যদি দাবার মতো হিসাব করা যেত মানবীয় কার্যকলাপ এবং যদি রাজনীতিবিদ ও যুদ্ধবিশারদরা দাবা খেলোয়াড়দের মতো চতুর হতেন তাহলে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা সত্য থাকত। সফল যুদ্ধের সুবিধাগুলো সন্দেহজনক, কিন্তু ব্যর্থ যুদ্ধের অসুবিধাগুলো নিশ্চিত। সুতরাং যদি অসাধারণ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি আগেভাগেই বুঝতে পারতেন যে অমুক যুদ্ধে জয়লাভ করতে যাচ্ছেন তাহলে কোনো যুদ্ধই হতো না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং প্রতিটি যুদ্ধেই সম্ভাব্যতার ভুল হিসাবটি করে থাকেন উভয় পক্ষের সরকার না হলেও এক পক্ষের সরকার। এর অনেক কারণ রয়েছে–গর্ব, অহংকার ও ছোঁয়াচে উত্তেজনা। যখন জনমনে অন্ধ বিশ্বাস জিইয়ে রাখা হয় তখন জনগণের এই বিশ্বাস ও মারমুখো ভাব সম্বন্ধে শাসকদের সহজেই অবহিত করা যেতে পারে। খুব কমই এইসব অপ্রিয় সত্যের মূল্যদিয়ে থাকেন শাসক শ্রেণি, তা তারা জানেন অথচ গোপন রাখেন। তবে সংবাদপ্রিয় অথবা কতোপকথনে ঘোষিত প্রিয় সত্য বিষয়ের যথার্থ মূল্যায়ন করে থাকেন। সৃষ্টি হচ্ছে বায়ুরোগ ও অহংভাবের বাতিক; রেহাই নেই সরকারের।
গোপনীয়তার জন্য সৃষ্ট ফলাফল আকাঙ্ক্ষিত ফলাফলের ঠিক বিপরীত হয় যুদ্ধ সংঘঠিত হলে। মানুষের কাছ থেকে গোপন করে রাখা অপ্রীতিকর সত্যের কিছু কিছু সর্বসাধারণের কাছে স্পষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং মানুষকে যতই সুখের স্বর্গে বসবাসের প্রতিশ্রুতি দেয়া হোক না কেন, তারা ততই আতঙ্কিত ও নিরুৎসাহিত হয় বাস্তব সত্যের দ্বারা। এইভাবে বেড়ে যায় বিপ্লব এবং আকস্মিক পদচ্যুতির সম্ভাবনা।
বুদ্ধিবৃত্তির জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায় অধীনস্তদের জোরপূর্বক বিশেষভাবে আচরণ দেখাতে বাধ্য করা হলে। বাহ্যিকভাবে হলেও অযৌক্তিক মতবাদ গ্রহণ যে সমাজে স্বাভাবিক সে সমাজে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তিকে বিরাগভাজন হতে হয়। ফলে ওই সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক মান কমে এবং তা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় কৌশলগত অগ্রগতির পথে। এর সত্যতা বিশেষভাবে প্রমাণিত হয় যখন অফিসিয়াল ধর্মমত এমন হয় যে, তা গ্রহণ করতে পারে খুব কম সংখ্যক মানুষই। নাজিরা অনেক যোগ্য জার্মান নাগরিককে নির্বাসিত করেছে। আজ হোক কাল হোক এর প্রভাব পড়বেই সামরিক কৌশলের উপর। বিজ্ঞান ছাড়া অসম্ভব দীর্ঘ অগ্রগতি। আবার চিন্তার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার অভাব হলে অগ্রগতি অসম্ভব। ফলে এই বিজ্ঞানের যুগে যুদ্ধ ভিন্ন অন্য সব ক্ষেত্রে মতামত সংক্রান্ত সমতার প্রচেষ্টা পরিশেষে সামরিক দক্ষতার সর্বনাশ সাধন করে।
আমরা এখন আসতে পারি এ দুটো গতানুগতিক উক্তির বাস্তব সংশ্লেষণে। সামাজিক বন্ধনের জন্য প্রয়োজন একটি ধর্মমত অথবা আচার-আচরণের একটি প্রচলিত রীতি অথবা প্রভাবশালী ভাবপ্রবণতা অথবা এ তিনের সংমিশ্রণ। একটি সম্প্রদায় ভেঙে পড়তে পারে এর কোনো একটি না থাকলে। ফলে কোনো অত্যাচারী বা বিদেশি শক্তির অধীন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এ ধরনের বন্ধন কার্যকরি হলে একে গভীরভাবে অনুভব করে নেয়া প্রয়োজন, তা বলপূর্বক আরোপিত হতে পারে সংখ্যালঘুর উপর, যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ব্যতিক্রমী বুদ্ধিবৃত্তি বা নৈতিকতার দিক দিয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ না হয়। তবে তা অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠের ভেতর খুঁটি ও স্বতঃস্ফূর্ত হবে। ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সামাজিক সংহতির উপায় হচ্ছে নেতার প্রতি আনুগত্য, জাতীয় গৌরব এবং ধর্মীয় উৎসাহ। কিন্তু নেতার প্রতি আনুগত্য আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন অপেক্ষাকৃত কম স্থায়ীভাবে কার্যকর। তার কারণ বর্তমানে সার্বভৌমত্বের উত্তরাধিকার হ্রাস পেয়েছে এবং মুক্তচিন্তার প্রসারের ফলে ধর্মীয় উৎসাহে ভাটা পড়েছে। সুতরাং একমাত্র জাতীয় গৌরব রয়ে গেল এবং তা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। খ্রিস্টবাদের মতো এত অধিক না হলেও এই অনুভূতির পক্ষে ক্ষতিকর অফিসিয়াল ধর্মমত থাকা সত্ত্বেও সোভিয়েত রাশিয়ায় লক্ষণীয়ভাবে আগ্রহের সৃষ্টি করেছে এর পুনরাবির্ভাব।
