সর্বতোভাবে এ কথা বলা যাবে না যে, দূরবর্তী এলাকাগুলোতে ক্ষমতার ব্যবহার সহজ হয়ে কলাকৌশলের উন্নতির ফলে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো লাভ করেছে বিপরীত ফল। হেনিবলের সৈন্যরা যোগাযোগ ছাড়াই বহু বছর বেঁচে ছিল। অপরপক্ষ আজকাল বিশাল সৈন্যবাহিনী অনুরূপ পরিবেশে দুই অথবা তিন দিনের বেশি টিকে থাকতে পারে না। পালের জাহাজের উপর নির্ভরশীল নৌকাবাহিনী চলাচল ছিল বিশ্বব্যাপী, এখন তাদের ঘন ঘন জ্বালানি নিতে হয় বলে কোনো কেন্দ্র থেকে তারা বেশি দূর যেতে পারে না। নেলসনের সময় ব্রিটিশরা সমুদ্রে কোথাও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলে তা বলবৎ হতো সর্বত্রই। অধুনা নিজস্ব জলসীমায় তাদের আধিপত্য থাকলেও দুরপ্রাচ্যে তারা দুর্বল ও বাল্টিক সাগরে প্রবেশাধিকার নেই তাদের।
সাধারণভাবে বলা যায় যে, আজকাল কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী স্থানগুলোতে ক্ষমতা প্রয়োগ করা অধিকতর সহজ। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতা বেড়ে যায় এবং বিজয় অধিকতর নিরঙ্কুশ হয়, কারণ দক্ষতার কোনোরূপ ক্ষতি হয় না আয়তন বৃদ্ধির ফলে। একটি বিশ্বরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে তা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে কোনো মারাত্মক যুদ্ধে বিজয়ী ব্যক্তি অথবা নিরপেক্ষ ক্ষমতাশালী ব্যক্তির দ্বারা।
ক্ষমতার তীব্রতা ও সংগঠনের শক্তি সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো জটিল ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি জনপদে গঠিত রাষ্ট্র আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে অনেক বেশি কর্মতৎপর। এর হাত রয়েছে রাশিয়া, জার্মানি ও ইতালিতে প্রায় সব মানবীয় বিষয়ে। মানুষের ক্ষমতাপ্রীতি রয়েছে, কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা ক্ষমতার মোহে বেশি আচ্ছন্ন অন্যান্য মানুষের চেয়ে। ফলে আশা করা যায় যে, যিনি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হাতে পেয়েছেন তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় রাষ্ট্রের পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে বৃদ্ধি করবেন তার অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ। জোরালো যুক্তি রয়েছে রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ জোরদার করার পেছনে। সুতরাং সাধারণ নাগরিকের নীরব সমর্থন থাকবে রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপে সরকারের ইচ্ছার প্রতি। যা হোক কিছু স্বাধীনতাপ্রীতিও থাকবে নাগরিকদের ভেতর। এক পর্যায়ে এই স্বাধীনতাপ্রীতি এত প্রবল হবে যে, তা অস্থায়ীভাবে হলেও আরও অধিক বৃদ্ধি হতে দেবে না সংগঠনের শক্তি। পরিণামে সংগঠনের শক্তি একটি বিশেষ পর্যায়ে পৌঁছলে জনসাধারণের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পেলে স্বাধীনতা প্রীতি প্রবল হবে আবার সংগঠন হ্রাস পেলে প্রবল হবে অফিসিয়াল ক্ষমতাপ্রীতি।
স্বাধীনতাপ্রীতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাহ্যিক হস্তক্ষেপের অবাস্তব বিরোধী নয় বরং নিষিদ্ধকরণ, বাধ্যতামূলক সৈন্যদলে নিযুক্তি, ধর্মীয় আনুগত্য ইত্যাদির মতো একপ্রকার সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিরোধী। কখনও কখনও এ ধরনের অনুভূতি দমিত হতে পারে ক্রমাগত প্রচারণা ও শিক্ষার দ্বারা। এর ফলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুর্বল হয়ে পড়ে স্বাধীনতাপ্রীতি। অনেক শক্তিই আধুনিক সম্প্রদায়গুলোর ভেতর সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেমন–স্কুল, সংবাদপত্র, ড্রিল ইত্যাদি। একই প্রভাব রয়েছে জনসংখ্যার ঘনত্বেরও। স্বাধীনতাপ্রীতি ও ক্ষমতাপ্রীতির মধ্যকার অস্থায়ী ভারসাম্য তাই আধুনিক অবস্থায় ক্রমাগতভাবে ক্ষমতার দিকে সরে পড়ে। এইভাবে সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের উদ্ভব হয় ও প্রশস্ত হয় এর সফলতার পথ। শিক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতাপ্রীতি কতটুকু হ্রাস করা সম্ভব বর্তমানে তা জ্ঞাত নয়। বিদ্রোহের উদ্রেক না করে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ক্রমাগতভাবে কতটুকু বাড়ানো যেতে পারে বলা অসম্ভব। কিন্তু এ রকম সন্দেহের কারণ নেই যে, বর্তমান যুগে তা অনেক বেশি বৃদ্ধি পাবে স্বৈরশাসনের চেয়ে।
