আমরা এমন মহান রাজার কাছে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্র বর্ষ শেষ হওয়ার আগে পৌঁছে যাই যার নাম ছিল হামুরাবি। একজন রাজার পক্ষে যা সম্ভব তার সবই তিনি করেছিরেন। আইন প্রণয়নের জন্য সুপরিচিত তিনি। সূর্যদেবতার কাছ থেকে তিনি আইন ক্ষমতা পেয়েছিলেন এবং তিনি দেখিয়েছিলেন যে মধ্যযুগীয় রাজপুরুষরা যা করতে পারেননি তা অর্জন করতে সফলকাম তিনি। যেমন আদালতে যাজকদের অধীনতা। সৈনিক ও ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বৈশিষ্ট্য অর্জন করেন তিনি। তার বিজয়ের প্রশংসা করেছেন দেশপ্রেমিক কবিরা।
তিনি লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন সেচ ব্যবস্থায় তার কৃতিত্ব। আমু এবং এনলিন। (একজন পুরুষ দেবতা এবং একজন স্ত্রী দেবতা) শাসন করার জন্য শুমার ও আক্কাদের ভূমি দান করলেন এবং তাদের শাসন করার জন্য রাজদন্ড প্রদানের দায়িত্ব আমার উপর অর্পন করলেন। আমি হামুরাবি খনন করলাম যা শুমার ও আক্কারেদ জমিতে পানি আনল। আমি শুমার ও আক্কাদের বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত মানুষগুলোকে একত্রিত করলাম এবং তাদের জন্য ব্যবস্থা করলাম পশু চারণ ও জল ব্যবহারের। আমি তাদের প্রচুর চারণভূমি দিলাম এবং প্রতিষ্ঠিত করলাম শান্তিপূর্ণ বসবাসে।
মিসরে পিরামিড যুগে রাজতন্ত্র উন্নতির সর্বোচ্চ শিকরে পৌঁছে। বিশাল এলাকা ছিল পরবর্তী রাজাদের, কিন্তু কারোরই পূর্ণমাত্রায় শাসন ছিল না রাজ্যের উপর। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ফলে নয়, মিসর ও ব্যাবিলনে রাজাদের ক্ষমতা শুধু বিদেশি আক্রমণের ফলে নিঃশেষ হয়। এটা সত্য যে, তা যাজক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অবতীর্ণ হতে পারেনি। কারণ প্রজাদের অধীনতা নির্ভর করতে রাজতন্ত্রের ধর্মীয় তাৎপর্যের উপর। কিন্তু এই দিক ছাড়া অপরিসীম ছিল তাদের
অধিকাংশ শহরেই ইতিহাস যুগের সূচনা পর্যন্ত গ্রিকরা রাজাদের রাজনৈতিক শাসন থেকে মুক্ত ছিল। ইতিহাসব্যাপী রাজার প্রতি রোমানরা তাদের জাতির অনীহা বজায় রাখে। সঠিক অর্থে রোমান সম্রাট পশ্চিমে তাদের জাতির অনীহা বজায় রাখে। সঠিক অর্থে রোমান সম্রাট পশ্চিমে রাজা ছিলেন না। আইনবহির্ভূত ছিল তাদের উৎস। সবসময় তিনি নির্ভর করতেন সেনাবাহিনীর উপর। জনসাধারণের কাছে নিজেকে ঈশ্বর ঘোষণা করতে পারতেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর কাছে তিনি একজন জেনারেল। তিনি প্রচুর পরিমাণে দান করতেন অথবা করতেন না। সাম্রাজ্য স্বল্পকাল ছাড়া কখনও উত্তরাধিকারজাত ছিল না। সেনাবাহিনীর হাতে ছিল প্রকৃত ক্ষমতা। সম্রাট শুধু সাময়িকভাবে এমন মনোনীত ব্যক্তিমাত্র।
কিছু পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বর্বর আক্রমণের ফলে পুনরাবির্ভাব ঘটে রাজতন্ত্রের। নতুন রাজারা জার্মান গোষ্ঠীপতি ছিলেন। পরম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না তারা। সবসময়ই তাদের ক্ষমতা নির্ভর করত কোনো পরিষদ বা সগোত্রীয় সহযোগিতার উপর। কিন্তু জার্মান গোষ্ঠী রোমান প্রদেশ জয় করলে এর প্রধান হতো রাজা এবং গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীরা লাভ করতেন বিশেষ স্বাধীনতাসহ এর আভিজাত্য। এভাবে যে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব হয় তা পশ্চিম ইউরোপের সব রাজাকে অবাধ্য বেরনদের করুণার উপর ফেলে দেয়।
