শান্ত ও অশান্ত পরিবেশের ভেতর বিরাজমান সাইরেকিউস সভায় ডায়ানোসিয়াসই একমাত্র প্রথম ব্যক্তি, যিনি তাদেরকে সম্বোধন করে কিছু বলছেন। তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও তাদের মেজাজের উপযোগী প্রাসঙ্গিক বিষয়ের উপর। তিনি তীব্র সমালোচনা করেন কার্তেজদের হাতে সাইরেকিউসের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ব্যাপারে জেনারেলদের বিশ্বাসঘাতকতা ও এগ্রিজেন্টাম ধ্বংস এবং সেই সঙ্গে চতুপার্শ্বস্থ প্রত্যেকটি ব্যক্তির আসন্ন বিপদের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের। তিনি শুধু রুক্ষভাবে পূর্ণতার সঙ্গে তাদের প্রকৃত ও অভিযোগে আনীত দুষ্কর্মের কথাই তুলে ধরেননি, তার প্রচণ্ড হিংস্রতা সব সঙ্গত বিতর্কের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। অধুনা তিনি বেআইনিভাবে মৃত্যুদন্ড দিতে মনস্থ করেন এগ্রিজেন্টামে গঠিত জেনারেলদের। ওখানে বিশ্বাসঘাতকতা বসে আছে। আইনানুগ বিচারের অপেক্ষা করো না, বরং সহসা তাদের উপর হস্ত চালনা করো এবং সংক্ষিপ্ত বিচারের ক্রিয়া প্রয়োগ করো। আইন ও পার্লামেন্টারি আদর্শের পরিপন্থি এমন বর্বরোচিত প্রেরণাদান। আইনানুগ ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটরা ডায়নোসিয়াসকে একজন শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী। হিসেবে অভিযুক্ত করে তার জরিমানা করেন। কিন্তু সমর্থকরা তার সমর্থনে উচ্ছ্বসিত ছিল। শুধু ফিলিস্টাস ঘটনাস্থলে তার জরিমানা অর্থই প্রদান করেননি, বরং তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, তিনি সারাদিন এ ধরনের সম্ভাব্য জরিমানার অর্থ প্রদান করে যাবেন। তিনি এভাবে ডায়নোসিয়াসকে প্রয়োগ করে যেতে বলেন তার ভাষা। যা বেআইনি হিসেবে শুরু হয়েছিল এখন তা খোলাখুলিভাবে আইন অমান্য করার প্রবণতায় পর্যবসিত হলো। ম্যাজিস্ট্রেটদের কর্তৃত্ব এতই নিষ্প্রভ এবং তাদের বিরুদ্ধে হট্টগোল এতই তীব্র ছিল যে, বক্তাকে শাস্তি প্রদান করা তো দূরের কথা, তাকে দমিয়ে রাখাও ছিল তাদের ক্ষমতার বাইরে। আরও উচ্চকণ্ঠে ডায়নোসিয়াস তার ভাষা প্রয়োগ করে চললেন। তিনি শুধু এগ্রিজেন্টামে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য জেনারেলদের অভিযুক্ত করেননি, বরং নিন্দা করেন সম্পদশালী ব্যক্তিদেরও, কারণ অলিগার্কদের মতো তারা জনসাধারণের উপর অত্যাচারী শাসন বজায় রাখত এবং হেয় প্রতিপন্ন করত অনেককেই। তাছাড়া তাদের স্বার্থ হাসিল করত শহরের দুর্ভাগ্য থেকে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের লোককে কর্তৃত্বে না বসালে সাইরেকিউসকে রক্ষা করা যাবে না। সম্পদের ভিত্তিতে তাদের নির্বাচিত করা যাবে না, বরং জন্মগতভাবে নীচ এবং নিজেদের দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন থাকায় যারা আচরণে বিনয়ী ও মার্জিত তাদেরকে নির্বাচিত করতে হবে।
