ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা অর্জন করেন পুনর্ব্যক্ততার শক্তি বলে বিশ্বাস প্রভাবিত করার সামর্থ্য। অফিসিয়াল প্রচারণার রয়েছে নতুন ও পুরনো রূপ। চার্চের কৌশল অনেক দিক দিয়েই প্রশংসার যোগ্য; কিন্তু তা ছাপাখানা আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত উন্নতি লাভ করে। এ কারণে আগের মতো ফলপ্রদ নয়। বহু শতাব্দী ধরে রাষ্ট্র বিশেষ বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে : মুদ্রার উপর রাজার মাথা, রাজ্যাভিষেক এবং জুবিলি, পদাতিক ও নৌবাহিনীর প্রদর্শনমূলক ক্রিয়াকলাপ ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো শিক্ষা, সংবাদ মাধ্যম, সিনেমা, রেডিও ইত্যাদির মতো আধুনিক পদ্ধতিগুলোর চেয়ে অনেক কম শক্তিসম্পন্ন। সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রগুলোতে এগুলো চরমভাবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এত শিগগির এগুলো .মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
আমি বলেছিলাম, আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে হৃদয়বৃত্তিতে নাড়া দিতে পারে না প্রচারণা। তা প্রমাণ করা যেতে পারে জাতীয়তাবোধের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রচারণা ব্যর্থতার দ্বারা। দৃষ্টান্ত স্বরূপ যুদ্ধপূর্ব অস্টিয়া, হাঙ্গেরির বৃহদংশ, ১৯৯২ সাল পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড এবং বর্তমান যুগ পর্যন্ত ভারতে সংঘটিত ঘটনাবলি উল্লেখ করা যায়। প্রচারণা সফল হয় রোগীর হৃদয়ানুভূতির সঙ্গে ঐকতান সৃষ্টি করলেই। মৌন সম্মতির এ ধরনের কোনো মৌল কারণ না থাকলে কর্তৃপক্ষের দাবি নিন্দার চোখে দেখা হয়। সরকারি দৃষ্টিকোণ থেকে গণতন্ত্রের সুবিধা হচ্ছে, এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করা সহজ; কারণ, তারা গণতান্ত্রিক সরকারকে নিজের সরকার মনে করে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের বিরুদ্ধাচরণ অন্যান্য শাসন পদ্ধতির চেয়ে গণতন্ত্রে কম। গণতন্ত্রে অধিকাংশ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে যেতে পারে কঠিন ও নীরস নেতা নির্বাচনের জন্য নিজেদের ভুল স্বীকারের মাধ্যমে।
গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে পদ্ধতিগত ব্যাপকভিত্তিক প্রচারণা বর্তমানকালে চার্চ, ব্যবসা, রাজনৈতিক দল, প্রটোক্র্যাসি এবং রাষ্ট্রের ভেতর হয়ে পড়েছে বিভক্ত। বিরোধী রাজনৈতিক দল ছাড়া এসব শক্তি একই পক্ষে থাকে। বিরোধী দলগুলোও ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পেলে রাষ্ট্রীয় প্রচারণা মৌল বিষয়গুলোর বিরোধিতা করে না। সর্বগ্রাসী দেশগুলোতে রাষ্ট্রই একমাত্র প্রচারক। