নেতার প্রতি আগ্রহ না থাকলে বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটাররা প্রায়ই ভোটাধিকার প্রয়োগ মনে করেন অর্থহীন। কোনো একটি দলের শক্তিশালী প্রচারক না হলে শাসক নির্বাচনের সিদ্ধান্তকারী বিশাল জনশক্তির তুলনায় তার ভূমিকা পুরোপুরিভাবে অবহেলিত মনে করেন। বাস্তবে তিনি শুধু দুই ব্যক্তির ভেতর যে কোনো একজনের পক্ষে সংশ্লিষ্ট মনস্তত্ত্ব রাজতন্ত্রের বেলা আরোচিত মনস্তত্ত্বের অনুরূপ হয়ে থাকে। রাজাও তার সক্রিয় সমর্থকদের সম্পর্ক গোত্র বা সম্প্রদায়ের সদস্যদের ভেতর বন্ধনের অনুরূপ প্রত্যক্ষ দক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তি বিশেষের ভেতর উৎসর্গের মনোবৃত্তি উজ্জীবিত করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করে থাকেন। ওই ব্যক্তি বড় নেতা হলে এক ব্যক্তির শাসন হয় প্রতিষ্ঠিত। তা না হলে কার্যকরি কমিটিই প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে থাকে তার নির্বাচনী বিজয়ের পশ্চাতে।
প্রকৃত গণতন্ত্র এটা নয়। সরকারের পরিধি বড় হলে গণতন্ত্র সংরক্ষণ সম্পর্কীয় প্রশ্ন কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তী অধ্যায়ে আমি এই আলোচনায় প্রত্যাবর্তন করব।
এ পর্যন্ত আমরা আলোচনা করলাম রাজনীতিতে বিভিন্ন প্রকার শাসন পদ্ধতি। কিন্তু অর্থনৈতিক সংগঠনগুলোতে আবির্ভূত পদ্ধতি এত গুরুত্বপূর্ণ ও অদ্ভুত যে তা দাবি রাখে পৃথক আলোচনার।
কোনো শিল্প উদ্যোগের ক্ষেত্রে প্রারম্ভেই রয়েছে একটি পার্থক্য যা প্রাচীন সমাজে নাগরিক ও দাসের মধ্যকার পার্থক্যর অনুরূপ। মূলধন দাতা একজন নাগরিক, কিন্তু চাকরিজীবী হচ্ছেন একজন দাস। এ ধরনের পার্থক্যে আমি খুব জোর দিতে চাই না। চাকরিজীবী দাসের অনুরূপ নন। কারণ, তিনি চাকরি পরিবর্তন করতে পারেন অথবা ইচ্ছা করলে কাটাতে পারেন অবসর সময়। সরকারের সাপেক্ষে আমি সাদৃশ্য বের করতে চাই। স্বাধীন মানুষের সাপেক্ষে সম্পর্কের ভিত্তিতে স্বৈরাচার, অলিগার্ক ও গণতন্ত্র ভিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়েছে। দাসের সঙ্গে সম্পর্ক অনুযায়ী এগুলো একই ধরনের। অনুরূপভাবে একটি পুঁজিবাদী শিল্প প্রতিষ্ঠানে রাজতান্ত্রিক, অলিগার্ক ও গণতান্ত্রিক পন্থায় বিনিয়োগকারীদের ভেতর ক্ষমতা বন্টন করা হয়। কিন্তু চাকরিজীবীরা বিনিয়োগ না করলে কোনো শেয়ার পায় না এবং তাদের দাবি অবহেলিত থেকে যায় প্রাচীন দাসের মতোই।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বহুরূপতা দেখা যায় অলিগার্কিক সংবিধানের মতো। আমি এ মুহূর্তে ভাবছি না এই সত্য সম্পর্কে যে, চাকরিজীবীরা রয়েছে ব্যবস্থাপনার বাইরে। আমি ভাবছি শুধু শেয়ার মালিকদের কথাই। এ সম্পর্কে ভালো বর্ণনা যে বইতে পাওয়া যায় ইতিমধ্যে আমি এর বর্ণনা দিয়েছি : The Modern Corporation and Private Property by Berley and Means. নিয়ন্ত্রণের ক্রমবিকাশ শিরোনামে এক অধ্যায়ে