নগ্ন ক্ষমতার সংজ্ঞা মনোগত। একটি সরকার নগ্ন হতে পারে কিছু সংখ্যক প্রজার সাপেক্ষে, কিন্তু অন্যদের সাপেক্ষে নয়। বিদেশি আক্রমণ ছাড়া গ্রিকদের নিষ্ঠুর শাসনের শেষ অধ্যায় এবং রেনেসাঁ ইতালির কয়েকটি প্রদেশ হচ্ছে আমার জানা মতে এর সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টান্ত।
রাজনৈতিক ক্ষমতার ছাত্রদের গ্রিক ইতিহাস পরীক্ষাগারের মতো ছোট ছোট পরীক্ষা উপহার দেয়। হোমারের যুগে বংশগত রাজতন্ত্র ইতিহাস যুগের আগেই লুপ্ত হয় এবং এর স্থলে জন্মলাভ করে বংশানুক্রমিক অভিজাততন্ত্র। অভিজাত ও অত্যাচারিতদের ভেতর সংঘঠিত সংঘর্ষের ইতিহাস হলো গ্রিক শহরগুলোর ইতিহাস। স্পার্টা ছাড়া সর্বত্রই একবার অত্যাচারী বিজয়ী হয়, কিন্তু পরে এর স্থলাভিষিক্ত হয় গণতন্ত্র অথবা অল্প লোকের শাসনের রূপে আভিজাত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। খ্রিঃ পূঃ সপ্তম ও ষষ্ঠ শতাব্দীর অধিকাংশ সময়ব্যাপী ছিল নিষ্ঠুরতার এই প্রথম যুগ। কিন্তু পরবর্তী যে যুগ সম্বন্ধে আমি আলোচনা করতে চাই তা নগ্ন ক্ষমতার যুগ ছিল না। কিন্তু এ সত্ত্বেও তা পথ তৈরি করে দেয় পরবর্তী সময়ের আইনহীনতা ও অবমাননাকর পরিস্থিতির।
অত্যাচারী শব্দটি মূলত শাসকের কোনো খারাপ বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত বহন করত না, বরং তা বুঝাত শুধু আইনগত ও প্রথাগত গুণাগুণের অনুপস্থিতি। প্রাচীনকালে অনেক অত্যাচারীই বিজ্ঞের মতো শাসন করে গেছেন। অধিকাংশ প্রজার সম্মতি নিয়েই তারা শাসন করেছেন। সাধারণত তাদের অভিজাত শ্রেণি ছিল অপশম্য শত্রু। প্রাচীন অত্যাচারীদের ভেতর অধিকাংশই ছিলেন বিত্তবান। অর্থের বিনিময়ে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করে নিত এবং তা বজায় রাখার জন্য সামরিক ক্ষমতার চেয়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতার উপর বেশি নির্ভর করত। তাদেরকে আমাদের যুগের স্বেচ্ছাচারীদের পরিবর্তে মধ্যযুগের স্বেচ্ছাচারীদের সাথে তুলনা করা যায়।
মুদ্রার প্রচলন শুরু হয় অত্যাচারীদের প্রথম যুগেই। ঋণ ও কাগজি মুদ্রা যেমন আজকাল ধনীদের ক্ষমতা বৃদ্ধির উপর প্রভাব রাখে, তখনকার দিনে তা তেমনই প্রভাব রাখত। উল্লেখ আছে যে, মুদ্রার প্রচলন সম্পর্কযুক্ত ছিল অত্যাচারী শাসকের উত্থানের সাথে। কিন্তু তা কতটুকু সত্য তা বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। তবে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, রৌপ্য খনির মালিকানা একটি লোকের অত্যাচারী শাসক হওয়ার পক্ষে সহায়ক ছিল। ইউরোপের নিয়ন্ত্রণাধীন আফ্রিকার অঞ্চলগুলোতে যেমন দেখা গেছে, নতুন অবস্থায় মুদ্রার ব্যবহার প্রাচীন প্রথাগুলোর ক্ষতিসাধন করে। খ্রিঃ পূঃ সপ্তম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্যবসায়ীদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং আঞ্চলিক অভিজাত শ্রেণির ক্ষমতা হ্রাস পায়। পারসিকরা এশিয়া মাইনরের অধিকার লাভ করা পর্যন্ত যুদ্ধবিগ্রহ কম ছিল গ্রিসীয় বিশ্বে এবং এগুলো ছিল গুরুত্বহীন। উৎপাদনের উদ্দেশ্যে কম কাজই দাসদের দ্বারা সম্পন্ন। হতো। এই অবস্থানগুলো অর্থনৈতিক ক্ষমতার জন্য আদর্শস্বরূপ ছিল এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের মতো তা প্রথাগুলোর প্রভাব দুর্বল করেছিল।
