আরও গুরুত্বপূর্ণ রাজতন্ত্র পতনের অন্য কারণটি। রাজারা সমাজের নির্ভরশীল হয়ে পড়েন বিশেষ অংশের উপর : অভিজাত শ্রেণি, চার্চ, উচ্চ বুর্জোয়া অথবা সম্ভবত কোনো ভৌগোলিক দল যেমন, কোজাক। ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায় অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ফলে সুবিধাভোগী বলের ক্ষমতা এবং তাদের সঙ্গে রাজাও হয়ে ওঠেন অপ্রিয়। নিকোলাস-২ এর মতো তিনি নিজ দলের পূর্ণ সমর্থন লাভের পরিবর্তে তা হারানোর মতো নির্বোধ হতে পারেন; কিন্তু এটা ব্যতিক্রমধর্মী। চার্লস-১ ও লুইস-১৬ অভিজাতদের সমর্থন পেয়েছিলেন, কিন্তু তাদের পতন ঘটে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিরোধী হওয়ার ফলে।
একজন রাজা বা স্বৈরচারী শাসক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারেন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ধূর্ত হলে এবং বাহ্যিকভাবে সফল হলে। তার রাজবংশ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে তিনি আপাত ঐশ্বরিক হলে। কিন্তু সভ্যতার বিকাশ তার স্বর্গীয় দাবির প্রতি বিশ্বাসের পরিসমাপ্তি ঘটায়। যুদ্ধের পরাজয় সবসময় সংঘটিত হলে কোনো এক সময় বিপ্লব হতে পারে এবং নিশ্চিত হয়ে যেতে পারে রাজতন্ত্র।
রাজতন্ত্রের স্বাভাবিক উত্তরাধিকার হচ্ছে অলিগার্কি। অলিগার্কি অনেক ধরনের হতে পারে : তা হতে পারে বংশপরম্পরায় অভিজাতদের, ধনীদের, চার্চের অথবা রাজনৈতিক দলের। বিভিন্ন ফল পাওয়া যায় এগুলো থেকে। উত্তরাধিকারমূলক জমিদারি আভিজাত্য, রক্ষণশীল, গর্বিত, মূর্খ এবং এমনকি নিষ্ঠুরও হতে পারে। এসব কারণে তা সবসময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয় উচ্চ বুর্জোয়াদের সঙ্গে সংগ্রামে। মধ্যযুগে সব স্বাধীন শহরগুলোতে ধনীদের শাসন জয়ী হয় এবং তা ভেনিসে টিকে থাকে নেপোলিয়ান কর্তৃক বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত। মোটের উপর ইতিহাসে জ্ঞাত অন্যান্য শাসনের চেয়ে এ ধরনের শাসন অধিকতর জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত ও ধূর্ততাপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে জটিল ষড়যন্ত্রে নিমজ্জিত ভেনিস শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিচক্ষণতার দিকনির্দেশনা দেয় এবং অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতাপূর্ণ কূটনৈতিক বিভাগ চালু করে। বাণিজ্যলব্ধ অর্থ চাতুর্যজাত ছিল, কিন্তু স্বেচ্ছাচারজাত নয়। বণিকদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারের ভেতর এই বৈশিষ্ট্যগুলো পরিলক্ষিত হয়। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি আধুনিক শিল্পে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। এর আংশিক কারণ এই যে, তারা কাঁচামাল ব্যবহার করে থাকেন কৌশলগতভাবে নিপুণতার সঙ্গে। এর আংশিক কারণ এও হতে পারে যে, জনসাধারণের সঙ্গে তাদের আচরণ সমপর্যায়ভুক্ত লোকের সঙ্গে নয় বরং সৈনিক কর্মচারীদের সঙ্গে আচরণের মতো, যারা অবশ্যই প্রত্যায়াপন্ন হবেন, কিন্তু হবেন না দমিত।
