উৎপাদন বলয়ে অসংখ্য ছোট ছোট খামারের ভেতর প্রতিযোগিতা শিল্পায়নের প্রাথমিক যুগের বৈশিষ্ট্য ছিল। অধুনা রাষ্ট্রের সঙ্গে সমভাবে বিস্তৃত ট্রাস্টগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ট্রাস্ট হিসেবে বিবেচিত অস্ত্র কারখানা এর জন্য ব্যতিক্রমধর্মী যে এর একটির প্রতি আদেশগুলো অন্যটির প্রতি আদেশের কারণ হয়ে দাঁড়ায় : যদি একটি রাষ্ট্র অস্ত্র সজ্জিত হয় তবে অন্যগুলোও অস্ত্র সজ্জিত হবে। এজন্যে প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক উদ্দেশ্যগুলো বজায় থাকে না। এই অদ্ভুত ক্ষেত্র ছাড়া ব্যবসায়ে এখনও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। কিন্তু আজকাল তা আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতার সঙ্গে মিশে এক হয়ে পড়েছে, যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারী হচ্ছে যুদ্ধ। সুতরাং আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতার মতোই আধুনিক ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার দোষ-গুণ।
যা হোক, আরও এক ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে, যার প্রচণ্ডতা আগের মতোই বিরাজমান-তা হচ্ছে চাকরি লাভের প্রতিযোগিতা। এর সূচনা হয় স্কুলের বৃত্তি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এবং তা চলে অধিকাংশ লোকের কর্মজীবনব্যাপী। এই প্রতিযোগিতা প্রশমিত করা যায়, কিন্তু পুরোপুরি বিলীন করা যায় না। সব অভিনেতা সমান পারিশ্রমিক পেলেও কোনো ব্যক্তি প্রথম নাবিকের চেয়ে হেমলেটের চরিত্রে অভিনয় করতে চান। লক্ষণীয় দুটো শর্ত রয়েছে, প্রথমত অকৃতকার্য ব্যক্তির পরিহারযোগ্য দুঃখ-কষ্ট ভোগ করা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত সফলতা স্বাভাবিক গুণের পুরস্কারস্বরূপ-হীনস্তাবকতা বা ধূর্ততার ফল নয়। দ্বিতীয় শর্তটি সমাজতন্ত্রীদের যথাযথ মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। যা হোক, আমি এ বিষয়ে আলোচনা করব না, কারণ, তা আমাদের অনেক দুরে নিয়ে যাবে মূল বিষয় থেকে।
আন্তঃরাষ্ট্রীয় তথা বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা হচ্ছে বর্তমান যুগের সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা। এটি পরিণত হয়েছে সর্বধ্বংসী প্রতিযোগিতায়–তা ক্ষমতার জন্যে, সম্পদের জন্যে, মানুষের বিশ্বাসের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভের জন্য এবং সর্বোপরি মানুষের জীবনের জন্যে। কারণ, মৃত্যুদণ্ডই হচ্ছে বিজয় লাভের একমাত্র উপায়। এটি স্পষ্ট যে, এই প্রতিযোগিতা রোধের প্রধান উপায় হচ্ছে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সশস্ত্র বাহিনীর বিলোপসাধন এবং একচেটিয়া সশস্ত্রবাহিনী সমেত একটি একক আন্তর্জাতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এর বিকল্প পন্থা হচ্ছে সভ্য দেশগুলোর অধিকাংশ লোকের মৃত্যু এবং অধিকাংশ লোকের দারিদ্র্য দশা ও আধা বর্বরতায় রূপান্তর। বর্তমানে এই বিকল্পটি পছন্দ এক বিশাল সংখ্যাধিক্যের।
