ভূগোলের সম্বন্ধে যাহা প্রযোজ্য ইতিহাস শিক্ষার বেলাতেও তাহাই বরং আরও বেশি ভাবে খাটে। তবে ইতিহাস শিক্ষা একটু বয়স বেশি হইলে শুরু করিতে হয় কারণ অতি অল্পবয়সে শিশুর সময়-জ্ঞান খুবই কম থাকে। প্রথমে বিখ্যাত লোকদের গল্প বহুচিত্রিত পুস্তকে বিশেষ আকর্ষণীয়ভাবে শিশুদের সম্মুখে ধরিতে হইবে। ওই রকম বয়সে আমার নিজের একখানা ইংল্যাণ্ডের ইতিহাসের ছবির বই ছিল। তাহাতে একটি ছবি ছিল রানী ম্যাটিল্ডা আবিংডনে বরফের উপর দিয়া টেমস্ নদী পার হইতেছেন। সেই ছবিখানি আমার মনে এমন গভীরভাবে রেখাপাত করিয়াছিল যে, আঠারো বৎসর বয়সে আমি যখন ঠিক ওইরূপভাবে বরফ পার হইয়া গিয়াছিলাম তখন আমার দেহ-মনে শিহরণ উঠিয়াছিল। মনে হইতেছিল রাজা স্টিফেন যেমন রানী ম্যাটিল্ডাকে সসৈন্যে অনুসরণ করিয়াছিলেন তেমনই আমার পিছনে যেন স্টিফেন ছুটিয়া আসিতেছিলেন। আমার ধারণা পাঁচ বৎসর বয়সের এমন কোনো বালক নাই যে আলেকজান্ডারের জীবনী শুনিয়া আনন্দিত না হইবে। কলম্বাসের জীবনকথায় ইতিহাস অপেক্ষা ভূগোলের অংশই বেশি। দুই বৎসর বয়স্ক শিশু অন্তত সমুদ্রের সঙ্গে পরিচয় আছে এমন শিমু যে কলম্বাসের জীবন-কথায় আনন্দ পায় এ প্রমাণ আমি নিজেই দিতে পারি। শিশু যখন ছয় বৎসর বয়সে পদার্পণ করে তখন মিঃ এইচ, জি ওয়েলসের ধরনের লেখা পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তাহাকে দেওয়া চলে, অবশ্য কোনো কোনো অংশ আরও সরলভাবে লেখা এবং অধিকতর ছবি সন্নিবেশ করার প্রয়োজন হইবে; অথবা সম্ভবপর হইলে চলচ্চিত্রের সাহায্য গ্রহণ করা চলে। লন্ডনে বাস করিলে শিশু প্রাকৃতিক ইতিহাসের জাদুঘরে [Natural History Museum] অদ্ভুত প্রাণী দেখিতে পারে কিন্তু দশ বৎসর কিংবা ওই রকম কাছাকাছি বয়স ছাড়া শিশুকে আমি ব্রিটিশ জাদুঘরে [British Museum-F] লইয়া যাইতে চাহি না। ইতিহাস শিখাইবার সময় বিশেষ লক্ষ্য রাখিতে হইবে যাহাতে আমাদের বয়স্ক ব্যক্তিদের নিকট যাহা আনন্দদায়ক তাহা যেন জোর করিয়া শিশুর উপর চাপাইয়া দেওয়া না হয়। যে দুইটি বিষয় শিশুকে প্রথমে আকৃষ্ট করে তাহা হইল পৃথিবীতে মানুষের প্রথম আবির্ভাব, বন্য মানুষ হইতে ক্রমে সভ্য মানুষের পর্যায়ে তাহার। জয়যাত্রার কথা। দ্বিতীয়, যেখানে কোনো ব্যক্তির বীরত্বে মুগ্ধ হইয়া বালক তাঁহার প্রতি অনুরক্ত হয় তাহার জীবনের ঘটনাগুলির সরস নাটকীয় ভঙ্গিতে বর্ণনা। এ স্থানে মনে রাখিতে হইবে মানুষের অগ্রগতি সরল এবং সহজ পথে হয় নাই। আদিম বর্বর মানুষের নিকট হইতে রক্তের ভিতর দিয়া আমরা যে বর্বরতা উত্তরাধিকারসূত্রে পাইয়াছি তাহাই মাঝে মাঝে সভ্যতার দিকে আগাইয়া যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিয়াছি কিন্তু জ্ঞানের বলে মানুষ এই প্রতিরোধ জয় করিয়াছে। কোনও বিশেষ এক দেশের অধিবাসীদের কথা নয়, সমগ্র মানব জাতির ক্রমবিবর্তন ও অগ্রগতির কাহিনী হইবে ইতিহাস শিক্ষার গোড়ার কথা। মানুষ তখন বাহিরের নানারূপ প্রতিকূল ও বিশৃঙ্খল অবস্থা এবং ভিতরের অজ্ঞানতার সঙ্গে সংগ্রাম করিতে করিতে আগাইয়া চলিয়াছে, বিচারবুদ্ধির