৪. রুশ বিপ্লব
এখনও বিশ্ব ইতিহাসে রুশ বিপ্লবের গুরুত্ব সম্পর্কে বিচার করার সময় আসেনি। আমরা এখন আলোচনা করতে পারি এর কয়েকটি দিক নিয়ে। প্রাথমিক খ্রিস্টবাদের মতো এটিও আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় নিরপেক্ষ। খ্রিস্টবাদের মতো না হলেও তা প্রধানত ইসলামের মতো রাজনৈতিক। এ পর্যন্ত এ মতবাদের যে অংশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে তা হচ্ছে উদারনীতিকদের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতার আহ্বান। ১৯১৭ সালের নভেম্বরে পর্যন্ত শুধু প্রতিক্রিয়াশীলাই উদারনীতিকদের প্রতিহত করে। অন্য প্রতিবাদীদের মতো মার্কসীয়রা ওকালতি করত গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, মুক্ত সাংবাদিকতা এবং উদারনৈতিক রাজনীতির অবশিষ্টাংশের। রুশ সরকার ক্ষমতালাভের পর এক মহান দিনগুলোতে খ্রিস্টীয় শিক্ষার দিকে ফিরে গেল। কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ইতিবাচক শিক্ষা ও সব প্রতিদ্বন্দ্বী মতবাদ দমনের মাধ্যমে সত্যের বিকাশ ঘটানো। অবশ্য এর অন্তর্ভুক্ত ছিল লাল সৈন্যের উপর নির্ভরশীল অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারের প্রতিষ্ঠা। এই ব্যবস্থায় প্রভূত বৃদ্ধি পায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার মিশ্রণের ফলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা।
কমিউনিস্ট মতবাদের আন্তর্জাতিক অংশ অচল প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু অসাধারণ সফলতা লাভ করে উদারনৈতিকতা বর্জনের দিক। রাইন থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত সর্বত্র এ মতবাদের প্রধান সব অংশই অগ্রাহ্য হয়েছে। প্রথমে ইতালি ও পরে জার্মানি বলশেভিকদের রাজনৈতিক ক্রিয়াকৌশল রপ্ত করে, এমনকি যেসব দেশ গণতান্ত্রিক থেকে গেল সেখানেও উদারনৈতিক বিশ্বাস এর অনুকুল পরিবেশ হারায়। উদারনীতিকরা মনে করেন যখন কোনো রাষ্ট্রীয় ভবন ধ্বংস করা হয় তখন পুলিশ ও আদালতের দায়িত্ব প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করা। কিন্তু নিরর মতো আধুনিকতাবাদীরা বলেছেন, সাজানো প্রমাণাদির মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দকৃত দলের উপর দোষ চাপানো উচিত। বাকস্বাধীনতার মতো বিষয়ে সেইন্ট এম্রোজের মতো তিনি মনে করেন যে, স্বাধীনতা তার নিজের দলেরই থাকা উচিত, অন্য কোনো দলের নয়।
সব রকম ক্ষমতাই এসব মতবাদ অনুযায়ী প্রথমে বিপ্লবী ক্ষমতার রূপ নেবে ও পরে পর্যবসিত হবে অপরিহার্য ধারণা মোতাবেক নগ্ন ক্ষমতায়। বিপদ অত্যাসন্ন। আমি পরবর্তী পর্যায়ের আগে একে এড়ানোর উপায় সম্পর্কে আর কিছুই বলব না।
এগুলো খুঁজতে হবে উদারনৈতিকতা বিলুপ্তির কৌশলগত প্রচারণার জন্য বর্ধিত সুযোগ-সুবিধা ও উদারনৈতিক মতবাদের ফসল জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে। সরকার প্রভূত ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা একত্রে কুক্ষিগত করে। রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সময়ের সমস্যাগুলো নতুন এবং তার সমাধানে লক ও মন্টেন্ধু আমাদেরকে সার্মথ্য যোগাতে পারেন না। ব্যক্তিগত উদ্যোগের একটি ক্ষেত্র সৃষ্টি করা প্রয়োজন অষ্টাদশ শতাব্দীর সমাজে শান্ত ও অগ্রগতি বজায় রাখতে। কিন্তু এই ক্ষেত্রের নতুন সংজ্ঞা প্রদান করা এবং একে নিরাপদ রাখা প্রয়োজন।
