সংগঠনগুলো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভিন্ন হয়ে পড়ে : একটি হচ্ছে আকার; অন্যটি বলা যায় ক্ষমতার তীব্রতা, যার অর্থ আমি মনে করি সদস্যদের উপর এগুলোর নিয়ন্ত্রণে মাত্রা। সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের ক্ষমতাপ্রীতির জন্যেই প্রতিটি সংগঠনে বিরোধী শক্তির অবর্তমানে রয়েছে এর আকার ও ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রবণতা। সহজাত কারণে এ উভয় প্রকার বৃদ্ধি রদ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, একটি আন্তর্জাতিক দাবা ক্লাব যথেষ্ট কৃতিত্বের অধিকারী সফল দাবা খেলোয়াড়দের করতে পারে অন্তর্ভুক্ত। সম্ভবত ক্লাব সদস্যদের দাবা খেলার সঙ্গে সম্পর্কহীন কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। একজন শক্তিমান সম্পাদকের অধীনে থেকে তা আরও অধিক সংখ্যক লোককে দাবা সচেতন করে তোলার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু তা অসম্ভব হয়ে পড়বে সম্পাদক দাবাড় না হলে। এতে দাবা ক্লাব ধ্বংস হয়ে যেতে পারে ভালো খেলোয়াড়দের দল ত্যাগের ফলে। কিন্তু এ ধরনের বিষয় ব্যতিক্রমধর্মী। সম্পদ বা রাজনৈতিক আধিপত্য সংগঠনের উদ্দেশ্য হলে শুধু অন্যান্য সংগঠনের চাপের মাধ্যমে অথবা সংগঠনটি বিশ্বব্যাপী হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এর বৃদ্ধি ঠেকানো যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বাধীনতা প্রীতি খুব প্রবল হলেই শুধু সম্ভব তীব্রতা ঠেকানো।
রাষ্ট্র হচ্ছে এর সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। কোনো রাষ্ট্র রাজ্যজয়ের লক্ষ্য স্থির করে যথেষ্ট শক্তিশালী হলে। কিন্তু যদি অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারে যে এর প্রকৃত ক্ষমতা অনুভূত ক্ষমতা থেকে কম অথবা অনভিজ্ঞতাবশত অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতাধর (এর প্রকৃত ক্ষমতার চেয়ে) বলে বিশ্বাস করে তাহলে সে বিপরীতমুখী প্রবণতা দেখায়। সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, কোনো রাষ্ট্র পারলে জয় করে নেয় রাজ্য। কিন্তু যুদ্ধ ক্ষেত্রে শুধু সমান শক্তিশালী অন্য রাষ্ট্রের মোকাবেলায় থেমে যায়। গ্রেট ব্রিটেন আফগানিস্তান জয় করেনি কারণ রাশিয়া সেখানে ব্রিটিশের মতোই শক্তিশালী। নেপোলিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে লুসিয়ানা বিক্রি করে দেন কারণ তার পক্ষে সম্ভব ছিল না লুসিয়ানার প্রতিরক্ষা। শুধু অভ্যন্তরীণ শক্তির বিবেচনায় প্রতিটি দেশই বিশ্বব্যাপী হতে চায়। কিন্তু একটি দেশের ক্ষমতা কমবেশি ভৌগোলিক : সাধারণত এ ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে উত্থিত হয় এবং কেন্দ্র থেকে দূরত্বের সঙ্গে হ্রাস পায়। পরিণামে কেন্দ্র থেকে বিশেষ দূরত্বে এর ক্ষমতা ভারসাম্য সৃষ্টি করে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে এবং প্রথাগত শক্তির হস্তক্ষেপ না ঘটলে সেখানে গঠিত হয় সীমান্ত।
এ পর্যন্ত কথিত সব কিছুই গুণগত পরিবর্তন ছাড়া সত্যে পরিণত হওয়ার জন্য অতিশয় বিমূর্ত। ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ক্ষমতা বলে নয় বরং বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক ঈর্ষামূলক মনোবৃত্তির জন্যেই টিকিয়ে রেখেছে অস্তিত্ব। বেলজিয়াম টিকে আছে কারণ এর অস্তিত্ব সুবিধাজনক ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের জন্য। পর্তুগালের অনেক উপনিবেশ রয়েছে কারণ বৃহৎ শক্তিগুলো একমত হতে পারেনি এগুলোর বিভক্তির ব্যাপারে। যুদ্ধ মারাত্মক বিধায় কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে রাজ্যাংশ বজায় রাখা কিছুকাল সম্ভব, কিন্তু তা সে হারাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রের নজরে পড়লে। এসব বিবেচনা আমাদের সাধারণ নীতির ক্ষতি করে না। এগুলো শুধু কার্যকরি শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটায়, যা বিলম্বিত করে অপরিণত শক্তিগুলোর ক্রিয়াকলাপ।
