মানবাধিকারের প্রতি ঘৃণা-বর্ষণ আমাদের যুগে স্থল উক্তি হিসেবে স্বাভাবিক ব্যাপার। এটা সত্য যে দার্শনিক তত্ত্ব অনুসারে এ মতবাদ অরক্ষিত। কিন্তু ঐতিহাসিক ও প্রায়োগিক দিক থেকে প্রয়োজনীয় এবং আমরা অনেক স্বাধীনতাই এর বদৌলতে ভোগ করছি। একজন বেনথামাইটের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় অধিকারের তত্ত্বগত ধারণা। বাস্তব উদ্দেশ্যে এই মতবাদের নিম্নরূপ বর্ণনা দেয়া যায়। কোনো সমাজের নিয়ম-কানুন যদি এ ধরনের নির্দিষ্ট হয়ে যায় যে এর ভেতর প্রত্যেক ব্যক্তিই তার পছন্দমতো কাজ করবে এবং তার উপর কোনোরূপ কর্তৃত্ব থাকবে না তবেই সে সমাজে সাধারণ সুখ বৃদ্ধি পাবে। ন্যায়বিচারও একটি বিষয় ছিল যা মানবাধিকারবাদীদের আগ্রহ যোগায়। তারা মনে করে যে আইনের সঠিক প্রয়োগ ছাড়া কোনো মানুষকেই তার জীবন ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এ ধরনের মতবাদ সত্য বা মিথ্যা হতে পারে। কিন্তু তা অসম্ভব নয় পুরাতাত্ত্বিকভাবে।
এ মতবাদ অবশ্যই উৎস ও ভাবপ্রবণতার দিক থেকে সরকারবিরোধী। এ মত স্বৈরাচারী সরকারের একজন প্রজা পোষণ করে যে, আপন ধর্মমত পোষণে স্বাধীনতা থাকবে, সে তার ব্যবসা চালিয়ে যাবে হস্তক্ষেপ ছাড়া, সে বিয়ে করবে তার পছন্দ অনুযায়ী। সুতরাং মানবতাবাদীরা বলেছে যে, যেখানে বিরোধী সিদ্ধান্ত দরকার সেখানে তা হবে অধিকাংশের অথবা তাদের প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত-স্বেচ্ছাচারী বা শুধু প্রথাগত কর্তৃত্ব যেমন রাজা বা গির্জার পাদ্রির সিদ্ধান্ত হবে না। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি স্বাধীনতা সম্বন্ধে জন্ম দেয় অদ্ভুত মানসিকতার যা ক্রমাগতভাবে পশ্চিমা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এক প্রকার সন্দেহ পোষণ করে তা ক্ষমতার টিকে থাকা অবস্থায় ও সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে।
প্রটেস্ট্যান্টবাদের সঙ্গে এক অবশ্যম্ভাবী যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের। ফলে এই মতবাদ ঘোষণা করা হয় ধর্মীয় বলয়ে জোরেশোরে। কিন্তু ঘোষণাকারীরা ক্ষমতালাভের পর তা বর্জন করে। প্রটেস্ট্যান্টবাদের বদৌলতে এবং পৌত্তলিক রাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতার জন্য প্রাথমিক খ্রিস্টবাদের সঙ্গে এর সম্পর্ক বিদ্যমান। ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে সম্পর্কের ফলে খ্রিস্টবাদের সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। খ্রিস্টীয় নীতিকথা অনুসারে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনই কর্তৃপক্ষের দ্বারা কোনো ব্যক্তিকে পাপকাজে বাধ্য করা যুক্তিযুক্ত করতে পারে না। চার্চ বলেছেন যে, বিবাহ যে কোনো একপক্ষের উপর আরোপিত বাধ্যবাধকতা বাতিল করে। এই মতবাদটি নির্যাতনের বেলায়ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। উদ্দেশ্য হচ্ছে, সামাজিক উপকার সাধনের পরিবর্তে ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তিদেরকে অনুশোচনা ও পরিত্যাগে বাধ্য করা। প্রত্যেক মানুষের পরিসমাপ্তি তার নিজের মধ্যেই-কান্টের এ ধরনের নীতি খ্রিস্টীয় শিক্ষা থেকে গৃহীত হয়েছে। ক্যাথলিক চার্চের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতা প্রাথমিক খ্রিস্টবাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকে অস্পষ্ট করে তোলো। কিন্তু এর চরম অবস্থায় তাকে পুনরুজ্জীবিত করে প্রটেস্ট্যান্টবাদ এবং সরকার সম্বন্ধীয় তত্ত্বে এর প্রয়োগ করে।
