ফ্রেডারিক বারবারেসার সময় লম্বৰ্ড লীগের সাথে বাণিজ্য ও জাতীয়তার ঐক্য শুরু হয় এবং রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে সর্বশেষ ও সংক্ষিপ্ত বিজয় অর্জন করে ক্রমাগতভাবে সমগ্র ইউরোপে তা ছড়িয়ে পড়ে। যেখানেই এই মৈত্রী ক্ষমতা লাভ করে সেখাইে প্রথমত রাজতন্ত্রের সহযোগ ও পরে এর বিপরীতে তা ভূমির উপর নির্ভরশীল প্রথাগত ক্ষমতার বিরোধী হয়ে পড়ে। অবশেষে রাজারা সর্বত্র বিলীন হয়ে পরিণত হয় ঠুটো জগন্নাথে। বর্তমানে কমপক্ষে পৃথক হয়েছে জাতীয়তা ও বাণিজ্য। ইতালি, জার্মানি ও রাশিয়ায় বিজয়ী হয়েছে একমাত্র জাতীয়তাই। দ্বাদশ শতাব্দীতে মিলানে সূচনালাভের পর স্বাভাবিক পরিণতি লাভ করে উদারনৈতিক আন্দোলন।
বাহ্যিক কারণে প্রথাগত ক্ষমতা ধ্বংস না হলে সবসময়ই তা এক বিশেষ স্তরে উন্নতি লাভ করে এবং অমনযোগী হয়ে পড়ে সাহস ও শ্রদ্ধায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাধারণ অনুমোদনের ব্যাপারে। কারণ বিশ্বাস করা হয় যে তা কখনও ধ্বংস হবে না। মূর্খতা ও নিষ্ঠুরতার জন্য মানুষ ক্রমান্বয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে এর স্বর্গীয় কর্তৃত্বের প্রতি। যেহেতু অভ্যাসের চেয়ে এসব দাবির ভালো উৎস নেই তাই সমালোচনা একবার শুরু হলে সহজেই এগুলোকে নিঃশেষ করে দেয়। বিদ্রোহীদের কাছে প্রয়োজনীয় ধর্মমত স্থান নেয় পুরনোর। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় ফ্রান্সের কাছ থেকে হাইতি স্বাধীন হলে শুধু বিশৃঙ্খলাই জন্ম নেয়। সাধারণত মনোগত বিদ্রোহ ব্যাপকতা লাভের আগে একটি দীর্ঘজীবী কুশাসন জরুরি হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্রোহীরা পুরনো শাসন বৈশিষ্ট্যের পুরোটা অথবা অংশবিশেষ অর্জন করে। অগাস্টাস তাই সিনেটের প্রথাগত মর্যাদা আত্মস্ত করেছিলেন এবং প্রটেস্ট্যান্টরা বাইবেলের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখলেও রাখতে পারেনি তা ক্যাথলিক চার্চের প্রতি। রাজতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অক্ষুণ্ণ রেখেই ব্রিটিশ সংসদ ধীরে ধীরে রাজক্ষমতা আত্মস্ত করে।
যা হোক, সীমিত বিপ্লব ছিল এগুলো : অধিকতর ব্যাপকতাসম্পন্ন বিপ্লবগুলো সৃষ্টি করত কঠিনতর সমস্যা। উত্তরাধিকারমূলক রাজতন্ত্রের স্থলে হঠাৎ প্রজাতন্ত্রী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দেয়, কারণ নতুন সংবিধান সম্পর্কযুক্ত হয় না জনগণের মানসিক অভ্যাসের সঙ্গে। সংবিধান ব্যক্তির স্বার্থের অনুকূল হলেই এর প্রতি সম্মান প্রদর্শিত হয়। উচ্চাভিলাষী ব্যক্তিরা একনায়ক হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অকৃতকার্য থাকার পর পরিত্যাগ করে সে চেষ্টা। একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে টিকে না থাকলে প্রজাতন্ত্রী সংবিধান ব্যর্থ হয় জনগণের চিন্তা-চেতনার উপর প্রভাব অর্জনে। অথচ স্থিতিশীলতার জন্য তা-ই ছিল জরুরি। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা যায় নতুন প্রজাতন্ত্রের দৃষ্টান্ত হিসেবে, যা সূচনা থেকেই রয়েছে স্থিতিশীল।
