্রকৃতির। অসহৎ ও অপরিণামদর্শী ষড়যন্ত্র দ্বারা তাকে পেছনে ফেলে রাখা হয়েছে। এ থেকে মনে হয় যে নিয়েজেকের দর্শন খুবই চমৎকার। কিন্তু এভাবে পাঠ করা হলে ও প্রশংসা করা হলে কিভাবে স্থির করা যাবে যে তিনিই বীর হবেন? স্পষ্টতই যুদ্ধ দ্বারা। এ দুয়ের কোনো একজন বিজয় অর্জন করলে তিনি শুধু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেই তার বীর উপাধি বজায় রাখতে সমর্থ হবেন। এর জন্য তাকে ক্ষমতাধর বিশাল গোপন পুলিশ বাহিনী গঠন করতে হবে। তিনি হত্যার ভয়ের মধ্যেই বসবাস করবেন। অন্য সবাই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত থাকবেন এবং এভাবে বীরত্বের সংস্কৃতি নিঃশেষ হবে একটি ভীতিপূর্ণ জাতি গঠনের মধ্য দিয়ে।

একটি বিশ্বাসের পরিণতি আনন্দদায়ক হলে তা সত্য হয়-এ ধরনের বাস্তববাদী তত্ত্বের সঙ্গে একই ধরনের বেদনাদায়ক পরিস্থিতি জন্ম নেয়। কার জন্য আনন্দদায়ক? স্ট্যালিনের প্রতি বিশ্বাস তার জন্য আনন্দদায়ক; কিন্তু ট্রটস্কির জন্য বেদনাদায়ক। হিটলারের প্রতি বিশ্বাস নাজিদের জন্য আনন্দদায়ক; কিন্তু ক্যাম্পে যাদের জড়ো করে রাখা হয়েছিল তাদের জন্য বেদনাদায়ক। নগ্ন শক্তিই শুধু এই প্রশ্নের সমাধান দিতে পারে। কে এই আনন্দদায়ক পরিণতি উপভোগ করবেন? এর উত্তরই প্রমাণ করে যে একটি বিশ্বাস সত্য।

ক্ষমতা দর্শন আপনা থেকেই ভুল প্রমাণিত হয় সামাজিক পরিণতির হিসাব নেয়া হলে। আমি ঈশ্বর-এই বিশ্বাসে অন্য কেউ অংশীদার না হলে তা অচল হয়ে পড়ে। অন্য কেউ অংশীদার হলে তা আমাকে বিধ্বংসী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। বীরের সংস্কৃতি একটি কাপুরুষ জাতির জন্ম দেয়। বাস্তববাদের বিশ্বাস ব্যাপকতা পেলে নগ্ন ক্ষমতার শাসনের দিকে ধাবিত করে, যা নিরানন্দের। সুতরাং এর নিজস্ব মাপকাঠি থেকেই বলা যায় যে, বাস্তববাদে বিশ্বাস মিথ্যা। সমাজজীবনে সামাজিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ক্ষমতাপ্রীতি ছাড়া প্রয়োজন অন্য কোনো দর্শনের উপর নির্ভর করা।

১৭. ক্ষমতার নীতি

আমরা ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অশুভ ব্যাপারগুলো নিয়ে পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে এতই নিমগ্ন ছিলাম যে, একটা তপস্বীরূপ উপসংহার টানা এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে ভালো জীবনযাপনের জন্য অপরাপর ব্যক্তিদের প্রভাবিত করার সব প্রচেষ্টা পরিহারে উৎসাহ দান করা স্বাভাবিক বলে মনে হয়। লাওসির সময় থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থকরা বাগী ও বিচক্ষণ ছিলেন। অতীন্দ্রিয়বাদে বিশ্বাসী অনেকেই শান্তিবাদী ও ব্যক্তিগত পবিত্রতায় মূল্যদানকারী ব্যক্তিরা মনে করেছেন যে তা কার্যকারিতা নয়, বরং মানসিক অবস্থা। আমি এই মানুষের সঙ্গে একমত হতে পারি না, যদিও আমি স্বীকার করি যে তাদের কেউ কেউ পরোপকারী ছিলেন। তারা এ ধরনের ছিলেন কারণ, যদিও তারা বিশ্বাস করতেন যে তারা ক্ষমতা পরিহার করেছিলেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শুধু বিশেষরূপেই তা পরিহার করতে পেরেছিলেন; যদি তারা পুরোপুরিভাবে তা পরিহার করতে পারতেন তবে তাদের মতবাদের ঘোষণা দিতে পারতেন না এবং পরোপকারী হতেন না। তারা দমনমূলক ক্ষমতা পরিহার করেছিলেন বটে, কিন্তু পরিত্যাগ করতে পারেনি যুক্তি-পরামর্শের উপর নির্ভরশীল ক্ষমতা।

