উপরের সংক্ষিপ্ত অনুসন্ধান থেকে অনুমিত হয় যে, সরকারের আত্মরক্ষামূলক কাজ থেকে উদ্ভূত প্রবাহ ব্যতিরেকে প্রধানত সংগঠনগুলো ব্যক্তি জীবনে বৃদ্ধি করে থাকে মানুষের শখ ও মঙ্গল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রমের উৎপাদিকা শক্তি, দারিদ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগুলো এমন যে নীতিগতভাবে এগুলো সম্বন্ধে কোনো বির্তক থাকা উচিত নয়। এর সবই নির্ভর করছে উন্নত সংগঠনের উপর। কিন্তু যখন আমরা যুদ্ধে পরাজয় বা বিপ্লব রোধে পদক্ষেপ নিই তখন ব্যাপারটি হয়ে থাকে ভিন্ন। এসব পদক্ষেপের যতই প্রয়োজন মনে করা হোক না কেন আসলে এগুলো নিরানন্দের এবং এ কারণেই শুধু সংরক্ষিত হয় যে বিপ্লব এবং পরাজয় আরও বেশি নিরানন্দের। সম্ভাবত পার্থক্য শুধু মাত্রার দিক থেকে। বলা যেতে পারে যে, টিকা, শিক্ষা এবং রাস্তা নির্মাণ নিরানন্দের, কিন্তু বসন্ত, অজ্ঞতা ও দুর্গম জলাভূমি এর চেয়েও নিরানন্দের। মাত্রাগত পার্থক্য এত বেশি যে, তা বস্তুগত পার্থক্যের শামিল। অধিকন্তু শান্তিপূর্ণ অগ্রগতিতে জড়িত কাজের নিরানন্দ অস্থায়ী। বসন্ত নিমূর্ল করা যেতে পারে, তখন টিকা নিষ্প্রয়োজন হয়ে পড়বে। উন্নত পদ্ধতির মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় শিক্ষা ও রাস্তা নির্মাণ। কিন্তু কৌশলগত যে কোননা অগ্রগতি যুদ্ধকে অধিক বেদনাদায়ক ও ধ্বংসাত্মক করে তোলে। মানবতা ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে সর্বগ্রাসী পদ্ধতিতে বিপ্লব প্রতিরোধ করা ধ্বংসাত্মক।
অন্য একটি পন্থা রয়েছে ব্যক্তি ও সংগঠনের সম্পর্কের শ্রেণিকরণের : ব্যক্তি হিসেবে তিনি একজন ক্রেতা, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সদস্য অথবা হতে পারেন শত্রু।
তিনি ক্রেতা হিসেবে দেখবেন যে সংগঠন তাকে উপভোগে সাহায্য করছে, কিন্তু বৃদ্ধি করছে না তার ক্ষমতা। অবশ্য তিনি ভুল বুঝতে পারেন এগুলোর ব্যাপারে : ক্রীত পিলটি উপকারে না আসতে পারে, বিয়ার খারাপ হতে পারে, ঘোড়দৌড়ে অর্থহানি হতে পারে। তা সত্ত্বেও সংগঠন থেকে তিনি কিছু লাভ করছেন। যেমন– আশা, বিনোদন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ। নতুন গাড়ি কেনার সম্ভাবনা আপনাকে কিছু ভাবনা ও বলার সুযোগ দেয়। অর্থ ব্যয়ের স্বাধীনতা আনন্দদায়ক। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আসবাবপত্রের প্রতি আকর্ষণ একটি ব্যাপক ও শক্তিশালী আবেগ। কিন্তু তা আর থাকে না রাষ্ট্র সুসজ্জিত বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিলে।
মানুষ যেসব সংগঠনের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সদস্য সেগুলো হচ্ছে রাজনৈকি দল, চার্চ, ক্লাব, বন্ধু, সমাজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রতিযোগিতায় এগুলো একই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি। যেমন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল, ভিন্ন মতাবলম্বী চার্চ, প্রতিযোগী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা আগ্রহী ব্যক্তিদের মনে ক্ষমতা তাড়না নাটকীয় মনোভাবের জন্ম দেয়। রাষ্ট্র দুর্বল না হলে এই প্রতিযোগিতা আইনের অধীন থাকে। রাষ্ট্র শান্তির ব্যবস্থা করে থাকে সহিংসতা ও প্রতারণামূলক কাজ ধরা পড়লে। কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বিরোধী সংগঠনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত রক্তপাতহীন হলে তা উৎসাহ যোগায় মানুষকে উন্মাদনা ও ক্ষমতামোহ হাসে। অন্যথায় এর ফলে জন্ম দেয় এক বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতা।
