সামরিক কৌশলের দ্বারা সব সময় সরকার প্রভাবিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক দিনগুলোতে রোমান নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত ছিল রোমান সেনাবাহিনী। কিন্তু পেশাদার সৈন্য স্থলাভিষিক্ত হলে সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়। সামন্ত অভিজাত শ্রেণির শক্তি নির্ভর করত দৃঢ়তার উপর, কিন্তু নিঃশেষ হয়ে যায় আর্টিলারির সূচনা হলে। প্রথম প্রশিক্ষণবিহীন বিশাল ফরাসি বিপ্লবী সেনাবাহিনী তাদের বিরোধী পেশাদার ছোট সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বিশেষ আদর্শের প্রতি জনপ্রিয় উৎসাহের গুরুত্ব প্রদর্শন করে। এর মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় গণতন্ত্রের সামরিক সুবিধাগুলো। উড়োজাহাজ ব্যবহারের মাধ্যমে মনে হয় আমরা স্বল্পসংখ্যক দক্ষ লোকের সমন্বয়ে গঠিত সেনাশক্তির উপর নির্ভরশীলতার যুগে ফিরে যাচ্ছি। মারাত্মক যুদ্ধে জড়িত প্রতিটি দেশের সরকার বৈমানিকদের ইচ্ছার অনুরূপ হবে, যা গণতান্ত্রিক নয়।
কিন্তু এগুলোর বিপক্ষে প্রয়োজন কিছু আলোচনার। মনে করা যেতে পারে যে, মহাযুদ্ধে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই জয়লাভ করবে। কিন্তু তাই বলে যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র অচল হয়ে যাবে–এটা মনে করা অসম্ভব। যুদ্ধ কল্পিত সুবিধাগুলো থেকে ফ্যাসিবাদী শক্তির অনেকটাই অস্তিত্ব লাভ করবে। ফলশ্রুতিতে কোনো জাতিকে শিক্ষা ও দেশপ্রেমের বিস্তৃতি ছাড়া অন্য কিছুই যোগাতে পারবে না এত শক্তি।
১৩. ব্যক্তি ও সংগঠন
সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা যে লাভজনক তা মানুষ দেখতে পায়, কিন্তু তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তিগতই থেকে যায় মৌচাকের মৌমাছির বিপরীতে। সমাজজীবনে এই জন্য অসুবিধা দেখা দেয় এবং জরুরি হয়ে পড়ে সরকার গঠন। কারণ, একদিকে সরকার প্রয়োজনীয় : সরকার ছাড়া সভ্য দেশের কিয়দংশ মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু অপরদিকে রয়েছে অসমতা বিজড়িত ক্ষমতা (সরকারের) এবং যাদের হাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা রয়েছে তারা এর ব্যবহার করে থাকে সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় অধিক আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য। এইভাবে নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচার একইভাবে হয়ে ওঠে ধ্বংসাত্মক। তাই সুখী হতে হলে প্রয়োজন এক ধরনের আপসের।
এই অধ্যায়ে আমি আলোচনা করার ইচ্ছা রাখি ব্যক্তি বিশেষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠন সম্বন্ধে-সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আলোচনা নয়। অবশ্যই এই বিষয়টির পার্থক্য গণতান্ত্রিক ও সর্বগ্রাসী দেশে অনেক। কারণ, কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও শেষোক্ত দেশে সংশ্লিষ্ট সংগঠনই রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। আমি যতটুকু সম্ভব প্রথম জরিপে বিবেচনার বাইরে রাখব এই পাথর্কটি।
দুটো পন্থায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিবিশেষকে প্রভাবিত করে। কিছু নীতি ব্যক্তিবিশেষের আশা-আকাক্ষা চরিতার্থ করার জন্য তার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিকল্পিত। আবার কিছু অনেকের বৈধ স্বার্থ ব্যাহত করা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত। পার্থক্যটি পরিস্কার নয় : পুলিশ রয়েছে সৎ লোকের স্বার্থ রক্ষা এবং সিদেল চোরকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে। এর প্রভাব অনেক বেশি জোরালো সভ্য মানুষের চেয়ে সিঁদেল চোরের জীবনের উপর। আমি আবার ফিরে আসব এ পার্থক্য। এ মুহূর্তে আলোচনা করব সভ্য সমাজে মানবজীবনের যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সংগঠনগুলো সিদ্ধান্তকারী ভূমিকা পালন করে সেগুলো।
