এসব অপরিহার্য সীমাবদ্ধতার জন্য ভোটাররা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্ভর করে সরকারের উপর। সরকার জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেই গণতন্ত্র সফল হয়। দীর্ঘ সংসদ রায় ঘোষণা করে যে, এর সম্মতি ছাড়া সংসদ ভেঙে দেয়া যাবে না। কোন জিনিসটি পরবর্তী সংসদকে এ ধরনের কাজে বাধা দেয়? উত্তরটি যেমন সাধারণ নয় তেমনি নিশ্চিতও নয়। প্রথমে অবস্থায় বিপ্লবাত্মক পরিস্থিতি বিরাজ না করলে বহির্গামী সংসদ সদস্যদের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা বিধিত করে। তাদের অনেকেই আবার নির্বাচিত হতে পারেন। শাসন করার আনন্দ হতে বঞ্চিত হলেও প্রতিযোগীর ভুলের প্রকাশ্য সমালোচনা করে প্রায় সমান আনন্দ পেতে পারেন। যথাসময়ে তারা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু শাসনতান্ত্রিক উপায়ে তাদের কবল থেকে ভোটারদের মুক্তি অসম্ভব হলেও বিপ্লবাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। এতে তাদের সম্পত্তি এমনকি জীবনও হতে পারে বিপন্ন। এ ধরনের হঠকারিতায় সম্পৃক্ত ছিল স্টামফোর্ড ও প্রথম চার্লসের অদৃষ্ট।
ইতিমধ্যে বিপ্লবাত্মক পরিস্থিতি বিরাজ করলে সব কিছু ভিন্ন রূপ ধারণ করত। ধরা যাক একটি রক্ষণশীল দলের এ ধরনের ভয় করার কারণ ছিল যে, পরবর্তী নির্বাচনে কমিউনিস্টরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে এবং ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটাবে কোনোরূপ ক্ষতিপূরণ ছাড়াই। এ ধলনের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল দীঘ সংসদের পক্ষে রায় দিতে পারে। তা প্রতিহত করা যেতে পারে শুধু সেনাবাহিনীর আনুগত্যের ব্যাপারে সন্দেহ দ্বারাই।
গণতন্ত্রের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বাধ্যতামূলক হলেও তা এ ধরনের নিরাপত্তাবোধে ব্যর্থ হবে যে বিপ্লবাত্মক পরিবেশে প্রতিনিধিদের পরিস্থিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সঙ্গে সংসদের মনোভাব বিরোধিতাপূর্ণ হতে পারে। এ ধরনের পরিবেশে সংসদ শক্তিমত্ততার উপর নির্ভর করে কোনোরূপ ঝুঁকি ছাড়াই ব্যর্থ করতে দিতে পারে অধিকাংশ জনগণের উদ্দেশ্য।
এটা বলা যাবে না যে, গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো শাসন পদ্ধতি রয়েছে। শুধু বলা যাবে যে, অনেক বিষয় রয়েছে যার জন্য মানুষ সংগ্রাম করবে এবং এগুলোর উদ্ভব হলে কোনো শাসনই ঠেকাতে পারবে না গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে এমন কোনো বিষয়ের জটিলতা রোধ করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর অন্যতম। যে সমাজে মানুষ গণতন্ত্র চর্চায় অভ্যস্ত সেখানে এই দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী গণতন্ত্র অন্য যে কোনো শাসন পদ্ধতির চেয়ে অগ্রাধিকার পাবার যোগ্য।