উদারপন্থিরা তত্ত্বগতভাবে মনে করে থাকেন যে প্রচারণায় প্রতিযোগিতা মুক্তভাবে ক্রিয়াশীল, কিন্তু তা সম্পর্কযুক্ত হয়ে পড়েছে আন্তঃরাষ্ট্রীয় অস্ত্র প্রতিযোগিতার সঙ্গে। আপনি যদি ফ্যাসিবাদ প্রচার করেন তবে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে জার্মানি ও ইতালির শক্তি বৃদ্ধি করা। কমিউনিজমের প্রচার করলে সম্ভবত আপনি তা বাস্তবায়িত করতে পারবেন না। তবে পরবর্তী যুদ্ধে জয়লাভের জন্য আপনি রাশিয়াকে সহায়তা করতে পারেন। আপনি যদি গণতন্ত্রের গুরুত্ব আরোপ করেন তবে আপনি দেখতে পাবেন যে, চেকোশ্লাভিয়ার স্বাধীনতা রক্ষায় ফ্রান্সের সঙ্গে সামরিক মৈত্রী সম্পর্কীয় নীতির প্রতি আপনি সমর্থন দান করেছেন। রাশিয়া, জার্মানি ও ইতালি একের পর এক মুক্ত প্রচারণার নীতি পরিত্যাগ করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। কারণ, ওই দেশের সরকার এই নীতি গ্রহণ করে তাদের পূর্বসূরিদের ব্যাহত করতে পেরেছিল এবং এর অবিরাম অনুবৃত্তি তাদের নিজস্ব নীতি অনুসরণ পুরোপুরিভাবে অসম্ভব করে তুলবে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আজকের দুনিয়া এত ভিন্ন যে মুক্ত প্রতিযোগিতায় উদারনৈতিক যুক্তিগুলো বলবৎ হলে আধুনিক পরিভাষায় এগুলোর বর্ণনা প্রয়োজন হবে। আমি বিশ্বাস করি যে, তারা ব্যাপক বৈধতা বজায় রেখেছে, তবে তারা সীমাহীন নয়-এটা বুঝে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ।
জন স্টুয়ার্ট মিলের লিখিত উদারপন্থি মতবাদ অনুমিত মতবাদের চেয়ে কম চরমভাবাপন্ন ON LIBERTY বইয়ে। মানুষ তার কার্যকলাপের জন্য স্বাধীন, যদি তা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। কিন্তু যদি অন্যান্য মানুষ আহত হয় তবে এগুলো রহিত করা যেতে পারে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। ধরা যাক, একজন মানুষ স্থির জ্ঞানে বিশ্বাস করেন যে, রানী ভিক্টোরিয়াকে হত্যা করা উচিত। তাকে এ মতের অনুমতি দেয়া যায় না প্রচার ও প্রসারে। এটা চরম দৃষ্টান্ত; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রায় সব মতামতের দ্বারা কেউ না কেউ আহত হন। বাকস্বাধীনতা অর্থহীন, যদি না তাতে ব্যক্তিবিশেষ বা শ্রেণিবিশেষের কাছে অপ্রীতিকর এমন কিছু বলার সুযোগ না থাকে। প্রচারণায় স্বাধীনতার সুযোগ থাকতে হলে তাতে মিলের চেয়ে জোরালো নীতির প্রয়োজন।
আমরা প্রশ্নটি পর্যালোচনা করতে চাই সরকারি দৃষ্টিকোণ, সাধারণ নাগরিকের দৃষ্টিকোণ, নতুনত্বের প্রবর্তকদের দৃষ্টিকোণ থেকে। আলোচনা শুরু করা যাক সরকারি দৃষ্টিকোণ দিয়েই।
ইতিমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকার দুধরনের বিপদের সম্মুখীন; বিপ্লব ও যুদ্ধে পরাজয়। (সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে অফিসিয়াল বিরোধীদের সরকারের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়)। এসব বিপদ আত্মরক্ষামূলক প্রবণতার জন্ম দেয়। আশা করা যায় যে এগুলো প্রতিহত করতে সরকার পারতপক্ষে সবকিছু করেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন হচ্ছে : প্রচারণায় কতটুকু স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীলতা দেবে? উভয়টি অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিপদের বিরোধী। উভয় উত্তর অবশ্যই নির্ভর করছে ওই সময়ের সরকারের বৈশিষ্ট্য ও পারিপার্শ্বিকতার উপর। স্বাধীনতা আরেক দফা বিপদ আনবে সরকার আধুনিক ও বৈপ্লবিক হলে এবং জনগণের অসন্তুষ্টির পেছনে জোরালো কারণ থাকলে। এই পরিবেশ ছিল ১৯৭৩ সালে ফ্রান্সে, ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় এবং ১৯০৩ সালে জার্মানিতে। কিন্তু সরকার ঐতিহ্যগত হলে এবং জনগণের আর্থিক অবস্থা খুব হতাশাব্যঞ্জক না হলে স্বাধীনতা নিরাপদ বাল্বের মতো কাজ করবে এবং অসন্তোষ কমিয়ে দেবে। ব্রিটিশ সরকার যদিও কমিউনিজম ব্যাহত করার জন্য অনেক কিছু করেছে তারপরও তা ব্রিটেনে কমিউনিস্টদের বিফলতার কাজ নয়। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাদের প্রচারের পরম স্বাধীনতা দেয়াই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।
