ধর্মীয় ক্ষমতা ধর্মনিরপেক্ষ ক্ষমতার চেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে। এ কথা সত্য যে, ধর্মীয় রাজনৈতিক বিপ্লব শুরু হয় রাশিয়া ও তুরস্কে মহাযুদ্ধের পর। কিন্তু উভয় দেশেই রাষ্ট্রের সাতে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল প্রথাগত ধর্ম। পঞ্চাশ শতাব্দীতে বর্বরদের উপর চার্চের বিজয় যুদ্ধে পরাজয় সত্ত্বেও ধর্মীয় ভাবধারা বজায় রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সেন্ট অগাস্টিন রোম লুণ্ঠনের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত সৃষ্টিকর্তার শহরে ব্যাখ্যা দেন যে, প্রকৃত বিশ্বাসীদের কাছে অঙ্গীকার করা হয়নি জাগতিক ক্ষমতা এবং তাই তা আশা করা হয়নি ধর্মীয় গোঁড়ামির ফলস্বরূপ। সাম্রাজ্যে অস্তিত্বশীল পৌত্তলিকরা যুক্তি প্রদান করে যে, রোম পরাজিত হয় দেবতাদের পরিত্যাগ করার জন্যেই। কিন্তু আপাত সত্য মনে হলেও এ ধরনের যুক্তি সাধারণ সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়। পরাজিতের উন্নত সভ্যতা বিস্তার লাভ করে আক্রমণকারীদের ভেতর এবং খ্রিস্টীয় বিশ্বাস গ্রহণ করে বিজয়ীরা। বর্বরদের ভেতর এভাবে রোমের প্রভাব বজায় থাকে চার্চের মাধ্যমে। প্রাচীন সংস্কৃতির ভিত হিটলারের আগে কেউই টলাতে পারেনি।
০৫. রাজকীয় ক্ষমতা
রাজাদের উৎস যাজকদের মতো প্রাগৈতিহাসিক। অধুনা বিরাজমান সবচেয়ে পশ্চাৎপদ বর্বর সমাজের অবস্থা থেকেই শুধু ধারণা লাভ করা যেতে পারে রাজতান্ত্রিক ক্রমবিকাশের প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে। রাজার সম্প্রদায় বা জাতিকে যুদ্ধে নেতৃত্ব দান করেন প্রাতিষ্ঠানিক পূর্ণতালাভের পর পতন শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। তিনিই স্থির করেন কখন যুদ্ধ করতে হবে এবং কখন শান্তি স্থাপন করতে হবে। তিনি প্রায়ই আইন প্রণয়ন করেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন বিচার বিভাগীয় প্রশাসন। সিংহাসনে তার অধিকার কমবেশি বংশগত। তার ওপর তিনি একজন পূতপবিত্র ব্যক্তি। দেবতা না হলেও তিনি প্রভুর আশীর্বাদপ্রাপ্ত।
কিন্তু এ ধরনের রাজতন্ত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যায় সরকারের দীর্ঘ ক্রমবিকাশ ও বর্বরদের তুলনায় উন্নততর সুসংগঠিত সম্প্রদায়ের। সেকেলে সমাজেও অধিকাংশ ইউরোপীয়র কল্পনা অনুরূপ কোনো বর্বরপ্রধান প্রকৃত খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা যাকে প্রধান বলে ধরে নেই। তিনি শুধু ধর্মীয় ও সামাজিক আনুষ্ঠানাদি পরিচালনা করে থাকেন। কখনও লর্ড মেয়রের মতো ভাষণদান করেন ভোজসভায়। কখনও যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। কিন্তু তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন না, কারণ অতিমাত্রায় পবিত্র তিনি। কখনও তার মানা (MANA) এমন যে কোনো প্রজা তার উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না। কার্যত তিনি বিরত থাকেন জনগণের কাজে অধিকমাত্রায় অংশগ্রহণ থেকে। তিনি আইন তৈরি করতে পারেন না, কারণ তা গঠিত হয় প্রথা অনুযায়ী। তার প্রয়োজন