খ্রিস্টানরা মানুষের চেয়ে ঈশ্বরকে মেনে চলার নীতির ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। খোদার আদেশ-নিষেধ মানুষের বিবেকের কাছে পৌঁছানো হয় সরাসরি নতুবা চার্চের মাধ্যমে। আজ পর্যন্ত ৮ম হেনরি বা হেগেল ছাড়া কেউ-ই বলেননি যে রাষ্ট্রের মাধ্যমে তা পৌঁছাতে পারে। রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেয় এভাবে খ্রিস্টীয় শিক্ষা। তত্ত্বগতভাবে প্রথমোক্তটির সাথে অরাজকতা এবং শেষোক্তটির সাথে চার্চ ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব জড়িত। কিন্তু কোনো স্পষ্ট নীতি নেই এগুলোর সীমারেখা নির্ধারণের ব্যাপারে। কোনটি সিজারের এবং কোনটি ঈশ্বরের? একজন খ্রিস্টানের পক্ষে বলা স্বাভাবিক যে, সবই ঈশ্বরের। এভাবে রাষ্ট্রের কাছে চার্চের দাবি অসহনীয় হয়ে দেখা দেয়। তত্ত্বগতভাবে কখনও মীমাংসা করা হয়নি রাষ্ট্র ও চার্চের মধ্যকার সংঘর্ষের। আজ পর্যন্ত তা চলে এসেছে শিক্ষার মতো বিষয়ে।
এটা মনে করা যেতে পারে যে রাষ্ট্র ও চার্চের ভেতর সংগতি বিধান করতে পারে কনস্টেইন্টাইনের ধর্মান্তর। প্রাথমিক খ্রিস্টান সম্রাটরা আর্যজাত ছিলেন। আর্য ও ভেন্ডালদের অনুপ্রবেশের ফলে পশ্চিমের গোড়া সম্রাটদের স্থায়িত্বকাল সংক্ষিপ্ত ছিল। ক্যাথলিক বিশ্বাসের প্রতি প্রাচ্য সম্রাটদের অধীনতা প্রশ্নাতীত হলে মিসরীয় মনোফিজাইট এবং পশ্চিম এশিয়ায় অধিকাংশই পরামর্শদাতার রূপ নিল। পবিত্র সপ্তাহে মিলানে অবস্থানের ফলে সম্রাট বুঝতে পারেন যে রোম সম্রাট তার নিজ ডমিনিয়নগুলোতে তার ধর্মের গণআচারের দাবি করবেন। তিনি আর্কবিশপের কাছে পরিমিত ও যুক্তিযুক্ত সুবিধাদি প্রদানের জন্য প্রস্তাব করেন যে, তিনি মিলান শহরে বা শহরতলিতে যেন একটি চার্চের ব্যবহার পরিত্যাগ করেন। এসব দেশের ভিন্ন মতাবলম্বীরা স্বাগত জানায় বাইজেনটাইন সরকারের চেয়ে কম অত্যাচারী হিসেবে নবীর অনুসারীদের। খ্রিস্টান রাষ্ট্রের সাপেক্ষে এসব প্রতিযোগিতায় সর্বত্রই চার্চ বিজয়ী হয়। একমাত্র নতুন ধর্ম ইসলামই চার্চের উপর প্রভুত্ব করতে দেয় রাষ্ট্রশক্তিকে।
মিলানের আর্কবিশপ সেন্ট এম্রোজ ও সম্রাজ্ঞী জাস্টিনার ভেতর ৩৮৫ সনে সংঘঠিত দ্বন্দ্বের মাধ্যমে চতুর্থ শতাব্দীর শেষভাগে অরিয়ন সাম্রাজ্য ও চার্চের মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তার ছেলে ভেলেনটিয়ান অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন এবং তিনি তার পরিবর্তে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পবিত্র সপ্তাহে মিলানে অবস্থানকালে তাকে বোঝানো হয়েছিল যে, ডমিনিয়নগুলোতে একজন রোমান সম্রাট তার ধর্মের গণপালনের দাবি করতে পারেন। তিনি আর্কবিশপের কাছে অত্যন্ত সুবিবেচনাপূর্ণ প্রস্তাব করেন যে, তিনি যেন মিলান শহর ও