এর ভূমিকা বৃদ্ধি পেয়েছে শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে জাতীয় ক্ষমতার প্রচারণায়। অধিকাংশ মানুষ দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে এবং কিছুসংখ্যক মানুষ মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত না থাকলে কোনো জাতিই আধুনিক যুদ্ধে জয় লাভ করতে পারে না। শাসকরা এ ধরনের অভিপ্রায়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রজাদের মনে এমন প্রত্যয় সৃষ্টি করেন যে যুদ্ধে মৃত্যুবরণকারী শহীদের সমমর্যাদাসম্পন্ন। যুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়ের প্রধান কারণ প্রচারণা এবং ১৯১৮-২০ সময়কালের ভেতর সোভিয়েতেদের বিজয়ের একমাত্র কারণ তা-ই। এটা স্পষ্ট যে, যেসব কারণে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা একীভূত হয়, ওই একই কারণে এ উভয় প্রচারণা একীভূত হয়। প্রকৃতপক্ষে একটি সংগঠনে সর্বপ্রকার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে–এ সংগঠনটি হলো রাষ্ট্র। বিভিন্ন প্রকার ক্ষমতার ভেতর পার্থক্য শিগগিরই শুধু ঐতিহাসিক আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে প্রতিবাদী শক্তিগুলো কার্যকর না হলে।
অবশ্য এই প্রেক্ষাপটে মার্কসবাদের সমর্থনপুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনা প্রয়োজনীয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে পুঁজিবাদী শ্রেণি সংগ্রামের জন্ম দেয়, যা পরিণামে অন্যান্য সংগ্রামকে প্রভাবিত করে। মার্কসবাদের ব্যাখ্যা সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু মার্কস মনে হয় ভেবেছিলেন যে শান্তির সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকে জমিদার ও পুঁজিপতিদের হাতে। এরা চরমতম বিশ্লেষণ চালায়। ফলে বিদ্রোহ দানা বেঁধে ওঠে প্রলেতারীয়দের ভেতর। প্রলেতারীয়রা বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায় একত্রিত হলেই জয় লাভ করবে এবং এমন একটি পদ্ধতি প্রবর্তন করবে যে জমি ও পুঁজি থেকে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে সমাজের হাতে ন্যস্ত থাকবে। সঠিকভাবে তত্ত্বটি মার্কসের হোক বা না হোক, ব্যাপকভাবে তা আজকাল সাম্যবাদীদের এবং তাই এটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার দাবিদার।
জমিদার ও পুঁজিপতিদের হাতে সব অর্থনৈতিক ক্ষমতা-এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি যদিও মোটামুটিভাবে সত্য এবং এ পর্যন্ত আমি তা-ই ধরে নিয়েছি, তারপরও এর গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জমিদার ও পুঁজিপতিরা শ্রম ছাড়া বড় অসহায়। তাই ধর্মঘটে দৃঢ় সংকল্প ও ব্যাপকতা থাকলে অর্থনৈতিক ক্ষমতায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। কিন্তু ধর্মঘটের সম্ভাবনা এতই পরিচিত যে আমি আর কিছুই বলব না এ সম্পর্কে।
দ্বিতীয় যে প্রশ্ন উঠে তা হচ্ছে : প্রকৃতপক্ষে পুঁজিপতিরা তাদের চরমতম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে কি? যেখানে তারা অপরিণামদর্শী নয় সেখানে মার্কসের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী পরিণতির ভয়ে তারা এমন করে না। শ্রমিকদের উন্নতি লাভে সুযোগ দেয়া হলে তারা বিপ্লব থেকে বিরত থাকে। আমেরিকা এর উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। দক্ষ শ্রমিকরা সেখানে রক্ষণশীল।