শাসন পদ্ধতি হিসেবে গণতন্ত্রের সমস্যা এই যে, তা সব সময় গুরুত্ব আরোপ করে আপসমূলক মনোভাবের উপর। কিন্তু সঠিক মনোভাব এই হওয়া উচিত যে, পরাজিত দল বশ্যতা স্বীকারের উপযোগী কোনো নীতি গ্রহণ করবে। অপরদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সুবিধাবাদী কার্যকলাপ এমন হওয়া উচিত নয় যা জন্ম দিতে পারে বিদ্রোহের। এর জন্য প্রয়োজন অনুশীলন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও পারস্পরিক সহিষ্ণু মনোভাব। এর চেয়েও বেশি প্রয়োজন ভীতশূন্য রাষ্ট্রের। কারণ ভীতিপ্রদ রাষ্ট্রের জনগণ বাধ্য হয় নেতাকে অনুসরণ করতে। এমন ক্ষেত্রে উড়িয়ে দেয়া যায় না নেতার একনায়ক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এই অবস্থায় একমাত্র গণতন্ত্রই স্থিতিশীল সরকার গঠনে সর্মথ। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ডমিনিয়ন স্ক্যানডিনেভিয়া এবং সুইজারল্যান্ড বাহ্যিক প্রভাব ছাড়া খুব কমই বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। স্থিতিশীলতা ছাড়াও গণতন্ত্রের গুণাগুণ এই যে, তা সমাজের মঙ্গলজনক কাজে সরকারকে বাধ্য করে। এগুলো আশানুরূপ না হলেও পরম রাজতন্ত্র, অলিগার্ক অথবা স্বৈরাচারের চেয়ে গণতন্ত্র অনেক বেশি কার্যকরি।
গণতন্ত্রের কিছু সমস্যা রয়েছে আধুনিক বৃহৎ রাষ্ট্রে। সমস্যাগুলো অন্যান্য শাসন পদ্ধতির সঙ্গে তুলনামূলক নয়, বরং তা অপরিহার্য রূপে বিপুল সংখ্যাপ্রসূত। প্রাচীনকালে প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অজ্ঞাত থাকায় নাগরিকরা বাজার এলাকায় জমায়েত হয়ে নিজেদের মতামত দিতে পারত প্রতিটি বিষয়ের উপর। রাষ্ট্রের পরিধি যখন একক নগরভিত্তিক ছিল তখন তা প্রতিটি নাগরিককে ক্ষমতা ও দায়িত্ববোধ দান করে। অধিকাংশ বিষয় এমন ছিল যে, প্রত্যেকেই তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দ্বারা এগুলো বুঝতে পারত। কিন্তু নির্বাচিত আইন পরিষদের অভাবে গণতান্ত্রিক এলাকা বেশি বিস্তার লাভ করেনি। ইতালির বিশাল এলাকায় জনগণকে রোমান নাগরিকত্ব প্রদান করলে রাজনৈতিক নতুন এলাকার নাগরিকরা রাজনৈতিক ক্ষমতায় বাস্তব অংশগ্রহণে সক্ষম হয়নি। কারণ, তা অনুশীলন করতে পারত শুধু রোমে বসবাসকারী জনসাধারণই। আধুনিক বিশ্বে প্রতিনিধি র্নিাচনের মাধ্যমে ভৌগোলিক অসুবিধাগুলো দূর করা হয়। অল্পদিন আগেও প্রতিনিধিরা একবার নির্বাচিত হলে যথেষ্ট ক্ষমতা রাখতেন। কারণ রাজধানী থেকে দূরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী জনগণ কার্যকরি মতামত রাখার জন্য ঘটনাবলি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য শীঘ্র বিস্তারিতভাবে জানতে পারত না। অধুনা সম্প্রচার মাধ্যম দ্রুত যাতায়াত ব্যবস্থা, সংবাদপত্র ইত্যাদির বদৌলতে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোও ক্রমাগতভাবে প্রাচীন নগর রাষ্ট্রের অনুরূপ হতে চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে দূরবর্তী ভোটারদের। অনুসারীরা নেতার উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, নেতাও প্রভাব বিস্তার করতে পারেন অনুসারীদের উপর। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে তা অসম্ভব ছিল। ফলস্বরূপ প্রতিনিধিত্বের গুরুত্ব কমেছে এবং নেতার গুরুত্ব বেড়েছে। সংসদ এখন আর ভোটার ও শাসকদের ভেতর কার্যকরি মাধ্যম নয়। আগের দিনে শুধু নির্বাচনকালে ব্যবহৃত হতো এমন সব প্রচার মাধ্যম আজকাল সব সময়ই প্রচারণা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। জননেতা, অত্যাচারী শাসক, দেহরক্ষী ও নির্বাসিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রাচীন নগর রাষ্ট্রের অনুরূপ রাষ্ট্র আবার জাগরিত হয়েছে। কারণ আবারও দেখা দিয়েছে এর প্রচারণা পদ্ধতি।