ব্যক্তি মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতার উপর সমাজবাদ ও সাম্যবাদের আক্রমণ হচ্ছে আমাদের সময়ের প্রধান বৈপ্লবিক আন্দোলন। আমরা এ ধরনের আন্দোলনের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আশা করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ উপস্থাপন করা যায় খ্রিস্টবাদের উত্থানের সময় প্রটেস্ট্যান্টবাদ ও রাজনৈতিক গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো। আমি পরবর্তী পর্যায়ে আরও আলোচনা করব।
০৬. নগ্ন ক্ষমতা
প্রথাগত ক্ষমতার সহায়ক বিশ্বাস ও অভ্যাস হ্রাস পেলে ক্রমে নতুন বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল ক্ষমতা অথবা প্রজাদের সম্মতির পরোয়া করে না–এ ধলনের নগ্ন ক্ষমতার পথ সুগম হয়। এর পর্যায়ভুক্ত হলো মেষের উপর কসাইয়ের, পরাভূত জাতির প্রতি আক্রমণকারী সেনাবাহিনীর এবং বন্দি ষড়যন্ত্রকারীর উপর পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগ। ক্যাথলিকদের উপর ক্যাথলিক চার্চের ক্ষমতা ঐতিহ্যগত; কিন্তু নগ্ন এর ক্ষমতা অত্যাচারিত মতাবলম্বীদের উপর। সাধারণ তিনটি পর্যায় অতিক্রম কের দীর্ঘদিনব্যাপী ক্ষমতাসীন সংগঠন। প্রথমটি বিজয়ের পথে অতি-উৎসাহের, কিন্তু প্রথাগত বিশ্বাসের নয়; পরে নতুন ক্ষমতার প্রতি সাধারণ সম্মতির যা শিগগিরই প্রথাগত হয়ে পড়ে; অবশেষে প্রথা অগ্রাহ্যকারী লোকের উপর ক্ষমতার ব্যবহার, যা আবারও নগ্ন ক্ষমতায় পর্যবসিত হয়। সংগঠনের বৈশিষ্ট্যগুলোর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এই পর্যায়গুলো অতিক্রমকালে।
এশিয়া ও আফ্রিকার খ্রিস্টান দেশগুলো প্রায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও নতুন শাসকদের (মুসলমান) বশ্যতা স্বীকার করে নেয় বিজিত হওয়ার পর। ওয়েলস কালক্রমে ইংরেজদের শাসন মেনে নেয়, যদিও আয়ারল্যান্ড তা করেনি। আলবিজেন বিরুদ্ধবাদীদের সামরিক শক্তি দ্বারা দমন করা হলে তাদের নতুন প্রজন্ম ভেতরে ও বাইরে চার্চের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়। ইংল্যান্ডে এক রাজকীয় পরিবারের জন্ম দেয় নরমেন বিজয়। পরে এমন মনে করা হতো যে তাদের স্বর্গীয় অধিকার প্রতিষ্ঠিত সিংহাসনে। মনোগত বিজয়ের ফলে শুধু সামরিক বিজয় স্থিতিশীল হয়। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে তা ঘটেছে সেগুলো সংখ্যার দিক দিয়ে অনেক।
দুটো ভিন্ন পরিবেশের জন্ম দেয় বিদেশি শক্তির কাছে পরাজয়ের পর বশ্যতা স্বীকার করেনি এমন সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ সরকার ব্যবস্থার নগ্ন ক্ষমতা। প্রথমত, দুই বা ততোধিক ধর্মমতের অতি-উৎসাহী বিশ্বাসীরা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় প্রভুত্ব অর্জনের জন্য। দ্বিতীয়ত, প্রথাগত বিশ্বাস স্থলবর্তী বিশ্বাস ছাড়া লোপ পেয়ে থাকে যেখানে ব্যক্তিগত অভিলাষ সীমাহীন। প্রথমোক্তটি বিশুদ্ধ নয়, কারণ শক্তিশালী ধর্মমতের অনুসারীরা অনুগত হয় নগ্ন ক্ষমতার। আমি পরবর্তী অধ্যায়ে বিপ্লবী ক্ষমতা শিরোনামে তা আলোচনা করব। এখনকার আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে শুধু দ্বিতীয় বিষয়ের উপর।