০৮. অর্থনৈতিক ক্ষমতা
অর্থনৈতিক ক্ষমতা সামরিক ক্ষমতার মতো মৌলিক নয়, সিদ্ধান্তমূলক। তা একটি রাষ্ট্রের ভেতরে আইনের উপর নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে তা শুধু ছোটখানো ব্যাপারেই আইনের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তা যুদ্ধ বা যুদ্ধের আশংকার উপর নির্ভরশীল। কোনোরূপ বিশ্লেষণ ছাড়াই অর্থনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণ করে নেয়া প্রচলিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে ঐতিহাসিক কারণগত ব্যাখ্যায় অযৌক্তিক গুরুত্ব আরোপিত হচ্ছে যুদ্ধ ও প্রচারণার বিপরীতে অর্থনীতির উপর।
শ্রম-অর্থনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া অন্যসব অর্থনৈতিক ক্ষমতার সর্বশেষ বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, একখন্ড জমির উপর দাঁড়িয়ে থাকা এবং এর উপর কিছু রাখা বা তা থেকে কিছু নিয়ে যাওয়া কার পক্ষে সম্ভব প্রয়োজনে তা সেনাশক্তি ব্যবহারের সামর্থ্যের উপর নির্ভর করছে। কিছু ক্ষেত্রে তা অপরিহার্য। এংলো পারসিক কোম্পানির মালিকানাধীন দক্ষিণ পারস্যের তেল সম্পদগুলো। কারণ ব্রিটিশ সরকার এ রকম আইন পাস করেছে যে তাতে অন্য কারোর অধিকার থাকবে না এবং অদ্যাবধি এই আইন বলবৎ করার জন্য তা যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু ব্রিটেন কোনো মরাত্মক যুদ্ধে পরাজিত হলে সম্ভবত মালিকানা পরিবর্তিত হতে পারে। কিছু ধনী মানুষের মালিকানাধীন রোডেশীয় স্বর্ণক্ষেত্রগুলো। কারণ ব্রিটিশরা মনে করত যে লবেনগুলার সঙ্গে যুদ্ধের মাধ্যমে লোকগুলোকে ধনী করে দেয়াই লাভজনক। যুক্তরাষ্ট্রের তেল সম্পদ কতগুলো কোম্পানির মালিকানাধীন, কারণ তাদের আইনগত অধিকার রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাশক্তি এই আইন বলবৎ করতে প্রস্তুত। তেল এলাকাগুলোর মালিকানা যেসব ইন্ডিয়ানদের ছিল তাতে তাদের কোনো আইনগত অধিকার নেই। কারণ, তারা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল। অতি সম্প্রতি সংঘটিত যুদ্ধে বিজয় অনুসারে ফ্রান্স অথবা জার্মানির মালিকানাধীন লরেনের লৌহখনি।
কিন্তু অপেক্ষাকৃত অস্পষ্ট ক্ষেত্রে এই বিশ্লেষণ প্রযোজ্য। কেন একজন প্রজা কৃষক জমির খাজনা দেন এবং কেন তিনি জমির শস্য বিক্রি করতে পারেন? তাকে খাজনা দিতে হয় কারণ জমি জমিদারের মালিকানাধীন। জমিদার জমির মালিক কারণ তিনি তা অর্জন করেছেন ক্রয় করে অথবা তা পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে। আমরা মালিকানা সূত্রের উল্টো দিক অনুসরণ করলে পরিশেষে এমন এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছব, যিনি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তা অর্জন করেছিলেন–এটা হতে পারে কোনো সভাসদের অনুকূলে ব্যবহৃত রাজার স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা অথবা সেক্সন বা নরমেনদের মতো বড় ধরনের বিজয়। এসব উগ্র কার্যকলাপের মধ্যবর্তী সময়ে রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহৃত হয় আইন অনুসারে মালিকানা পরিবর্তনের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য। জমির মালিকানা সিদ্ধান্তকারী ক্ষমতা, কে জমির উপর থাকবে এর মাধ্যমে তা নির্ধারিত হয়। এই অনুমতির জন্য কৃষক জমির খাজনা প্রদান করেন এবং সে সুবাদে শস্য বিক্রি করেন তিনি।
