বুদ্ধ ও স্টয়েকের সময় থেকে আজ পর্যন্ত নৈতিকতাবাদী সবাই ভালো বলতে এমন কিছু বিবেচনা করেছেন যা সব মানুষ সমভাবে উপভোগ করতে পারে। তারা নিজেদের রাজপুত্র বা গ্রিক বা ইহুদি মনে করেননি বরং মানুষই ভেবেছেন। সব সময়ই তাদের নীতির দ্বিত্ব উৎস ছিল : একদিকে তারা নিজেদের জীবনে বিশেষ বিশেষ জিনিসের মূল্য দিতেন। অপরদিকে সহানুভূতিমূলক গুণ থাকার ফলে নিজেদের মতোই তারা অন্যদের জন্যও আশা করতেন। নীতিশাস্ত্রে সহানুভূতি একটি বিশ্বজনীন শক্তি; আমি মনে করি সহানুভূতি একটি আবেগ তত্ত্বীয় নীতি নয়। সহানুভূতি সহজাত একটি বিশেষ শিশু অন্য একটি শিশুর কান্নার দুঃখ পেতে পারে। কিন্তু সহানুভূতির সীমাবদ্ধতা প্রাকৃতিকও বটে। ইঁদুরের প্রতি বিড়ালের সহানুভূতি নেই। হাতি ছাড়া অন্য প্রাণীর প্রতি রোমানদের সহানুভূতি ছিল না। ইহুদিদের প্রতি জেন্টাইলদের এবং কুলকদের প্রতি স্ট্যালিনের কোনো সহানুভূতি ছিল না। সহানুভূতির সীমাবদ্ধতা থাকলে অনুরূপভাবে ভালোর ধারণা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ভালো এমন যা শুধু মহানুভব ব্যক্তিরা অথবা শুধু অতিমানব অথবা আর্য অথবা প্রলেতারীয় অথবা ক্রিস্টাডেলপীয়রা ভোগ করে থাকেন। এসব ইঁদুর-বিড়াল সম্পর্কজাত নীতিশাস্ত্রের কথা।
ইঁদুর-বিড়াল সম্পর্কজাত নীতিশাস্ত্রীয় কথার খণ্ডন বাস্তব, তাত্ত্বিক নয়। দুটোই এ ধরনের নীতিশাস্ত্রের উপযোগী হয়ে থাকে। ঝগড়াটে ছোট ছোট ছেলেদের মতো অনেকেই বলতে থাকে, চলো খেলা শুরু করি; আমি বিড়াল তুমি ইঁদুর। না না প্রত্যেকেই উত্তর দেয় তুমি না আমি বিড়াল হব। এভাবে ওরা সবাই পরিণত হয় ঝগড়াটে বিড়ালে। কিন্তু এর একজন পূর্ণ সফলতা অর্জন করতে পারলে সে তার নীতিকথা প্রতিষ্ঠা করতে পারে; আমরা তখন বাড়ি ভাড়া, সাদা মানুষের বোঝা অথবা নরভিক প্রতিযোগিতা অথবা এ ধরনের কিছু মতামত পেয়ে থাকি। এ ধরনের মতামতগুলো অপরিহার্যরূপে আকর্ষণ করে থাকে বিড়ালকেই, ইঁদুরকে নয়। এগুলো ইঁদুরের উপর আরোপিত নগ্ন ক্ষমতা।
নীতিশাস্ত্রীয় বিতর্ক প্রায়ই উপায় সম্পর্কিত-উদ্দেশ্য সম্পর্কিত নয়। দাস প্রথাকে এজন্য আক্রমণ করা যেতে পারে যে তা অ-অর্থনৈতিক নয়। স্বাধীন ছেলেমেয়েদের আলাপ-আলোচনা আগ্রহ উদ্দীপক-এ সত্যের উপর জোর দিয়ে মহিলাদের অধীনতার সমালোচনা করা হয়। নির্যাতনের জন্য দুঃখ করা হয় এজন্য যে, এর ফলে উদ্ভূত ধর্মীয় বিশ্বাস বৈধ নয়। যা হোক, এসব যুক্তির পেছনে সাধারণত উদ্দেশ্য সম্পর্কিত পার্থক্য বিদ্যমান। নিয়েজেকের যুদ্ধবাদ সম্পর্কিত সমালোচনার মতো উদ্দেশ্যের পার্থক্য নগ্নভাবে প্রতীয়মান হয়। খ্রিস্টীয় নীতিশাস্ত্রে সব মানুষ একই রকম। নিয়েজের বেলায় অধিকাংশই বীরের পাথেয়। প্রকৃত সত্যের প্রতি আবেদন সৃষ্টির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক বিতর্কের মতো উদ্দেশ্য সম্পর্কিত বিতর্ক চালানো যায় না। মানুষের অনুভূতির পরিবর্তনের প্রচেষ্টার মাধ্যমে অবশ্যই এগুলো চালাতে হবে। খ্রিস্টানরা অনুভূতি সৃষ্টির চেষ্টা চালাতে পারে। অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা প্রচারণা বৃদ্ধি করতে পারে। সংক্ষেপে এই প্রতিযোগিতা হচ্ছে ক্ষমতালাভের সাধারণ প্রতিযোগিতা। সার্বজনীন ক্ষমতায় শিক্ষাদানকারী কোনো ধর্মমত ও একটি সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী হয়ে ওঠার উপায়ে পরিণত হতে পারে। তখনই তা ঘটে থাকে যখন ফরাসি বিপ্লব অস্ত্রের বলে বিস্তার লাভ করার কাজ শুরু করে।