কোনো নতুন ধর্মের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে দিব্যতন্ত্রের গুণাগুণ কখনও খুব মহান এবং কখনও হয়ে পড়ে প্রায় অস্তিত্বহীন। প্রথমত বিপ্লবের পর বিশ্বাসীরা সামাজিক বন্ধনের নাভী গঠন করে এবং মৌলিক বিষয়ে একমত হওয়ার ফলে সহজে সহযোগিতা করতে পারে। সুতরাং তাদের পক্ষে সম্ভব সম্পূর্ণ সচেতন একটি শক্তিশালী সরকার গঠন করা। দ্বিতীয়ত ইতিমধ্যে খেয়াল করা গেছে যে, কোনো কারণে গণতন্ত্র নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ হলে সেখানে সংখ্যালঘিষ্ঠ (জন্ম বা সম্পদের দিক দিয়ে নয়) দল বা চার্চের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা সম্ভব। তৃতীয়ত, এটা নিশ্চিত যে বিশ্বাসীরা সাধারণ মানুষের চেয়ে অধিক শক্তিসম্পন্ন ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং অনেকাংশেই তারা অর্জন করেছে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব। যা হোক কিছু ক্ষমতাসম্পন্ন কিছু ধর্মমতসহ বিশেষ বিশেষ ধর্মমত চাকরি সন্ধানী দুঃসাহসিক লোকসহ শুধু মূর্খ লোককেই আকর্ষণ করে থাকে। তাই দিব্যতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত কতগুলো বৈশিষ্ট্য হলো বুদ্ধিবৃত্তি।
একটি সম্প্রদায়ের সদস্যদের ভেতর ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লে সেখানে অনিবার্যভাবে কঠোর বাছাই সম্পন্ন হয়। খাঁটি বিশ্বাসীরা সত্য বিশ্বাসের প্রচারের উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে; অন্যান্য ব্যক্তিগত বাহ্যিক সাদৃশ্য সন্তুষ্ট থাকে। প্রথমোক্ত মনোভাব মুক্তবুদ্ধিচর্চা নষ্ট করে দেয়। শেষোক্তটি জন্ম দেয় কপটতার। শিক্ষা ও সাহিত্য অবশ্যই ধরাবাঁধা ছকের ভেতর থাকবে এবং উদ্যম ও সমালোচনার পরিবর্তে শুধু বিশ্বাস সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিকল্পিত হবে। নেতারা নিজস্ব মতবাদে আগ্রহী হলে ভিন্ন মতের আবির্ভাব ঘটবে এবং গোঁড়া মতবাদ ক্রমান্বয়ে সঞ্চার করবে অধিকতর শক্তি। যারা ধর্মমতের দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত তারা সাধারণ মানুষের অনুরূপ নয়, দৈনন্দিন জীবন থেকে এ ধরনের ভিন্ন কিছু দ্বারা পরিচালিত হন। এ ধরনের মানুষ কোনো অপ্রিয় সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করলে সমাজের অধিকাংশ মানুষ। স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অধিকতর হঠকারী ও মূর্খ হয়। এটি এমন একটি ফল বা সব চিন্তাই কার্যত ভিন্নমত এবং তাই বিপজ্জনক-এ ধরনের জ্ঞানের দ্বারা উন্নীত হয়। দিব্যতন্ত্রের অনুসারী শাসক অন্ধ অনুরাগের বশবর্তী হবেন; অন্ধ অনুরাগের ফলে তিনি মারাত্মক হবেন; মারাত্মক হলে তিনি বিরোধিতার সম্মুখীন হবেন; বিরোধিতার সম্মুখীন হলে তিনি আরও মারাত্মক হবেন। তার ক্ষমতা তাড়না ধর্মীয় উন্মাদনার ছদ্মাবরণে আবৃত থাকবে। ফলে তা পর্যবসিত হবে নিয়ন্ত্রণহীনতায়। ধ্বংস ও বিপন্ন অবস্থা এবং নাজি পুলিশ ও চেক এর জন্যেই।