তিনি এর জন্যেই হতে পেরেছিলেন অত্যাচারী। তিনি পরিমাণসূচক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন গরিব ও নীচদের সঙ্গে। এ কথা সত্য যে, তিনি ধনীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন, কিন্তু তা বিতরণ করে দেন তার দেহরক্ষীদের। তার জনপ্রিয়তা শিগগিরই হ্রাস পেল, কিন্তু অক্ষুণ্ণ থেকে গেল ক্ষমতা। গ্রেটের বর্ণনায় পরবর্তী কয়েক পৃষ্ঠাব্যাপী আমরা দেখতে পাব :
আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এ ধরনের অনুভূতি এতই অধিক ছিল যে, তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল সাইরেকিউবাসীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই এবং তা নির্ভরশীল ছিল একমাত্র নগ্ন ক্ষমতার উপর। সম্ভবত অন্য যে কোনো স্বেচ্ছাচারীর চেয়ে অধিকতর সতর্ক অবস্থায় থাকতেন তিনি।
এজন্য গ্রিক ইতিহাস বৈশিষ্ট্যমন্ডিত যে, স্পার্টা ছাড়া গ্রিসের সর্বত্রই ঐতিহ্যগত প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে। তার ওপর প্রায় নীতিবিবর্জিত ছিল রাজনীতি। হেরোডেটাসের বর্ণনা পাওয়া যায় যে, কোনো স্পার্টাবাসী ঘুষ প্রতিরোধ করতে পারত না। অর্থহীন ছিল গ্রিসব্যাপী রাজনীতিকদের পারস্য রাজের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণে আপত্তি। কারণ প্রতিপক্ষ যথেষ্ট ক্ষমতাবান হলেও তিনি তাই করতেন। ফলস্বরূপ সার্বজনীন লড়াই শুরু হয়ে যায় ব্যক্তিগত ক্ষমতা লাভের জন্যে। পাপ, রাজপথ যুদ্ধ ও হত্যা বিরাজ করছিল এর পেছনে। এ ব্যাপারে অগ্রগামী ছিল সক্রেটিস ও প্লেটোর শিষ্যরা। বিদেশি শক্তির অধীনস্থ হওয়াই ছিল এর পরিণতি যার পূর্বাভাস অনুভূত হয় আগেই।
গ্রিসের স্বাধীনতাহানির জন্য বিলাপ করা এবং গ্রিকদের জ্ঞানী ও সক্রেটেসীয় ভাবাটা ছিল প্রথাগত। গ্রিসীয় সিসিলির ইতিহাসে দৃষ্ট রোমের বিজয়ে পরিতাপ করার কারণ কত ক্ষীণ ছিল। আমার জানা নেই এগথোসলের জীবনধারার চেয়ে নগ্ন ক্ষমতার ভালো দৃষ্টান্ত। আলেকজান্ডারের সমসাময়িক ছিলেন এগথোসল। তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৩৬১ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৮৯ অব্দ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন এবং তিনি তার জীবনের শেষ আটশ বছর সাইরেকিউসের একজন অত্যাচারী ছিলেন।
শুধু গ্রিক শহরগুলোর মধ্যেই সাইরেকিউস সবচেয়ে বড় ছিল না, সম্ভবত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যেও বড় ছিল। একমাত্র প্রতিপক্ষ ছিল কার্তেজ, যার সঙ্গে যুদ্ধে উভয় পক্ষের শোচনীয় পরাজয়ের পর অল্পকাল বিরতি ছাড়া সব সময় যুদ্ধ চলছিল। সিসিলির অন্যান্য শহর দলীয় রাজনীতির পালাবদল অনুযায়ী পক্ষ অবলম্বন করে কখনও সাইরেকিউসের আবার কখনও কার্তেজের। প্রত্যেক শহরেই ধনীরা অলিগার্কি এবং গরিব জনসাধারণ গণতন্ত্র সমর্থন করত। গণতন্ত্রের অনুগামীরা জয় লাভ করলে এর নেতারা হয়ে যেত অত্যাচারী। পরাজিত দলের অনেকেই নির্বাসিত হতো। তাদের দল যেসব শহরে ক্ষমতাশালী সেসব শহরে তারা সেনাবাহিনীতে যোগদান করত। কিন্তু সেনাবাহিনীর অধিকাংশই ছিল বণিক দলের, যারা গ্রিসীয় ছিল না।
