সংগঠনগুলোর ইতিবৃত্ত নামক এই পর্বে যা আলোচনা করা হবে তা নির্ভর করছে এই সত্যের উপর যে, সংগঠন হচ্ছে একটি কর্মশীল সংস্থা (Organism), যার জিন আছে এবং ক্ষয় ও বৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের ভেতর প্রতিযোগিতা বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের ভেতর প্রতিযোগিতার মতোই এবং তা মোটামুটিভাবে ডারউইনের পদ্ধতির অনুরূপ দেখা যেতে পারে। কিন্তু এ ধরনের সাদৃশ্যে অন্যান্য জিনিসের মতো অধিক গুরুত্ব দেয়া যাবে না। তা ধারণা দিতে পারে, কিন্তু প্রদর্শিত করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ আমরা ধরে নিতে পারি না যে, সামাজিক সংগঠনগুলোতে অনিবার্য ক্ষয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের।
সামগ্রিকভাবে না হলেও ক্ষমতা প্রধানত নির্ভরশীল সংগঠনের উপর। তা টিকে থাকতে পারে প্লেটো ও গ্যালিলিওর খাঁটি মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতার অনুরূপ সামাজিক প্রতিষ্ঠান ছাড়াই। কিন্তু সাধারণভাবে এ ধরনের ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না চার্চ, রাজনৈতিক দল বা অনুরূপ কোনো সামাজিক সংস্থার দ্বারা প্রচার ও প্রসার না ঘটলে। এ মুহূর্তে আমি বিবেচনার বাইরে রাখব সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কহীন ক্ষমতা।
একই লক্ষ্য অর্জনে নিবেদিত কর্মকাণ্ড সম্পাদনের জন্য সংঘবদ্ধ জনগোষ্ঠীই সংগঠন। তা স্বেচছামূলক হতে পারে একটি ক্লাবের মতো, পরিবার বা ক্লোনের মতো তা স্বাভাবিক জৈবিক গোষ্ঠীভুক্ত হতে পারে, হতে পারে তা রাষ্ট্রের মতো বাধ্যতামূলক। সংগঠনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট বা অস্পষ্ট, চেতনাসম্পন্ন বা অচেতন হতে পারে, তা হতে পারে সামরিক বা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ধর্মীয়, শিক্ষা বা ক্রীড়া সংক্রান্ত। বৈশিষ্ট্য বা উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন প্রত্যেক সংগঠনে রয়েছে ক্ষমতার বিভাজন। অবশ্যই এর একটি সরকার থাকবে এবং তা সিদ্ধান্ত নেবে সারা সংগঠনের নামে। যে উদ্দেশ্যে সংগঠন টিকে থাকে তার সঙ্গে সঙ্গতিশীল যে কোনোভাবে এর ক্ষমতা সংগঠনের একক সদস্যের চেয়ে হয়ে থাকে বেশি। ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে মানব সভ্যতার কৌশলের জটিলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুবিধাগুলো। কিন্তু সবসময়ই কিছুটা স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয় সংঘবদ্ধতার ফলে। আমরা অন্যদের উপর অর্জন করতে পারি বৈধ ক্ষমতা আবার অন্যরাও আমাদের উপর অর্জন করতে পারি বৈধ ক্ষমতা আবার অন্যরাও আমাদের উপর অর্জন করতে পারে ক্ষমতা। ক্রমাগত অধিক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সংগঠনগুলোর-ব্যক্তি বিশেষের নয়। সদস্য সংখ্যা কম না হলেও সংগঠনের সিদ্ধান্তগুলো কার্যকরি করতে হয় সরকার পদ্ধতির মাধ্যমে। শিল্প-পূর্ব সমাজের চেয়ে আধুনিক সভ্য সমাজের জীবনধারায় সরকার আবশ্যিকভাবে পালন করে থাকে অনেক ভূমিকা।