এ পর্যন্ত আমাদের আলোচিত সংগঠনগুলোর মতো রাষ্ট্র ছাড়া সব সংগঠনই একই প্রকার আইনের অধীন, শুধু ব্যতিক্রম এই যে, এগুলো প্রয়োগ করতে পারে না শক্তি। আমি আলোচনার বাইরে রাখছি ক্ষমতা তাড়নার অবদানে অক্ষম ক্লাবের অনুরূপ সংগঠনগুলোকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাজনৈতিক দল, চার্চ এবং ব্যবসায় কর্পোরেশনগুলো। লক্ষ্য অর্জনে যত কম সফল হোক না কেন বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করতে চায় অধিকাংশ চার্চই। অধিকাংশই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে সদস্যদের কিছু গুরুত্ববহ অভ্যন্তরীণ বিষয়। যেমন-বিবাহ ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা। সম্ভাব্যতা প্রমাণিত হলে চার্চগুলো রাষ্ট্রীয় কাজে জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করে। তিব্বতে পিটারসের পিতৃত্বে এবং কিছু মাত্রায় সংস্কার আন্দোলন পর্যন্ত পুরো পশ্চিম ইউরোপে তা ঘটেছে। কিছু ব্যতিক্রম থাকা সত্ত্বেও চার্চের ক্ষমতা তাড়না সীমিত হয়ে পড়েছে শুধু সুযোগ-সুবিধার অভাবে এবং ভিন্নমত বা অনৈক্যরূপে বিদ্রোহের ভয়ে। যা হোক অনেক দেশেই জাতীয়তাবাদ তাদের ক্ষমতা খর্ব করে দিয়েছে এবং আগেকার ধর্মীয় তাড়নাগুলো রাষ্ট্রীয় তাড়নায় পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় শক্তি হ্রাস পায় এবং জাতীয় রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি পায় জাতীয়তাবাদের ফলে।
রাজনৈতিক দলগুলো অতি সাম্প্রতিককালেও অতি ঠিলেঢালা সংগঠন ছিল এবং অতি অল্প চেষ্টাই করেছে সদস্যদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য। ঊনবিংশ শতাব্দীব্যাপী সংসদ সদস্যরা প্রায়ই দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে তাদের ভোটাধিকার। ফলে দলীয় বিভক্তির পূর্বাভাস বর্তমানের চেয়ে বেশি অনিশ্চিত ছিল। ওয়ালপল নর্থ এবং পিট একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত তাদের সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণ করতেন দুর্নীতির মাধ্যমে। দুর্নীতি হ্রাসের পরও রাজনীতি অভিজাত নিয়ন্ত্রিত ছিল। ফলে সরকার ও দলীয় নেতাদের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার কোনো পথ ছিল না। আজকাল বিশেষত শ্রমিক দলের সদস্যরা ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং প্রতিজ্ঞা বিফল হলে সাধারণত তাদের রাজনৈতিক মৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়। দাবি করা হয় দুধরনের আনুগত্য : কর্মসূচিতে মতামত ঘোষণায় এবং নেতাদের প্রতি দৈনন্দিন কার্যকলাপে। নামমাত্র গণতান্ত্রিক উপায়ে কর্মসূচি স্থির হলেও কিছু সংখ্যক তোষামোদকারীর দ্বারা তা খুব বেশি প্রভাবিত হয়। সংসদ বা সরকারি কার্যকলাপে কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে কি-না স্থির করার দায়িত্ব নেতাদের উপর পরিত্যক্ত। তারা এমন না করার সিদ্ধান্ত নিলে বিশ্বাসভঙ্গের সমর্থনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা অনুসারীদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু বিবৃতিতে এ ধরনের কিছু অস্বীকার করা হয়। এই পদ্ধতির ফলেই ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ সমর্থন লাভ। এগুলোর বাস্তবায়ন ছাড়াই নেতারা ওকালতি করেছেন সরকারের পক্ষে।
