অর্থনৈতিক ক্ষমতা একটি রাষ্ট্রের ভেতর আইন এবং জনমত লব্ধ হলেও তা সহজেই কিছু বিশেষ স্বাধীনতা ভোগ করে। এটি দুর্নীতির মাধ্যমে আইন প্রভাবিত করে এবং প্রচারণার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করে। এটি রাজনীতিকদের উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করে তাদের স্বাধীনতা হ্রাস করতে পারে এবং ভয় দেখাতে পারে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের। কিন্তু অত্যন্ত সীমিত অর্থনৈতিক ক্ষমতার সাফল্যের দিক। ঋণদাতা সিজারের ক্ষমতা অর্জনে সহায়তা দান করে তার সাফল্য ছাড়া ঋণ পরিশোধের সম্ভাবনা দেখেনি। কিন্তু সাফল্য অর্জনের পর তাদের উপেক্ষা করার উপযোগী ক্ষমতা অর্জন করেন সিজার। সম্রাটের অবস্থান দখল করে নেয়ার জন্য ফুজারের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেন পঞ্চম চার্লস। কিন্তু সম্রাট হওয়ার পর তিনি তাদের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করেন। ফলে সব ঋণই হারায় তারা। আমাদের সময়ে জার্মান পুনরুদ্ধারের জন্য সাহায্যদানে লন্ডন শহরে অনুরূপ অভিজ্ঞান রয়েছে। টাইসনের অভিজ্ঞতাও হিটলারের ক্ষমতা লাভে একই জাতীয়।
এ মুহূর্তে গণতান্ত্রিক দেশে কিছু লোকের শাসন ক্ষমতার (Plutocracy) কথা ধরা যাক। আগেকার দিনগুলোর কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তা ব্যর্থ হয় ক্যালিফোর্নিয়ায় ও অস্ট্রেলিয়ায় এশীয় শ্রমের প্রবর্তন করতে। এটি ধ্বংস করতে পারেনি ট্রেড ইউনিয়ন। ব্রিটেনে এটি ধনীদের উপর ব্যাপক করারোপ এড়াতে এবং সমাজতান্ত্রিক প্রচারণারোধে ব্যর্থ হয়। এটি সমাজতন্ত্রীদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারকে সমাজতন্ত্র প্রবর্তনে বাধা প্রদান করতে পারে। তারা অনমনীয় হলে সংকট সৃষ্টি ও প্রচারণার মাধ্যমে তাদের পতন ঘটাতে পারে। এসব উপায় ব্যর্থ হলে গৃহযুদ্ধের সূচনা করতে পারে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বাধা প্রদানের জন্য। যেখানে এই বিষয়টি সহজ এবং জনমত খুবই সুনির্দিষ্ট সেখানে প্রটোক্র্যাসি ক্ষমতাহীন। কিন্তু যেখানে জনমত সুনির্দিষ্ট নয় অথবা বিষয়ের জটিলতার জন্য জনমত বিভ্রান্ত, সেখানে অভীষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ প্লুটোক্র্যাসি।
ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষমতা রয়েছে ধনীদের বিপরীতে। বর্ণ শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্তি ঠেকিয়ে রাখতে পারে ট্রেড ইউনিয়নগুলো। নিজেদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে, ব্যাপক মৃত্যুকর ও আয়কর লাভ করতে পারে। কিন্তু এ পর্যন্ত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন। তাছাড়াও ব্যর্থ হয়েছে তাদের পছন্দসই অথচ অধিকাংশ লোকের বিরাগভাজন সরকারকে টিকিয়ে রাখতে।
এভাবে জনমত দ্বারা সীমিত হয়ে পড়ে গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর প্রভাব। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যেখানে তীব্র প্রচারণা ও জনমত প্রভাবিত করতে পারে না। এর বাস্তবতা গণতান্ত্রিক দেশে পুঁজিবাদ বিরোধীদের স্বীকৃত মানের চেয়েও বেশি।