আমরা দেখেছি যে, দোষ-গুণ-ই আছে রাজতন্ত্র ও অলিগৰ্কীর। উভয়টির প্রধান ত্রুটি হচ্ছে, যে সরকার এক সময় সাধারণ মানুষের স্বার্থের প্রতি এতই উদাসীন হয়ে পড়ে যে বিপ্লব সংগঠিত হয়। গণতন্ত্র দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে তা এ ধরনের অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। যেহেতু গৃহযুদ্ধ গুরুতর অমঙ্গলজনক সুতরাং যে সরকার ব্যবস্থা গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা দূর করে দেয় তা প্রশংসার দাবি রাখে। এখন গৃহযুদ্ধ অসম্ভব, কিন্তু সংঘটিত হলে তা আগের ক্ষমতাসীনদের জন্য নিয়ে আসবে বিজয়। অন্যান্য কিছু অপরিবর্তিত থাকলে গৃহযুদ্ধে সংখ্যালঘু সরকারের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের বিজয়ের সম্ভাবনা বেশি। এগুলো গণতন্ত্রের পক্ষের যুক্তি; অধুনা বিভিন্ন উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে তা অনেক সীমাবদ্ধতার অধীন।
একটি সরকার গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করে রাজনৈতিক ক্ষমতায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অংশগ্রহণের ফলে। চরম গ্রিসীয় গণতন্ত্রে মহিলা ও দাসের স্থান ছিল না। মহিলাদের ভোটাধিকার প্রদানের আগেই আমেরিকানরা নিজেদের গণতান্ত্রিক ভাবত। স্পষ্টতই রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে গণতন্ত্রের কাছাকাছি এসে যায় একটি অলিগার্কি ব্যবস্থা। কিন্তু অংশগ্রহণকারী লোকের সংখ্যা হ্রাস পেলে দেখা দেয় অলিগার্কির বৈশিষ্ট্য।
সব সংগঠনের বিশেষত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সরকারের সমস্যা দুধরনের। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি হচ্ছে শাসিতের কাছ থেকে সম্মতি আদায় করা। শাসিতের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি হচ্ছে শাসিতের স্বার্থের ক্ষতিয়ান নিতে সরকারকে উদ্বুদ্ধ করা। সমস্যা দুটির যে কোনো একটি সমাধান হয়ে গেলে দেখা দেয় না অন্যটি। কিন্তু উভয়টির সমাধানের অভাবে দেখা দেয় বিপ্লব। সাধারণ একটি সমঝোতামূলক সমাধানে পৌঁছা সম্ভব। পেশিশক্তির কথা বাদ দিলে সরকার পক্ষের প্রধান উৎপাদকগুলোর পেশি হচ্ছে ঐতিহ্য, ধর্ম, বৈদেশিক শত্রুর ভয় এবং নেতাকে অনুসরণ করার স্বাভাবকি ইচ্ছা। শাসিতের স্বার্থ রক্ষার জন্য কোন মাত্রা কার্যকর–এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত পদ্ধতিই হচ্ছে গণতন্ত্র।
শাসন পদ্ধতি হিসেবে কিছু অপরিহার্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে গণতন্ত্রের। অন্যান্য ক্ষেত্রে এগুলো নীতিগতভাবে পরিহারযোগ্য। এ সীমাবদ্ধতার উদ্ভব হয় প্রধানত দুটো উৎস থেকে। কিছু ক্ষেত্রে ত্বরিত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় বিশেষজ্ঞ পরামর্শ। ১৯৩১ সালে ব্রিটেন যখন স্বর্নমান পরিত্যাগ করে তখন উভয় উৎপাদকই জড়িত ছিল। সমস্যাগুলো এমন ছিল যে, তা বুঝত না অধিকাংশ মানুষই। গণতন্ত্র তাই অতীত দৃশ্যাদি অবলোকনপূর্বক এর মতামত প্রকাশ করতে পারত। যুদ্ধ মুদ্রার চেয়ে কম কৌশলসম্পন্ন, কিন্তু তুরিতাবস্থাজনিত।
