তা হচ্ছে কোনো অব্যাহত গোঁড়ামি প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব, কারণ বিজয়ের জন্য তা মনে করা হয় প্রয়োজনীয়। যুক্তিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে তাই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রে বিপ্লবের সম্ভাব্যতা আনন্দের অপরিহার্য ভিত্তি নয়। এর অধিক যা আশা করতে হয় তা হচ্ছে নিরাপত্তা অপরিহার্য ভিত্তি নয়। এর অধিক যা আশা করতে হয় তা হচ্ছে নিরাপত্তা বোধের ক্রমবৃদ্ধি। এটি উৎসাহ কমিয়ে দেবে এবং উন্মুক্ত করবে অলসতার দ্বার। সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের এটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।
১০. ক্ষমতার উৎস : ধর্মমত
লোকসংখ্যা, অর্থনৈতিক উৎসগুলো এবং কৌশলগত যোগ্যতার উপরই শুধু নির্ভর করে না একটি সম্প্রদায়ের ক্ষমতা, নির্ভর করে সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরে বিরাজমান বিশ্বাসের উপরও। কখনও জনগণের অন্ধ বিশ্বাস সম্প্রদায়ের ক্ষমতা প্রভূত বৃদ্ধি করে আবার কখনও তা হ্রাস করে দেয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর চেয়ে বর্তমান সমাজে ধর্মোন্মাদনা ব্যাপকতা লাভ করেছে, তাই ক্ষমতার যুক্তি হচ্ছে, ঐক্যবদ্ধ উন্মাদ জাতির চেয়ে যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনা বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠ সুস্থ। জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত জাতির। এ যুক্তির বিচার করা যাক ইতিহাসের আলোকে।
শুরুতে এটা লক্ষণীয়, ব্যর্থতার ক্ষেত্রগুলো উন্মাদনার সফল ক্ষেত্রগুলোর চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম জ্ঞাত। কারণ ব্যর্থতার ক্ষেত্রগুলো অপেক্ষাকৃত অস্পষ্ট রয়েছে। সুতরাং ভুল হতে বাধ্য ত্বরিত পরীক্ষণ। কিন্তু তা এড়ানো কঠিন নয় যদি আমরা সম্ভাব্য ভুলের উৎস সম্বন্ধে অবহিত হই।
ইসলামের অভ্যুদয় হচ্ছে ধর্মোন্মাদনার মাধ্যমে ক্ষমতালাভের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত। আরবদের সম্পদ ও জ্ঞানে নতুন কিছুই যোগ করেননি মোহাম্মদ (সঃ)। তারপরও তার মৃত্যুর কিছুদিনের ভেতর তার অনুসারীরা শক্তিশালী প্রতিবেশিদের পরাজিত করে প্রতিষ্ঠা করে বিশাল সাম্রাজ্য। নিঃসন্দেহে নবী (সাঃ) কর্তৃক প্রবর্তিত ধর্মই তার জাতির বিজয়ের অপরিহার্য উপাদান। জীবনের শেষদিকে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেন বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। মুসলমানরা নিরুৎসাহিত ছিল : তারা ইঙ্গিত করল অর্থ, ঘোড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবের দিকে। তারা আরও বলল যে, এটা ফসল কাটার সময় এবং গ্রীষ্মের অসহনীয় গরম। নবী ঘৃণাভরে উচ্চারণ করলেন, নরকের আগুন এর চেয়েও গরম। তিনি ঘৃণার চোখে দেখতেন বাধ্যতামূলক সেবা গ্রহণ। কিন্তু ফিরে এসে পঞ্চাশ দিনের জন্য সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কার করে চরম অপরাধীদের শাস্তি দেন। মোহাম্মদ (সঃ)-এর জীবিতাবস্থায় এবং তার মৃত্যুর পর কয়েক বছর পর্যন্ত ধর্মোন্মদনার মাধ্যমে আরব জাতির ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যুদ্ধে আত্মবিশ্বাস জন্মে। অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে বেহেস্ত পাওয়া যাবে-সাহস সঞ্চার করা হয় এ ধরনের বিশ্বাস জন্মানোর মাধ্যমে।
