একই জিনিস ঘটত মহিলাদের অধীনতার ব্যাপারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষ প্রাণীদের শ্রেষ্ঠশক্তি স্ত্রী প্রাণীদের ক্রমাগতভাবে অধীন করে নিতে পারে না। কারণ, উদ্দেশ্যের দিক থেকে পুরুষদের যথেষ্ট দৃঢ়তার অভাব রয়েছে। মানবজাতির ভেতর সভ্যতার কোনো এক স্তরে স্ত্রীলোকের অধীনতা বর্বর সমাজের চেয়ে অনেক বেশি পূর্ণাঙ্গ ছিল এবং সবসময়ই এই অধীনতা নৈতিকতার সাহায্যে শক্তি লাভ করে। সেন্ট পল বলেছেন, পুরুষ ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব ও গৌরব কিন্তু মহিলারা পুরুষের গৌরব। কারণ পুরুষ স্ত্রীলোকের নয় বরং স্ত্রীলোক পুরুষের। কোনো পুরুষই স্ত্রীলোকের জন্য সৃষ্টি হয়নি বরং স্ত্রীলোক পুরুষের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং স্ত্রী তার স্বামীকে মেনে চলবে। স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর ভেতর অবিশ্বস্ততা নিকৃষ্ট পাপ। এটা সত্য যে, তত্ত্বগতভাবে খ্রিস্টধর্মে পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ের বেলা ব্যভিচার সমান পাপ। এই পাপটি ঈশ্বরের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবে সম্ভব হয়নি। এমনকি খ্রিস্টপূর্ব যুগেও তা তত্ত্বগতভাবে ছিল না। বিবাহিত মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার দুষ্কর্মের ছিল। কারণ অপরাধটি ছিল তার স্বামীর বিরুদ্ধে। কিন্তু মহিলারা ও যুদ্ধবন্দিরা ছিল তাদের প্রভুর বৈধ সম্পদ। তাই তাদের সাথে যৌনমিলন দুষ্কর্মের ছিল না। এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না খ্রিস্টান ধার্মিক দাস মালিকদের। তা ছিল না ঊনবিংশ শতাব্দীর আমেরিকাতেও।
পুরুষ ও মহিলাদের নৈতিকতার পার্থক্যের ভিত্তি ছিল ক্ষমতার দিক থেকে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব। মূলত শ্রেষ্ঠত্ব শুধু কায়িক দিক থেকেই ছিল। কিন্তু এই ভিত্তি থেকে তা ক্রমে অর্থনীতি, রাজনীতি ও ধর্মনীতিতে সম্প্রসারিত হয়। পুরুষের উপর নৈতিকতার বড় ধরনের সুবিধা এক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট বলে মনে হয়। কারণ, অতি আধুনিককালেও মহিলারা বিশ্বাস করতেন পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব বাস্তবায়নকারী নৈতিক শিক্ষায়। ফলে প্রয়োজন পড়ত অপেক্ষাকৃত কম বাধ্যবাধকতার।
আইনপ্রণেতার দৃষ্টিতে মহিলাদের গুরুত্বহীনতার একটি আকর্ষণীয় ব্যাখ্যা পাওয়া যায় হামুরাব্বি বিধিতে। কোনো ভদ্রলোকের সন্তানসম্ভবা মেয়েকে আঘাত করার ফলে মেয়েটি মারা গেলে আঘাতকারীর মেয়ের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় প্রদান করা হয়। ভদ্রলোক ও আঘাতকারীর পক্ষে এটাই ন্যায়। যে মেয়েটি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে সে শুধু শেষোক্ত ব্যক্তির অধিকারভুক্ত এবং তার নিজের বাঁচার অধিকার নেই। ভদ্রলোকের মেয়েকে খুন করায় আঘাতকারী ভদ্রলোকের কাছে অপরাধী-মেয়েটির কাছে নয়। মেয়েদের অধিকার ছিল না, কারণ তারা ছিল ক্ষমতাহীন। ১ম জর্জ পর্যন্ত রাজারা শ্রদ্ধেয় ছিল ধর্মীয় দিক দিয়ে।
Theres such divinity doth hedge a king that treason can but peep thing it would. Acts little of it will.