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না আধুনিক প্রচারণার সর্বপ্রকার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর অফিসিয়াল দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপকভাবে গৃহীত হবে। জাতীয় অনুভূতি বিরোধী সরকারের মতোই এ ধরনের অবস্থার ফলে জন্ম নেয় সরকারের ব্যর্থতাবোধ। যুদ্ধোন্মদনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যত বেশি জয়ের ভরসা দেয়া হয় জয়ের সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায় হলে প্রতিক্রিয়া তত বেশি হয়। সুতরাং আশঙ্কা করা হয় যে, বিগত যুদ্ধের মতো পরবর্তী যুদ্ধ বিপ্লবের বীজ ছাড়ানোর মাধ্যমে সমাপ্ত হবে। যুদ্ধ আরও বেশি ধ্বংসাত্মক হবে বিধায় ১৯১৭ ও ১৯১৮ সালে বিপ্লবের চেয়েও বেশি ভয়ানক হবে। শাসকরা উচ্ছঙ্খল জনতার হাতে মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে বুঝতে পারেন, যা শত্রুর হাতে সৈন্যদের মৃত্যুর ঝুঁকির সমান।
ক্ষমতার উচ্চ মূল্যায়ন সহজ অফিসিয়াল প্রচারণায়, বিশেষত যখন কোনো প্রতিযোগিতামূলক প্রচারণা থাকে না। সময়মতো যেসব উপপাদ্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যায় ওইসব মিথ্যা উপপাদ্যে বিশ্বাস জন্মানোর লক্ষ্যে অফিসিয়াল প্রচারণা নিবেদিত হলে এর অবস্থান গ্যালিলিওর বিরুদ্ধবাদী এরিস্টটলের অনুসারীদের মতোই খারাপ হয়। বিরোধী দুটো রাষ্ট্রশক্তির প্রত্যেক পক্ষই যদি মানুষের মনে নিশ্চিত যুদ্ধ জয়ের প্রচারণা চালায় তবে উভয় পক্ষ না হলেও একপক্ষ অবশ্যই নাটকীয়ভাবে অফিসিয়াল বিবৃতি খন্ডনের অভিজ্ঞতা লাভ করবে। যখন সব বিরোধী প্রচারণা নিষিদ্ধ থাকে তখন শাসকদের মনে করা স্বাভাবিক যে, তা সৃষ্টি করতে পারে যে কোনো ধরনের বিশ্বাস। সুতরাং অসতর্ক হয়ে পড়ে অতিমাত্রায় ধারণা পোষণ করে। শক্তি বজায় রাখতে হলে প্রয়োজন মিথ্যাগুলোর ভেতর প্রতিযোগিতা।
ক্ষমতা রাষ্ট্রের একচেটিয়া অধিকারভুক্ত হয় মতামতের উপর একীভূত ও ঘনীভূত হয়ে। কিন্তু এটা মনে করা যুক্তিসঙ্গত হবে না যে, যুদ্ধ ছাড়া অন্য সময়েও রাষ্ট্রের একচেটিয়া প্রচারের ফলে সরকার অজেয় হবে। লুথারীয় যুগের পোপদের মতো পরিণামে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা সাধারণ লোকের স্বার্থের প্রতি অতিশয় উদাসীন হয়ে পড়তে পারেন। শিগগির অথবা বিলম্বে কোনো নতুন লুথার রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তুলবেন এবং তার পূর্বসূরিদের মতো এত দ্রুত সফল হবেন যে তাকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ রকম হবে কারণ, শাসকরা মনে করেন যে এ রকম কিছু ঘটতে পারে না। কিন্তু এ রকম পূর্বাভাস পাওয়া অসম্ভব যে মঙ্গলের জন্য পরিবর্তনটি।
অন্য কিছুর মতো বিপ্লব বিলম্বিত হয়ে প্রচারণার ব্যাপারে সংগঠন ও একত্রীকরণের প্রভাবে, কিন্তু যখন তা ঘটে তখন তা অধিকতর প্রচন্ড হয়ে থাকে। শুধু একটি মতবাদ অফিসিয়াল অনুমোদন পেলে বিকল্প মতবাদের চিন্তা ও তার তুলনামূলক গুরুত্ব নিরূপণের সুযোগ পায় না। শুধু আবেগপ্রসূত বিদ্রোহের মহাজোয়ার গোঁড়ামি দূর করতে পারে। মনে হয় সফলতা অর্জনের উদ্দেশ্যে সরকারি মতবাদের মধ্যেও সত্য জিনিসটি অগ্রাহ্য করা প্রয়োজন বিরোধিতাকে যথেষ্ট একাগ্র ও প্রচন্ড করে তোলার জন্যে। শুধু যে জিনিসটি অগ্রাহ্য করা যাবে
