ব্যক্তিগত নৈতিকতার চেয়ে ইতিবাচক নৈতিকতা পুরনো এবং সম্ভবত পুরনো আইন ও সরকারের চেয়েও। মূলত তা ছিল উপজাতীয় প্রথা এবং ক্রমে তা থেকে গঠিত হয়েছে আইন। অতি প্রাচীন সমাজে দৃষ্ট বিবাহ সম্পর্কে অসাধারণ বিস্তৃত নিয়ম-কানুন আলোচনা করা যাক। আমাদের কাছে মনে হয়েছে এগুলো নিয়ম মাত্রই; কিন্তু তাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র যারা এগুলো গ্রহণ করে। এগুলোর নৈতিক শক্তি বিদ্যমান অজাচারী যৌনমিলনের ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধের মতোই। এগুলোর উৎস অস্পষ্ট, কিন্তু এক অর্থে সন্দেহাতীতভাবে ধর্মীয়। ইতিবাচক নৈতিকতার এই অংশটুকু সামাজিক অসমতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয় বলে মনে হয়। এটা ব্যতিক্রমধর্মী ক্ষমতা অর্পণ করে না বা এর মেনে নেয় না অস্তিত্ব। আজও সভ্য সমাজে রয়েছে এ ধরনের নৈতিক বিধি। গ্রিক চার্চ একই সন্তানের দেব পিতাদের ভেতর বিবাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে–এ ধলনের বিধি-নিষেধ কোনোরূপ সামাজিক উদ্দেশ্যই পূর্ণ করছে না। এর উৎস একমাত্র ধর্মতত্ত্বেই রয়েছে। মূলত কুসংস্কার ছিল এখনকার অনেক যুক্তিনির্ভর বিধি-নিষেধই। প্রেতাত্মার শত্রুতার জন্য হত্যা আপত্তিজনক-এ ধরনের আপত্তি শুধু হত্যাকারীরই নয় বরং প্রদর্শিত হতো হত্যাকারীর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও। তাই এ বিষয়ে সমাজের স্বার্থ জড়িত ছিল শাস্তিও শুদ্ধিকরণ আধ্যাত্মিক গুরুত্ব লাভ করে এবং দেখা দেয় অনুশোচনা ও মুক্তিদানের রূপলাভের সম্ভাবনা। কিন্তু এর মূল আনুষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য এখন এভাবে স্মরণ করা হয়, মেষশাবকের রক্তে বিধৌত।
আমি আলোচনা করতে চাই না ইতিবাচক নৈতিকতার এ ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও। আমি ক্ষমতার সহায়ক গৃহীত নৈতিক বিধির ওই দিকগুলো আলোচনা করতে চাই। সাধারণত প্রথাগত নৈতিকতার (বহুলাংশে অচেতন) অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থা সক্রিয় করে তোলা। সফল হলে এ উদ্দেশ্য অর্জিত হয় পুলিশ বাহিনীর চেয়ে সহজে ও অধিকতর কার্যকরি পন্থায়। কিন্তু তা ক্ষমতা পুনর্বণ্টনের প্রত্যাশায় সিক্ত বিপ্লবী ক্ষমতার মুখোমুখি হতে বাধ্য। এই পরিচ্ছেদে আমি প্রথমত আলোচনা করব নৈতিক আচরণবিধির উপর ক্ষমতার প্রভাব নিয়ে এবং পরে দেখাব যে খুঁজে পাওয়া যায় কি-না নৈতিকতার অন্য কোনো ভিত্তি।
