এর গুণাগুণ পরিষ্কার মনোবিজ্ঞান সম্মতভাবে। সাধারণত নেতা কোনো গোত্র বা সম্প্রদায়কে বিজয়লাভে পরিচালিত করেন এবং তার অনুসারীরা নিজেদের তার গৌরবের অংশীদার বলে মনে করেন। সাইরাস মিডসদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে পারসিকদের নেতৃত্ব দেন; আলেকজান্ডার মেসিডোনিয়াবাসীদের ক্ষমতা সম্পদ দান করেন; নেপোলিয়ান বিপ্লবী সৈন্যদের বিজয় এনে দেন। তা-ই ছিল লেনিন ও হিটলারের সঙ্গে নিজ নিজ দলের সম্পর্ক। যে দল বা সম্প্রদায়ের প্রধান হচ্ছেন একজন বিজয়ী ব্যক্তি সে দল বা সম্প্রদায় স্বেচ্ছায় তাকে অনুসরণ করে এবং তার সফলতার প্রশান্তি অনুভব করে। শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভীতি বিরাজমান যাদের তিনি পরাস্ত করেন তাদের ভেতর। কোনো রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ বা আপসভ্যাসের প্রয়োজন নেই; একমাত্র সহজাত সামাজিক বন্ধন অন্তর্হিত ছোট দলের ভেতর বিরাজমান বন্ধনের মতোই এবং তা এই সত্যের জন্য সহজ হয়ে যায় যে, সবকিছুই নির্ভর করে বীরের কৃতিত্বের উপর। তিনি যখন মারা যান তখন তার কাজ হয়ে যেতে পারে টুকরো টুকরো। কিন্তু ভাগ্যক্রমে কোনো সক্ষম উত্তরাধিকারী নতুন ক্ষমতা চালিয়ে যেতে পারে প্রথাগত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।
নেতা ও অনুসারীদের সম্পর্ক ভিন্ন অন্য যে সম্পর্ক একই সম্প্রদায়ের লোককে একত্রিত করে রেখেছে তার অসুবিধা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের সাপেক্ষে। বিজয়ের মাধ্যমে ছোট দৃষ্টান্ত খুবই কম। কারণ, ফিলিপের সময় গ্রিস ও রেনেসাঁ ইতালির বিভিন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভেতর সামান্যতম সহযোগিতা ও জীবন-মৃত্যুর ব্যাপার ছিল। এ সত্ত্বেও তা ঘটেনি। আজকাল একই জিনিস সত্য ইউরোপের বেলায়। আদেশদানে অথবা স্বাধীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ব্যক্তিকে প্রভাবিত করা সহজ নয় যে তিনি স্বেচ্ছায় বাইরের শক্তির কাছে মাথা নত করবেন। কিন্তু সাধারণত তা দস্যুদলের অনুরূপ এবং তাদের হাতে নেতৃত্বদানের ক্ষমতা অর্পণের ব্যাপারে নেতার অভিপ্রায়ে বিশ্বাস রাখে। এই ক্ষেত্রে চুক্তিটি রুশোর নয় বরং হবসের। এটি এমন এক চুক্তি যার মাধ্যমে নাগরিকরা পরস্পরের সঙ্গে অভিনয় করে থাকে–এটা নেতা ও অনুসারীদের মধ্যকার চুক্তি নয়। মনোবিজ্ঞানসম্মত গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে যে, মানুষ এ ধরনের চুক্তি শুধু তখনই মেনে নিতে রাজি হয় যখন দেখা দেয় লুণ্ঠন ও বিজয়ের সমূহ সম্ভাবনা। স্বাভাবিকভাবে নগ্ন আকারের না হলেও এটাই মনোবিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া, যার ফলে স্বৈরাচারী নয় এমন রাজারা সফল যুদ্ধের মাধ্যমে হতে পেরেছে এর আরও অধিক কাছাকাছি।
এই আলোচনা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় যে, রাজার স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার প্রতি যখন সিংহাসনের কাছাকাছি একদল লোকের স্বেচ্ছামূলক সম্মতির প্রয়োজন হয়ে পড়ে তখন স্বভাবতই অধিকাংশ প্রজা প্রথমে ভয়ে ও পরে মেনে নেয় ঐতিহ্যগতভাবে অধীনতা। যে অর্থে সামাজিক চুক্তি পুরোপুরিভাবে অবাস্তব নয় শুধু সে অর্থে তা বিজয়ীদের চুক্তি। এ চুক্তি আসল উদ্দেশ্য হারিয়ে বসে বিজয়ের ফলোভে বঞ্চিত হলে। একাধিক সম্প্রদায়ে বিস্তৃত ক্ষমতার অধিকারী রাজার প্রতি অধিকাংশ প্রজার বশ্যতার মূল কারণ স্বেচ্ছামূলক সম্মতি নয়, ভয়।