এমনকি বিশ্বাসঘাতকতা শব্দের ভেতর অধার্মিকতার গন্ধ রয়েছে REPUB LIC বইয়েও। ইংল্যান্ডে রাজকীয় ঐতিহ্যের দ্বারা সরকার লাভবান হন। ভিক্টোরীয় যুগে রাজনীতিবিদরা, এমনকি গ্লেডস্টোনও ভাবতেন যে এটা দেখা তাদের কর্তব্য যে রানী কখনও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া থাকবেন না। আজকাল অনেকেই ভাবেন যে কর্তৃপক্ষের প্রতি বশ্যতা সার্বভৌমত্বের প্রতি বশ্যতার শামিল। এটা একটি ক্রমহাসমান অনুরাগ। কিন্তু এই অনুরাগ হ্রাস পেলে সরকারের স্থিতিশীলতা হ্রাস পায় এবং বেড়ে যায় ডান অথবা বামের একনায়কত্বের সম্ভাবনা।
এখনও বেইজহাটের ইংলিশ সংবিধান বইটি পড়াশোনার জন্য একটি মুল্যবান বই। তাতে এভাবে শুরু হয়েছে রাজতন্ত্রের আলোচনা
রানীর উপকারিতা মর্যাদাপূর্ণ ক্ষমতার দিকদিয়ে বর্ণনাতীত। তাকে ছাড়া ইংল্যান্ডের বর্তমান ইংলিশ সরকার ব্যর্থ হবে। রানী উইন্ডসরের স্লোপে ভ্রমণ করেছেন, ওয়েলসের রাজকুমার ডারভিতে গিয়েছিলেন-এগুলো পড়ে অনেকেই কল্পনা করে যে, অনেক ছোট জিনিসের বেলাও অনেক চিন্তা এবং খ্যাতির গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা রয়েছেন ভুলের মধ্যেই। এটা খুঁজে বের করা ভালো যে কিভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ হলো একজন বিধবা এবং বেকার যুবকের কার্যকলাপ।
রাজতন্ত্র ভালো সরকার হওয়ার পেছনে সবচেয়ে জোরালো কারণটি হচ্ছে যে, এটা একটি বোধগম্য সরকার। একে বুঝতে পেরেছে মানবজাতি। কিন্তু বিশ্বে এরা খুব কমই অন্যদের বুঝতে পেরেছে। প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, কল্পনাশক্তির দ্বারাই মানুষ শাসিত হচ্ছে; কিন্তু এর চেয়েও সত্য যে, মানুষ শাসিত হচ্ছে কল্পনার দুর্বলতার দ্বারাই।
এটি সত্য ও গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক বন্ধন সহজ করে তোলে রাজতন্ত্র। কারণ, ব্যক্তিবিশেষের প্রতি আনুগত্য তত কঠিন নয়। দ্বিতীয়ত রাজতন্ত্র এর দীর্ঘ ইতিহাসে যে শ্রদ্ধা মিশ্রিত অনুরাগ পুঞ্জীভূত করেছে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এর সঞ্চার অসম্ভব। কোথাও বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র অবলুপ্ত হলে স্বভাবত এর স্থলে শিগগির অথবা বিলম্বে এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় : গ্রিসে স্বেচ্ছাচারী, রোমে সম্রাট, ইংল্যান্ডে ক্রমওয়েল, ফ্রান্সে নেপোলিয়ন ও এবং আমাদের সময়ে স্ট্যালিন ও হিটলার। এ ধরনের মানুষ অর্জন করেন আগের রাজতন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনুভূতির অংশবিশেষ। প্রাচীন ও ঐতিহ্যগত পরম রাজতন্ত্রে যথোচিত আনুগত্যের অনুরূপ রাশিয়ার বিচারলয়ে অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির ভেতর শাসকের প্রতি আনুগত্য গ্রহণ এক মজাদার ব্যাপার। নতুন একনায়ক অসাধারণ ব্যক্তিত্বশীল না হলে খুব কমই সফল হবেন অতীতে বংশানুক্রমিক রাজপুরুষদের উপভোগকৃত ধর্মীয় শ্রদ্ধাবোধ সঞ্চারে।