তার আশপাশের এলাকাগুলোতে একক চার্চের ব্যবহার বর্জন করেন। কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল এম্রোজের আচরণ। হতে পারে যে জাগতিক প্রাসাদগুলো সিজারের মালিকানাধীন; কিন্তু চার্চগুলো ঈশ্বরের ঘর এবং বিশপের এলাকাধীন প্রচারকের একমাত্র তিনিই আইনানুগ উত্তরাধিকারী। খ্রিস্ট শুধু প্রকৃত বিশ্বাসীদেরই প্রাপ্য ধর্মের জাগতিক ও ঐশ্বরিক সুবিধাদি। মানসিক দিক দিয়ে এম্রোজ সন্তুষ্ট ছিলেন কিন্তু তার ধর্মীয় মতাদর্শগুলো ছিল সত্য বিশুদ্ধতার মাপকাঠি। শয়তানের অনুসারীদের সঙ্গে আলোচনায় অস্বীকৃতি জানালেন আর্কবিশপ এবং সাবলীলতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করলেন যে, শহীদের মৃত্যু অধার্মিকতার কাছে বশ্যতা স্বীকার করার চেয়ে শ্রেয়।
শিগগিরই দেখা গেল শহীদ হতে ভয় করার তার কোনো কারণই ছিল না। তাকে যখন পরিষদের সামনে ডাকা হলো তখন তিনি সঙ্গে নিয়ে আসেন একদল ক্রোধান্বিত সমর্থকদের। সমর্থকরা ভয় দেখাচ্ছিল যে তারা রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করবে এবং সম্রাজ্ঞী ও তার ছেলেকে মেরে ফেলতে পারে। গথিক ব্যবসায়ীরা অরিয়নদের মাধ্যমে এ রকম একজন পবিত্ৰাত্মার বিরুদ্ধে কিছু করতে ইতস্তত বোধ করল এবং বিপ্লব এড়ানোর জন্য সম্রাজ্ঞী তা চেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। এম্রোজের বিজয় উপেক্ষা করতে পারলেন না ভেলেনটিয়ানের মাতা। যুবরাজ আবেগজনিত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন যে, তার নিজস্ব চাকররা একজন বিবেকহীন যাজকের হাতে প্রস্তুত ছিল তাকে ছেড়ে দিতেও।
সম্রাজ্ঞী পরবর্তী বছরে জয় করার চেষ্টা করলেন দরবেশকে। তিনি নির্বাসনের ঘোষণা দিলেন তার বিরুদ্ধে। কিন্তু তিনি গির্জায় বিশপের আসনে অবস্থান নিলেন, যেখানে তাকে দিনরাত সমর্থন করতেন বিশ্বাসী ও দানশীল ব্যক্তিরা। তাদেরকে জাগ্রত রাখার জন্য তিনি নিয়মিত উচ্চস্বরে প্রার্থনা সংগীত চালনা করেন মিলানের চার্চে। অলৌকিক ঘটনা দ্বারা অনুসারীদের উৎসাহ আরও বৃদ্ধি করা হলো এবং পরিশেষে ইতালির ক্ষুদ্র সার্বভৌমত্ব টিকে থাকতে পারল না স্বর্গের প্রিয়পাত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়।
এ ধরনের প্রতিযোগিতার ফলে চার্চ সার্বভৌম ক্ষমতা অর্জন করে। দানশীলতা ও সংগঠন দুই-ই আংশিকভাবে এই বিজয়ের কারণ। কিন্তু প্রধান কারণ এই ছিল যে, এর বিরোধী কোনো ধর্মমত বা জনমত ছিল না। যখন রোম জয়লাভ করল তখন একজন রোমান ভাবত যে এটা তার রাষ্ট্রের গৌরব। কিন্তু এ ধরনের মনোভাব চতুর্থ শতাব্দীতে কিছুদিনের জন্য মুছে গিয়েছিল। ধর্মের সাপেক্ষে রাষ্ট্রীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা আধুনিককালে পুনরুজ্জীবিত হয় জাতীয়তাবোধের অভ্যুদয়ের ফলে।
