এ কথা সত্য যে, স্বর্ণযুগের আগমনে বিশ্বাসীদের মধ্যে অধিকতর দ্র ব্যক্তিরাও রয়েছেন। এমন অনেকেই আছেন যারা বিশ্বাস করেন যে, মানুষের ভেতর যা কিছু সর্বোত্তম তা মানুষের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসবে, আরোপিত হবে না কোনো কর্তৃপক্ষের দ্বারা। বন্ধুসমাজ দ্বারা এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করা যায়। এমন অনেকেই আছেন যারা মনে করেন যে, বদান্যতাপূর্ণ ও বিজ্ঞতাপূর্ণ পরামর্শ অনুযায়ী বাহ্যিক প্রভাবগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী হতে পারে, কিন্তু কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের সহায়ক হবে না। এ ধরনের ব্যক্তিরা উৎসাহী সংস্কারক হওয়া সত্ত্বেও প্রচারণার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হতে পারেন।
অন্য এক ধরনের সংস্কারক অস্তিত্ব লাভ করেছে বিবর্তন সাধারণভাবে গৃহীত হওয়ার পর। সিনডিকেলিস্ট দিনগুলোতে সরেলকে আমরা দৃষ্টান্ত হিসেবে নিতে পারি। এ ধরনের মানুষ মনে করেন যে, মানবজীবন হচ্ছে একটি ক্রম অগ্রগতির ধারা। তা বিশেষ লক্ষ্যে ধাবিত নয় এবং অগ্রগতি সাধিত হওয়ার আগে এ সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে কিছুই বলা যাবে না। কিন্তু তা এমন ধরনের যে প্রতিটি স্তরে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে বলে দেখা হয়। না দেখার চেয়ে দেখা ভালো; কিন্তু যে। পর্যন্ত সব প্রাণীই অন্ধ ছিল সংস্কারের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে দৃষ্টিক্ষমতা অর্জনের প্রস্তাব তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তা সত্ত্বেও প্রকৃত সত্য যে অতীত দর্শনের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে একটি স্থিতিশীল সংরক্ষণশীলতা ভুল হতে বাধ্য। সব সংস্কার কর্ম অবশ্যই উৎসাহিত হবে। কারণ আমরা না জানলেও বাস্তবায়িত হবে মূল নীতি।
আমি এখন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করব প্রচারণার স্বাধীনতা সম্পর্কে। প্রাচীনযুগের সহনশীলতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে গিবন বলেছেন, রোমান বিশ্বে বিভিন্ন উপাসনা পদ্ধতি জনগণ কর্তৃক সমভাবে সত্য বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু দার্শনিক এগুলো একইভাবে মিথ্যা এবং ম্যাজিস্ট্রেটরা সমভাবে উপকারী মনে করতেন। যে দার্শনিক সম্বন্ধে আমি ভাবছি তিনি এতটুকু বলতে যাবেন না যে বিরাজমান সব ধর্মমতই সমভাবে মিথ্যা। কিন্তু তিনি তাও বলতে যাবেন না যে, এর একটি মিথ্যা থেকে মুক্ত অথবা দৈবাৎ মুক্ত হয়ে থাকলেও এই সৌভাগ্যপূর্ণ সত্যটি মানবমনের দক্ষতাপূর্ণ বিভাগ কর্তৃক অনাবিস্কৃত হতে পারত। অদার্শনিক প্রচারকের কাছে তার নিজস্ব প্রচারণাটিই সত্য এবং বিপরীত প্রচারণাটি মিথ্যা। যদি তিনি উভয়টি অনুমোদন দানে বিশ্বাস করেন তবে তা শুধু এ কারণে যে তিনি নিষিদ্ধকরণের ফলে ভুক্তভোগী হওয়ার ভয়ে ভীত। দার্শনিক ব্যক্তিটির কাছে ব্যাপারটি এত সহজ নয়।
প্রচারণার কি ব্যবহার হতে পারে দার্শনিক ব্যক্তির কাছে? পেশাদার প্রচারকের মতো তিনি বলতে পারেন না : পিন প্রস্তুত করার জন্য পিন ফ্যাক্টরির অস্তিত্ব রয়েছে এবং মতামত গঠনের জন্য রয়েছে মতামত ফ্যাক্টরি। গঠিত মতামত দুটো পিনের মতামত হলে এবং দুটোই ভালো হলে কি হতো? বৃহদায়তন উৎপাদন ব্যবস্থায় একচেটিয়া অধিকারের ফলে প্রতিযোগিতাশীল ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদন ব্যবস্থার চেয়ে সস্তা সামগ্রী উৎপাদনে সক্ষম হলে উভয় ক্ষেত্রে একই কারণে একচেটিয়া প্রয়োজন অনুভূত হয়। শুধু তাই নয়, সাধারণ প্রতিযোগী মতামত ফ্যাক্টরি প্রতিযোগী পিন ফ্যাক্টরির মতো ভিন্ন মতামত সৃষ্টি করে না, যা ভালো হতে পারে। তা এ রকম মতামত গঠন করে যা