রাজতন্ত্র দুর্বল ছিল চার্চ ও সামন্ত অভিজাত সম্প্রদায়ের অধিকাংশ জিনিস গ্রহণ করার আগে। আমরা এর আগে চার্চের দুর্বলতার কারণ আলোচনা করেছি। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে রাজার বিরুদ্ধে সংগ্রামে অভিজাত শ্রেণি ধ্বংস হয়, কারণ তা সুশৃংখল সরকারের প্রতি বাধাস্বরূপ ছিল। জার্মানিতে এর নেতারা উন্নীত হয় ছোট ছোট রাজায়। ফলে জার্মানি ফ্রান্সের কৃপায় পতিত হয়। বিভাগপূর্ব পর্যন্ত পোল্যান্ডে অভিজাত শ্রেণির অরাজকতা চলছিল। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে শতবর্ষের যুদ্ধ ও গোলাপযুদ্ধের পর সাধারণ নাগরিকরা বিশ্বাস স্থাপন করে শক্তিশালী রাজার উপর। চতুর্থ এডওয়ার্ড বিজয়ী হন লন্ডন নগরীর সাহায্য পেয়ে এবং তিনি তার রানী লন্ডন থেকেই বেছে নেন। সামন্ত অভিজাত শ্রেণির শত্ৰু একাদশ লুইস উচ্চশ্রেণির বুর্জোয়াদের বন্ধু ছিলেন, যারা তাকে অভিজাতদের বিরুদ্ধে সাহায্য করে এবং তিনি তাদেরকে সাহায্য করেন আর্টিসামদের বিরুদ্ধে। ENCY CLOPAEDIA BRITANICA-র রায় হচ্ছে, তিনি বড় পুঁজিপতির মতো শাসন করেন।
শিক্ষা যাজকদের এখন একচেটিয়া অধিকার নয়। চার্চের সঙ্গে সংঘর্ষে এ নিয়ে আগেকার রাজাদের তুলনায় রেনেসাঁ রাজতন্ত্রের সুবিধা ছিল বড় ধরনের। অপেশাদার আইনজ্ঞদের সাহায্য অতুলনীয় নতুন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়।
নতুন রাজতন্ত্র ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেনে চার্চ ও আভিজাত্যের ঊর্ধ্বে ছিল। তাদের ক্ষমতা নির্ভরশীল ছিল জাতীয়তাবাদ ও বাণিজ্য-এই দুই উদীয়মান শক্তির উপর। যতদিন পর্যন্ত মনে করা হতো যে তারা এই দুই শক্তির জন্য কার্যকর ততদিন তারা শক্তিশালী ছিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হলেই বিপ্লব সংগঠিত হয়। নতুন বিশ্বজয়ের মাধ্যমে স্পেন একপাশে সরে দাঁড়ায়; কিন্তু স্পেনীয় নতুন জগৎ বাণিজ্যের জন্যেই বিদ্রোহ করছিল ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে।
যদিও বাণিজ্যিক বলয় সামন্তবাদীদের অরাজকতার বিরুদ্ধে রাজাকে সমর্থন দেয়, তারপরও যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ার পর তা প্রজাতন্ত্রী ধরনের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। প্রাচীনকালে উত্তর ইতালি ও মধ্যযুগীয় হেনসিটিক শহরগুলোতে এবং হল্যান্ডের মহান দিনগুলোতে তা একই ছিল। সুতরাং বেদনাদায়ক ছিল রাজার বাণিজ্য মৈত্রী। রাজা স্বর্গীয় কর্তৃত্বের কাছে আবেদন করেন, তাদের ক্ষমতা যেন সিক্ত হয় প্রথাগত ও আংশিকভাবে ধর্মীয় উপাদানে। এ ব্যাপারে তারা শুধু অপরাধীই নয়, বরং তা ছিল অধার্মিকতা। ফ্রান্সে সেইন্ট লুইসকে রূপকাহিনীর ব্যক্তিত্বে পরিণত করা হয়, যার কিছু ধার্মিকতা পৌঁছে পঞ্চদশ লুইস পর্যন্ত। নতুন কোর্ট আভিজাত্য সৃষ্টি করে। রাজারা একে গুরুত্ব দেয় বুর্জোয়াদের চেয়ে। ইংল্যান্ডে উচ্চতর অভিজাত ও মধ্যবিত্তরা একত্রিত হয়ে নামমাত্র সংসদীয় শিরোনামে একজন রাজা বসায়, যার কোনোরকম অতিপ্রাকৃত সংসদীয় গুণাগুণ ছিল না। উদাহরণস্বরূপ রাজার ক্ষতিকর দিকের কোনো উপশ্রম দিতে পারেননি জর্জ-১, কিন্তু রানী এনি দিতে পেরেছিলেন। ফ্রান্সে রাজারা জয়লাভ করলেন অভিজাত শ্রেণির উপর এবং তাদের মাথা শিরোচ্ছেদ যন্ত্রের নিচে পতিত হলো।