কিন্তু উন্মাদনা যদিও প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোতে আরবদের প্রেরণা দান করে, তারপরও অন্যান্য বিষয়ের ভূমিকা রয়েছে তাদের দীর্ঘ বিজয়ের ইতিহাসে। বাইজেনটাইন ও পারস্য দুটোই দুর্বল হয়ে পড়েছিল সিদ্ধান্তহীন দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে। রোমান সৈন্যরা সব সময়ই দুর্বল ছিল এবং অশ্বারোহণে তাদের অনীহা ছিল। আরব অশ্বারোহীরা অবিশ্বাস্যরকম দ্রুতগতিসম্পন্ন ছিল এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কষ্টসহিষ্ণু হয়ে উঠত, যা অসহনীয় ছিল তাদের বিলাস প্রিয় প্রতিবেশিদের কাছে। এসব অবস্থা অপরিহার্য ছিল মুসলমানদের প্রাথমিক সাফল্যের জন্য।
খুব শিগগিরই উন্মাদনামুক্ত করা হলো সরকার। নবী (সঃ)-এর জামাতা হযরত আলী (রাঃ) বিশ্বাসীদের একটি সম্প্রদায়ের ভেতর মূল উন্মাদনা জিইয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি গৃহযুদ্ধে পরাজিত হন এবং শেষ পর্যন্ত শহীদ হন। তারপর খেলাফতে অধিষ্ঠিত হলো নবী (সঃ)-এর ঘোর বিরোধী উমাইয়া পরিবার। কিন্তু ধর্মে তাদের রাজনৈতিক সম্মতি ছাড়া বেশি কিছু ছিল না। মোহাম্মদ (সঃ)-এর নির্যাতনকারীরা জোরপূর্বক দখল করল তার সন্তানদের উত্তরাধিকার এবং তার ধর্ম ও রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তা হয়ে বসল প্রতিমা পূজারিরা। বিরোধিতায় আবু সুফিয়ান দুর্দান্ত ও অনড় ছিলেন। তার ধর্ম গ্রহণ ধীরগতিসম্পন্ন ও অনিচ্ছাকৃত ছিল। প্রয়োজন ও স্বার্থ দ্বারা সমর্থিত ছিল তার নতুন বিশ্বাস। তিনি যুদ্ধ করেন এবং সেবা দান করেন এবং সম্ভবত তিনি বিশ্বাসও করতেন। উমাইয়া পরিবারের যোগ্যতার দ্বারা অন্ধকার যুগের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হলো। এ মুহূর্ত থেকে অনেক দিন পর্যন্ত খেলাফত মুক্ত চিন্তার জন্য চিহ্নিত হয়ে রইল। কিন্তু খ্রিস্টানরা উন্মাদ রয়ে গেল। প্রথম থেকেই মোহাম্মদ (সঃ)-এর অনুসারীরা বিজিত খ্রিস্টানদের সঙ্গে তাদের আচরণে সংযমের পরিচয় দেন। এই সংযম খ্রিস্টানদের নির্যাতনস্পৃহার প্রবল বিরোধী। তাদের বিজয় ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রধান কারণ ছিল এই সংযম।
ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে স্বাধীনতাবাদীদের বিজয় হচ্ছে উন্মাদনার এই আপাত সাফল্যের অন্য একটি উদাহরণ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে যে, উন্মাদনার কতটুকু ভূমিকা ছিল ক্রমওয়েলের সাফল্যে? বাজার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পার্লামেন্ট এজন্য বিজয়ী হয় যে লন্ডন ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো এর পক্ষে ছিল; জনশক্তি ও অর্থ সম্পদের দিক দিয়ে তা রাজাকে অনেক দূর অতিক্রম করে গিয়েছিল। মধ্যপন্থিদের মতো প্রেসবাইটেরিওয়অরা বিপ্লবের ফলে ক্রমাগতভাবে একদিকে চলে যায়, কারণ, তারা সর্বান্তকরণে বিজয়ের প্রত্যাশা করছিল না। ক্রমওয়েল একজন বাস্তব রাজনীতিবিদ হয়ে পড়েন ক্ষমতা অর্জনের পর এবং উদ্বিগ্ন ছিলেন সংকটাবস্থাকে সর্বোত্তম পন্থায় কাজে লাগানোর ব্যাপারে। কিন্তু তিনি তার অনুসারীদের উন্মাদনা উপেক্ষা করতে পারেননি, যা এতই অপ্রিয় ছিল যে পরিণামে এর জন্যেই তার দলের পতন হয়। এ কথা বলা যাবে না যে, উন্মাদনা ইংলিশ স্বাধীনতাবাদীদের চেয়ে তাদের পূর্বসূরিদের সাফল্যে বেশি কিছু করেছে।