প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষে উন্নতি লাভ করা যতদিন পর্যন্ত সম্ভব ছিল প্রথাশক্তি হ্রাসের পরিণতি ভালো বই মন্দ ছিল না। এর ফলে বিগত চার শতাব্দী ছাড়া অন্য সব সময় গ্রিক সভ্যতা লাভ করে দ্রুত অগ্রগতি। গ্রিক শিল্প, বিজ্ঞান ও দর্শনের স্বাধীনতা ছিল কুসংস্কার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমন উন্নত যুগের অবদান। কিন্তু দুর্ভাগ্য, রোধ করার মতো সমাজের গঠনশৈলী তত উন্নত ছিল না। অভাব ছিল সমাজে ধ্বংসাত্মক অপরাধ এড়ানোর উপযোগী প্রয়োজনীয় নৈতিকতা বোধের। কোনো সদ্গুণ দ্বারা সফলতা অর্জন করা ওই সময় সম্ভব ছিল না। দীর্ঘদিন যুদ্ধের ফলে স্বাধীনচেতা মানুষের সংখ্যা হ্রাস পেল এবং ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেল দাস-দাসীর সংখ্যা। ফলে খোদ গ্রিসই মেসিডোনিয়ার অঙ্গরাজ্যে পরিণত হলো। ক্রমবর্ধমান হিংসাত্মক বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ এবং অত্যাচার সত্ত্বেও গ্রিসীয় সিসিলি প্রথমে কার্তেজ ও পরে রোমের বিরুদ্ধে সংগ্রামে রত ছিল। এ উভয় কারণে সাইরেকিউসের অত্যাচারী শাসন আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। প্রথমত আমাদের কাছে নগ্ন ক্ষমতার একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টান্ত। দ্বিতীয়ত, বৃদ্ধ ডায়ানোসিয়াসের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত এবং তা প্রভাবিত করতে পেরেছিল যুবকদের জন্য সমাজ গঠনের চেষ্টায় রত প্লেটোকে। পরবর্তী সব যুগের গ্রিক অত্যাচারীদের দৃষ্টিভঙ্গি অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয় বৃদ্ধ ডায়ানোসিয়াস ও সাইরেকিউসের কুশাসনে নিযুক্ত তার উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে দুর্ভাগ্যজনক যোগাযোগের মাধ্যমে।
গ্রেট প্রতারণামূলক সংগঠন সম্পর্কে বলেন, বল প্রয়োগকারী সংগঠনগুলোর সূচনালগ্নে জনসাধারণকে প্রতারণাপূর্বক বশ্যতা স্বীকার করানো হতো এর মাধ্যমে। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন বশ্যতা স্বীকার করানো হতো যা ছিল গ্রিক শক্তি প্রয়োগকারীদের ব্যবসায়িক পুঁজি। প্রাচীন অত্যাচারী শাসন জনগণের সমর্থন ছাড়া কতটুকু টিকে ছিল তা সন্দেহজনক। কিন্তু সামরিক বৈশিষ্ট্যের চেয়ে অধিকতর বৈশিষ্ট্যমন্ডিত পরবর্তী অত্যাচারী শাসনের বেলায় তা নিশ্চিত সত্য। গ্রেটের বর্ণনা দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যায় ডায়াডোরাসের উপর নির্ভরশীল ডায়ানোসিয়ামের উত্থানের মুহূর্তগুলো সম্পর্কে। সাইরেকিউস পরাজয়ের গ্লানি স্বীকার করতে বাধ্য হলো কমবেশি গণতান্ত্রিক শাসন বর্তমান থাকা সত্ত্বেও। পরাজিত জেনারেলদের শাস্তি দাবি করলেন মহাযুদ্ধে বিজয়ীদের নেতা ডায়ানোসিয়াস।
