এ ধরনের রাস্তা যদিও সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি সম্ভব করে তুলেছিল তারপরও তা রাজাকে সামর্থ্য যোগায়নি দূরবর্তী প্রদেশগুলো পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। একুজন ঘোড়সওয়ার বার্তাবাহক এক মাসে সার্দিস থেকে সোসাতে সংবাদ নিয়ে আসত, কিন্তু সার্দিস থেকে সোসাতে যেতে সৈন্যদের লেগে যেত তিন মাস। যখন আওনিয়া পারস্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল তখন এশিয়া মাইনরে ইতিমধ্যে কোনো সৈন্য না থাকায় বিদ্রোহের মোকাবেলা করতে তাদের লেগে যায় কয়েক মাস। সব সাম্রাজ্য প্রায়ই প্রাদেশিক গভর্নদের দ্বারা পরিচালিত বিদ্রোহ দেখেছে; এমনকি প্রত্যক্ষ বিদ্রোহ না হলে সবে মাত্র বিজয় ছাড়া স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রায় অনিবার্য ছিল এবং কালক্রমে তা সমর্থ ছিল স্বাধীনতার রূপলাভে। প্রাচীন কোনো বড় রাষ্ট্রই বর্তমান যুগের মতো একই মাত্রায় কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো না। এর প্রধান কারণই ছিল দ্রুত চলাচলের সুবিধার অভাব।
মেসিডোনিয়াবাসীদের মাধ্যমে রোমানরা পারসিকদের কাছ থেকে শিখেছিলেন কিভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্বারা শক্তিশালী করা যায় কেন্দ্রীয় সরকারকে। রাজকীয় বার্তাবাহক পুরো পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়াব্যাপী দিনরাত ঘন্টায় ভ্রমণ করতে পারত গড়ে দশ মাইল। কিন্তু প্রতিটি প্রদেশেই রাজকীয় পদ সামরিক কমান্ডারদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যিনি তাদের সৈন্যদলের অগ্রগমন পথে কেউ নেই এমন কিছু না জেনেই পরিচালনা করতে পারতেন সৈন্য। সৈন্যদের ক্ষিপ্রগতি ও সংবাদ প্রেরণে ধীরগতি প্রায়ই রোম সম্রাটের বিরুদ্ধে সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। ইতালি আক্রমণের জন্য গোলের উত্তর থেকে কনস্টেন্টাইনের অভিযান সম্পর্কিত গিবনের বর্নণা কনস্টেন্টাইনের আরামপ্রদ ও হেনিবলের কষ্টসাধ্য গমনের ভেতর প্রদর্শন করে স্পষ্ট পার্থক্য।
গোল থেকে ইতালি অভিযানকালে হেনিবল পর্বতের উপর নিয়ে বর্বর জনপদের মধ্য দিয়ে প্রথমে একটি রাস্তা আবিষ্কার করেন ও পরে তা খুলে দিতে ব্যর্থ হন। বর্বররা এর আগে কখনও নিয়মিত সৈন্য চলাচলের জন্য এ ধরনের রাস্তা মেনে নেয়নি। আল্পস পর্বতমালা তখন প্রকৃতিগতভাবেই শক্তি প্রদত্ত। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেসব জেনারেল পথের জন্য চেষ্টা করেছিলেন তারা হঠাত্র অসুবিধায় পড়েন বা বাধার সম্মুখীন হন। কনস্টেন্টাইনের যুগে সভ্য ও বাধ্য ছিল পাহাড়ি কৃষকরা। দেশে প্রচুর সম্পদ মজুদ ছিল এবং রোমানরা বহু জনপথ আল্পস পর্বতমালার উপর দিয়ে নিয়ে যায় যা যোগাযোগ স্থাপন করে গোল ও ইতালির ভেতর। কনস্টেন্টাইন কটিয়ান আল্পসের রাস্তাটি (যা বর্তমানে সেনিস পর্বতমালা) অধিক গুরুত্ব দিতে এবং এত সক্রিয় অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তার সেনাবাহিনী পরিচালনা করেন যে, রাইনের তীরবর্তী অঞ্চল থেকে তার প্রস্থান সম্পর্কে সেক্রেনসিয়াম কোর্টে (রোমে) কোনো কিছু বোধগম্য হওয়ার আগে তিনি প্রবেশ করেন পিডমন্টের সমতল ভূমিতে।
