প্রচারণার মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জন সম্পর্কে ধারণা লাভে ইচ্ছুক যে কোনো ব্যক্তির কাছে পোপীয় ক্ষমতার উত্থান-পতন একটি পাঠোপযোগী বিষয়। এটুকু বলা যথেষ্ট নয় যে, মানুষ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিল এবং তারা বিশ্বাস করত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ক্ষমতায়। মধ্যযুগব্যাপী প্রচলিত ধর্মবিরোধী মতবাদ বিরাজমান ছিল এবং সার্বিকভাবে পোপ শ্রদ্ধা পাওয়ার উপযুক্ত না হলে তা প্রটেস্ট্যান্টবাদের মতো বিস্তার লাভ করত। প্রচলন বিরোধী মতবাদ ছাড়া ধর্মনিরপেক্ষ শাসকরা চার্চকে রাষ্ট্রের অধীন রাখার জোর চেষ্টা করত, কিন্তু তা সফল হলেও পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্যর্থ হয়। এর রয়েছে অনেক কারণ।
প্রথমত, বংশগত উত্তরাধিকারমূলক ছিল না পোপীয় পদ এবং তাই ধর্মনিরপেক্ষ রাজতন্ত্রের মতো দীর্ঘকাল অবধি সংখ্যালঘুতা প্রসূত অসুবিধার সম্মুখীন হয়নি। চার্চে ঈশ্বর ভঙ্গি, জ্ঞান ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছাড়া কেউ প্রসিদ্ধি লাভ করতে পারেনি। ফলস্বরূপ অধিকাংশ পোপই এক বা একাধিক দিক থেকে সাধারণ স্তরের অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন। সামর্থ্য লাভ করতে পারতেন ধর্মনিরপেক্ষ সার্বভৌম রাজা। কিন্তু প্রায়ই ঘটেছে এর বিপরীতটি। তার ওপর পাদ্রিদের মতো আবেগ নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না তাদের। রাজারা বারবার পৃথক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে সৃষ্ট অসুবিধায় পড়েন, চার্চের বিষয় হওয়ার জন্য পোপের কারুণার মুখাপেক্ষী হতে হয়। কখনও তারা চেষ্টা করেন হেনরি-৮ এর মতো সমস্যা মোকাবেলা করার নীতি অনুসরণের। কিন্তু তাদের প্রজারা মুক্ত হয় অধীনতার শপথ থেকে এবং পরিশেষে তাদের স্বীকার করতে হয় বশ্যতা অথবা হতে হয় পরাজিত।
নৈর্ব্যক্তিক অবিচ্ছেদ্যতা হলো পোপীয় মর্যাদার অন্য একটি বড় শক্তি। কতই না আশ্চর্যজনক ফ্রেডারিক-২ এর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কোনো পোপের মৃত্যুতে সৃষ্ট ক্ষীণ পার্থক্য। এমন কিছু মতবাদ এবং রাষ্ট্রীয় শাসন প্রণালি ছিল যে সমাজ নির্ভরতার সঙ্গে রাজারা এগুলো বিরোধিতা করতে পারতেন না। একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ সরকারগুলোর তুলনামূলক অবিচ্ছেদ্যতা বা উদ্দেশ্যের সংশক্তি অর্জন করে জাতীয়তাবাদের অভ্যুদয়ের ফলে।
রাজারা সাধারণত একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে অজ্ঞ ছিল। অন্যদিকে অধিকাংশ পোপই ছিলেন জ্ঞানী এবং সর্ববিষয়ে উত্তমরূপে ওয়াকিবহাল। তার ওপর সামন্ত প্রথার সঙ্গে একই সূত্রে বাঁধা ছিলেন রাজারা। ফলে সবসময় শক্ত ছিল অরাজকতাজনিত বিপদ মোকাবেলা করা। এই প্রথা নবতর অর্থনৈতিক শক্তির শত্রু ছিল। সর্বোপরি এ শতাব্দীতে রাষ্ট্রের চেয়ে চার্চ প্রদর্শন করে উন্নতর সভ্যতার প্রতিমূর্তি।
