কম হলেও পৃথিবী গসপেলের কাছে ঋণী। তা কিছুটা দাসত্ব ও মহিলাদের অধীনতা প্রত্যাখ্যানকারীদের কাছে ঋণী। আমরা আশা করতে পারি যে ভবিষ্যতে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বর্জনকারীদের কাছে তা ঋণী হবে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে সহিষ্ণু প্রচারকদের কাছে তা ঋণী হবে। মধ্যযুগীয় চার্চের বিরুদ্ধে বিপ্লব, পুনর্জাগরিত রাজতন্ত্রে এবং বর্তমান প্রটোক্র্যাসি ক্ষমতার অচলাবস্থা নিরসনের জন্য প্রয়োজনীয়। এ কথা স্বীকার করে পৃথিবীকে অরাজতার দিকে ঠেলে না দিয়ে প্রয়োজন এগুলোর স্থান খুঁজে বের করা।
এখানে বিবেচনাধীন রয়েছে দুটো প্রশ্ন : প্রথমত ইতিবাচক নৈতিকতা ব্যক্তিগত নৈতিকতায় পরিণত করার জন্য কি হতে পারে এর দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞতাপূর্ণ মনোভাব? কোন মাত্রার শ্রদ্ধার জন্য ব্যক্তিগত নৈতিকতা ইতিবাচক নৈতিকতার কাছে দায়ী? কিন্তু এর যে কোনো একটি আলোচনার আগে প্রয়োজন ব্যক্তিগত নৈতিকতা বলতে কি বোঝায় তা আলোকপাত করা।
ব্যক্তিগত নৈতিকতা আলোচনা করা যেতে পারে ঐতিহাসিক ঘটনাবলি থেকে অথবা দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আলোচনা শুরু করি পূর্বোক্তটি দিয়েই।
ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান অনুযায়ী বলা যায়, প্রায় প্রতিটি ব্যক্তিই ঘৃণার চোখে দেখতেন বিশেষ বিশেষ কাজ। সাধারণ এসব কার্যকলাপ শুধু ব্যক্তিবিশেষের দ্বারাই নয় বরং ঘৃণিত হতো সম্পূর্ণ গোষ্ঠী, জাতি বা সম্প্রদায় কর্তৃক। কোনো কোনো ঘৃণার উৎস মানুষের জানা নেই আবার কোনো কোনো ঘৃণার উৎস ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ভেতর খুঁজে পাওয়া যেত। আমরা জানি কেন মোহাম্মদ (সাঃ)-এর অনুসারীরা কোনো প্রাণী বা মানুষের ছবি অংকন করে না। এর কারণ মোহাম্মদ (সাঃ) এমন করতে নিষেধ করেছেন তাদের। আমরা জানি কেন ইহুদিরা খরগোস খায় না। এর কারণ মুসা (আঃ)-এর আইন ঘোষণা করছে যে খরগোস অপবিত্র প্রাণী। এ ধরণের নিষেধাজ্ঞাগুলো গৃহীত হলে ওইগুলো ইতিবাচক নৈতিকতার আওতাভুক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু যে কোনোভাবে এগুলো জানা হয়ে গেলে তা পড়ে ব্যক্তিগত নৈতিকতার পর্যায়ে।
যা হোক, ইতিবাচক নৈতিকতা বলতে আমাদের কাছে ধর্মীয় অনুশাসনের চেয়ে বেশি কিছু মনে হয়। যেভাবে তা আমাদের কাছে পরিচিত তা সেকেলে নয়, কিন্তু এর কতগুলো উৎস রয়েছে বলে মনে হয়- চৈনিক বিজ্ঞ ব্যক্তি, ইহুদি নবী এবং গ্রিক দার্শনিক। কঠিন ব্যাপার ইতিহাসে তাদের গুরুত্ব নির্ণয় করা। সবাই কয়েক শতাব্দীর ভেতর বসবাস করে গেছেন। তাদের সবাই বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর অংশীদার যা তাদের পূর্বসূরিদের থেকে স্পষ্টভাবে পৃথক করেছে। প্রথা অথবা অন্য কারও পূর্বসূরিদের থেকে স্পষ্টভাবে পৃথক করেছে। প্রথা অথবা অন্য কারও জ্ঞানের মাধ্যমে নয় বরং নিজের জ্ঞানানুযায়ী লাওসি ও চুনসি চাও তাদের মতবাদ প্রচার করেন। তাদের মতবাদ বিশেষ কর্তব্য সংবলিত নয়, বরং বিশেষ চিন্তা ও অনুভূতি সংবলিত জীবন পদ্ধতি