আমি মনে করি না যে সরকারের উচিত হবে কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্য প্রেরণামূলক প্রচার চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া। এক্ষেত্রে প্রচারণায় অতি অল্প লোকের পরিবর্তন হলেও অনুমোদিত কাজ বাস্তবায়িত হয়ে যেতে পারে। আইনত মৃত্যুদণ্ড প্রদান ছাড়া নাগরিকদের জীবন রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু কারো হত্যার লক্ষ্যে আন্দোলন সংঘটিত হলে তার জীবন রক্ষা করা মুশকিল। WELIMER প্রজাতন্ত্রে এ বিষয়ে মাত্রাধিক শিথিল ছিল। কিন্তু আমি মনে করি না যে, কোনো স্থিতিশীল সরকারের পক্ষে উচিত আইনত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার যোগ্য একশ্রেণির লোকের মৃত্যুদন্ডের লক্ষ্যে আন্দোলন নিষিদ্ধ করা। কারণ এ ধরনের আন্দোলন আইনের প্রতি কোনো ভীতি প্রদর্শন করে না।
সরকারি দৃষ্টিকোণ থেকেও রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ না হলে কোনো মতের উপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। যদি কেউ মনে করে যে পৃথিবী চেপ্টা অথবা রোববার দিন কর্মবিরতি পালন করা উচিত তবে জনসাধারণকে তার মতাবলম্বী করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে স্বাধীনতা দান করা উচিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মেটাফিজিক্স বা নৈতিকতা বিরাজমান সত্যের অভিভাবক-মনে করা উচিত নয়। কিন্তু আজকাল তা-ই করা হচ্ছে জার্মানি, ইতালি ও রাশিয়াতে। কিন্তু প্রতিটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের মুক্ত থাকা উচিত দুর্বলতার স্বীকারোক্তি থেকে।
সাধারণ নাগরিকরা খুব কমই আগ্রহ দেখান সরকারের প্রতি হুমকিস্বরূপ নয় এমন পরিবেশে প্রচারণার স্বাধীনতায়। সরকার ভিন্নমত পোষণ করতে পারে ধর্ম অথবা জাতীয়তার প্রশ্নে : ফলে অভিজাতদের বিরুদ্ধে রাজা, বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে অভিজাত অথবা বিত্তহীনদের বিরুদ্ধে বুর্জোয়া উদ্বুদ্ধ হতে পারে। দ্বিতীয় চার্লস ও যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মান সরকারের মতো দেশপ্রেম এর প্রভাব রয়েছে বলে মনে হয়। এ ধরনের পরিবেশে সাধারণ নাগরিকরা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আগ্রহী হতে পারে এবং আহ্বান জানাতে পারে বাকস্বাধীনতার প্রতি। কিন্তু এগুলো হচ্ছে বিপ্লব-পূর্ব পরিবেশ। যেখানে এই পরিবেশ বিরাজ করে সেখানে বিরোধী প্রচারণায় সরকারের উচিত ধৈর্য ধারণ করা। এমনকি তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা প্রায়ই সত্য কারণ, এতে তারা ক্ষমতা হারাবে বটে, কিন্তু যদি ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকে তবে জীবনও হারাতে পারে। খুব কম সরকারই এ ধরনের বিচক্ষণতা দেখিয়েছে যে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার-কথাটি সব সময় সত্য নয়।
আট শতাব্দী ধরে ইংল্যান্ড আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে এ ধরনের নীতি অনুসরণ করতে সমর্থ হয়, কিন্তু পরিশেষে এর পরিসমাপ্তি ঘটায় কিছু অর্থ ও মর্যাদাহানির মাধ্যমে। এই আট শতাব্দী ব্যাপী ব্রিটিশ নীতি সফল ছিল কারণ সেখানে কৃষকরা যখন ক্ষুধার্ত জমিদাররা তখন ঐশ্বর্যশালী।
প্রচারণার স্বাধীনতা যেসব ক্ষেত্রে নাগরিকদের আস্থা জন্মায় ওইগুলো প্রচণ্ড বিপ্লব অথবা অধিক স্বাধীনতার স্বীকৃতি দান। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সরকার নির্বাচনের স্বাধীনতা। তা গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনাধিকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অন্যথায় তা অর্জিত হয় বিপ্লবাত্মক পন্থায়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এর স্বীকৃতি অতীব প্রয়োজনীয়। তা মুক্ত প্রচারণার অধিকারকে বহু দূর অতিক্রম করে যায়।
বাকি রয়েছে আগ্রহী সংস্কারকদের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা কনস্টেন্টাইন পূর্ব প্রতীকী খ্রিস্টানরা, লুথারের সময় প্রটেস্ট্যান্ট এবং বর্তমানকালের প্রটেস্ট্যান্টদের কথা ধরা যাক। এসব মানুষ খুব কমই বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। তারা শহীদত্ব বরণে আগ্রহী ছিলেন এবং অন্য লোককে অনুরূপভাবে আগ্রহী করে তোলার ইচ্ছা পোষণ করতেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, অতীতে সরকারি প্রশাসন যন্ত্র বর্তমান থাকা সত্ত্বেও সংকল্পবদ্ধ ব্যক্তিরা স্বাধীনতার কথা বলতে পারতেন। যা হোক আজকাল সরকারি প্রশাসযন্ত্র অনেক বেশি দক্ষ এবং সম্ভবত মৌলিক পরিবর্তন অসম্ভব করে তুলতে সক্ষম। অপরদিকে যুদ্ধ ও বিপ্লব অরাজকতার জন্ম দেয় এবং সম্ভবত নতুন কিছুর সূচনা করে। এই প্রেক্ষাপটে কিছু কিছু কমিউনিস্ট আশা নিয়ে তাকিয়ে আছেন পরবর্তী যুদ্ধের দিকে।
সাধারণত স্বর্ণযুগের আগমনে বিশ্বাসী হবেন আগ্রহী সংস্কারকরা : তিনি মনে করেন যে সবাই তার ধর্মমত গ্রহণ করলে সহস্র বছরের শাসন সম্ভব হবে। বর্তমানের জন্য বিপ্লবী হলেও ভবিষ্যতের জন্য তিনি একজন রক্ষণশীল : একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব এবং গঠিত হলে তা রক্ষা করতে হবে। এই সব দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে তিনি স্বভাবত পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টায় বা একে ব্যাহত করার প্রচণ্ডতা থেকে অপসৃত হন না; বিরোধিতায় তিনি একজন সন্ত্রাসবাদী এবং ক্ষমতায় একজন নির্যাতনকারী। প্রচণ্ডতায় তার বিশ্বাস বিরোধীদের একই বিশ্বাসে উপনীত হতে উদ্বুদ্ধ করে : তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে তাকে নির্যাতন করবে এবং বিরোধিতায় থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। তার সহস্র বছরের শাসন তাই মধুময় হবে না; গুপ্তচরবৃত্তি থাকবে, প্রশাসনিক আদেশ অনুযায়ী গ্রেফতার করা চলবে এবং কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থাকবে। কিন্তু সর্বধ্বংসীদের মতো তিনি এতে ক্ষতির কিছু দেখবেন না।