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মতো নীতিশাস্ত্রীয় উদ্দেশ্য ক্ষমতা নয়। মানুষ যদিও একে-অপরকে ঘৃণা করেছে, শোষণ করেছে এবং অত্যাচার করেছে তারপরও নতুন জীবন পদ্ধতির প্রবর্তকদের প্রতি তারা তাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছে। প্রাচীনকালের জাতীয় এবং উপজাতীয় বিশ্বাসগুলোর স্থলে বিশ্বজনীনতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিবেদিত মহান ধর্মগুলো মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখেছে ইহুদি বা জেন্টাইল, অধীন বা স্বাধীন হিসেবে নয়। এগুলোর প্রবর্তকদের সহানুভূতি ছিল বিশ্বজনীন এবং মনে করা হতো যে এ মর্মে তাদের প্রজ্ঞা অস্থায়ী ও আবেগপ্রবণ স্বেচ্ছাচারী প্রজ্ঞা অতিক্রম করেছে। ফলাফল সম্পূর্ণরূপে প্রবর্তকদের আশানুরূপ হয়নি। পুলিশ উত্তেজিত জনতাকে অসহায় মানুষের উপর আক্রমণ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত। উত্তেজিত জনতা অসহায়দের জীবন্ত দগ্ধ দেখতে চাইলে যদি তাদের কেউ ধীর পরিত্যাগের মাধ্যমে প্রথমে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করার পর অগ্নিদগ্ধ হতো, তবে উন্মত্ততা প্রচণ্ড রূপ ধারণ করত। তা সত্ত্বেও বিশ্বজনীন সহানুভূতিমূলক নীতিমালা একের পর এক রাজ্য জয় করে নিত। অনুভূতির জগতে তা বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের নৈর্ব্যক্তিক ঔৎসুক্যের অনুরূপ, দুটোই মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। আমার মনে হয় না যে উপজাতীয় বা অভিজাত নীতিশাস্ত্রীয় তত্ত্বে প্রত্যাবর্তন দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। বুদ্ধের সময় থেকে মানবজাতির ইতিহাস বিপরীতমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। ধ্যানমগ্ন মুহূর্তে যা কিছু ভালো মনে হয় তা ক্ষমতা নয়। তা প্রমাণিত মানুষ যাকে স্বর্গীয় আত্মা মনে করেছে তার বৈশিষ্ট্য থেকেই।
এ অধ্যায়ের শুরুতে আলোচিত পিতামাতার প্রতি সন্তানোচিত আচরণ, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর বশ্যতা, রাজার প্রতি আনুগত্য ইত্যাদির মতো প্রথাগত নৈতিক বিধি আংশিক অথবা সম্পূর্ণভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছে। নৈতিক নিয়ন্ত্রণের অভাব হলে অধিকতর কঠোর নতুন আচরণবিধি এগুলোর স্থান দখল করে নেয়। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে আমাদের এ যুগে ইতিবাচক নৈতিকতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের ক্ষমতা অনেক বেশি। অবশ্যই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বৃদ্ধির পরিণতিস্বরূপ তা ঘটেছে। চার্চ ও পরিবারের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা কমে গেছে। কিন্তু আমি এর কোনো লক্ষণই দেখছি না যে অষ্টাদশ শতাব্দী অথবা মধ্যযুগের চেয়ে আমাদের এ যুগে নৈতিকতার প্রভাব রয়ে গেছে মানবীয় কার্যকলাপে।