বলা যেতে পারে যে, পারলে কোনো রাষ্ট্র দখল করে নেয়–এ নীতির ব্যতিক্রম যুক্তরাষ্ট্র। এটা স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মারাত্মক অসুবিধা সৃষ্টি হতো না মেক্সিকো এবং প্রকৃতপক্ষে লাতিন আমেরিকার সব রাষ্ট্র দখল করে নেয়ার কার্যক্রম হাতে নিলে। যা হোক রাজনৈতিক বিজয়ের স্বাভাবিক উদ্দেশ্য বর্তমানে বিরোধী শক্তির দ্বারা এ ক্ষেত্রে হচ্ছে বাধাগ্রস্ত। গৃহযুদ্ধের আগে দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর ছিল সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতা। মেক্সিকোর যুদ্ধে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং বিশাল এলাকা সন্নিবেশিত হয়। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী বসতি স্থাপন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রম সবচেয়ে শক্তিমান নাগরিকের কর্মশক্তি আত্তীকরণের জন্য যথেষ্ট ছিল। এই কার্যক্রম এক প্রকার শেষ হয়ে আসতেই ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে স্পেন-আমেরিকার যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদের সজীব তাড়না প্রকাশ পেতে দেয়। কিন্তু আমেরিকার সংবিধানে নতুন এলাকার সন্নিবেশ অসুবিধাজনক। এর অন্তর্ভুক্ত অনাকাঙ্ক্ষিত নতুন ভোটারদের অনুপ্রবেশ। তাছাড়া এর ফলে অভ্যন্তরীণ মুক্ত বাণিজ্যিক এলাকা বিস্তার লাভ করে এবং তাই তা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থের পক্ষের ক্ষতিকারক। লাতিন আমেরিকার উপর-আপাতত অভিভাবকত্ব সংবলিত মনরো মতবাদ তাই প্রভাবশালী স্বার্থের ক্ষেত্রে সন্নিবেশের চেয়ে অধিকতর সন্তোষজনক। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে রাজনৈতিক বিজয় সুবিধাজনক হলে শিগগিরই তা ঘটত।
সবসময়ই শাসকদের কাম্য ছিল রাজনৈতিক বলয়ে ক্ষমতার কেন্দ্ৰায়ন এবং সবসময় শাসিতরা এর বাধা প্রদান করেনি। আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় একনায়ক দেশের চেয়েও প্রাচীন বড় সাম্রাজ্যগুলোতে তা অধিকতর পূর্ণতা লাভ করে। কিন্তু কার্যত কৌশলগতভাবে সম্ভব ক্ষেত্রগুলোতে তা সীমাবদ্ধ ছিল। যাতায়তই সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল প্রাচীন রাজপুরুষদের জন্য। মিসর ও ব্যাবিলনে বড় বড় নদীও এ সমস্যা সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। কিন্তু পারস্য শাসন নির্ভরশীল ছিল সড়ক পথ যোগাযোগের উপর। হেরোডেটাস সার্দিন্স থেকে সোসা পর্যন্ত বৃহৎ রাজকীয় রাস্তার বর্ণনা দিয়েছে। ১৫০০ মাইল দীর্ঘ রাস্তার উপর দিয়ে শান্তির সময়ে রাজকীয় বার্তাবাহক এবং যুদ্ধকালীন সৈন্য চলাচল করত। তিনি বলেন-রাস্তার প্রকৃত বর্ণনা হচ্ছে নিম্নরূপ : পুরো রাস্তাব্যাপী রাজকীয় স্টেশন ও চমৎকার পান্থশালা বিরাজমান; রাস্তাটি আগাগোড়া জনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে এবং তাই তা বিপদমুক্ত-প্রাইজেরিয়া ত্যাগ করে হেলিস অতিক্রম করতে হয়; ফটক রয়েছে, এগুলোর মধ্য দিয়ে জনস্রোত অতিক্রমের আগে আপনাকে অবশ্যই নিতে হবে অনুমতি (ছাড়পত্র)। একটি শক্তিশালী বাহিনী এই স্থান পাহারা দিয়ে থাকে। … সিসিলিয়া ও আর্মেনিয়ার মধ্যবর্তী সীমান্ত হচ্ছে ইউফ্রেটিস নদী। তাই পার হতে হয় নৌকাযোগে। আর্মেনিয়াতে পনেরোটি বিশ্রামের স্থান রয়েছে। এর দুরত্ব ৫৬.৫ প্যারাসংস (প্রায় ১৮০ মাইল)। এক জায়গায় পাহারারত আছে একজন দেহরক্ষী। চারটি বড় নদী এই জেলাকে ছেদ করেছে, এর প্রতিটি পার হতে হয় নৌকাযোগে…. পুরো স্টেশনের সংখ্যা উন্নীত হয়েছে ১১১টিতে, প্রকৃতপক্ষে এই বিশ্রামস্থল সার্দিস ও সোসার মধ্যবর্তী দেখতে পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১৫০ ফার্লং গতিতে চললে (প্রায় সৈনিকদের গতি সমান) ভ্রমণ সম্পন্ন করতে সঠিকভাবে লেগে যায় নব্বই দিন।
