কিছুদিনের জন্য সিসিলিতে তার ক্ষমতা স্বাভাবিক উত্থাপন-পতনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি এজেস্টা অধিকার করেন এবং শহরের প্রত্যেক পুরুষকে হত্যা করেন। ধনীরা সম্পদ উন্মোচন করে না দেয়া পর্যন্ত তাদের অত্যাচার করেন। যুবতী এবং শিশুদের তিনি দাস হিসেবে বিক্রি করে দেন প্রধান ভূমিতে অবস্থিত ত্রুটিতে।
বলতে আমার দুঃখ হয় যে, সুখের ছিল না তার পারিবারিক জীবন। গোপন সম্পর্ক ছিল তার এক পুত্রের সঙ্গে তার এক স্ত্রীর। তার দুই নাতি অপর এক নাতিকে হত্যা করে এবং পরে এক পুরনো ভৃত্যকে উদ্বুদ্ধ করে দাঁতের খড়গে বিষ প্রয়োগে। এগথোসল যখন দেখলেন যে তিনি নিশ্চিত মারা যাবেন তখন তিনি সিন্টে সভা ডাকলেন এবং দাবি করলেন নাতির উপর হত্যার প্রতিশোধ। কিন্তু বিষক্রিয়ায় তার মাড়ি এত ক্ষত হয়েছিল যে তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। নাগরিকরা উঠে পড়ল। মৃত্যুর আগে তড়িঘড়ি চিতায় চলে গেলেন তিনি। তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হলো এবং বলা হলো যে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে গণতন্ত্র।
প্রাচীন গ্রিসের অনুরূপ রেনেসাঁ ইতালির ঘটনাবলি, কিন্তু আরও ঘনীভূত ছিল সন্দেহ। অলিগার্কিক বাণিজ্যিক প্রজাতন্ত্র, অত্যাচারী শাসন ও প্রাচীন আদর্শ অনুসরণে সমাজতান্ত্রিক রাজ্যশাসন এবং আরও ছিল চার্চ। পোপ ইতালি ছাড়া সব জায়গাতেই সম্মানী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হতেন, কিন্তু তার পুত্র সম্মানিত এ ধরনের বিবেচনা করা হতো না। বর্গীয় ক্ষমতার উপর নির্ভর করতেন সিজার।
শুধু নিজের বর্ণনামতেই নয়, বরং সিজার বর্গীয় ও তার পিতা ষষ্ঠ আলেকজান্ডার গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন মেকিয়াভেলিকে অনুপ্রাণিত করার জন্যে। ওই যুগের বর্ণনায় তাদের একটি ঘটনা ক্রেইটনের মন্তব্য সহকারে সহায়তা করবে। শতাব্দীব্যাপী পোপের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল কলোনা এবং অরসিনি। ইতিমধ্যে অরসিনি টিকে থাকলেও কলোনার ঘটেছিল পতন। ষষ্ঠ আলেকজান্ডার তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন এবং সিজার বিশ্বাসঘাতকতাপূর্বক দুটি গুরুত্বপূর্ণ অরসিনি দখল করেছেন শুনে তিনি তাদের প্রধান কার্ডিনাল অরসিনিকে ভেটিকানে আমন্ত্রণ করেন। কার্ডিনাল অরসিনি পোপের কাছে আসা মাত্রই বন্দি হলেন। তাকে খাদ্য সরবরাহ করার জন্য তার মা পোপকে দুহাজার ডুকাট প্রদান করেন এবং পোপকে লোভনীয় মুল্যবান পার্ল দান করেন তার স্ত্রী। তা সত্ত্বেও কার্ডিনাল অরসিনি কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। কথিত আছে যে, ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের আদেশে তাকে বিষাক্ত মদ সরবরাহ করা হয়। এই ঘটনায় এ যুগের নগ্ন ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে ক্রেইটনের মন্তব্যেই।