আমার ফ্যাক্টরি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত। তাই সমাজে আমার ফ্যাক্টরির উৎপাদিত সামগ্রীর যোগান বজায় রাখার জন্য প্রভূত পরিমাণে কাজ বৃদ্ধি করে দেয়। এ কারণেই নিষিদ্ধ করতে হবে প্রতিযোগিতাশীল ফ্যাক্টরিগুলো। আমি বলছি এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারেন না দার্শনিক। তিনি বলবেন যে প্রচারণা অবশ্যই অন্ধ বিশ্বাস সৃষ্টি করবে না, বরং তা বিচার, যুক্তিসিদ্ধ সংশয়ে এবং বিরুদ্ধ মতবাদের ভেতর তুলনামূলক গুরুত্ব নিরূপণে ক্ষমতা যোগাবে। প্রচারণা প্রতিযোগিতায় সুযোগ থাকলেই এই উদ্দেশ্য সফল হবে। তিনি জনসাধারণকে বিচারকের সঙ্গে তুলনা করে দেখতে চান। বিচারক কোনো সমস্যায় বিচার্য বিষয়ে উভয় পক্ষের যুক্তি-পরামর্শ শুনে থাকেন। কিন্তু অপরাধ আইনে এক পক্ষের যুক্তি-পরামর্শ শুনে রায় প্রদান করার মতো একচেটিয়া প্রচারণাও অযৌক্তিক। সুতরাং সঙ্গতিপূর্ণ প্রচারণার পরিবর্তে তিনি প্রত্যেক প্রশ্নে সবার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য প্রচারের পক্ষে ওকালতি করবেন যাতে জনগণ ভিন্ন ভিন্ন মতামত শোনার পর আপন মতামত গঠন করতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন পার্টির স্বার্থে পরিচালিত ভিন্ন ভিন্ন পত্রিকার পরিবর্তে সব পার্টির স্বার্থে নিবেদিত একটি পত্রিকার পক্ষে তিনি ওকালতি করবেন। বুদ্ধিবৃত্তিক সুবিধা স্বাধীন বিতর্কে খুবই স্পষ্ট। তাই স্বাধীন বিতর্কে প্রতিযোগিতামূলক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ আবশ্যিক নয়। বি.বি.সি. বিতর্কের সুযোগ দিয়ে থাকে। প্রতিদ্বন্দ্বী সব বৈজ্ঞানিক মতবাদ রাজকীয় সমাজে বর্ণণা করা যেতে পারে। জ্ঞানী ব্যক্তিরা যৌথ প্রচারণা সমর্থন করেন না, কিন্তু সদস্যরা যাতে নিজ নিজ মতামত প্রকাশ করতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেন। কোনো একক সংগঠনে এ ধরনের আলোচনা মৌলিক বিরত ঐকমত্যের নিদর্শন। মিসরীয় পুরাতত্ত্ববিদ তার প্রতিদ্বন্দ্বী পুরাতত্ত্ববিদের বিরুদ্ধে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে যাবেন না। যে সমাজে সরকার সম্বন্ধীয় মৌল বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত সেখানে মুক্ত আলোচনা সম্ভব। কিন্তু যেখানে এ ধরনের মতৈক্য নেই মনে হয় প্রচারণা সেখানে শক্তি ব্যবহারের ভূমিকাস্বরূপ অবতীর্ণ হয়। যাদের অধিকারে শক্তি রয়েছে তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রচারণায় একচেটিয়া অধিকার লাভ করতে চায়। একটি সরকারের অধীনে শান্তিপূর্ণ সহযোগিতা অসম্ভব না হলে সেখানে মতপার্থক্য সংবলিত স্বাধীন প্রচারণা সম্ভব। ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে পটেস্ট্যান্ট কাথলিক রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, কিন্তু অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে পেরেছে। এ কারণেই ওই সময়ে সম্ভব হয়ে ওঠে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা। একটি স্থিতিশীল সরকার কাঠামো জরুরি মুক্তবুদ্ধির জন্য; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা অত্যাচারের মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। এই সমস্যার সমাধান প্রধানত নির্ভরশীল সরকার পদ্ধতির উপর।
১৫. ক্ষমতা ও নৈতিক বিধি
যে কোনোভাবে নৈতিকতার দুটো দিক বিদ্যমান ইহুদি নবীদের সময় থেকেই : একটি আইনের অনুরূপ; অপরটি ব্যক্তিবিশেষের বিবেক। পূর্বোক্তটি ক্ষমতার অংশবিশেষ, শেষোক্তটি প্রায়ই বিপ্লবধর্মী। আইনের অনুরূপ দিকটি ইতিবাচক নৈতিকতা, অন্যটি ব্যক্তিগত নৈতিকতা। আমি এই পরিচ্ছেদে আলোচনা করার ইচ্ছা রাখি দুই ধরনের নৈতিকতার পরস্পরের মধ্যকার এবং এগুলোর সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক।