যা স্বাভাবিক হয়ে যায় কোনোরূপ নীতির প্রয়োজন ব্যতিরেকে। একই কথা বলা যেতে পারে প্রাচীন বৌদ্ধদের সম্বন্ধে। ইহুদি নবীরা আইন অতিক্রম করেন এবং নতুন ও অধিকতর অন্তর্মুখী গুণাবলি সমর্থন করেন। এই সমর্থনের ভিত্তি প্রথা নয়, বরং প্রভু এমন বলেছেন শব্দাবলির মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ। সক্রেটিস আত্মার আদেশ অনুযায়ী কাজ করেন-আইনানুগ কর্তৃপক্ষের আদেশ অনুযায়ী নয়। অন্তরের সুরের প্রতি মিথ্যা হওয়ার চেয়ে শহীদের মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতে তিনি প্রস্তুত। তাদের সময়ে এইসব মানুষ বিদ্রোহী ছিলেন এবং সবাই সম্মানিত হয়েছেন। এগুলোর ভেতর অবশ্যই বিবেচনাধীন রয়েছে নতুন কিছু। কিন্তু এই জিনিসটি কি তা সার্বিকভাবে সহজ নয় বলা।
এটা মনে হয় যে, নৈতিক প্রশ্নে মানবজাতির ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে নিজেকে উপস্থাপিত করা সবসময় অন্যায় হতে পারে না। আজকাল প্রত্যেকেই বিজ্ঞানে অনুরূপ মতবাদ গ্রহণ করেন। কিন্তু বিজ্ঞানে নতুন মতবাদ পরীক্ষা করার পদ্ধতি জ্ঞাত এবং শিগগিরই তা সাধারণভাবে গৃহীত হয়ে থাকে অথবা প্রথা ছাড়া অন্য কোনো কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়। নীতিশাস্ত্রের নতুন মতবাদ পরীক্ষা করার অনুরূপ কোনো পদ্ধতির অস্তিত্ব নেই। নবী তার উপদেশের প্রাথমিক উপস্থাপনায় প্রভু এমন বলেছেন কথাটি যথেষ্ট মনে করেন। কিন্তু অন্যান্য মানুষ কি করে বুঝবে যে তিনি দিব্যজ্ঞানপ্রাপ্ত হয়েছেন? বিজ্ঞানে প্রায়ই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত পরীক্ষার অনুরূপ পরীক্ষা ডিউটারনমি আশ্চর্যজনকভাবে প্রস্তাব করেন যে পূর্ব ধারণাতেই সফলতা রয়েছে। তিনি যদি অন্তরে অন্তরে তাকে বলে দেন তবে আমরা কি করে জানব প্রভু কোন কথাটি বলেননি। নবী যখন কিছু বলেন এবং কথা অনুযায়ী কাজ হয় না তখন বলা হয় যে প্রভু এ রকম বলেননি, বরং নবী তা অনুমান করেই বলেছিলেন। কিন্তু আধুনিক মানুষ খুব কমই এ ধরনের নীতিশাস্ত্রীয় পরীক্ষা গ্রহণ করে থাকে।
প্রশ্নের মোকাবেলা অবশ্যই করতে হবে আমাদের। নীতিশাস্ত্রীয় মতবাদ বলতে কি বোঝায় এবং কিভাবে তা পরীক্ষা করা যেতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে নীতিশাস্ত্র ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অধিকাংশ লোকের জন্য কর্তৃত্বই যথেষ্ট-চার্চ অথবা বাইবেলে বর্ণিত সত্য-মিথ্যাই তাদের কাছে আসল সত্য-মিথ্যা। কিন্তু সময় সময় বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিত্ব স্বর্গীয় প্রেরণা লাভ করেছেন–তারা জেনেছেন কোন জিনিস সত্য অথবা মিথ্যা। কারণ, প্রভু সরাসরি তাদের সাথে কথা বলেছেন। গোঁড়া মতবাদ অনুসারে এসব মানুষ অনেক আগেই চলে গেছেন এবং আধুনিক কোনো ব্যক্তি নিজেকে ওইরকম একজন বলে পরিচয় দিলে তাকে আশ্রয়দানে রাখাই শ্রেয় হবে যদি চর্চা তার ঘোষণা অনুমোদন না করে। যা হোক, এটাই হচ্ছে বিদ্রোহীদের স্বেচ্ছাচারী হওয়ার স্বাভাবিক অবস্থা এবং তা আমাদের সাহায্য করে না বিদ্রোহীদের বৈধ কার্যকলাপ নিরূপণে।