হয় না প্রশাসনে, কারণ ছোট সম্প্রদায়ে প্রতিবেশিদের দ্বারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শাস্তি প্রদত্ত হয়ে থাকে। দুজন প্রধান থাকেন কিছু বর্বর সমাজে : একজন নিরপেক্ষ ও অন্যজন ধর্মীয়। প্রাচীন জাপানের সগোন ও মিকাডোর মতো নয়। কারণ নিয়মানুযায়ী শুধু আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা রয়েছে ধর্মীয় প্রধানের। প্রাচীন বর্বর সমাজে সাধারণত সিদ্ধান্তমূলক প্রশ্নে আনুষ্ঠানিক সরকারের চেয়ে প্রথার গুরুত্ব এত বেশি যে ইউরোপীয়দের কাছে প্রধান হিসেবে খ্যাত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ভেতর থেকেই শুধু রাজকীয় ক্ষমতার সূত্রপাত হয়।
হিজরত ও বিদেশি আক্রমণ প্রথা ধ্বংস ও পরিণামে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টিতে বড় ধলনের শক্তি। শাসকরা সভ্যতার সর্বনিম্ন স্তরে রাজা বলে খ্যাত। রাজ-পরিবারগুলো কখনও বিদেশি হয়ে থাকে এবং প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্ট শ্রেষ্ঠত্বের দ্বারা শ্রদ্ধা অর্জন করে। কিন্তু রাজতান্ত্রিক বিবর্তনে প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এটা সাধারণ বা অসাধারণ যে স্তরেই থাকুক না কেন তা একটি বিবর্তনমূলক প্রশ্ন।
এটা পরিষ্কার যে যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে রাজশক্তি বৃদ্ধির ব্যাপার। কারণ সাধারণ ঐক্যের প্রয়োজন খুবই স্পষ্ট যুদ্ধকালীন সময়ে। বিবর্তনমূলক উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অশুভ প্রভাব এড়ানোর সবচেয়ে সহজ পন্থা হচ্ছে রাজতন্ত্রে উত্তরাধিকারমূলক বৈশিষ্ট্য অর্জন। রাজা যদিও তার উত্তরসূরি নিযুক্ত করার ক্ষমতা রাখেন তারপরও তিনি প্রায় নিশ্চিতরূপেই তার পরিবারের সদস্যদের ভেতর থেকে তা করে থাকেন। কিন্তু চিরকাল স্থায়ী হয় না রাজবংশ।
রাজপরিবারের সূচনা হয় জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা বিদেশ জয়ের মাধ্যমে। সাধারণত ধর্মই নতুন পরিবারকে প্রথাগত উৎসবের মাধ্যমে বৈধ করে তোলে। এসব সুযোগ রাজকীয় ক্ষমতা লাভবান হয়। কারণ তা রাজকীয় ক্ষমতায় অপরিহার্য সমর্থন দান করে। প্রথম চার্লস বলেছিলেন কোনো বিকল্প নেই, কোনো রাজা নেই। সর্বযুগব্যাপী সত্য ছিল এ জাতীয় মেক্সিম রাজতন্ত্রের। উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের কাছে রাজপদ এতে লোভনীয় যে একমাত্র শক্তিশালী ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞাই তারেকে বাধ্য করতে পারে এ ধরনের লোভ পরিত্যাগে।
বর্বর প্রধান ও রাজার মধ্যবর্তী যতগুলো স্তরই থাকুক না কেন, এই প্রক্রিয়া ইতিহাস যুগে সর্বপ্রথম মিসরে ও ব্যাবিলনে সমাপ্ত হয়। খ্রিঃ পূঃ ৩০০০ অব্দে নির্মিত মহান পিরামিডের নির্মাণ সম্ভব ছিল একমাত্র প্রজাদের উপর প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী কোনো রাজার পক্ষেই। এ সময় ব্যাবিলনে কিছু সংখ্যক রাজা ছিলেন, কিন্তু মিসরের সঙ্গে তুলনা হতে পারে এমন কোনো রাজা ব্যাবিলনে ছিলেন না। কিন্তু রাজারা তাদের নিজ নিজ এলাকায় পরিপূর্ণ শাসক ছিলেন।