ব্যাপক অর্থে ক্ষমতাপ্রীতি হচ্ছে মানুষ অথবা অন্যান্য জাতি নিয়ে গঠিত বহির্বিশ্বে অভিপ্রেত ফলাফল সৃষ্টির সামর্থ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষা মানব প্রকৃতির অপরিহার্য অংশ এবং একজন কর্মচঞ্চল মানুষের ভেতর তা গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপক। তাৎক্ষণিকভাবে চরিতার্থ করা না গেলেও প্রত্যেক আকাঙ্ক্ষাই একে চরিতার্থ করা না গেলেও প্রত্যেক আকাঙ্ক্ষাই একে চরিতার্থ করার সামর্থ্যলাভের জন্য সহায়ক আকাক্ষার জন্ম দেয়। তাই তা এক প্রকার ক্ষমতাপ্রীতি। তা যেমন সবচেয়ে ভালো আকাক্ষার বেলায় সত্য তেমনি সবচেয়ে খারাপ আকাক্ষার বেলায়ও সত্য। যদি আপনি আপনার প্রতিবেশিকে ভালোবাসেন, আপনি তাদের সুখি করার জন্য ক্ষমতা লাভের ইচ্ছা পোষণ করেন। তাই ক্ষমতাপ্রীতির সার্বিক নিন্দাবাদ প্রকারান্তরে আপনার প্রতিবেশিকে ভালোবাসারই নিন্দাবাদ।

যা হোক, উপায়মূলক ক্ষমতা ও উদ্দেশ্যমূলক ক্ষমতার ভেতর পার্থক্য বিস্তর। উপায়মূলক ক্ষমতার আশাবাদী ব্যক্তি প্রথমত অন্য কিছু আশা করেন এবং পরে এমন বিশ্বাসে উপনীত হন যে তিনি যেন তা অর্জন করতে সমর্থ। উদ্দেশ্যমূলক ক্ষমতার আশাবাদী ব্যক্তি তা অর্জনের সম্ভাব্যতার দ্বারা তার উদ্দেশ্য ঠিক করে নেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, রাজনীতিতে কোনো মানুষ বিশেষ কার্যক্রম বিধিবদ্ধ দেখতে চান এবং এভাবে তিনি সরকারি কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েন। অপরদিকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যে আশাবাদী ব্যক্তি এমন কার্যক্রম হাতে নেন যা তাকে পৌঁছে দেয় ঈপ্সিত লক্ষ্যে।

এই পার্থক্যের ব্যাখ্যা রয়েছে নির্জন স্থানে ক্রিস্টের তৃতীয় পরীক্ষায়। তিনি নেমে এলে এবং পূজা করলে পৃথিবীর সব কটা রাজ্যই অর্পণ করা হবে। অর্থাৎ বিশেষ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তার কাছে ক্ষমতা অর্পণ করা হবে; কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে অর্পণ করার জন্য নয়। এই পরীক্ষা এমন যে স্পষ্টভাবে হোক বা অস্পষ্টভাবে হোক প্রায় প্রতিটি মানুষই এর অধীন। সমাজতন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তিনি রক্ষণশীল পত্রিকার কোনো পদ গ্রহণ করতে পারেন–তুলনামূলকভাবে এটিই হচ্ছে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। শান্তিপূর্ণভাবে সমাজতন্ত্র অর্জনে তিনি নিরাশ হতে পারেন এবং সাম্যবাদী হয়ে যেতে পারেন। এর কারণ এই নয় যে, তিনি যা চান তা এই পথে অর্জন করা যাবে। তবে তিনি যা চান এর কিছু কিছু এই পথে অর্জন করা সম্ভব। তিনি যা চান বিফলতার সঙ্গে তার সমর্থন, তিনি যা চান না সফলতার সঙ্গে তার সমর্থন অপেক্ষা অধিক তুচ্ছ বলে মনে হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত সফলতা ভিন্ন অন্য কিছুর প্রভাব জোরালো ও সুনির্দিষ্ট হলে ওইসব প্রভাব মেটানো না গেলে তার ক্ষমতানুভূতিতে কোনোরূপ আত্মতুষ্টি আসবে না। সফলতার জন্য উদ্দেশ্যের পরিবর্তন তার কাছে স্বধর্ম ত্যাগের মতোই, যা বর্ণিত হতে পারে শয়তানের পূজা হিসেবেই।

