যুবক বা যুবতী অর্থ উপার্জন শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সংগঠন তাদের কার্যকলাপ প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। চাকরিদাতা সাধারণত একটি সংগঠন; অধিকন্তু নিয়োগদাতাদের একটি ফেডারেশন। ট্রেড ইউনিয়ন এবং তাদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। ইনস্যুরেন্স এবং ফ্যাক্টরি আইনের মতো বিষয়গুলো ছাড়া রাষ্ট্র ট্যারিফ ও সরকারি আদেশের মাধ্যমে ব্যক্তি মানুষের নির্বাচিত বৃত্তি লাভ করবে না অবদমিত হবে তা স্থির করার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। শিল্পোন্নয়ন প্রভাবিত করতে পারে মুদ্রা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অথবা জাপানের অভিলাসের মতো সবরকম পরিস্থিতি।
বিবাহ এবং সন্তানের প্রতি কর্তব্য আবার একজন মানুষকে আইন এবং প্রধানত চার্চ থেকে প্রাপ্ত নৈতিক আচরণবিধির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে। যদি তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকেন এবং খুব গরিব না হন তবে তিনি সর্বশেষ বৃদ্ধকালীন বয়স্ক-ভাতা ভোগ করতে পারেন। সতর্কতার সঙ্গে আইন ও চিকিৎসার দ্বারা তার মৃত্যু তত্ত্বাবধান করা হয় যাতে এটা নিশ্চিত হতে পারে যে তার মৃত্যু ঘটেনি নিজের ইচ্ছায় বা অন্যের দ্বারা।
কিছু ব্যাপার রয়ে গেল যা ধার্য হয়ে থাকে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই। কোনো ব্যক্তি একজন মহিলা রাজি হলে তাকে বিয়ে করতে পারেন। যৌবনে তার সবিশেষে স্বাধীনতা রয়েছে জীবিকা অর্জনের পথ বেছে নেয়ার ব্যাপারে। ইচ্ছানুসারে অবসর সময় কাটাতে পারেন সীমাবদ্ধতার ভেতর। ধর্ম বা রাজনীতিতে আগ্রহী হলে যোগ দিতে পারেন সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্প্রদায় বা দলে। পছন্দ-অপছন্দের স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও বিবাহ সম্পর্কিত ব্যাপার ছাড়া তিনি নির্ভরশীল সংগঠনের উপর। খুব ব্যতিক্রমধর্মী না হলে তিনি ধর্ম প্রতিষ্ঠা, দল সৃষ্টি, ফুটবল ক্লাব সংগঠন অথবা পারেন না নিজের পানীয় বানাতে। তিনি শুধু সদাপ্রস্তুত বিকল্পের ভেতর চর্চা করতে পারেন নিজের রুচি। কিন্তু এর সব বিকল্পকে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার গণ্ডির ভেতর সবচেয়ে আকর্ষণীয় করে তোলে প্রতিযোগিতা।
এ পর্যন্ত সভ্য সমাজে সংগঠনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে তুলনামূলক অনুন্নত সামজের কৃষকদের তুলনায় মানুষের স্বাধীনতা বৃদ্ধি করা। তুলনা করা যাক পাশ্চাত্য দিনমজুরের জীবনের সঙ্গে একজন চীনা কৃষকের জীবন। এটা সত্য যে তাকে শিশু হিসেবে যেতে হয় না স্কুলে। কিন্তু অতি অল্প বয়স থেকেই তাকে কাজ করতে হয়। সম্ভবত শৈশবকালে অর্থাভাব ও চিকিৎসার অভাবে তার মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি। যদি বেঁচে থাকেন এবং সৈনিক বা বান্ডিট না হন অথবা কোনো বড় শহরে স্থানান্তরের ঝুঁকি না নেন তবে জীবিকা অর্জনের জন্য রুচি চর্চা করার সুযোগ পাবেন না তিনি। বািবহের ব্যাপারে সামান্যতম স্বাধীনতা ছাড়া প্রথা তার সর্বস্ব হরণ করে। বাস্তবে তার অবসর বলতে কিছুই নেই এবং যদি থেকেও থাকে তবে এ নিয়ে আনন্দ করার মতো কিছুই নেই এবং যদি থেকেও থাকে তবে এ নিয়ে আনন্দ করার মতো কিছুই নেই। তিনি সবসময় বেঁচে থাকেন ন্যূনতম জীবিকার উপর নির্ভর করে। দুর্ভিক্ষের সময় তার পরিবারের এক বিরাট অংশ ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করে। লোকটির জীবন যতই কঠিন হোক না কেন তার স্ত্রী বা কন্যা সন্তানদের জীবন এর চেয়েও কঠিন। গড়পড়তা চীনা কৃষকদের জীবনের তুলনায় ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বেকার যুবকের জীবনও স্বর্গের মতো।
