প্রতিটি সফল বিপ্লবই কর্তৃত্বকে নাড়া দেয় এবং সামাজিক বন্ধন দুরূহ করে তোলে। এটা শুধু রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে দেয় না, পরবর্তী বিপ্লবের রূপও প্রদান করে। অধিকন্তু ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ প্রাথমিক দিনগুলোতে খ্রিস্টীয় শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহের বিপজ্জনক উৎস হিসেবে রয়ে গেল। ব্যক্তিগত বিবেক যখন দেখল যে সে চার্চের রায় গ্রহণ করতে পারে না তখন সে বশ্যতা অস্বীকার করার পক্ষে যুক্তি পেল। চার্চের জন্য বিরক্তিকর হতে পারে ভিন্নমত, কিন্তু প্রাথমিক খ্রিস্টবাদের নিরিখে তা নীতিবিরুদ্ধ ছিল না।
প্রত্যেক কর্তৃত্বের জন্য এ ধরনের অসুবিধা সহজাত এবং এর উৎসস্থল বিপ্লব। এ কথা বলতেই হবে যে প্রাথমিক খ্রিস্টবাদ যুক্তিসঙ্গত ছিল এবং তার্কিকভাবে বলা যাবে না যে, পরবর্তী সব বিপ্লবই বিভিন্ন দোষে দুষ্ট হতে পারে। নৈরাজ্যিক আগুন জ্বলছিল খ্রিস্টবাদে, যদিও তা মধ্যযুগে গভীরভাবে পুঁতে রাখা হয়েছিল, তথাপি তা ভয়ানক অগ্নিকান্ডের রূপ ধারণ করে সংস্কার আন্দোলনের সময়।
২. সংস্কার
দুটো বিষয়ে ক্ষমতার দিক দিয়ে সংস্কার আমাদের ধারণা দেয়। এর ধর্মীয় নৈরাজ্য চার্চকে দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রকে সবল করে তোলে। সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ আন্তর্জাতিক সংগঠনের আংশিক ধ্বংসের জন্যে। এ বৃহৎ সংগঠন বারবার প্রমাণ করেছে যে তা যে কোনো নিরপেক্ষ সরকারের চেয়ে ক্ষমতাশালী। লুথার চার্চ এবং চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে জয়লাভের জন্য নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ যুবরাজদের উপর। হিটলারের যুগ পর্যন্ত লুথারীয় চার্চ কোনো অক্যাথলিক সরকারের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেনি। কৃষক বিদ্রোহ রাজার কাছে অধীনতা প্রচারের পক্ষে লুথারকে আরেকটি কারণ যুগিয়েছিল। স্বাধীন ক্ষমতা হিসেবে চার্চ লুথারীয় দেশগুলোতে তার বাস্তব অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে এবং পরিণত হয় ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের কাছে বশ্যতা স্বীকারের জন্য প্রচারণার অংশবিশেষ।
৮ম হেনরি বিষয়কে ইংল্যান্ডে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, তেজোবীর্য এবং নির্মমতার সঙ্গে হাতে দিয়েছিলেন। তিনি নিজেকে ইংল্যান্ডের চার্চ-প্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ধর্মকে জাতীয় ও নিরপেক্ষ রূপ দিতে আরম্ভ করেন। এ রকম আশা তার ছিল না যে, ইংল্যান্ডের ধর্ম বিশ্বজনীন খ্রিস্টীয় জগতের অংশবিশেষ হবে। তিনি আশা করেছিলেন যে ঈশ্বরের গৌরবের চেয়ে তার গৌরবের বেশি সহায়ক হবে ইংলিশ ধর্ম। তিনি তার পছন্দমত পরিবর্তন করিয়ে ছিলেন সংসদ দ্বারা। তার কোনো অসুবিধা ছিল না যারা পরিবর্তনের বিরোধী ছিল তাদের ফাঁসিদানে। রাজস্ব আনা হলো সন্ন্যাসীদের মঠ ভেঙে। তা তাকে সাহায্য যোগায় ঈশ্বরের কৃপা লাভের