কিন্তু চার্চের বড় শক্তি ছিল স্বর্গীয় প্রভাবে অনুপ্রাণিত শ্রদ্ধাবোধ। এ ধরনের নৈতিক পুঁজি হিসেবে তা প্রাচীনকালে নির্বাহিত নির্যাতনের গৌরব উত্তরাধিকর সূত্রে অর্জন করে। আমরা দেখেছি যে, এর বিজয় সম্পর্কযুক্ত ছিল বলপূর্বক কৌমার্য প্রথার বাস্তবায়নের সঙ্গে এবং মধ্যযুগীয় চিন্তাধারায় কৌমার্য প্রথা অত্যন্ত আর্কষণীয় ছিল। কিছু সংখ্যক পোপ ছাড়া অধিকাংশ যাজকই কষ্ট করেছেন নীতি বিসর্জন না দিয়ে। সাধারণ মানুষের কাছে এ কথা পরিষ্কার ছিল যে, বল্গাহীন লোভ-লালসা-লাম্পট্য ও আত্মকেন্দ্রিকতার এ বিশ্বে চার্চের মর্যাদাশীল প্রসিদ্ধ ব্যক্তিরা নৈর্ব্যক্তিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সাধারণ জীবনযাপন করেছেন এবং স্বেচ্ছায় ব্যক্তিগত সহায়-সম্পদের অধীন করে দিয়েছেন। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে চিত্তাকর্ষক পবিত্র ব্যক্তিরা-হিল্ডার ব্র্যান্ড, সেইন্ট বার্নাড, সেইন্ট ফ্রান্সি জনমত উদ্ভাসিত করেছেন এবং রোধ করেছেন নৈতিকতার অবক্ষয়। অন্যথায় তা উদ্ভূত হতো অন্যের দুষ্কর্মের ফলস্বরূপ।
আদর্শিক উদ্দেশ্য এবং ক্ষমতার প্রতি মোহের জন্য ক্ষমার অধিকারী যে কোনো সংগঠনের প্রতি শ্ৰেষ্ঠ গুণের জন্য খ্যাতি বিপজ্জনক এবং পরিণামে তা নিশ্চিতভাবে অপরিনামদর্শী নির্মমতার ভেতর শ্রেষ্ঠত্বের জন্ম দেয়। জাগতিক বস্তুর ব্যাপারে ঘৃণা প্রচার করে চার্চ এবং এভাবে কর্তৃত্ব অর্জন করে রাজপুরুষের উপর। দারিদ্র্যব্রত পালন করে খ্রিস্টান ভিক্ষুরা। এর ফলে বিশ্ব এতই প্রভাবিত হয় যে, এর আগে অর্জিত চার্চের প্রভূত সম্পদ আরও বৃদ্ধি পায়। ভ্রাতৃপ্রেম প্রচারের মাধ্যমে বিজয়মণ্ডিত দীর্ঘ ও নৃশংস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় উদ্দীপনা সৃষ্টি করেন সেইন্ট ফ্রান্সিস। পরিশেষে রেনেসাঁ চার্চের ক্ষমতা ও সম্পদের উৎস সব নৈতিক উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে এবং প্রয়োজন দেখা দেয় আকস্মিক সংস্কারের জন্যে পুনর্জাগরণ পুনরুদ্ভাবনের।
এর সবই অপরিহার্য হয়ে পড়ে যখন কোনো সংগঠনের উদ্দেশ্যে উৎপীড়নমূলক ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে সদ্গুণ ব্যবহৃত হয়।
প্রথাগত ক্ষমতার পতন সর্বদাই বিদেশি শক্তির দ্বারা বিজিত হওয়া ছাড়া ওইসব ব্যক্তির দ্বারা এর অপব্যবহারের ফল। মেকিয়াভেলির মতো এমন ভাবা হতো যে মানুষের মনে এর অবস্থান এত দৃঢ় যে এর অপসারণ অসম্ভব চরম অপরাধমূলক ব্যবস্থার দ্বারাও।
পোপের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হতো মধ্যযুগে। বর্তমানকালে যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রিমকোর্টের প্রতি সেই সম্মান দেখানো হয় অনুরূপভাবে গ্রিকরা দৈববাণী প্রকাশের স্থানের প্রতি যে সম্মান দেখাত। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের কার্যকরিতা সম্বন্ধে পড়াশোনা করেছেন এমন অনেকেই জানেন যে সুপ্রিমকোর্ট ধনতন্ত্র সংরক্ষণে নিয়োজিত শক্তিগুলোর একাংশ। কিন্তু এগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত মানুষের প্রতি সম্মান হাসের ব্যাপারে কিছুই করেন না। আবার কিছু সংখ্যক মানুষ আছে যারা সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষের চোখে বিধ্বংসী ও বলশেভিক হওয়ার জন্য ঘৃণিত ও কলঙ্কিত। লুথারের মতো সংবিধানের সরকারি ব্যাখ্যাদানকারী কর্তৃপক্ষের উপর কেউ সফল আক্রমণ চালানোর আগে তার জন্য প্রয়োজন হবে স্পষ্টভাবে পক্ষভুক্ত মানুষ সংগ্রহের জন্য বেশ কিছু অগ্রগতি অর্জন করা।