ক্ষুদ্রদীপ জ্ঞানের দীপ্তিতে ক্রমশ উজ্জ্বলতর হইয়া অজ্ঞানের অন্ধকার রজনীর অবসান ঘটাইতেছেন। বিভিন্ন গোষ্ঠী, জাতি এবং ধর্মসম্পদায়ে বিভক্ত হওয়া মানবের পক্ষে নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক; বিশৃঙ্খলা ও অজ্ঞান তমসারাত্রির আবাসনকল্পে মানবের যে সংগ্রাম অবিরাম চলিয়াছে তাহাতে এই ভেদবুদ্ধি মানুষকে দুর্বল এবং বিভ্রান্ত করিয়া ফেলে। পক্ষান্তরে, সুশৃঙ্খল ও জ্ঞানদীপ্ত মানবসমাজ গড়িয়া তোলাই মানবোচিত কাজ।
প্রথমে আমি ছবি ও গল্পের ভিতর দিয়া বিষয়বস্তুটির অবতারণা করিব। প্রথমে থাকিবে কেবল মানুষের আদিম যুগ হইতে ক্রমোন্নতির পথে জয়যাত্রার কথা। ইহার অন্তর্নিহিত ভাব এবং মানুষের আদর্শে কি হওয়া উচিত সে কথা প্রথমে না বলিয়া পরে শিশুর বিচারবুদ্ধি কিছুটা বৃদ্ধি পাইলে–অবতারণা করা চলে। আমি দেখাইব কেমন করিয়া আদিম মানব শীতে কষ্ট পাইয়াছে, কাঁচা ফল খাইয়া জীবন ধারণ করিয়াছে। কখন আগুন আবিস্কার করা হইল এবং ইহার ফলে আদি মানবের জীবনে কি পরিবর্তন আসিল তাহা দেখাইব। এই প্রসঙ্গে প্রমিথিয়ুস কর্তৃক আগুন আনার কাহিনী বর্ণনা করিলে তাহা সময়োপযোগী হইবে। তাহার পরে দেখাইব কেমন করিয়া মিশর দেশে নীল নদের উপত্যকায় কৃষিকার্যের পত্তন হয় এবং কুকুর, ভেড়া ও গরু পোষা শুরু হয়। গাছের গুঁড়ি খোদাই করিয়া যে নৌকা তৈয়ার করা হইত তাহা হইতে শুরু করিয়া কেমন করিয়া বর্তমান যুগের বিরাট জাহাজ নির্মাণ করা সম্ভব হইয়াছে তাহা দেখাইব। মানুষের বাসস্থান আদি মানবের পর্বত গুহা হইতে কিভাবে বর্তমানে লন্ডন ও নিউইয়র্কের মতো বিরাট শহরের অবস্থায় আসিয়া পৌঁছিয়াছে তাহার চিত্র দেখাইব। অক্ষর ও সংখ্যা লেখার ক্রমবিকাশ দেখাইব, গ্রিসের উন্নত সভ্যতার কথা, রোমের বিপুল ঐশ্বর্যের কথা, তাহার পরবর্তীকালের সভ্যতার অবনতি ও অজ্ঞানের অন্ধকারের কথা এবং সর্বশেষ বর্তমান যুগের বিজ্ঞানের ক্রমোন্নতির কথা গল্প ও চিত্রের সাহায্যে শিশুদিগকে বুঝাইতে হইবে। খুব কম বয়সের শিশুর নিকটও এই বিষয়গুলি চিত্তাকর্ষক করা যায়। মানবজাতির ইতিহাস বর্ণনায় যুদ্ধবিগ্রহ, অত্যাচার ও নিষ্ঠুরতা সম্বন্ধে নীরব থাকিব না তবে রণজয়ী বীরদিগকে আমি খুব প্রশংসার পাত্র বলিয়া ছাত্রদের সম্মুখে তুলিয়া ধরিব না। আমার ইতিহাস শিক্ষার প্রকৃত বিজয়ী বীর তাহাদিগকেই বলিব যাহারা মানুষের ভিতরের ও বাহিরের অজ্ঞান-তমসা দূর করিয়াছেন-যেমন বুদ্ধ এবং সক্রেটিস, আর্কিমিডিস, গ্যালিলিও, নিউটন এবং আর সমস্ত জ্ঞানী ব্যক্তি যাহারা আমাদিগকে আত্মজয় করিতে কিংবা বহিঃপ্রকৃতি জয় করিতে সাহায্য করিয়াছেন। মানুষের মহান সম্ভাবনা এবং বিপুল ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আমি ছাত্রদের ধারণা গড়িয়া তুলিতে চাই। তাহারা যেন বুঝিতে পারে যে যুদ্ধবিগ্রহ এবং আমাদের পূর্বপুরুষ আদি বর্বর মানবের মতো আচরণ দ্বারা আমরা অবনতির ভ্রান্ত পথেই চারিত হইব, মানুষের মধ্যে সদ্ভাব, মানবজাতির পক্ষে কল্যাণকর কাজ করাতেই মানুষের সভ্যতার আসল পরিচয়।
