ব্যাপক ভিত্তিতে ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস ইংল্যান্ডের অনুরূপ : উন্মাদনা, বিজয়, পতন ও প্রতিক্রিয়া। এমনকি অনুকূল এই দুই দৃষ্টান্তে ক্ষণস্থায়ী ছিল উন্মাদনার দৃষ্টান্ত।
সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতা অনেক বেশি উন্মাদদের। এটি টিটাসের সময় জেরুজালেম ধ্বংস করে এবং ১৪৫৩ সালে ধ্বংস করে কনস্টান্টিনোপল। প্রাচ্য ও প্রতিচ্যের চার্চগুলোর ভেতর তুচ্ছ পার্থক্য থাকায় প্রতিচ্যকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। প্রথমত স্পেনের পতন ঘটায় ইহুদি ও মুরদেরকে বিতাড়নের মাধ্যমে এবং পরে নেদারল্যান্ডে বিদ্রোহ ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। অপরদিকে বর্তমান যুগব্যাপী ওইসব জাতিই সফল হচ্ছে যারা ভিন্ন মতাবলম্বীদের নির্যাতনে সবচেয়ে কম আসক্ত।
তা সত্ত্বেও আজকাল ব্যাপকতা লাভ করেছে একটি কথা, সুষম মতবাদ অপরিহার্য জাতীয় সংহতির জন্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয় জার্মানি ও রাশিয়ায় কঠোরতার সঙ্গে এবং ইতালি ও জাপানের কিছুটা শৈথিল্যের সঙ্গে। গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্সে অনেক ফ্যাসিবাদ বিরোধীরাই এই মতবাদ পোষণ করেন যে মুক্তিচিন্তাই হচ্ছে সামরিক দুর্বলতার উৎস। আরও একবার এই প্রশ্নের পর্যালোচনা করা যাক অধিক তত্ত্বগতভাবে এবং বিশ্লেষণাত্মক ঢঙে।
আমি যে প্রশ্ন সম্পর্কে বলছি তা ব্যাপক কিছু নয়। মুক্তচিন্তাকে উৎসাহিত। করা উচিত কি-না অথবা কমপক্ষে তা কি সহ্য করতে হবে? আমি একটি ছোট প্রশ্ন করছি : ক্ষমতার উৎস হিসেবে (স্বতঃস্ফূর্ত বা আরোপিত) সুষম ধর্মমতের ব্যাপ্তি কতটুকু? অপরপক্ষে এর ব্যাপ্তি কতটুকু ক্ষমতার উৎস হিসেবে?
১৯০৫ সালে যখন ব্রিটিশরা তিব্বতে সামরিক অভিযান চালায় তখন প্রথমে সাহসের সঙ্গে অগ্রসর হয় তিব্বতীয়রা, কারণ লাগামবাদীরা বুলেটের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ দান করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা হতাহত হলে লাগামবাদীরা দেখল যে বুলেটের অগ্রভাগ নিকেলের তৈরি। তখন ব্যাখ্যা দেয়া হলো যে শুধু সিসার ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ প্রযোজ্য। এরপর খুব কম সাহস প্রদর্শন করে তিব্বতীয়রা। বেলাকুন এবং পিজনার যখন কমিউনিস্ট বিপ্লব করেন তখন তারা আশ্বস্ত ছিলেন যে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে দ্বান্দ্বিক মতবাদ। আমি ভুলে গিয়েছি যে লাগামবাদীরা কমিনটার্নের ব্যর্থতার কি ব্যাখ্যা দিয়েছিল? এ দুটো দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায় যে বিজয় লাভে ব্যর্থ সুষম বিশ্বাস।
এ ব্যাপারে সত্যে পৌঁছাতে হলে দুই বিপরীত উক্তির ভেতর আপস মীমাংসা করা প্রয়োজন। এর প্রথমটি হচ্ছে, বিশ্বাসের অনুবর্তী মানুষ ভিন্ন মতাবলম্বীদের চেয়ে অধিক আগ্রহের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ভ্রান্ত বিশ্বাসের চেয়ে সত্য বিশ্বাসের অনুসারীদের সাফল্যলাভের সম্ভাবনা বেশি। এই দুই উক্তি পরীক্ষা করব আমরা।
