সহজেই এই কেন্দ্রায়ন বোঝা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাধারণ শেয়ার মালিকদের মতামত রাখার কোনো সুযোগ নেই রেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনায়। তত্ত্বগতভাবে পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ ভোটাররা ব্যবস্থাপনায় যেটুকু ক্ষমতা রাখে, কোম্পানি ব্যবস্থাপনায় তাদের ততটুকু ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তারা তার চেয়েও কম ক্ষমতা ভোগ করে থাকেন। রেল কোম্পানি অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিছু সংখ্যক ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত; আমেরিকাতে তা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। প্রতিটি উন্নত দেশে অর্থনৈতিক ক্ষমতা মুষ্টিমেয় ব্যক্তিদের একচেটিয়া অধিকার। কখনও কখনও এরা আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্সে পুঁজিপতি। এরা জার্মানি, ইতালি ও রাশিয়ায় রাজনীতিবিদ। যেখানে রাজনৈতিকও অর্থনেতিক ক্ষমতা একীভূত হয়ে গেছে সেখানে উদ্ভব ঘটেছে শেষোক্ত পদ্ধতির। অর্থনৈতিক ক্ষমতা মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে কুক্ষিগত হওয়া সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু এ ধরনের প্রবণতা ক্ষমতার ক্ষেত্রে সাধারণতভাবে প্রযোজ্য-শুধু অর্থনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে নয়। একটি স্টিল ট্রাস্ট কিছু সংখ্যক প্রতিযোগিতাশীল ছোট ছোট স্টিল উৎপাদকের পরবর্তী স্তরের অন্তর্ভুক্ত। তেমনি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একাঙ্গীভূত অবস্থা ও এগুলোর পৃথক সত্তা রয়েছে পরবর্তী স্তরে। কিন্তু এখনও আমি যেতে চাই না সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের আলোচনায়।
অর্থনেতিক ক্ষমতা পর্যবসিত হতে পারে সামরিক বা প্রচারণা ক্ষমতায়। বিপরীত প্রতিক্রিয়াটিও ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন দেশের আন্তঃসম্পর্কে অন্তর্ভুক্ত হলে প্রাচীন অবস্থাধীন সামরিক ক্ষমতাই অন্যান্য ক্ষমতার উৎস। আলেকজান্ডার পারসিকদের মতো এবং রোমানরা কার্তেজদের মতো ধনী ছিলেন না; কিন্তু যুদ্ধে বিজয়ের ফলে বিজয়ীরা তাদের শত্রুদের চেয়ে ধনী হয়ে ওঠে। বিজয়ের সূচনালগ্নে মোহাম্মদ (সাঃ)-এর অনুসারীরা বাইজেনটাইনদের চেয়ে অনেক গরিব ছিলেন এবং টিউটনিক আক্রমণকারীরা ছিলেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যের চেয়ে গরিব। এসব ক্ষেত্রে সামরিক ক্ষমতা অর্থনৈতিক ক্ষমতার উৎস। কিন্তু আরব জাতির অভ্যন্তরে সামরিক ক্ষমতা নবী (সাঃ) ও তার পরিবারের প্রচারণার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে সৃষ্টি হয়েছিল পশ্চিমা চার্চের ক্ষমতা ও সম্পদ।
অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ক্ষমতাশালী হওয়ার পর সামরিক ক্ষমতা অর্জন করেছে–এমন অনেক রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রাচীনকালে উপকূলবর্তী গ্রিক শহর ও কার্তেজ। মধ্যযুগে ইতালীয় প্রজাতন্ত্র এবং বর্তমান যুগে প্রথমে হল্যান্ড ও পরে ইংল্যান্ড। শিল্প বিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের আংশিক ব্যতিক্রম ছাড়া এর সব ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি ছিল বাণিজ্য কাঁচামালের মালিকানা নয়। ভৌগোলিক সুবিধার সঙ্গে দক্ষতার সমন্বয়ে কোনো শহর বা রাষ্ট্র আংশিকভাবে একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। (সতেরো শতকে স্পেনের পতনে দৃষ্ট শুধু পরিবর্তীগুলোই যথেষ্ট ছিল না) সামরিক ক্ষমতা অর্জনের উপায় বের করা হয় বাণিজ্যলব্ধ সম্পদ আংশিকভাবে ভাড়াটে সৈন্যদের পেছনে ব্যয় করে। যা হোক এ ব্যবস্থায় ত্রুটি ছিল যে তা সব সময় সিপাহি বিদ্রোহ এবং ব্যাপকভাবে বিশ্বাসঘাতকতার জন্ম দিত। ম্যাকিয়াভেলি এ কারণেই তা অনুমোদন করেননি এবং পরামর্শ দেন যে সেনাবাহিনী নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। বাণিজ্য সমৃদ্ধ বিরাট দেশে এ পরামর্শ খুবই ফলপ্রসূ, কিন্তু গ্রিক নগর রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে অথবা ছোট ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের বেলায় তা অর্থহীন। শুধু বিশাল সম্প্রদায় অথবা প্রতিবেশিদের তুলনায় অধিকতর সভ্য সমাজের ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল হয়ে থাকে বাণিজ্য নির্ভর অর্থনৈতিক ক্ষমতা।
যা হোক এর গুরুত্ব হারিয়েছে বাণিজ্য। আগের তুলনায় পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব কমে গেছে। সাম্রাজ্যবাদের প্রসারের ফলে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রয়োজন আগের তুলনায় অনেক কম। কাঁচামাল ও খাদ্যের মালিকানা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ; যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা খুব কমই সম্ভব। দৃষ্টান্তস্বরূপ তেলের ব্যাপারটি ধরা যাক: তেল ছাড়া কোনো দেশই যুদ্ধ করতে পারে না এবং যুদ্ধ করতে সমর্থ না হলে সে তেলের মালিক হতে পারে না। ব্যর্থ হতে পারে উভয় শর্তই: পারস্যের তেল পারসিকদের উপকার আসেনি, কারণ তাদের যথেষ্ট সেনাশক্তির অভাব ছিল। তেল অর্জন করতে না পারলে জার্মান সেনাশক্তি তাদের কোনো উপকারে আসবে না। অনুরূপ অবস্থা বিরাজমান খাদ্যের বেলা। একটি শক্তিশালী যুদ্ধযন্ত্রের জন্য খাদ্যোপার্জন থেকে প্রভূত জাতীয় শক্তি অর্জন করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তাই তা নির্ভর করে বিশাল উর্বর এলাকার সামরিক নিয়ন্ত্রণের উপর।
বর্তমানের মতো অতীতে কখনও এত অঙ্গাঙ্গীভঅবে সম্পর্কযুক্ত ছিল না অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা। শিল্পে উন্নতি বিধান, খাদ্য এবং কাঁচামালের অধিকার ছাড়া কোনো জাতিই ক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। সামরিক ক্ষমতাবলে জাতিগুলো নিজ দেশে অনুৎপাদনযোগ্য কাঁচামালের অধিকার লাভ করে। যুদ্ধের সময় জার্মানরা বিজয়ের মাধ্যমে রোমানিয়ার তেল ও ইউক্রেনের ফসলের অধিকার লাভ করে। গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চল থেকে যেসব দেশ তাদের কাঁচামাল পেয়ে থাকে তারা নিজেদের অথবা তাদের মিত্রদের সামরিক শক্তির মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে ওইসব দেশের উপর।