দলের অভ্যন্তরে আনুগত্যের উদ্দেশ্য এবং সাধারণ জনগণের ভেতর ভয় এত সহজ ও সরল যে সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর বিস্তৃতি শুধুই বিজয়ের মাধ্যমে হয়েছে স্বেচ্ছামূলক ফেডারেশন দ্বারা নয়। একই কারণে রাজতন্ত্র এত গুরুত্ব বহন করছে ইতিহাসে।
যা হোক রাজতন্ত্রের রয়েছে অনেক বড় অসুবিধা। তা উত্তরাধিকারমূলক হলে শাসকদের টিকে থাকা সন্দেহজনক। সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে গৃহযুদ্ধ হতে পারে উত্তরাধিকার আইনে কোনোরূপ অনিশ্চয়তা থাকলে। প্রাচ্যে একজন শাসক তার ভাইদের হত্যার মাধ্যমে শুরু করেন; কিন্তু একজন পালিয়ে যেতে পারলে তিনি দাবি উত্থাপন করতেন সিংহাসনের। পড়া যেতে পারে MAINUC CIS STORIA DO MOGOR নামক বইটি। বইটিতে মহান মোগলদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, উত্তরাধিকারমূলক যুদ্ধ অন্য যে কোনো কারণের চেয়ে তাদের সাম্রাজ্যকে অধিকতর দুর্বল করে দেয়। একই শিক্ষা গোলাপ যুদ্ধ দিয়ে থাকে আমাদের দেশে।
অপরপক্ষে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা এর চেয়ে বেশি রাজতন্ত্র উত্তরাধিকারমূলক না হলে। এ ধরনের বিপদের উদাহরণ হচ্ছে কমোডসের মৃত্যুর পর ক্রিস্টেন্টাইনের সিংহাসন আরোহণ পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য। এ সমস্যার একমাত্র সমাধান পরিকল্পিত হয়েছে; এটা এমন পদ্ধতি যার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে থাকেন পোপ। কিন্তু তা হচ্ছে গণতন্ত্র থেকে শুরু করে উন্নয়নের সর্বশেষ পরিভাষা। এক্ষেত্রেও বিরাট অনৈক্য থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, এ পদ্ধতিও অভ্রান্ত নয়।
রাজতন্ত্রে আরও মারাত্মক অসুবিধা এই যে, রাজার স্বার্থের অনুকূল প্রজাদের স্বার্থ না হলে সাধারণত তা প্রজাদের স্বার্থের প্রতি উদাসীন হয়। বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত থাকা সম্ভব স্বার্থের অভিন্নতা। রাজার আগ্রহ অভ্যন্তরীণ অরাজকতা দমনে বিদ্যমান। সুতরাং অরাজকতার বিপদ দেখা দিলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সম্প্রদায় অরাজকতা দমনে রাজাকে সমর্থন করেন। প্রজাদের সম্পর্কে তার আগ্রহ রয়েছে কারণ তাতে কর অধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। রাজা ও প্রজাদের স্বার্থ অভিন্নরূপে দেখা দেয় বৈদেশিক যুদ্ধে বিজয়ী হলে। তাই রাজ্য বিস্তারে সমর্থ হলে তার নেতৃত্বাধীন দলটি তার কাজকে লাভজনক মনে করে। কিন্তু রাজারা দুটো কারণে বিপথগামী হন : গর্ব এবং নিষ্প্রভ অভ্যন্তরীণ দলের উপর নির্ভরতা। গর্ব সম্পর্কে : মিসরীয়রা পিরামিড তৈরির ব্যাপারে কষ্ট করলেও ফরাসিরা পরিশেষে প্রতিবাদ করেছে ভার্সাই এবং লভার সম্পর্কে। নীতিবাদীরা কঠোর ভাষা প্রয়োগ করেছে কোর্টের বিলাসিতার উপর। বাইবেলের অপ্রামাণিক অংশে মদ খারাপ, নারী খারাপ, রাজা খারাপ বলে বর্ণিত আছে।