প্রারম্ভেই জন্ম : একজন ডাক্তার বা একজন যাত্রীর সেবা অপরিহার্য। অতীতে যথেষ্ট ছিল একজন সম্পূর্ণ অশিক্ষিত মিসেস গ্যাম্পের সেবা। কিন্তু আজকাল তা যথেষ্ট নয়–এক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারি কর্তৃপক্ষের দ্বারা ধার্য নির্দিষ্ট স্তরের দক্ষতা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শিশুর স্বার্থ রক্ষা করা। বিভিন্ন সরকারি দায়িত্বের মান শিশু-কিশোরের মৃত্যুহারে প্রতিফলিত হয়। পিতামাতা তাদের কর্তব্যে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলে সরকারি কর্তৃপক্ষ শিশুটির পালন পিতামাতা বা কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে দিতে পারেনি। শিশুটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধীনে আসে পাঁচ অথবা ছয় বছর বয়সে এবং তখন থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত বাধ্য হয়। সরকারের পছন্দ অনুযায়ী বিষয়গুলো শিখে নিতে। এই প্রক্রিয়া শেষে অধিকাংশের ক্ষেত্রেই সারা জীবনের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায় মতামত ও মানসিক অভ্যাস।
ইতিমধ্যে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে শিশুরা প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে অন্য কিছুর উপর, যা আরোপিত হয় না রাষ্ট্র কর্তৃক। পিতামাতা ধার্মিক বা রাজনীতিবিদ হলে তারা ধর্মীয় বা দলীয় নীতি শিক্ষা দেন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শিশু ক্রমাগতভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে সংঘটিত আমোদ-প্রমোদে। যেমন-সিনেমা, ফুটবল খেলা ইত্যাদি। সে মোটামুটি বুদ্ধিমান হলে সংবাদ মাধ্যম কর্তৃক হতে পারে প্রভাবিত। রাষ্ট্রীয় স্কুল ভিন্ন অন্য কোনো স্কুলে পড়লে সে স্বাভাবিকভাবে এক প্রকার অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে-ইংল্যান্ডে তা হচ্ছে জাতি বা গোষ্ঠীর উপর সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব। ইতিমধ্যে সে একটি নৈতিক আচরণবিধি আত্মস্থ করে যা তার যুগের সম্প্রদায়ের বা জাতির। এই নৈতিক আচরণবিধি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর সংজ্ঞা প্রদান করা সহজ নয়। কারণ তিন প্রকার কর্মবিধি রয়েছে যেগুলোর পার্থক্য স্পষ্ট নয়। প্রথমত সাধারণ অপবাদ সত্ত্বেও এগুলো পালন করতে হয়; দ্বিতীয়ত খোলাখুলিভাবে অমান্য করা যাবে না কতগুলো; তৃতীয়ত যেগুলো পরিপূর্ণ উপদেশ হিসেবে গণ্য করা হয়, শুধু দরবেশ ব্যক্তিই তা পালন করতে পারেন। মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য আচরণবিধি সম্পূর্ণত না হলেও প্রধানত ধর্মীয় সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত ধর্মীয় ঐতিহ্যের ফলাফল। এগুলো টিকে থাকতে সক্ষম দীর্ঘ অথবা স্বল্পকাল। তাছাড়া পেশাগত আচরণবিধিও রয়েছে-কিছু ব্যাপার আছে যেগুলো কোনো অফিসার, ডাক্তার অথবা ব্যারিস্টার অবশ্যই করবে না। কিন্তু আজকাল সাধারণত পেশাগত সমিতি ও এ ধরনের বিধি পরিকল্পনা ও প্রণয়ন করে। এটা উপদেশমূলক যে দ্বন্দ্বযুদ্ধের ব্যাপারে চার্চ ও সেনাবাহিনীর ভেতর সংঘাত দেখা দিলে সেনা-আচরণবিধি অফিসারদের ভেতর বিস্তার লাভ করে। আইনের বিরুদ্ধে প্রসার লাভ করে চিকিৎসা ও দোষ স্বীকার সম্পর্কীয় গোপনীয়তা।