আধুনিক সমাজে আইনের নিয়ন্ত্রণাধীনে অর্থনৈতিক ক্ষমতা চূড়ান্তভাবে জমির মালিকানার উপর নির্ভরশীল হলেও এর সবচেয়ে বড় দাবিদারদের অন্তর্ভুক্ত নয় নামমাত্র জমির মালিকরা। সামন্তযুগে জমির মালিকদেরই অর্থনৈতিক ক্ষমতা ছিল। মজুরি নির্ধারণে শ্রম আইনের ভূমিকার মতোই তারা নির্ধারণ করতে পারত শ্রমিকদের মজুরি। তাছাড়া সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে সদ্যজাত ঋণদানেও তাদের ভুমিকা রাখতে পারে। কিন্তু শিল্পোন্নত দেশে জমির মালিকানার চেয়ে ঋণ অধিকতর শক্তিশালী। অবিবেচনার সাথে ঋণ গ্রহণ করে জমির মালিকরা, নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ব্যাংকের উপর। উৎপাদন কৌশলের পরিবর্তনের পরিণামস্বরূপ তা ঘটে বলেই মনে করা হয়। ভারতের মতো যেসব দেশে কৃষি ব্যবস্থা আধুনিক যন্ত্রনির্ভর নয় সেখানে তা হচ্ছে আইন কার্যকরি করার ক্ষেত্রে সরকারি ইচ্ছা ও ক্ষমতার ফসল। যে দেশে আইন সবার ঊর্ধ্বে নয় সেখানে দেখা গিয়েছে যে সময় সময় ঋণদাতারা তাদের ঋণগ্রহীতাদের হাতে খুন হয় এবং ঋণগ্রহীতারা ঋণের কাগজপত্র পুড়িয়ে দেয়। রাজপুরুষ থেকে কৃষক পর্যন্ত জমির সঙ্গে যাদেরই সম্পর্ক রয়েছে তারা সবাই ঋণ গ্রহণে অভ্যস্ত। কিন্তু যেখানে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয় এবং তা কার্যকরি করা হয় সেখানে ঋণগ্রহীতাকে ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত ঋণের সুদ দিয়ে যেতে হয়। যেখানে তা ঘটে থাকে সেখানে ভূ-সম্পত্তির উপর নির্ভরশীল ক্ষমতা ঋণগ্রহীতার হাত থেকে ঋণদাতার হাতে চলে যায়। কিন্তু ব্যাংক হচ্ছে আধুনিককালে ঋণদাতা।
আধুনিক বৃহৎ কর্পোরেশনের মালিকানা ও ক্ষমতা কোনোক্রমেই একত্রিত নয়। বার্লে ও মিনস The Modern Corporation and Private Property নামে বইতে দেখিয়েছেন তা কিভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করে। তারা যুক্তি দেন যে মালিকানা অপকেন্দ্রিক হলেও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রমুখী। দুহাজার ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক শিল্পকারখানা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে (পৃঃ ৩৩)-সযত্ন ও শ্রমবাধ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তাঁরা মনে করেন যে, আগেকার দিনের রাজা ও পোপের অনুরূপ বর্তমান নির্বাহীরা; তাদের মতে এডাম স্মিথের লেখায় আবির্ভূত ব্যবসায়ীদের উত্তরাধিকারী হিসেবে নয় এবং মহান আলেকজান্ডারের জীবনী আলোচনায় ওই নির্বাহীদের উদ্দেশ্য ও প্রেরণা সম্বন্ধে অধিক জানা যায়। তারা যুক্তি দেখান যে এসব বিশাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন মধ্যযুগীয় চার্চ বা জাতীয় রাষ্ট্রর ক্ষমতার কেন্দ্রায়নের অনুরূপ এবং এভাবে কর্পোরেশনগুলো রাষ্ট্রের গড়ে ওঠে সমকক্ষ প্রতিযোগী হিসেবে।
