আজ প্রথাগত হয়ে পড়েছে মানবীয় কার্যাবলির সহায়ক শক্তি হিসেবে যুক্তি পরামর্শ রহিতকরণ। তারপরও বিজ্ঞানের অভ্যুদয় হচ্ছে অন্য দিকে এক অদম্য শক্তি। বিজ্ঞানজগতের ব্যক্তিরা অপেশাদার বুদ্ধিমান মানুষের কাছে এ কথা প্রমাণ করেন যে, একটি বিশেষ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি সামরিক শৌর্য-বীর্যের সহায়ক। ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনুরাগ ও চার্চের রাজত্ব এবং প্রথাজনিত শক্তি সত্ত্বেও এসব লক্ষ্য এত আগ্রহের সঙ্গে প্রতীক্ষিত হচ্ছিল যে নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অতিক্রম করে যাবে। সূর্যকে স্থির থাকতে বাধ্য করেছিল যশোয়া-এ জাতীয় বিশ্বাস বিশ্ববাণী পরিত্যাগ করেছে। নৌ চলাচলের জন্য উপকারী কোপারনিকাসের জোতির্বিদ্যা। এরিস্টটলের পদার্থবিদ্যা পরিত্যক্ত হলো। কারণ, পড়ন্ত বস্তু সম্পৰ্কীয় গ্যালিলিওর তত্ত্বের দ্বারা ক্যানন বলের গতিপথ বের করা সম্ভব হলো। বন্যার কাহিনী প্রত্যাখ্যান করা হলো, কারণ ভূতত্ত্ববিদ্যা খনিজ সম্পদ উত্তোলনের জন্য উপযোগী। এখন সাধারণভাবে স্বীকৃত হচ্ছে যে, যুদ্ধ এবং শান্তিকালীন শিল্পের জন্য বিজ্ঞান অপরিহার্য এবং বিজ্ঞান ছাড়া কোনো জাতি সম্পদশালী বা ক্ষমতাশালী হতে পারে না।
এসব প্রভাব শুধু মতামতের উপর বিজ্ঞানের বদৌলতে বাস্তবধর্মী আবেদনের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে সাধারণ তত্ত্বের মাধ্যমে বিজ্ঞান যা বলতে চায় তা প্রশ্নাতীত নয়। কিন্তু কৌশলের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফল সবার জন্য উন্মুক্ত। বিজ্ঞান শ্বেতকায় মানুষের এ পৃথিবীর প্রভুত্ব দান করেছিল, কিন্তু তা হারাতে বসে জাপানিরা তাদের কৌশল শিখে ফেললে।
যুক্তি-পরামর্শের ক্ষমতা সম্পর্কে এই দৃষ্টান্ত থেকে কিছু জানা যেতে পারে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুক্তি-পরামর্শ কুসংস্কারের উপর জয়যুক্ত হয়, কারণ তা চলমান উদ্দেশ্য উপলব্ধি পথ প্রদর্শন করে। অধিকন্তু এ ধরনের কাজের পক্ষে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। যারা বলতে চান যে মানবীয় কার্যাবলিতে যুক্তির কোনো ক্ষমতা নেই, তারা এ দুটো যুক্তি অবহেলার চোখে দেখেন। যদি শুধু যুক্তি-পরামর্শের নামে আপনি কোনো লোককে তার মৌলিক উদ্দেশ্য পরিবর্তন করার আহ্বান জানান তাহলে আপনি ব্যর্থ হবেন এবং আপনি ব্যর্থ হতে বাধ্য, কারণ, শুধু যুক্তি পরার্মশই জীবনের লক্ষ্য নিরূপণ করতে পারে না। প্রোথিতমূল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আপনার আক্রমণ একইভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে যদি আপনারা যুক্তিগুলো প্রশ্নাতীত না হয় অথবা এত কঠিন না হয় যে শুধু বিজ্ঞানের ছাত্ররাই এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। প্রত্যেক সুস্থ ব্যক্তির কাছে বিশ্বাসযোগ্য দৃষ্টান্ত দ্বারা আপনি প্রমাণ করতে পারেন যে, আপনি বিদ্যমান আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে সক্ষম, তবে আপনি আশা করতে পারেন যে আপনি যা বলবেন মানুষ তা বিশ্বাস করবে। অবশ্য এতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে যে, আপনি যেসব আশা পূর্ণ করতে সক্ষম তা যারা ক্ষমতালাভে সক্ষম তাদের।
