আমরা দেখেছি যে, এ পর্যন্ত প্রায়ই ধর্মীয় উপাদান আনা হয়েছে রাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে ক্ষমতার মোকাবেলায়। যে সমাজ ব্যবস্থায় রাজা প্রতীকস্বরূপ বিদ্যমান তিনি সেই সমাজ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করে তুলেছেন। জাপান ও ইংল্যান্ডের মতো অনেক অর্ধসভ্য দেশে তা ঘটেছে। রাজা কোনো অন্যায় করতে পারেন না-ইংল্যান্ডে এই মতবাদটি রাজাকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু রাজার অস্তিত্ব না থাকলে মন্ত্রীদের যে ক্ষমতা থাকত এর অধীনে তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। যেখানে রাজতন্ত্র প্রথাগত সেখানে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই হচ্ছে রাজার প্রতি অপরাধ এবং গোড়া ব্যক্তিদের কাছে এগুলো পাপ ও অধর্ম। সাধারণতভাবে বলতে গেলে রাজতন্ত্র অবস্থা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কাজ করার মতো একটি শক্তি। এর চেয়ে উপযোগী কাজ হচ্ছে সামাজিক সংহতির অনুকূলে ব্যাপক অনুভূতি সৃষ্টি করা। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে এত কম সামাজিক যে অরাজকতা হচ্ছে একটি নিয়মিত বিপদ যার প্রতিরোধকল্পে রাজতন্ত্র অনেক কিছু করেছে। যা হোক, এই গুণের বিপরীতে তা প্রাচীন পাপ বাঁচিয়ে রাখা এবং ঈপ্সিত পরিবর্তন প্রতিরোধকল্পে শক্তিবৃদ্ধির দোষে দুষ্ট। অধুনা পৃথিবী পৃষ্ঠের অধিকাংশ স্থানে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটিয়েছে এই ত্রুটি।
অন্যান্য ক্ষমতার চেয়ে নৈতিকতার সঙ্গে যাজকয়ি ক্ষমতার সম্পর্ক অধিকতর স্পষ্ট। খ্রিস্টান দেশে ঈশ্বরের আরাধনার ভেতর সদ্গুণ নিহিত। কোন আদেশটি ঈশ্বরের তা একমাত্র যাজকই জানেন। আমরা দেখেছি যে মানুষের চেয়ে ঈশ্বরের আরাধনাই শ্রেয়-নীতিবাক্যটি বিপ্লবধর্মী। দুটো পরিস্থিতিতে তা সম্ভব–একটি হচ্ছে যখন রাষ্ট্র চার্চের বিরোধী; অন্যটি হচ্ছে, যখন ধরে নেয়া হয় যে ঈশ্বর সরাসরি মানুষের বিবেকের সাথে কথা বলেন। পূর্বোক্ত অবস্থা কনস্টেন্টাইনের আগে বিদ্যমান ছিল এবং শেষোক্ত অবস্থা এনাবেপ্টিস্ট এবং স্বাধীনচেতাদের ভেতর বিরাজমান ছিল। স্বাধীন অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত প্রথাগত চার্চ বিদ্যমান থাকাকালে ইতিবাচক নৈতিকতা ব্যক্তিবিশেষের বিবেক ও ঈশ্বরের মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হয়। এর গ্রহণযোগ্যতা চলাকালে এর ক্ষমতা অনেক বেশি এবং চার্চের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি দোষণীয় মনে করা হয়। তা সত্ত্বেও চার্চের অসুবিধা রয়েছে, কারণ যদি চার্চ নিদারুণভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করে তবে মানুষ সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করবে যে তা কি সঠিকভাবে ঈশ্বরের ইচ্ছায় বিশ্লেষণ করতে পারছে। যখন এই সন্দেহ সাধারণভাবে বিস্তার লাভ করে তখন চার্চ সংক্রান্ত সব প্রাসাদ চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যায়। এমনটি ঘটেছিল সংস্কার আন্দোলনের সময় টটনিক দেশগুলোতে।
চার্চের ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও নৈতিকতার সম্পর্ক বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত আলোচিত ক্ষমতা ও নৈতিকতার সম্পর্কের কিছুটা বিপরীত। পিতামাতা, স্বামী ও রাজার প্রতি বাধ্য থাকার জন্য ইতিবাচক নৈতিকতার নির্দেশ, কারণ, তারা শক্তিশালী; কিন্তু নৈতিক কর্তৃত্বের জন্য চার্চ শক্তিশালী। যা হোক তা শুধু একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সত্য। চার্চ নিরাপদ হলে পিতামাতা, স্বামী বা রাজার প্রতি আনুগত্যের নৈতিকতার মতো চার্চের প্রতি আনুগত্যের নৈতিকতা বেড়ে যায়। অনুরূপভাবে অধীনতামূলক নৈতিকতা প্রত্যাখ্যান করা হয়। বিরুদ্ধ মতবাদ এবং অনৈক্য চার্চের কাছে বিশেষভাবে ঘৃণ্য। তাই এগুলো বিপ্লবী কার্যক্রমের অপরিহার্য উপাদান। যাজকীয় ক্ষমতার বিরোধিতার ফলাফল আরও জটিল। চার্চ নৈতিক বিধিগুলোর অফিসিয়াল অভিভাবক। ফলে এর বিরোধীরা নৈতিক মতবাদ এবং পরিচালনার দিক থেকে এর বিরোধিতা করবেন। তারা পিউরিটানদের মতো আরও কঠোরতার সঙ্গে এবং ফরাসি বিপ্লবীদের মতো আরও শৈথিল্যের সঙ্গে বিদ্রোহ করতে পারে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই নৈতিকতা একটি ব্যক্তিগত বিষয়-আগের মতো একটি অফিসিয়াল সিদ্ধান্তের বিষয় নয়।
এটা অবশ্যই করা উচিত নয় যে, অপেক্ষাকৃত কম কঠোর হলেও অফিসিয়াল যাজকীয় নৈতিকতার চেয়ে ব্যক্তিগত নৈতিকতা নিকৃষ্ট। খ্রিস্টপূর্ব যষ্ঠ ডেলপিতে দৈববানী এই জনহিতকর সংস্কার কাজ স্তিমিত করে দেয় এবং পুরনো ব্যক্তির মৃত স্ত্রীর বোনকে বিবাহ করা অনুমোদনযোগ্য মনে করে তখন চার্চ তার ক্ষমতা সাপেক্ষে পুরনো বিধি-নিষেধ বলবৎ করে।
চার্চ যেখানে ক্ষমতা হারিয়েছে সেখানে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে নৈতিকতা প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তিগত হতে পারেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা জনমত অর্থাৎ সাধারণ প্রতিবেশি এবং চাকরিদাতাদের মতো প্রদর্শিত হচ্ছে ক্ষমতাবানদের মতামতের মাধ্যমে।
এ পরিবর্তন পাপীদের দৃষ্টিকোণ থেকে তুচ্ছ ও অধিকতর খারাপ হতে পারে। যেখানে ব্যক্তিগত প্রাপ্তি পাপীর নয় বরং বিচারকের মতো, তিনি সেখানে আনুষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক আদালতের অংশবিশেষ। তিনি কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে নিতে বাধ্য চার্চ শক্তিশালী হলে। দৃঢ় নৈতিক অনুভূতিসম্পন্ন প্রটেস্ট্যান্টরা যাজকীয় নৈতিক ক্রিয়াকলাপ অন্যায়ভাবে আত্মস্থ করেছে এবং অন্যান্য মানুষের দোষ-গুণ বিশেষত দোষের প্রতি প্রায় পোষণ করে সরকারি মনোভাব।
