একজন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক মনে করতে পারে যে মালিকের চেয়ে তার আয় কম হওয়া অন্যায়। নগ্ন ক্ষমতাই এ ধরনের ক্ষেত্রে তাকে মেনে নিতে বাধ্য করে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের পুরনো পদ্ধতি প্রথাগত এবং তাতে আপনা আপনি ঘৃণার উদ্রেক হয় না। ব্যতিক্রম শুধু তাদের ক্ষেত্রে, যারা প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে রত। সমাজতান্ত্রিক মনোভাব বৃদ্ধি পেলে পুঁজিবাদী শক্তি আরও বেশি নগ্ন হয়ে পড়ে। এ ব্যাপারটি ক্যাথলিক চার্চ এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের সম্পর্কের অনুরূপ। আমরা দেখেছি যে, নগ্ন ক্ষমতার কিছু অশুভ দিক রয়েছে সর্মথন লাভকারীর ক্ষমতার বিপরীতে : পরিণামে ভয়ের মাধ্যমে নির্মমতা প্রশমিত না হলে সমাজতান্ত্রিক মনোভাব বৃদ্ধির ফলে পুঁজিবাদী শক্তি আরও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। মার্কসীয় দর্শনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সমাজে যদি শ্রমিকই সমাজতন্ত্রী হয় এবং বাকি সবাই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারক হয় তারপরও বিজয়ী যে কোনো দল তাদের বিরোধীদের উপর নগ্ন ক্ষমতা প্রয়োগ না করে পারে না। মার্কসের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী অবস্থা বড়ই নাজুক। যে পর্যন্ত তার শিষ্যদের প্রচার সফল হয়েছে তাতে তা ঘটবেই।
মানব ইতিহাসের জঘন্য বিষয়গুলোর অধিকাংশই নগ্ন ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত-শুধু যুদ্ধের বিষয়গুলোই নয়, বরং অন্যগুলো কম দৃষ্টিগোচর হলেও সমভাবে ভয়ংকর। দাসত্ব ও দাস বেচা-কেনা, কংগোর শোষণ, প্রাথমিক শিল্পায়নের ভয়াবহতা, শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা, বিচারবিভাগীয় অনাচার অপরাধ আইন, জেল, কর্মশালা, ধর্মীয় অত্যাচার, ইহুদিদের নির্দয় চপলতা, বর্তমানে জার্মান ও রাশিয়ায় অবিশ্বাস্য রকম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অন্যায় আচরণ–এগুলো হচ্ছে অসহায়দের প্রতি নগ্ন ক্ষমতা।
এক সময় নগ্ন হতে বাধ্য ঐতিহ্যের অভ্যন্তরে প্রোথিত অনেক অন্যায় ক্ষমতা। খ্রিস্টান স্ত্রীরা অনেক শতাব্দী ধরে তাদের স্বামীদের মেনে চলত, কারণ সেন্ট পল বলেছিলেন, তা-ই করা উচিত। কিন্তু সেন্ট পলের মতবাদ সাধারণভাবে মহিলা সমাজে গৃহীত হওয়ার আগে পুরুষদের অসুবিধাগুলোর কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জেনস ও মেডিয়ার গল্পে।
ক্ষমতা থাকবে সরকার অথবা অরাজক দুঃসাহসিকদের। সমাজে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী অথবা সাধারণ অপরাধী থাকলে নগ্ন ক্ষমতা অবশ্যই থাকবে। বাধাগ্রস্ত একঘেয়ে দুঃখের চেয়ে ভালো কিছু পেতে হলে মানবজাতিকে সম্ভাব্য ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে হবে নগ্ন ক্ষমতা। আইন ও প্রথার মাধ্যমে ক্ষমতার লালন একান্ত প্রয়োজন অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রণাদানের চেয়ে ভালো কিছু পেতে হলে।
০৭. বিপ্লবী ক্ষমতা