রাষ্ট্র উদাসীন হলে এবং নিরপেক্ষ না হলে রাজণৈতিক বিরোধ, দাঙ্গা, হত্যা অথবা গৃহযুদ্ধে পর্যবসিত হয়। ব্যক্তি ও সমাজজীবনে এই বিপদ এড়ানো গেলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে উন্নতির লক্ষন।
মানুষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সংগঠনটির অনিচ্ছুক সদস্য-তা হচ্ছে রাষ্ট্র। এ পর্যন্ত নাগরিকত্ব প্রদানে সফল জাতীয়তা নীতি নাগরিকদের ইচ্ছানুসারে প্রণীত হয়-ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছায় নয়।
হতে পারতেন তিনি একজন রুশ
ফরাসি, তুর্কি অথবা প্রোসিয়ান
অথবা হয়তো ইতালির কিন্তু
এতগুলো সম্ভাবনার পরেও তিনি
রয়েছেন একজন ইংরেজ।
তবে অধিকাংশ মানুষ সুযোগ পেলেও নাগরিকত্ব পরিবর্তন করে না যদি রাষ্ট্র নাগরিকদের প্রতি শত্রুতামুলক মনোভাব না দেখায়। সফল জাতীয়তা নীতি ছাড়া অন্য কিছুই রাষ্ট্রকে এত শক্তিশালী করতে পারে না। নাগরিকত্ব ও দেশপ্রেম হাতে হাত ধরে চললে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংগঠনের প্রতি আনুগত্যের চেয়েও গভীরতর হয়।
ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রেরণা বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের। অনুরূপ একটি প্রেরণা রয়েছে স্বদেশপ্রীতি ও পরিবারপ্রীতির। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আনুগত্যে অনুরূপ প্রেরণা থাকে না ক্ষমতাপ্রীতি ও বৈদেশিক আক্রমণজনিত ভয়ের দ্বৈত প্রেরণায় উজ্জীবিত না হলে। রাজনৈতিক দলগুলোর অনুরূপ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অবাধ হয়ে পড়ে। সভ্য দুনিয়া আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে একটি লিন্ডবার্গ শিশুর হরণ ও এর হত্যায়। কিন্তু পরবর্তী যে যুদ্ধের জন্য আমরা ব্রিটেনে আমাদের আয়ের এক-চতুর্থাংশ খরচ করছি সে যুদ্ধে তা দাঁড়াবে সাধারণ ব্যাপার হয়ে। কোনো প্রতিষ্ঠানই জন্ম দেয় না জাতীয় রাষ্ট্রের অনুরূপ আনুগত্যের। বিশাল সংখ্যঅর মানুষ হত্যার জন্য প্রস্তুতি নেয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য। মৃত্যু ঝুঁকিসহ সংগঠনের প্রতি আনুগত্যই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র মেনে নিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে। এতে বাসস্থান, ছেলেমেয়ে এবং সভ্যতা ধ্বংসের ঝুঁকি ও বিদেশি শক্তির বশ্যতা স্বীকার করার চেয়ে ভালো। বেদনাদায়ক সমস্যা ঘটছে ব্যক্তি-মনোবিজ্ঞান ও সরকারি সংগঠনের। আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের নিস্তার নেই যদি এই ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচার উপযুক্ত পথ খুঁজে বের না করি।
১৪. প্রতিযোগিতা
ঊনবিংশ শতাব্দীতে মানুষ জ্ঞাত ছিল স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার উৎপীড়ন সম্পর্কে। এই বিপদ পরিহার করে চলার কৌশলও জানা ছিল মানুষের। কৌশলটি হচ্ছে প্রতিযোগিতা। তখনও মানুষ জানত প্রথাগতভাবে একচেটিয়ার অশুভ দিক। সভাসদদেরকে লাভজনক মজুরি প্রদান করেন স্টুয়ার্ট এবং এলিজাবেথ। গৃহযুদ্ধের অনেকগুলো কারণের অন্যতমই ছিল এর বিরুদ্ধে আপত্তি। সামন্তযুগে নিজেদের কারখানায় শস্য ভাঙানোর জেদ ধরা ছিল সম্ভ্রান্ত ইংরেজদের পক্ষে স্বাভাবিক ব্যাপার। ১৮৪৮ সালের আগে ইউরোপীয় রাজতন্ত্র মুক্ত প্রতিযোগিতার উপর আধা-সামন্ততান্ত্রিক বিধি-নিষেধের সঙ্গে জড়িত ছিল; রাজা ও জমিদারদের স্বার্থে এই বিধি-নিষেধ বিদ্যমান ছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সর্বনিম্ন মজুরি আইন এবং সাধারণ ভূমির পৃথকীকরণ ইত্যাদি। ইংল্যান্ডে তাই শস্য আইন প্রশ্ন পর্যন্ত সর্বোপরি অবাধ নীতির পক্ষে ওকালতির ব্যাপারে একমত হন জমিদার ও পুঁজিপতিরা।
