সামাজিক চুক্তি নামক রুশোর বইটি আধুনিক পাঠকের কাছে তত বৈপ্লবিক মনে হয় না। কিন্তু তা সরকারের কাছে কেন এত বেদনাদায়ক বোঝা মুশকিল। আমার মতে এর প্রধান কারণ হলো তা বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে গৃহীত রীতির উপর সরকারি ক্ষমতার ভিত্তি অন্বেষণ করে–তবে রাজার প্রতি কুসংস্কারমূলক শ্রদ্ধার উপর নয়। বিশ্বব্যাপী রুশোর মতবাদের প্রভাব থেকে দেখা যায় যে, সরকারের সংস্কারমুলক ভিত্তির ব্যাপারে মানুষকে একমত হতে উদ্বুদ্ধ করা কঠিন। হয়তো তা সম্ভব নয় কুসংস্কার সহসা দূরীভূত হলে। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ হিসেবে স্বেচ্ছাকৃত সহযোগিতার জন্য কিছু অনুশীলন দরকার হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে যে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু সাধারণ সমর্থন হারিয়ে ফেললে ঐতিহ্যগত শাসনের অধীন তা অসম্ভব এবং অবশ্যম্ভাবীরূপে বিপ্লবে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। সুশৃঙ্খল সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব মুক্তবুদ্ধিচর্চার সঙ্গে সুসঙ্গত হলেও তা সমাধান করতে হবে সমস্যাটি কঠিন হওয়া সত্ত্বেও।
কখনও কখনও ভুল অর্থে এ সমস্যার প্রকৃতি গৃহীত হয়ে থাকে। এ ধরনের একটি সরকার কল্পনা করা যথেষ্ট নয় যা একজন তাত্ত্বিকের কাছে বিদ্রোহাত্মক মনোভাব সৃষ্টিতে সহায়ক বলে মনে হয় না। বাস্তবে একটি সরকার গঠন করা জরুরি এবং গঠিত হলে বিপ্লব রোধকল্পে প্রয়োজনীয় আনুগত্য লাভে সমর্থ হবে। তা হচ্ছে, বাস্তব রাষ্ট্র শাসনমূলক সমস্যা এবং এতে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট জনসাধারণের সর্বপ্রকার বিশ্বাস ও পূর্ব ধারণা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এমন অনেকে বিশ্বাস করে যে, কোনো জনসমষ্টি একবার রাষ্ট্রীয় সংগঠন যন্ত্র দখল করতে পারলে প্রচারণার মাধ্যমে জনসমর্থন লাভ করতে পারবে। যা হোক, এ মতবাদের রয়েছে স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা। জাতীয় অনুভূতির বিরোধী হওয়ার জন্য অধুনা রাষ্ট্রীয় প্রচারণা ভারতে এবং (১৯২১ সালের আগে) আয়ারল্যান্ডে অচল প্রমাণিত হয়েছে। প্রবল ধর্মীয় অনুভূতির বিরোধী হওয়ার জন্য অধুনা রাষ্ট্রীয় প্রচারণা ভারতে এবং (১৯২১ সালের আগে) আয়ারল্যান্ডে অচল প্রমাণিত হয়েছে। প্রবল ধর্মীয় অনুভূতির বিরোধী হয়ে টিকে থাকা কঠিন। এখনও এ ব্যাপারটি সন্দেহজনক যে, তা কত দূর অধিকাংশ লোকের ব্যক্তিস্বার্থের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে। স্বীকার করতেই হবে যে, ক্রমাগতভাবে অধিকতর ফলপ্রসূ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রচারণা। সুতরাং সরকারের পক্ষে সহজ হচ্ছে সাধারণ মানুষের সমর্থন লাভ করা। পরবর্তী পর্যায়ে আরও পূর্ণতার সাথে আমাদের উত্থাপিত প্রশ্নগুলো আলোচিত হবে। এখন শুধু এগুলো মনে রাখা দরকার।
আমি এ পর্যন্ত আলোচনা করেছি রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্পর্ক। কিন্তু অর্থনৈতিক পরিমন্ডলে নগ্ন ক্ষমতা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কসমনে করেন ভবিষ্যতে সমাজতান্ত্রিক সম্প্রদায় ছাড়া সর্বত্রই সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরিভাবে নগ্ন ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। ঐতিহাসিক হেলভি বেনথেইজমে একদা বলেছেন যে, যে ব্যক্তি তার কাজের মূল্য যতটুকু ধারণা করে তা-ই পেয়ে থাকে। আমি নিশ্চিত এটি সত্য নয় গ্রন্থাকারদের বেলায়। আমার বেলা আমি দেখেছি যে, যে বই আমার কাছে যত বেশি মূল্যবান মনে হয়েছে তার জন্য আমাকে তত কম মূল্য দেয়া হয়েছে। যদি সফল ব্যবসায়ী প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাস করেন যে, তাদের কাজ উপার্জিত