নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কিভাবে পরিবর্তিত হয় বিশেষ প্রতিষ্ঠানে–এ সম্পর্কে প্রয়োজন কিছু বলা। এটা এমন যে এ ব্যাপারে ইতিহাস থেকে কোনো নিশ্চিত নির্দেশনা পাওয়া যায় না। আমরা দেখেছি যে ইতিহাস যুগের সূচনালগ্নেই মিসর ও ব্যাবিলনে পরম রাজতন্ত্র পুরোপুরিভঅবে উন্নতি লাভ করে; নৃবিজ্ঞানের প্রমাণ থেকে ধারণা করা হয় যে, মূলত বয়স্ক পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত সীমিত কর্তৃত্ব থেকে তা উন্নীত হয়েছে। ইউরোপীয় প্রভাবের অধীনতা ছাড়া এশিয়াব্যাপী (চীন ছাড়া) কোথাও পরম রাজতন্ত্র অন্য কোনো শাসন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে দেখা যায়নি। অপরপক্ষে ইতিহাস যুগে তা কখনও ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেখা যায়নি। অপরপক্ষে ইতিহাস যুগে তা কখনও ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মধ্যযুগে সামন্ত অভিজাত শ্রেণি ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহরগুলোর মিউনিসিপ্যাল স্বায়ত্তশাসনের জন্য রাজার ক্ষমতা সীমিত ছিল। রেনেসাঁর পর সর্বত্র রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু মধ্যবিত্তের আবির্ভাবের ফলে এর পরিসমাপ্তি ঘটে প্রথম ইংল্যান্ডে, পরে ফ্রান্সে ও এর পরে পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ জায়গায়। ১৯১৮ সালে বলশেভিকদের সাংবিধানিক পরিষদ বাতিল করা অবধি অনুমান করা হতো যে, সভ্য জগতের সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করবে সংসদীয় গণতন্ত্র।
যা হোক, নতুন কিছু নয় গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন। এগুলো ঘটে থাকে গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলোতে, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হলে রোমে এবং মধ্যযুগীয় ইতালির বাণিজ্যিক প্রজাতন্ত্রগুলোতে। কোনো সাধারণ নীতি প্রণয়ন করা কি সম্ভব গণতন্ত্রমুখী ও গণতন্ত্রবিমুখী বিভিন্ন পরির্তন নিধারণে?
অতীতে গণতন্ত্রবিরোধী দুটি শক্তি ছিল-সম্পদ ও যুদ্ধ। এ দুটোর ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য আমরা মেডিসি ও নেপোলিয়ানকের দৃষ্টান্ত হিসেবে নিতে পারি। বাণিজ্যলব্ধ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিদের রূঢ়তা জমিদারদের চেয়ে কম। তাই তা ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করতেও পরবর্তী সময়ে হিংসার উদ্রেক না করে শাসন কাজ চালিয়ে যেতে উত্তরাধিকারী শাসকদের তুলনায় অনেক দক্ষ। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় ভেনিসে অথবা হেনসিটিক লীগের শহরগুলোতে বিদেশি লোকের মাধ্যমে মুনাফা সৃষ্টি করা হতো। ফলে স্বদেশে তাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়নি। নগরবাসী অভিজাতদের অলিগার্ক তাই বাণিজ্য প্রধান সমাজে অন্য স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল পদ্ধতি। একটি পরিবার অনেকগুলো পরিবারের তুলনায় প্রভূত সম্পদের অধিকারী হলে তা সহজেই উন্নীত হয় রাজতন্ত্রে।
যুদ্ধ পরিচালিত হয় একটি ভিন্ন ও হিংস্রতাপূর্ণ মানসিকতা দ্বারা। ভয় মানুষের মনে জন্ম দেয় নেতার প্রয়োজনবোধের। একজন সফল জেনারেল ভয়ের বিপরীতধর্মী আবেগপূর্ণ প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম। যেহেতু বিজয় এ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তাই একজন সফল জেনারেল দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা তার হাতে ন্যস্ত করার প্রয়োজনীয়তা সহজেই বুঝতে সক্ষম। তিনি অপরিহার্য বিবেচিত হন সংকটকালীন। কিন্তু সংকট কেটে গেলে তাকে অপসারণ করা হয়ে পড়ে কঠিন।
যুদ্ধংদেহী মানসিকতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও গণতন্ত্রবিরোধী আধুনিক আন্দোলন সম্পূর্ণরূপে নেপোলিয়নের অনুরূপ নয়। এটা অদ্ভুত মনে হতে পারে যে, সেনাপতির চেয়ে শক্তিশালী হবে বেসামরিক সরকার। তথাপি যেখানে গণতন্ত্র জাতীয় প্রোথিতমূল অভ্যাসে পরিণত হয়েছে সেখানকার অবস্থা তাই। লিংকন সেনাপতি নিয়োগকালে লিখেন, তারা আমাকে বলছে যে তোমার লক্ষ্য হচ্ছে একনায়কতন্ত্র। তা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন বিজয় লাভ করা। বিজয়ের জন্য আমি তোমার দিকে চেয়ে আছি এবং আমি ঝুঁকি নেব একনায়কত্বের। তিনি নিরাপদে তা লিখতে পেরেছিলেন, কারণ, তিনি জানতেন যে বেসামরিক সরকারের উপর আক্রমণ হলে আমেরিকার সৈন্য জেনারেলকে অনুসরণ করে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ওয়েলিংটনের অধিনায়ক এ ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করলে কোনো মানুষ পেতেন না তাকে অনুসরণ করার জন্য।
গণতন্ত্র নতুন অবস্থায় প্রাক্তন ক্ষমতাসীনদের প্রতি বিরক্তি থেকেই জন্ম লাভ করে; কিন্তু নতুন অবস্থায় স্থিতিশীল নয় তা। যারা নিজেদের পুরনো রাজা বা অলিগার্কদের বিরোধী মনে করেন তারা রাজতান্ত্রিক বা অলিগার্কিক পদ্ধতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেন। নেপোলিয়ান ও হিটলার জনসমর্থন লাভ করেছিলেন, কিন্তু পারেননি বারবোনস এবং হোহেন জোলার্ন। যেখানে গণতন্ত্র দীর্ঘ স্থায়ীত্বের ফলে ঐতিহ্যগত হয়ে পড়েছে শুধু সেখানেই তা স্থিতিশীল হয়। ক্রমওয়েল, নেপোলিয়ান ও হিটলার নিজ নিজ দেশে গণতন্ত্রের প্রাথমিক যুগে আর্বিভূত হন। প্রথম দুইজনের তুলনায় তৃতীয় ব্যক্তি কখনোই আশ্চর্যজনক হতে পারেন না। পূর্বসূরিদের চেয়ে তার দীর্ঘস্থায়ীত্বের কল্পনা করার কারণ ছিল না।
এ ব্যাপারে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, অদূর ভবিষ্যতে গণতন্ত্র এর ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না। আমরা বলছি যে গণতন্ত্র এর স্থিতিশীলতার জন্য অবশ্যই ঐতিহ্যগত হবে। পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ায় কতটুকু সম্ভাবনা রয়েছে এর ঐতিহ্যগত প্রতিষ্ঠা লাভের?