চার্চ বা রাজনৈতিক দলের সমর্থনপুষ্ট সরকার (যাকে দিব্যতন্ত্র ও সেন্ট পিটারের পিতৃত্বে এবং জেসুটের রাজত্বকালে) পেরাগুয়েতে বিরাজ করে। কিন্তু এর আধুনিক রূপটি কেলভিনের শাসনের মাধ্যমে জেনেভাতে শুরু হয়। ব্যতিক্রম শুধু মুনস্টারে এনাবেপ্টিস্টদের স্বল্পকালীন আন্দোলন। এর চেয়েও আধুনিক রূপটি দরবেশদের শাসন যা পুনর্জাগরণের সময় ইংল্যান্ডে সমাপ্ত হয়। তবে তা কিছুকালের জন্য টিকে ছিল নতুন ইংল্যান্ডে। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে এ ধরনের সরকারের স্থায়ী বিলুপ্তি ঘটেছে বলে মনে হয়। কিন্তু পুনরুজ্জীবিত হয় লেলিন কর্তৃক। ইতালি ও জার্মানিতে তা গৃহীত হয় এবং এর জন্য জোর প্রচেষ্টা চলে চীনে।
রাশিয়া ও চীনের মতো যেসব দেশে জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই অশিক্ষিত ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাশূন্য সেখানে বিপ্লবীরা সম্মুখীন হয় কঠিন পরিস্থিতির। সম্ভবত সফল হতো না পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র। এর জন্য চেষ্টা করা হয়েছে চীনে, কিন্তু প্রথম থেকেই পরিণত ছিল কলঙ্কজনক। অপরপক্ষে রাশিয়ায় অঞ্চলভিত্তিক আভিজাত্য ও মধ্যবিত্ত বনিক শ্রেণির প্রতি বিপ্লবী দলগুলোর ছিল শুধু ঘৃণাই। এসব শ্রেণির মানুষের সমন্বয়ে গঠিত অলিগার্ক দ্বারা কোনো লক্ষ্যই অর্জন করার ছিল না। তাই তারা বলেছিলেন, বিপ্লবী দল হিসেবে আমরা দেশে গণতন্ত্রের ক্ষেত্র সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখব এবং এর ভেতর আমাদের নীতি অনুযায়ী আমরা দেশবাসীকে শিক্ষিত করে তুলব।
যা হোক আশানুরূপ ফল লাভ হয়নি পুরনো বলশেভিকদের। ক্রমাগতভাবে মারাত্মক রূপ ধারণ করে গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং কৃষক অসন্তোষের মুখে একনায়কতন্ত্র। পাশাপাশি লেলিনের মৃত্যুর পর কমিউনিস্টদের দলীয় কোন্দলের ফলে একদলীয় শাসন কঠিন ছিল না। আমি ১৯২০ সালে লিখেছিলাম : বর্তমানে রাশিয়া যে অবস্থার সম্মুখীন বলশেভিক তত্ত্ব অনুসারে আজ হোক কাল হোক প্রতিটি দেশ একই অবস্থার সম্মুখীন হবে এবং এমন অবস্থায় প্রতিটি দেশ নির্মম লোকের হাতে পড়বে যারা স্বাধীনপ্রিয় নয় স্বভাবগতভাবে। একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের গুরুত্ব কমই দেবে তারা। এটি অনিবার্য যে রাশিয়ায় বলশেভিকদের মতো অন্যান্য দেশে যেসব ব্যক্তি অনুরূপ অবস্থানে রয়েছে তারা ছেড়ে দেবে তাদের ক্ষমতার একচেটিয়া অধিকার এবং নতুন বিপ্লবের মাধ্যমে বিতাড়নের পূর্ব পর্যন্ত টিকে থাকার জন্য চেষ্টা করবে যুক্তি খুঁজে বের করার। অন্যান্য ক্ষেত্রে গুণাগুণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এসব কারণে দিব্যতন্ত্রকে গণতন্ত্রের দিকে গণ্য করা কঠিন একটি পদক্ষেপ হিসেবে।