জন্য তীর্থযাত্রার মতো ক্যাথলিক বিদ্রোহ দমনে। প্রাচীন সামন্ত আভিজাত্যকে দুর্বল করে দেয় বারুদ এবং গোলাপ যুদ্ধ। যখনই উদ্যত হতেন তখনই তিনি তাদের মাথা কর্তন করে দিতেন। প্রাচীন গির্জার ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল ওয়েলসের পতন হলো। হেনরির অধীন যন্ত্রবিশেষ পরিণত হলেন ক্রমওয়েল এবং ক্রেনমার। হেনরি বিনয়ী ছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে রাষ্ট্রক্ষমতা কিরূপ হতে পারে চার্চের পূর্ণ গ্রাসের মাধ্যমে।
স্থায়ী হতে পারেনি ৮ম হেনরির কাজ। এলিজাবেথের অধীন প্রটেস্ট্যান্টবাদের সংমিশ্রণে এক ধরনের জাতীয়তাবোধ হঠাৎ প্রয়োজনীয় আকর্ষণীয় হয়ে উঠল। স্পেনের পরাজয় দাবি করল আত্মসংবরণ ক্যাথলিক এবং দখল করে নিল স্পেনীয় ভান্ডারজাত জাহাজ। তারপর থেকে শুধু বাম দিকে থেকেই ছিল এংলিকান চার্চের জন্য বিপদ। কিন্তু প্রতিহত করা হলো বামদিক থেকে উদ্ভূত আক্রমণ। পরবর্তীকালে জুড়ে নিল এর স্থান।
ভিকার ও বে হচ্ছে প্রটেস্ট্যান্ট দেশগুলোতে রাষ্ট্র কর্তৃক চার্চের পরাজয়ের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যে পর্যন্ত ধর্মীয় সহিষ্ণুতা অসম্ভব মনে হতো, পোপ ও সাধারণ পরিষদের একমাত্র স্থলবর্তী ছিল ইরিস্টেনিয়ারিজম।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে যাদের ধর্মবোধ অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল তাদের কাছে সন্তোষজনক হতে পারেনি ইরিস্টেনিয়ারিজম। এক রকম অসম্ভব ছিল পাপমোচনমূলক প্রশ্নে সংসদীয় কর্তৃত্বের কাছে বশ্যতা স্বীকারের জন্য বলা। স্বাধীনচেতা জনগণ সমভাবে চার্চ ও রাষ্ট্রের ধর্মীয় কর্তৃত্ব অগ্রাহ্য করল এবং দাবি করল ধর্মীয় সহিষ্ণুতার অনুসিদ্ধান্ত সহকারে ব্যক্তিগত বিচারের অধিকার। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সংযোজিত হলো সরাসরি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সঙ্গে। ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকের ধর্মীয় মতামতের অধিকার থাকলেও তার অন্যান্য অধিকার কি থাকবে না? সাধারণ নাগরিকদের আচরণে কি সরকারের কোনো আইনসঙ্গত সীমাবদ্ধতা ছিল না? ক্রমওয়েলের পরাজিত অনুসারীরা এ জন্য মানবাধিকার সংবলিত মতবাদ আটলান্টিক মহাসাগরের অপর পারে বহন করে নিয়ে যায় এবং জেফারসন এর বাস্তব রূপ দেন আমেরিকার সংবিধানে। আবার তা ইউরোপে ফেরত আসে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে।
৩. ফরাসি বিপ্লব
পশ্চিমা জগৎ সংস্কার আন্দোলন থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত ক্রমাগতভাবে আন্দোলনের ভেতর দিয়ে চলতে থাকে, যা মানবাধিকার বিপ্লব নামে আখ্যায়িত হয়। ১৮৪৮ সালে এই আন্দোলন পূর্ব রাইনে রূপ নেয় জাতীয়তাবাদের। এই মিলন বা যোগ অস্তিত্ব লাভ করে ফ্রান্সে ১৯৭২ সাল থেকে ও ইল্যান্ডে প্রথম থেকেই এবং আমেরিকাতে ১৭৭৬ সাল থেকে। এই আন্দোলনে গুরুত্ব পায় মানবাধিকারের চেয়ে জাতীয়তাবাদই বেশি। কিন্তু মানবাধিকারই প্রথম দিকে অধিকতর গুরুত্ববহ ছিল।