ফলাফল দাঁড়াল এই যে, মেক্সেনসিয়াস পরাজিত হন এবং ধর্মের মর্যাদা লাভ করে ক্রিশ্চিয়ানিটি রাষ্ট্র। যদি রোমানদের রাস্তাঘাট অধিকতর শোচনীয় না হতো এবং সংবাদ প্রেরণের ত্বরিত ব্যবস্থা থাকত তবে ভিন্নরূপে আবির্ভূত হতো বিশ্ব ইতিহাস।
দূরবর্তী স্থানগুলোতে সরকারি ক্ষমতার ব্যবহার সম্ভব করে তোলে বাষ্পচালিত জাহাজ, রেলপথ ও সর্বশেষে উড়োজাহাজ। সাহারা অথবা মেসোপটেমিয়ায় বিদ্রোহ হলে আজকাল কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তা দমন করা যায়। কিন্তু একশো বছর আগেও সৈন্য পাঠাতে কয়েক মাস সময় লেগে যেত এবং তা খুব কষ্টকর হতো বেলুচিস্তানে আলেকজান্ডারের সৈন্যদের মতো তৃষ্ণায় মৃত্যুবরণ থেকেও।
সংবাদ প্রেরণও মানুষ ও দ্রব্যসামগ্রীর ত্বরিত চলাচল ব্যবস্থার মতো সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৮১২ সালের যুদ্ধের শান্তি স্থাপন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পর নিউ ওলিন্স যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যদিও পরস্পরবিরোধী কোনো পক্ষই জানত না প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে। সপ্ত বর্ষের যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সৈন্যরা কিউবা বা ফিলিপাইন দখল করে নেয়, কিন্তু শান্তি চুক্তিতে সই করার আগ পর্যন্ত ইউরোপে তা জানা ছিল না। টেলিগ্রাফ আবিষ্কারের আগে শান্তি কালীন দূতদের ও যুদ্ধকালীন জেনারেলদের অনেক স্বাধীনতা ছিল, কারণ নির্দেশগুলো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রতিফলিত হতো না। দূরবর্তী সরকার তাদের প্রতিনিধিদের প্রায়ই নিজস্ব বিবেচনার উপর নির্ভর করে কাজ করার জন্য আহ্বান করত এবং এভাবেই কেন্দ্র নির্দেশিত মামুলি নীতিমালার প্রেরকের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ যে সংবাদ মানুষের চেয়েও দ্রুততর। একশো বছর আগেও সংবাদ দ্রুততর ছিল না ঘোড়ার চেয়ে। অপরাধের সংবাদ প্রকাশের আগেই পার্শ্ববর্তী শহরে পালাতে পারত একজন ডাকাত। আজকাল সংবাদ প্রথমেই পৌঁছে বলে পলায়ন অপেক্ষাকৃত কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের সময় সরকারই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সব আদান-প্রদানের দ্রুত উপায়গুলো। ফলে বেড়ে যায় তাদের ক্ষমতা।
আধুনিক কলাকৌশল শুধু সংবাদ আদান-প্রদানের দ্রুততার মাধ্যমেই নয় বরং রেল, টেলিগ্রাফ, মোটর ট্রাফিক এবং সরকারি প্রচারণার দ্বারাও বিশাল সাম্রাজ্যগুলোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল করে তুলেছে। বিদ্রোহ সহজ করার জন্য প্রাচীন পারস্যের প্রাদেশিক শাসন এবং রোমান প্রকনসুলের যথেষ্ট স্বাধীনতা ছিল। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল সাম্রাজ্য। এটিলা ও চেঙ্গিস খাঁর সাম্রাজ্যগুলো ক্ষণস্থায়ী ছিল এবং ইউরোপীয় জাতিগুলো নতুন জগতে তাদের দখল হারাল। কিন্তু বাহ্যিক আক্রমণ ছাড়া অধিকাংশ সাম্রাজ্যই আধুনিক সুবাদে মোটামুটি নিরাপদ। বিপ্লব দেখা দিতে পারে শুধু যুদ্ধে পরাজিত হলেই।
