আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেই নয় শুধু, বরং সরকার পরিচালনায় একটি রাষ্ট্রের যেখানে নগ্ন ক্ষমতা বিরাজমান, সেখানে ক্ষমতা অর্জন অন্য যে কোনো জায়গার চেয়ে নিষ্ঠুর। মেকিয়াভেলি এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ নেয়া যেতে পারে ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের মৃত্যুর সময় সিজার বর্গীয়ার প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার প্রশংসাসূচক বর্ণনা।
তিনি কাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন চারটি পন্থায়। প্রথমত, তাদের দ্বারা লুণ্ঠিত প্রভুদের পরিবারবর্গেল শোষণের মাধ্যমে যাতে পোপের কাছ থেকে এ যুক্তি নেয়া যায়। দ্বিতীয়ত, রোমের ভদ্রলোকদের সমর্থন আদায় করে তাতে তাদের সাহায্য নিয়ে পোপকে দমন করা যায়। তৃতীয়ত, কলেজকে নিজের সুবিধায় এনে। চতুর্থত, পোপের মৃত্যুর আগে প্রভূত ক্ষমতা অর্জন করে যাতে তিনি ক্ষমতাবলে প্রথমত আঘাত রোধ করতে পারেন-এ চারটির তিনটি তিনি পূর্ণ করেন আলেকজান্ডারের মৃত্যুর আগে। কারণ তিনি হত্যা করেছিলেন তার নাগালের ভেতর বেদখলকৃত জমিদারদের। পালাতে সক্ষম হয়েছিল শুধু অল্প কয়েকজন।
যে কোনো সময় অনুসরণ করা যায় দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পন্থা। কিন্তু প্রথমটি জনমতকে ব্যথিত করে প্রতিষ্ঠিত সরকার থাকাকালীন। একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার বিরোধী নেতাকে হত্যা করে নিজের অবস্থান সংহত করতে পারবেন না। কিন্তু যেখানে নগ্ন ক্ষমতা বিদ্যমান সেখানে নিষ্ক্রিয় এ রকম নৈতিক বাধা।
জনসাধারণ যখন কোনো ক্ষমতার প্রতি ক্ষমতার কারণেই শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তখন তা-ই নগ্ন ক্ষমতায় পরিণত হয়। এভাবে চলে আসা ঐতিহ্যগত ক্ষমতার ঐতিহ্য গ্রহণযোগ্য না হলে তা নগ্ন ক্ষমতায় পরিণত হয়। এভাবে নগ্ন ক্ষমতায় পরিণত হয় যুক্ত চিন্তা ও তীব্র সমালোচনা। গ্রিস ও রেনেসাঁ ইতালিতে তা ঘটে থাকে। প্লেটো নগ্ন ক্ষমতার যথাযথ উপস্থাপন করেন রিপাবলিকের প্রথম বইয়ে। থ্রাসিমেকাস ন্যায়-নীতিগত সংজ্ঞা প্রদানের চেষ্টায়রত সক্রেটিসের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে বলেছেন, আমার মতে ন্যায়ের অর্থ হচ্ছে শক্তিমানের স্বার্থ রক্ষা করা।
প্রত্যেক সরকারই আইন রচনা করে তার স্বার্থ রক্ষার্থে। গণতান্ত্রিক আইন রচনা করে একটি গণতান্ত্রিক সরকার। একটি স্বৈরশাসক স্বৈরতান্ত্রিক আইন রচনা করে। অন্যান্য আইনও অনুরূপভাবেই রচিত হয়। এই পদ্ধতি অনুসারে এখনকার সরকারগুলো ঘোষণা করেছে যে, তাদের স্বার্থই প্রজাদের স্বার্থ এবং যে-ই তা থেকে বিচ্যুত হয় সে-ই অবৈধ বা অন্যায় আচরণের জন্য অভিযুক্ত হয়ে বেত্রাঘাতপ্রাপ্ত হয়। সুতরাং হে মহাশয়, আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে, প্রত্যেক শহরে প্রতিষ্ঠিত সরকারের স্বার্থ রক্ষাই ন্যায়। আমি মনে করি উন্নত যুক্তি পাওয়া যাবে সরকারের পক্ষে। সুতরাং সঠিক যুক্তির সিদ্ধান্ত একই জিনিস যে, সর্বত্র শক্তিমানের স্বার্থ রক্ষাই ন্যায়।