এবার আসা যাক অন্য এক শ্রেণির সংগঠনের বেলায়। এগুলো একজন লোককে অন্য মানুষের আহত করা থেকে বিরত রাখার লক্ষ্যে পরিকল্পিত হয়েছে : পুলিশ এবং ফৌজদারি আইন হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। খুন, ডাকাতি ও রাহাজানির উপর এগুলো হস্তক্ষেপ করলে ব্যতিক্রমধর্মী অল্প সংখ্যক হিংস্র ব্যক্তি ছাড়া সবারই স্বাধীনতা এবং সুখ বৃদ্ধি পায়। যেখানে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে লুণ্ঠনকারী ছাড়া সবারই বেসামরিক জীবনের আনন্দ অসম্ভব হয়ে পড়ে। অবশ্যই একটা বিপদ রয়েছে : পুলিশের পক্ষে দুবৃত্ত দলের মানুষ সাজা সম্ভব অথবা যে কোনোভাবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা সম্ভব। এই বিপদ কোনোক্রমেই কাল্পনিক নয়, তবে সুপরিচিত এর রহিত কারণও। এ রকম বিপদও রয়েছে যে, ক্ষমতাসীনরা পুলিশ ব্যবহার করতে পারে সংস্কারের লক্ষ্যে সংঘটিত আন্দোলন ঠেকানোর জন্য। বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত এ রকম ঘটে যাওয়া প্রায় অপরিহার্য বলে মনে হয়। নৈরাজ্য রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলো এমনই যে তা বর্তমান অবস্থানের পরিবর্তন আরও দুরূহ করে তোলে তা মৌলিক প্রতিবন্ধকতাগুলোর অংশবিশেষ। এই প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সভ্য সমাজের অনেক মানুষ ভাবতে পারে যে পুলিশ সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা সম্ভব।
এ পর্যন্ত আমরা কোনো চিন্তা করিনি যুদ্ধ, বিপ্লব এবং এগুলোর ভয় সম্বন্ধে। এগুলোর ভেতর রয়েছে আত্মরক্ষামূলক রাষ্ট্রীয় প্রবণতা। এই কারণে রাষ্ট্র ব্যক্তি জীবনের উপর চরম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কায়েম করে। ইউরোপের প্রায় সব দেশেই বাধ্যতামূলক সার্বজনীন সামরিক চাকরি বিদ্যমান। যুদ্ধ দেখা দিলে সর্বত্রই সামরিক বয়সের প্রত্যেক পুরুষকে যুদ্ধে ডাকা হয় এবং সরকার বিজয় লাভের জন্য যেসব কাজ উপযোগী মনে করে তা করার জন্য আদেশ করে পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিদের। যাদের কার্যকলাপ শত্রুপক্ষের অনুকূলে মনে হয় তাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। শান্তির সময়ে সব সরকারই সময়মত প্রত্যেকের যুদ্ধ করার ইচ্ছা এবং জাতীয় প্রয়োজনে সার্বক্ষণিক আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। সম্ভাব্যতার মাত্রা অনুসারে সরকারের পদক্ষেপ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে বিপ্লবাত্মক বিষয়ে। বিপ্লবের ঝুঁকি বেড়ে যায় অন্যান্য জিনিস অপরিবর্তিত থাকলে এবং জনকল্যাণমূলক কাজে সরকারের মনোযোগ কমে গেলে। কিন্তু সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের মতো দৈহিক নিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক ও অর্থ সংক্রান্ত ব্যাপারে মানসিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা একচেটিয়াভাবে সরকারের হাতে থাকলে এই সরকার অপেক্ষাকৃত কম প্রগাঢ় সরকারের চেয়ে অপ্রিয় হয়ে পড়ে। কারণ বিপ্লবী চেতনায় সংগঠন ও প্রসার সহজ নয়। সুতরাং আশংকা করা যায় যে, রাষ্ট্র ও জনসাধারণের ভেতর স্পষ্ট সীমারেখা থাকলে সরকার ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রত্যেক ধাপে জনকল্যাণমূলক কাজে আরও বেশি উদাসীন হবে।