বাস্তবে একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সরকার সম্ভব হলেও তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে ক্ষমতার বিভাজন। যৌথ সিদ্ধান্তে প্রত্যেকের সমান ভূমিকা থাকলে এবং সদস্য সংখ্যা এক লাখ (ধরা যাক) হলে, নিঃসঙ্গ বন্য জীবের মতো অন্যের উপর মোট ক্ষমতার লক্ষতম ভাগ ক্ষমতা থাকে। তা জন্ম দেয় অরাজকতাপূর্ণ জনগোষ্ঠী মনস্তত্ত্ব থেকে ভিন্ন রকম মনস্তত্ত্বের। যেখানে সরকার পুরোপুরিভাবে গণতান্ত্রিক নয় সেখানে বৃদ্ধি পায় মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত হলেও সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণকারী সদস্যের চেয়ে বেশি। একই কথা প্রযোজ্য গণতান্ত্রিক সরকারের নিযুক্ত অফিসিয়ালদের বেলা। সংগঠন যত বড় হবে নির্বাহীদের ক্ষমতা হবে তত বেশি। সুতরাং সংগঠনের পরিবৃদ্ধির প্রত্যেক ধাপে ক্ষমতার ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পায় অসমতা। পাশাপাশি সদস্যদের স্বাধীনতা খর্ব হয় ও বৃদ্ধি পায় সরকারের স্বাধীনতা। সাধারণ মানুষ তা মেনে নেয়, কারণ, একক প্রচেষ্টার চেয়ে যৌথ প্রচেষ্টায় অর্জিত হয় বেশি কিছু, ব্যতিক্রমধর্মী ক্ষমতালোভী ব্যক্তিরা আনন্দ করে, কারণ, তা এনে দেয় সুযোগ। সরকার বংশগত অথবা ক্ষমতালোভী ব্যক্তিটি বিশেষ গোষ্ঠীভূক্ত হলেও দেখা দেয় ব্যতিক্রম।
দুধরনের প্রতিযোগিতা ক্ষমতালাভের: একটি আন্তঃসাংগঠনিক প্রতিযোগিতা; অন্যটি একটি সংগঠনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যকার প্রতিযোগিতা। আন্তঃসাংগঠনিক প্রতিযোগিতা শুধু তখনই দেখা যায়, যখন এগুলোর উদ্দেশ্য মোটামুটি একই অথচ বেমানান। তা হতে পারে অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রচারণা বা এর যে কোনো দুটো বা তিনটিরই সমন্বয়। তৃতীয় নেপোলিয়ান যখন সম্রাট হচ্ছিলেন তখন তার-ই স্বার্থে নিয়োজিত একটি সংগঠন সৃষ্টি ও পরে অর্জন করতে হয়েছিল এর শ্রেষ্ঠত্ব। এই উদ্দেশ্যে কিছু মানুষকে তিনি সিগার দেন-তা ছিল অর্থনৈতিক অন্যান্য মানুষের কাছে তিনি নিজেকে চাচার ভাজিতা বলে পরিচয় দেন তা ছিল প্রচারণা। পরিশেষে তিনি কিছু সংখ্যক বিরোধীকে গুলি করে হত্যা করেন–তা ছিল সামরিক। ইতিমধ্যে তার বিরোধীরা স্থির সিদ্ধান্ত নেয় গণতান্ত্রিক ধরনের সরকারের প্রশংসায় এবং নিন্দা করে সিগার ও বুলেটের। গ্রিকদের সময় থেকেই পরিচিত গণতন্ত্রের উপর একনায়কতন্ত্র অর্জনের কৌশল। সবসময়ই তাতে অন্তর্ভুক্ত ঘুষ, প্রতারণা ও হিংস্রতার একই মিশ্রণ। যাক আমাদের বর্তমান বিষয়বস্তু ঘুষ, প্রতারণা ও ও হিংস্রতার একই মিশ্রণ। যাক আমাদের বর্তমান বিষয়বস্তু এটা নয়। সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক ইতিবৃত্ত হলো আমাদের বর্তমান বিষয়বস্তু।