এটা স্পষ্ট যে, সহযোগিতার সহায়ক হলো ঐকমত্য। স্পেনের গৃহযুদ্ধে এনার্কিস্ট, কমিউনিস্ট ও বাস্ক জাতীয়তাবাদীদের ভেতর সহযোগিতা কঠিন ছিল, যদিও তারা সবাই কামনা করে ফ্রাঙ্কোর পরাজয়। একটু কম হলেও অনুরূপভাবে কার্লিস্ট ও আধুনিক ফ্যাসিবাদীদের ভেতর সহযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ে। অব্যবহিত লক্ষ্য সম্পর্কে ঐকমত্য ও মেজাজগত সাদৃশ্য থাকলে অন্যান্য বিষয়ে মতপার্থক্য ক্ষতিকর নয়। পেনিনসুলার যুদ্ধের ঐতিহাসিক স্যার উইলিয়াম নেফিয়ার নেপোলিয়নের প্রশংসা করেছেন এবং ওয়েলিংটনের নিন্দা করেছেন। তার লিখিত বই থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন নেপোলিয়নের পরাজয়কে। কিন্তু তার সাম্প্রদায়িক চেতনা ও সামরিক কর্তব্যানুভূতি বাতিল করে দেয় এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তি। তিনি উচ্চ রক্ষণশীল রাজনীতিকদের মতো দক্ষতার সঙ্গে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। সুযোগ এলে আজকাল হিটলারের বিরুদ্ধে তেজোবীর্যের সাথে যুদ্ধ করবে ব্রিটিশ টরিরা।
একটি জাতি, ধর্ম বা দলের ক্ষমতালাভের জন্য জরুরি মেজাজ ও অভ্যাসের উপর নির্ভরশীল সমতা। যেখানে এর অস্তিত্ব রয়েছে সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাসের প্রয়োজন নেই। গ্রেট ব্রিটেনে এর অস্তিত্ব বিদ্যমান কিন্তু সেখানে তা ছিল না ১৭৪৫ সাল পর্যন্ত। ১৯৭২ সালে ফ্রান্সে অথবা বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধের সময় রাশিয়ায় এর অস্তিত্ব ছিল না। এ মুহূর্তে এর অস্তিত্ব নেই স্পেনে। কার্যক্ষেত্রে আনুগত্যের উপর নির্ভর করতে পারলে একটি সরকারের পক্ষে মুক্ত চিন্তার অনুকূলে সম্মতি প্রদান করা কঠিন নয়। কিন্তু বিষয়টি জটিল হয়ে যেতে পারে সম্মতি প্রদানে অনিচ্ছার দরুন। এটা স্পষ্ট যে, গৃহযুদ্ধের সময় স্বাধীন প্রচারণা অসম্ভব, কিন্তু আসন্ন গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রচারণা নিষিদ্ধকরণের যুক্তিগুলো কম আকর্ষণীয়। জোরালো যুক্তি বিদ্যমান মারাত্মক পরিবেশে আরোপিত সমস্যার পক্ষে।
এখন ধরা যাক দ্বিতীয় উক্তিটি। সত্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিশ্বাসগুলো নেয়াই সুবিধাজনক। সরাসরি সুবিধা সম্ভব শুধু সীমিত শ্রেণির বিশ্বাসের বেলায়। প্রথমত উচ্চ বিস্ফোরক দ্রব্য ও বিষাক্ত গ্যাসের মতো বিষয়গুলো এবং পরে ধরা যেতে পারে বিরোধী শক্তিগুলোর আপেক্ষিক ক্ষমতা-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো। এসব বিষয় সম্পর্কেও বলা যেতে পারে যে, শুধু নীতি ও সামরিক ক্রিয়াকলাপ নির্ধারণে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন : আশা করা যায় যে জনগণ বিজয়ের নিশ্চয়তা অনুভব করবে এবং বিমান ও আক্রমণপ্রসূত বিপদের গুরুত্ব কমই দেবে। সত্য সম্পর্কে অবহিত হবেন শুধু সরকার, সামরিক কর্তাব্যক্তি ও তাদের কুশলীরাই। অন্যান্য মানুষের ভেতর সর্বাধিক কাম্যআত্মবিশ্বাস ও অন্ধভাবে বাধ্য থাকা।