আমরা দেখেছি যে দুটো ভিন্ন পন্থায় ভেঙে পড়তে পারে প্রথাগত পদ্ধতি। প্রথমত, এক ধরনের সন্দেহবাদের জন্ম দিতে পরে ধর্মমত ও মানসিক অভ্যাসের উপর প্রতিষ্ঠিত পুরনো যুগ। সে ক্ষেত্রে শুধু নগ্ন ক্ষমতার দ্বারা সামাজিক বন্ধন রক্ষা করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, মানুষের উপর ক্রমাগতভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে নতুন মানসিক অভ্যাস সংবলিত নতুন ধর্মমত। পরিশেষে শক্তিশালী হয়ে বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করে পুরনো অচল সরকারের স্থলে সামঞ্জস্যপূর্ণ সরকার নতুন। এ ক্ষেত্রে নতুন বিপ্লবী ক্ষমতা ভিন্ন রকম বৈশিষ্ট্য ধারণ করে প্রথাগত ক্ষমতা ও ভগ্ন ক্ষমতা থেকে। এটা সত্য যে, প্রতিষ্ঠিত নতুন পদ্ধতি শিগগিরই প্রথাগত হয়ে পড়ে বিপ্লব সফল হলে। আবার এটাও সত্য যে, সংগ্রাম কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী হলে তা নগ্ন ক্ষমতার সংগ্রামে পর্যবসিত হয়। তা সত্ত্বেও নতুন ধর্মমতে বিশ্বাসীরা মনোগত দিক দিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী দুঃসাহসিকদের চেয়ে অনেক ভিন্ন এবং তাদের কার্যকলাপ অধিক স্থায়ী হওয়ার উপযোগী এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
চারটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বিপ্লবী ক্ষমতা ব্যাখ্যা করব :
(১) প্রাথমিক খ্রিস্টবাদ, (২) সংস্কার, (৩) ফরাসি বিপ্লব, (৪) সমাজবাদ ও রুশ বিপ্লব।
১. প্রাথমিক খ্রিস্টবাদ
খ্রিস্টবাদের প্রভাব পড়ছে ক্ষমতা ও সামাজিক সংগঠনের উপর। এ জন্য আমি আলোচনা করতে চাই খ্রিস্টবাদ সম্পর্কে।
পুরোপুরিভাবে অরাজনৈতিক ছিল খ্রিস্টবাদের প্রাথমিক দিনগুলো। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা হচ্ছে আমাদের যুগে প্রাচীন প্রথার উত্তম প্রতিনিধি। এরা বিশ্বাস করেন যে, এ পৃথিবীর পরিসমাপ্তি অত্যাসন্ন। ধর্মনিরপেক্ষ কোনোরূপ অংশগ্রহণে তাদের আগ্রহ নেই। যা হোক ছোট সম্প্রদায়েই শুধু এমন মনোভাব সম্ভব। রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায় খ্রিস্টানদের সংখ্যা ও চার্চের শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে। এ ধরনের প্রত্যাশা জোরদার করেছে ডায়ক্লোসিয়ানদের নির্যাতন। খ্রিস্টবাদে দীক্ষার মনোভাব কমবেশি অস্পষ্ট। কিন্তু এ কথা স্পষ্ট যে, এগুলো ছিল রাজনৈতিক। এর অর্থ দাঁড়ায়, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ছিল চার্চ। চার্চের শিক্ষা ও রোমের প্রথাগত মতবাদের ভেতর পার্থক্য এত বেশি ছিল যে খ্রিস্টের সময়ে অনুষ্ঠিত বিপ্লব ইতিহাসে পরিগণিত হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে।
ক্ষমতা সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খ্রিস্টীয় মতবাদ হচ্ছে, মানুষকে নয়, আমাদের উচিত ঈশ্বরকে মেনে চলা। এর আগে অনুরূপ শিক্ষা ইহুদিবাদ ছাড়া অন্য কিছুতে ছিল না। এটা সত্য যে, ধর্মীয় কর্তব্য বিদ্যমান ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে ইহুদি ও খ্রিস্টান ছাড়া অন্য কোথাও এর সংঘর্ষ ঘটেনি। সম্রাটের কার্যকলাপে নীরব থাকত পৌত্তলিকরা; এমনকি তখনও, যখন তারা মনে করত যে সত্যের লেশমাত্র নেই সম্রাটের স্বর্গীয় দাবির মধ্যে। অপরদিকে খ্রিস্টানদের কাছে অধিবিদ্যাগত সত্য চরম মুহূর্তের। তারা বিশ্বাস করে, তারা যদি ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করে তবে নরকযন্ত্রণা ভোগের ঝুঁকি নিতে হবে। কম খারাপ হিসেবে এর চেয়ে অধিক পছন্দনীয় শহীদের মৃত্যু যন্ত্রণা।