অর্থের সমমূল্যমানের তাহলে তারা অবশ্যই অনুমিত স্তর অপেক্ষাও নিম্নস্তরের মূর্খ হবেন। তা সত্ত্বেও সত্যের উপাদান রয়েছে হেলভির তত্ত্বে। একটি স্থিতিশীল সমাজে তীব্র অন্যায় অনুভূতিসম্পন্ন বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ থাকতে পারে না। সুতরাং ধরে নিতে হবে যে, যে সমাজে অসন্তুষ্টি ব্যাপক নয় সে সমাজে অধিকাংশ মানুষ মনে করে যে তারা পাইকারিভাবে বিনা বেতনে রয়েছে। যে অনুন্নত সমাজে চুক্তি নয় বরং মর্যাদার উপরই জীবিকা নির্ভর করে সে সমাজে প্রথাগত সবকিছুই তিনি ন্যায়সঙ্গত মনে করেন। কিন্তু তখনও হেলভির ফর্মুলা কার্যকারণকে উল্টিয়ে দেয়। ন্যায়সঙ্গত অনুভূতিই প্রথার কারণ, কিন্তু প্রযোজ্য নয় বিপরীতটি। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ক্ষমতা প্রথাগত যখন পুরনো প্রথাগুলো পুরোপুরি বদলে যায় শুধু তখনই তা নগ্ন ক্ষমতায় পর্যবসিত হয় অথবা, কোনো কারণে পরিণত হয়। সমালোচনায়।
মজুরি নির্ধারণের কোনো রীতি প্রচলিত ছিল না। শিল্পায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে এবং চাকরিজীবীরা সংগঠিত হয়নি তখনও। ফলে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত সীমারেখার ভেতর শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক নগ্ন হয়ে পড়ে। গোঁড়া অর্থনীতিবিদরা মনে করতেন, অদক্ষ শ্রমিকদের রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরে রাখাই যে এর কারণ তা তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন।
কিছুক্ষেত্রে তা স্পষ্ট। দস্যু কর্তৃক লুণ্ঠিত দ্রব্য অথবা বিজিত জাতির কাছ থেকে বিজয়ীদের দ্বারা দখল করা সম্পদ নগ্ন ক্ষমতার বিষয়। এভাবে দাসত্ব ও নগ্ন ক্ষমতার বিষয় দাস অভ্যাস সত্ত্বেও তা নীরবে মেনে নেয় না। মাকর্স দেখতে পান যে, প্রশ্নটি ক্ষমতা সম্পর্কিত। কিন্তু আমি মনে করি যে, তিনি গৌণ করে দেখেছেন অর্থনৈতিক ক্ষমতার সাপেক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতা। ট্রেড ইউনিয়নগুলো যথেষ্ট অবদান রাখতে পারত শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। কিন্তু কার্যত ক্ষমতা ছাড়া এগুলো অচল হয়ে পড়ে। এক রাশ আইন অচল হয়ে যেত ইংল্যান্ডে, কিন্তু তা ঘটেনি, কারণ ১৯৬৮ সালে ভোটাধিকার লাভ করে শহরে শ্রমিকরা। ট্রেড ইউনিয়ন (সংগঠন) থাকায় মজুরি আর নগ্ন ক্ষমতার দ্বারা নয় বরং পণ্য কেনা-বেচার মতো দর কষাকষির দ্বারা স্থির হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মার্কসের প্রভাব পরিলক্ষিত হওয়ার আগে নগ্ন ক্ষমতার ভূমিকা ধারণাতীতভাবে বেশি ছিল। দস্যু কর্তৃক ভাগ্যহতের কাছ থেকে জোরপূর্বক দখল করা দ্রব্য অথবা বিজিত জাতির কাছ থেকে বিজয়ী কর্তৃক সম্পদ অর্জনের মতো তা নগ্ন ক্ষমতার বিষয়। এভাবে দাসত্বের বিষয়টি, যখন দাস কর্তৃক অভ্যাস সত্ত্বেও তা নীরবে মেনে নেয় না। আদায়কারীর প্রতি ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও যদি অর্থ সংগ্রহ জরুরি হয়ে পড়ে তবে নগ্ন ক্ষমতার মাধ্যমেই তা জোরপূর্বক আদায় করা হয়। দুটো ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘৃণা বিদ্যমান : একটি হচ্ছে যেখানে অর্থ প্রদান প্রথাগত নয় এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ফলে প্রথাগত ব্যাপার অন্যায় বলে গৃহীত হয়। আগের দিনগুলোতে পুরুষরা স্ত্রীর সম্পত্তির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধিকার রাখত, কিন্তু নারী আন্দোলন এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উদ্রেক এবং পরিবর্তন ঘটায় আইনের ক্ষেত্রে। আগে শ্রমিকের দুর্ঘটনার দায়িত্ব বহন করত না মালিক। কিন্তু এখানেও পরিবর্তন ঘটেছে দৃষ্টিভঙ্গির এবং প্রবর্তিত হয়েছে এ সম্পর্কিত আইনও। এ ধরনের দৃষ্টান্ত সংখ্যায় অনেক।