নৈতিক ক্ষমতার স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে পৌনঃপুনিক অভ্যাসের মাধ্যমে বাধ্য থাকার মনোভাব সৃষ্টি। পিতামাতার প্রতি সন্তান, স্বামীর প্রতি স্ত্রী, প্রভুর প্রতি ভৃত্য, রাজার প্রতি প্রজা এবং (ধর্মীয় ক্ষেত্রে) যাজকের প্রতি অজ্ঞের বাধ্য থাকা কর্তব্য। ধর্মীয় আদর্শ এবং সেনাবাহিনীতে আরও বিশেষ কর্তব্যপরায়ণতা। বিদ্যমান ছিল। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমান্তরালে প্রবহমান এগুলোর প্রতিটির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
আলোচনা করা যাক পিতামাতার প্রতি সন্তানোচিত আচরণ দিয়েই। বর্তমান যুগে এমন অসভ্য রয়েছে যে যখন তাদের পিতামাতা বৃদ্ধাবস্থায় কাজের অনুপযোগী হয়ে পড়ে তখন খাদ্য হিসেবে তাদের বিক্রি করে দেয়া হয়। সভ্যতার অগ্রগতির কোনো এক পর্যায়ে স্বাভাবিক অগ্রিম চিন্তাশীল কোনো ব্যক্তির মাথায় অবশ্যই এমন চিন্তা আসে যে শৈশব অবস্থায় তাদের সন্তানদের ভেতর এ ধরনের মানসিক অবস্থা সৃষ্টি করা যেতে পারে যা বৃদ্ধাবস্থায় তাকে জীবিত রাখতে সাহায্য করবে; নিঃসন্দেহে তিনি ওই ব্যক্তি যার পিতামাতা ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছেন। তিনি তার বিরোধী মতবাদ সমর্থন করার জন্য দল গঠনের উদ্দেশ্যে দূরদর্শিতামূলক চেতনায় আবেদন রেখেছিলেন কি-না আমার সন্দেহ। আমার সন্দেহ হয় যে, তিনি মনোযোগ আকর্ষণ করেন মানবাধিকারের প্রতি প্রধানত ফলমূল জাতীয় খাদ্যের সুবিধাদির প্রতি, ছেলেমেয়েদের মঙ্গলার্থে শ্রমের ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছেন এমন বৃদ্ধ লোকের দোষহীনতার দিকে। সম্ভবত ওই সময় কৃশ বয়োজ্যেষ্ঠ ও অস্বাভাবিক বুদ্ধিমান কোনো ব্যক্তি ছিলেন যার পরামর্শ তার মাংসের চেয়েও মূল্যবান অনুভূত হলো। যা হোক এমন হতে পারে যে, কারও পিতামাতাকে খাওয়ার চেয়ে সম্মান প্রদর্শন করা উচিত বলে অনুভূত হলো। আমাদের কাছে অতিরঞ্জিত বলে মনে হয় প্রাচীন সভ্যতায় পিতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই লাভজনক প্রথার অবসানের লক্ষ্যে অতি শক্তিশালী বাধা সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল। সুতরাং আমরা দেখতে পাই যে, TEN COMMANDMENT-এর পরামর্শ হচ্ছে যদি তুমি তোমার পিতামাতাকে শ্রদ্ধা করতে ব্যর্থ হও তবে অল্প বয়সেই তুমি মারা যাবে। রোমানরা পিতৃহত্যাকে সবচেয়ে নৃশংস অপরাধ মনে করত এবং কনফিউসীয়রা মনে করত যে, পিতামাতার প্রতি সন্তানোচিত ব্যবহার করাই নৈতিকতার বুনিয়াদ। ছেলেমেয়েদের অসহায় শৈশবাবস্থার পরও তাদের উপর পৈতৃক কর্তৃত্ব স্থায়ী করার জন্য এগুলোই সহজাত ও অচেতন ব্যবস্থা। সম্পত্তির স্বত্বাধিকারের দ্বারা পিতামাতার কর্তৃত্ব অবশ্যই বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু পিতামাতার প্রতি সন্তানোচিত আচরণের অস্তিত্ব না থাকলে যুবকরা তাদের পিতামাতা দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর তাদের দল বা গোষ্ঠীর উপর পিতামাতার নিয়ন্ত্রণ রাখতে দিত না।
