জাতীয়তাবোধের জন্য রাষ্ট্রীয় পরিবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা হচ্ছে দলীয় রাজনীতি বা ধর্মে দৃষ্ট সীমাবদ্ধতার মতোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। আমি এই পরিচ্ছেদে উদ্দেশ্য থেকে মুক্ত জীবনপ্রাপ্ত সংগঠনগুলোর আলোচনা করব। এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি যে, তা সম্ভব বিশেষ সীমা পর্যন্ত। আলোচনা প্রয়োজন এই সীমানার বাইরে আবেগ-উচ্ছ্বাসে সংগঠনের যে আবদেন রয়েছে তার।
বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায় ব্যক্তি বিশেষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে প্রতিটি শ্রেণিই হচ্ছে অনুভূতির এবং কিছু সংখ্যক মনোবিজ্ঞানী একে অভিহিত করেছেন অনুভূতি আশ্রিত অভিমত নামে। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনুরাগের পর্যায়ে রয়েছে দেশপ্রেম, পরিবারপ্রেম, ক্ষমতাপ্রীতি, উপভোগপ্রীতি এবং আরও কিছু। আবার বিরাগ মনোভাবের পর্যায়ে রয়েছে বেদনাপ্রীতি, বিদেশিদের প্রতি ঘৃণা ইত্যাদি। কোনো এক বিশেষ সময়ের একটি মানুষের আবেগ মিশ্রিত অনুভূতি হচ্ছে তার স্বভাব, তার বিগত ইতিহাস এবং বর্তমান পরিবেশের জটিল সৃষ্টি। দৃষ্টান্তস্বরূপ ধরা যাক পারিবারিক অনুভূতি। তা গৃহায়ন, শিক্ষা বা জীবন বীমার মতো যেসব বিষয়ে বিভিন্ন পরিবারের সিল রয়েছে ওই সব বিষয়ের জন্য সংগঠন সৃষ্টি করেছে। বর্তমানের চেয়ে বেশি পরিমাণে অতীতে তা জন্ম দিয়েছে অনেকগুলো পরিবারের স্বার্থরক্ষার জন্য বিশেষ পরিবারের। দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যায় মন্টেগু ও ক্যাপুলেট স্বার্থরক্ষাকারী সংগঠনের। এমন একটি সংগঠন হলো রাজবংশোদ্ভূত রাষ্ট্র। অভিজাত সরকার হচ্ছে বিশেষ পরিবারগুলোর সমন্বয়ে গঠিত, যা সমাজের অবশিষ্টাংশের স্বার্থের বিনিময়ে সমন্বয়কারী পরিবারগুলোর সুবিধাদির উদ্দেশ্যে গঠিত। এ ধরনের সংগঠন সবসময়ই কমবেশি পরিবারগুলোর সুবিধাদির সংবলিত। বিরাগ অনুভূতিগুলো হচ্ছে ভয়, ঘৃণা, অবমাননা ইত্যাদি। এ ধরনের অনুভূতি তীব্রভাবে অনুভূত হলে তা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় সংগঠনের পরিবৃদ্ধির সাথে।
এই সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা প্রদান করে ধর্মতত্ত্ব। খ্রিস্টীয় যুগের প্রথম দিকে কয়েক শতাব্দী ছাড়া অন্য কোনো সময়েই ইহুদিদের উদ্দেশ্য ছিল না। জেন্টাইলদের ধর্মান্তরিত করার। তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতির দ্বারা সন্তুষ্ট ছিল। জাপান অবশিষ্ট দুনিয়ার আগে সৃষ্টি হয়েছিল–সিন্টের এই শিক্ষা জাপানি ছাড়া কারো অনুভূতিতে নাড়া দেবে এমন আশা করা যায় না। প্রত্যেকেই এই গল্প জানে যে, ওল্ড লিকট স্বর্গে উপস্থিত হয়ে অন্য মানুষের উপস্থিতি আবিষ্কারে বাধাপ্রাপ্ত হন, কারণ ভয় ছিল যে এতে নষ্ট হবে