হিতকর ক্ষমতাপ্রীতি অবশ্যই ক্ষমতা ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হবে। আমি বলছি না যে ক্ষমতাপ্রীতি এর নিজের জন্য অবশ্যই হবে না, কারণ সক্রিয় বৃত্তির কোনো এক পর্যায়ে তা নিশ্চিতভাবেই আবির্ভূত হবে। আমি বলছি যে অন্য উদ্দেশ্যের সহায়ক না হলে তা অপূর্ণ থেকে যায়।

এটাই যথেষ্ট নয় যে, ক্ষমতা ছাড়া অন্য উদ্দেশ্য থাকা উচিত; উদ্দেশ্য এমন হবে যে তা অর্জিত হলে লোকের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সাহায্য করবে। যদি আপনি আবিষ্কার অথবা শৈল্পিক সৃষ্টি অথবা সাশ্রয়ী মেশিন আবিষ্কার অথবা এ পর্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন বিভিন্ন দলগুলোর ভেতর আপস মীমাংসার লক্ষ্য স্থির করেন তবে আপনি সফল হলে তা আপনার পাশাপাশি অন্য লোকের আকাঙ্ক্ষা পূরণের উপায় হয়ে দাঁড়াবে। দ্বিতীয় শর্তটি এই যে, উপকারী বৈশিষ্ট্য অর্জনের জন্য ক্ষমতাপ্রীতি অবশ্যই পূর্ণতা অর্জন করবে; সাধারণভাবে বলতে গেলে উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হলে প্রভাবিত ব্যক্তিদের আকাক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিছু উদ্দেশ্যের সঙ্গে অবশ্যই সম্পর্কযুক্ত হবে।

তৃতীয় শর্তটির স্পষ্ট রূপদান অপেক্ষাকৃত কঠিন। আপনার উদ্দেশ্য হাসিলের উপায় অবশ্যই এমন হবে না যে, ঘটনাক্রমে এর খারাপ প্রভাবগুলো অর্জিততব্য উদ্দেশ্যের শ্রেষ্ঠত্বকে অতিক্রম করে যায়। কর্ম ও ভোগের ফলস্বরূপ প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য এবং আকাক্ষা অবিরাম পরিবর্তনশীল। যারা এগুলো করে এবং যারা এগুলোর শিকার তাদের উভয়ের ক্ষেত্রে সহিংসতা ও অন্যায়ের জন্ম দেয়। পরাজয় পূর্ণ না হলে তা ক্রোধ ও ঘৃণার জন্ম দেয়। অপরপক্ষে তা পূর্ণ হলে অনীহা ও নিষ্ক্রিয়তার জন্ম দেয়। যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্যের প্রতি যতই ঔৎসুক্য থাকুক না কেন শক্তি বলে বিজয়লাভের ফলে নিষ্ঠুরতা ও পরাজিতদের প্রতি ঘৃণার জন্ম হয়। এসব আলোচনা থেকে যদিও এটা প্রমাণিত নয় যে, কোনো ভালো উদ্দেশ্যই শক্তি বলে অর্জন করা যায় না, তথাপি আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে শক্তি খুবই বিপজ্জনক এবং এর অতিশয় আধিক্যের ফলে দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তির আগেই যে কোনো ভালো উদ্দেশ্য দৃষ্টির অগোচর হয়ে যেতে পারে।

যা হোক, শক্তি ছাড়া সভ্য সমাজের অস্তিত্ব অসম্ভব। কারণ, সমাজে অসৎ ও সমাজবিরোধী স্বার্থান্বেষী মানুষ রয়েছে যারা নিয়ন্ত্রিত না হলে শিগগিরই অরাজকতায় ও বর্বরতায় প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করে তুলবে। যেখানে শক্তি এড়ানো যাবে না সেখানে অপরাধ আইন অনুসারে প্রতিষ্ঠিত কর্তৃপক্ষের দ্বারা আরোপিত হবে। যা হোক, এ ক্ষেত্রে দুটো অসুবিধা রয়েছে: প্রথমটি হচ্ছে বিভিন্ন রাষ্ট্রে শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারের মধ্যে। কারণ এ ক্ষেত্রে কোনো সাধারণ সরকার নেই, স্বীকৃত কোনো কার্যকরি আইন বা বিচার বিভাগীয় কর্তৃত্ব নেই; দ্বিতীয়টি এই যে, সরকারের হাতে শক্তি কেন্দ্রীভূত হলে সরকার সমাজের বাকি অংশের উপর স্বেচ্ছাচার চালানোর সামর্থ্যলাভ করবে। আমি পরবর্তী পরিচ্ছেদে এই অসুবিধাগুলো আলোচনা করব। এই পরিচ্ছেদে আমি ব্যক্তিগত নৈতিকতা সাপেক্ষে ক্ষমতার আলোচনা করব-সরকারের সাপেক্ষে নয়।