স্বাধীনতার উপর কতটুকু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন জাতীয় গৌরব রক্ষার জন্য? মুলত হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য তা-ই। রাশিয়ায় মনে করা হয় যে, যারা অফিসিয়াল মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন রাষ্ট্রদ্রোহিতার আচরণ দেখানোই স্বাভাবিক তাদের পক্ষে। ইতালি ও জার্মানিতে সরকারের শক্তি নির্ভর করে সরকারের জাতীয়তাবাদী আচরণের উপর এবং যে কোনো বিরোধিতাই মস্কোর স্বার্থে হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। ফ্রান্সে স্বাধীনতাহানি ঘটলে বুঝতে হবে যে তা সম্ভবত জার্মানপন্থিদের বিশ্বাসঘাতকতা রোধের লক্ষ্যে করা হয়েছে। এসব দেশে শ্রেণি সংঘাতগুলোকে অতিক্রম করে যায়। ফলে গণতান্ত্রিক দেশে পুঁজিপতি এবং ফ্যাসিবাদী দেশে সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী দল জাতীয় স্বার্থ ভিন্ন অন্য স্বার্থের চেতনায় পরিচালিত হয়। এই সমস্যা কঠিন সরকারের জন্য। কারণ, জাতীয়তাবাদ একটি মূর্খতাপূর্ণ আদর্শ ও বুদ্ধিজীবীরা অনুধাবন করেন যে তা ধ্বংস এনেছে ইউরোপে। সবচেয়ে ভালো সমাধান হচ্ছে যে গণতন্ত্র কমিউনিজম বা সমষ্টিগত নিরাপত্তার মতো আন্তর্জাতিক স্লোগানের ছদ্মাবরণে নিয়ে আসে। জার্মানি ও ইতালির মতো যেসব দেশে তা করা যায় না, বাহ্যিক সমতা সেখানে অত্যাচারের জন্ম দেয়, কিন্তু জন্ম দেয় না বৈধ অন্তর্মুখী চেতনার। সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছে সামাজিক সংহতির জন্য অপরিহার্য কোনো একটি ধর্মমত। কিন্তু শক্তির উৎস হতে হলে অধিকাংশ জনগোষ্ঠী এবং কিছু সংখ্যক কুশলীদের দ্বারা তা অনুভূত হতে হবে একান্ত গভীরভাবে। যেখানে এ ধরনের অবস্থা নেই সরকার সেখানে বিপচন ও নির্যাতনের মাধ্যমে তা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু বিপচন ও নির্যাতন কঠোর হলে তা বাস্তবতার বাইরে চলে যেতে পারে এবং বাধ্য করে গুরুত্বপূর্ণ সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে অথবা তা ভুলে যেতে। যেহেতু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা ক্ষমতার তাড়না দ্বারা প্রভাবিত সেহেতু স্বাধীনতার উপর যে পরিমাণ হস্তক্ষেপ জাতীয় শক্তির জন্য সবচেয়ে সহায়ক-তা সবসময়ই সরকারগুলোর বিশ্বাসের তুলনায় কম। তাই অরাজকতায় পর্যবসিত না হলে জাতীয় সংহতি বৃদ্ধি করতে পারে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বিকীর্ণ অনুভূতি। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া এসব চলে যেতে পারে সার্বজনীনতার বাইরে।
১১. সংগঠনের ইতিবৃত্ত
এ পর্যন্ত আমরা আলোচনা করেছি ক্ষমতার মনস্তত্ত্বগত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস সম্পর্কে : প্রথা, বিশেষত যাজক বা রাজার প্রতি সম্মানরূপে, ভয় এবং ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যা নগ্ন ক্ষমতার উৎস, পুরনো বিশ্বাসের স্থলে নতুন বিশ্বাস যা বিপ্লবী ক্ষমতার উৎস এর ধর্ম বিশ্বাস ও অন্যান্য ক্ষমতার উৎসের ভেতর ঘাত-প্রতিঘাত। এখন আমরা আমাদের আলোচনার নতুন বিভাগে আসছি : ক্ষমতার চর্চার মাধ্যমে সংগঠনগুলোর আলোচনা। প্রথমত জীবনীশক্তিসম্পন্ন। প্রতিষ্ঠান হিসেবে, পরে বিভিন্ন প্রকার ব্যবস্থাপনা সাপেক্ষে এবং পরিশেষে এগুলোর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের জীবনের উপর এগুলোর প্রভাব সম্পর্কে। আমাদের আলোচনার এই পর্বে সংস্থাগুলোকে যতদূর সম্ভব তাদের উদ্দেশ্য ছাড়া বিবেচনা করতে হবে, যেভাবে মানুষ বিবেচিত হয়ে থাকে অস্থিবিদ্যা ও জীব রসায়নে।