এমন বিশ্বাসঘাতকাপূর্ণ কাজে আশ্চর্যজনকভাবে কোনোরূপ আপত্তি থাকার কথা ছিল না এবং সফল হওয়ার কথা ছিল পরিপূর্ণভাবে। কিন্তু ইতালির কৃত্রিম রাজনীতিতে সবকিছু নির্ভর করত খেলোয়াড়ের দক্ষতার উপর। কনডেটরি শুধু তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করে এবং যে কোনো উপায়ে তাদের বিতাড়িত করার পর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি। অরসিনি ওভিটেলজদের পরাজয়ের পর কোনো দল বা স্বার্থ অবশিষ্ট ছিল না, যার ক্ষতিসাধন করা যেত। জেনারেলদের অনুগত থাকাকালীন কনডেটরির সৈন্যরা দুর্দমনীয় ছিল। যখন জেনারেলরা অপসারিত হলেন তখন সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে অন্য কাজে ঢুকে পড়ল। এবং….অনেকেই এ ব্যাপারে সিজারের দুশ্চিন্তাহীন শান্ত মেজাজের প্রশংসা করেন … প্রচলিত নৈতিকতায় কোনো প্রকার ক্ষতি সাধন করা হলো না। …. মেকিয়াভেলির প্রতি সিজারের মন্তব্য যথেষ্ট মনে করে গ্রহণ করেছে ইতালির অধিকাংশ মানুষই : যারা নিজেদের পটু প্রতারক হিসেবে প্রদর্শন করে তাদের প্রতারণা করাই শ্রেয়। সফলতার দ্বারাই সিজারের আচরণ বিচার্য।
প্রাচীন গ্রিসের মতোই রেনেসাঁ ইতালিতে সংমিশ্রণ ঘটেছিল উচ্চতর সভ্যতার সঙ্গে নিম্নতর নৈতিকতার। উভয় যুগেই প্রদর্শিত হয় শীর্ষস্থানীয় প্রতিভা ও সর্বনিম্ন নীতিহীনতা। কোনোরূপ শত্রুতা ছিল না প্রতিভাধর ও নীতিবিবর্জিত ব্যক্তিদের মধ্যে। সিজার বর্গীয়ার জন্য দুর্গ তৈরি করেছিলেন লিওনাদ। সক্রেটিসের কিছু ছাত্র ত্রিশ অত্যাচারীর ভেতর সবচেয়ে খারাপ ছিল। প্লেটোর ছাত্ররা সাইরেকিউসে লজ্জাজনক কাজে যুক্ত ছিল এবং এরিস্টটল বিয়ে করেছিলেন এক অত্যাচারীর ভগিনীকে। উভয় যুগেই শিল্পের চর্চা হয় এবং পরে দেড়শ বছরব্যাপী সাহিত্য ও হত্যা পাশাপাশি উৎকর্ষ লাভ করে। উত্তর পশ্চিমের কম সভ্য অথচ অধিক সঙ্গতিপূর্ণ জাতীয়তার দ্বারা সব নিঃশেষ হয়ে যায়। রাজনৈতিক স্বাধীনতা লুপ্ত হওয়ার সাথে উভয় ক্ষেত্রেই শুধু সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ই জড়িত ছিল না, বরং জড়িত ছিল বাণিজ্যিক প্রভুত্বের অবলুপ্তি ও সর্বনাশা দারিদ্র্যও।
নগ্ন ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। সাধারণত এগুলো বিলুপ্ত হয় তিনটির যে কোনো একটি পন্থায়। প্রথমত বিদেশিদের বিজয়ের মাধ্যমে; গ্রিস ও ইতালির ঘটনাবলি, দ্বিতীয়ত একটি স্থিতিশীল একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, যা প্রথাগত হয়ে পড়ে শিগগিরই। মেরিয়াস থেকে এন্তনির পরাজয় পর্যন্ত স্থায়ী গৃহযুদ্ধের পর অগাস্টাসের সাম্রাজ্য হচ্ছে এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তৃতীয়ত হচ্ছে একটি ধর্মের উত্থান। এর স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে, যে পন্থায় মোহাম্মদ (সাঃ) পূর্ববর্তী বিবদমান আরব সম্প্রদায়গুলোকে একত্রিত করেছিলেন। রাশিয়ায় রফতানিযোগ্য খাদ্য পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মহাযুদ্ধের পর ইউরোপব্যাপী কমিউনিজম গ্রহণের মাধ্যমে নগ্ন ক্ষমতার রাজত্ব শেষ হয়ে যেত।