যখন বিপ্লবী এবং প্রথাগত ক্ষমতার ভেতর ফরাসির বিপ্লবের অনুরূপ অবস্থায় প্রভুত্ব অর্জনের লক্ষ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় তখন বিজিতদের উপর বিজয়ীদের ক্ষমতাই নগ্ন ক্ষমতা। বিপ্লবী সৈন্য ও নেপোলিয়ানের সৈন্যরা নতুন ধর্মমতের প্রচারণা শক্তির সমন্বয়ে নগ্ন ক্ষমতা প্রদর্শন করে। নতুন ধর্মমতের প্রচারণা শক্তির সমন্বয়ে নগ্ন ক্ষমতা প্রদর্শন করে। ইউরোপে এই ক্ষমতা ব্যাপকতার দিক দিয়ে অভূতপূর্ব ছিল। আজও ইউরোপবাসীর উপর এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। জেকোবিনরা সর্বত্রই প্রথাগত ক্ষমতার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেন, কিন্তু নেপোলিয়ানের সৈন্যরাই এই প্রশ্ন কার্যকরি করে। নেপোলিয়ানের সৈন্যরা প্রাচীন কদর্য বার্তাগুলোর সংরক্ষণের জন্য যুদ্ধ করে এবং পরিশেষে বিজয়ী হলে প্রতিষ্ঠা করে একটি প্রতিক্রিয়াশীল পদ্ধতি। তাদের নিষ্প্রভ প্রতিবাদের ফলে তার অত্যাচার এবং বল প্রয়োগ বিস্মৃতির অতলগর্ভে তলিয়ে যায়। মহান শান্তি সুদূরপরাহত, তাই যুদ্ধের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় এবং বেয়নেটে বিদ্ধ করে স্বাধীনতার অগ্রগদূতকে। মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বছরগুলোতে এক প্রকার বাইরোনিক ধর্মবিশ্বাসজাত সহিংসতা জন্ম নেয় এবং ক্রমাগতভাবে মানুষের চিন্তাভাবনার উপর প্রভাব ফেলে। এর সবই নেপোলিয়ানের নগ্ন ক্ষমতায় খুঁজে পাওয়া যায়। রবসপিয়ার ও নেপোলিয়নের কাছে স্ট্যালিন তার সফলতার জন্যে যতটুকু ঋণী, হিটলার ও মুসোলিনি তার চেয়ে কম ঋণী নন।
নেপোলিয়নের দৃষ্টান্ত থেকে বলা যেতে পারে যে বিপ্লবী ক্ষমতা নগ্ন ক্ষমতায় পর্যবসিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বিদেশ বিজয়, ধর্মীয় নির্যাতন অথবা শ্রেণি সংগ্রামে অত্যুৎসাহীদের ভেতর সংঘাত নগ্ন ক্ষমতা থেকে ভিন্ন এ কারণে যে এই সংঘাতের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধার নয় বরং তা ধর্মমতের স্বার্থে পরিচালিত। ক্ষমতা হচ্ছে এর উপর। এর উদ্দেশ্য বিস্মৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে। তাই সংগ্রাম কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী হলে অন্ধ অনুরাগ ক্রমাগতভাবে শুধু বিজয়লাভের প্রচেষ্টায় পরিচালিত হতে পারে। সুতরাং প্রথম দৃষ্টে অনুভূত পার্থক্যের চেয়ে বিপ্লবী ক্ষমতা ও নগ্ন ক্ষমতার পার্থক্য প্রায়ই কম হয়ে থাকে। লাতিন আমেরিকায় প্রথমত স্পেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উদারপন্থি ও গণতন্ত্রীদের দ্বারা পরিচালিত হয়, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটে অস্থিতিশীল সামরিক একনায়ক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। বিপ্লবী বিশ্বাস ব্যাপক ও জোরালো হলে এবং বিজয় খুব বেশি বিলম্বিত না হলে সহযোগিতামূলক অভ্যাসের ফলে কি বিপ্লবের সঙ্গে জড়িত দুঃখ-কষ্টের অবসান ঘটবে এবং নতুন শাসকের কি খাঁটি সামরিক শক্তির পরিবর্তে সম্মতির উপর নির্ভরতা লাভের সামর্থ্য যোগাবে? মনোকর্তৃত্ব ছাড়া অত্যাচারী হতে বাধ্য যে কোনো সরকার।