গ্রন্থকারদ্বয় দেখিয়েছেন যে কিভাবে অলিগার্করা স্বল্প বিনিয়োগের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করে নিয়ন্ত্রণ লাভ করেছে বিশাল সঞ্চিত মূলধনের। Proxy Committee র কলা- কৌশল ব্যবহার করে পরিচালকরা তাদের উত্তরসূরিদের নির্দেশ দিতে পারেন। মালিকানা অসংখ্য ভাগে ভাগ হয়ে পড়লে ব্যবস্থাপনা চিরস্থায়ী হয়ে যেতে পারে। এ শর্তের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থা বর্তমান লেখক অন্যত্র যে সংগঠনে বের করতে পেরেছেন তা হচ্ছে ক্যাথলিক চার্চের উপর প্রভাবশালী সংগঠন। পোপ কার্ডিনালদের নিযুক্ত করেন, আবার কার্ডিনাল পরিষদ পোপ নির্বাচন করেন। এ ধরনের ব্যবস্থা কোনো কোনো বিশাল কর্পোরেশনে বিদ্যমান। আমেরিকায় টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ কোম্পানি এবং আমেরিকার ইস্পাত কর্পোরেশনের বিনিয়োগ যথাক্রমে চার ও দুই বিলিয়ন ডলার। শেষোক্তটিতে পরিচালকমণ্ডলী মাত্র ১.৪ শতাংশের মালিক অথচ তাদের হাতে সম্পূর্ণরূপে অর্থনৈতিক ক্ষমতা।
ব্যবসা কর্পোরেশনগুলো অধিকতর জটিল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে। ভিন্ন ভিন্ন করণীয় কাজ রয়েছে পরিচালকদের, শেয়ার মালিকদের, ডিবেঞ্চার মালিকদের, নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারীদের। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সাধারণ অলিগার্ক ব্যবস্থার অনুরূপ। এর ইউনিট হচ্ছে শেয়ার-শেয়ার মালিক নয়। পরিচালকরা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি। বাস্তবে সাধারণ শেয়ার মালিকদের তুলনায় পরিচালকদের যে ক্ষমতা রয়েছে তা ব্যক্তি অলিগার্কের তুলনায় রাজনৈতিক অলিগার্কের ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। অপরপক্ষে যেখানে ট্রেড ইউনিয়ন সুসংগঠিত সেখানে চাকরির শর্তের ব্যাপারে কর্মচারীদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত রাখার ক্ষমতা রয়েছে। উদ্দেশ্যের অদ্ভূত দ্বৈততা পরিলক্ষিত হয় পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানে : একদিকে জনসাধারণের জন্য দ্রব্য অথবা সেবার যোগান দেয়ার উদ্দেশ্যে এগুলো সৃষ্টি করা হয়ে থাকে; অপরদিকে শেয়ার মালিকদের লাভের অংশ দেয়াও এগুলোর উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে রাজনীতিবিদরা শুধুই বেতন বৃদ্ধির চিন্তা করেন না, বরং জনকল্যাণমূলক কর্মেও ব্রত হন। স্বৈরাচারী সরকারের পক্ষ থেকেও এ ধরনের দাবি উচ্চারিত হয় বলে ব্যবসার চেয়ে রাজনীতিতে অধিক কপটতা বিদ্যমান। কিন্তু গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক প্রচারণার যৌথ প্রভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপতি রাজনৈতিক প্রতারণার কলা-কৌশল আয়ত্ত করেছেন এবং ভান করতে শিখেছেন যে জনকল্যাণই তাদের ধন উপার্জনের উদ্দেশ্য। রাজনীতি ও অর্থনীতি একীভূত হওয়ার আরেকটি দৃষ্টান্ত তা।
