ওইদিকে সব রাজনৈতিক দলেল সাংগঠনিক ক্ষমতা প্রভূত বৃদ্ধি পেয়েছে, তারপরও এখনও তা কমিউনিস্ট, ফ্যাসিস্ট ও নাজিদের তুলনায় অপরিমিতভাবে কম গণতান্ত্রিক দলগুলোতে। ঐতিহাসিক ও মনোগত দিক দিয়ে শেষোক্তগুলো গোপন সংস্থার বিকাশ-রাজনৈতিক দলের নয়। স্বেচ্ছাচারী সরকারের অধীন যেসব মানুষ মৌলিক পরিবর্তন চায় তারা গোপনীয়তার দিকে ধাবিত হয় এবং যখন তারা একত্রিত হয় তখন বিশ্বাসঘাতকতার ভয় তাদের কঠোর শৃঙ্খলার দিকে পরিচালিত করে। গুপ্তচর-মুক্ত বিশেষ নিরাপদ জীবন পদ্ধতিই স্বাভাবিক। ঝুঁকি, গোপনীয়তা, বর্তমান দুঃখভোগ এবং ভবিষ্যৎ বিজয়ের আশা এক প্রকার ধর্মীয় আনন্দানুভূতি এবং যাদের মধ্যে এই ভাব সহজেই উদিত হয় শুধু তারাই আকর্ষিত হয়ে থাকে। একটি বিপ্লবী গোপন সংস্থার লক্ষ্য অরাজকতা হলেও এর ভেতর স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যকলাপের ঊর্ধ্বে বহু বিস্তৃত পরিদর্শন সংবলিত একটি কঠোর স্বৈরাচারী শাসনের সম্ভাবনা দেখা যায়। নেপোলিয়ানের মৃত্যুর পর ইতালি গোপন সংস্থার পরিপূর্ণ হয়ে পড়ে, যেগুলোর প্রতি কিছু মানুষ আকর্ষিত হয় বিপ্লবী তত্ত্বের দ্বারা ও অন্যান্য মানুষ অপরাধমূলক কাজের দ্বারা। রাশিয়ায় একই ব্যাপার ঘটে সন্ত্রাসবাদের সাথে সাথে। রাশিয়ায় কমিউনিস্টরা ও ইতালিতে ফ্যাসিস্টরা গোপন সংস্থার মানসিকতায় গভীরভাবে উচ্ছ্বসিত ছিল এবং এগুলোর উপর নির্ভর করে রচিত হয় নাজিদের কাঠামো। তাদের কিছু নেতা সরকার গঠন করলে তারা দল পরিচালনার একই যুক্তি সাহায্যে রাষ্ট্র শাসন করে। বিশ্বব্যাপী তাদের অনুসারীদের ভেতর অধীনতামূলক আপেক্ষিক স্পিরিট কাম্য।
অর্থনৈতিক সংগঠন আকারে বৃদ্ধি পেলে জন্ম দেয় ক্ষমতার গতিবিজ্ঞান সম্বন্ধীয় মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গির। এ বিষয়ের উপর তিনি যা বলেছেন তার অনেকটাই পরিণত হয়েছে সত্যে। কিন্তু এগুলো ক্ষমতা তাড়নার অবদানে সক্ষম সব সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য-অর্থ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেই নয় শুধু। উৎপাদনের এই প্রবণতা ট্রাস্টের জন্ম দেয় যা বৃহৎ রাষ্ট্র এবং এর উপরাষ্ট্রের সঙ্গে সমভাবে বিস্তৃত; কিন্তু কদাচই অস্ত্র কারখানা ছাড়া বিশ্বব্যাপী ট্রাস্ট গঠনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। টারিফ ও কলোনিগুলো রাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী করে তুলেছে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। অথনৈতিক পরিমন্ডলে বৈদেশিক বিজয় ট্রাস্টভুক্ত রাষ্ট্রের জাতীয় সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল। সীমাবদ্ধ ক্ষেত্র ছাড়া আজকাল তা আর পুরনো পদ্ধতির খাঁটি ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার দ্বারা পরিচালিত নয়। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর চেয়ে ইতালি ও জার্মানিতে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক আরও গভীর এবং স্পষ্ট। কিন্তু এ কথা মনে করা ভুল হবে যে, ফ্যাসিবাদের অধীন বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইংল্যান্ড, ফ্রান্স অথবা আমেরিকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে রাষ্ট্রকে অধিক নিয়ন্ত্রণ করে। অপরপক্ষে ইতালি ও জার্মানিতে বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অন্য সব কিছুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কমিউনিস্ট ভীতির ব্যবহার করছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, ইতালিতে বাধ্যতামূলক মূলধন সংগ্রহের সূচনা হচ্ছে, কিন্তু পক্ষান্তরে ব্রিটিশ শ্রমিক দল কর্তৃক একই জাতীয় অপেক্ষাকৃত মৃদু প্রস্তাব জন্ম দেয় পুঁজিপতিদের হৈচৈয়ের এবং সফল হয় পুরোপুরিভাবে।
এর শক্তি আগের যে কোনো একটি অথবা একত্রে উভয়টি শক্তির চেয়ে বেশি হয়ে তাকে মানানসই ভিন্ন উদ্দেশ্যের দুটো সংগঠন একত্রীভূত হলে। যুদ্ধের আগে মহান উত্তরাঞ্চলীয় লন্ডন থেকে ইয়র্ক, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয়রা ইয়র্ক থেকে নিউকেসল এবং উত্তর অঞ্চলে ব্রিটিশরা নিউকেসল থেকে এডিনবার্গ গিয়েছেন। আজকাল LNER-রা সব দিকে যায় এবং স্পষ্টত তিনটি কোম্পানির চেয়ে শক্তিশালী। অনুরূপভাবে একটি ইস্পাত কারখানা খনিজ নিষ্কাশন থেকে শুরু করে জাহাজ নির্মাণ পর্যন্ত একই কর্পোরেশন কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ হওয়া সুবিধাজনক। এই কারণে একটি স্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে একত্রীকরণের। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই তা সত্য নয়। এ পদ্ধতির যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন রাষ্ট্র অন্য সব সংগঠনকে আত্তীকৃত করে ফেলে। সংগঠন বিভিন্ন রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সংগঠন হলে একই ধরনের প্রবণতা কালের প্রবাহে এক সময় বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় পরিচালিত হবে। যদি বিভিন্ন রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সংগঠন হলে একই ধরনের প্রবণতা কালের প্রবাহে এক সময় বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় পরিচালিত হবে। যদি বিভিন্ন রাষ্ট্রের সম্পদ, স্বাস্থ্য, বুদ্ধিমত্তা অথবা নাগরিকদের সুখ অর্জন হয় তবে তা অসঙ্গতিপূর্ণ কিছু হবে না। তবে এগুলোকে জাতীয় ক্ষমতার চেয়ে মনে করা হয় কম গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের ভেতর সংঘাত দেখা দেয় এবং একত্রীকরণের পরিণাম ভালো হয় না। পরিণামে একটি বিশ্বরাষ্ট্র শুধু সম্ভব যদি একটি জাতীয় রাষ্ট্র পুরো পৃথিবী জয় করে অথবা জাতীয়তাবাদের গন্ডি অতিক্রম করে একটি ধর্মমত বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে।