অভিলাসের মতো ক্ষমতাপ্রীতি এমন একটি শক্তিশালী প্রেরণা যে অধিকাংশ মানুষের কার্যকলাপের উপর এর প্রভাব তাদের অনুমিত প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশি। সুতরাং যুক্তি প্রদর্শন করা যেতে পারে যে, সবচেয়ে বেশি সুফল প্রদানকারী নীতিই ক্ষমতাপ্রীতির প্রতি যুক্তি-পরামর্শের চেয়ে বেশি শত্রুভাবাপন্ন। কারণ ক্ষমতান্বেষণের ক্ষেত্রে নিচের নীতিবিরুদ্ধ পাপের প্রতি মানুষের প্রবণতা রয়েছে। তবে বিধিগুলো কঠোর হলে তাদের কার্যকলাপ সঠিক হতে পারে। নীতিশাস্ত্রীয় মতবাদ প্রতিষ্ঠাকারী খুব কমই এ ধরনের বিবেচনার দ্বারা প্রভাবিত হবেন। কারণ প্রভাবিত হলে তিনি সদগুণের স্বার্থে সচেতনভাবে মিথ্যা ভাষণে বাধ্য হবেন। সত্যনিষ্ঠ হওয়ার চেয়ে নৈতিক উন্নয়নের আকাক্ষা প্রচারক ও শিক্ষাবিদের জন্য মৃত্যুবিশেষ এবং তত্ত্বগতভাবে এর বিরুদ্ধে যাই বলা হোক না কেন বাস্তবে তা ক্ষতিকর। আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে ক্ষমতাপ্রীতির জন্যেই মানুষ খারাপ কাজ করছে এবং করে যাবে। তথাপি বলা উচিত নয় যে, ক্ষমতাপ্রীতি অনাকাক্ষিত ওইসব ক্ষেত্রেও যেখানে রয়েছে এর কল্যাণধর্মী প্রয়োগ।

বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতাপ্রীতি মানুষের মেজাজ, সুযোগ-সুবিধা ও তার দক্ষতার উপর নির্ভরশীল; অধিকন্তু মেজাজ পরিবেশ দ্বারা গঠিত হয়। ব্যক্তিবিশেষের ক্ষমতাপ্রীতি বিশেষ খাতে চালনা করতে হলে তার জন্য সঠিক পরিবেশ, সঠিক সুযোগ-সুবিধা ও যথাযথ দক্ষতার ব্যবস্থা করতে হবে। এর ফলে চিকিৎসা সাপেক্ষে সুপ্রজননের অন্তর্ভুক্ত জন্মগত স্বভাব প্রশ্নাতীত হয়ে পড়ে। কিন্তু শুধু অল্প সংখ্যক লোকের উপরোক্ত উপায় অবলম্বনে প্রয়োজনীয় কার্যকলাপ বেছে নেয়া যাবে না।

এবার আলোচনা করা যাক মেজাজ প্রভাবিত করার পরিবেশ নিয়ে : নিষ্ঠুর তাড়নাগুলোর উৎস অভাগা শিশুকালে অথবা গৃহযুদ্ধের মতো অভিজ্ঞতার ভেতর দৃষ্ট হয়, যেখানে যন্ত্রণা এবং মৃত্যু প্রায়ই ঘটতে দেখা যায়। কৈশোরে এবং যৌবনের প্রাথমিক অবস্থায় শক্তির বৈধ নির্গমনের অভাবে একই জাতীয় প্রভাব থাকতে পারে। আমি বিশ্বাস করি যে পান্ডিত্যপূর্ণ প্রাথমিক শিক্ষা পেলে, সহিংসতাপূর্ণ পরিবেশে বসবাস না করলে এবং জীবন গঠনে অযৌক্তিক অসুবিধার সম্মুখীন না হলে অল্প মানুষই নিষ্ঠুর হতো। এসব শর্ত সাপেক্ষে অধিকাংশ লোকের ক্ষমতাপ্রীতি হিতকর অথবা নিদেনপক্ষে নির্দোষ নির্গমনের পথ বেছে নেয়।

ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটো দিক রয়েছে সুযোগ প্রশ্নটির : এটা গুরুত্বপূর্ণ। যে দস্যু, রাহাজানি অথবা স্বেচ্ছাচারী জীবন গঠনের সুযোগ থাকবে না। তবে অপেক্ষাকৃত কম ধ্বংসশীল পেশার সুযোগ থাকা উচিত। পশ্চাৎপদ সমাজের চেয়ে ক্রম অগ্রসরমান সমাজে তা অনেক বেশি সহজ। সম্পদের সঙ্গে নৈতিক স্তরের কোনো সম্পর্ক নেই যে সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে নৈতিক স্তরের পরিবর্তন হবে। আজকাল রাইন থেকে প্রশান্ত অঞ্চল পর্যন্ত সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির কঠোরতার প্রধান কারণ এই যে, বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী তাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে

দক্ষতার গুরুত্ব অনেক ক্ষমতাপ্রীতির স্বরূপ নির্ধারণে। সাধারণভাবে বলতে গেলে বিশেষ ধরনের আধুনিক যুদ্ধ ছাড়া ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দক্ষতার প্রয়োজন খুবই কম। কিন্তু গঠনমূলক কাজে সবসময়ই এর প্রয়োজন রয়েছে এবং উচ্চ পর্যায়ে এর প্রয়োজন অনেক বেশি। কঠিন দক্ষতা অর্জন করেছেন এমন অধিকাংশ মানুষ এর অনুশীলনে আনন্দ পান এবং সহজগুলোর চেয়ে এগুলোর অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কারণ অন্যান্য দিক একই হলে এই কঠিন দক্ষতা ক্ষমতাপ্রীতির জন্য অধিকতর তৃপ্তিদায়ক। যিনি উড়োজাহাজ থেকে বোমা নিক্ষেপের কৌশল শিখেছেন তিনি শান্তির সময়ে উন্মুক্ত নীরস পেশার চেয়ে এর অধিক গুরুত্ব দেবেন। কিন্তু যিনি সংক্রামক জ্বরের চিকিৎসা শিখেছেন তিনি যুদ্ধকালীন সার্জনের কাজের চেয়ে এর গুরুত্ব বেশি দেবেন। আধুনিক যুদ্ধে বড় রকমের দক্ষতার প্রয়োজন হয় এবং তা দক্ষ মানুষের কাছে যুদ্ধকে আকর্ষণীয় করে তোলে। শান্তি ও যুদ্ধকালীন অনেক বৈজ্ঞানিক দক্ষতার প্রয়োজন হয়; কোনো বৈজ্ঞানিক শান্তিবাদী ব্যক্তি এ কথার নিশ্চয়তা দিতে পারেন না যে, তার আবিষ্কার পরবর্তী যুদ্ধে ধ্বংসযজ্ঞ সহজতর করে তুলবে না। তা সত্ত্বেও শান্তির সময়ে এবং যুদ্ধে ব্যবহৃত দক্ষতার পার্থক্য রয়েছে। এ ধরনের পার্থক্য বজায় থাকলে কোনো মানুষের ক্ষমতাপ্রীতি অর্জিত দক্ষতার ক্ষেত্র অনুযায়ী তাকে শান্তিপ্রবণ করে তুলবে অথবা তাকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করবে। এমন বলা যাবে যে, ক্ষমতাপ্রীতি কোন পথে চালিত হবে তা নির্ধারণে কৌশলগত প্রশিক্ষণের ভূমিকা অনেক।

এ কথা সর্বতোভাবে সত্য নয় যে, যুক্তি-পরামর্শ এক জিনিস এবং শক্তি প্রয়োগ অন্য জিনিস। অনেক যুক্তি-পরামর্শ প্রত্যেকে অনুমোদন করলেও ওইগুলো প্রকৃতপক্ষে একপ্রকার শক্তিপ্রয়োগ। ধরুন আমরা আমাদের সন্তানদের বেলায় কি করি? আমরা তাদের বলি না যে কিছু মানুষ মনে করে পৃথিবী গোলাকার; কিন্তু অন্যান্য মানুষ মনে করে তা চেপ্টা; তুমি যখন বড় হবে তখন পারলে তুমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তোমার সিদ্ধান্ত ঠিক করে নেবে। এর পরিবর্তে আমরা তাদের বলি পৃথিবী গোলাকার যে বয়সে আমদের ছেলেমেয়েরা পরীক্ষা প্রমাণের উপযুক্ত হয় সে বয়সে আমরা তাদের মুক্ত চিন্তার দ্বার বন্ধ করে দেই। ফলে পৃথিবী চেপ্টা মতবাদের পক্ষে জোরালো যুক্তি পরামর্শ কোনোরূপ আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে না।