আইন সম্পদ সীমাবদ্ধতা আরোপ করে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শোষণের উপর। ব্যক্তি বিশেষ বা দল বিশেষ অবশ্যই একচেটিয়া অধিকার রাখে অন্যান্য লোকের আকাঙ্ক্ষিত কিছুর উপর আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে। একচেটিয়া অধিকার আইন দ্বারা সৃষ্টি হতে পারে, যেমন– ঔষধপত্রের উৎপাদন, ছাপানো ইত্যাদি অধিকার ও জমির মালিকানা। এগুলো সৃষ্টি হতে পারে ট্রেড ইউনিয়ন ও ট্রাস্টের মতো সংঘের মাধ্যমে। দরকষাকষির মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে বা সমষ্টিগতভাবে যা কিছু লাভ করা যায় রাষ্ট্র ঐগুলো ছাড়া প্রয়োজনীয় অন্য সব কিছুই বল প্রয়োগ করে অর্জন করার অধিকার রাখে। প্রভাবশালী মহল রাষ্ট্রকে অধিকার আদায়ে এবং যুদ্ধে এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করে যা সঠিকভাবে জাতির জন্য নয় বরং নিজেদের পক্ষে সুবিধাজনক তাদের সুবিধামত আইন কাজে লাগাতে পারে, যেমন শ্রমিকদের নয়, নিয়োগকারীদের সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগদানে। প্রকৃত অর্থে ব্যক্তি বিশেষ বা গোষ্ঠী বিশেষের অর্থনৈতিক ক্ষমতা সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল এবং অর্থনীতির সাধারণ বিবেচ্য উৎপাদকগুলোকে প্রচারণার মাধ্যমে প্রভাবিত করে থাকে। পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় প্রায়োগিক ক্ষেত্রে অর্থনীতি পৃথক বিজ্ঞান হিসেবে আবির্ভূত হলে তা হবে অবাস্তব ও ত্রুটিপূর্ণ। ক্ষমতা বিজ্ঞানের বিশদ অধ্যয়নের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, এ কথা সত্য।
০৯. জনমত সংগঠনের ক্ষমতার প্রভাব
এমন দৃষ্টিভঙ্গির সহায়ক যুক্তি খুঁজে বের করা সহজ যে, মতামতই সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং অন্যসব ক্ষমতা এ থেকেই উদ্ভুত। সৈন্যরা অকেজো হয়ে পড়ে যুদ্ধের যৌক্তিকতা সম্পর্কে যুদ্ধরত সৈন্যদের আস্থার অভাব হলে অথবা ভাড়াটে সৈন্যদের বেলা বিজয়লাভে সেনাপতির যোগ্যতায় আস্থা না থাকলে। আইন অর্থহীন হয়ে পড়ে সমাজে সাধারণ স্বীকৃতির অভাব হলে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ভরশীল আইনের প্রতি শ্রদ্ধার উপর। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায় যে, জালিয়াতির বিরুদ্ধে নাগরিকদের আপত্তি না থাকলে ব্যাংকিংয়ের ব্যাপারে কি ঘটত? প্রায়ই রাষ্ট্রের চেয়ে ধর্মীয় মতামত বেশি শক্তিশালী বলে প্রমাণিত। কোনো দেশের অধিকাংশ জনগণ সমাজতন্ত্রের পক্ষ অবলম্বন করলে সে দেশে ধনতন্ত্র অচল হয়ে পড়ে। এমন ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে, মতামতই হচ্ছে সামাজিক কার্যকলাপে সর্বোচ্চ ক্ষমতা।