এমন ধারণা খুবই প্রশ্ন সাপেক্ষ যে প্রলেতারীয়রা সংখ্যাগরিষ্ঠ। কৃষিপ্রধান যে দেশের জমির উপর কৃষকদের মালিকানা রয়েছে সেখানে মোটেই এর সত্যতা নেই। যেসব দেশে স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ অনেক বেশি সেখানে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী যারা প্রলেতারীয় তারা রাজনীতির ক্ষেত্রে ধনীদের পক্ষে থাকে, কারণ তাদের চাকরি নির্ভরশীল বিলাস সামগ্রীর চাহিদার উপর। এক্ষেত্রে প্রলেতারীয়ের বিজয় কোনোক্রমেই নিশ্চিত নয় শ্রেণি সংগ্রাম সংগঠিত হলে।
অধিকাংশ মানুষই চরম সংকট মুহূর্তে তার শ্রেণির চেয়ে জাতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে। এর রকম সবসময় নাও হতে পারে। কিন্তু ১৯১৪ সালের পর আজ অবধি পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই, যখন প্রায় সব আন্তর্জাতিকবাদীই যুদ্ধবাজ ও দেশপ্রেমিক হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং শ্রেণি সগ্রাম যদিও সুদূর ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনা তারপরও খুব কমই তা আশা করা যায় না। বর্তমানের মতোই থেকে যাবে জাতীয়তাবাদী যুদ্ধের আশঙ্কা।
স্পেনের বর্তমান গৃহযুদ্ধ এবং অন্যান্য দেশে এর প্রতিক্রিয়া এ কথা প্রমাণ করে যে, জাতীয়তাবাদী ধারণাগুলো শ্রেণি সংগ্রামের প্রভাবাধীন। আমি মনে করি না যে, এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছে ঘটনা প্রবাহই। জার্মানি ও ইতালি জাতীয়তাবাদী পটভূমির জন্যেই জেনারেল ফ্রাঙ্কোর পক্ষ অবলম্বন করে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স একই জাতীয় কারণে ফ্রাঙ্কোর বিরোধিতা করে। এটা সত্য যে সরকারের নীতি ব্রিটিশ স্বার্থ অনুযায়ী স্থির করা হলে ব্রিটিশরা যতটুকু ফ্রাঙ্কোর বিরোধিতা করত বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম বিরোধিতাই করেছে। কারণ রক্ষণশীলরা। স্বভাবতই তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। তা সত্ত্বেও যখন মরক্কোর খনি অথবা ভূমধ্যসাগরে নৌ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তখনই ব্রিটিশ স্বার্থ রাজনৈতিক সহানুভূতি অগ্রাহ্য করেছে। রুশ বিপ্লব সত্ত্বেও ১৯১৪ সালের আগে বৃহৎ শক্তিগুলোর বিভিন্ন শিবিরে বিভক্তিই আবার কার্যকর হয়েছে। উদারপন্থিরা জারকে অপছন্দ করেছে এবং রক্ষণশীলরা স্ট্যালিনকে; কিন্তু স্যার E-কে অথবা বর্তমান সরকারের কেউই এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারতেন না ব্রিটিশ স্বার্থের প্রতি হস্তক্ষেপ।
যা এ অধ্যায়ে বলা হয়েছে তার সারসংক্ষেপ হচ্ছে : সামরিক ইউনিটের (যা কয়েকটি স্বাধীন দেশের সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে) অর্থনৈতিক ক্ষমতা নির্ভর করে (ক) নিজ ভূখন্ডের নিরাপত্তা বিধানে এর সামর্থ্যের উপর, (খ) অন্য রাষ্ট্রকে ভীতি প্রদানে এর ক্ষমতার উপর, (গ) কাঁচামাল, খাদ্য, শিল্প ক্ষেত্রে দক্ষতার উপর, (ঘ) অন্যান্য সামরিক ইউনিটের প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবা সরবরাহে এর সামর্থ্যের উপর। এর সব ক্ষেত্রে সামরিক ও অর্থনৈতিক উৎপাদনগুলো একটি অন্যটির সাথে মিশে আছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, জাপান শুধু মিলিটারি শক্তির দ্বারাই চীনা ভূ-খন্ডে তার সামরিক শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল অর্জন করে এবং একইভাবে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স অর্জন করে নিকট প্রাচ্যে তেল। কিন্তু শিল্পে পূর্ব অগ্রগতি ছাড়া উভয়টিই অসম্ভব। যুদ্ধ যতই বিজ্ঞানভিত্তিক ও যন্ত্রর্নিভর হচ্ছে সামরিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক গুরুত্ব ততই বাড়ছে। কিন্তু এ কথা মনে করা নিরাপদ নয় যে, অর্থনৈতিক সম্পদে শ্রেষ্ঠ পক্ষই জয়লাভ করে। প্রচারণার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে অর্থনৈতিক উৎপাদকের মতোই জাতীয়তাবোধ সৃষ্টিতে।