সাধারণভাবে যখন এমন দৃষ্টিভঙ্গি গৃহীত হয় তখন শাসক তার নৈতিক বিপত্তির অধীনে থাকে না। কারণ শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য তারা যা কিছু করে তাতে অত্যাচারিত ছাড়া কেউই ব্যথিত হয় না। বিদ্রোহীদের দমনে উৎসাহ যোগায় শুধু অকৃতকার্য হওয়ার ভয়ই। নির্মম উপায়ে সফলতার সম্ভাবনা থাকলে তাদের ভয় করার প্রয়োজন নেই যে, এই নির্মমতাই তাদের অপ্রিয় করে তোলে।
থ্রাসিমেকাসের মতবাদ যেখানে সাধারণভাবে গৃহীত হয়, সেখানে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল সরকারের ইচ্ছাধীন শক্তির উপর। এভাবে তা অপরিহার্য করে তোলে সামরিক শাসন। সমাজে বিরাজমান বিশ্বাস যদি বিদ্যমান ক্ষমতা বন্টনের প্রতি জনমনে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করে তবেই সেখানকার সরকার স্থিতিশীলতা পেতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে সব বিশ্বাস স্বাভাবিকভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনার মুখে টিকে থাকতে পারে না। সাধারণের সম্পত্তিসহ বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল রাজকীয় পরিবার, অভিজাত ব্যক্তিবর্গ, ধনিকশ্রেণি, স্ত্রীলোকদের বিপরীতে পুরুষদের এবং অন্যান্য জাতির বিপরীতে শ্বেতকায় জাতির মানুষের হাতে। কিন্তু এ জাতীয় সীমাবদ্ধতা বুদ্ধিবৃত্তি প্রসারের ফলে অগ্রাহ্য করা হয়ে থাকে এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা হয় ক্ষমতা ছেড়ে দেন নতুবা বাধ্য হন নগ্ন ক্ষমতার উপর নির্ভর করতে। সাধারণের সম্পত্তি লাভের জন্য সুশৃঙ্খলভাবে সরকারকে অবশ্যই যুক্তি-পরামর্শের একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে, যাতে মানবজাতির অধিকাংশ লোকই একমত হতে পারে গ্রাসিমেকাসের মতবাদ ছাড়া অন্য মতবাদের উপর।
পরবর্তী অধ্যায় পর্যন্ত আমি মূলতবি রাখব সরকার গঠনের জন্য সাধারণের সম্মতি আদায় সংক্রান্ত কুসংস্কার ছাড়া অন্যান্য পন্থার আলোচনা। কিন্তু এ পর্যায়ে কিছু প্রাথমিক মন্তব্য যথাযথ হবে। প্রথমত, সমস্যা সমাধানের অযোগ্য নয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে তা সমাধান করা হয়েছে। (ব্রিটেনে তা সমাধান করা হয়েছে বলা মুশকিল, কারণ ব্রিটিশ স্থিতিশীলতায় রাজসিংহাসনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন একটি অপরিহার্য উপাদান।) দ্বিতীয়ত, বুঝতে হবে সুশৃঙ্খল সামজের সুবিধাদি। সাংবিধানিক উপায়ে তা তেজোদীপ্ত ব্যক্তিদের ধনী ও ক্ষমতাশীল হওয়ার সুযোগ দেবে। যে সমাজে তেজোদীপ্ত ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ শ্রেণি আশানুরূপ বৃত্তিলাভে বঞ্চিত হয়, সে সমাজের অস্থিতিশীলতায় একটি উপাদান বিদ্যমান। ফলে সে সমাজে বিদ্রোহ দেখা দেয় যে কোনো সময়। তৃতীয়ত, শৃঙ্খলার স্বার্থে কতক সামাজিক রীতিনীতি উদ্দেশ্য মূলকভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন; কিন্তু তা ব্যাপক বিরোধিতা সৃষ্টির মতো এত নিদারুণ অন্যায়মূলক হবে না। এ রীতি একবার সফল হলে শিগগিরই ঐতিহ্যগত হয়ে পড়ে এবং লাভ করে ঐতিহ্যগত সর্বপ্রকার শক্তি।