কিন্তু মতামত গঠনকারী কারণগুলো অবহেলিত হলে অর্ধেকে এসে দাঁড়ায় এর সত্যতা। জনমত সামরিক শক্তির জন্য অপরিহার্য–এ কথা যেমন সত্য তেমনি সমভাবে সত্য যে সামরিক শক্তি জনমত গঠন করতে পারে। এ মুহূর্তে ইউরোপের প্রত্যেকটি দেশে একটি করে ধর্ম রয়েছে যা ষোড়শ শতাব্দীর শেষদিকে ওই দেশগুলো রাষ্ট্রধর্ম ছিল সেনাশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নির্যাতন ও প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ করত কোনো কোনো দেশ। এ কথা মনে করা হয় যে মনোগত কারণেই মতামত গঠিত হয়। কিন্তু তা শুধু সত্য অব্যবহিত কারণের বেলা। পটভূমিতে ধর্মমতের সেবায় স্বভাবতই শক্তির ভূমিকা বিদ্যমান।
বিপরীত দিক থেকে বলা যায় যে, সূচনালগ্নে ধর্মমতের অধীন কোনো শক্তি থাকে না এবং প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোতে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করতে হয় শুধু যুক্তি-পরামর্শের মাধ্যমে।
সুতরাং আমি সন্ধান পাই এক প্রকার ঊর্ধ্ব-নিম্নমুখী গতির : প্রথমত অল্প মানুষের দীক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে বিশুদ্ধ যুক্তি-পরামর্শের ব্যবহার, তারপর অবশিষ্ট মানুষের সঠিক প্রচারণার প্রভাবাধীন করার লক্ষ্যে শক্তি প্রয়োগ এবং পরিশেষে বৃহৎ অংশের অকৃত্রিম বিশ্বাস, যা আবারও শক্তির ব্যবহার অপ্রয়োজনীয় করে দেয়। কিছু মানুষ মতামতের ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায় ছাড়িয়ে যায় না, কিছু দ্বিতীয় পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে তারপর ব্যর্থ হয় এবং অন্যান্য মানুষ তিনটির সব কটিতে সফল হয়। বন্ধু সমাজ কখনও যুক্তি-পরামর্শের বাইরে যায়নি। অন্যান্য গির্জা অমান্যকারীরা ক্রমওয়েলের সময় অর্জন করে রাষ্ট্রশক্তি। কিন্তু ব্যর্থ হয় ক্ষমতা দখলের পর প্রচারণায়। তিন শতাব্দী ধরে যুক্তি-পরামর্শ ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যাথলিক চার্চ অর্জন করে কনস্টান্টাইনে সময় রাষ্ট্রশক্তি। তারপর শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি প্রচারণা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করে, যার ফলশ্রুতিস্বরূপ প্রায় সব পৌত্তলিক খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়। বর্বরদের আক্রমণের পরও খ্রিস্ট ধর্ম বেঁচে থাকে। রাশিয়ার মার্কসীয় ধর্মমত দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে, কিন্তু অন্যত্র তা সীমাবদ্ধ প্রথম পর্যায়েই।
যা হোক, কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত রয়েছে যে কোনো স্তরে বল প্রয়োগ ছাড়া জনমত গঠনকারী প্রভাবের। বিজ্ঞানের অভ্যুদয় হচ্ছে এগুলোর ভেতর উল্লেখযোগ্য। অধুনা সভ্য দেশগুলোতে বিজ্ঞান রাষ্ট্র কর্তৃক উৎসাহিত হচ্ছে। কিন্তু এর সূচনালগ্নে অবস্থা এ রকম ছিল না। গ্যালিলিওকে তার বিশ্বাস পরিত্যাগে বাধ্য করা হয়। নিউটনকে মিন্টোর প্রভু বানানোর মাধ্যমে থামিয়ে দেয়া হয়। ক্রিস্ট ও এরিস্টটলসহ ইতিহাসে জ্ঞাত অন্যান্য ব্যক্তিত্বের চেয়ে তাদের প্রভাব অনেক বেশি। অন্য একমাত্র ব্যক্তিত্ব যার প্রভাব তুলনামূলকভাবে গুরুত্বের অধিকারী তিনি হচ্ছেন পিথাগোরাস। সন্দেহজনক তার অস্তিত্ব।