তাদের স্বর্গীয় সুখভোগ। একই ধরনের অনুভূতি নিতে পারে আরও অশুভ রূপ। অত্যাচারীদের কাছে অত্যাচার এত আনন্দের নয় যে, ভিন্ন মতাবলম্বী শূন্য পৃথিবী তার কাছে অসহনীয় হবে। অনুরূপভাবে হিটলার ও মুসোলিনি যেহেতু মনে করেন যে, যুদ্ধ মানবীয় কার্যাবলির ভেতর সবচেয়ে মহৎ কাজ সুতরাং পুরো পৃথিবী জয়ের পর যুদ্ধ করার মতো কোনো শত্রু অবশিষ্ট না থাকলে তারা সুখি হতে পারবে না। দলীয় রাজনীতিতে একটি দলের প্রশ্নাতীত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হলে তা দাঁড়ায় নিরানন্দের কারণ হয়ে।
যে সংগঠন এভাবে ব্যক্তি বিশেষের প্রতি এর আবেদন, গর্ব, হিংসা, ঘৃণা, : অবমাননা অথবা প্রতিযোগিতায় আনন্দের মধ্য থেকে পেয়ে থাকে তা বিশ্বব্যাপী হয়ে পড়লে পূর্ণ করতে পারে না এর উদ্দেশ্য। যে বিশ্বে এ ধরনের ভাবাবেগ খুব বেশি শক্তিশালী সেখানে কোনো সংগঠন বিশ্বব্যাপী হয়ে পড়লে তা নিশ্চিতভাবে ভেঙে পড়বে চালিকাশক্তির অভাবে।
এ পর্যন্ত আমরা যা আলোচনা করেছি তাতে দেখা যাবে যে নেতৃত্বের চেয়ে আমরা সংগঠনের সাধারণ সদস্যদের অনুভূতি নিয়েই আলোচনা করেছি বেশি। যাই হোক না কেন সংগঠনের উদ্দেশ্য, এর নেতৃত্ব ক্ষমতা থেকে তৃপ্তি পেয়ে থাকে। তাই তাদের স্বার্থ হয় না সাধারণ সদস্যদের স্বার্থের মতো। তাই নেতৃত্বের ভেতর বিশ্বজয়ের আকাক্ষা যতটা প্রবল ততটা নয় সদস্যদের ভেতর।
১২. ক্ষমতা ও শাসন পদ্ধতি
কোনো সংগঠনের উদ্দেশ্যের কথা বাদ দিলেও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে– (১) আকার, (২) সদস্যদের উপর ক্ষমতা (৩) সদস্য নয় এমন মানুষের উপর ক্ষমতা এবং (৪) সরকারের ধরন। পরবর্তী পরিচ্ছেদে আমি আকার সম্বন্ধে আলোচনা করব। বাকিগুলো বর্তমান পরিচ্ছেদের আলোচ্য বিষয়।
রাষ্ট্র ছাড়া আইনানুগ স্বীকৃত সংগঠনগুলো সদস্যদের উপর সীমাবদ্ধ ক্ষমতা প্রয়োগ করে আইনের মাধ্যমে। যদি আপনি একজন ব্যারিস্টার, সলিসিটর, চিকিৎসক বা ঘোড়দৌড়ের ঘোড়ার মালিক হন, আপনার সম্প্রদায় থেকে আপনি বিতাড়িত হতে পারেন, হতে পারেন আপনি তালিকাচ্যুত, অযোগ্য ঘোষিত হতে পারেন ঘোড়দৌড় ব্যবসায়, অথবা আপনাকে সতর্ক করা যেতে পারে ঘোড় দৌড় মাঠ থেকে সরে পড়ার জন্য। এসব শাস্তি অপমানজনক এবং প্রথম তিনটি অর্থনৈতিকভাবে চরম কষ্টকর। কিন্তু আপনি যতই আপনার পেশায় অপ্রিয় হোন না কেন আইনগতভাবে আপনার সহকর্মীরা আপনার পেশাগত অনুশীলনে বাধা প্রদান ছাড়া কিছুই করতে পারবে না। আপনি যদি রাজনীতিবিদ হন তবে আপনি অবশ্যই কোনো দলের অন্তর্ভুক্ত হবেন; কিন্তু আপনাকে অন্য দলে যোগদানে অথবা সংসদীয় প্রতিযোগিতা থেকে দূরে শান্তিপূর্ণ বসবাসে বাধা দেয়া যাবে না। রাষ্ট্র ছাড়া অন্যান্য সংগঠনগুলোকে সদস্যদের উপর ক্ষমতা নির্ভর করে এর বিতাড়ন করার অধিকারের উপর এবং তা কমবেশি মারাত্মক বিতাড়নের সঙ্গে জড়িত অপমান ও অর্থনৈতিক কষ্ট অনুসারে।