মানবীয় কার্যাবলির ক্ষেত্রে এগুলো হচ্ছে বিচার-বুদ্ধিজাত ক্ষমতা। আমি এখন আলোচনা করব অন্য এক প্রকার বলহীন যুক্তি-পরামর্শ সম্পর্কে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ধর্ম প্রচারকদের যুক্তি-পরামর্শ সম্বন্ধে। মামুলি ফর্মুলায় পর্যবসিত পদ্ধতি হচ্ছে : যদি বিশেষ উপপাদ্য সত্য হয় তবে আমি আমার আকাঙ্ক্ষা পূরণে সমর্থ হব। আমি আশা করি যে, এই উপপাদ্যটি সত্য হবে; সুতরাং আমার ব্যতিক্রমধর্মী বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মনিয়ন্ত্রণ না থাকলে আমি একে সত্য বলে বিশ্বাস করব। আমাকে বলা হয়েছে যে, গোঁড়ামি ও ধর্মীয় জীবনযাপন মৃত্যুর পর আমাকে স্বর্গে যাওয়ার সামর্থ্য যোগাবে। এ রকম বিশ্বাসের পেছনে আনন্দ রয়েছে এবং সম্ভবত আমি তা বিশ্বাস করব যদি জোরেশোরে তা আমার কাছে উপস্থাপন করা হয়। এই বিশ্বাসের কারণ বিজ্ঞানের সত্য তথ্যের মতো নয়, বরং বিশ্বাস থেকে প্রাপ্ত আনন্দানুভূতি ও তৎসমেত বিশ্বাস জন্মানোর নিমিত্ত প্রাণশক্তি, যা অবিশ্বাসযোগ্য করে তোলে না ওই পরিবেশে।
প্রচারাভিযানের ক্ষমতা এই শিরোনামে ধরা পড়ে। এমন দিলে বিশ্বাস করা আনন্দদায়ক, কারণ তা আপনাকে আশা প্রদান করে ভালো স্বাস্থ্যের। এগুলো বিশ্বাস করা সম্ভব যদি আপনি দেখতে পান যে এগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জোরেশোরে ঘন ঘন ঘোষণা করা হচ্ছে। সঙ্গত প্রচারণার মতো অসঙ্গত প্রচারণা ও অবশ্য মানুষের অনুভূতিকে নাড়া দেয়। কিন্তু সত্যের প্রতি আবেদনের পুনর্ব্যক্ততার প্রতিকল্প স্বরূপ এগুলো।
বাস্তব ক্ষেত্রে এত পরিষ্কার নয় উপরোল্লিখিত বিশ্লেষণের মতো যৌক্তিক ও অযৌক্তিক আবেদনের ভেতর পার্থক্য। চূড়ান্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট না হলেও স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান কিছু যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ। অযৌক্তিক অবস্থা বিরাজ করে কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপের ভেতর। প্রথাগত না হলে বিশ্বাস আকাঙ্ক্ষা, প্রমাণ ও পুনর্ব্যক্ততার সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়ে থাকে। আকাক্ষা ও প্রমাণের অভাব হলে বিশ্বাস অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে গুরুত্ব আরোপিত না হলে বিশ্বাস ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য নিয়ে আবির্ভূত হয়। ধর্মের প্রবর্তক, বিজ্ঞান আবিষ্কর্তা ও পাগলের বৈশিষ্ট্যের অনুরূপ এইগুলো।
